ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 34

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৩৪
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

মেয়ে জামাই এবং মেহমান চলে যাওয়ার পরে সামিন আর ইলহাম ইশমামের মুখোমুখি হলো। সামিন ভাইকে ধ'ম'কের সুরে বলতে লাগলো,“তুই টাকা পয়সা নিয়ে অহংকার শুরু করেছিস কবে থেকে ছোটো?”

ইশমাম দুই ভাইয়ের দিকে একপলক তাকিয়ে বললো,“তোমরা যেদিন থেকে দোষ কে আস্কারা-লাই দিতে শুরু করলে সেদিন থেকে।”

ওখানে বাড়ির প্রত্যেকেই দাঁড়িয়ে আছে। সামিন সবার মুখের দিকে একবার করে তাকিয়ে ইশমামকে বলে,“এখন মেয়েটিকে আর ছেলেটিকে থানায় পুরলে খুব অন্যায়ের প্রতিবাদ হতো? দোষের শাস্তি হতো? বিয়ে না মেনে ছাড়াছাড়ি করিয়ে দিলে খুব বাস্তবিক সিদ্ধান্ত হতো সেটা? আমার বিরক্ত লাগছে এসব ছোটো। এতো ঝামেলা ভালো লাগছে না। তুই ওদের না মান তবে এভাবে অপমান করিস না,তোর সাথে অন্তত এসব যায়না। ”

আলো পাশ থেকে বলে,“তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছো ইশমাম আমরা তিন বৌ-ই নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। এ নিয়ে তোমাদের ভাইদের কখনো কোনো অসুবিধা ছিলো না। আজ তবে মেয়ে বিয়ে দিতে গিয়ে এতো টাকা পয়সার ধার ধারছো কেন ? আর ছেলেটি যথেষ্ট যোগ্য, সবদিক থেকে, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তার। তোমার অসুবিধা তো ওরা তোমার অমতে বিয়ে করেছে তাই, তো সেটা নিয়ে রাগ করে বসে থাকো না! থাকো!
কিন্তু তুমি টাকা নিয়ে কেন খোটা দেবে? ছেলেটি এতিম বলে মা বাবার গুরুত্ব বোঝে না এসব বলে কেনো কথা শোনাবে? সবকিছুর একটা সীমা থাকা দরকার। মানবে না? তোমার মানতেও হবে না। কথায় কথায় বলছো মেয়েকে জন্ম দিয়েছো, মেয়ে তোমার ইমোশনের দাম দেয়নি, তা মেয়ের মনটা ভে'ঙে পিতৃত্ব সার্থক করতে যাচ্ছিলে ? একবার তো বোঝাওনি মেয়েকে মাথায় হাত বুলিয়ে, হম্বতম্বি শুরু করে দিয়েছিলে, রা'গ দেখিয়েছো , না আমাদের ঠান্ডা মাথায় ভাবতে দিয়েছো,না নিজে ভেবেছো। এর মাঝে ইরফান গিয়ে ছেলেটাকে মে'রে আসলো। তোমরা ভুলে যাও এভ্রি অ্যাকশন হ্যাজ ইটস অপজিট এন্ড ইক্যুয়াল রিয়াকশন। তোমরা যা খুশি তাই করবে,অথচ কারো প্রতিক্রিয়া নিতে পারবে না ! ছেলে মেয়ে অবশ্যই অন্যায় করেছে, তবে তোমাদের একগুয়ে আচরণের কারণে। নয়তো এমন কিছুই হতো না।”

ইশমাম আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আলো কথাগুলো বলে দ্রুত চলে যায়। সারাদিনের ঝক্কি ঝামেলা সামলে তার শরীরটা বিশ্রাম চাচ্ছে। সেও আর নিতে পারছে না এতো ঝামেলা।

আস্তে ধীরে লিভিং রুম ফাঁকা হয়। এতো মেহমান,সবাই একসাথে বেড়িয়ে যাওয়ায় বাড়িটা আবারও নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গিয়েছে। দোতলায় উঠে যে যার রুমে ঢুকে পরে সবাই, তখনও কেউ দেখতে পায়নি ইরফানকে। তখনও দোতলার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে সে। একটা থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট, উদোম শরীর। কিছুক্ষণ ওভাবে ওখানে দাড়িয়ে থাকার পরে শরীরটা নে'ড়ে আরমোরা ভে'ঙে নিজের ঘরে গিয়ে গায়ে একটা টি-শার্ট চাপাতেই শেহা দরজায় নক করলো। ইরফান শেহাকে অবাক করে দিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলে,“ও শেহু! আয়।”

শেহা ঢুকলো, সে অযথা কোন কথা না বাড়িয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জানতে চাইলো,“খাবে না? আসরের ওয়াক্ত হয়েছে। এখন খাবে?”

বিছানায় বসলো ইরফান। শেহার ভীষণ কৌতুহল জাগছে মনে ইরফানকে নিয়ে, রাগী মির্জার এতো বরফ শীতল ভাব তার হজম হচ্ছিল না। কিন্তু ঐ প্রিতমের চ্যাপ্টার নিয়ে কোন কথা বললে যদি রেগে যায়,তাই সে ঐ প্রসঙ্গের ধারেকাছেও গেলো না। বললো,“খাবার তোমার ঘরে নিয়ে আসবো? কি দেবো? বিফ তো?”

_হু। যা।
বেডের হেডসাইডে হেলান দিয়ে বসলো ইরফান।

শেহা চলে যায়। ইরফান তখন একটা সিগারেট ধরিয়ে আয়েশ করে ধোঁয়া ওড়াচ্ছে। আরও কিছুক্ষণ চুপ থাকার পরে হঠাৎ তার ফোন বেজে ওঠে। কলটা রিসিভ করে ইরফান কিছুক্ষণ চুপ থেকে ওপাশের ব্যক্তির কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে, এর মাঝে শেহা খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকলে ইরফান সিগারেটটা দ্রুত অ্যাশট্রেতে ফেলে দেয়। তারপর ফোনটা কানে চেপে ধরে ওপাশের ব্যক্তিকে বলে,“আপডেট জানাবি। ইনফরমেশন এক্যুরেট হতে হবে নয়তো লাত্থি মে'রে একেবারে....”

ফোন কাটলে শেহা অবাক হয়ে বলে,“কি ইনফরমেশন?”

_কিছু না,কাজের।
চামচ দিয়ে খাবারটা খেতে খেতে ইরফান শেহাকে বললো,“তুই খেয়েছিস?”

শেহা মিষ্টি করে হেসে মাথা নাড়ায়। কিছুক্ষণ ইরফানকে দেখে সে। শ্যামলা বর্ণের একটা গম্ভীর মুখ। চুপচাপ খাচ্ছে খাবারটা। ইরফানের আচরণ স্বাভাবিক দেখতে পেয়ে সে খুব সাহস করে বলে,“ইনু অত ডাকলো তোমাকে কেঁদে কেঁদে,একটু বেরোতে পারতে তো। ওকে কত সুন্দর লাগছিলো জানো? একেবারে বৌ বৌ।”

ইরফান চুপচাপ খাচ্ছে,শান্ত ভঙ্গিতে। শেহার কথা শেষ হলেও সে খেতে থাকে, তারপর আস্তেধীরে বলে,“একটা সফট ড্রিংকস এনে দে শেহু।”

_____

গত এক সপ্তাহ যাবত প্রেরণা যত ছোটাছুটি করেছে তাতে প্রেরণা অনুভব করছে তার ওজন কম করে হলেও পাঁচ কেজি কমলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারার হাল দেখে সে নিজেই অবাক।
শুদ্ধর স্কুলে গেলে শুদ্ধর বন্ধুদের মায়েরা প্রেরণার থেকে স্লিম ফিগার ধরে রাখার টিপস চায়,তখন প্রেরণা বলতে পারেনা তার এমন টিঙটিঙে শরীরের রহস্য।
জীবনের ম্যারাথন রেসের নিয়মিত প্রতিযোগী প্রেরণা। দৌড়াচ্ছে তো দৌড়াচ্ছেই। থামবার নাম নেই।
আজ ক'দিন ধরে রেস্তোরাঁয় বসছে না সে। ওদিকে প্রেরণার লোনটা স্যাংকশন হয়েছে। এখন কেটরিং সার্ভিসের বিজনেস টা গুছিয়ে নিতে পারলেই শান্তি। তবে এতোসব চিন্তা সাইডে রেখে সে শুধু ভাবছে প্রিতম-ইনায়ার বিয়ের অনুষ্ঠানের কথা। অনুষ্ঠান মোটামুটি ঘরোয়া হবে,তবে প্রেরণা কোনো কমতি রাখবে না।

লিভিং রুম থেকে হাসির শব্দ ভেসে আসছিলো। ইনায়া হেসে কুটিকুটি হচ্ছে প্রনমির সাথে। দু'টোতে মিলেছে বেশ,প্রায় সমবয়সী কি-না। প্রেরণার অসম্ভব ভালো লাগে ইনায়াকে, ভীষণ সরল, স্নিগ্ধ, একটুও হিংসা নেই, আপাতদৃষ্টিতে এটাই মনে হয় প্রেরণার। অবশ্য অমন যৌথ ফ্যামিলিতে যারা বেড়ে ওঠে,তারা এমনই হয়।
প্রেরণাও এমনই ছিলো,তবে এখন বেশ জটিল সে। এতো সরলতা তার মাঝে নেই।

প্রেরণা বিকেলের অলস সময়ে শুদ্ধকে হোমওয়ার্ক দেখিয়ে দিয়ে তার প্ল্যান্টস গুলোর পরিচর্জা করছিলো ঠিক সেসময় তার ফোন বেজে ওঠে। ব্যস্ত হাতে কলটা রিসিভ করে সালাম দিতেই ওপাশ থেকে সালামের জবাব দেন সাগর ভুঁইয়া।

প্রেরণার ভ্রু কুঁচকে গেলো, বিরক্তিতে তেঁতো হলো মুখ। সাগর ভুঁইয়া বলতে লাগলেন,“তোমার উত্তর তো জানালে না প্রেরণা।”

প্রেরণার গা কাঁপছে রাগে। দুবার ঘনঘন নিশ্বাস ফেলে সে বলতে লাগলো,“আপনার এ প্রস্তাবে আমি রাজি নই।”

_ভেবে বলেছো?

_আমি ভাবিইনি এমন জ'ঘন্য বিষয়টি নিয়ে। আশা করছি বুঝতে পারছেন আঙ্কেল।

সাগর ভুঁইয়া হাসলেন,বলতে লাগলেন,“ঠিক আছে। অসুবিধা নেই। রাখছি প্রেরণা কেমন?”

অনেক নরম শান্ত আচরণ মুরব্বির। ফোন কে'টে প্রেরণা বিছানায় বসে কপালে হাত দিয়ে রাখলো। আবার শুরু হয়েছে মাথাব্যথা। ইচ্ছে করছে একটা হাতুড়ি দিয়ে এক বারিতে কপালের হাড় ভেঙে ফেলতে। যে কপালে সবসময় সময়ে অসময়ে যন্ত্রনা শুরু হয়, যে কপালে সুখ সয়না, যে কপালের দরুন এমন ইতর গুলো প্রেরণার পিছু লাগে,সে কপালটাকে চুড়মার করে দিতে ইচ্ছে করছে হাতুড়ির বারিতে প্রেরণার।

মাথাব্যথার ওষুধ খেয়ে প্রেরণা গেলো কিচেনের দিকে। কিচেনের দরজার কাছটাতে যেতেই তার কদম থামলো। প্রিতম আর ইনায়া তখন কিচেনে ছিলো। প্রিতম ফ্রাই প্যানে কিছু একটা ভাজি করছিলো। ইনায়া লোয়ার কিচেন কেবিনেটের ওপরে হাতে বই নিয়ে বসে আছে। সেদিন শশুর বাড়ি থেকে ফেরার পথেই প্রিতম অর্ডার করে দিয়েছিলো ইনায়ার বই।

স্বামী রান্না করছে,ইনায়া একহাতে বই নিয়ে আরেকটা হাত গালে রেখে তাকিয়ে আছে স্বামীর দিকে। তার চোখে স্বামীর চশমা।

কিছুক্ষণ দেখলো প্রেরণা ওদের দু'জনকে। আর ভেতরে ঢুকলো না ওদের বিরক্ত করতে। চলে গেলো প্রনমির ঘরে।

প্রনমির মাথায় তখন ওয়েল মাসাজ দিচ্ছিলেন মিস জেনি। আর প্রনমি তখন গুনগুন করে গাইছিলো,

“তুমি কোন্‌ ভাঙনের পথে এলে সুপ্তরাতে।
আমার ভাঙল যা তা ধন্য হল চরণপাতে॥”

প্রেরণা গিয়ে পাশেই বসলো, বললো,“গুনগুন করছিস কি? ভালো করে গা!”

প্রনমি হেসে বললো,“আমার গানের টিচার কি বলেন জানো আপু, বলে আমার কন্ঠ নাকি একেবারে রিমা বর্মনের মতো।”

_ঠিকই তো বলে। আমিও মিল খুঁজে পেয়েছি। তোর আজ গানের ক্লাস আছে?

_না তো, আজ সোমবার। আগামীকাল আছে।
এটুকু বলে প্রনমি উ'শ'খু'শ করতে থাকে। প্রেরণা বলে,“কিছু বলবি?”

_আমাকে কিছু টাকা দেবে আপু? আমি ভাবীর জন্য কিছু কিনতে চাই।

এমনিতে আপুর কাছে সহজে কিছু চায়না প্রনমি। কখনোই না। আজ ভাবীর জন্য চাইলো। দুদিনেই ভাবীর সাথে খাতির জমিয়ে ক্ষীর করেছে প্রনমি। তার কিছু একটা দিতে ইচ্ছে করছে নতুন ভাবীকে।

প্রেরণা হেসে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,“মিস জেনির কাছে দিয়ে দেবো টাকা।”

_____

শান্তিনীড়ের লিভিং রুমে উপস্থিত মানুষগুলোর আলোচনার বিষয়বস্তু ইরফান মির্জা। ইনশিরাহ এবং শেহাও ছিলো সেখানে,তবে সরাসরি বড়দের পাশে বসেনি তারা। বসেছে কিছুটা দূরে,মনযোগ দিয়ে শুনছে সবার কথা।
সবার অদম্য কৌতূহল ইরফানকে নিয়ে। হঠাৎ করে এতো ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার কারণ কি হতে পারে? আজ দুপুরে ইরফান সবার সাথে খেতেও বসেছিলো। তবে সন্ধ্যা থেকে বাড়িতে নেই। কোথায় গিয়েছে জানেনা কেউ।

ইলহাম ভাইকে বললো,“ওর এই হাবভাব আমার কাছে অস্বাভাবিক লাগছে ভাইয়া। ওর সাথে এসব যায়না।”

রিতু এবার একটু ছেলের কোল টেনে বললো,“এমন ভাবে বলছো কেন? এখন একটু শান্ত হয়েছে তবুও সমস্যা? আমার ছেলে কি অবুঝ? ঠিক বুঝেছে ও ঠান্ডা মাথায়।”

ইলহাম উদাস গলায় বলে,“হলেই ভালো।”

সামিন কথার মাঝখানে ইহানের দিকে তাকিয়ে বলে,“ডক্টর ক্যামেলিয়ার অ্যাকাডেমীতে যোগাযোগ করেছিলি? ইনুর প্রোগ্রামের পরে ওকে পাঠিয়ে দে।”

ইলহাম বলে,“হ্যা সে-ই ভালো। এসব অনেক ছোটো করে দেখেছি। এখন একটা ব্যবস্থা নিতেই হচ্ছে।”

আলো আর রিতু সবার মাঝখান থেকে উঠে টেবিলে রাতের খাবার পরিবেশন করতে চলে যায়।
শেহা এতক্ষণ তার মামা আর দাদানের কথা খুবই মনযোগ দিয়ে শুনছিলো। অতঃপর খুবই ক্ষীণস্বরে ইনশিরাহকে বলো,“তোমাদের রা'গী মির্জা না একবার এক অ্যাংগার ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাডেমীর মেম্বার হয়েছিলো?”

_হু।

_তো সেখান থেকে ফিরে এলো কেন?

_আরে সব ভালোই চলছিলো। ওর মধ্যে অনেক চেঞ্জ লক্ষ্য করেছি আমরা। হঠাৎ একদিন কোথাও গ্যাঞ্জাম করে অ্যাকাডেমীতে গেলো, হয়তো প্রিতমের সাথেই মারামারি করেছিলো। ওর মেজাজ খুব গরম ছিলো, ওদের “লাফ অ্যান্ড লাফ” কোর্স চলছিলো তখন। তখন ক্লাসে ওদের প্রফেসর ওকে বলে হাসতে,মন খুলে, দাঁত বের করে ত্রিশ মিনিট হাসতে। তখন ও মেজাজ দেখিয়ে প্রফেসরকে বলে,“আপনার হাসির মা'কে আব্বা।”
ঐদিন প্রফেসর পাপাকে ফোন করে বলে,“আপনার ভাইপোকে নিয়ন্ত্রণে আনা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। ওর জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রফেসর হায়ার করতে হবে‌।”

শেহা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ইনশিরাহর দিকে। ইনশিরাহ বলতে লাগলো,“ওর যে বৌ হবে সে বেচারীর জন্য আমার খুব দুঃখ হয় শেহু। জীবন টা ন'ষ্ট হয়ে যাবে মেয়েটির।”

শেহা লাজুক হাসলো। ক্ষীণ স্বরে বললো,“হয়তোবা এমন কিছুই হবে না। সে বেচারি হয়তো তোমাদের রা'গী মির্জাকে পেলে ভালো থাকবে।”

_____

ঠিক রাত ন'টার সময়ে প্রেরণার ফোনে একটি ইনকামিং কল এসেছে। ভাই আর ভাইয়ের বৌকে নিয়ে ডিনার শেষ করে কেবল উঠেছে প্রেরণা। এঁটো হাতেই ছুটে গিয়ে প্রেরণা কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সাগর ভুঁইয়ার বড় ছেলে সাহল ভুঁইয়া সালাম দেয়‌।
প্রেরণা সালামের জবাব দিলে সাহল ভুঁইয়া তাকে জানিয়ে দেয় প্রেরণার সাথে তাদের ব্যবসায়িক চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় তারা দালানটি অন্য পার্টির হাতে হস্তান্তর করেছে, ইতোমধ্যে এগ্রিমেন্ট পেপারে সাইন হয়েছে। অতিসত্বর প্রেরণা তার অ্যাডভান্সের অর্থ ফেরত নিয়ে যেন দালানটি ছেড়ে দেয়। প্রেরণা জবাব দেয়,সে তো টাকা বাড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে আরও কিছুদিন সময় চেয়েছিলো, তবুও কেন?
সাহল ভুঁইয়া কারণ বলেননি। তবে প্রেরণার বুঝতে বাকি নেই এর কারণ।

নিজের এতদিনের পরিশ্রমে গড়া স্বাদে আহ্লাদে ওখান থেকে সরিয়ে ফেললে তার ব্যাবসা এক নিমিষেই লস খাবে তা শতভাগ নিশ্চিত ভাবে বলাই যায়। এই অগোছালো পরিস্থিতিতে নিজের রুজি-রুটির মাধ্যমটির দুশ্চিন্তায় প্রেরণা ধপ করে বসে পরলো বিছানায়।

এখন কি করবে সে? কিছু কি করার আছে? কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে থেকে সে ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে ম্যানেজার সাব্বিরকে কল দেয়। ওপাশে সাব্বির কলটা রিসিভ করে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলে,“ম্যাম রেস্তোরাঁয় উকিলের থেকে নোটিশ এসেছে। সামনের মাসে....”

_জানি সাব্বির। তুমি এক কাজ করো, কাল আমার সাথে দেখা করো তো ভাই। জরুরী আলোচনায় বসবো।

ফোন কাটে প্রেরণা। যারপরনাই স্বাভাবিক সে। স্থির দৃষ্টিতে দেখছিলো মুখোমুখি আয়নায় নিজের মুখটা। প্রেরণার জীবনের বাঁকে বাঁকে এমন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে,ঘটবে। প্রেরণা সবসময় বলে যা হয় দেখা যাবে ‌কিন্তু পরে যা হয় তা দেখার মতো হয়না। দীর্ঘসময়ের বিরতি শেষে নতুন এক ঝামেলা এসে দাঁড়ালো, প্রেরণার ধৈর্য্যের পরিক্ষা নিতে।

_____

আজ প্রনমি ভীষণ ভীষণ ভীষণ খুশি। তাকে আজ টিচার তিন দফায় প্রশংসা করেছে। সবার থেকে বেশি প্রশংসা কুড়িয়েছে প্রনমি। এবং তাকে একটি পেন গিফট করেছে টিচার। প্রনমি যে একাডেমীতে গান শিখতে যায় সেখান থেকে তাদের অ্যাপার্টমেন্টের দূরত্ব খুব বেশি নয়। সময়ের হিসেবে ক্যাবে দশ মিনিট লাগে।
তবে আজ সম্ভবত বাড়ি ফিরতে দেরী হবে প্রনমির। ছায়ানট একাডেমী থেকে বেরিয়ে প্রনমি ক্যাবের জন্য দাড়িয়ে আছে মিস জেনির সাথে। মেইন রোডের পাশে যাত্রি ছাউনীর নিচে ।

আজ সকাল থেকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পরছে। দক্ষিণাঞ্চলে বন্যা চলছে,তবে রাজধানীতে তেমন একটা টের পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় প্রেরণা কিছুতেই প্রনমিকে একাডেমীতে আসতে দিতে চায়নি। প্রনমিই জেদ ধরে এলো।

দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো খালি ক্যাব পাওয়া গেলো না। ওদিকে মিস জেনি,যে কিনা ডায়াবেটিসের পেশেন্ট,তার জোরালো চাপ লেগেছে। এই মুহূর্তে ওয়াশরুমে যেতেই হবে। খুব কাছেই,কিছুটা দূরে একটা পাবলিক টয়লেট। সে প্রনমিকে বললো,“মা এখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে কোনো অসুবিধা হবে না তো? আমি যাবো আর আসবো। পারবে তুমি? নাকি আমার সাথে যাবে?”

প্রনমি মিষ্টি হেসে বললো,“আমি পারবো মিস জেনি। আমার ডিভাইস আমার সাথে আছে। কোনো অসুবিধা হবে না।”

মিস জেনি আশ্বস্ত হলো প্রনমির হাতে কলিং ডিভাইস দেখে। সে ছাতা মেলে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো পাশের পাব্লিক টয়লেটের কাছে।

প্রনমি মুখ হাসি হাসি করে দাঁড়িয়ে আছে, হাসছে কারন সে বৃষ্টির শব্দ শুনছিলো। ছোটোবেলার একটা অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য মনে পরে যায় প্রনমির। বাবা মায়ের সাথে তারা তিন ভাইবোন মস্কোর এলিন পার্কে ঘুরতে গিয়ে শেষ বৃষ্টিতে ভিজেছিল।
প্রনমি আশেপাশে কেউ নেই ভেবে গুন গুন করে গাইতে শুরু করলো,“পুরানো সেই দিনের কথা,ভুলবে কিরে হায়।
ও সে চোখের দেখা,প্রাণের কথা সে কি ভোলা যায়।”

ছড়ি নিয়ে দুকদম এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ধরতে চাইছে প্রনমি,তবে নাগাল পাচ্ছে না।

প্রনমি আজ পরেছে একটা ধোতি পাজামা এবং শর্ট কামিজ। আপু ওকে এটা কিনে দেওয়ার সময় বলেছিলো এটা নাকি পুরনো দিনের ফ্যাশন, ঘুরেফিরে আবারও পরছে সবাই।
ফ্যাশনেবল নাকি নয় তা দিয়ে প্রনমির কি?

মেয়েটির চুলের দুপাশে দুটো বিনুনি করা। হাতে একটি গিফট বক্স। তাতে রয়েছে তার নতুন মিষ্টি ভাবীর জন্য একটা মিষ্টি গিফট।

ঠিক ঐ সময়টিতে বিপরীত পাশের ছাউনী থেকে তাকে দেখছিলো কেউ। কিছুক্ষণ সাবধানী নজর আশেপাশে বুলিয়ে মাস্ক টা ঠিক করে ছাতা নিয়ে এগিয়ে যায় প্রনমির কাছে। প্রনমি তখন বৃষ্টি ছুঁতে ব্যস্ত। আচমকা এক পুরুষালি কন্ঠস্বরে সে চমকায়। কিছুটা ভীত লাগছে তাকে।
আগন্তুক লোকটি প্রনমিকে বলে,“এক্সকিউজ মি মিস!”

শত কসরত করেও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছেন না
মিস জেনি। ইদানিং হাপিয়ে উঠছে সে। প্রেরণা বারবার তাকে বলে বিশ্রাম নিতে,বাড়িতে থেকে শুধু শুদ্ধর দেখাশোনা করতে,কিন্তু অন্ধ মেয়েটির জন্য তার আলাদা টান। বন্ধ্যা মিস জেনি খুব ছোট থেকে ওদের তিন ভাইবোনকে দেখছে। ছোট্ট প্রনমির জন্য তার আলাদা মায়া,সবসময় মন পোড়ে মেয়েটির জন্য।
ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে সে দ্রুত চলে যায় যাত্রী ছাউনীর কাছে। গিয়েই সে দাঁড়িয়ে পরে সেখানে।‌
আশেপাশে ভালো করে দেখলো সে, পরপর শরীরটা কাঁপুনি দিয়ে উঠলো মিস জেনির। বোকার মতো তাকিয়ে রইল যাত্রী ছাউনীতে নিচে পরে থাকা প্রনমির কলিং ডিভাইস আর গিফট বক্সের দিকে।

আশেপাশে কেউ নেই,চলছে না একটা গাড়িও। চোখ তুলে আবারও আশেপাশে তাকায় জেনি। কাছে দূরে কোথাও প্রনমি নেই।

ক্লান্ত প্রেরণা কাকভেজা হয়ে কেবল ফিরলো বাড়িতে। রেস্তোরাঁর বিষয়টি নিয়ে কোনও সুরাহা হয়নি। তাকে দ্রুত নিজের প্রতিষ্ঠান সরিয়ে ফেলতে হবে, সেটি নিয়ে চিন্তিত প্রেরণা। বাড়িতে ঢুকে তার মনটা কিঞ্চিত ভালো হয়ে গেলো, বৃষ্টি পেয়ে শুদ্ধ আর তার নতুন মামি লিভিং রুমের ডিভানে কমফোর্টার মুরি দিয়ে হরর মুভি দেখছে। এই মেয়েটি যখন যার সাথে মেশে তখন তার মতো আচরণ করে,এখন যেমন শুদ্ধর বয়সী লাগছে মেয়েটাকে।

প্রেরণা ওদের কিছুক্ষণ দেখে রুমের ভেতরে চলে যায়,ঠিক তখনই প্রেরণার ফোনে মিস জেনির কল আসে। প্রেরণা ক্লান্ত হাতের আঙ্গুল চালিয়ে কলটা রিসিভ করতেই শুনতে পায় ওপাশে গলা ফাটিয়ে কাঁদছে মিস জেনি।
প্রেরণার হাত কাঁপে। কাঁপে গলা। বলে,“মিস জেনি?”

ভদ্রমহিলা শ্বাসও নিতে পারছিলেন না, কোনোমতে চেঁ'চি'য়ে বললো,“প্রনমি মামনি ইজ মিসিং প্রেরণা।”

চলমান......

[ আগামীকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য একদিন পরপর গল্প পাবেন। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 34 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন