#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৩৯ [ ১ম অংশ ]
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
[ ১ম অংশ ]
মুঈনকে দেখে সেলের সামনে পাহারা রত কনস্টেবল দু'জন সালাম দিলো। স্যারের এখানে আসার কারণ তারা জানে,তাই অবাক হলো না। মুঈন তাদের সালামের জবাব দিয়ে ভেতরে পা রাখতেই থ'ম'কে দাঁড়িয়ে গেল।
ইনশিরাহ ইরফানের চুল খামচে ধরে ঝাকুনি দিচ্ছি,ইরফান নিজের চুল ছাড়াতে না পারায় পালটা ধরলো ইনশিরাহর চুল। হতভম্ব ইহান চোখ বড় বড় করে ভাইবোনের দিকে তাকিয়ে আছে।
মুঈন বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখলো ওদের কয়েক মুহূর্ত, পরপর গম্ভীর স্বরে বললো,“হেই! হোয়্যাটস গোয়িং অন।”
থেমে গেলো দু'জনেই, ছেড়ে দিলো একে অপরের চুল। ইনশিরাহ লাফিয়ে কয়েক কদম পেছনে চলে যায়। মুঈন রীতিমতো হতাশ এদের আচরণে, কথা না বাড়িয়ে ইহানকে বললো,“যদি চাও আমার অফিসে এসো। এখানের পরিবেশ ভারি অদ্ভুত!”
ইহানকে দেখে ঠোঁট প্রশ্বস্ত করা একটা হাসি দিল মুঈন। বিনিময়ে ইহান সামান্য হাসলো। কেবিনে ঢুকে চেয়ারে বসলো ইহান। ইনশিরাহ মুঈনের কেবিনের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে, তার দ্বিধা হচ্ছে, ঢুকবে কি ঢুকবে না এটা নিয়ে। একটু আগের ঘটনায় সে লজ্জিত।
মুঈন একপলক দৃষ্টি দিলো ইনশিরাহর দিকে, ইহান তখন ঘা'ড় ঘুরিয়ে ইনশিরাহকে বললো,“কিরে আয়!”
গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল ইনশিরাহ, পা-মাথা অস্বস্তি নিয়ে বসলো ইহানের পাশের চেয়ারটাতে। মুঈন মাত্র কয়েক পলকে খুব নিখুঁত ভাবে দেখে নিলো ইনশিরাহর ভেজা গাল,ফোলা চোখ। টমবয় বসে আছে মাথা নিচু করে। জানালার কাঁচ গলিয়ে শেষ বিকেলের কমলা রঙের রোদ এসে ভেজা গাল দু'টোতে লালচে আভা এনে দিয়েছে। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না মুঈন, অদৃশ্য কেউ যেন হঠাৎ তাকে বললো,“মুঈন ইয়র টাইম ইজ ওভার! এবার চোখ সরাও। অত বেশী তাকিয়ে থাকাটা দৃষ্টিকটূ।”
মুঈন চোখ সরিয়ে ইহানের দিকে তাকিয়ে বললো, “বিধ্বস্ত লাগছে তোমাকে।”
ইহান ম্লান হাসলো,বললো না কিছু। মুঈন বলতে লাগলো,“ভাইয়ের সাথে কথা হলো ভালো মতন?”
_হ্যা।
কনস্টেবলকে তিন কাপ চা দিতে বলে মুঈন আবারও ইনশিরাহর দিকে একপলক দৃষ্টি দিলো, তারপর ইহানের দিকে তাকিয়ে বললো,“আমি তোমাদের পরিবারের কিছু নির্দিষ্ট লোককে এতদিন অদ্ভুত ভাবতাম, এখন দেখছি সবাই অদ্ভুত!”
ইনশিরাহ মুঈনের এই কথাটায় মাথা তুলে একবার তাকালো। ইহান শুকনো গলায় জানতে চায়,“আমিও অদ্ভুত?”
_তুমি সবথেকে বেশি অদ্ভুত ইহান।
চা খেতে খেতে ইহান স্মিত হাসলো। মুঈন বলতে লাগলো,“আমি ব্যক্তি ইহানকে চিনি, এই ভাই ইহানটা খুব অদ্ভুত। পুরোটাই আমার চেনা ব্যক্তি ইহানের বিপরীত।”
ইহান এবারও জবাব না দিয়ে ম্লান হাসলো, মুঈন বলে,“দুর্বল খুব ওদের প্রতি?”
_ঠিক দুর্বল না, আমার মনে হয় ওরা আমিই,আমিই ওরা।
চায়ের কাপে চুমুক দেয় মুঈন,“হুম বুঝলাম। আসলে এসব সম্পর্কের অনুভূতির ব্যাপারে কোনো আইডিয়া নেই,বিকজ আই নেভার হ্যাড আ ফ্যামিলি। আমি খুব কম ফিল করতে পারছি তোমাকে, তোমাদের ইউ নৌ!”
একটু থেমে মুঈন আবারও বলতে লাগলো,“ইরফানের কথায় আসি! ওনারা এখনো কেস ফাইল করেননি,তবে তোমরা যদি জামিন করিয়েও নাও,তাতে লাভ হবে না। সর্বোচ্চ দুদিন বাইরে থাকতে পারবে।”
একটা লম্বা শ্বাস ফেললো ইহান। মুখমণ্ডল নিমিষেই পাংশুবর্ণের হয়ে গেল।
মুঈন তা দেখে বলতে লাগলো,“কেন? এতোটা অধঃপতন কেন ইহান? মির্জা বাড়ির ছেলে ও, তোমার ভাই ! সামিন বাবা, ইলহাম আংকেল, ইশমাম আংকেল! এতো সুন্দর একটা পরিবার। এতোটা অধঃপতন কেন!”
ইহান হাত থেকে চায়ের কাপ রেখে বললো,“অ্যারিস্টোটালের ট্রাজেডির সংজ্ঞাটা মনে আছে?”
_আছে।
_এজন্যই ! অথবা আমার দিকটা আমি ক্লিয়ার করতে পারি, আমি না কখনো ভালো সোলজার ছিলাম, না কখনো ভালো অভিভাবক উঠতে পেরেছি। আই ওয়াজ আ লুজার দেন অ্যান্ড স্টিল আই অ্যাম! প্রমানিত হলো।
ইনশিরাহ বিবর্ণ মুখ নিয়ে দাদানের দিকে তাকায়, দাদানের মলিন মুখটা তাকে ব্যাথিত করে।
মুঈন সব প্রসঙ্গ পাল্টে বললো,“আফসোস হয় চাকুরী টা ছেড়ে?”
_না ভালো লাগছে। সবাই খুশি আমার সিদ্ধান্তে।
_আর তুমি?
_খুশি, দমবন্ধ লাগতো ঐ ইন্সিডেন্টের পরে, এখনও লাগে সময়ে অসময়ে।
থামলো মুঈন, খানিকবাদে ইহানের মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,“ইরফানকে নিয়ে আমি কোনো হেল্প করতে পারবো না ইহান, আমার পেশাগত নীতি ছাড়াও ব্যক্তিজীবনে আমি কিছু নীতি মেনে চলি, তবে অ্যাজ আ ফ্রেন্ড আমি বলবো, ঐ ভদ্রমহিলাকে রিকোয়েস্ট করে দেখো কি হয়। যদি কিছু না হয়,তবে ইরফানের রায়ের কাগজে সীল বসাতে আমার হাত কাঁপবে। এছাড়া আর কোনো সহমর্মিতা পাচ্ছো না আমার থেকে। আ'ম রিয়েলি ভেরী স্যরি ডিয়ার ফ্রেন্ড!”
শূন্য দৃষ্টিতে ইহান তাকিয়ে আছে মুঈনের দিকে। মস্তিস্ক ফাঁপা লাগছে তার। কানের কাছে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বালক ইরফানের খিলখিল হাসি, চেঁ'চি'য়ে বলা,“দাদান এসো আমরা চোর পুলিশ খেলি। তুমি পুলিশ,আমি চোর। পারলে আমাকে অ্যারেস্ট করো দাদান। আমাকে জেলে ঢোকাও।”
_____
প্রনমিকে দু'চামচ স্যুপ খাইয়ে দিতে পেরেছে প্রেরণা। মেয়েটা কিছুই খেতে চাচ্ছে না , শুধু চুপচাপ বসে থাকে। প্রেরণা,প্রিতম,মিস জেনি বহু চেষ্টা করেছে একটু স্বাভাবিক কথা বলাতে, পারছে না। এমন আতঙ্ক একটা রাতে পেলো মেয়েটা! বোনের দিকে অসহায়ের মত তাকিয়ে আছে প্রেরণা। গর্ব নয়, তবে প্রনমির মতো ভুবনমোহিনী সুন্দরী তরুণী প্রেরণা আশেপাশে দেখে না। প্রেরণাও সুন্দরী, বয়স বাড়ার সাথে সাথে সে সৌন্দর্যে ভাটা পরছে।
দিনকে দিন চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য পাচ্ছে প্রনমি। এই অমায়িক লাবন্যতায় পরিপূর্ণ মেয়েটার জীবনটা কত মলিন। যে সুযোগ পাচ্ছে, মেয়েটাকে মলিন করে দিতে চাচ্ছে।
কথাগুলো ভাবতেই হঠাৎ ইরফানের রাগী রাগী উগ্র চেহারাটা প্রেরণার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ঘৃণায় দাঁতে দাঁত চাপে প্রেরণা।
প্রনমিকে রেখে প্রেরণা ঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিং রুমে চলে আসে। ইনায়া চুপচাপ বসে আছে সেখানে। মেয়েটা সেই সকাল থেকে খায়নি। বসে বসে ভেজা চোখ মুছছে বারবার।
ওকে কিছুক্ষণ দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রেরণা নিজের ঘরে যেতে নিলেই হঠাৎ কলিং বেল বেজে ওঠে।
দরজা খুলতেই ভীষণ অবাক হয়ে যায় প্রেরণা, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে বারো তেরোজন ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলা।
প্রেরণা হতভম্ব হয়ে বলে,“আপনারা কারা!”
সবার সামনে দাঁড়ানো ভেজা চোখ নিয়ে একজন ভদ্রমহিলা বললেন,“আমি শিখা ভট্টাচার্য। ইরফানের বন্ধু অধরার মা।”
প্রেরণা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো। ভেতর থেকে প্রিতম,ইনায়া,মিস জেনি এসে দাঁড়ায় সেখানে। ইনায়া ওনাদের প্রত্যেককে চেনে, ভীষণ রকম অবাক হয়ে বলে,“আন্টি, আংকেল,আপনারা!”
_____
সন্ধ্যা নাগাদ শান্তিনীড়ে ডক্টর এলো। বিকেল থেকে শেহার গাঁয়ে জ্বর। প্রবল জ্বরে রীতিমতো কাঁপছে মেয়েটা। একটু পরপর শুধু জানতে চাইছে,“বাবা কেনো আসছে না।”
শান্ত রওনা দিয়ে দিয়েছে ইতোমধ্যে, শেহার ঘরে পরী আর ইশমাম বসে আছে শেহার মাথার কাছে। সামিন,আলো নিচতলায়।
নিস্তব্ধতায় ছেয়ে আছে এতো বড় বাড়িটা। খাওয়া-দাওয়া হয়নি কারো। ইলহাম মির্জা গো ধরে বসে আছে থানায় যাবেনা, কোনো উকিল সে হায়ার করবে না।
আলো বারবার ইহানকে কল করছে,ওদিক-কার কথা জানতে। ইহান কল টা রিসিভ করছে না।
ফোনটা রেখে আলো সোফাতে গা এলিয়ে দিয়ে দুচোখের পানি ছেড়ে দেয় নিশ্চুপ। কোনো শব্দ নেই তার কান্নার। গোটা বাড়িটা আজ কেমন দমবন্ধ লাগছে। কেমন গুমোট হয়ে আছে চারিদিক। ছেলেটার কথা ভেবে বুকটা খা খা করছে। কানে বাজছে ছেলেটার খুনসুটি মাখানো কথাগুলো,“অদ্রিতা আলো। আমি তোমার শশুর ইমতিয়াজ মির্জা বলছি।”
ঢুকরে কেঁদে ওঠে আলো,পাগল ছেলেটা নিজের কতবড় সর্বনাশ করলো! এই আক্ষেপে শেষ হয়ে যাচ্ছে সে। সামিন এসে স্ত্রীর পাশে বসে কিছুক্ষণ দেখলো তাকে,একটা হাত কাঁধে রেখে নরম গলায় বললো,“কেদো না, ইহান যাচ্ছে উকিলের সাথে কথা বলতে, তুমি যাও,রিতুকে সামলাও।”
তক্ষুনি দোতলা থেকে ত্রস্ত পায়ে নেমে আসে ইলহাম মির্জা, আলোর দিকে তাকিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে,“ভাবী রিতুকে দেখেছো? ও বাড়িতে কোথাও নেই!”
অ্যাডভোকেট রিমনের চেম্বারে দীর্ঘসময় বসে আছে ইহান এবং ইনশিরাহ। তাদের সামনে দুকাপ কফি। সুপরিচিত ক্রিমিনাল লইয়ার রিমন তালুকদার স্বভাবের দিক থেকে যতটা ধূর্ত, ততটাই কৃপণ। লোক মুখে শোনা যায় উনি এতোটাই কৃপণ যে একটা টি-ব্যাগ দুবার করে ব্যাবহার করেন এই অতি বদ ভদ্রলোক, তবে উকিল হিসেবে পেশাদার এবং মেধাবী। ফাঁসির দড়ি থেকে আসামী বের করে আনা তার বা হাতের খেল। সে-ই কৃপণ উকিল কখনোই মক্কেলকে দুপয়সার চা খাওয়াতে ইচ্ছুক নয়, তবে তার এই মক্কেল তার কাছে বিশেষ। সোনার ডিম পারা হাস। মির্জারা সোনার ডিম পারা হাস-ই বটে।
ইহান বারবার হাতঘড়িতে সময় দেখছিলো, অ্যাডভোকেট রিমন তালুকদার হঠাৎ কেশে ইহান ইনশিরাহর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তারপর গোঁফে হাত বুলিয়ে বলে ওঠে,“সব-ই বুঝলাম মিস্টার মির্জা, এখন আপনাকে খোলাখুলি আমি পাঁচটা লাইন বলবো। এই পাঁচ লাইন ব্যাতীত আমার কিছু বলার নেই, আপনি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।”
ইহান ইনশিরাহ নড়েচড়ে বসে। কফির কাপে চুমুক বসিয়ে বেশ শব্দ করে কাপটা টেবিলে রেখে, একদলা থুতু অ্যাশট্রেতে ফেলে রিমন।
ইনশিরাহর গা গুলিয়ে উঠলো এই দৃশ্য দেখে। রিমন বলতে লাগলো,“আপনার ভাইয়ের বন্ধুদের একসপ্তাহে জামিন হবে, বাকি রইলো আপনার ভাই, আমি প্রমাণ করে দেবো আপনার ভাই একজন সম্পূর্ণ মানসিক রোগী, একেবারে টাটকা প্রমাণ দেবো আদালতকে। আপনারা নাকে তেল মেখে ঘুমাবেন শুধু, আপনার ভাইকে কোর্ট থেকে ছাড়িয়ে আনার দায়িত্ব আমার। কিছুদিন মেন্টাল হসপিটালে পরে থাকতে হবে আপনার ভাইকে, এই ধরুন হপ্তাখানেক। তারপর ভাইকে একেবারে বিদেশ পাঠিয়ে দেবেন। একেবারে স্মুদ পরিকল্পনা,আপনারা ত্রিশ লক্ষ টাকা আমার অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দিন।”
ইহান তাকিয়ে আছে রিমনের দিকে, রিমন বলতে থাকলো,“অত ভাবছেন কি! মির্জাদের পকেট ঝাড়া দিলে ত্রিশ লাখ টাকা এমনিই পরে যায়, যান তবুও সময় দিলাম, ভাবুন। ত্রিশ লক্ষ টাকা এবং হপ্তাখানেক পাগলের হাসপাতালে থাকার মানসিক প্রস্তুতি নিতে বলুন আপনার ভাইকে। যান।”
_____
প্রেরণার হাত কপালে ঠেকিয়ে ধরে কাঁদছে অধরার মা শিখা। হুহু করে কাঁদছে ভদ্রমহিলা। বুকফাটা আর্তনাদ করে বলছে,“মা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আউট অব দ্য সিটি। উকিলের সাথে কথা বলেও সাময়িক জামিন করাতে পারিনি। তুমি একটু দয়া করো, একটু!”
প্রেরণা নিশ্চুপ তাকিয়ে আছে অধরার মায়ের দিকে, তাকায় তার লিভিং রুমে দাঁড়ানো প্রত্যেকটা মানুষের দিকে, নিজেদের সন্তানের হয়ে আকুতি মিনতি করতে এসেছেন যারা।
শিখা বলতে লাগলো,“দুদিন মেয়েটা লকাপে আটকে থাকবে মা! ওর এক সপ্তাহ পর বিয়ে, সাত বছরের সম্পর্ক দুজনের, বিয়েটা ভেঙে যাবে মা।”
প্রেরণা তখনও নিশ্চুপ। প্রিতমও পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সৌভিকের বাবা একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি, সে বলতে লাগল,“মা, যাস্ট টেল মি ক্ষতিপূরণ হিসেবে কি চাও। আমরা প্রস্তুত,সবাই প্রস্তুত, তুমি শুধু অ্যামাউন্ট টা বলো.....”
প্রেরণার চোখ কপালে তুলে ফেললো, হতবাক হয়ে বললো,“অ্যামাউন্ট? আঙ্কেল একটা গোটা রাত মেয়েটা ভুগলো। একটা ফাঁকা বাড়ি, অতগুলো ছেলে। ধরুন যদি গতকাল রাতে বিয়ে না হয়ে ভয়ংকর কিছু ঘটতো আমার অসহায় বোনটার সাথে? তখনও অ্যামাউন্টের কথা বলতেন? বলুন!”
প্রেরণার এই একটা কথাতে চুপ হয়ে যায় সবাই। শিখা তবুও কেঁদে বুক ভাসাচ্ছিলো। প্রেরণা একজন মায়ের অমন কান্না সহ্য করতে পারছিলো না, সে প্রিতমের দিকে তাকায় একবার। প্রিতমও দ্বিধা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
শিখা হুট করে প্রেরণার পায়ে পরলো, হতভম্ব প্রেরণা লাফিয়ে তিনপা পিছিয়ে যায়, আবার এসে শিখাকে টেনে তোলে। দু'হাতে শিখার বাহু ধরে উঁচু গলায় বলে,“হচ্ছে টা কি আন্টি! আর ইউ আউট অফ ইয়র মাইন্ড?”
_একটু দয়া করো মা, একটু! আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো।
প্রবল বেগে কাঁদতে কাঁদতে বলল শিখা।
প্রেরণা কিছুক্ষণ ঘুরে ঘুরে দৃষ্টি ফেললো তার লিভিং রুমে দাড়িয়ে থাকা ভদ্রমহিলা ও ভদ্রলোকদের দিকে। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল তার ভেতর থেকে। কিছুক্ষণ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ক্লান্তস্বরে, অস্ফুটে বললো,“আপনারা যান। কাল সকালে নিজেদের গুণধর বাচ্চাদের বুকে ফিরে পাবেন। এক নম্বর আসামি রেখে বাকিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নেবো আমি। যান, যান প্লিজ। আমি একটু বিশ্রাম নিতে চাচ্ছি! দোহাই লাগে আপনারা যান।”
বিশ্রাম নেয়া আর হয়ে ওঠে না প্রেরণার। সন্ধ্যার দিকে প্রনমির কাছে গিয়ে একটু শুয়েছিলো শুদ্ধকে নিয়ে, প্রেরণা ভেবেছে প্রনমির সামনে শুদ্ধর সাথে খুনসুটি করলে যদি একটু মেয়েটা সারা দেয়। প্রিতম বেরিয়েছিল তখন, প্রনমির পছন্দের পেস্ট্রি আনতে। প্রেরণার ফোনে কল এলো সাব্বিরের, এতো ঝামেলায় প্রেরণা ভুলেই বসেছিল রেস্তোরাঁর কথা। সাব্বিরকে বলেছিল দালান দেখতে। কলটা রিসিভ করতেই সাব্বির বলে,“ম্যাম গুড নিউজ। দু'টো অপশন পেলাম। ঝিলবাড়ির নিউটাউন মলের নাইনথ ফ্লোর আর রিভানার টেন্থ ফ্লোর।”
মেজাজ বিগড়ালো প্রেরণার। চেঁচিয়ে উঠলো সাব্বিরের ওপর,“আর ইউ আউট অফ ইয়র মাইন্ড সাব্বির? ওটা ভাতের হোটেল আমার,কোন আহাম্মক রিভানার দশতলায় আর নিউটাউনের নয় তলায় গিয়ে ভাত খাবে? মাছি উড়বে আমার হোটেলে সাব্বির, তোমাকে গ্রাউন্ড ফ্লোর দেখতে বলা হয়েছে বানিজ্যিক এরিয়ায়, আর তুমি নয়তলা, দশতলা করছো। ভাই এতো জ্বালিও না আমাকে তোমরা সবার মতো,আমি ছাদ থেকে লাফ দেবো তবে। একটু আমার প্রতি সদয় হও। একটু মন দিয়ে আমার কথা শুনবে,সে অনুযায়ী কাজ করবে। দুদিনের মধ্যে একটা ব্যবস্থা করো নয়তো মহাসড়কের পাশে ছাপড়া দিয়ে হোটেল খুলবো,পরে করো সেই হোটেলের ম্যানেজার গিরি ইউ ইডিয়ট!
চেঁচিয়ে কথাগুলো শেষ করে হাপাচ্ছে প্রেরণা। ফোনের ওপাশে সাব্বির চুপসে গেল,ভীত কন্ঠে বললো,“ঠিক আছে ম্যাম। রাখছি।”
ফোন কে'টে ধপ করে বিছানায় বসে পরলো প্রেরণা।
এশার আজান শেষ হবার সাথে সাথে কলিং বেল বেজে ওঠে।
নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে প্রেরণা গিয়ে দরজা খুলে দিতেই দেখতে পায় দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে রিতু।
একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে প্রেরণা রিতুর দিকে, অস্পষ্ট বিড়বিড়ালো,“আন্টি আপনি!”
বলে সময় নিতে পারলো না প্রেরণা, রিতু ভেতরে ঢুকে আচমকা প্রেরণার হাত দু'টো আগলে নিয়ে কান্নায় ভে'ঙে পরে।
এমন ভাবে কাঁদছে ভদ্রমহিলা,প্রেরণার অ্যাপার্টমেন্টের দেয়ালে আওয়াজ বারি খেয়ে গুমোট হয়ে উঠেছে পুরো অ্যাপার্টমেন্ট।
ক্লান্ত প্রেরণা ক্রন্দনরত রিতুর দিকে তাকিয়ে আবারও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, মুহুর্তেই দ্বিগুণ ঘৃণা বেড়ে যায় ইরফানের প্রতি।
কত বড় বাড়ির বৌ, রাজার ঘরের রানী বলা চলে ভদ্রমহিলাকে, ছেলের অপকর্মের দরুন কতটা ভুগছেন। প্রেরণার মতো তুচ্ছ মেয়ের হাত ধরে আকুতি মিনতি করছেন। শুকনো মুখটা নিয়ে প্রেরণা তাকিয়ে থাকে রিতুর দিকে। রিতু একটু দম নিলো, অস্ফুটে আওড়াল,“আমার ছেলেটাকে ক্ষমা করো মা।”
রিতুর একটা হাত ধরলো প্রেরণা। এখন কথা বলার মতো শক্তিও নেই তার গায়ে, রিতুকে টানতে টানতে নিয়ে সোফায় বসালো, বিনম্র স্বরে বলল,“বসুন আন্টি। শান্ত হোন।”
রিতু শান্ত হয়না, কান্নার বেগে শরীর কাঁপছে, আবারও প্রেরণার হাত দু'টো ধরে বলে,“ওকে তোমাদের ত্রিসীমানায় আসতে দেবো না মা। তুমি,তুমি একটু সদয় হও। আমার প্রতি হও।”
_আন্টি কেনো এমন অন্যায় আবদার করছেন? আপনি না মেয়ে? আপনি বুঝতে পারছেন না আমাদের কোথায় লেগেছে? আন্টি সারারাত আমার বোনটাকে আটকে রেখেছে, মানসিক টর্চার করেছে....
_সব মানি,সব মানি মা... কিন্তু আমার মায়ের মন যে মানছে না। ছেলেকে ওভাবে দেখতে পারবো না আমি। আমি মরে যাবো।
প্রেরণা নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললো,
_চুপ করুন আন্টি, শান্ত হোন। এটা হয়না,এতো বড় ক্রাইমের শাস্তি ওকে পেতেই হবে।
চলমান....
[ ২য় অংশের লিংক কমেন্টে ]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৩৯ [ ২য় অংশ ]
#ইসরাত_ইতি
[ ২য় অংশ ]
( ১ম অংশের লিংক কমেন্টে )
রিতুর কান্না আর নিতে পারছেনা প্রেরণা, ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে মাথায়,আর ভালো লাগছে না এসব কিছু।
রিতু পুনর্বার বলে ওঠে,“ওকে ক্ষমা করো! ওকে রিহ্যাবে পাঠিয়ে দেবো মা। কখনো তোমাদের পরিবারের কোনো ক্ষতি ও করবে না!”
কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রিতুকে দেখে প্রেরণা বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলে ওঠে,“এটা অনেক আগে করার ছিল আপনাদের আন্টি। না আমার বোনটা ভুগতো, না আপনারা ভুগতেন।”
_কিভাবে? মা তুমিই বলো কিভাবে করতাম? একসাথে বাড়ির চারটা বাচ্চা বড় হলো, একই পরিবেশে, একই শিক্ষায়। ওর রাগটা ছিল বেশি, কিন্তু পরিবারের প্রতিটা সদস্যের প্রতি ওর খেয়াল দেখে কিভাবে বুঝতাম এই ছেলে এমন কান্ডজ্ঞানহীনের মতো করে বসবে একদিন? বোনদের ব্যাথায় কাঁদে,ভাইয়ের কিছু হলে জান বের করে দেয়, প্রতিটা সম্পর্ককে নিখুঁত ভাবে বহন করা ছেলেটাকে কিছু ত্রুটির দরুন রিহ্যাবে দিয়ে দেওয়া আদৌও সম্ভব একটা পরিবারের পক্ষে? পারে কেউ মা?”
_সেই-ই তো! তখন সম্ভব ছিলো না, আজ সম্ভব হলো । প্রতিটা সম্পর্ককে নাকি নিখুঁত ভাবে বহন করে আপনার ছেলে অথচ বিয়ের মতো একটা সম্পর্ক নিয়ে তামাশা করে দিলো গুন্ডাদের মতো। শুধু মাত্র প্রিতমের থেকে শোধ তুলতে....
কথাটা শেষ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দেয় প্রেরণা, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে রিতুর হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় প্রনমির ঘরে। ততক্ষণে প্রনমি ঘুমিয়ে গিয়েছে, গায়ে একটা লাল রঙের একটা ফ্রক তার। চুলে দু'টো বেনী করে দিয়েছে মিস জেনি।
রিতু দেখছে ঘুমন্ত প্রনমিকে। প্রেরণা বললো,“সাজ পোশাক দেখে একেবারে বাচ্চা একটা মেয়ে মনে হচ্ছে না আন্টি? ওর বয়স আঠারো। তবুও কিন্তু ও বাচ্চা-ই, পৃথিবী টাকে চোখেও বেশি দেখেনি, অনুভব করেনি নিজের মন দিয়ে। নিজের ভেতর গুটিয়ে থাকে মেয়েটা, সারাক্ষণ শুধু ছটফট করে একটু সবার মতো করে বাঁচতে। কিন্তু তা তো সম্ভব না। জানেন,বেশ ভালো গান করে আমার বোন, ওর দুনিয়া বলতে এটুকুই। কেউ ওর গানের একটু প্রশংসা করলে কি যে ভীষণ খুশি হয়! ওর জীবনে আছেই বা কি এটুকু ছাড়া খুশি হওয়ার? আমি আর প্রিতম তো তবুও বাবা আর মাকে দেখেছি,ওর তো ওনাদের স্মৃতিও নেই। এতটুকু বয়সে মেয়েটা এতিম হয়েছে, ছয় বছর বয়সে পুরুষের নৃশংস রূপ দেখেছে। তবুও এই বাচ্চা মেয়েটা এ পর্যন্ত এসেছে। আপনি এখন বলুন, আন্টি মন থেকে বলবেন কিন্তু দোহাই আপনার.... আপনার ছেলে কি ক্ষমার যোগ্য? আন্টি ও দেখলোও না মেয়েটা অন্ধ? অসুস্থ? একটা বাচ্চাবয়সী মেয়ে! দেখলো না আপনার ছেলে? এতো রাগ? এতো ক্রোধ আমাদের ওপর?”
প্রেরণার গলা কাপে বলতে গিয়ে। ইনায়া এসে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। দেখছে ননদ আর মেজো মাকে। রিতু কাঁদছে। প্রেরণা আবারও বলে,“বলুন আন্টি আপনার ছেলে কি ক্ষমার যোগ্য? একটা মেয়ে হয়ে যদি আপনি অকপটে বলতে পারেন,আমি এখুনি গিয়ে ইরফানের নামে কমপ্লেইন তুলে নেবো। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ওকে বের করবো লকাপ থেকে।”
দৃঢ়তা প্রেরণার কন্ঠে। রিতু কিছু বলতে পারছে না, তার যে কিছু বলার নেই,শুধু মুখে আঁচল চে'পে কাঁদছে। প্রেরণার ভীষণ মায়া লাগছে রিতুর জন্য। একহাতে আগলে ধরলো সান্ত্বনা দিতে। একটু দম নিয়ে রিতু বলে,“একটা মেয়ে আসেনি প্রেরণা, একজন মা এসেছে, ব্যক্তিত্বহীনা মা। যে মায়ের কোনো আদর্শ নেই, শুধু বুক পোড়ে সন্তানের জন্য যার।”
আর কথা বলতে পারছেনা রিতু। হাপাচ্ছে। প্রেরণা রিতুকে ধরে রেখে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলে,“পানি নিয়ে এসো।”
ইনায়া ছুটে যায় পানি আনতে। প্রেরণা রিতুর দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে এবার, রিতু টলছে। কেমন অদ্ভুত মুখভঙ্গি। প্রেরণা উৎকণ্ঠা নিয়ে বলে,“আন্টি ঠিক আছেন? আন্টি!”
রিতু আর কিছু বলতে পারলো না, প্রেরণার গায়ে ঢলে পরলো।
_____
ইহান ইলহামের কল পেয়ে ইনশিরাহকে নিয়ে উকিলের চেম্বার থেকে বেরিয়েছে । বারবার রিতুর নাম্বারে কল করেও রিতুকে পেলো না ইহান। একটার পর একটা দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘুরছে সে,তার ওপর মাম্মার দুশ্চিন্তা! ওদিকে আগামীকাল থেকে পার্টির সম্মেলন। সে না হয় বাকিরা সামলে নেবে, এটুকু ভরসা!
ইনশিরাহকে নিয়ে ইহান বাড়িতে ফিরছিল রাত দশটার দিকে, শেষবার গিয়েছিলো থানায়ও,ভাইকে দেখতে। পথিমধ্যে ফোনে কল এলো প্রিতমের। রিতুর খবর পেয়ে দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে ইনশিরাহ আর ইহান ছুটে গেলো প্রেরণার অ্যাপার্টমেন্টে।
অচেতন রিতুর মাথার কাছে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল প্রেরণা। ইনায়া হাতে পায়ে মাসাজ করছে। স্ট্রেস নিতে না পেরে এমনটা হয়েছে খুব সম্ভবত। মিস জেনি তার টোটকা এনে প্রেরণার হাতে দেয়,প্রেরণা সেটা রিতুর মাথায় লাগিয়ে মৃদু আওয়াজে ডাকে,“আন্টি! শুনতে পাচ্ছেন আন্টি!”
প্রিতম অদূরেই শুকনো মুখে বসে আছে। একবার রিতুকে দেখছে, একবার ইনায়াকে।
রিতুর জ্ঞান ফিরে আসার আগেই ইহান আর ইনশিরাহ এলো। প্রেরণার সাথে ইহান ইরফানের হয়ে কোনো অনুরোধ করলো না, তার বাঁধল খুব। শুধু গম্ভীর কন্ঠে মাম্মাকে বললো,“বাচ্চামো করছো! চলো।”
প্রেরণা চেয়ে চেয়ে দেখলো তাকে। ইহান শুকনো মুখে বললো,“আসছি!”
রিতু নিস্তেজ হয়ে ছিলো বাকিটা সময় । শুধু শেষ বারের মত প্রেরণার চোখের দিকে আকুতি নিয়ে তাকালো, প্রেরণা অমন অসহায় দৃষ্টির দিকে চেয়ে থাকতে পারলো না বেশিক্ষণ, চোখ নামিয়ে নির্লিপ্ত হয়ে থাকলো মেয়েটা। মনে বড় দোলাচল শুরু হলো প্রেরণার। ভীষণ বাজে অবস্থা সেখানে ।
______
রাত তখন বারোটা বেজে ঊনচল্লিশ মিনিট। ক্লায়েন্টদের জমে থাকা কাজ গুলো সম্পূর্ণ করে প্রিতম উঠে দাঁড়ায়। বিয়ের পরের দিনই রুম থেকে তার কম্পিউটার সরিয়ে গেস্টরুম টাকে তার ওয়ার্কিং রুম করেছে, বেশি রাত জেগে কাজ করতে হয় প্রিতমের,ইনুর ঘুমের অসুবিধা হয় তাই।
লিভিং রুমের বাতি জ্বলছে, জ্বলছে প্রনমির ঘরের বাতিও। নিশ্চয়ই আপু জেগে আছে সেখানে। প্রিতম গেলো না আর ওদিকটায়। সোজা রুমে ঢুকে দেখলো ইনু তখনও জেগে আছে, চুপচাপ শুয়ে আছে সিলিংয়ের দিকে দৃষ্টি দিয়ে। দরজা বন্ধ করে,বাতি নিভিয়ে, চশমা খুলে রেখে,বেড সাইড ল্যাম্প জ্বেলে প্রিতম শুয়ে পরলো বিছানায় । ঘা'ড় ঘুরিয়ে ইনায়াকে দেখলো, ইনায়া নিশ্চুপ। প্রিতম ওকে দেখতেই থাকলো, ভীষণ মায়া লাগলো মেয়েটির প্রতি। সারাদিনে কম ধকল যায়নি মেয়েটার ওপর থেকে। এর পেছনে ছোটাছুটি,ওকে সামলানো,তার খেয়াল রাখা, রান্না দেখা, সবাইকে খাওয়ানো,শুদ্ধকে দেখভাল করা,প্রনমির যত্ন,আরো কতো কি! বড়লোকের দুলালী, কখনো এতো কাজ করেছে কিনা,এতো এতো দায়িত্ব পালন করেছে কিনা সন্দেহ! এই নরম হাতে কত কি করেছে আজ।
প্রিতম এগিয়ে গেলো ইনায়ার কাছে। একহাতে তাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে ইনায়ার ঘাড়ে মুখ গুজে দিল। এবং ওভাবেই থাকলো কিছু সময়, তারপর অস্ফুটে বললো,“শরীর খারাপ লাগছে?”
নির্লিপ্ত ইনায়া কোন জবাব দেয় না। তার কোনো নড়চড় নেই। প্রিতম মাথা তুলে ইনায়ার দিকে তাকালো, কয়েকপলক তাকে দেখে প্রিতম একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ইনায়ার কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলতে লাগলো,“ইনু, লিসেন, আমি চাইনা কোনো তৃতীয় ব্যাক্তির কারণে আমাদের দুজনের মধ্যে কোন মান অভিমান আসুক, বা দূরত্ব বাড়ুক। এমন দিন দেখার জন্য আমি সেদিন পাগলামি করিনি। এতোটা ঠুনকো নয় আমাদের সম্পর্ক আশা করি! বাকি টা তোমার বিবেচনা।”
ইনায়া তাকালো প্রিতমের দিকে, পরপর ফুঁপিয়ে উঠে গলা জড়িয়ে ধরলো প্রিতমের, আকুতি নিয়ে বলতে লাগলো,“প্লিজ প্রিতম একটু নরম হও। মেজো মাকে দেখলে আজ? কি করে পারছো তুমি আর আপু এতো কঠোর হতে?”
প্রিতম ইনায়ার হাত সরিয়ে দিয়ে উঠে বসলো, উঠে বসলো ইনায়াও। কাঁদছে সে। প্রিতম বললো,“তুমি এতো অবুঝ তো নও ইনায়া, একটা অন্যায় আবদার করছো!”
_মানছি অন্যায় আবদার। তাই-ই তো বলছি বারবার,প্লিজ এবারের মতো মাফ করে দাও। বড় বাবা বলেছে রিহ্যাবে পাঠিয়ে দেবে।
_ইনু সেটা পরের ব্যাপার, কিন্তু এখন ও শাস্তি পাবে না? ইনু কাল রাতে বিয়ে না হয়ে যদি অন্যকিছু হতো? ড্যু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া একটা মেয়েকে একা পেলে একজন পুরুষের মাথাতে কত ধরনের চিন্তা আসে? নাকি তুমি অবুঝ!
ইনায়া হতবাক হয়ে তাকিয়ে রয় প্রিতমের দিকে, তারপর বলে,“কি হতে পারত সেটা জানতে চাইনা প্রিতম,কি হয়েছে সেটা বলতে চাই। প্রনমি সেইফ আছে, এবং দাদান শাস্তি পেলেও ওর কিছুই হবে না। তাইনা?
_তাই বলে শাস্তি দেবো না?
_ক্ষমার ওপরে আর কিছু থাকে প্রিতম? দয়া চাইছি তো। দাদানকে সরিয়ে নেবে শহর থেকে বড় দাদান। প্রনমির ধারে কাছেও ঘেষবে না সে!
প্রিতম চুপ করে বসে রইলো, ইনায়া বলতে লাগলো,“তুমিও তো আমার সাথে মিথ্যাচার করেছিলে, আমি শাস্তি দিতে পারতাম না? আমি তো ক্ষমা করেছি,কারণ সুযোগ দিয়েছি তোমাকে। দাদানকেও একটা সুযোগ দাও।”
প্রিতম হতভম্ব হয়ে বললো,“দুটো জিনিস এক ইনু?”
ইনায়া চুপ হয়ে রইল। আচমকা ভীষণ রা'গ উঠে গেল প্রিতমের, প্রিতম উঠে দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে হাত বাড়িয়ে ফ্লাওয়ার পটটা ছুঁড়ে মারলো মেঝেতে, টুকরো টুকরো হয়ে ভে'ঙে গেলো তা।
ইনায়া কেঁপে উঠলো। প্রিতম ধ'ম'কে বলতে লাগলো,“মানে কি? আক্ষেপ হচ্ছে ক্ষমা করে আমাকে? মানে আমাদের ভাইবোনদের থেকে আশা করবে আমরা যেন ক্ষমাই করতে থাকি শুধু আর তোমরা ভাইবোনেরা ক্ষমা করে সেটা নিয়ে তিন বেলা খোটা দিতে ভুলবে না?”
_আমি এমনটা বোঝাতে চাইনি প্রিতম!
প্রিতম একটা লম্বা শ্বাস ফেললো, কথায় কথা বাড়বে, ঝগড়া হবে, আর ঐ অবুঝ মেয়েটা অযথা সেটাকে টেনে নিয়ে যাবে বহুদূর। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রিতম ত্রস্ত পায়ে হেঁটে বেলকোনিতে চলে গেলো। ইনায়া কিছুসময় তাকে দেখে কাঁদতে কাঁদতেই শুয়ে পরলো বিছানাতে ।
সময় গড়ায়, একটু বাদে প্রেরণার মেসেজ আসে প্রিতমের ফোনে,“ভাই একটু প্রনমির ঘরে আয়।”
প্রনমির মাথার কাছে বসে আছে প্রেরণা, ঘুম আসছে না দু'চোখে। প্রিতম ঘরে ঢুকে বললো,“কি ঘুমাচ্ছো না কেন।”
_এদিকে আয়,কথা বলিস না।
ঘুমন্ত প্রনমির মাথায় হাত বুলিয়ে প্রেরণা বেলকোনিতে গেলো, প্রিতমও গিয়ে আপুর পাশে দাঁড়ায়। কিছুসময়ের নীরবতার পরে প্রেরণা প্রিতমকে বললো,“কি রে তোর সংসারে আগুন লেগেছে নাকি!”
প্রিতম চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। প্রেরণা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,“বকাঝকা করিস না, ছোটো মানুষ। আর তাছাড়া ওর যায়গায় আমি হলে এভাবেই করতাম।”
একটু থেমে প্রেরণা ভাইয়ের মুখের দিকে তাকায়, বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলে,“সব দেখলি, শুনলি, বোধ হয় ভাবলিও। এখন তোর মত দে!”
প্রিতম কিছুটা সময় নেয়, ঘা'ড় ঘুরিয়ে রুমের ভেতরে ঘুমন্ত প্রনমির মুখের দিকে তাকিয়ে একটা ঢোক গিলে নেয়,তারপর আস্তেধীরে বলে,“কমপ্লেইন তুলে নাও আপু। আমি ক্লান্ত। আর কিছু বলতে পারছি না!”
দু ভাইবোন একই সাথে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। প্রেরণা ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে , তারপর বলে, “কাল যাবি আমার সাথে?”
_মাথা খারাপ? আমি ঐ উন্মাদটাকে দেখতে চাই না আর ইহ জনমে। আপু পুরোই সাইকোপ্যাথ। আবার আমাকে দেখলে বলবে,“এই তুই আমাকে দয়া করে কমপ্লেইন তুলে নিয়েছিস ব্লাডি বাস্টার্ড! তোর সাহস কিভাবে হয় আমাকে দয়া করার রোডসাইড রাস্কেল!”
অবিকল ইরফানকে নকল করে বললো প্রিতম। প্রেরণা এতো এতো দুঃখ,হতাশা আর মন খারাপের মধ্যেও হেসে ফেললো প্রিতমের কথা শুনে। হাসলো প্রিতমও। দুই ভাই-বোন ইরফানকে নিয়ে কিছুক্ষণ হেসে নেয়, হঠাৎ করে প্রিতম কন্ঠস্বর যারপরনাই গম্ভীর করে বলে,“একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আপু!”
_কি?
_প্রনোকে আর ইনুকে নিয়ে আমি এই শহর থেকে চলে যাবো। তুমি শুদ্ধকে নিয়ে থাকতে পারবে না? অস্ট্রেলিয়ায় চাকুরীটা কনফার্ম হলে বৌ আর বোনকে নিয়ে সেখানে সেটেল হবো পরে।
প্রেরণা তাকিয়ে আছে ভাইয়ের দিকে। নিচুগলায় বললো,“ইনায়া মানবে?”
_স্বামীর সিদ্ধান্তকে যদি সমর্থন না-ই করতে পারলো তাহলে আমার কিছুই বলার নেই আপু। ও যা চাইছে সেটা তো আমি করছি!
প্রেরণা চুপ করে রয়। প্রিতম আর কোন কথা না বাড়িয়ে বললো,“যাই বৌকে তার ইনোসেন্ট কিউট পিউট সহজ সরল ভাইয়ের খবরটা দিয়ে আসি। নয়তো আজ কেঁদে কেঁদে রুম সাগর বানিয়ে ফেলবে।”
ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে তার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে প্রেরণা বললো,“তোর আচরণ অবিকল ড্যাডের মতো।”
প্রিতম ম্লান হেসে নিজের ঘরের দিকে গেলো। ঘরে ঢুকে সে রীতিমতো অবাক। ইনায়া ব্যাগপত্র সব গুছিয়ে নিচ্ছে। হতভম্ব হয়ে প্রিতম বলে,“এসব কি!”
ইনায়া কাঁদছে আর জামাকাপড় গোছাচ্ছে। সে চলে যাবে। প্রিতমের ভীষণ রাগ উঠলেও রাগটাকে পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে যায় ইনায়ার কাছে, নম্র স্বরে বললো,“ধমকেছি বলে রাগ করেছো? এজন্য চলে যাবে ছেড়ে? আচ্ছা সে না হয় সকালে যাবে। তার আগে আমার একটা কথা শোনো।”
_তোমার কোনো কথা আমি শুনতে চাইনা বুঝলে তুমি? ঠান্ডা মাথায় কথা হচ্ছিলো তখন, তুমি কিভাবে পারলে ফুলদানি ভাঙতে! এই সত্যি করে বলো তো,তুমি তখন ঐ ফুলদানি দিয়ে আমাকে মারতেও চেয়েছিলে তাই না?
নাকি কান্নায় প্রিতমের মাথাটা ঝিমঝিম করছে এমনিতেই, তার ওপর এ সমস্ত কথা। প্রিতমের ইচ্ছে করছে আটতলা থেকে লাফ দিতে। সে বহুকষ্টে পুনরায় নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে রাখে। নরম হয়ে বলে,“আগে আমার একটা কথা শোনো ইনু।”
ইনায়া কোনো কথা শুনলো না, ব্যাগ গুছিয়ে বালিশ নিয়ে ঘর থেকে বের হতে গেলে প্রিতম ওর হাত টেনে ধরলো ,“কোথায় যাচ্ছো?”
_আপুর ঘরে শুতে যাচ্ছি! শোবো না আমি তোমার সাথে।
প্রিতমকে ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে গেলো ইনায়া। প্রিতম চুপচাপ বসে রইলো। এ কোন মহাবিপদে পরলো সে!
প্রেরণা ইনায়াকে দেখে অবাক হয়ে বললো,“তুমি!”
_আপনার সাথে ঘুমাবো আপু।
কাঁদতে কাঁদতে বলে বালিশটা বিছানায় রেখে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পরলো ইনায়া, প্রেরণাকে কিছু বলতে না দিয়ে।
প্রেরণা বুঝতে পারলো আগুন ভালোভাবে লেগেছে, তবে পানি ঢালার মতো শক্তি নেই তার এখন। তার ইমার্জেন্সি ঘুমের প্রয়োজন,আর চলছে না তার শরীর। এসব সকালে দেখবে। কথা না বাড়িয়ে সেও বিছানায় শুয়ে পরলো চুপচাপ, কিছুক্ষণ বাদে তলিয়ে গেলো ঘুমের রাজ্যে।
রাত তিনটা পেরিয়ে গিয়েছে অথচ ইনায়ার চোখে ঘুম এলো না, ঘুম এলো না তবে ভীষণ পানির তেষ্টা পেলো। উঠে বসে ঘরের কোথাও পানির অস্তিত্ব দেখলো না। বিছানা থেকে নেমে সে দরজা খুলে ডাইনিং রুমের দিকে যেতে থাকে পা টিপে টিপে, ঐ লোকটা ঘুমায়নি ইনায়া জানে, তার সামনে পরতে মন চাইছে না ইনায়ার।
নিঃশব্দে পানি খেয়ে গ্লাসটা টেবিলে রাখতেই আঁতকে উঠলো ইনায়া। প্রিতম জাপ্টে ধরেছে তাকে পেছন থেকে।
ছটফট করছে ইনায়া, প্রিতম বললো,“এখন কোথায় পালাবে।”
রীতিমতো ধস্তাধস্তি শুরু হয়েছে দুজনের মধ্যে। ইনায়া ক্লান্ত হয়ে বললো,“ছাড়ো নয়তো আমি চেচাবো....আপুউউউ...”
মুখ চেপে ধরলো প্রিতম ইনায়ার। দাঁতে দাঁত চেপে বললো,“রুমে চলো বলছি।”
ইনায়া নিজের মুখের ওপর থেকে প্রিতমের হাত সরিয়ে ঘন ঘন শ্বাস ফেললো কিছুক্ষন, রেগে মেগে বললো,“ ডাকাতের মতো করছো কেন?”
_কিডন্যাপ করছি বৌকে। রুমে চলো।
_যাবো না আমি।
ওর মুখটা আবারও চেপে ধরল প্রিতম টানতে টানতে রুমের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলছে,“প্রানপ্রিয় ভাইয়ের রাগ থাকবে,সেটা জায়েজ, আর আমি রা'গ করলে ছেড়ে যাওয়ার হুমকি। ভাই কাউকে কিডন্যাপ করলে সাত খুন মাফ, আর আমি উলটো পাল্টা কিছু করলেই তোমাদের সবকটা ভাইবোনের খুব ফাটে তাইনা? রুমে চলো, বোঝাচ্ছি তোমাকে.....”
চলমান.....