ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 41

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৪১
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

ইরফান চেয়ে থাকে ইনশিরাহর মুখের দিকে। ইনশিরাহ পুনর্বার বলে ওঠে,“খুলবে না মেজো মা দরজা তুই বুঝতে পারছিস না? অযথা সময় নষ্ট করিস না! নিচে যা তুই।”

ইরফান এলোমেলো দৃষ্টি রাখে চারপাশে। অতঃপর একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ।

ইনশিরাহ একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ভাইয়ের দিকে, পরপর এসে হুট করে ভাইকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল একবার, কেঁদে ফেললো ইনশিরাহ, বললো,“আই উইল মিস ইউ!”

ইরফান ম্লান হাসলো,বোনের মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে মলিন মুখে আশেপাশে তাকাতেই দেখলো ওপাশের বারান্দার পর্দার আড়ালে লুকিয়ে তাকে দেখছিলো ইনায়া, সকালে প্রিতম এ বাড়িতে রেখে গিয়েছে তাকে ভাইয়ের সাথে যাতে সাক্ষাৎ হয় তার।

ভেজা চোখে তাকিয়ে আছে ইনায়া। ইরফান বোনকে দেখে, পরনে একটা সোনালী পাড়,লাল জমিনের হাফসিল্ক শাড়ি, গলায় অল্প গয়না, চুলে খোঁপা। কিযে মিষ্টি লাগছিল বোনকে!

ইনায়া ইরফানের কাছে আসতে পারছিলো না সংকোচে। দূর থেকেই দেখছিলো ভেজা চোখে তার দাদানকে। ইরফান স্মিত হেসে একটা হাত বাড়িয়ে দিয়ে ইনায়াকে ডাকে,“এদিকে আয় ইনু!”

বলে শেষ করতে পারলো না ইরফান,ইনায়া এসে জরিয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে দিলো । ইরফান নিজেকে সামলে নিয়ে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,“ভালো থাক!”

ভাইয়ের শার্ট খামচে ধরে ভাঙা গলায় আওড়ায় ইনায়া,“দাদান আমি তোমাকে ভীষণ রকমের ভালোবাসি দাদান।”

ইরফান ম্লান হাসলো, কান্নাকাটির বন্যা বইছে দোতলায়। ইনশিরাহ আর ইনায়া পাল্লা দিয়েছে কে বেশি কাঁদতে পারে ভাইয়ের জন্য।

এই এতকিছুর পরেও রিতু দরজা খুলে বেরোলো না। ইরফানও আর ডাকলো না মাম্মাকে।

শেহাকে খুঁজে পেলো না কোথাও ইরফান। ভীষণ বিচলিত হয়ে শেহাকে ডাকছিলো সে, জানতে পারলো শেহা সকালেই চলে গিয়েছে শান্তর সাথে। গাঁয়ে তুমুল জ্বর নিয়ে। ভীষণ অবাক ইরফান কল দেয় শান্তর নাম্বারে, আধাঘণ্টা অপেক্ষা করেও শেহার থেকে বিদায় নিতে পারলো না ইরফান। জানতে পারলো শেহা ওয়াশরুম থেকে বেরোয়নি।

এদিকে ইরফানের যাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। নিচে বাড়ির বড়রা সে ব্যাপারেই কথা বলছে।
চার মাসের কোর্সে ভর্তি করা হয়েছে ইরফানকে। মাসিক একলক্ষ বারো হাজার টাকা ফি দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের সব সাইক্রিয়াটিস্ট, ডক্টর এবং প্রফেসর দ্বারা পরিচালিত “Hope” নামের এই পুনর্বাসন কেন্দ্র। দেশের নামী সব ফ্যামিলির ছেলে-মেয়ে সেবা নিয়ে সুস্থ হয়েছে দ্রুত। ইরফানের সেকশন “মনরোগ”। এই সেকশনে চার্জ টা একটু বেশি রাখা হয়। অবশ্য সেবার মান বিবেচনা করলে দেশে নাম্বার ওয়ান “হৌপ”

ফোনটাও আলোর কাছে বাধ্য ছেলের মত জমা দিয়ে দিলো ইরফান। গায়ে চাপালো একটা হোয়্যাইট টি-শার্টের ওপর ব্ল্যাক শার্ট, বোতামগুলো সব খোলা। চুলগুলো সেট করা বরাবরের মতো। পরী আর আলো ব্যাথিত হৃদয় নিয়ে তাকিয়ে রয় ছেলেটির মুখপানে। চাপা রঙের সুশ্রী মুখটা,দেখতে ঠিক রাজপুত্রের মতো। কেউ কি এখন দেখে বলবে ও অসুস্থ? এই তো কত সভ্য শান্ত লাগছে, স্বাভাবিক লাগছে। একেবারে স্বাভাবিক! কত বুঝদার, দায়িত্ববান ছেলেটা,দেখে মনে হচ্ছে বন্ধুদের সাথে কোনো ট্রিপে যাচ্ছে।

চোখ ছাপিয়ে জল এলো আলোর,সে পাত্তা না দিয়ে টেবিলে খাবার বেড়ে দিলো ইরফানকে।

মাম্মা মুখ দেখলো না তার, শেহার সাথেও কথা হলো না । ইরফান শেষবারের মতো রিতুর রান্না করা খাবার খেলো, এখন তার আচরণ বেশ স্বাভাবিক, মেজাজ ঠিকঠাক। খেতে খেতে ধীরে সুস্থে সামিনের দিকে তাকিয়ে বললো,“মান্থলি একলক্ষ বারো হাজার টাকা? বড় বাবা, কে বলেছে ভালো হতে টাকা লাগে না? আমার ভালো হতে চারমাসে চারলক্ষ আটচল্লিশ হাজার টাকা লাগবে।”

বলতে বলতে হাসলোও ইরফান। ইনায়াকে ধ'ম'কে তার প্লেটে কাচ্চির আলু এক্সট্রা দিতে বললো। ইনশিরাহকে বললো সফট ড্রিংকস বের করতে। একেবারেই ঘরের ছেলের স্বাভাবিক আচরণ।

ওর কথার জবাবে সামিন ঠান্ডা গলায় বলে,“খেয়ে গাড়িতে গিয়ে বসো। ইহান দিয়ে আসবে তোমাকে। মন চাইলে কল করো আমাদের। আমরা কল করলে কথা বলো অনুগ্রহ করে। এখানে অনেকেই আছে যারা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা নিতে পারে না। আশাকরি বুঝতে পেরেছো।”

_জি জি জি।
খেতে খেতে মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দেয় বড় বাবাকে। ওরা সবাই নির্জীব হয়ে দেখছিলো ইরফানকে। খাওয়া শেষে ইরফান উঠে ওয়ালেট বের করে ইনশিরাহ আর ইনায়াকে কিছু ক্যাশ টাকা দেয়, এটা ও প্রায়ই করতো, শেহার জন্যও রেখে গেলো টাকা।

সামিনের সাথে কোলাকুলি করে ইশমামের সাথে কোলাকুলি করলো। ইলহামের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে ইলহাম ছেলের মাথা হাত রাখলো ঠিকই,তবে ইরফানের দিকে তাকালো না।

ইরফান হাসলো নিশ্চুপ, বাড়ির সবাইকে বলে চুপচাপ গাড়ীতে বসার সময়ে ইরফান টের পেলো তার হাঁটু কেঁপে উঠেছে হঠাৎ, এটা,এমন অনুভূতি ইরফান মির্জার জীবনে এই প্রথম হলো, গা ছাড়া ভাব দেখিয়ে এড়ানো গেলো না এই অনুভূতি,এই শেকড় ছেঁড়ার অনুভূতি।

গাড়ি চলছে নির্দিষ্ট গতিতে। পুরো রাস্তা আজ ফাঁকা, জ্যাম খুব কম। ইহান সাবধানী নজর বুলায় আশেপাশে, তারপর একটু বিরতি নিয়ে ইরফানের দিকে তাকায়। দীর্ঘসময় নিশ্চুপ ছিলো, হুট করে ইহানের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসে ছেলেটা, বিনিময়ে ইহানও শুকনো হাসি ফিরিয়ে দেয় ভাইকে।

ইরফান গাড়ির মিউজিক অফ করে দিয়ে পরিবেশটাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে, হুট করে সিটে গা এলিয়ে দিয়ে ইহানকে বলে,“তো তোমরা বিয়ে করে নেবে!”

_বিয়ে?
ভীষণ অবাক ইহান।

_হু বিয়ে, তুমি আর জ্ঞানী আপা বিয়ে করে নেবে নাকি!
হাই তুলতে তুলতে জানতে চায় ইরফান।

একটা লম্বা শ্বাস ফেললো ইহান, ভাইকে ছোটোখাটো একটা ধ'ম'ক দিয়ে বলে,“অনেক বেশি কথা বলিস না? এমন কিছুই নেই আমাদের মাঝে।”

ইরফান হাসলো। কিছুক্ষণ হেসে বললো,“না থাকলেই ভালো। উনি আমার নিরীহ দাদানকে ডিজার্ভ করে না।”

ইহান ভ্রু উঁচিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকায়, কিছু সময় তাকিয়ে থেকে চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে বলে,“উনি আমাকে ডিজার্ভ করেন না, প্রিতম ইনুকে ডিজার্ভ করে না আর তুই ওনার অতটুকু ইনোসেন্ট বোনটাকে খুব ডিজার্ভ করিস,তাইতো?”

দাদানের কথা শুনে ইরফানের মুখটা ফাটা বেলুনের মতো চুপসে যায়।

পরপর কাঁচুমাচু মুখ করে বললো,“ইনোসেন্ট! যা গালি জানে ঐ এতটুকু মেয়ে! নিশ্চয়ই প্রেরণা আপার থেকে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। প্রিতম এতো গালি দেয় না।”

ইহান ভাইয়ের আবোল তাবোল কথায় কর্ণপাত করে না আর।

হুট করে প্রনমির ক্রন্দনরত মুখটা দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে ইরফানের। কাঁদতে কাঁদতে লাল হয়ে যাওয়া ফরসা দু'টো গাল,সেই গালে একটা লাল তিল,রক্তিম নাকের ডগা,ভেজা ভেজা নীল দু'টো চোখ....আরো কি কি! সব আস্তে আস্তে ভেসে উঠতে থাকে চোখের সামনে। ইরফান ওসব ভাবতে গিয়েও বিচ্ছিন্ন হয়ে পরলো পুরো পৃথিবী থেকে। শ্যামলা মুখটায়, ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো অস্পষ্ট হাসি।

ইহান আড়চোখে ইরফানকে দেখে বললো,“হাসছিস কেনো?”

সিটে গাঁ এলিয়ে আড়মোড়া ভেঙে,হাই তুলতে তুলতে ইরফান বললো,“দাদান একটা বিষয়,আমি কিন্তু আমার বৌ তালাক দিইনি।”

ড্রাইভ করতে করতে ইহান শীতল স্বরে জবাব দেয়,“তোর তালাক দিতে হবে না, প্রনমি বিয়ে বাতিল করলেই হবে, ও সুস্থ হয়ে নিক। নাউ স্টপ !”

বাকিটা রাস্তা ইরফান কোনো কথা বললো না, “Hope”-এর মেইন গেট দিয়ে যখন ওদের গাড়ি ঢুকলো তখন ইরফান খেয়াল করলো জায়গাটা একটা জেলখানার থেকে কম কিছু নয়, বিশালাকার এড়িয়া জুরে অবস্থিত এই রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার। উঁচু উঁচু প্রাচীর এবং কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে এড়িয়ার প্রত্যেকটি কোণায় কোণায়। সেকশন ভেদে ভবন গুলো আলাদা আলাদা। মোট সাতটি ভবন,প্রত্যেকটি সাত তলা বিশিষ্ট।”

ইরফান ইহানকে স্বাগত জানায় এখানকার সহকারী ব্যাবস্থাপণা পরিচালক। প্রতিষ্ঠানের প্রধানের সাথে সাক্ষাৎ করে ইরফানের ভর্তি সংক্রান্ত ফর্মালিটিজ পূরণ করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মনরোগ বিভাগের অ্যাকাডেমিক ভবনে। এখানে হাতে গোনা কয়েকজন ডক্টর বাদে সবাই ফরেইনার। কথাবার্তা ভীষণ আন্তরিক এবং নিজেদের অতি অমায়িক ব্যক্তিত্ব দিয়ে তারা সবার আস্থা অর্জন করতে সক্ষম।
ইহানের পছন্দ হয়েছে এখানকার নিয়মনীতি এবং পরিবেশ।

ইরফানের কামরা চারতলাতে। এখানকার রোগীদের কামরা গুলো কিছুটা বোর্ডিং স্কুলের রুম গুলোর মতো। একটা সিঙ্গেল বেড, দু'টো শেল্ফ ভর্তি বই, একটা টেবিল,একটা চেয়ার, একটা ডিভান, একটা কফি মেকার, একটা মিনি ফ্রিজ, দু'টো কেবিনেট, একটা ওয়াশরুম,আর রয়েছে একটা লম্বা বেলকোনি। সবকিছু মানের দিক থেকে বিলাসবহুল,তবে আয়তনে জায়গা খুব কম রুমে। ইরফানের শান্তিনীড়ের রুমের অর্ধেক এই ঘরটা।

খাওয়া-দাওয়ার জন্য প্রতিটি সেকশনের আলাদা ডাইনিং রুম রয়েছে তিন তলাতে। তিনবেলা একটা নির্দিষ্ট সময়ে খাবার দেওয়া হয়,বিকেলে রয়েছে স্ন্যাক্সের সুব্যবস্থা।

প্রতিষ্ঠানের কড়া নিয়মাবলীর মধ্যে রয়েছে, কোনো রোগীর কাছে মোবাইল ফোন অথবা কোনো ধরণের কলিং ডিভাইস থাকা যাবে না, কোনো রোগী প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত পোশাক ব্যাতীত অতি দামী পোশাক পরতে পারবে না। কেউ দেরী করে খেতে যেতে পারবে না। ইত্যাদি ইত্যাদি।

প্রতিটি সেকশনের জন্য জিম এবং মুভি অডিটরিয়াম আছে। অবসরে রোগীরা চাইলেই সেখানে যেতে পারবে। তবে প্রতিদিন ক্লাসে অংশ নিতে হবে।

ইহান পরিচালকের সাথে কথা বলে জানতে পারলো রোগীদের সামরিক প্রশিক্ষণও দেয়া হয় এখানে,নারী পুরুষ উভয়কেই।

অভিভাবকদের জন্যেও রয়েছে কিছু নিয়ম, ইহান সেসব দেখে নেয়।প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর অন্তর পরিবারের যেকোনো একজন সদস্য এসে দেখা করে যেতে পারবে। তিনদিন পর একদিন ফোনকলে কথা বলতে পারবে।

শুরুতেই দুজন কর্মী এসে ইরফানকে নিয়ে যায় সেলুনে তার চুল ছাটতে, এখানে রোগীদের চুলের জন্যও নিয়ম বেঁধে দেয়া রয়েছে।

ইরফান আঁতকে উঠলো এইবার। তার চুলে হেয়ার কাটিং মেশিন চালানোর সাথে সাথে দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে দু'টো গালি দিলো নাপিতকে।

ইহান ভাইয়ের মনের কথা বুঝতে পারলো, হাসলো সে। ইরফান ভাইয়ের হাসিমুখ দেখে বাচ্চা ছেলেদের মতো কন্ঠে বিরক্তিভাব ফুটিয়ে চেঁচায়,“দাদান আমার ভালো হওয়ার সাথে চুলের কি সম্পর্ক!”

_এটা এখানের নিয়ম।

_নিয়ম নিয়ম করতে করতে ওনারা আমার ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। এর থেকে তো জেলই ভালো দাদান।

_ঠিকাছে তবে চল জেলে, তিনমাসে একবার করে চুল ছাটবি সেখানে, পঁয়তাল্লিশ জন লোক মিলে একটা ওয়াশরুম ব্যাবহার করবি,তেল চিটচিটে বালিশে ঘুমাবি,আর.....

_ঠিকাছে ঠিকাছে, আর বলতে হবে না। কাটুক চুল, ন্যাড়া করে ফেলুক আমাকে।

ইরফান নিজের মুখে তালা লাগিয়ে বসে থাকে, নাপিত তার পছন্দের ক্লাসিক কোউফ ছেঁটে ছুটে সর্বনাশ করে দেয় অতি যত্নে।

আয়নায় নিজেকে দেখতে চাইলো না ইরফান। দাদান সুদর্শন তাই তাকে এসব জিরো ট্রিম করা ছাঁটে বেশ মানায়, তাকে নিশ্চয়ই কোজাকের মতো লাগছে। আতঙ্কে নিজেকে দেখতেই চাইছে না ইরফান।
ইহান ঠেলে ভাইকে জোরপূর্বক আয়নার সামনে নিয়ে দাড় করালো। ইরফান অবজ্ঞা নিয়ে দেখলো নিজেকে, বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো নিজের দিকে ড্যাবড্যাব করে।
না,সে যেরকম ভেবেছে,তাকে মোটেও সেরকম লাগছে না , বরং ভালো লাগছে দেখতে। ইহান ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,“কি? খারাপ হয়েছে?”

দু'পাশে মাথা নাড়লো ইরফান। বললো,“আমাকে তো পুরো ইহান তাজওয়ার লাগছে দাদান। তবে কালো ইহান তাজওয়ার।”

বাচ্চাসুলভ কথা শুনে ইহান হেসে ওঠে, হাসে ইরফানও। কিছু মুহুর্তের জন্য দুই ভাই বর্তমান ভুলে চলে যায় কৈশোরে। হাসতে থাকে হোহো করে।

______

ইরফান চলে যাওয়ার এতগুলো ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি শান্তিনীড়ে। বড়রা লিভিং রুমে বসে আছে উদাস হয়ে। ইনশিরাহ আর ইনায়া নিজেদের ঘরে। দোতলার পরিবেশটা কেমন গুমোট ভাব ধরে আছে রিতুর আর্তচিৎকারে। ইহানের গাড়ি স্টার্ট হবার শব্দ শোনার সাথে সাথে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি সে, তখন থেকেই কেঁদে চলেছে শব্দ করে বদ্ধঘরে বসে। আলো অমন আহাজারি নিতে না পেরে রিতুকে দরজা খুলতে বললো বারকয়েক। রিতু দরজা খোলে না, তার কারো স্বান্ত্বনা চাই না।

আলো ইলহামের কাছে গিয়ে বলে,“রিতুকে গিয়ে সামলাও ভাইয়া।”

_ভাবী কিভাবে? দিনকে দিন কেমন অবুঝ হচ্ছে। গেলেই পুরনো দিনগুলোর কথা টেনে আমাকে কথা শোনাবে, পরিস্থিতি এমনিতেই ভালো লাগছে না। তার চেয়ে কাদুক, ও সবসময় ওর কপালের দোহাই দিতো না? ওর কপালের দোষে খারাপ বর জুটেছে, তেমনি ভাবে ওর কপালের দোষেই ছেলেটার আজ এই হাল। এসব ভেবেই কাদুক।

ইলহাম ক্লান্ত পায়ে হেঁটে চলে যায় সেখান থেকে। আলো মলিন মুখে তাকিয়ে রয় রিতুর ঘরের দরজার পানে।

ইহান ইরফানের থেকে বিদায় নিয়ে “হৌপ” থেকে চলে যাওয়ার পরে কিছুক্ষণ মুভি অডিটরিয়ামে বসে ছিলো ইরফান। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিলো সে । এখন তার মন মেজাজ বেশ স্বাভাবিক। আপাতত মেজাজ গরম হবার মতো কিছু ঘটেনি তাই।

ইরফানের পাশে এসে বসলো এক যুবক, তাঁরই বয়সী । পরিচিত হতে এসেছে। ইরফানকে বললো,“কেস কি তোমার?”

_জানতেই হবে? না জানলে চলবে না?

_না মানে,আমিও তোমার সাথে আজ ভর্তি হয়েছি।

_আমার কেস হচ্ছে রাগ প্রচন্ড বেশি। অবশ্য এতে আমার কোন অসুবিধা হচ্ছিলো না, তবে দুনিয়ার লোকের সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। সমস্যা-ই সমস্যা। শশুর বাড়ির লোক বৌ দেবে না আমাকে,রাগ না নিয়ন্ত্রণে আনলে।

হাই তুলতে তুলতে বললো ইরফান। ছেলেটা অবাক হয়ে বললো,“তুমি বিয়ে করেছো?”

_হ্যা,করেছি একটা, তবে কেউ মানতে চায়না।

_কবে বিয়ে করেছো?

_গত পরশু।

ভীষণ অবাক ছেলেটা,বললো,“তোমার বৌ রেখে এখানে চিকিৎসা নিতে এসেছো?”

ইরফান উঠে দাঁড়ালো, বলিষ্ঠ দেহ নে'ড়ে চেড়ে গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলল,“না। ভবিষ্যতে বৌ আনবো বলে চিকিৎসা নিতে এসেছি।”

ছেলেটা তাকিয়ে রয়। ইরফান হেলেদুলে চলে যায় সেখান থেকে।
বিকেলের হালকা কিছু স্ন্যাক্স খেয়ে একটা বই নিয়ে বসলো ইরফান, একাডেমিক বইয়ের বাইরে জীবনে কখনো আউট বই পরেনি সে। ঠান্ডা মাথায় রুটিন দেখে নিলো, কোনদিন কোনদিন কাউন্সিলিং হবে,সেসব। তারপর গালিভার ট্রাভেলস বইটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে রেখে দিয়ে রুমে কিছুক্ষণ অযথা পায়চারি করলো, সে পরে আছে একটা ঢিলেঢালা ট্রাউজার আর ফুল স্লিভ টি-শার্ট। এখানে টু কোয়ার্টার,থ্রি কোয়ার্টার এলাউ নয়।
ইরফানের পোশাক নিয়ে ভীষণ বিরক্ত লাগলেও সে জানে না তাকে কতটা সুদর্শন লাগছে। ভিন্ন রকম লাগছে মির্জা বাড়ির রগচটা ছেলেটিকে।
সময় কাটানোর মতো কিছুই পেলো না সে, বই পড়া তার দ্বারা হবে না। হাত দুটো কম্পিউটারে গেমস খেলার জন্য নিশপিশ করছে, ঠোঁট দুটো নিশপিশ করছে একটা সিগারেট ফুঁকতে।

তখন সময় সন্ধ্যা ছয়টা, ইরফানের ভীষণ মেজাজ গরম হতে লাগলো। ভীষণ। সে আশেপাশে তাকালো , পর পর অস্থির হয়ে আচমকা থামলো, দৃষ্টি স্থির হয় ঘরের এক কোণে চারপায়ী টেবিলে। আচমকা ইরফানের সেদিন রাতের কথা মনে পরে যায়। প্রনমি ছুটে গিয়ে এই রকম টেবিলের নিচে আশ্রয় নিয়েছিলো। দৃশ্যটা মনে পরতেই ইরফান দাঁড়িয়ে রয় কিছু পল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় টেবিলের কাছে। ভীষণ কৌতুহলী হয়ে ঝুকে বসে সে। তারপর হুট করে নিজেই ঢুকে গেলো টেবিলের নিচে, শুধুমাত্র এটা দেখতে এই টেবিলের নিচে ঢুকে বসে থাকতে কেমন লাগে।

নিজের কান্ডে নিজেই বেশ অবাক ইরফান। সে কি পাগল হয়েছে! প্রনমির মায়াভরা মুখ আর কাঁপতে থাকা রক্তিম দু'টো ঠোঁট মনে করে একদফা লাজুক হাসলো সে। তারপরও বসে রইলো টেবিলের নিচে।
এতক্ষণের ধীরে ধীরে গরম হওয়া মেজাজ টা শীতল হলো ইরফানের।

ওদিকে ইভিনিং ভিজিটর এসে বারংবার দরজায় নক করলেও ইরফান কোনো সারা দিচ্ছিলো না, সে তো ব্যস্ত প্রনমিকে ভাবতে।

ভিজিটর দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো, আশেপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে হতভম্ব হয়ে গেলো সে ইরফানকে দেখে। অমন তাগড়া একটা যুবক তার ব'লিষ্ঠ দেহ নিয়ে আঁটসাঁট হয়ে বসে আছে টেবিলের নিচে। হতভম্ব হয়ে ভিজিটর বললো,“আপনি!”

ইরফান দারুণ লজ্জায় পরে গেলো। কিন্তু লোকটাকে তার লজ্জা বুঝতে না দিয়ে মুখটাকে গম্ভীর করার চেষ্টা করলো।

লোকটা বলে,“আপনি টেবিলের নিচে ঢুকে বসে আছেন কেন।”

ইরফান গম্ভীর কন্ঠে জবাব দেয়,“এতে রা'গ কমে যায়।”

ভিজিটর অবাক, ভীষণ অবাক, নিজেকে সামলে বললো,“রাগ কমানোর জন্য এখানে প্রফেসর রয়েছেন, তাদের কাছে ক্লাস করবেন। এভাবে টেবিলের নিচে বসে থেকে রাগ কমানোর প্রয়োজন নেই। বেরিয়ে আসুন। প্রফেসর অ্যান্থনি আপনাদের নিউ মেম্বারদের অডিটরিয়ামে ডাকছেন, পরিচিতি ক্লাস হবে ঠিক সন্ধ্যা সাতটায়‌।”

______

লোকটা দেখতে অমায়িক। বয়সে ততটাও বৃদ্ধ নন,তবে সাদা ধবধবে দাঁড়ির কারণে একটু বেশি বৃদ্ধ লাগে দেখতে। ইহান তাজওয়ারের পার্টির অফিসের সামনে প্রায়শই দেখে ইহান, পেশায় একজন ভিক্ষুক লোকটা।
ইহান গাড়ি থেকে নামতেই লোকটা ছুটে এসে হুমরি খেয়ে পরলো একপ্রকার। ইহান সালাম দিয়ে তাকে কিছু সাহায্য করলো।
আজ সকাল সকাল এসেছে ইহান, লাগাতার ফোনকল তাকে টিকতে দেয়নি বাড়িতে।

ইরফানের রিহ্যাবে চলে যাওয়ার দুদিন পেরিয়েছে। বাড়ির পরিবেশ সেরকমই থমথমে, রিতু কেমন নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছে। বাড়ির প্রাণ হারিয়েছে। ইনশিরাহ ঘর থেকে বেরোয় না খুব একটা। সামিন, ইলহাম, ইশমাম প্রয়োজনের কাজ টুকু করতে বাইরে যান, প্রতিবেশীদের সাথে আড্ডা দেয় না অবসরে। অফিস থেকে সোজা বাড়িতে চলে আসে।

তাড়াহুড়ো করে ইহান আজ অফিসে ঢুকতেই দেখতে পায় তার কক্ষে বসে আছে স্বাদে আহ্লাদের ম্যানেজার সাব্বির। বিবর্ণ মুখে বসে আছে সে, ইহানকে দেখতে পেয়েই উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিলো।

সালামের জবাব দিয়ে ইহান তাকে বসতে বলে। সাব্বির বসে আছে শুকনো মুখ নিয়ে, যারপরনাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সে, তার ওপর নতুন এক আতঙ্কের নাম ইহান তাজওয়ার । আজ তাকে এখানে কেন ডাকা হয়েছে সে ব্যাপারে জানে না সাব্বির। তাই দ্বিগুণ চিন্তিত সে।

ইহান কেশে সাব্বিরের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললো,“সব ভালো?”

_জি ভাই!
আমতা আমতা করতে লাগলো সাব্বির।

ইহান কোনো ভণিতা না করে সরাসরি সাব্বিরকে বললো,“একটা বিশেষ ব্যাপারে জানতে তোমাকে এখানে ডাকা। আচ্ছা তোমাদের হোটেলের সাইনবোর্ড কেন খোলা হয়েছে?”

সাব্বির একটা ঢোক গিললো, হরবর করে বলে ওঠে,“চুক্তির মেয়াদ শেষ তাই ।”

_কোথায় হোটেল খুলছো তবে?

_আপাতত কোনো দালান খুঁজে পাইনি ভাই।

_এর আগে কি করেছো? ছাড়লে কেন?

_আসলে ভুঁইয়া দের এই দালান ছাড়ার পরিকল্পনাই ছিলো না আমাদের। ম্যামের সাথে একটা ঝামেলার জের ধরে উনি ম্যামকে কোনো নোটিশ না দিয়েই....

_ঝামেলা?
ইহান কৌতুহলী হয়ে জানতে চায়।

সাব্বির মিনমিন করছিলো। ইহান শীতল স্বরে বলে,“কি ঝামেলা?”

_আসলে....
একটু থেমে সাব্বির বলতে লাগলো,“যতদূর শুনতে পেয়েছি কানাঘুষা ঐ সাগর ভুঁইয়া ম্যামকে বাজে প্রস্তাব দিয়েছিলো,ম্যাম রাজি না হওয়ায়......”

ভ্রু কুঁচকে যায় ইহানের। চোয়াল শক্ত হয়,বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলে,“কে? সাগর ভুঁইয়া?”

_জি ঐ বুড়ো বাঘডাশ। খুব বিপদে পরেছি ভাই। হাতে আর মাত্র দশদিন আছে। এর মধ্যে একটা ব্যবস্থা করতে হবে।

ইহান কিছুক্ষণ চুপ থেকে সাব্বিরকে বললো,“ঠিকাছে যাও।”

_কেন ডেকেছিলেন ভাই তা তো বললেন না।

_এমনিই ডেকেছিলাম, সামনে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন, ভোটটা আমাদের পার্টিকে দেবে কেমন? ভালো থেকো, যেকোনো অসুবিধা জানিও।

সাব্বির বুঝতে পারলো না কিছু,তাকে কেন ডাকা হয়েছে বুঝতে পারলো না। এতকিছু মাথায়ও ঢুকছিলো না তার। তার মাথার পোকা গুলো সারাদিন কলকলিয়ে বলে,“নতুন দালান, নতুন দালান।”
এই মাথায় আর কি ঢুকবে?

সাব্বির বেরিয়ে যেতেই ইহান একটা লম্বা শ্বাস ফেললো। সাগর ভুঁইয়ার বিষয়টি জানতে পেরে রাগে কাঁপছে সমস্ত শরীর। একগ্লাস পানি খেলো সে। তখুনি আপন এলো অফিসে। দীর্ঘ পনেরো দিন পরে দেশের বাড়ি থেকে এসেছে ছুটি কাটিয়ে। ইহানের সাথে কুশল বিনিময় করে একটা চেয়ারে বসলো আপন। ওকে উশখুশ করতে দেখে ইহান বললো,“আর কিছু বলবি?”

_ভাই বাড়ির সবাই ভালো আছে? আমাদের ইশি কোথায় ভাই?

_ইশিকে দেখেছি সকালে বেরিয়েছে ক্যামেরা নিয়ে।

আপন ভীষণ ঘামছিলো। ইহান ভ্রু কুঁচকে বলে,“কি হয়েছে? খুলে বল।”

এদিক ওদিক তাকিয়ে আপন একটা ঢোক গিলে নিয়ে বললো,“ভাই মাইন্ড করবেন না। ইশির ব্যাপারে আপনাকে কিছু বলার আছে আমার।”

ইহান অবাক। আপনের মুখের দিকে তাকিয়েই রাশভারী গলায় বলে,“ইশির ব্যাপারে?”

চলমান......

[ সামান্য সময়ে লিখেছি,আজ বাড়ির কাজে হেল্প পেয়েছি তাই। এতো অল্প সময়ের লেখা তাই পঁচা হয়েছে। মানিয়ে নিবেন।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 41 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন