#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৪০
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
আজ হঠাৎ করে ই-বাসে উঠতে ইচ্ছে করলো প্রেরণার। সচরাচর স্কুটিতে যাতায়াত করলেও এই রুটের তিনতলা বিশিষ্ট ই-বাসে চড়তে প্রেরণা মুখিয়ে থাকে। বাচ্চাদেরও মতো আনন্দ পায় সে। মোট সাতটা ই-বাস রয়েছে এই রুটে। প্রেরণা স্পেশাল প্যাসেঞ্জার কার্ড বানিয়ে রেখেছিলো। এতে বিল কিছুটা কম দিয়ে পারা যায়।
প্রেরণা একটু হিসেবি গোছের মহিলা কিনা!
হাতের ফোনটাতে বারবার সময় দেখছে সে। থানায় গিয়ে যা করার করে রেস্তোরাঁয় যেতে হবে। হঠাৎ পায়ের কাছে একটা বল জাতীয় বস্তু এসে থামলো, প্রেরণা সেটা তুলে হাতে নিয়ে পাশে ফিরে তাকিয়ে দেখলো দু'জন বয়ঃজ্যেষ্ঠ ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা তার দিকেই তাকিয়ে আছে। অমায়িক চেহারায়, ঠোঁটে অমায়িক হাসি লেপ্টে আছে দুজনের। প্রেরণা মুচকি হাসলো, বললো,“এটা আপনাদের আঙ্কেল?”
লোকটা খুব বিনয়ী সুরে বললো,“ইয়াহ। ইয়াং লেডি, এটা দিয়ে তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম, কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে? এতো ডাকছি আমরা দুজন,দেখছিলেই না। আসলে হয়েছে কি, আমার ওয়াইফ বললো তোমাকে সে মুখ চেনে, তুমি কি কাঞ্চন পার্ক রোডে কখনো যাও?”
_জি আংকেল, প্রায়শই। কেন বলুন তো!
লোকটার পাশের ভদ্রমহিলা বলে ওঠে,“ঠিক ধরেছি। তুমিই সে না যে আমার পার্স তুলে দিয়েছিলে ড্রেন থেকে? আমাকে ফার্স্টএইড করে দিয়েছিলে, আমার এক্সিডেন্ট হয়েছিল সেদিন ঐ রোডে।”
প্রেরণার মনে পরে গেলো, একদিন এক ভদ্রমহিলাকে সে সাহায্য করেছিল,রাজনৈতিক দু'টো দলের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে ফেঁসে গিয়েছিলেন ভদ্রমহিলা। প্রেরণা বললো,“জি আন্টি মনে পরেছে। আমিই সে। আমি প্রেরণা আহসান।”
লোকটা অমায়িক হেসে জবাব দিল,“নাইস মিটিং ইউ প্রেরণা, আ'ম ডক্টর রাওনাফ করীম খান অ্যান্ড শি ইজ মাই ওয়াইফ মৃদুলা উর্বী।”
প্রেরণা আবারও বিনয়ী হাসলো, ভদ্রমহিলা বলতে লাগলেন,“তোমাকে সেদিন একটা ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য কত খুঁজলাম। ভিড়ের মাঝে কোথাও হারিয়ে গিয়েছিলে। মেয়ে তুমি বড্ড উপকার করেছিলে সেদিন।”
_ইট ওয়াজ মাই ডিউটি টুয়ার্ডস এনি সিনিয়র পার্সন আন্টি, মেনশন নট।
প্রেরণার স্টপেজে বাস থামলে সাইরেন বেজে উঠল, ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা হাত নাড়িয়ে বিদায় জানায় প্রেরণাকে। বাস চলতে শুরু করলেও প্রেরণা কিছু মুহূর্ত সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলো, জীবনের চলতি পথে কতশত আগন্তুকের দেখা মিলে যায়, কিছু মুহূর্তের জন্য। সেটাই ভাবলো প্রেরণা।
_____
মুঈনের কেবিনের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় প্রেরণা, কনস্টেবল পাশ থেকে চলে গেলে সে দরজার বাইরে দাঁড়িয়েই নিচুগলায় মুঈনকে বলে,“স্যার আসবো?”
মুঈন বিনম্র স্বরে বললো,“জি আসুন।”
প্রেরণা ভেতরে ঢুকলে মুঈন বসতে বললো তাকে,প্রেরণা বসতেই মুঈন ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে দেখলো প্রেরণাকে। আন্তরিক হয়ে জানতে চাইলো,“আপনার বোন কেমন আছে?”
_জি কিছুটা ভালো।
মুঈন কিছু সময় চুপ থেকে বললো,“তো ফাইনালি কমপ্লেইন তুলে নিলেন।”
_জি।
মুঈন নড়েচড়ে বসে, ভীষণ কৌতুহলী দৃষ্টিতে প্রেরণাকে কয়েক মুহূর্ত দেখে বলে,“আসলে আমার তিন বছরের পেশাগত জীবনে এরকম বহু দেখেছি। এক্ষেত্রে যেটা অবজার্ভ করেছি এ ধরণের সেনসিটিভ কেসে বাদী পক্ষ প্রধাণত দু'টো কারণে শক্তিশালী,ক্ষমতাধর প্রতিপক্ষের ওপর থেকে অভিযোগ তুলে নেয় , এক, সাহসে না কুলোলে, দুই অর্থনৈতিক দিক থেকে দুর্বল হলে এমন জ'ঘন্য অপরাধে ছাড় দেয়। ইন দিস কেস,আমার আপনাদের, স্পেশালি আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে না আপনি ভয় পেয়েছেন, আর আপনি অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল সেটাও সম্ভবত ভুল। আর রিলেটিভ দেখে পারিবারিক পরিস্থিতি ঠিক রাখতে যে অভিযোগ তুলেছেন এটাও মানতে পারছি না, কারণ বোনের ব্যাপারে অপরাধীর প্রতি সামাজিকতার খাতিরে এতটা দয়ালু কেউ হয়না। তবে এই সিদ্ধান্ত? ”
ভীষণ আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলো মুঈন। প্রেরণা ম্লান হাসলো, একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,“জি স্যার। না অর্থ সংকট রয়েছে,না সাহস ফুরিয়েছে। যেটা ফুরিয়েছে সেটা হলো আমাদের দুই ভাইবোনের ধৈর্য্য। আমরা ক্লান্ত। এমন যদি মিরাকল করা যেতো মম আর ড্যাডকে পুনরায় জীবিত করে বোনের পাশে বসিয়ে রেখে বলতাম,“তোমরা বোনকে দেখো,আমরা দুনিয়ার সাথে লড়ি।” তবে একটা কথা থাকতো। আমরা দুই ভাইবোন যাস্ট হাঁপিয়ে গিয়েছি।
গতকাল রাতে দুই ভাই-বোন মিলে ভেবে সিদ্ধান্তটা নিলাম।
যাক তবে একটা স্বস্তি পেয়েছি আপনারা আমাদের পাশে ছিলেন, আর মির্জা ফ্যামিলি থেকে ইলহাম আঙ্কেল আর সামিন আঙ্কেলরা যে আমার কাছে এসে ঘ্যান ঘ্যান করেননি, আমাকে টাকার অফার করেননি, অপরাধটাকে আসলেই অপরাধ বলে স্বীকার করেছেন এতে আমি সন্তুষ্ট। আশা করছি ওনারা এই ধাক্কাটাকে সিরিয়াসলি নিয়ে নিজেদের ছেলেকে সেভাবে দেখবেন।
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ স্যার,আমি ভাবিওনি আমাদের এভাবে ট্রিট করা হবে। ধন্যবাদ দিতেই এলাম।”
প্রেরণা থামলো, মুঈন একটা অমায়িক হাসি দিয়ে বললো,“ইট ওয়াজ মাই ডিউটি!”
প্রেরণা হাত ঘড়িতে সময় দেখে উঠলো। মুঈনকে সালাম দিয়ে পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে বেরিয়ে থানা প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়াতেই তার কদম থামলো। ইহান দাঁড়িয়ে আছে, একজন কনস্টেবলের সাথে কথা বলছে। প্রেরণা লোকটাকে দেখলো কিছু মুহূর্ত, প্রেরণা যেমন ভুগছে ভাই বোনের জন্য,তেমনি ভুগছে এই লোকটাও। ব'লিষ্ঠ দেহের সাথে তার জাতীয় পোশাক শুভ্র পাঞ্জাবি পরে নেতাসুলভ গাম্ভীর্য নিয়ে চলা লোকটা জিন্স প্যান্ট,শার্টে ছোটাছুটি করছে এ'কদিন। প্রেরণার কাছে এসে অহেতুক আকুতি মিনতি করেনি দেখে প্রেরণা লোকটার উপর বিরক্ত হলো না বরং আশ্চর্য লাগে কতটা ধৈর্য্য এই লোককে দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা। পরিচয়ের প্রথম দিন থেকে দেখছে সবকিছু সংবেদনশীলতার সহিত সামলে নিতে।
ইহানের সাথে কথা বলে কনস্টেবল চলে যায়, ইহান তখনও দেখতে পায়নি প্রেরণাকে,সে কদম বাড়ায় পুরাতন দালানের দিকে, ওসির রুমে যাবে তাই, ঠিক তক্ষুনি কন্ঠে দৃঢ়তা নিয়ে অপ্রত্যাশিত নারীকন্ঠ তাকে ডাকলো,“এই যে ডিসেন্ট মির্জা!”
স্থির হলো ব'লিষ্ঠ কদম। ঘা'ড় ঘুরিয়ে দেখলো প্রেরণাকে,চোখ থেকে খুললো সানগ্লাস। ইহান প্রেরণাকে দেখে অবাক হলো না, অবাক হলো তার মুখে এমন অদ্ভুত সম্বোধন শুনে। ইহান প্রেরণার শাড়ি দেখলো হঠাৎ, আজও কেমন অফ হোয়াইট রঙের শাড়ি পরেছে। এই রঙ গুলো ভদ্রমহিলা কেন পরে বুঝে উঠতে পারে না ইহান, জীবনে রঙ না থাকলে রঙিন শাড়ি পরা যাবে না, ভদ্রমহিলা সম্ভবত এই তত্ত্বে বিশ্বাসী,অথব অযথা নিজেকে বুড়ি সাজিয়ে রাখতে চায়।
প্রেরণা এগিয়ে এসে ঠিক ইহানের মুখোমুখি দাঁড়ায়, চোখে চোখ রাখে ইহানের, কোনো সংকোচ ছাড়াই, উল্টো ইহান চোখ নামিয়ে নেয়।
প্রেরণা বলতে থাকে,“বাইরে প্রেসের লোক দেখেছি, তাকিতুকি দিচ্ছে। কিছু পয়সা দিয়ে এদের মুখ বন্ধ করুন এখন, এতো সৎ থাকলে কিভাবে হয়? ভোটার কমে যাবে আপনার। আমার যেটুকু করার করে দিয়েছি, আর কিছু করার নেই আমার।”
ইহান শান্ত দৃষ্টিতে শুধু দেখতে থাকলো প্রেরণাকে, প্রেরণা বলতে লাগলো,“একটা ছোটো কাজ করবেন?”
_কি?
ইহানের রাশভারী স্বর।
_আপনার আদরের ভাইকে প্লিজ বলবেন না আমি বা আমার ভাই স্বেচ্ছায় ওর নামে অভিযোগ তুলেছি। অনুরোধ আমার।
_তা কেনো?
অবাক ইহান।
_এখানে এসে শুনলাম আপনার ভাই-ই জামিন চাইছে না, অদ্ভুত ছেলে! ভা'ঙে তবু মচকায় না। ওর সাইকোলজিক্যাল কেসটা আপনারা না বুঝলেও আমি ধরে ফেলেছি এখানে এসে। আপনার ভাই ভীষণ অসুস্থ ইহান, আমরা ওকে ছাড় দিয়েছি এটা শুনলে ও এটাকে নিয়েও বাতেঙ্গা খাড়া করবে, ওর ইগো হার্ট হবে, ও লম্বা করবে টেনে এসব আবারও। আমি চাচ্ছি ও জানুক কোনো না কোনোভাবে জামিন হয়েছে ওর। আমি আর আমার ভাইয়ের নাম যেন সামনে না আসে। ও ভালো থাকুক,আমরাও ভালো থাকি। বরং জেনে গেলেও বলবেন,আমরা হার মেনে অভিযোগ তুলেছি।
এটুকু বলে প্রেরণা অহেতুক হাসলো,বলতে লাগলো,“এসব আমি কি বলছি! আসলেই আমরা হার মেনেছি। সো আপনার ভাইয়ের ইগো হার্ট হবার কোন সুযোগ নেই। ওর জন্য শুভকামনা, সুস্থ জীবনের কামনা।”
ইহান কোনো জবাব দেয়না, প্রেরণার সরল বচন মুহুর্তেই ধারালো হলো, গম্ভীর হয়ে,কন্ঠে তেজ নিয়ে ইহানের চোখে চোখ রেখে বললো,“আর একটা কথা আপনি মাথায় ভালো করে ঢুকিয়ে নেবেন ইহান, এটা শুধু আপনাকেই বললাম, আপনাকেই বলার তাই, ভবিষ্যতে আপনার ভাইকে আমার বোনের থেকে, আমার ভাইয়ের সংসার জীবন থেকে দূরে রাখবেন। যদি আর কখনো আমার সন্তানসম ভাইবোনের প্রতি ও ক্ষোভ ঝাড়তে আসে তবে আপনার চৌদ্দ গুষ্টি এসেও এই প্রেরণার থেকে আপনার ভাইকে বাঁচাতে পারবে না।”
একটু বলে থামলো প্রেরণা, ইহান একদৃষ্টে দেখছিল প্রেরণাকে, প্রেরণা বলতে লাগলো,“এই এতোটুকু বয়স থেকে এ ঘাটে ও ঘাটে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে বড় হয়েছি, হজম শক্তি প্রচুর, ধৈর্য্যশক্তি মাশাআল্লাহ এবং জেদও মাশাআল্লাহ। আমি দুবার ভাববো না সেদিন পাল্টা আঘাত করতে।”
ঘনঘন নিশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলায় দ্রুত, পুনরায় কন্ঠে আন্তরিকতা এনে মিষ্টি করে হাসলো প্রেরণা, এবার নম্রস্বরে বললো,“আবারও বলছি, আমার মনের মধ্যে কোন বিষ রাখিনি জমা, ওর সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশা করছি। আপনার ভাই যেন এই আন্তরিকতা টুকু কোনো জেদ না দেখিয়ে গ্রহণ করে, কোনো জেদ না বহন করে আর। আমরা তুচ্ছ। আমাদের থেকে আর প্রতিশোধ না নেওয়ায় অনুরোধ রাখলাম ওর প্রতি। ওর সমস্যাটা ধরতে পেরেছি,ওকে বুঝিয়ে বলবেন, জীবদ্দশায় ইনায়াকে কখনো প্রিতম বা আমি কষ্ট দেবো না। আসছি।”
বলেই প্রেরণা ত্রস্ত পায়ে হেঁটে ইহানের সামনে থেকে থানা প্রাঙ্গণের পকেট গেটের কাছে চলে যায়। ইহান স্থির দৃষ্টিতে দেখতে থাকলো তাকে, মাঝারি উচ্চতা, পাতলা ফিনফিনে দেহে মলিন রঙের শাড়ি, একটা লম্বা বিনুনি,দুলছে কোমরের কাছে,কলমি লতার ন্যায়। কন্ঠের ঝাঁঝ এখনও ইহানের আশেপাশে,বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
______
থানা এরিয়া থেকে বেরোতেই প্রেরণার ঠিক সামনে এসে থামলো সাফওয়ানের গাড়ি। প্রিতম থানায় আসবে না তাই জামি-সাফোয়ানকে পাঠিয়েছে আপুর সাথ দিতে।
গাড়িতে উঠে বসলো প্রেরণা, জামি বললো,“লেট করে ফেললাম আপু।”
_অসুবিধা নেই ভাই।
গাড়ি চলছে নির্দিষ্ট গতিতে, জামি ড্রাইভ করছিলো, সাফওয়ান তখন থেকে উ'শ'খু'শ করছিলো প্রেরণাকে কিছু বলতে,প্রেরণা খেয়াল করলো তা, ঠান্ডা গলায় বলল,“ঝেড়ে কাশো সাফওয়ান।”
_আপু ওদের বিয়ে...
মিনমিনিয়ে বলে সাফওয়ান।
_বিয়ে?
_না মানে আপু,সব মানছি,তবে যা শুনেছি প্রনমি সজ্ঞানে কবুল বলেছে তাই এটা নিয়ে....আসলে আপু আমাদের মন খুব খচখচ করছে,কাল রাত থেকে এটা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করলাম....
হাত দিয়ে ইশারা করে সাফওয়ানকে থামিয়ে দিয়ে গাড়ির সিটে গা এলিয়ে দিলো প্রেরণা, একেবারে বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলে,“ওটা একটা বালের বিয়ে!”
জামি সাফওয়ান প্রেরণার দিকে তাকায়, প্রেরণা বলতে থাকে,“কি? বুঝতে পারছো না? তোমাদের সব প্রশ্নের উত্তর আমি বাড়িতে গিয়ে দেবো। মনযোগ দিয়ে গাড়ি চালাও ভাই।”
______
ইরফানের দিকে অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে ইহান। হাত মুষ্টিবদ্ধ তার, দাঁতে দাঁত চেপে বললো,“এটা কেমন পাগলামি! জামিন চাইনা মানে!”
ইরফান জুস খাচ্ছিলো,হুডির টুপিটা মাথা থেকে সরিয়ে চুলগুলো এলোমেলো করে বললো,“চাইনা মানে চাইনা।”
সবকিছু ইহানের ধৈর্য্যকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, রাশভারী কন্ঠে বলল,“হঠাৎ এমন মহান সিদ্ধান্ত। কেন জামিন চাইনা ইরফান মির্জা আপনার?”
_মুড নেই।
জুস খেতে খেতে জবাব দেয় ইরফান।
ইহান তখন ওর কলার চেপে ধরলো, দাঁতে দাঁত চেপে বললো,“আমাদের যথেষ্ট ভোগান্তি দিয়েছিস,এখন তোর এই মুড নেই নাটক স্টপ কর নয়তো তোর ঘাড়ের রগটা,যেটা সবসময় বাঁকা থাকে,ওটা আমি যাস্ট আজকে কে'টে নামিয়ে ফেলবো।”
ইরফানের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই দাদানের কথায় । জুসটা শেষ করে
একটা ঢেকুর তুলে আবারও হুডির ক্যাপ তুলে দেয় মাথায়। বলে ওঠে,“এখানের পরিবেশটা চমৎকার তাই বলছিলাম।”
ইহান হতাশ, পুরো হতাশ। কিছুক্ষণ ক্রোধান্বিত চোখে ইরফানের দিকে তাকিয়ে থেকে ফোনটা বের করে আলোকে কল করে বলে,“ভেতরে এসো বড় মা।”
আলো বাইরেই ছিলো, কিছুক্ষণ আগে সে এসেছে থানায়। সেলের ভেতরে পা রাখলো সে। এসে মুখোমুখি দাঁড়ালো ইরফানের। ইরফান মিষ্টি করে হেসে বললো,“হোয়াসসাপ বড় মা! আ'ম ফাইন।”
_নাটক কেনো করছো!
বিরক্তির সুর আলোর কন্ঠে।
_ঔ,আমার ছেলের বৌ আমার ওপর রেগে আছে!
ইরফান নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে।
আলো একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,“ইরফান, একটু আমাদের প্রতি সদয় হও।”
_আচ্ছা যাও,নাটক করবো না। সরাসরি বলছি, দুমাস এখানে থাকতে বেশ লাগবে আমার, সো অ্যাডভেঞ্চারাস!
_ইরফান!
ধ'ম'কে ওঠে আলো।
_কি ব্যাপার, আমার আদর্শময়ী বড় মা আজ হঠাৎ একজন ক্রিমিনালের ছাড় পাওয়া নিয়ে উৎকণ্ঠায় আছে!
মজার ছলে ভ্রু উচায় ইরফান। আলো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করে,“আমি প্রেরণা নই। আমি আলো, আমাকে চিনিস তো তুই? আমি কখনো কাউকে ছাড় দেই না, আমার প্রতি কেউ অন্যায় করলে তাকে তীব্র প্রতিক্রিয়া না দেওয়া পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। অ্যান্ড ট্রাস্ট মি বাবা, প্রেরণার যায়গায় যদি আমি হতাম তাহলে..... তুইও ভালো করে জানিস আমি কি করতাম। তো যা বলছিলাম,রাখি এসব নীতির কথা। আমি তোর বড় মা। বড় মা হিসেবে আমি তোর ভালোটা চাচ্ছি। যদি আমার চাওয়ার দাম দিতে না পারিস তাহলে,মাই ফ্যামিলি ইজ এভরিথিং ফর মি,এসব ডায়লোগ পরবর্তী জীবনে আর কপচাবি না।”
ইরফান তাকিয়ে আছে আলোর দিকে। আলো বলতে থাকে,“এসব কেন ঘটিয়েছিস সেই তর্ক বিতর্কে যেতে চাচ্ছি না। হতে পারে তোর কাছে স্ট্রং রিজন আছে, হতে পারে বোনের লাইফ রিস্কে ভেবে এমনটা করেছিস, এমন বহু যুক্তি দাড় করানো যায় তোর আবেগের যায়গা থেকে, কিন্তু দিনশেষে এটা ঘোর অন্যায় বাবা।”
_তো সেজন্য তো বললাম কিছুমাস থাকি এখানে! এই এতো ইমোশনাল সিন ক্রিয়েট কেনো করছো!
হাই তুলে,ড্যাম কেয়ার ভাব নিয়ে বললো ইরফান।
আলো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো, ক্লান্তস্বরে বলতে লাগলো,
_একটা ডেভিল সত্তার শাস্তি হিসেবে তার আত্মশুদ্ধির ওপরে আর কিছু থাকে না। তুই ডিসাইড কর বাবা, একটা সুন্দর জীবন থেকে সাতবছর সরিয়ে ফেলবি নাকি চারটা মাস পরিশ্রম করে নিজের ভেতরে লুক্কায়িত শয়তানটাকে নিশ্চিহ্ন করবি ! একটু নত হ ইরফান, এই পৃথিবী সুন্দর, একটু নত হয়ে দেখ আমাদের কাছে, তুই আর জেদ করিস না। আমরা ভীষণ ক্লান্ত সবাই, না পারছি তোকে বুঝতে, না পারছি তোকে আমাদের বোঝাতে। আমরা কতটা অসহায় বুঝতে পারছিস? এতকিছুর পরেও আমরা হাত বাড়িয়েছি, তুই দুকদম এগোবি না?”
হুহু করে কেঁদে ওঠে আলো। ইরফান দেখতে থাকে বড় মা'কে। আলো শাড়ির আঁচলের কোণায় চোখ মুছে নেয় চেপে চেপে। ইরফান বিরক্ত হয়ে বলে,“স্টপ বড় মা,তুমি তোমার মেজো জা'য়ের সাথে থাকতে থাকতে ওনার মতো ছিঁচকাদুনে হয়ে গিয়েছো।”
আলো কান্না থামাতে পারছে না, তীব্র প্রচেষ্টার পরে একটুখানি দম নিয়ে বললো,“তোর কাছে হাতজোড় করছি বাবা একটু সারা দে। আমরা তোকে বুঝতে পারিনা। তুই একটু বোঝ আমাদের।”
______
অ্যপার্টমেন্টে ঢুকে প্রেরণা জামি আর সাফওয়ানকে বসতে বলে দ্রুতপায়ে নিজের ঘরের ভেতরে যায়। হাতে করে কিছু কাগজপত্র নিয়ে এলো প্রেরণা। বসলো জামিদের মুখোমুখি।
সাফওয়ান জামি দু'জনেই বুঝতে পারছে না কিছু। প্রেরণা শীতল মেজাজ নিয়ে বলতে লাগলো,“তো কি যেন বলছিলে! বিয়ে! এই কাগজগুলো দেখো।”
ওরা কাগজগুলো দেখতে লাগলো, প্রেরণা বলতে থাকে,“প্রনমি মেন্টালি স্টেবল নয়, দীর্ঘবছর ধরে ওর ট্রিটমেন্ট করাচ্ছি। একটু উন্নতি হয়, আবার কিছু সমস্যা দেখা যায়। তোমাদের দুলাভাই থেকে শুরু করে আমি,প্রিতম কারি কারি টাকা ঢালছি এসবের পেছনে। ও স্পেশাল চাইল্ড শুধু শারীরিক ভাবে নয় বলতে পারো মানসিক ভাবেও। এমতাবস্থায় কোর্ট থেকে ওর গার্ডিয়ানশিপ আমি, তোমাদের দুলাভাই, এবং প্রিতম নিয়েছি। তোমাদের দুলাভাই জীবিত নেই,আছি আমরা দুজন। এই পরিস্থিতিতে ও যতদিন পরিপূর্ণ সুস্থ না হয় ওর লাইফের যেকোনো ডিসিশন আমাদের,বিয়ে থেকে শুরু করে সবকিছু আমাদের,ওর নিজেরও নয় । আর একজন মানসিক ভাবে আনস্টেবল মেয়ের বিয়েতে সম্মতি নিয়ে ভাবছো? মানবাধিকার আইন কতভাবে লঙ্ঘন করেছে ঐ ইরফান মির্জা জানো ? ওকে গিয়ে বলবে ওর বৌ লাগলে কোর্টে যেতে,কোর্টে এই বিয়ে বৈধ প্রমাণ করে যেন বৌ নিয়ে যায়। আমি ব্যন্ড পার্টি বাজিয়ে হাসতে হাসতে নাচতে নাচতে আমার বোন দিয়ে দেবো,নিজে গিয়ে মির্জা বাড়িতে মিষ্টি বিলাবো। তবে কোর্টে গেলে আবার চৌদ্দ শিকের ভেতরে ঢুকতে হবে ওকে, এসব ডকুমেন্ট কে টেক্কা দিতে পারবে একমাত্র আমার বোন, প্রনমি যদি বলে ও ইরফানকে ভালোবাসে, অ্যান্ড ট্রাস্ট মি! এটা তো জীবনেও হবেনা।”
অত্যন্ত আত্ববিশ্বাসের সহিত প্রেরণা বললো কথাগুলো।
_____
টানা ছত্রিশ ঘন্টা পরে ইরফানের পা পরলো শান্তিনীড়ের অন্দর মহলে। লিভিং রুমে ওর বাবা,দুই চাচা এবং পরী ছাড়া অন্য কেউ ছিলো না।
ইহান গিয়ে একটা সোফাতে ধপ করে বসে পরলো। ইলহাম পুত্রের দিকে এক পলক তাকিয়েও দেখলো না, সামিনের হাতে কিছু কাগজপত্র ছিলো,জেলা প্রশাসকের থেকে অনুমোদনের কাগজপত্র।
ইরফান ঘা'ড় ঘুরিয়ে বড় মায়ের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা স্বরে বলে,“এক্ষুনি এখান থেকে চলে যাবো?”
_হ্যা, ইহান নিয়ে যাবে তোমায়।
আলোর হয়ে উত্তরটা সামিন দিয়ে দেয়।
ইরফান চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলো সবাইকে, সবাই নির্লিপ্ত হয়ে আছে। একপাশে তার ব্যাগেজ রাখা। ইরফান অস্ফুটে বললো,“এগুলো!”
_এগুলো মেজো ভাবী গুছিয়ে রেখেছে। তোর সাথে যাবে।
ইশমাম জবাব দেয়।
ইরফান ছোটোবাবার দিকে তাকায় কয়েক মুহূর্তের জন্য,বলে,
_মাম্মা কোথায়?
_ওপরে।
ইরফান দ্রুতপায়ে হেঁটে দোতলায় উঠে রিতু-ইলহামের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। ইরফান দরজায় চাপড় মেরে বলে,“মাম্মাহ।”
ভেতর থেকে কেউ সা'রা দেয়না। একইভাবে বারবার ডাকতে থাকে ইরফান। রিতু জবাব দিচ্ছেই না।
ইরফান এবার কিছুক্ষণ থামে, তারপর ধীরে ধীরে বলে,“মাম্মা তোমাদের কথা রাখছি তো! আর কি করবো! যাচ্ছি আমি,দেখবে না একবার?”
রিতু বেরোলো না ও ঘর থেকে, মুখে হাত চেপে ধরে নিশ্চুপ কাঁদছে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে।
ইনশিরাহ এসে ইরফানের পিছনে দাড়ায়, বলে ওঠে,“মেজো মা দরজা খুলবে না।”
চলমান......
#কিছু কথা যা আপনাদের মাথায় ঢুকিয়ে নিতে হবে :
ইরফান প্রনমিকে ভালোবাসে এই কথা আমি কোথাও উল্লেখ করেছি বলে মনে হয় না। ওর অবচেতন মন প্রনমিকে দেখে থমকায়,এই যা।
ও প্রনমিকে তখন পাবে যখন ও প্রনমিকে ভালোবেসে ফেলবে,ওর সেল্ফ রিয়ালাইজেশন হবে।
তার আগে ওকে প্রনমির সাথে মিলিয়ে দেবো, ট্রাস্ট মি! এই কাজ ইতি কেন ইতির বাপও করতে পারবে না প্রেরণার সামনে থেকে।
নাকে তেল দিয়ে ঘুমান, উপযুক্ত সময় হলে মিলিয়ে দেবো, আর ধৈর্য্যে না কুলোলে নিজেরা নিজেরা কল্পনা করে নিন,ওর সংসার,লুতুপুতু প্রেম, পাঁচ ছয়টা বাচ্চা।
ওমন একটা ইনোসেন্ট মেয়েকে একটা অসুস্থ মানুষের হাতে তুলে দিয়ে হ্যাপি এন্ডিং দিতে আমি রাজি নই। দু'জনে আগে সুস্থ হোক। দু'জনে দু'জনের প্রেমে পড়ুক, প্রেরণার ধারণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভালোবাসার একটা সংসার গড়ে তুলুক। গল্প বড় হবে,দেখতে থাকুন। ওদের ব্যাপারটা একটু জটিলই হবে।
আর অনেকেই বলেন সামিনের সাথে তো এসব করেননি,সামিন ছাড় পেয়েছে। ভাই সামিন কি অসুস্থ ছিলো যে ওর আত্মশুদ্ধি রিহ্যাবে পাঠিয়ে করাবো। 🫡