ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 37

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৩৭
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

ইনশিরাহ গাঁয়ের সমস্ত শক্তি খরচ করে প্রনমিকে টেনে বের করলো করলো টেবিলের নিচে থেকে। থরথর করে কাঁপছিলো মেয়েটা। ওকে দু'হাতে আগলে ধরলো ইনশিরাহ, প্রচন্ড দুর্বল লাগছে প্রনমিকে, শেষ কখন খেয়েছে কে জানে!

এদিকে ইহান চ'ড় মে'রেই চলেছে ইরফানকে, তার কপালের শিরা দৃশ্যমান, তেজে আর প্রচন্ড রাগে।

বাকিরা সবাই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছিলো গেস্ট রুমের বাইরে, কিন্তু রিতু পারলো না থাকতে, ছুটে গেলো গেস্টরুমের ভেতরে। কাঁপা কাঁপা গলায় বড় ছেলেকে বলছে,“এখন থাম। একটু থাম।”

ইহান থামছে না, তবে চ'ড় মারতে মারতে ইহান ক্লান্ত হয়ে গেলেও ইরফানের কোনো হেলদোল নেই। প্রত্যেকটা চ'ড় যেন তাকে ছুঁতেও পারছে না।

রিতু বড় ছেলের হাত থেকে ছোটো ছেলেকে ছাড়িয়ে নিতে ব্যস্ত। ইহানকে অনুনয় করে বলছে,“ঠান্ডা মাথায় বসে কথা বল,ও তো পালাচ্ছে না।”

মাম্মার কথা গাঁয়েও মাখলো না ইহান, ইরফানের কলার ধরে টানতে টানতে ইলহামের সামনে এনে দাড় করালো। ইলহাম চেয়েও দেখলো না ছেলেকে। ইহান ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে,ঘেমে গিয়েছে পুরো, রিতুকে বলে,“আজ ন'টায় রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার থেকে ভ্যান আসবে মাম্মা। ওর সবকিছু গুছিয়ে দাও। এই বাড়িতে ওর স্থান নেই, এতদিন শুধু অ্যাংগার ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাডেমীর পিছনে বেহুদা পয়সা খরচ করেছি আমরা, ওর তো পুরোটাই শুদ্ধ করতে হবে।”

রিতু অসহায়ের মতো দুই ছেলের মুখ দেখে ঘুরে প্রনমির দিকে তাকায়। ইনশিরাহ নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে রেখেছে প্রনমির মাথাটা। কাঁপুনি থামছে না মেয়ের।

ইরফান তখনও “ডোন্ট কেয়ার” ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অতিরিক্ত রাগে মানুষ অন্ধ হয়ে যায়, তবে ইরফানের হয়েছে ব্যতিক্রম কিছু, তার কোনো অনুভূতি নেই। ইনশিরাহ চেঁচিয়ে ওঠে ভাইয়ের ওপর,“ছিহঃ আমরা তিনটা বোন তোর, আমাদের কথাও মাথায় আসলো না? কতটা ভোগালি দুই পরিবারকে ! সর্বোপরি এই মেয়েটাকে,কত নিচ তুই ইরফান। আমার যাস্ট ঘেন্না লাগছে এটা ভেবে যে সে-ই তুই-ই কিনা নিজের বোনদের নিয়ে এতোটা পজিসিভ। এতো ভণ্ডামি কেনো? বল!”

ইরফান একপলক দেখলো ইনশিরাহকে। রা'গে ফুঁসছে ইনশিরাহ। আলো ধপ করে একটা সোফাতে বসে পরলো। সামিন ইরফানের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। সব শাসনের উর্ধ্বে চলে গিয়েছে এই ছেলে, চূড়ান্ত হতবাক সামিন। তাদের বাড়ির শাসনে এতোটাই খামতি থেকে গিয়েছে যে আজ শান্তিনীড়ের সামনে রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের গাড়ি এসে থামবে। টেনে হিচরে নিয়ে যাবে তাদের আদরের ছেলেকে। আক্ষেপ! এই আক্ষেপ নিয়ে কোথায় মুখ লুকাবে ইয়াসার মির্জা!

শেহা সিঁড়িতে যেখানটাতে দাঁড়িয়ে ছিলো,ঠিক সেখানটাতেই দাঁড়িয়ে আছে। একহাতে সিঁড়ির রেলিং ধরে আছে মেয়েটা। তাকিয়ে আছে প্রনমির মুখের দিকে। অন্যকিছু দেখছে না সে,অন্যকিছু শুনছেও না, সে শুধু শুনছে রাগী মির্জা ঐ মেয়েটাকে বিয়ে করেছে। জোর করে হোক,যেমন করে হোক, বিয়ে করেছে, বৌ করেছে ঐ মেয়েটাকে।

দোতলা থেকে অসুস্থ পরী নেমে এলো। পুরো ঘটনা শুনে সে চেঁচাতে চাইলো ইরফানের ওপর, আলো ওকে থামিয়ে দিয়ে বললো,“ওকে যতো-ই মারি,যত যা কিছুই বলি এখন এসব কিছুই ওকে ছুঁতে পারবে না,অযথা উত্তেজিত হোস না তুই। সবাইকে ভাবতে দে।”

ইলহাম মুখ খোলে,“আরে প্রিতম আর ওর বোনকে কল করো কেউ,তাদের মেয়েকে তাদের হাতে তুলে দিয়ে তারপর এই ছেলের ব্যবস্থা হবে।”

ইহান শান্তস্বরে জবাব দিলো,“এতো সহজ হবে পাপা? আদৌও কি এতো সহজ হবে? কিডন্যাপিং অ্যান্ড....”

ভাইকে সবটা বলতে না দিয়ে ইরফান হাসলো তাচ্ছিল্যের হাসি,হেসে বললো,“ও কেনো যাবে? ওকে বিয়ে করেছি। আমি জাহান্নামে গেলেও ও এখানেই থাকবে। ও সজ্ঞানে কবুল বলেছে আর আমি বৌ তালাক দেবো না।”

ইহান আবারও তে'ড়ে যায় ভাইয়ের দিকে,কলার চেপে ধরে বলে,“বিয়ে? ওটা বিয়ে?”

_তবে কি প্রিতমের টা বিয়ে ছিলো?

ইহান কলার ছেড়ে দেয় ভাইয়ের, এই ছেলের আর কিছু হবার নেই। ফোনটা বের করে মুঈনকে কল লাগায় সে।

ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায় শান্তিনীড়ের অন্দরমহলে পা রাখে প্রেরণা। ইনায়াও এসেছে তার পিছু পিছু। ওরা সবাই দরজার দিকে দৃষ্টি দিলো, বিধ্বস্ত প্রেরণা গাঁয়ের ধূসররঙা শাড়িটা এখন অবধি পাল্টায়নি। কুঁচি এলোমেলো হয়ে গিয়েছে, চেহারা মলিন। সদর দরজায় পা রাখার সাথে সাথে প্রেরণা পা থেকে জু'তো খুলে হাতে নেয় তার।

নিস্পলক ওর দিকে তাকিয়ে ছিলো সবাই। শান্ত মুখভঙ্গি প্রেরণার , কিন্তু ওর পদক্ষেপ বুঝতে সময় নেয়নি কেউ। ইরফান স্থির হয়ে দেখছিলো প্রেরণাকে, প্রেরণা জু'তো হাতে তার দিকেই এগিয়ে আসছে।

সবাই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। প্রেরণার পায়ের গতি বাড়তেই রিতু আঁতকে উঠে ইরফানকে আগলে নিজের পেছনে নেয়। ইনশিরাহ প্রনমিকে রেখে ছুটে এসে প্রেরণার এক হাত টেনে ধরে পেছন থেকে,ইনায়া প্রেরণাকে ধরলো জাপটে। ন্যায় অন্যায় অপরাধ বুঝলেও একজন বোন কখনও তার ভাইকে জুতাপেটা হতে দেখতে চাইবে না। তারা যতই অবুঝ কিংবা জ্ঞানী হোক বোনদের কাছে এই দৃশ্য অসহনীয়।

প্রেরণা দাঁতে দাঁত চেপে ইনশিরাহ আর ইনায়াকে বলে,“ছাড়ো আমাকে।”

গলা কাঁপছে প্রেরণার। রিতু ইরফানকে আগলে রেখে কেঁ'দে ওঠে, প্রেরণাকে বলে,“মা, আমরা রয়েছি তো। ওর বিচার হবে, তুমি শান্ত হও।”

ইনশিরাহ চেঁ'চি'য়ে প্রেরণাকে বলে ওঠে,“আপু, সবাই আছে, প্রনমি ইজ সেইফ নাও। আপনি শান্ত হোন।”
সামিন আলো একে অপরের দিকে অসহায়ের মতো তাকায়।

প্রেরণা তবুও দমছে না, কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তির পরে ডুকরে কেঁদে ওঠে সে,রিতুর দিকে তাকিয়ে বলে,“কি শান্ত হবো আমি? কি শান্ত হবো? আপনার এই জানোয়ার ছেলেটি কি করেছে জানেন? এমন একটি মেয়েকে নিজের প্রতিহিংসার শিকার বানিয়েছে যে অলরেডি ডে'ড! আমি শান্ত হবো? কি আশা করছেন আমার থেকে? কতটুকু মাহাত্ম্য আশা করছেন? আ'ম স্যরি,আমি মহান নই!”

প্রনমিকে এবার আলো আগলে নেয়,মেয়েটা টলছিলো।

কাঁদতে কাঁদতে গোঙানির মতো আওয়াজ বের হচ্ছে প্রেরণার থেকে। ইহান শুধু দেখছিলো তাকে। একটু দম ফেলে প্রেরণা ইরফানের দিকে তাকিয়ে কেঁ'দে বলে,“তুমি যাকে ব্যবহার করেছো না প্রিতমের থেকে শোধ তুলতে? সে-ই মেয়েটির ওপর তার ছয় বছর বয়সে রেপের অ্যাটেম্পট হয়েছিলো। যার কারণে আজ মেয়েটির চোখের দৃষ্টি টুকুও নেই, আছে শুধু মানসিক ট্রমা, যন্ত্রণা,আর গোটা জীবনের জন্য প্রতিবন্ধী তকমা।
তুমি জিতেছো। কে বলে তোমাকে লুজার? প্রিতম চ্যাম্পিয়ন, এসব কে বলে? এবার তুমি জিতলে,একেবারে যায়গা মতো আঘাত করেছো ভাই! প্রিতমকে শিক্ষা দিতে এর থেকে বেস্ট কিছু আর হয়-ই না।”

কন্ঠনালী থেকে কথাও বেরোচ্ছিল না প্রেরণার। বাকিরা সবাই বাকরুদ্ধ। একরাশ গ্লানি নিয়ে তাকিয়ে আছে ছোটো প্রনমির দিকে, যে ইতোমধ্যে আবারও ট্রমায় চলে গিয়েছে। কাঁপছে আলোর বুকের কাছে মাথা রেখে।

প্রেরণা কাঁদছে, হাউমাউ করে কাঁদছে। ইরফান প্রেরণার কথাগুলো শুনে ধীরে ধীরে নিজের দৃষ্টি নিয়ে প্রনমির দিকে স্থির করে। তারপর একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে প্রনমির দিকে।

প্রেরণা দু'হাতে চোখ মুছে কান্না দমানোর চেষ্টা করে, কিন্তু পারেনা। ইনায়া কেঁদে ফেলেছে,মেজো দাদানের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলে,“হেট ইউ দাদান।”

একটা বাক্য,ইনায়ার বলার ভঙ্গি,ইরফানকে ওর দিকে তাকাতে বাধ্য করে। ইনায়া আবারও অস্ফুটে বলে,“হেট ইউ।”

ইরফান আবারও প্রনমির দিকে তাকায়। রিতু প্রনমির অতীতের কথা জানতে পেরে ইরফানের বুকে কিল ঘুষি মারতে শুরু করে, কাঁদছে সে, ভীষণ অসহায় বোধ করছে,মা হিসেবেও, নারী হিসেবেও, কাঁদতে কাঁদতে ইরফানকে বলছে,“তুই আর কত জ্বালাবি আমাকে! আর কত!”

ইরফান ওসব কিছু শুনছিলোই না,সে দেখছে প্রনমিকে, অতঃপর দেখতেই থাকলো, আবারও সব হুঁশ জ্ঞান খুইয়ে।

এর মাঝে প্রিতম চলে আসে মুঈনকে সাথে নিয়ে, প্রিতমের ভাবভঙ্গি যারপরনাই স্বাভাবিক,কাল রাত থেকেই। ক্লান্ত ভঙ্গিতে হেঁটে এসে সে প্রথমেই আলোর কাছ থেকে প্রনমিকে টেনে আগলে নেয়। প্রনমি ভাইকে চিনতেও সময় নেয়, ধরতেই কেঁপে উঠছে যেনো। প্রিতম বোনের মাথায় চুমু খেয়ে বলে,“আমি ভাইয়া প্রনো, কিচ্ছু ভয় নেই....”

ভাইয়ের শার্ট খামচে ধরে আছে প্রনমি,ওর এক একটা নিঃশ্বাস প্রিতমকে দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছিল, কিন্তু সে শান্ত। শান্ত চোখেই তাকায় ইরফানের দিকে, ক্লান্ত ভঙ্গিতে বলতে থাকে,“কোনো কিছুই আমার অওকাতের মধ্যে ছিলো না, না অ্যাকাডেমিক হিস্ট্রি,না তোর বোন। তবুও সবকিছু যেভাবেই হোক পেয়েছি। আমি সবকিছুর জন্য শুকরিয়া করি সৃষ্টি কর্তার কাছে। তবে আমার সাথে হার জিতের এই খেলাতে তোর শেষ চালটা দারুণ ইরফান। আমার সবথেকে দুর্বল যায়গাটিতে আঘাত করে চেকমেট করে দিয়েছিস। দুর্দান্ত। কংগ্রাচুলেশন আমাদের তিন ভাইবোনকে এক রাতে জাহান্নাম থেকে ঘুরিয়ে এনে নিজেকে জেতানোর জন্য। এসব বোনের জন্য করেছিস নিজের? তুই কত ভালো ভাই ইরফান জানিস? আমার মতো লুজার নোস, আমাকে দেখ নিজের জীবনের একটা ভুলের জন্য নিজের আদরের বোনটিকে আমি আরেকবার শেষ করলাম। ”

ইনায়া মাথা তুলে প্রিতমের দিকে তাকায়। প্রিতমের কথাটিতে তার বুক কাঁপছে হঠাৎ। প্রিতম ভুল বলতে কি বুঝিয়েছে? ইনায়া তার ভুল?

ইরফান ওসব কিছু শুনছিলো না,শুধু দেখছিলো প্রনমিকে। তার অবচেতন মনে তৃষ্ণা পেলো মেয়েটির মুখটা দেখার। কিন্তু প্রনমি মুখ লুকিয়ে আছে প্রিতমের বুকে।

প্রিতম কোনো উচ্চবাচ্য করলো না,না ইরফানকে আঘাত করলো, না আর কথা শোনালো। সে বোনকে আগলাতে ব্যস্ত।

ইহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুঈনের দিকে তাকিয়ে বলে,“অনুমোদনের কাগজ এনেছো?”

প্রেরণা দু'হাতে চোখ মুছে ইহানকে বললো,“কিসের অনুমোদন?”

ইহান নিরেট স্বরে বলল,“রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে পাঠানো হবে ইরফানকে,অর্ডারের কাগজ!”

প্রেরণা মুহুর্তেই বদলে গেলো, এতোক্ষণের নরম,ব্যথিত প্রেরণা নেই। ইহানের দিকে তাকিয়ে বললো,“আর ইউ কিডিং উইদ আস ইহান?”

ইহান দেখছে প্রেরণাকে। মুঈন টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গম্ভীর হয়ে, বাইরে পুলিশ ভ্যান এসে দাঁড়িয়েছে যা এখনও টের পায়নি এ বাড়ির লোক।

প্রেরণা ইহানকে বলতে লাগলো,“কিডন্যাপিং,অ্যাবিউজের কেস এটা! ও জেল খাটবে! জেল খেটে বেরোনোর পরে আপনি আপনার ভাইকে যেখানে খুশি সেখানে দিতে পারেন,ওকে রিহ্যাবে পাঠান অথবা মদিনাতে,সেটা ওর জেল খাটার পরে। ওর এবং ওর বন্ধুদের নামে কেস ফাইল হয়েছে।”

রিতু আঁতকে উঠলো, মায়ের মন মানছে না, পৃথিবী দুলে উঠেছে তার।

প্রেরণা ওখানে দাঁড়ানো প্রত্যেকের দিকে তাকিয়ে বললো,“আশা করবো এ বাড়ির সবার মেরুদন্ড আছে,অন্যায়কে প্রশ্রয় না দেওয়ার মুরোদ আছে!”

ইহান জানতো,ঠিক এমন কিছুই হবে, তবুও ভাইয়ের মন চেয়েছিল যাতে এমন কিছু না হয়। সে ইরফানের দিকে তাকায় অসহায়ের মতো।
ইরফান কারো কোনো কথাই পাত্তা দিচ্ছিলো না, তার মস্তিস্ক আটকে আছে একটি যায়গায়,গতকাল রাতের ঘটনাগুলো সে মনে করছিলো,আর প্রনমিকে দেখছিলো।

সামিন প্রেরণার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,“মেরুদন্ড আছে। বাবা মায়ের ন্যায় অন্যায় বোধ, সমস্ত লজিক ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে নড়বড়ে হয়ে যায়, হয়তোবা অমন বাবা মা আমরা হইনি। তবে স্নেহের পরিমাণে ভুল করায় আজ আমাদের ছেলের জন্য অমন একটা ফুল কষ্ট পেয়েছে,আমরা লজ্জিত,যদি সম্ভব হতো ওর স্মৃতি থেকে গতকাল দিনটা আমি মুছে দিতাম। এছাড়া আর কিছু বলার নেই তোমাকে।”

রিতু এগিয়ে এলো সামিনের কাছে, কাঁদতে কাঁদতে বলে,“ভাইয়া, ও ভাইয়া! ও খারাপ। ও খুব খারাপ। ওকে দিয়ে পা ধরান ওই মেয়ের, তবুও জেল নয়। জেল নয় ভাইয়া।”

সামিন রিতুর দিকে তাকায়, শান্ত স্বরে বলে,“তুমি দোতলায় যাও রিতু।”

রিতুর হাত পা কাঁপছে। শরীরটা ভে'ঙে আসছে তার, অসুস্থ পরী তাকে সামলাতে যায়।

মুঈন বাইরে থেকে কাউকে ভেতরে আসার নির্দেশ দেয়। একজন কনস্টেবল এসেছে।
প্রেরণা এগিয়ে গেলো প্রনমির কাছে, এতক্ষণে বোনকে সরাসরি বললো,“ও কি করেছে তোর সাথে?”

প্রনমি কাঁপছে জবাব না দিয়ে। প্রেরণা গলার স্বর উঁচু করে বলে,“খুলে বল।”

প্রনমি বলবে কি! তার যে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে। প্রেরণা তখন চেঁ'চি'য়ে উঠলো বোনের ওপর,“জীবন টা জুজু দেখে ভয় পাওয়ার দিনে আটকে নেই প্রনমি, অন্তত আমাদের তিনভাইবোনের নেই। মুখ খোল, আমার জানতে হবে, ও কি কি করেছে?”

প্রনমি ভাইয়ের শার্ট আরও খামচে ধরলো। ইরফান প্রনমির হাতের দিকে দেখছে।

প্রেরণা প্রনমির হাত ধরে হ্যাচকা টেনে বললো,“চল থানায় যাবি আমাদের সাথে।”

ক্ষণে ক্ষণে কঠোর হচ্ছে প্রেরণা। মুঈন প্রেরণাকে বললো,“ওর প্রতি সংবেদনশীল হোন, ধৈর্য্য নিয়ে বোঝান।”

ইহান বললো,“থানায় ও কেনো যাবে! শি নিড রেস্ট!”

প্রেরণা ঘুরে তাকায় ইহানের দিকে, ক্ষোভ উপচে পরছে ওর চোখ মুখ দিয়ে, বললো,“থানায় যাবে কারণ আমার পোড়াকপালি বোনের বোধশক্তি টুকুও সম্ভবত কাল আপনার ভাই নষ্ট করে দিয়েছে,ও কিছুই বলতে পারবে না। ওকে থানায় নিয়ে চেক করা হবে। তারপর আপনার ভাইয়ের নামে আরও একটি চার্জ লাগানো হবে। রেপের!”

শব্দগুলো বজ্রের ন্যায় আছড়ে পরলো মির্জা বাড়ির সিনিয়রদের মাথাতে। ইলহাম নিস্তেজ হয়ে বসে রইলো,সামিন হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দু'চোখ বন্ধ করে নিলো। ইশমাম মাথা নিচু করে বসে আছে।

আলো মুখে আঁচল চে'পে ধপপ করে একটা সোফাতে বসলো, ওদিকে রিতু ডুকরে কাঁদছে ছেলের নামের পাশে রেপিস্ট তকমা লেগে গিয়েছে সে আক্ষেপে।

ইহান প্রেরণার থেকে চোখ সরিয়ে ইরফানের দিকে তাকায়। ইরফান নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে একপ্রকার হ্যাংলা চোখে মেয়েটিকে অবলোকন করছে।

প্রেরণা প্রনমির হাত ধরে টানছে। তখন ইহান এসে ওদের সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে,“হেই প্রেরণা! আপনি রেগে আছেন, কিন্তু আপনাকে বুঝতে হবে প্রনমি স্বাভাবিক নেই। এই অবস্থায় ওকে থানা,ল্যাব এসবের চক্কর করালে ওর ওপর সেটা আরও বেশি প্রভাব ফেলবে ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড।”

প্রেরণা মনযোগের সহিত শুনলো ইহানের কথা, একটু যেনো বুঝলোও। টানা-হেচরা বন্ধ করে বোনকে বুকে টেনে নিয়ে কাঁদছে চুপ করে।

রিতু এবার বুক চাপড়ে কেঁদে চলেছে। ইলহাম মেজাজ দেখিয়ে ইনশিরাহকে বলে,“এই ওকে দোতলায় নিয়ে যা তো মা। ভালোলাগছে না এসব যা।”

রিতু যাবে না। ছেলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে, বারবার বলছে,“ও মাফ চাইবে, আমি মাফ চাইবো। তবুও জেল নয়।”

প্রিতমের কাছে গিয়ে হাত ধরেও অনুনয় করলো রিতু, আলো টেনে নিয়ে আসলো তাকে।

যেটা হবারই ছিলো সেটা হলোও শেষমেশ, ইরফানকে পুলিশ ভ্যানে গিয়ে উঠে বসতে বললো মুঈন।

ইরফান তাও শুনছিলো না, সে এবার একটুখানি মুখ দেখতে পেলো প্রনমির, সামান্য ঝলকে গালের লাল তিলটাও দেখতে পেলো। প্রেরণা বোনকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে ইরফানের দিকে তাকিয়ে আছে, ইরফানের কৌতুহলী দৃষ্টি প্রনমিকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখছে, প্রেরণা এখন বাঁচাতে চাইছে বোনকে অমন দৃষ্টি থেকে।

ইরফানের নির্লিপ্ততা অবাক করলো ইহানকে। এতক্ষণের হম্বতম্বি কোথায় গেল? কনস্টেবল এসে যখন ইরফানকে তাড়া দিলো তখন ইরফান আরও একবার প্রনমির দিকে তাকালো। এবং ওকে টেনে পুলিশ ভ্যানে না নেওয়া অবধি দেখতেই থাকলো প্রনমিকে।

ইহান পোর্চের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে, ইরফানকে নিয়ে কনস্টেবল দু'জন চললো থানায়।
ইহান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলো তা। অন্দরমহল থেকে রিতুর আর্তনাদ ভেসে আসছে। বুক চাপড়ে কাঁদছে মহিলা।

একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইহান ভেতরে ঢুকলো, মুঈন ওকে বলে চলে গিয়েছে ততক্ষণে। বাড়ি থেকে একজন লোকও ইরফানের জন্যে, ইরফানের সাথে যায়নি।

প্রেরণা এবার প্রিতমের দিকে তাকিয়ে বলে,“চল। যেতে হবে।”

ইনায়া চুপচাপ বড় মায়ের পাশে বসেছিলো। সে মাথা তুলে তাকায়। প্রিতম মাথা নেড়ে রিতুর সামনে এসে দাঁড়ায়, রিতুর হাত দু'টো ধরে নরম গলায় বলে,“মেজো মা....আমরা দুঃখিত।”

রিতু হাত ছাড়িয়ে নিয়ে মেঝেতে বসে পরে ‌। প্রিতম তাকে কিছুক্ষণ দেখে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ইনায়ার দিকে তাকায়, যে ছলোছলো চোখে তাকেই দেখছিলো।

প্রিতম বললো,“ইনু যাবে? নাকি মায়ের কাছে দু'দিন থাকবে?”

ইনায়া সাথে সাথে উঠে দাঁড়ায়। সে যাবে। অবশ্যই যাবে।

_____

ইনশিরাহও গিয়েছে প্রেরণাদের সাথে,আলোর কথাতে। ওরা প্রনমিকে নিয়ে মিনিট পাঁচেক আগেই বেরিয়েছে ।
বর্তমানে শান্তিনীড়ের বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোকপাত করা যাক,

নিচতলার লিভিং রুমে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় বসে আছে বাড়ির বড়রা।

ইহান তাদের থেকে কিছুটা দূরে বসে আছে মেঝের দিকে দৃষ্টি দিয়ে।

রিতু মেঝেতে হাত পা ছড়িয়ে বাচ্চাদের মতো কেঁদে চলেছে, বারবার স্বামীকে বলছে,“এভাবে কিভাবে বসে থাকতে পারছেন? অ্যাডভোকেট রিমনকে কেন কল করছেন না? কেন?”

_কেন? কি দরকার?

_কি দরকার? অন্তত জামিনটা করিয়ে আনুন না।

_প্রয়োজন নেই। কোনো প্রয়োজন নেই, যা করেছে,একটু ভুগুক।

স্বামীর এহেন কথায় রিতু আঁতকে ওঠে, পরপর দু'চোখের পানি মুছে বলে,“খুব নীতি কথা এখন তাইনা? খুব নীতি কথা আপনাদের কয় ভাইয়ের? আর আপনারা যা করেছিলেন তার শাস্তি পেয়েছিলেন? নিজে কি ছিলেন আপনি?”

সন্তানের শোকে রিতু কি বলে যাচ্ছিলো সে নিজেও জানে না, ইশমাম রিতুকে ধ'ম'কে ওঠে,“ভাবী স্টপ! ইহান এখানে আছে।”

ইহান একটা লম্বা শ্বাস ফেলে উঠে সেখান থেকে চলে যায়। মুঈনের নাম্বার ডায়াল করে সে তাকে ফোন দেয়।

ইলহাম মলিন মুখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ছিলো। আলো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামিনের দিকে তাকায়,বলে,“তোর বড় মা'কে এভাবে বিয়ে করেছি,ওভাবে বিয়ে করেছি। এসব বলে একটা অপরাধকে রোমান্টিসাইজ করেছেন, আমি বারবার ছেলেমেয়েদের সামনে ওসব তুলে আপনাকে খোটা দিয়েছি। আমরা দায়ী এমন দিনের জন্যে মেয়র সাহেব। কত বড় ভুল আমাদের ।”

ইলহাম মাথা তুলে তাকায় আলোর দিকে,বলে,“ভাবী ,ওর বখে যাওয়ার পেছনে পরিবেশ পরিস্থিতি কিছুই এমন ছিলো না, এসব তোমার অযথা কথা। ও কি পায়নি? কোন জিনিসের খামতি ছিলো ওর? আসলে আমাদের রক্তই খারাপ সেটা বলো, এসব বেহুদা কথা বলো না। প্লিজ! আমার কিচ্ছু শুনতে ইচ্ছে করছে না আর!”

____

অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে প্রেরণা প্রনমিকে নিয়ে সরাসরি নিজের রুমে চলে গেলো। ইনশিরাহ আর ইনায়া ছুটে গেলো পিছু পিছু।

প্রেরণা দরজা আটকে বোনকে অতি যত্নে প্রথমে বিছানায় বসালো, কাঁপুনি কমেছে মেয়েটার। দু'হাত বোনের মাথায় বুলিয়ে প্রেরণা প্রনমির দু কাঁধে হাত দু'টো রেখে নরম গলায় বললো,“সোনা,এখন বল। ও কি করেছে তোর সাথে? বল আমায়!”

প্রনমি বলছে না,কেমন অদ্ভুত ভাবে বসে আছে। প্রেরণা আবারও বলছে,“প্লিজ বল! ও তোকে ছুঁয়েছে? বল আমাকে, ছুঁয়েছে কি না এটুকু বল!”

প্রনমি কিছু বলছেই না। প্রেরণার রাগও উঠছে,কান্নাও পাচ্ছে। কাঁপা গলায় চেঁ'চি'য়ে ওঠে বোনের ওপর,“একটু বল তোর দোহাই লাগে।”

প্রনমির দুকাধ ধরে ঝাকুনি দিয়ে চেঁচালো প্রেরণা। ইনশিরাহ ছুটে গিয়ে প্রেরণাকে সরিয়ে আনলো, নরম গলায় বললো,“আপু একটু ঠিক হয়ে নিক আগে!”

প্রেরণা ইনশিরাহর কথা না শুনে আবারও প্রনমিকে ঝাঁকুনি দিয়ে চেঁচালো,“বল!”

ইনশিরাহ আবার টেনে আনলো প্রেরণাকে,“আপু ধীরে সুস্থ জেনে নিবেন।”

_ধীরে সুস্থে?
উঁচু গলায় বলে ওঠে প্রেরণা, আবারও বলে,“ধীরে সুস্থে নয় ইনশিরাহ,আমার তো এখুনি জানতে হবে যাতে অবস্থা বুঝে ওকে একটা ইমার্জেন্সি কন্ট্রাসেপটিভ পিল খাওয়াতে পারি। বুঝতে পারছো কিসের এতো তাড়া আমার সবটা জানার?”

বলতে গিয়ে আবারও কেঁদে ফেললো প্রেরণা। ইনশিরাহ মাথা নিচু করে নিলো, ইনায়া গিয়ে প্রনমিকে ধরলো শক্ত করে।

প্রেরণা বিছানার একপাশে বসলো, হাঁপাতে লাগলো মেয়েটা। দু'হাতে শুধু নিজের চুল টানছে। অসহ্য লাগছে তার, অসহ্য লাগছে পৃথিবীটা।

____

রিতুর আহাজারি আর সহ্য করা যাচ্ছিলো না। শুধু চিৎকার দিয়ে বলছিলো,“অন্তত যান,আমাকে নিয়ে যান। এভাবে কিভাবে পারছেন আপনারা থাকতে?”

ইহান বেড়িয়েছে বাড়ি থেকে। কোথায় যাচ্ছে কাউকে বলেনি সে। সামিনেরা তিন ভাই উদাস হয়ে নিচতলায় বসে আছে। আলো উঠে দাঁড়ালো সেখান থেকে, প্রেশার টা আবারও গোলমেলে ঠেকছে, একটু বিশ্রাম চাই তার। এই পরিবেশ অসহনীয় হয়ে উঠেছে। রিতুকে কোনোভাবেই শান্ত করা যাচ্ছিলো না, হাল ছেড়ে দিয়ে সে-ই দোতলায় উঠে যায়, বিশ্রাম না নিলে যদি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পরে এই পরিস্থিতিতে! বাকিদের এতো ঝামেলা দিয়ে কি লাভ!

নিজের ঘরে যাওয়ার পথে মৃদু গুঞ্জনের আওয়াজ আলোর কর্নগোচর হতেই তার কদম থামলো। সে দাঁড়িয়ে পরেছে ঠিক দ্রীপ্তর ঘরের সামনে। একটা চাপা গোঙানির মতো আওয়াজ হচ্ছে, কে অমন আওয়াজ করছে! পরী নাকি! কিন্তু পরী তো নিচে।

চিন্তিত ভঙ্গিতে আলো দ্রীপ্তর ঘরের দরজা ঠেলে ঢুকলো সেখানে। ঘরের ভেতরটা অন্ধকার প্রায়। ঝাপসা আলোয় যেটুকু আলো দেখলো,ছুটে গেলো সে।
শেহা মেঝেতে পরে আছে কেমন অদ্ভুত ভঙ্গিতে। আলো আঁতকে উঠলো অমন দৃশ্য দেখে। ছুটে গেলো সে মেয়েটার কাছে। মেঝেতে ঝুঁকে বসে শেহার মাথাটা কোলে তুলে কাতর স্বরে বলে,“মা কি হয়েছে! এমন করছিস কেন? তুই অসুস্থ? শরীর খারাপ লাগছে?”

শেহা কিছু বলতে পারছিলো না, শুধু গোঙানির মতো আওয়াজ বেরোচ্ছিল। আলো ওকে বুকের সাথে মিশিয়ে বলে,“মা বল আমায়! কি হয়েছে।”

বড় মামীকে ধরে কাঁপতে লাগলো শেহা,বহু কষ্টে, তার কন্ঠনালী থেকে বেরোলো,“বড় মামী! বড় মামী! আমার মনে হচ্ছে আমি মরে যাচ্ছি!”

চলমান......

পরের পর্ব চারদিন পরে এই সময়ে পাবেন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 37 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন