#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৩৫ [ ১ম অংশ ]
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
[ ১ম অংশ ]
বি'কট আওয়াজ করে চেঁচিয়ে উঠলো প্রেরণা। ভাইয়ের নাম ধরে ডাকলো সে। প্রিতম তখন নিজের ঘরে কাজ করছিলো। বাইরে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে ততক্ষণে,তার সাথে বজ্রপাত, আবহাওয়ার অবস্থা খুব একটা ভালো নয়।
প্রেরণার চিৎকারে ছুটে এলো প্রিতম, লাফিয়ে উঠে বসলো ইনায়া।
নিজের ঘরের ড্রেসিং টেবিল ধরে হাপাচ্ছিলো প্রেরণা,আজ সারাদিনে মুখে কুটোটি কাটেনি সে,এই শরীরে হঠাৎ এমন ধাক্কা সামলাতে পারলো না মেয়েটা। গা গুলোচ্ছে তার সাথে অন্ধকার দেখছে চোখে।
প্রিতম ছুটে এসে বোনকে ধরে চেঁচিয়ে উঠলো,“আপু! কি হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে?”
ইনায়াও এসে ধরলো প্রেরণাকে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে প্রেরণার,গলার কাছে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে,মনে হচ্ছে কিছু আটকে গিয়েছে। হঠাৎ হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে প্রেরণা, চেঁচিয়ে বলে,“প্রনমিকে পাওয়া যাচ্ছে না ভাই!”
_____
লোকটার নাম কাজী আফতাব উদ্দিন। তেত্রিশ বছরের পেশাগত জীবন তার। বাপ-দাদা সবাই ছিলেন এই পেশার সাথে জড়িত। স্বভাবত খুবই নিরীহ গোছের লোক। কারো সাথে কথা বলেন মেপে। রাস্তাঘাটে যদি একটা ল্যাম্পোস্টের সাথে ধাক্কা লাগে তাহলে ল্যাম্পোস্টকে বলবে,“আপনার কোথাও লাগেনি তো ল্যাম্পোস্ট? ক্ষমা করবেন।”
এমন একটা লোকের শত্রু কে হতে পারে সেটাই ভাবছে আফতাব উদ্দিন। ঝড় বৃষ্টি দেখে কাজী অফিস বন্ধ করে বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাইরে পা রাখার সাথে সাথে কিছু উঠতি বয়সী ছেলে ছোকরা তাকে পাকরাও করে নিয়ে যাচ্ছে কোথাও। এখন পর্যন্ত জবান খুলতে পারেনি কাজী আফতাব উদ্দিন। উদাস চোখে গাড়ির জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, বৃষ্টির মধ্যে ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়াতেও ঘামছে অবিরত। একটু নড়ে চড়েও সুবিধে করতে পারছে না লোকটা। দু'পাশে তাকে ঠেশে বসে আছে দু'টো গাঁট্টাগোট্টা ছেলে। একজন আবার তার কাঁধ জরিয়ে রেখেছে। দু'জনের হাতেই আগ্নেয়াস্ত্র তাই ডাক-চিৎকার দেওয়ার উপায় নেই। কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বসে দোয়া ইউনুস পরে চলেছে কাজী আফতাব উদ্দিন। হঠাৎ করে তার ডানপাশের ছেলেটি বলে,“কি নানাভাই? কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো?”
_তোমরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো নানু ভাইয়েরা?
কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলে বৃদ্ধ আফতাব উদ্দিন।
ছেলেটা হাসলো তার প্রশ্ন শুনে, কিছুক্ষণ হেসে বললো,“সওয়াবের কাজ করতে নানুভাই। আজ একটি ফরজ কাজ সম্পন্ন করতে হবে আপনাকে।”
_____
নিজেকে ধাতস্থ করে উঠতে পারছে না প্রেরণা, বারবার মাথা ঘুরে পরে যেতে চাইছে। সুগার ফল করেছে তার। ইনায়া ফ্রিজ থেকে একটু মিষ্টি এনে ঠোঁটে ছোয়ানোর চেষ্টা করছে। প্রেরণা পারছে না নিজেকে সামলাতে। প্রিতম বোনকে পানি খাইয়ে দিয়ে জামিদের ডেকে নেয় কল করে। তারপর চলে যায় পুলিশ স্টেশনে।
ওদিকে মিস জেনি তন্নতন্ন করে ছায়ানট এলাকা খুজে ফিরে চলে আসেন অ্যাপার্টমেন্টে। দেয়ালে কপাল ঠেকিয়ে আঘাতের পরে আঘাত করে যাচ্ছে ভদ্রমহিলা,সবটা তার দোষে হয়েছে, কথাগুলো বারবার আওড়িয়ে হাহাকার করে কাঁদছে সে।
কিছুক্ষণ পরে থেকে প্রেরণা চোখের জল মুছলো, তারপর মনকে শক্ত করে উঠে দাঁড়াল। তাকেও থানায় যেতে হবে,এভাবে দুর্বল হয়ে পরলে কোনো লাভ হবে না। শুদ্ধকে ইনায়ার কাছে রেখে সে বেড়িয়ে পরলো। আর এদিকে ইনায়া কল লাগালো মির্জা বাড়িতে।
পুলিশ স্টেশনে যতক্ষনে পৌঁছাল প্রিতম,তার আগে ওর বন্ধুরা পুলিশ স্টেশনে হাজির। থানায় মিসিং ডায়েরী লিখিয়ে কনস্টেবল নিয়ে প্রিতম আর প্রেরণা ছায়ানট একাডেমীর এরিয়ায় প্রত্যেকটা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ চেক করালো। ক্যাব পয়েন্টের ধারের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেলো ঠিক বিকেল পাঁচটা পঁয়তাল্লিশ নাগাদ প্রনমিকে যাত্রী ছাউনীতে রেখে মিস জেনি কোথাও একটা চলে যাওয়ার ঠিক সাত মিনিটের মাথায় একজন লোক ছাতা মাথায় নিয়ে প্রনমির কাছে এলো। ছাতার কারণে লোকটার মুখটা দেখা গেলো না। দুমিনিট সময় নিয়ে লোকটা প্রনমিকে কিছু বললো, তারপর প্রনমি লোকটার পিছু পিছু চলে গেলো উল্টো পথ ধরে।
ফুটেজ দেখে কান্নায় ভেঙে পরে প্রেরণা। প্রিতম বোনকে আগলে ধরে রাখে। পুলিশের লোকগুলো আশেপাশে সবযায়গায় জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য তৎপর হয়।
প্রেরণা ধপ করে বসে পরলো এবার মেঝেতে। বুকটা দুমরে মুচড়ে যাচ্ছে তার। বুকে আগলে বড় করেছে ভাইবোন দুটিকে,প্রেরণার মনে হচ্ছে তার হৃদপিন্ডেই কেউ ছুড়ি বসিয়ে দিয়ে গিয়েছে।
_____
জবুথবু হয়ে মেঝেতে,দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে প্রনমি। অর্ধভেজা শরীর তার,অসহ্য শীত লাগছে, শরীর কাঁপছে শীতে,ঠকঠক করে। চেঁচিয়ে কাঁদছে সে,অথচ কান্নার আওয়াজ দেওয়ালে বারি খেয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বারবার। ভয়ংকর শোনাচ্ছে সে শব্দ, কাঁদতে কাঁদতে যখন একটু ক্লান্ত হলো,অনেকটা আকুতি নিয়ে অনুনয়ের ভঙ্গিতে কেঁদে কেঁদে অদৃশ্য কাউকে বললো,“আপুর কাছে যাবো আমি, ভাইয়ার কাছে যাবো।”
অদৃশ্য কেউ টা কে প্রনমি জানে না। গত একঘন্টায় তার সাথে কি কি হয়েছে তাও জানেনা মেয়েটা। শুধু ঝাপসা মনে পরলো সে যাত্রী ছাউনীতে দাঁড়িয়ে ছিলো,হাত দিয়ে বৃষ্টি ছোঁয়ার চেষ্টা করছিলো, হঠাৎ একটা লোক এলো তার কাছে। তাকে বললো,“এক্সকিউজ মি মিস।”
প্রনমি ভীত হয়ে সংকোচের সহিত জিজ্ঞেস করলো,“কি চাই?”
লোকটা বললো,“আপনার সাথে একজন ভদ্রমহিলা ছিলেন না? তিনি পাব্লিক টয়লেটের সামনে মাথা ঘুরে পরে গিয়েছেন।”
আৎকে উঠেছিলো প্রনমি। লোকটা বললো,“আপনি আমার সাথে আসুন। ওনাকে দুজন মহিলা ধরে রেখেছেন। আসুন।”
প্রনমি দু'বার কিছু ভাবলোও না,একবারও প্রেরণার শিখিয়ে দেওয়া সতর্কবাণী গুলো মনে করলো না,একটু মাথাও খাটালো না। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ছুটে গেলো লোকটার সাথে।
আর তারপর, কেউ তার হাতের কব্জি চেপে ধরলো হঠাৎ। চেঁচিয়ে ওঠার আগেই টের পেলো সে কোন গাড়িতে। তার আওয়াজ গাড়ির বাইরে যাচ্ছে না। ডুকরে কেঁদে ওঠে প্রনমি,তাকে কেউ ধরে ছিলো না জোর করে, শুধু টের পেয়েছিল পাশে কেউ বসে আছে চুপচাপ। ড্রাইভিং সিটে বসা ব্যক্তি তখন কাউকে উদ্দেশ্য করে বলে,“কোথায় যাবো?”
ক্রন্দনরত প্রনমিকে চূড়ান্ত হতবাক করে দিয়ে তার পাশে বসে থাকা লোকটা ঠান্ডা গলায় বলে ওঠে,“নিক্সনের বাড়িতে।”
লোকটার কন্ঠস্বর শুনে প্রনমি কান্না থামিয়ে চেঁ'চি'য়ে ওঠে,“আপনি! আপনি কে? কে আপনি?”
আর কোনও জবাব পায়নি সে । এখন অবধি লোকটি আসেনি প্রনমির সামনে, প্রনমি জানতে পারেনি তাকে এখানে কেন নিয়ে আসা হয়েছে। সে শুধু চোখের পানি খরচ করে যাচ্ছে,যার মূল্য এই লোক গুলো হয়তো দেবে না।
ঘরের ভেতরে থাকা আধুনিক ঘড়িটি রোবটিক আওয়াজ তুলে জানিয়ে দেয় সময়, সন্ধ্যা সাতটা বেজে গিয়েছে। নিশ্চয়ই আপু ভাইয়া খুঁজতে নেমেছে প্রনমিকে। নিশ্চয়ই তড়পাচ্ছে সবাই, যেমন প্রনমি তড়পাচ্ছে।
আতঙ্কে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসছে বারবার। প্রনমি চেঁচিয়ে কেঁদেই যাচ্ছে, তবে আওয়াজ এ ঘরে বাইরে যাচ্ছে কিনা সন্দেহ। ভেজা শরীরটা ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে,সাথে সেই পুরনো আতঙ্ক,মস্তিস্কের কোথাও চিনচিনে ব্যাথা শুরু হচ্ছে,ঘামছে প্রনমি, ভীষণ ঘামছে।
_____
কাজী আফতাব উদ্দিনকে ঠেলে গাড়ি থেকে নামিয়ে কাঁধ জরিয়ে বিশালাকার ডুপ্লেক্স বাড়িটার অন্দরমহলে নিয়ে যাচ্ছে ছেলে দুজন। কাঁপতে কাঁপতে কাজী এগিয়ে যাচ্ছে, মুখে আওড়াচ্ছে দোয়া ইউনুস। শিবিরের লোক মনে করে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন আজকাল মোল্লা শ্রেণীর লোক হত্যা করছে নির্বিচারে। সেও কি এমন কিছুর শিকার হতে চলেছে?
তাকে ছেলে দু'জন ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে একটা রুমের ভেতর প্রবেশ করলো। বৃদ্ধ কাজী ঠকঠক করে কাঁপছে। সে ভেবেছে এক্ষুনি দেখবে কামরায় রামদা আর চাইনিজ চাকু হাতে দাঁড়িয়ে আছে পনেরো ষোলোজন যুবক, টগবগে রক্ত ফুটছে যাদের শিরায়।
আফতাব উদ্দিন ঘামছে,মুখ থেকে স্বর বেরোচ্ছিলো না। পাশের ছেলেদুজন তাকে ঠেলে সে কামরায় ঢুকিয়ে দিতেই সে আতঙ্কে চোখ মুখ খিচে ফেললো। তবে পরক্ষনেই রোবটিক আওয়াজ কর্নপাত হতেই সে চোখ মেললো, চোখ মেলে সামনে তাকিয়ে দেখলো একজন যুবক ছেলে কম্পিউটারে গেমস খেলছে। পরনে একটা থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট এবং একটি হুডি। ওদিকে ফিরে গেমস খেলছে তাই কাজী মুখটা দেখতে পারছে না।
কাজীর পাশ থেকে একটা ছেলে বলে,“দোস্ত নানাভাইকে আনলাম।”
ছেলেটি গেমস খেলতে খেলতে শান্তস্বরে জবাব দিলো,“নিউমার্কেটের টাকেই এনেছিস না?”
_আরে হ্যা। ওনাকেই।
ছেলেটি কম্পিউটার অফ করে ঘুরে তাকালো, কাজী আফতাব উদ্দিন চ'ম'কে উঠলেন রীতিমতো।
ইরফান শান্ত ভঙ্গিতে কাজীর দিকে তাকিয়ে আছে। আফতাব উদ্দিন মিনমিন করে বলে ওঠে,“তুমি!”
ইরফান উঠে দাঁড়ালো। রাফি আর সৌভিককে বললো,“ওনাকে চা নাস্তা দে।”
কাজী বললেন,“কি চাও আমার থেকে। কি?”
ইরফান দুকদম এগিয়ে এসে একটা ডিভানে পায়ের ওপর পা তুলে আরাম করে বসলো, ফিচেল হেসে কাজীকে বললো,“বিয়ে পড়াবেন আমার।”
_বিয়ে?
_হু। বিয়ে।
_____
নিক্সনের বাবা মা দুজনেই আর্কিটেক্ট, আপাতত দু'জনেই মালয়েশিয়া গিয়েছেন। এতো বড় ডুপ্লেক্স বাড়িটাতে নিক্সন একাই রয়েছে।
অধরা,স্নেহা,মমো, সিনথিয়া চারজন বান্ধবী তাদের প্রানপ্রিয় বন্ধু ইরফানের জরুরি তলবে ছুটে এলো নিক্সনের বাড়িতে।
এসে ওরা পরেছে বিপাকে। রীতিমতো পাগলামী আর অন্যায়কে মেনে নিতে পারছিলো না কেউ। তবে বেশি গাইগুই করতে পারেনি, ইরফানের ধ'ম'ক খেয়ে চুপ করে গিয়েছে।
প্রনমিকে যে ঘরটিতে রাখা হয়েছে তার জানালার কাঁচ গলিয়ে উঁকি মারছে বারোজোড়া চোখ। পা থেকে মাথা দেখছে জবুথবু হয়ে বসে থাকা মেয়েটিকে,যে কাঁদছে অবিরত। তবে মেয়েটির কান্না তাদের বিচলিত করছে না, তারা উল্টো মুগ্ধ হচ্ছে। মুগ্ধতার রেশ কাটিয়ে সৌভিক চেঁচিয়ে ইরফানকে বলে,“আল্লাহ,এইটা তো পুতুল। দোস্ত দোস্ত শোন,এই বিয়ে তোর জন্য ফরজ ফরজ ফরজ। ”
ইরফান ভ্রু কুঁচকে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে, সৌভিকের রসিকতায় তার কোন হেলদোল নেই। অধরা চেঁ'চি'য়ে ওঠে,“ইরফান, বাড়াবাড়ির একটা লিমিট আছে। এসব ঠিক হচ্ছে না! ওকে ওর বাড়িতে দিয়ে আয়!”
ইরফান যেন সেকথা শুনলো না, উল্টো অধরাকে বললো,“যা গিয়ে একটু দেখ সবটা। আমি ডাকলে কাজী নিয়ে আসবি।”
ইরফান ওদের বিস্মিত দৃষ্টি উপেক্ষা করে এগিয়ে গেলো ঘরটির কাছে। মেয়েগুলো উদ্বিগ্ন ভীষণ,তবে ছেলেগুলো দাঁত বের করে হাসছে, প্রিতম গ্যাং এবার ভালোই নাকানিচোবানি খাবে এটা ভেবে উত্তেজনায় ভালোমন্দ কোনো ভাবনা আসছিলো না মাথাতে।
রাজন সৌভিককে বললো,“আমাদের কালোমানিক বন্ধু চাঁদ সুন্দরী বিয়ে করতে চলেছে, এ যে সে চাঁদ না, প্রিতমের বাড়ির চাঁদ।”
কথাটা শুনে হেসে কুটিকুটি হচ্ছে বাকিরা। মেয়ে চারজন লটকানো মুখ নিয়ে একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
এদিকে যখন ইরফান গ্যাং প্রিতমকে নাকানিচোবানি খাওয়ানোর পাঁয়তারা করছিলো,অপরদিকে প্রিতম গ্যাংয়ের আঠারো জন শহর তন্নতন্ন করে খুঁজছে প্রনমিকে। কিন্তু কোথাও যে প্রনমির কোন খোঁজ নেই।
কাঁদতে কাঁদতে দেয়ালে মাথা ঠেকালো প্রনমি,অবিরত চেচাচ্ছে,“আমি আপুর কাছে যাবো। আমি ভাইয়ার কাছে যাবো।”
ঠিক তখনই ক্যাচক্যাচ আওয়াজ হয় দরজায়। প্রনমির কান্না থেমে যায়,ভয়ে গুটিয়ে যায় মেয়েটা। দু'হাতে খামচে ধরে কামিজের অংশ। কাঁপা গলায় বলে,“কে?”
ইরফান একদৃষ্টে দেখছে প্রনমির মুখটা, তার দৃষ্টি ঐ নীল চোখ থেকে সরছে না। দরজাটা ভিরিয়ে দিয়ে ধীরপায়ে এগিয়ে যায় প্রনমির কাছে। বুক কাঁপছে প্রনমির, আবারও চেঁচালো,“বলছেন না কেন? কে আপনি?”
ইরফান এগিয়ে গিয়ে ওর মুখোমুখি মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসলো, সে শুধু দেখছে প্রনমির গালের ঐ লাল তিলটা। প্রনমি এবার কেঁদে উঠলো নিজের ওড়না সামলে নিয়ে বললো,“কে আপনি?”
_আমি তোমার বেয়াই ইরফান মির্জা।
শান্ত স্বরে জবাব দেয় ইরফান।
উগ্র লোকটার কন্ঠস্বর কানে যেতেই প্রনমি লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল, পিছিয়ে গেলো তিন পা,প্রকট বারি খেলো দেয়ালের সাথে,পিঠে ব্যাথা পেলো।
ইরফান তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে প্রনমিকে, সে কিছু একটা করতে এসেছিলো এখানে, ভুলে গিয়েছে। কোথাও আচ্ছন্ন হয়ে আছে সে। প্রনমির চিল্লাচিল্লিতে সে সম্বিত ফিরে পেলো।
“আপনি কি চান আমার থেকে? কি চান? আমার ভাইয়া জানতে পারলে খুব খারাপ হবে। আমাকে আপু ভাইয়ার কাছে যেতে দিন।”
ইরফান প্রনমির কথায় মৃদু হাসলো। এমন হাসির শব্দে প্রনমি আরও ভীত হয়ে পরে।
কিছুক্ষণ হেসে ইরফান প্রনমিকে বলে,“দেবো, অবশ্যই তোমার আপু ভাইয়ার কাছে যাবে তুমি। তোমার ভাই এসে তোমাকে নাইওরি নিয়ে যাবে তোমার শশুর বাড়ী থেকে। প্রতিবার কমপক্ষে তিনদিনের জন্য ঘুরে আসবে আপু ভাইয়ার কাছ থেকে।”
_শশুর বাড়ি?
অস্ফুটে আওড়াল হতভম্ব,ভীতসন্ত্রস্ত প্রনমি।
ইরফান শান্ত গলায় বলে,“হু, আজ তোমার বিয়ে হবে। এখান থেকে যাবে শশুর বাড়ী।”
ডুকরে কেঁদে ওঠে প্রনমি, কোনো মতে বলে,“বিয়ে?”
সে কথার জবাব না দিয়ে ইরফান হাক ছাড়লো,ডাকলো সবাইকে। কাজীকে টেনে ধরে নিক্সন আর রাফি নিয়ে এলো ও ঘরে। অধরারাও ঢুকলো, সবার চেহারায় উদ্বিগ্নতার ছাপ স্পষ্ট।
ইরফান কাজীকে বললো,“নিন শুরু করুন। আমি বর,ও কনে।”
কাঁদতে কাঁদতে দুর্বল হয়ে পরছে প্রনমি, ইরফানকে উদ্দেশ্য করে বলছে,“আপনি এমন কেন করছেন আমার সাথে?”
সবাই নিশ্চুপ। কাজী করুণ দৃষ্টিতে প্রনমিকে দেখে কাঁপা গলায় ইরফানকে বলে,“এভাবে জোর করে বিয়ে?”
ইরফান কাজীর দিকে শান্ত চোখে তাকাতেই মিইয়ে যায় কাজী। সে দুকদম এগিয়ে যায়, দাঁতে দাঁত চেপে কাজীকে বলে,“এই কাজী! সেদিন আমার বোনের বিয়ে নিয়ে কত যুক্তি দেখিয়েছিলেন না? আজকেও একটা যুক্তি শুনুন, ও খুব অসহায় দেখতে পাচ্ছেন তো? তাছাড়া বাবা মা নেই ওর, খুবই অসহায়। আমি বিয়ে করে ওর আর ওর গুষ্টির দায়িত্ব নিতে চাই। এটা একটা মানবিক বিয়ে কাজীর বাচ্চা। বিয়ে পড়ান।”
গর্জন করে ওঠে ইরফান, কাজী সহ প্রত্যেকেই শিউরে ওঠে। শুধু প্রনমি হাতরে এসে এলোপাথাড়ি ইরফানের গায়ে কিল ঘুষি মারতে শুরু করে, চেঁচাতে থাকে,“মরে গেলেও বিয়ে করবো না। অসভ্য জানোয়ার একটা, আমাকে ভাইয়ার কাছে নিয়ে চল। চল বলছি।”
ইরফানের সেদিকে কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। কাজীকে আবারও ধ'ম'কে ওঠে,“বিয়ে পড়ান। বরের নাম ইরফান মির্জা,বরের বাবা ইলহাম মির্জা। কনের নাম.....এই ওর নামটা যেন কি?”
নিক্সনের দিকে তাকিয়ে বলে ইরফান।
পাশ থেকে নিক্সন প্রনমির ছোটো বার্বি কাধ ব্যাগটা থেকে তার আইডি কার্ড বের করে বলে,“প্রনমি আহসান। বাবা মরহুম পলক আহসান।”
কাজী হাশফাশ করছে, আল্লাহকে ডাকছে, এর থেকে পরিত্রাণের উপায় চাইছে । এরা সবাই উন্মাদের মতো আচরণ করছে, ছোটো মেয়েটির বুঝি সর্বনাশ হয়ে যাবে।
প্রনমি একের পর এক কিল ঘুষি মারতেই থাকে ইরফানের গাঁয়ে, একসময় ওকে থামাতে ইরফান ওর দু'টো হাত এক হাতে ধরলো খুব শক্ত করে, আচমকা প্রনমি ক্ষীপ্ত ভঙ্গিতে ঝুঁকে ইরফানের হাত কামরে দেয়।
“আহহহ”
বলে আঁতকে ওঠে ইরফান। চোখ বড় বড় করে প্রনমির দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে রাগী গলায় বলে,“কামরাচ্ছো কেনো? কুত্তা নাকি তুমি!”
প্রনমি চেঁচায়,“আমাকে ভাইয়া আপুর কাছে দিয়ে আয়।”
_বিয়ের পর যাবে।
_জীবনেও না,মরে গেলেও বিয়ে করবো না।
চেঁচিয়ে কন্ঠনালী ছিঁড়ে ফেলার উপক্রম প্রনমির।
_তুমি বিয়ে করবে। অবশ্যই করবে।
কথাটা বলে ইরফান বাকি সবার মুখের দিকে তাকায়, খুবই শান্ত স্বরে বলে,“আউট! এখান থেকে সবাই বের হও।”
এক এক করে সবাই বেরোতেই ইরফান ঘরের দরজাটা বেশ শব্দ করে লাগিয়ে দিলো। আঁতকে উঠলো প্রনমি, আবারও কেঁদে ফেলে বললো,“আমি তো আপনার কোনও ক্ষতি করিনি বলুন। আপনি এমন করছেন কেন আমার সাথে? ভাবীর ভাই তো আপনি? আপনি সত্যিই ভাবীর ভাই তো!”
দরজা আটকে ইরফান ধীরপায়ে এগিয়ে যেতে থাকে প্রনমির কাছে। প্রনমি দুহাতে নিজের বাহু আড়াআড়ি করে ধরে আছে, হাঁপাতে হাঁপাতে বলছে,“প্লিজ আমাকে ছাড়ুন।”
ইরফান আরো দুকদম এগোলো। প্রনমি বললো,“প্লিজ।”
শরীরটা ভে'ঙে যাচ্ছে মেয়েটির। হাত পা কাঁপছে বাজে ভাবে। ইরফান আরো দুকদম এগলো,আর শান্ত চোখে প্রনমির কাঁপতে থাকা ঠোঁটের দিকে তাকালো, আবার তাকালো গালের লাল তিলটার দিকে,তাকালো ভেজা ভেজা নীল দু'টো চোখের দিকে। প্রনমি টের পেলো জানোয়ারটা আর তার মধ্যে দূরত্ব আর বেশি নেই, জোরালো আওয়াজ তুলে চেঁচিয়ে উঠলো প্রনমি, ডুকরে কেঁদে দিয়ে বললো,“করবো বিয়ে আমি,করবো! করবো! দূরে যান আপনি, দূরে যান। দূরে যান।”
চলমান.....
[ ২য় অংশ আগামীকাল সকালে পাবেন । ]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৩৫ [ ২য় অংশ ]
#ইসরাত_ইতি
[ ২য় অংশ ]
( ১ম অংশের লিংক কমেন্টে )
খবরটা মির্জা বাড়িতে পৌঁছানোর সাথে সাথে ও বাড়ি থেকে সামিন, ইলহাম,ইহান প্রত্যেকে রওনা দিয়ে দিয়েছে। ইনশিরাহও যাবে তাদের সাথে। নিচতলায় ইশমাম দাঁড়িয়ে ছিলো,তার সমস্ত মুখে ছেয়ে আছে দ্বিধা । সামিন তাড়াহুড়ো করে বলে,“আমরা আসছি!”
ইশমাম কয়েকপলক ভাইকে দেখে বলে,“আমিও যাবো চলো।”
ওরা সবাই অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পরলো, ইহান বলে ওঠে,“আর ইউ শিয়র ছোট বাবা?”
_হু,চল।
মেয়েটি অন্ধ, ইশমামের রাগ থাকলে প্রনমির ভাইয়ের ওপর রয়েছে, মেয়েটির ওপরে তো নয়, এভাবে এতো বড় দূর্ঘটনায় জেদ দেখানোটা নেহায়েত বর্বরতা। ইশমাম খবরটা শুনতে পেয়েই যাওয়ার মনস্থির করেছিলো,অথচ কেউ তাকে একটি বার বলেওনি। শেষমেশ সে নিজে থেকেই বললো।
খানিক বাদে আলোও ত্রস্ত পায়ে সিঁড়ি ভেঙে নামতে নামতে চেঁচালো,“আমিও যেতে চাচ্ছি।”
বাড়িতে থেকে গেলো তিনজন, পরী,রিতু আর শেহা। শেহা যায়নি পরীর জন্যে। ছোটো মামীর শরীরটা খুব বেশি ভালো নেই তাই।
ওরা শুরুতে থানায় যাওয়ার মনস্থির করেছিলো তবে পথিমধ্যে খবর পেলো প্রেরণা-প্রিতম তাদের বাড়িতে। হঠাৎ করে প্রেরণা অসুস্থ হয়ে পরায় বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাকে।
অত্যধিক দুর্বলতার কারণে স্যালাইন চলছে প্রেরণার শরীরে। ডক্টর এসে বাড়িতে দেখে গিয়েছে তাকে। চোখ মুখ খিচে বিছানায় পরে আছে প্রেরণা,চোখের জল গালে লেপ্টে গিয়ে শুকিয়ে গিয়েছে।
তার মাথার কাছে শুদ্ধকে কোলে নিয়ে বসে আছে ইনায়া। আলো আর ইনশিরাহও রয়েছে সেখানে। ইনায়া প্রেরণার মাথায় হাত বুলিয়ে কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বলে ওঠে,“আপু। একটু পানি খাবে?”
প্রেরণা কোনো জবাব দেয়না। শুধু ঘনঘন নিশ্বাস ছাড়ছে দুচোখ বন্ধ করে।
ইনায়া আলোর দিকে তাকালো, কেঁদে দিয়ে বললো,“জানো বড় মা, ও কত নিস্পাপ একটা মেয়ে, জানিনা কোন জানোয়ারের ....”
ইনশিরাহ চোখ লাল করে ইনায়াকে ইশারায় ধমকালো। ইনায়া চুপ হয়ে যায়,মুখ চেপে ধরে কাঁদতে থাকে।
আলো নরম গলায় প্রেরণাকে বলল,“মা তুমি কিছু মুখে দাও! অনেক দুর্বল তুমি। প্লিজ দাও।”
প্রেরণা আচমকা চোখ মেলে উঠে বসে, ওদের সবাইকে হতবাক করে দিয়ে হাত থেকে সুই খুলে ফেলে দৌড়ে যায় ড্রয়িং রুমে। মির্জা বাড়ির পুরুষেরা প্রিতমকে নিয়ে থানায় গিয়েছিলো আবারও, ওরা সবে মাত্র ফিরলো। তখন রাত নয়টা। প্রেরণা গিয়ে ভাইকে ধরলো,বাহু ধরে ঝাকুনি দিয়ে রুগ্ন কন্ঠে চেঁচালো,“প্রনমি কোথায়? ওর খোঁজ পায়নি কেউ?”
ইহান নিচুস্বরে প্রেরণাকে বললো,“আপনি শান্ত হোন প্রেরণা, তিন থানায় ইনফর্ম করা হয়েছে,উই উইল গেট প্রনমি ব্যাক।”
প্রেরণা শান্ত হতে পারছে না। গলাকাটা মুরগীর মতো তড়পাচ্ছে ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে। প্রিতম উদ্ভ্রান্তের ন্যায় আশেপাশে তাকিয়ে ইনায়াকে বললো,“নিয়ে যাও আপুকে ঘরে। শুইয়ে দাও জোর করে।”
_____
একটা কক্ষে-ই আঠারো জন মানুষ । কাজী আফতাব উদ্দিন কক্ষের এক কোণে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। এক এক করে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে ইরফানকে বলে,“এখন কি করবো?”
_চুপচাপ বিয়ের মিষ্টি খান।
কাজীকে ধ'ম'কে ওঠে ইরফান। বৃদ্ধ কাজী কেঁপে উঠে টপাটপ দু'টো মিষ্টি মুখে পুরে নেয়, বেচারা ভয়ে ঐ গুন্ডা ছেলেটাকে বলতেও পারলেন না তার ডায়াবেটিস আছে, মিষ্টি খাওয়া বারণ।
ইরফান একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে কক্ষের এক কোণে,মেঝেতে পরে থাকা প্রনমির দিকে,যে পরে আছে একটা মরা মাছের মত। নির্লিপ্ত হয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে মেয়েটা,শরীরে ভেজা পোশাক, শিফন জর্জেটের ওড়নাটা মাথায় তুলে দেয়া। পাঁচ মিনিট আগে দশ লক্ষ টাকা মোহরানা ধার্য করে ইরফান মির্জা আর তার বিয়ে হয়েছে। হ্যা তিন কবুল যেহেতু বলেছে সজ্ঞানে,এটা হয়তো বিয়েই ছিলো, প্রনমি মনে মনে ভাবছে।
ইরফান প্রনমির থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিক্সনের দিকে তাকিয়ে বলে,“এই কাজীকে ওনার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আয়। যা। আর কাজী, এরপর থেকে মির্জা বাড়িতে যত বিয়ে হবে সব আপনি পরাবেন কাজীর বাচ্চা। এখন ফুটুন।”
কাজী একবার করুণ দৃষ্টিতে দেখলো প্রনমিকে, তবে তার কি করার আছে?
এরমাঝে মিষ্টি খাওয়ায় শরীরটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলে সে অনুনয় করে ইরফানের কাছে। নিক্সন আর রাফি কাজীর কাঁধ চে'পে ধরে মিষ্টি হেসে বলে,“চলুন নানা ভাই । বাড়িতে দিয়ে আসি আপনাকে।”
ওরা কাজীকে নিয়ে চলে গেলে অধরা ইরফানের দিকে তাকায়, হুডি আর থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরে নতুন বর পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে সোফায়। অধরা চূড়ান্ত বিরক্ত হয়ে বললো,“প্রিতমকে আমরা কেউ পছন্দ করি না, বাট ওর বোনকে এসবের থেকে দূরে রাখতে পারতি।”
ইরফান ফিচেল হেসে একটা সিগারেট ধরিয়ে এক টান দিয়ে বলে,“ও আমার বোনকে দূরে রেখেছে?”
_ওরা রিলেশন করেছে ইরফান।
চেঁচিয়ে উঠলো স্নেহা।
সৌভিক স্নেহার ওপর চেঁচালো,“এই এই! তোদের জ্ঞান বিতরণ হয়েছে? যা গিয়ে ভাবীকে নতুন সালোয়ার স্যুট পরিয়ে দে। যা না মা!”
ওরা চার বান্ধবীই এখান থেকে ছুটে পালিয়ে যেতে পারলে বাঁচে। তবুও শান্ত থেকে এসে প্রনমির হাত টেনে ধরলো। প্রনমি যেন এই দুনিয়ায় ছিলো না, ওরা ধরতেই কেঁপে উঠলো এক প্রকার। অধরা নরম গলায় বললো,“শান্ত হও। ওঠো,এসো আমাদের সাথে।”
প্রনমির গায়ের ভেজা জামাটা পাল্টে দিলো ওরা,প্রনমি চুপচাপ কাঠের পুতুল হয়ে বসেছিলো। ও আসলে বুঝতেও পারছে না ওর সাথে কি হচ্ছে। একটা টাইমলুপে আটকে গিয়েছে যেন। মস্তিস্কে পুরনো সেই ব্যাথাটা চিনচিন করে ওঠে, কানের কাছে বাজছে ছোট্ট প্রনমির খিলখিল হাসি, তারপর সে হাসি মিলিয়ে গিয়ে শুনলো একটা আর্তচিৎকার,“আমি আপুর কাছে যাবো, আমি ভাইয়ার কাছে যাবো। দরজাটা খুলে দিন আঙ্কেল।”
ইরফানকে ঘিরে ওর সব বন্ধুরা দাঁড়াল। রাজন বললো,“এখন কি করবি?”
ইরফান পকেট থেকে এক টানে ফোনটা বের করে ঠান্ডা গলায় বলল,“সম্বন্ধী আর জ্যেষ্ঠ শালীর দোয়া নিয়ে বাসর করবো।”
____
ভাইকে জরিয়ে ধরে গগন কাঁপানো চিৎকার দিয়ে কাঁদছে প্রেরণা।
তার দিকে করুণ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে সবাই। মির্জা বাড়ির লোকগুলো দাঁড়িয়ে আছে। কিভাবে এদের সান্ত্বনা দেবে তারা বুঝতে পারছে না। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমনিতেই ভালো নেই। এখানে সেখানে দূর্ঘটনা ঘটেই চলেছে মেয়েদের সাথে। একটু যেন নরম হলো ইশমামও, মেয়ে জামাইয়ের ওপর রাগ একফোঁটাও কমেনি তবুও গম্ভীর হয়ে প্রিতমকে বললো,“ডাক্তার ডাকো, তোমার বোন বেশীই অসুস্থ।”
আলো আক্ষেপ নিয়ে বললো,“একটু যদি খাইয়ে দিতে পারতাম মেয়েটাকে,কিছু খাচ্ছেও না।”
ইনশিরাহ ছুটে গেলো সামিনের কাছে, উদ্বিগ্নতার সহিত বললো,“পাপা মুঈন ফরাজী কিছু জানিয়েছে তোমাকে? কোনো আপডেট?”
সামিন বিরস মুখে মাথা নেড়ে বলে,“খুজছে।”
ঠিক তখনই ইহানের ফোনে একটা কল আসে। কিছু ছেলে পেলেও লাগিয়েছে সে । ইহান কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ছেলেটা বললো,“ভাই আন্দাজী খবর।”
_যা-ই হোক বল।
_ওখানে আপনার ভাইয়ের বন্ধুর গাড়ি ছিল পাঁচ মিনিটের জন্য। টেসলার নতুন মডেল টা।
ইহানের ভ্রু কুঞ্চিত হলো, ছেলেটিকে কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই প্রিতমের ফোন বেজে উঠল।
প্রিতম বোনের মাথাটা বুকের সাথে চেপে ধরে রেখেই এক হাতে ফোনটা বের করলো । আননোন নাম্বার, রীতিমতো হাত কাঁপছে প্রিতমের। ইহান নম্রস্বরে বললো,“রিসিভ করো প্রিতম।”
প্রিতম একটা ঢোক গিলে কলটা রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ইরফান শান্ত স্বরে বললো,“আসসালামু আলাইকুম প্রিতম ভাইয়া।”
প্রিতম থমকালো। শ্বাস আটকে এলো তার, অস্ফুটে বললো,“তুই!”
ইরফান মৃদু হেসে বললো,“জি প্রিতম ভাইয়া আমি আপনার ভগ্নিপতি ইরফান মির্জা বলছি, ঘড়ি ধরা উনিশ মিনিট আগে আপনার ছোটো বোনকে দশ লাখ টাকা মোহরানা ধার্য করে বিয়ে করেছি ভাইয়া। আমি আপনার এবং আমার শ্রদ্ধেয়া জ্ঞানী আপা প্রেরণা আহসানের দোয়া চাইছি।”
প্রিতম আঁতকে উঠলো,তার মনে হলো গোটা পৃথিবী দুলে উঠলো তার। ওকে কৌতুহলী দৃষ্টিতে দেখছিলো সবাই। প্রিতম কাঁপা গলায় চেঁচিয়ে উঠলো,“মানে!”
প্রেরণা কান্না থামিয়ে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকায়।
ওপাশ থেকে ইরফান শান্ত ভঙ্গিতে বলে,“মানে তোর বোন, আমার বৌ হয়েছে। বিয়ে করেছি আমি। টেনশন করিস না অযথা, আমি আমার বৌয়ের খুব যত্ন করবো, তুই আর তোর ঐ অসহ্যকর জ্ঞানী আপা মাথায় ঠান্ডা তেল লাগিয়ে ঘুমা ।”
_এটা কি বলছিস তুই !
কাঁপছে প্রিতমের গলা। ইরফান বলে,“ঘ্যানা নাকি! শুনতে পাচ্ছিস না বিয়ে করেছি!”
_ইরফান। ইরফান,ভাই শোন, তুই, তুই আমার বোনের সাথে উল্টোপাল্টা কিচ্ছু করবি না।
প্রিতমের এহেন কথায় ওখানে উপস্থিত মির্জা বাড়ির প্রত্যেকে হতভম্ব হয়ে তাকায়। প্রেরণা শ্বাস বন্ধ করে দাড়িয়ে আছে। ইহান গিয়ে প্রিতমের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে লাউড স্পিকার অন করে দিতেই ওপাশ থেকে ইরফান বলে ওঠে,“তুই আমার বোনকে নিশ্চয়ই ছাড়িস নি!”
কাঁপছে প্রিতম, অসহায়ের মতো চেঁ'চি'য়ে বলে,“তোর বোনকে আমি ভালোবেসেছি ইরফান।”
ইনায়া মুখে হাত চেপে কাঁদছে মেজো দাদানের কথা শুনে। ইরফান হাসলো প্রিতমের কথাটা শুনে, বললো,“সে আমিও তোর বোনকে বাসবো, চিন্তা করিস না।”
শক্ত পোক্ত প্রিতম এবার ঝরঝর করে কেঁদে দিয়ে বললো,“আমার বোনটা অসুস্থ ইরফান,দয়া কর।”
প্রেরণা হাত মুঠি করে ঠায় দাঁড়িয়ে, তার নির্লিপ্ত দৃষ্টি প্রিতমের ফোনের দিকে, চোখের পাতাও ফেলছে না সে।
সামিন আলো বোকার মতো একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। ইহান চেঁচিয়ে উঠলো মাঝখান থেকে,“এই ইরফান প্রনমিকে নিয়ে এক্ষুনি এখানে আয়, এক্ষুনি। এক্ষুনি । অসভ্য জানোয়ার একটা।”
অমন সিংহের গর্জনও ভ্রুক্ষেপ ঘটাতে পারেনি ইরফানের, সে বললো,“আজ রাত টা যাক। কাল সকালে বাড়িতে বৌ নিয়ে আসছি দাদান। স্যরি বিয়েটা তোমার আগে করলাম।”
কল কে'টে ইরফান ফোনটা সুইচ অফ করে দেয়। প্রিতম পাগলের মতো নাম্বারটাতে কল দিতে থাকলো বারংবার। মিস জেনি কপাল চাপড়ে কেঁদে যাচ্ছে। শুধু কাঁদছে না প্রেরণা, সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখছে মির্জা বাড়ির প্রত্যেকটা সদস্যকে। ইহান একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,“হেই প্রেরণা, যাস্ট কাম ডাউন, প্রনমিকে আপনার কাছে ফিরিয়ে দেবো আমরা।”
প্রেরণা ওসব কিছু শুনছে না,শুধু দেখতে থাকে সবাইকে।
ইলহাম মির্জা ধপ করে চেয়ারে বসে পরলো। সামিন আর আলো চোখ মুখ কঠিন করে দাঁড়িয়ে আছে। ইনশিরাহ ছুটে গেলো ইলহামের কাছে, চেঁচিয়ে বললো,“মেজো বাবা কি হয়েছে তোমার?”
ইলহাম দু'চোখ তুলে বড় ভাইয়ের দিকে তাকায়, কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,“ভাইয়া এই ছেলেকে নিয়ে তুমি উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিও। আমার কোনো আক্ষেপ থাকবে না।”
এতক্ষণে প্রেরণা মুখ খুললো, ইলহামের দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে বললো,“বাড়িতে যান আঙ্কেল। আপনারা সবাই বাড়িতে যান। কাল দেখা হচ্ছে।”
_____
পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে ইরফান। হাতের সিগারেটটা শেষ। ফোনটাকে সুইচ অফ করেও শান্ত থাকেনি, সিমকার্ড গুলো খুলে ফেলেছে সে।
অধরা,স্নেহা এসে ওর সামনে দাঁড়ায়। রাগী গলায় বলে,“আমরা চলি। তোর বৌ ও ঘরে। পোশাক বদলে দিয়েছি। মেয়েটার গা গরম,ভেজা কাপড়ে থাকায় জ্বর আসতে চলেছে সম্ভবত। একটু কনসিডার করিস আজকের রাতটা।”
কথাগুলো অধরা তীব্র ঘৃণা থেকে বলছে ইরফানের প্রতি। ইরফান বুঝতে পারলেও কিছু বললো না অধরাকে। বললো,“তোরা যাবি এখন?”
_তো আর কি করবো? বাসরের খাট সাজাবো তোর? দে তবে ফুল এনে দে। সাজিয়ে দিয়ে যাই।
রাজন বলে ওঠে,“আমি কিনে আনছি। একটু ওয়েট।”
ওদের গ্যাং-এ মমো আর রাজন দুই জমজ ভাইবোন। মমো রাজনকে বলে ওঠে,“এতো উৎফুল্ল? যদি আমার সাথে এমন কিছু হতো তখন?”
ছেলেগুলো মেয়ে চারটাকে পাত্তা দিলো না। ইরফান রাজনকে বললো ওদের চারজনকে বাড়িতে দিয়ে আসতে। বাকিদেরও বাড়িতে চলে যেতে বললো।
গোটা বাড়িতে থেকে গেলো ইরফান-প্রনমি,নিক্সন।
মেইন দরজা লক করে নিক্সন ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলে,“ভাবী খুব সুইট। ধ'মকা ধ'মকি করে রাতটা নষ্ট করিস না। একটু বুঝিয়ে বললেই নরম হয়ে যাবে।”
ইরফান চুপচাপ শুনছে নিক্সনের কথা। নিক্সন বলে,“কিছু লাগলে একটা কল করে দিবি।”
কথাটা বলেই চোখ টিপি দিয়ে নিক্সন শিষ বাজাতে বাজাতে নিজের ঘরে চলে গেলো।
ইরফান কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো একই স্থানে, তারপর ধীরপায়ে হেটে দোতলায় উঠলো।
ঘরের দরজা ভেজিয়ে রাখা ছিলো। মৃদু ধাক্কা দিয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকেই ইরফান ঘরের চারপাশে ভালো করে দেখে নিলো। তার দৃষ্টি দিয়ে আটকালো টুকটুকে লাল সালোয়ার কামিজ পরিহিত কক্ষের এক কোণে মেঝেতে বসে থাকা প্রনমির দিকে। হাঁটুতে মাথা রেখে চুপচাপ বসে আছে।
ইরফান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো প্রনমির দিকে, ভীষণ মানিয়েছে মেয়েটির গায়ে এই রঙটা। সৌভিকের ভাষায় পুতুলের মতো লাগছে। ইরফানের মনে পরলো এমন একটা টুকটুকে লাল পোশাক পরা পুতুল ইনুর ছিলো, যেটা ইরফান দুষ্টুমি করে মাঝখান থেকে কে'টে ফেলেছিল।
কারো অস্তিত্ব টের পেয়ে প্রনমি মাথা তুললো। অভিব্যক্তিহীন একটা মুখ, ঠিকরে পরছে জ্যোতি সে মুখটা থেকে।
ইরফানের কদম ওখানেই থেমে গেলো। প্রনমিকে আরো কিছুক্ষণ দেখে ইরফান বললো,“বিছানায় গিয়ে ঘুমাও। কাল সকাল সকাল বেরোবো।”
ইরফানের গলার আওয়াজ পেয়ে আবারও কেঁদে ওঠে প্রনমি, চেঁচিয়ে ওঠে,“আমাকে এখন যেতে দিন আপুর কাছে। দয়া করুন। যেতে দিন।”
_বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরো।
_যেতে দিন আপুর কাছে।
ইরফান একটা লম্বা শ্বাস ফেলে এগিয়ে গেল প্রনমির কাছে, গিয়েই হাতের কব্জি চে'পে ধরলো সে, বিছানা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়াই উদ্দেশ্য তার,প্রনমি একা যেতে পারবে না যেহেতু।
ইরফান হাত ধরায় দুনিয়া কেঁপে উঠলো প্রনমির, আন্দাজে একদলা থুতু ছুড়ে দিলো সে। ইরফানের গায়ে গলার কাছে পরলো সেটা। ইরফান শুধু শান্ত চোখে দেখছে প্রনমিকে। প্রনমি দাঁতে দাঁত চেপে বলে,“জানোয়ার।”
ইরফান কোনো রাগ দেখালো না। একহাতে প্রনমির ডান হাতটা চেপে ধরেই আরেক হাতে পকেট থেকে টিস্যু পেপার বের করে থুতু মুছে ফেলে প্রনমিকে বললো,“এটাই প্রথম,এটাই লাস্ট। এরপর এমন কিছু ইরফান মির্জা বরদাস্ত করবে না।”
প্রনমি নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টায় ব্যর্থ হলো, আবারও কান্নায় ভেঙে পরলো সে। ইরফান ততক্ষণে তাকে টানতে টানতে বিছানার কাছে নিয়ে যাচ্ছে, প্রনমি হঠাৎ ইরফানকে ধাক্কা দিয়ে উল্টো ঘুরে ছুট লাগায়, হাত দিয়ে হাতরে কিছুর নাগাল পাওয়ার চেষ্টায় সে, যেটা দিয়ে ঐ জানোয়ারটাকে আঘাত করা যাবে।
কিন্তু সে কিছুই পেলো না, উল্টো পায়ের সাথে কিছু একটা লেগে মুখ থুবড়ে পরলো একটা টেবিলের ওপর।
ইরফান নিজের যায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে দেখছে প্রনমির কান্ড। প্রনমি হাত দিয়ে বস্তুটাকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে দেখলো একটা চারপায়ী টেবিল। সে কাঁদতে কাঁদতে দ্রুত টেবিলের নিচে ঢুকে গেলো।
ইরফান কিছুক্ষণ এসব দেখে এগিয়ে যায় প্রনমির কাছে। ঝুঁকে বসলো সে, এক হাত দিয়ে টেনে বের করলো প্রনমিকে, অমন পুরুষালি শক্তিকে প্রতিহত করার সামর্থ্য প্রনমির নেই, সে শুধু কাঁদতে কাঁদতে অনুনয় করতে লাগলো,“প্লিজ না। প্লিজ না।”
ইরফান টেনে হিচরে বের করলো মেয়েটাকে। কোনো কথা না বলে আবারও বিছানার কাছে নিয়ে গিয়ে ইরফান বললো,“এটা বিছানা। স্লিপ নাউ! স্টপ অল দিইইজ।”
ধমকাচ্ছে ইরফান। প্রনমির গা গুলোচ্ছে অমন লোকের হাতের মুঠোয় নিজের হাত সে কারনে। আবারও প্রনমি হুট করে ঘৃণায় ইরফানের গায়ে থুতু ছুঁড়ল।
ইরফান এবার খানিকটা রেগে গেলো, জিদ চেপে গেল মাথায়, একপ্রকার ধাক্কা মেরে প্রনমিকে বিছানায় বসিয়ে দেয়।
প্রনমি ডুকরে কেঁদে ওঠে। ইরফান বলে,“বেশি বেশি করবে না। আমার রাগটাকে আমিই প্রচুর ভয় পাই। চুপচাপ ঘুমিয়ে পরো।”
প্রনমি কেঁদেই চলেছে, ইরফান গিয়ে বিছানার একপাশে শুয়ে পরে, তারপর প্রনমিকে বলে,“গত তিন রাত ধরে ঘুমাইনি। আমি ঘুমাতে চাচ্ছি। স্টপ ক্রাইং।”
প্রনমির কান্নার আওয়াজ জোরালো হয়। গোটা রুমে সে আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। মিনিট বিশেক ওভাবেই চলতে থাকে। ইরফান কিছুক্ষণ বিরক্ত হয়ে উল্টিপাল্টি খায় বিছানায়। তারপর দুটো বালিশ চেপে ধরে কানের দুপাশে। তবুও কান্নার শব্দ উপেক্ষা করতে পারছে না সে।
আরো দশমিনিট পরে সে উঠে বসলো, প্রনমির দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,“একটু চুপ করো না রে! একটু ঘুমাতে দাও। এতো কাঁদার এনার্জি তোমার? প্লিজ চুপ করো, আমি ঘুমাতে চাই।”
থামছে না প্রনমি। ইরফান এগিয়ে এলো ওর কাছে। ধ'ম'কে বললো,“ থামবে না তো?”
ইরফানের কথার ইঙ্গিতে কান্না থামিয়ে গুটিয়ে যায় প্রনমি। ওড়না টেনে নিজেকে ঢাকতে ব্যস্ত মেয়েটা। হঠাৎ করে আবারও শরীরটা ঝাকুনি দিয়ে উঠলো তার।
ইরফান ওকে দেখলো, তার দৃষ্টি চলে গেল আবারও প্রনমির গালের লাল তিলটার কাছে। এতো কাছ থেকে ইরফান কোনো মেয়েকে দেখেনি, চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য প্রনমির, নিখুঁত একেবারে, গ্রিক মিথলজিতে বর্ণিত দেবীর মতো।
মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠলো হঠাৎ। একটা ঢোক গিললো ইরফান, অস্বস্তি হচ্ছে খুব। সে দ্রুত গিয়ে আবারও নিজের যায়গায় শুয়ে পরলো।
প্রনমি কিন্তু কান্না থামায় নি। কিছুক্ষণ পর ইরফান আবারও উঠে বসলো, এবার ইরফান-ই অনুনয়ের ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে ওঠে,“ওরে একটু ঘুমাতে দে না রে।”
প্রনমি হঠাৎ কান্নার মাঝেই বললো,“জানোয়ার।”
ইরফান ভ্রু কুঁচকে প্রনমির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। এতোসব টলারেট করার ছেলে ইরফান নয়। সে আবারও এগিয়ে আসলো প্রনমির কাছে। প্রনমিকে বললো,“আরেকবার জানোয়ার বললে....”
_জানোয়ার।
_চুপ।
_জানোয়ার।
_চুপ।
_জানোয়ার।
ইরফানের জিদ উঠে গেল হঠাৎ। একটা পৈশাচিক হাঁসি দিয়ে প্রনমিকে ভয় দেখাতে তার ডান হাতের তর্জনী প্রনমির গালের লাল তিলে ঠেকায়।
প্রনমি শিউরে উঠলো। ইরফান ঠান্ডা গলায় বললো,“জানোয়ার কেনো বলছো?”
_জানোয়ারের মতো করছেন তাই।
হাঁপাতে হাঁপাতে বলে প্রনমি। ইরফান প্রনমির তিলটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে নিচুস্বরে বলে,“জানোয়ার কখনো তোমায় এভাবে আদর করেছে?”
ডুকরে কেঁদে ওঠে প্রনমি। ইরফানের হাতটা নিজের গাল থেকে সরিয়ে দেয়,তবে ইরফান নাছোড়বান্দা, সে তিলটাকে ভালো করে দেখবে, ধ'ম'কে প্রনমিকে বললো,“দেখতে দাও।”
আবারও গালে ঐ জানোয়ারটা আঙুল ছোয়ালো, খুব কাছ থেকে প্রনমি গন্ধ পেলো একটা পুরুষের, একটা বর্বরের গন্ধ। মাথার ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা হতে থাকলো প্রনমির। আবারও বাচ্চা প্রনমির খিলখিল হাসির আওয়াজ শুনতে পেলো সে। সেই সাথে দেখতে পেলো কেউ বাচ্চা প্রনমিকে কোলে বসালো, লোকটা প্রনমির ফ্রকের ভেতর হাত ঢুকিয়ে তলপেটের নিচে হাত দিয়ে চাপ দিচ্ছে, প্রনমি ছাড়া পেতে তড়পাচ্ছে, পরপর সেই শক্ত হাত প্রনমির বুকে চলে যায় । ভীষণ ভাবে ব্যাথা দিলো ছোটো প্রনমির বুকে। প্রনমি কেঁদে দিয়ে বললো,“আমি আপুর কাছে যাবো।”
লোকটা প্রনমির ফ্রকের চেইন খুলতে খুলতে বলে,“আহা বাচ্চা, আমিতো তোমার পাপার মতোই। আদর করতেছি তো।”
চোখ ছাপিয়ে নিশ্চুপ জল আসলো প্রনমির। ইরফান তা দেখে তৎক্ষণাৎ আঙুল টা সরিয়ে নিলো । একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে সে,ক্ষণিকের জন্য এই জ্ঞান এলো তার মাথায়। হুট করে একটা হাত প্রনমির কপালে রাখলো, জ্বর দেখতে।
প্রনমি উদ্ভ্রান্তের ন্যায় বসে এই দুনিয়া ভুলে, তার কানের কাছে বাজছে সিড়ি থেকে ধুপধাপ শব্দ করে গড়িয়ে পরার শব্দ আর চেঁচানোর শব্দ,“ভাইয়া,আপুউ।”
মস্তিস্কে চিনচিনে ব্যাথাটা প্রকট হলো, পুরো পৃথিবী দুলছে প্রনমির। ইরফানের হাত তার কপালে। কত কত ভাবনা আসছে প্রনমির। এই হাতটা কি এখন প্রনমির বুকে চলে যাবে? তারপর আরও নিচে, আরো নিচে, ব্যাথা দেবে প্রনমিকে?
কাঁপছে প্রনমি। ইরফান দেখলো মেয়েটির খিঁচুনির মতো হচ্ছে, সে একটা ঢোক গিলে বললো,“এই! এই! কি হচ্ছে?”
প্রনমি সেসব শুনলো না,হুট করে অচেতন হয়ে লুটিয়ে পরে যেতে চাইলো বিছানা থেকে মেঝেতে। শক্ত হাতে প্রনমিকে ধরে ফেললো ইরফান।
এমন ঘটনায় হঠাৎ বোকা বনে গেলো সে। প্রনমির দু'গালে মৃদু চাপড় মেরে ইরফান বলছে,“এই মেয়ে! এই এই! আমি কিছু করিনি তো! এই মেয়ে, আমি শুধু তিলটা দেখছিলাম ওটা আসল না নকল ট্রাস্ট মি! আমি কিছু করিনি। ওপেন ইয়র আইজ। এই মেয়ে! কি নাম যেন তোমার,প্র- প্রনতি..... প্রমিলা....হোয়্যাটেভার! এই মেয়ে! ও হ্যা,মনে পড়েছে, এই প্রনমি! আমি কিছু করিনি। চোখ মেলো ! প্রনমি! প্রনমি।”
চলমান.....