#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৩৬
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
প্রনমির মাথা ঠেকেছে ইরফানের বুকের কাছটাতে। একহাতে ওকে শক্ত করে ধরে কিছুক্ষণ দু'গালে চাপড় মে'রে ওর নাম ধরে ডাকলো ইরফান। প্রনমি কোনো সারা শব্দ করেনা।
ইরফান আবারও শুধু চেয়ে রইল মেয়েটার মুখের দিকে, চোখের পানি গালে লেপ্টে আছে, অনেকটা কিশোরী মেয়েদের মতো মুখটা, এতোটা বড় লাগে না। আচমকা পরিস্থিতি অনুধাবন করে ইরফান নড়েচড়ে বসে, ইরফানের এতোটা নিকটে কোনো মেয়ে আসেনি, মেয়েলি মিষ্টি ঘ্রাণ পাচ্ছে ইরফান, এই অনুভূতি অজানা,এই অনুভূতি প্রথম। অদ্ভুত লাগছে ইরফানের। কিছুক্ষণ ওভাবে স্থির হয়ে বসে থেকে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ইরফান প্রনমিকে তুলে নেয় পাঁজাকোলা করে, তারপর ধীরে ধীরে বিছানার একপাশে একটা বালিশে শুইয়ে দেয়।
বুকের কাছ থেকে লাল ওড়নাটা সরে গিয়েছে প্রনমির। ওদের তিন ভাইবোনের-ই দুধে আলতার মতো গাঁয়ের রং। একেবারে নিরেট, উজ্জ্বল ত্বক। ইরফানদের মধ্যে ইরফান আর ইনশিরাহ শ্যামলা বর্ণের, ইহান,ইনায়া,শেহা ফর্সা তবে এই আহসান পরিবারের সদস্যদের ধারে কাছেও নেই কেউ। চোখ ধাঁধিয়ে যায় এদের উজ্জ্বলতা দেখলে। আর এই তিন ভাইবোনের মধ্যে সবথেকে বেশি নজরকাড়া এই মেয়েটির রং সম্ভবত। অপার্থিব কোনো নারী মনে হয়,মনে হয় পৃথিবীর কেউ না।
ইরফান আরও কিছু মুহূর্ত অচেতন প্রনমির মুখের দিকে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত কাজ করে বসলো। নিজের শ্যামলা রঙা হাত টা প্রনমির গালের ঠিক পাশে রেখে দু'জনের গাঁয়ের রঙের বিস্তর পার্থক্য মাপছে সে। ইরফানের হাতটা প্রনমির ধবধবে সাদা নরম তুলতুলে গালের পাশে কুচকুচে কালো লাগছে।
এসব সে করছে ঘোরের মাঝে। তার সমস্ত হুস জ্ঞান খুইয়ে বসে আছে সে। কিছুক্ষণ নিজের হাত দেখে আবারও প্রনমির গালের ঐ লাল তিলটা ছুঁলো, এই তিলটা এখানে না থাকলে এই মেয়ের অর্ধেক সৌন্দর্য থাকতো না সম্ভবত।
হঠাৎ করেই ইরফানের ঘোর কাটে। নড়েচড়ে বসে হালকা কেশে ওঠে সে। প্রনমির বুকের ওড়না সরে যাওয়ায় নারী কায়ার গোপন,নিগূঢ় সৌন্দর্য চক্ষুগোচর হচ্ছে ইরফানের,সে চোখ সরিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
তারপর হেঁটে রুমের এক কোণে চলে যায়, ফোন বের করে নিক্সনকে কল করে সে। কলটা রিসিভ করে ঘুম ঘুম কন্ঠে নিক্সন বলে,“কি লাগবে?”
_জ্ঞান হারিয়েছে।
নিক্সন উঠে বসলো,ঘুম গেলো চোখ থেকে উড়ে, হতভম্ব গলায় বললো,“শাআলা ইতর কোথাকার! ইতরামি টা আর দুদিন পর করলে হতো না? একদিনে এতো চাপ নিতে গেলি কেন বাপ?”
ইরফানের মেজাজ বিগড়ালো,নিক্সনকে অতি ভয়ংকর একটা গালি দিয়ে বললো,“প্যানিক অ্যাটাক আছে না? ন্যাকা মেয়েদের বেশি হয় এটা। সেটা হয়েছে সম্ভবত। হুদাই ভাই। কত ভদ্র ভাবে বললাম ঘুমাতে, সে তা না করে দৌড়া দৌড়ি লাফালাফি, টেবিলের নিচে ঢুকে আমার সাথে লুকোচুরি খেলে। তারপর পর পর কয়েকটা ধ'ম'ক দিয়েছি আর অমনি মাথার তার কে'টে পরে গিয়েছে। কি করবো এখন? ডাক্তার ডাকবো? সে এক বিরাট ঝামেলার ব্যাপার হবে। দেখা গেলো ডাক্তার অতিরিক্ত প্রশ্ন করে বসায় তোর বাড়িতে একটা ডাক্তার মা'র্ডার হবে আমার হাতে।”
নিক্সন একটা ঢোক গিলে বললো,“না ভাই। ওয়েট। আমি দেখছি।”
কল কে'টে নিক্সন কল লাগালো অধরার নাম্বারে। কলটা রিসিভ করে অধরা তেঁতে উঠলো,“আবার কি হয়েছে?”
_তোরা চারজন একটু বাড়িতে আসবি?
_হোয়্যাট! মাথা খারাপ তোর? এতো রাতে? সমস্যা কি?
_আরে ভাবী জ্ঞান হারিয়েছে, এখন কি করবো বুঝতে পারছি না। ডাক্তার ডাকা যাবে না। প্লিজ আয়না মা, প্লিজ। আচ্ছা রাজন-মমো দুই ভাইবোনকে সাথে নিয়ে আয়, আন্টিকে বল আমার শ্বাস টান উঠেছে,আর বেশিক্ষণ বাঁচবো না। প্লিজ আয় মা।
ফোন কে'টে অধরা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দেয়। আর একসপ্তাহ বাদে তার বিয়ে, কোথায় হবু বরের সাথে রঙ বেরঙের স্বপ্ন দেখবে,তা না করে একটা সাইকোর সাথ দিচ্ছে রাত বিরেতে, অধরা জানে,ধরা পরলে জামিন নেই। তবুও বন্ধু,কি আর করা!”
শুদ্ধ ঘুমিয়েছে ,তাকে ইনায়া প্রেরণার বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে। পুরো অ্যাপার্টমেন্ট অন্ধকার হয়ে আছে,শুধু জানালার কাঁচ গলিয়ে আসা শহুরে কৃত্রিম আলোয় মোটামুটি আন্দাজ করে চলতে পারছে ইনায়া।
ধীরপায়ে, ক্লান্ত ভঙ্গিতে সে হেঁটে চলে যায় বসার ঘরের দিকে। মির্জা বাড়ির প্রত্যেকে চলে গিয়েছে ঘন্টাখানেক হলো। এতো বড় দুর্ঘটনা নিয়ে প্রেরণার কথার পরে আর কেউ আগায়নি কথা। তবে ইনায়া বড় দাদান আর বড় বাবার মুখ দেখে বুঝে নিয়েছে আগামীকাল খুব ভয়ংকর কিছু হতে চলেছে ও বাড়িতে। খুব ভয়ংকর কিছু। বড় দাদানের কাছে তার ভাইবোন গুলো হলো এ একটা অঙ্গ নিজের, কখনো প্রয়োজনের ব্যতীত বকাবকি করেনি অমন পোড় খাওয়া কঠোর মানুষটা, তবে আজ ইনায়া মেজো দাদানের জন্য বড় দাদানের চোখে তীব্র ক্ষোভ দেখেছে, কাল সকালে সম্ভবত আগুন জ্বলবে দাউদাউ করে।
মেজো দাদানের সাথে প্রিতমের কথোপকথন মনে করেই চোখ ভিজে উঠছে ইনায়ার। পুরুষ মানুষ কতটা অসহায় হলে এমন করে কেঁদে ফেলতে পারে !
ইনায়া আরো দুকদম এগোলো, আধো অন্ধকারে দেখলো দুই ভাইবোন মেঝেতে বসে আছে,দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে। মিস জেনিও তাদের সাথে।
এখন প্রেরণা বা প্রিতমকে যারপরনাই শান্ত লাগছে,কেউ কোনো কথা বলছে না,যেন ওরা এই দুনিয়ায় নেই ।
ইনায়াও ওদের থেকে দূরে মেঝেতে বসে পরলো,দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে। ক্ষণিকের জন্য মনে হলো এমন কিছুই হতো না যদি না সে প্রিতমকে ভালোবাসতো, যদি না প্রিতমকে বাধ্য করতো তাকে ভালোবাসতে তাহলে হয়তো এই পরিবারটা এতোটা সাফার করতো না, আর প্রনমি? আদুরে মেয়েটা, নিজের জীবনে কতটা অসহায় একটি মেয়ে যার কাছে সুখ মানে ওর গানের জন্য দু'টো প্রশংসা, এছাড়া কোনো সুখ নেই মেয়েটির জীবনে,হাসি নেই, আনন্দ নেই, সেই মেয়েটাও সাফার করছে ইনায়ার কারণেই। ইনায়ার দোষ সে জীবনের প্রথম অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করেনি।
হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে দিলো ইনায়া,একটা সম্ভাব্য ঝড় তার জীবনেও আসতে চলেছে, সে সেটাই ভাবছে অবচেতন মনে, সে অতটাও অবুঝ নয়, তবে এসবের কারণে প্রিতম আর তার মাঝে দূরত্ব না হোক। কখনও না হোক, ইনায়া সবকিছু সইতে পারবে, এসব পারবে না। আজ মেজো দাদান অমন একটা কাজ করার আগে ভাবলো না তার তিনটা বোন আছে?
কান্না পাচ্ছে ইনায়ার, ভীষণ কান্না পাচ্ছে। এখন কি হচ্ছে প্রনমির সাথে? মেজো দাদানের যা রাগ, যদি মারধর করে মেয়েটাকে!
কথাগুলো ভাবতেই ইনায়া কাঁপছে ঠকঠক করে।
_____
অধরা,মমো, স্নিগ্ধা,স্নেহা আর রাজন এসেছে কিছুক্ষণ আগে। অধরা এসেই প্রনমির মাথার কাছে বসতে বসতে হতাশ গলায় বলে,“হে ঠাকুর,আমি বুঝতে পারছি না আমি তোদের পাল্লায় কেনো পরলাম! আচ্ছা পানি ছিটিয়েছিস মুখে?”
ইরফান দু'পাশে মাথা নাড়ায়। অধরা তিতিবিরক্ত হয়ে বলে,“এই তুই আমার সামনে থেকে যা তো। আর তোর এমন দানবীয় হাত পায়ের লোম দেখে আমার রীতিমতো বমি পাচ্ছে। একটা ভদ্র পাজামা পাঞ্জাবী পর, যা।”
ইরফান চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো, ওরা চার বান্ধবী প্রনমির হাত পা মাসাজ করছে ।
ইরফানের দৃষ্টি গিয়ে আবারও স্থির হয় প্রনমির মুখে। কিছুক্ষণ আগের ঘটনায় রীতিমতো বোকাবোকা লাগছে নিজেকে ইরফানের। গালে একটু আঙুল ছোঁয়াতে কেউ অজ্ঞান হয় ? আতঙ্কে হলে তো বহু আগেই অজ্ঞান হওয়া উচিত ছিলো। আজব মেয়ে! এর মার্কস আরো দু'টো কাঁটা। জিরো থেকে মাইনাস টু মেয়েটির রেটিং।
____
শান্তিনীড়ের লিভিং রুমে তখন কপালে হাত চেপে বসে আছে সামিন, আলো, ইলহাম, ইশমাম।
ইহান আর ইনশিরাহ বিপরীত দিকের একটা সোফাতে বসে আছে। বাড়িতে ফেরার পরে তারা এ ব্যাপারে কোনো আলোচনা করেনি এখন অবধি। ফজর হয়ে আসছে। রিতু,পরী শেহাকেও ঘুম থেকে তোলেনি কেউ,ওরা কেউ জানেইনা কিছু এখন অবধি।
ইহান তখন থেকে ফোনে লাগাতার অনেকের সাথে কথা বলছে, এর মাঝে মুঈনও ছিলো। বাকিরা জানতে চাইলো না ইহান কি চাইছে, আগ্রহও দেখালো না জানার।
কিছুক্ষণ বাদে মুঈন কলব্যাক করলে ইহান উঠে এক সাইডে চলে যায়,শান্তস্বরে বললো,“কাল অনুমোদনের কাগজ টা নিয়ে এসো প্লিজ।”
মুঈন কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললো,“ইহান, এক্ষেত্রে অনেকগুলো কেস আমি হ্যান্ডেল করেছি যে পরে পরিবারের লোকেরাই বাগরা দিয়েছে এমন কিছু....”
_এমন কিছুই হবে না মুঈন।
শান্ত জবাব ইহানের।
_তবে মোস্ট ইম্পর্ট্যান্টলি,ওনারা কোনো অ্যাকশন নিলে আমার পূর্ন সমর্থন থাকবে, এক্ষেত্রে আমি কোনো পারশিয়ালটি করবো না ইহান।
শব্দ গুলো স্পষ্ট করে উচ্চারণ করে মুঈন।
ইহান একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলে,“হুম। আশাও করছি না মুঈন।”
ফোন কাটে। ইহান তখনও সবার থেকে দূরে জানালা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। পাশের মসজিদে ফজরের আজান দিয়ে দিয়েছে। ইহান নিস্পলক তাকিয়ে আছে জানালার বাইরে।
_____
প্রনমির যখন জ্ঞান ফিরেছে তখন আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। সবার কৌতুহলী দৃষ্টি মেয়েটার মুখমন্ডলে। জ্ঞান ফিরতেই ঘাম ছেড়েছে শরীর থেকে।
পিট পিট করছে চোখের পাতা মেয়েটার,অস্ফুটে আওড়াল,“ভাইয়া!”
ওরা শুধু দেখলো মেয়েটিকে। নড়েচড়ে উঠে বসতে চাইলো প্রনমি।
নিক্সন তখন একটা বাটি হাতে ঘরে ঢুকলো। বাটিতে গরম স্যুপ থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে।
নিক্সন সবার মুখের দিকে তাকিয়ে বোকাবোকা হেসে বললো,“নতুন ভাবীর জন্য স্যুপ করেছি আমি। ভাবী প্রিতমের বোন! কি আশ্চর্য!”
অধরা ওর হাত থেকে স্যুপের বাটিটা ছো মেরে নিয়ে বলে,“তোদের এসব আহ্লাদের কথা শুনলে আমার গা জ্বলছে যা তো সবকটা এখান থেকে।”
ইরফান শুধু দেখেই চলেছে প্রনমিকে,তার অন্য কিছুতে মন নেই। হঠাৎ গাঁয়ে ধাক্কা লাগতেই তার ঘোর কাটে,অধরা তাকে ঠেলে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে।
শত চেষ্টা করেও প্রনমিকে কিছু খাওয়াতে পারলো না অধরা। জোর করেও না। উল্টো দাঁত খিচে প্রনমি স্যুপের বাটি এক ঝটকায় ছুঁড়ে ফেলে দেয়, অধরা সামলাতে গিয়ে গরম স্যুপ অধরার হাতে পরলো।
অধরার আর্তনাদে ইরফান ছুটে এলো, এসে ঐ অবস্থা দেখতে পেয়ে বিরক্ত হলো ইরফান। রেগে প্রনমির কাছে এগিয়ে গিয়ে আবারও ধ'ম'কে ওঠে,“নরম থাকতে চাইছি অথচ তোমার পোষাচ্ছে না তাইনা!”
প্রনমি মিইয়ে যায় আবারও, আবারও ইরফানের কন্ঠস্বর শুনে বুক ধরফরানি বাড়তে থাকে, ঘাম হতে থাকে তার। পালানোর চেষ্টা করতে থাকে, ছোটাছুটি করতে থাকে।
ইরফান ওকে কিছুক্ষণ দেখে মমোকে বললো,“ওর চুল ঠিক করে দে, সাজিয়ে দে একটু, ওর শশুরবাড়ি যাবে ও।”
প্রনমি কাঁদতে থাকে। মমো আমতা আমতা করছিলো।
ইরফান দাঁড়িয়ে রয় কক্ষের এক কোণে,মমোকে পুনরায় ধ'ম'কে বলে,“বললাম না তোকে ওর চুল ঠিক করে সাজিয়ে দে।”
মমো এগিয়ে যায় প্রনমির কাছে। চুলে চিরুনি চালাতে দিচ্ছে না প্রনমি। শব্দ করে কাঁদছে আর হাত ছুড়ছে এলোপাথাড়ি। কাঁদতে কাঁদতে বলছে,“আমি আপুর কাছে যাবো। অন্য কোথাও না।”
মমো বেজার মুখে ইরফানের দিকে তাকালে ইরফান এগিয়ে যায় প্রনমির কাছে। ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলে,“এটা মামার বাড়ির আবদার ? বিয়ে হয়েছে, শশুর বাড়ি যাবে। আপু ভাইয়ার কোলে চড়ার দিন শেষ। গিয়ে সংসার করবে স্বামীর সাথে। যেমনটা আমার বোন করছে। ”
থামলো ইরফান, প্রনমি তখনও মমোর হাত সরিয়ে দিচ্ছে বারবার। ধৈর্য্যের বাধ ভেঙ্গে ইরফান আবারও একটা অদ্ভুত কান্ড করে বসলো। এক হাতে মমোর হাত থেকে লিপস্টিক টা নিয়ে আরেক হাতে প্রনমির থুতনি চেপে ধরলো। প্রচন্ড শক্তি খাটিয়ে লিপস্টিক টা প্রনমির ঠোঁটে ঘষতে ঘষতে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,“কেন সাজবে না তুমি? অযত্ন করেছে তোমার স্বামী তোমার? এতো বেচারী সাজার কিচ্ছু হয়নি। সাজবে, অবশ্যই সাজবে। তোমার ভাই আমার বোনকে কত যত্ন করে সবার থেকে প্রশংসা কুড়োচ্ছে দেখো। ট্রাস্ট মি তোমার ভাইয়ের থেকেও অনেক ভালো বর হবো, এতো ভালো বর হবো যে তোমার ভাইয়া আর আপু খুশিতে পাগল হয়ে যাবে। কখনো ভালো হবে না, পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে।”
মেজাজের খেই হারিয়ে উন্মাদের মতো আচরণ করছে ইরফান, লিপস্টিক টা ঘষতে গিয়ে ভে'ঙেই ফেললো। প্রনমি ব্যাথা পাচ্ছে ঠোঁটে, চেঁচাতে পারছে না,শুধু চোখ বেয়ে পানি পরছে। এবার হাতও ছুঁড়ছে না সে, আতঙ্কে আবারও শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল তার।
লিপস্টিক লাগিয়েছে যা তা ভাবে, এবার মমোর হাত থেকে কাজল নিয়ে এক হাতে প্রনমির দু'গাল চেপে ধরে কাজল পরাচ্ছে চোখে। ভেজা চোখে কাজল লাগছে না। ইরফানকে অবাক হয়ে দেখছে বাকিরা, চোখে মুখে হতভম্ব ভাব তাদের।
ইরফান যেন ইরফান নেই, কিছুক্ষণ বাদে ইরফান মমোকে বললো,“আর কি লাগায় রে চেহারায় ? ছা'তা নামও তো জানি না এসবের। ওকে গহনা পরাতে হবে, ওসব মাম্মা পরিয়ে দেবে। আর কিভাবে সাজাবো ? ওহ হ্যা নেইলস, এই ওর হাতের প্রত্যেকটা নেইলসে “ই” অক্ষর টা পেইন্ট করে দে,ওর ভাই যেমন আমার বোনের নখে “পি” লিখিয়েছিলো। । ”
চোখ মুখ খিচিয়ে নিরব অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছিলো প্রনমি। লোকটা উন্মাদ। উন্মাদ বললে ভুল হবে, লোকটা হয়তো মানুষই না। প্রনমি চাইছে না চোখের জল খরচ করতে তবুও পারছে না শক্ত হতে। আতঙ্কে বুক কাঁপছে তার। এরপর! এরপর কি হতে চলেছে তার সাথে!
অধরা এসে ইরফানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলে,“ব্যাথা পাচ্ছে মেয়েটা।”
হুশে ফিরলো ইরফান। হঠাৎ করে প্রচন্ড রাগ উঠে গিয়েছিল এমন! এতক্ষণ কি করেছে খেয়ালে আসতেই প্রনমির দিকে তাকায় সে। প্রনমি থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে অধরাকে শক্ত করে ধরে থাকলো। একটু সেইফ স্থান খুঁজছে মেয়েটা। ঐ লোকটা তার গায়ে হাত তুলবে যেকোনো সময়, মার খেতে চায় না প্রনমি।
সাজগোজ কিছুই হয়নি। ইরফানের লাগিয়ে দেওয়া লিপস্টিক,কাজল মুছিয়ে অধরা শুধু প্রনমির ওড়নাটা মাথায় তুলে দেয় শেষমেশ।
ইরফান জিন্সের সাথে নেভি ব্লু একটা শার্ট পরে রেডি হয়ে নেয়। ওর বন্ধুরা জানতে চায় এখন কি করবে ইরফান। ইরফান গম্ভীর মুখে প্রনমির ডান হাতের কব্জি চে'পে ধরলো শক্ত করে। তারপর মেয়েটাকে টেনে হিচরে নিয়ে যেতে লাগলো সদর দরজার কাছে।
_____
ঠিক সকাল সাড়ে সাতটার সময়ে ইরফান প্রনমিকে নিয়ে শান্তিনীড়ে পৌঁছাল।
ওর জন্য সদর দরজা খুলেই রেখেছিলেন সবাই। প্রত্যেকটা মানুষ নির্ঘুম লিভিং রুমে কাটিয়েছে দীর্ঘ সময়। দোতলা থেকে রিতু নিচে নামলেও তাকে এখন অবধি কিছুই জানায়নি ইলহাম। পরী আর শেহার তখনও ঘুম ভাঙেনি।
রিতু যখন অবাক চোখে সবার মুখ দেখছিলো,ঠিক তখনই ভীতসন্ত্রস্ত প্রনমিকে টেনে হিচরে শান্তিনীড়ে প্রবেশ করলো ইরফান।
প্রনমি চেঁচাচ্ছিল না,তবে চাঁপা আওয়াজে কাঁদছিল, কব্জিতে ব্যাথা করছে তার। আর পারছিলো না এতো টর্চার নিতে।
ইরফানের মুখভঙ্গি যারপরনাই শান্ত। আর সবথেকে শান্ত ওর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইহান,আলো,সামিন, ইলহাম, ইশমাম।
শুধু রিতু বিভ্রান্তের ন্যায় প্রনমিকে দেখছিলেন। মুখে বলছিলেন না কিছুই। ইনশিরাহ দূরে ঠায় দাঁড়িয়ে, আসন্ন তান্ডবের জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইরফান মেয়েটাকে টানতে টানতে আরো দুকদম এগোলো, সরাসরি সামিনের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ালো সে। সামিন শান্ত চোখে একপলক ক্রন্দনরত প্রনমিকে দেখছে, একপলক দেখছে ইরফানের শক্ত হাতের মুঠোয় প্রনমির হাতটা।
ইরফান ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যেকের মুখের দিকে তাকিয়ে সামিনকে বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলে,“তোমাদের বাড়ির বৌ বড় বাবা।”
রিতু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ছেলের মুখের দিকে। বাকিরা কেউ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। কিন্তু মুহুর্ত কে'টে যেতেই সামিনের একটা জোরালো চ'ড় পরে ইরফানের গালে। বাচ্চা কাচ্চার গাঁয়ে এই প্রথম হাত উঠলো সামিনের।
ইরফান মোটেও বিচলিত নয়, সে ম্লান হেসে মাথা তুলে আবারও বড় বাবার চোখে চোখ রেখে বলে,“কেন রিয়্যাক্ট করছো বড় বাবা? মেয়ে তুলে এনে বিয়ে করা এ বাড়ির ঐতিহ্য। আমি চর্চা করলাম। তুমিও তো বড় মা'কে তুলে এনে বিয়ে করেছিলে! করোনি?”
কথাটা শেষ করতে পারলো না ইরফান,আলো এসে স্বশব্দে আরেকটা চ'ড় বসায় ইরফানের গালে।
ইরফান তবুও বিচলিত নয়, উল্টো ওর হাতের বাঁধন শক্ত করে। চাঁপা আর্তনাদ করে ওঠে প্রনমি।
রিতু শুধু দেখেই যাচ্ছিলো ছেলেকে, সে ভাবছে তার ঘুম কাটেনি হয়তো, এসব হয়তো স্বপ্ন।
ইহান একপাশে দাঁড়িয়ে আছে বুকে হাত বেঁধে, শান্ত হয়ে। ইলহাম, ইশমাম দু'জনেই চুপচাপ বসে আছে। কেউ মাথা তুলে দেখছেও না ইরফানকে।
সামিন খুবই ঠাণ্ডা গলায় ইরফানকে বলে,“ওর হাত টা ছাড়।”
ঘুম ভেঙে যাওয়ায় শেহা ফ্রেশ হয়ে নিচেই নামছিল, রাতে একটা ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলো ডাক্তারের পরামর্শে,নয়তো এতো বেলা অবধি সে ঘুমায় না। নিচে শোরগোলের আওয়াজ শুনে সে দ্রুতপায়ে সিঁড়ি ভাঙছিল। কিন্তু সিঁড়ির মাঝপথে এসেই তার কদম থামলো। প্রত্যেককে দেখলো শেহা, তারপর নির্নিমেষ দেখতে লাগলো ইরফান আর ইরফানের সাথে অপরুপ সুন্দরী মেয়েটাকে, যার হাত ধরে রেখেছে ইরফান। ওখানেই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো শেহা। তার কেমন বুক কাঁপছে হঠাৎ। আশ্চর্য রকমের জোরালো শব্দ হচ্ছে বুকে, কিছু হারিয়ে ফেলার সতর্কঘন্টা বাজছে সেখানে,যা সে পায়-ই নি,তাড়া দেখায়নি পাওয়ার। তবে কিছুই বুঝতে পারছে না শেহা।
জেদে ইরফানের চোয়াল শক্ত হয়, সামিনের কথার কোন জবাব না দিয়ে প্রনমিকে টানতে টানতে নিচতলার গেস্ট রুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা লক করে দেয়, শব্দ করে।
কেঁপে ওঠে রিতু, মাথা ঘুরছে তার। বাকিরা সবাই শান্ত।
গেস্টরুমে ঢুকে ইরফান প্রনমিকে একপ্রকার ধাক্কা মেরে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে নিজেও চুপচাপ বসে থাকে বিছানায়।
প্রনমি উঠে আবারও ছোটাছুটি করতে থাকে, লোকটা বাড়ির অতগুলো বড়দের সামনে দরজা লাগিয়ে নিজের দুঃসাহসের সীমা দেখিয়ে দিয়েছে, এখন কি করবে তার সাথে!
প্রনমি ছুটছে, একবার গিয়ে দেয়ালে বাড়ি খেয়ে ঘুরে অন্যদিকে ছুটতে লাগলো, আবারও গিয়ে মুখ থুবড়ে পরলো একটা টেবিলের ওপর। আ'ত'ঙ্কি'ত, বিপর্যস্ত প্রনমি টেবিলের নিচে ঢুকে গেল আবারও।
ইরফান শুধু চুপচাপ বসে রইলো।
শেহা সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে দেখছে বন্ধ দরজা টা। পরপর বোকার মতো দেখছে সবাইকে।
ইহান এগিয়ে যায় গেস্টরুমের দরজার কাছে,শান্ত ভঙ্গিতে ইলহাম আর সামিনকে বলে,“তোমাদের পিতৃত্ব যেন জেগে না ওঠে! বুকে পাথর চাপা দাও।”
রিতু কেঁদে উঠলো শব্দ করে। ইলহাম নির্জীব হয়ে বসে আছে।
ইহান একটা লম্বা শ্বাস ফেলে লা'থি বসায় দরজায়। পরপর কয়েকটা লা'থিতে ভাঙলো শান্তিনীড়ের গেস্টরুমের দরজা, ভাঙলো ভাইয়ের প্রতি ইহানের স্নেহের প্রাচীর।
ইরফান তখনও বিচলিত হচ্ছে না, তার তো মাথা-ই কাজ করছে না জেদে আর তীব্র ক্ষোভে।
বড়রা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। শেহা সিঁড়িতেই দাঁড়িয়ে। দরজা ভেঙে ইহান পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে রুমের ভেতরে ঢোকে।
ইনশিরাহ ছুটে যায় বড় দাদানের পিছু পিছু।
ইহানের হাত কাপছিলো, ইহান দেখতে পেলো। তবুও পাত্তা দিলো না। অমন পেটানো হাতের প্রথম চ'ড়টায় ইরফান নড়লো খানিকটা, তবুও চোয়াল শক্ত করে বসে রইলো।
দ্বিতীয় চ'ড়টা দিয়ে ইহান ইরফানের কলার চে'পে ধরলো, তৃতীয়বারের মতো আরেকটা চ'ড় মারলো সে, তৃতীয় চড়ে ইরফান হেসে উঠলো সামান্য।
আরেকটা চ'ড় পরলো গালে,আরেকটা, তারপর আরেকটা।
ইরফান একটুও বিচলিত হচ্ছে না এতো মা'র খেয়েও, একটুও না।
ইহানও থামছে না।
ইনশিরাহ ছুটে গেল প্রনমির কাছে। ঝুঁকে বসলো মেয়েটার সামনে। চাঁপা স্বরে কাঁদছিল টেবিলের নিচে বসে। ইনশিরাহ ওর হাত ধরলেও কেঁপে উঠলো সে। ইনশিরাহ নরম গলায় বললো,“আমি ইনশিরাহ আপু তোমার। এসো। ভয় নেই। এসো।”
চলমান.......