#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৪২
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
আজ বহুদিন পরে প্রণমিকে নিজের হাতে গোসল করিয়ে, নতুন সালোয়ার কামিজ পরিয়ে সাজাচ্ছে প্রেরণা। ব্যস্ততার জীবনে নিজের চুলে চিরুনি বসানো, শুদ্ধর হাতের নখ কে'টে দেওয়ার মতো ছোটো ছোটো কাজগুলোও করতে ভুলে যায় প্রেরণা, প্রনমির যত্ন নেয়নি আজ বহুদিন।
লালচে-কালো দীঘল চুল প্রনমির,নেমেছে কোমরের নিচ পর্যন্ত। অল্পস্বল্প ঢেউ খেলেছে চুলে। হেয়ার প্যাক লাগিয়ে আজ শ্যাম্পু করে দিয়েছে প্রেরণা। ভারী মিষ্টি সুবাস ছড়াচ্ছে মেয়েটা।
প্রনমি বসে আছে জড়োসড়ো হয়ে, আজ মেয়েটা নিজে থেকে একটা দু'টো কথা বলছে, প্রেরণা সুযোগটা হাতছাড়া করলো না। সে চায় মেয়েটার মন থেকে সব ভয় দূর করে দিতে। তাই সময় কাটাচ্ছে প্রনমির সাথে।
ভেজা চুল থেকে একফোঁটা দুফোঁটা করে গড়িয়ে পরছে জল। অপরূপ রূপসী মুখটায় এক সমুদ্র স্নিগ্ধতা লেপ্টে আছে, তাকে লাগছে রূপকথার রাজকন্যাদের মতো। মম আর ড্যাড দুজনের সৌন্দর্য পুরোটাই পেয়েছে প্রনমি।
গাঁয়ে একটা সবুজ রঙের সালোয়ার কামিজ ওর। ওড়নাটা দু'কাধে আড়াআড়ি ভাবে ফেলে প্রেরণা বললো,“সোনা...”
_হু।
মৃদু সারা দেয় প্রনমি।
_একটা গান করবি?
প্রনমি দুপাশে মাথা নাড়ায়। সে গান করবে না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রেরণা বলে,“কিসের ভয় তোর প্রনো? কোনো ভয় নেই আর। সব বিপদ কেটে গিয়েছে সোনা!”
_ভয় পাচ্ছি না আমি,আমার গাইতে ইচ্ছে করে না আপু।
_না ভয় পাচ্ছিস। বল আমায়,কি হয়েছে? না বললে বুঝবো কিভাবে?
প্রনমি কিছু মুহূর্ত নীরবতা পালন করে বলতে লাগলো,“আপু! ভাবীর চাচা চাচীরা এ বাড়িতে কেন আসেন? ওনারা কি আমাকে নিয়ে যেতে চান? আপু সেদিন আমি ভয় পেয়ে কবুল বলেছি,আমি করিনি বিয়ে লোকটাকে। আমি যদি কবুল না বলতাম ঐ লোকটা আমার সাথে খারাপ কিছু করে ফেলতো। আমি ঐ লোকটার কাছে যাবো না। ভাবীর বাড়ির লোক কি আমাকে নিয়ে যেতে চায়? আমি যাবো না, এই বিয়ে আমি মানিনা আপু।”
কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বিড়বিড় করছিলো প্রনমি। প্রেরণা বোনের আ'ত'ঙ্কি'ত মুখটার দিকে মলিন মুখে তাকিয়ে রয়, মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,“কেউ নিয়ে যাবে না তোকে। এই বিয়ে হয়নি। আর ইনুর চাচা চাচী আসে তোকে দেখতে। সামিন আঙ্কেল আর ওনার ওয়াইফ এই বিষয়ে একটা কথাও বলেননি। ওনারা শুধু তোর শরীরের খোঁজখবর নেন,ইনুকে দেখতে আসেন। কিচ্ছু ভয়ের নেই আর। আমরা আছি না? মরে গিয়েছি?”
আজ সকাল সকাল ঘরের সব কাজ করে নিয়েছে প্রেরণা। আজকে একটা বিশেষ দিন, প্রনমি আর মিস জেনি বাদে প্রেরণা, ইনায়া আর প্রিতম যাবে শুদ্ধকে নিয়ে হসপিটালে। আজ শুদ্ধর সুন্নতে খৎনা করানো হবে।
এর আগে প্রেরণা হেল্পিং হ্যান্ড নেয়নি কোনো,তবে ইনায়া আসার পর থেকে নিতে হয়েছে, প্রেরণার ব্যস্ততা বেড়েছে, পড়ুয়া মেয়েটার অযথা কাজে হাত লাগাতে হয়।
সবকিছু গোছগাছ করে কিচেনের দিকে যাওয়া ধরলে প্রেরণা চাঁপা আর্তনাদ শুনতে পেলো ইনুর, ছুটে গেলো সে কিচেনে। গিয়ে দেখলো হাতের আঙ্গুল সামান্য কে'টে ফেলেছে লেমন গ্রাস কাটতে গিয়ে।
আঙ্গুলে ফার্স্ট এইড করতে করতে আড়চোখে ইনায়াকে একপলক দেখে প্রেরণা বললো,“এতো অন্য মনস্ক কেন থাকো?”
_কই না তো আপু!
বড্ড মায়া লাগলো প্রেরণার মেয়েটির প্রতি, বিয়ের দিন থেকে একটার পর একটা ঝামেলা আর দায়িত্বের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে মেয়েটা। বয়স কতই বা! সবে কুড়ি। এই এতো ঝামেলার একটা যবনিকা টানা প্রয়োজন। নয়তো প্রিতম আর ইনায়ার এতো উতলা প্রেম পানসে হতে দেখলে প্রেরণার খারাপ লাগবে। ভাইয়ের বৌকে প্রেরণা বললো,“আজ শুদ্ধর ঝামেলাটা যাক,প্রিতমের সাথে এক সপ্তাহের জন্য কোথাও ঘুরে আসবে। তোমরা ঘোরাঘুরি করে আসার পরে হবে রিসিপশন। মানে হানিমুনের পরে হবে রিসিপশন।”
হেসে ফেললো প্রেরণা, হাসলো কারণ ইনায়াকে হাসাতে চায় তাই। তবে ইনায়া মন খুলে হাসলো না,ম্লান হাসলো।
প্রেরণা জানে,প্রেরণা বোঝে, কেনো ইনায়া এমন করে। আসলে ভাইয়ের জন্য মন পোড়ে তাই। প্রেরণা আর কথা না বাড়িয়ে উঠে দাঁড়ায়।
শুদ্ধ ইবনে ওয়াসীত আলমারির মধ্যে লুকিয়ে আছে। ভীষণ ভীত হয়ে পরেছে ছেলেটা। ঐ অতটুকু হলেও শুদ্ধ জানে সুন্নতে খৎনা কি,তাদের ক্লাসের আইজান তাকে বলেছে কিছুদিন আগে, আইজান বলেছে একজন ডাক্তার একটা কাঁচি দিয়ে কচাৎ করে “নুনু” কেটে দেয়। অনেক ব্যাথা হয়। আইজানের টা কাটা হয়েছে দশদিন আগে।
প্রেরণা প্রিতম ইনায়া পুরো ঘরময় তন্নতন্ন করে খুঁজে শুদ্ধকে আলমারি থেকে উদ্ধার করলো। শুদ্ধ কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো,“মাম্মা আমি যাবো না। আমি কোথাও যাবো না।”
_আমরা তো রোলার কোস্টার চড়তে যাচ্ছি বাবা। তুমি কি ভেবেছো?
শুদ্ধ চোখ মুছলো । দু'চোখ ভরা বিস্ময় নিয়ে বললো,“রোলার কোস্টার?”
_হুম সোনা। আচ্ছা তোমার মামী মনিকে জিজ্ঞেস করে দেখো।
শুদ্ধ ইনায়ার দিকে তাকালো। ইনায়া মাথা নেড়ে প্রেরণার বলা মিথ্যাটাকে বিশ্বাস করালো শুদ্ধকে। মামী মনিকে শুদ্ধ বিশ্বাস করে। মামী মনিকে শুদ্ধ এই ক'দিনে কখনো তার সাথে মিথ্যা কথা বলতে দেখেনি সে। মাম্মা,মামা বহুবার শুদ্ধকে বোকা বানিয়েছে। মামী মনি বানায়নি।
অবশেষে ছেলেটা সব ভয় ডর এক পাশে রেখে মা,মামা,মামীর মন ভোলানো মিথ্যা কথায় ভুলে গিয়ে রেডি হলো মায়ের হাতে। তখন সে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলতেও লাগলো আজ সারাদিনে রোলার কোস্টারে চড়া ব্যতীত আর কি কি করতে চায় সে।
প্রেরণার নিষ্পাপ ছেলেটাকে মিথ্যা কথা বলতে মায়াই লাগলো। তবে কি আর করার! শিশ্নের অগ্রভাগের চামড়া পুরো হয়ে গিয়েছে বিধায় মুত্রত্যাগে অসুবিধা হচ্ছে শুদ্ধর। ডাক্তার বলেছে খৎনা করিয়ে দিলেই ঠিক হয়ে যাবে। তাই যে তাদের বড্ড তাড়া।
শুদ্ধকে যখন লাইফস্প্রিং প্রাইভেট হসপিটালের গেট দিয়ে কোলে নিয়ে প্রিতম ঢুকছিলো শুদ্ধ তখনও বুঝতে পারছিলো না তার সাথে কি হতে চলেছে। ঐ অতটুকু মস্তিস্ক সবটা তখনই ধরে ফেললো যখন একজন ডক্টর তার প্যান্ট খুলে দেখলো।
আর অমনি হসপিটাল কাঁপিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু। প্রিতম ইনায়া কোনোভাবেই তাকে শান্ত করতে পারছিলো না।
এদিকে প্রেরণা ডক্টরের সাথে জরুরি আলাপ করছে। প্রেরণা লেজার কাট খৎনা পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে কিছুতে যেতে দেবেনা শুদ্ধকে। ব্যাপক হারে দূর্ঘটনা ঘটছে আশেপাশে। মায়ের মন সায় দিচ্ছে না। ওদিকে অচেতন করে খৎনা পদ্ধতিতে সাম্প্রতিক সময়ে তিনজন শিশু নিহত হয়েছে। মনে ভয় ঢুকে গিয়েছে প্রেরণার। তার মন এতেও সায় দিচ্ছে না।
ডাক্তার বললেন,“তাহলে আপনি চাচ্ছেন কি? আপনার ছেলে সাধারণ পদ্ধতিতে কাজটা আমাদের করতে দেবে বলে মনে হয় না। আপনি ভাবুন। ভেবে সিদ্ধান্ত জানান।”
প্রিতম ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে শুদ্ধকে বোঝাচ্ছে, রীতিমতো হাপাচ্ছে সে, বললো,“মামু। শোন মামু। এতে একটুও ব্যাথা পেতে হয়না। একটুও না, একটা পিঁপড়া তোমাকে কামড়ে দিলে যেমন লাগবে, এর বেশি ব্যাথা হবেই না।”
_না, এটা তোমরা সবসময় বলো, ইনজেকশন পুশ করার আগে মাম্মা বলে পিপড়া কামড় দেওয়ার মতো ব্যাথা লাগবে, কিন্তু আমি অনেক ব্যাথা পাই।
_কিন্তু মামু। সবাই করে এটা। তোমার বন্ধুরাও করবে। করতেই হবে। ঐ যে ডক্টর আঙ্কেলকে দেখছো? উনিও করেছেন?
_উনিও করেছেন?
শুদ্ধ অবাক হয়, তাকায় ডাক্তার আঙ্কেলের দিকে। যে প্রেরণার সাথে কথা বলছিলো।
প্রিতম বললো,“হ্যা,উনিও করেছেন। ছেলে রা সবাই করে। তোমার স্পাইডার ম্যান করেছে, সুপারম্যান করেছে। সবাই করেছে খৎনা।”
_সুপার ম্যানও খৎনা করেছে?
_জি।
আবোলতাবোল বলে বোঝাতে থাকলো প্রিতম শুদ্ধকে। ইনায়া পেছনে দাঁড়িয়ে মুখে ওড়না চে'পে হাসছে। শুদ্ধ হঠাৎ প্রিতমকে বলে ,“তুমিও করেছো?”
প্রিতম ভড়কায়। ইনায়া দমবন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রিতম কিছুটা সময় নিয়ে আস্তে ধীরে শুদ্ধকে বলে,“জি করেছি।”
শুদ্ধ অবাক,তার মামাও এটা করেছে সেটা শুনে সে ভীষণ অবাক। অবশ্য আইজান বলেছিলো আইজানকে আইজানের পাপা বলেছে,তার পাপাও নাকি এটা করেছে। তবুও শুদ্ধ প্রিতমকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না, বললো ,“দেখাও আমাকে।”
প্রিতম বাকরুদ্ধ। ঘামছে রীতিমতো। ইনায়া আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলো না,ওখান থেকে ছুটে পালিয়ে গেলো ওয়েটিং রুমে। সেখানে দাঁড়িয়ে এক দফা হেসে আবারও এসে দাঁড়ায় সেখানে। প্রিতম কাঁচুমাচু মুখ করে ইনায়াকে বলে,“এতো না হেসে ওকে একটু বোঝাতে তো পারো। মামী মনিকে ভীষণ মানে ও।”
______
কপালের নিলচে শিরাগুলো দৃশ্যমান। দেখতে ভীষণ শান্ত লাগলেও ভেতরে ভেতরে ভীষণ ক্ষ্যাপাটে হয়ে উঠছে ইহান তা আপন বুঝতে পারছে। সে গুছিয়ে বলতে লাগলো এবার,“আন্দাজে একটা কথা বলে দিলেই তো হয়না ভাই। প্রথম তিন বার যখন নজরে পরেছে তখন নিজের ভ্রম বলে নিজেকে বুঝ দিয়েছি, কারণ এটা তো অবিশ্বাস্য তাই না! ইশি মির্জা বাড়ির মেয়ে আর ঐ সাঈম..... তারপর সেই ইন্সিডেন্ট টা,ইশি যে উচ্চমাধ্যমিকে থাকতে ছেলেটাকে থাপ্পড় মেরেছিলো। এসব কিছু ভেবে এই ব্যাপারটা পৃথিবীর সবথেকে অবিশ্বাস্য ব্যাপার ছিলো আমার কাছে। কিন্তু আজ নিয়ে পাঁচ বার ওদের একসাথে দেখলাম। সরি ভাই,কিছু মনে করবেন না। আমার কাছে স্বাভাবিক লাগেনি ব্যাপারটা। বাকি টা আপনি একটু খোঁচা দিলেই হয়তো বুঝতে পারবেন। ভাই, আমার মনে হচ্ছে আমাদের ইশি কোনো বড় ট্র্যাপে পরেছে।”
ইহান চুপচাপ শুনতে থাকলো সেসব কথা। তার মস্তিস্ক তখন নানা হিসেব মেলাতে ব্যস্ত। ইশিকে সাঈমের বিষয়ে কোনো সতর্কবাণী দিলে ইশির ঘা'ব'ড়ে যাওয়া মুখ, অযথা ইহানকে দেখে ইশির ফোন লুকিয়ে ফেলা, বাড়িতে ভুঁইয়াদের বিষয়ে কোনো সমালোচনা হলে ইশির সেখান থেকে নিশ্চুপে উঠে চলে যাওয়া কিংবা নরম প্রতিবাদ করা। সবকিছুর জট খুলে যায় হুট করে। অসহ্য রকমের তেঁতো অনুভূতি হচ্ছে ইহানের। কি প্রতিভাবান, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন, স্বাধীনচেতা বোনটা এতোটা বোকা!
ইহান আপনকে চলে যেতে বলে সেখান থেকে। হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিয়ে কাউকে কল লাগায়, বিড়বিড় করে বলতে থাকে,“এসব কিছুই মিথ্যে। আমি আমার বোনের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চাইনা, এসব কিছু যেনো মিথ্যে হয়। বড় মা ভীষণ কষ্ট পাবে!”
ওপাশ থেকে কেউ ফোনটা রিসিভ করে, ইহান গম্ভীর হয়ে বলতে লাগলো,“আমার একটা ছোটো কাজ করতে হবে।”
______
অবশেষে! অবশেষে! অবশেষে! দীর্ঘ এক ঘন্টার প্রচেষ্টা সফল হলো ইনায়ার। তোতাপাখির মতো ঠোঁট নেড়ে শুদ্ধকে রাজ্যের মন ভোলানো কথায় ভোলাতে সক্ষম হলো অবশেষে। একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ইনায়া বসলো চেয়ারে। হাঁফ ধরে গিয়েছে তার। প্রিতম গর্বিত দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে হাসে নির্মল হাসি। শুদ্ধ বাবু তখন গুড বয়ের মতন শুয়ে আছে কেবিনে। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাতে দাঁত চেপে শক্ত হয়ে পরে আছে ছেলেটা। তাকে সব ভয় দূর করতে হবে। মামী মনি বলেছে ব্রেভ বয় হতে হলে এটা করতেই হবে। শুদ্ধ হতে চায় ব্রেভ বয়। তাকে প্রমাণ দিতেই হবে মাম্মার কাছে সে ব্রেভ বয়,নয়তো মাম্মা নেক্সট ইয়ার তাকে প্যারাগ্লাইডিং করাতে নিয়ে যাবে না।
শুদ্ধ যথেষ্ট সাহসী হয়ে উঠেছে ইনায়ার বুঝ নিয়ে। সে প্রস্তুত,নিজেকে নিজে প্রমিজ করলো শুদ্ধ, কোনো চেঁচামেচি নয়, কোনো কান্নাকাটি নয়। মাম্মা সবসময় বলে শুদ্ধর পাপা ছিলেন একজন হিরো,একদম সুপারম্যানের মতো। যুদ্ধ করতো পাপা,মোটেও ব্যাথা পেতো না সে। শুদ্ধও কাঁদবে না।
ডক্টর এর মাঝে আটটা খৎনা করে ওদের কেবিনে এলেন প্রেরণার সিদ্ধান্ত জানতে, প্রেরণা বললো তার ছেলে রাজি হয়েছে।
তাদেরকে আরো কিছুটা সময় দিয়েছে ডক্টর। এর মাঝে হঠাৎ প্রিতমের ফোনে একটা কল আসে। কলটা রিসিভ করেই প্রিতমের মুখটা শুকিয়ে একটুখানি হয়ে যায়, চেঁচিয়ে ওঠে সে,“হোয়্যাট!”
প্রেরণা আর ইনায়া চিন্তিত হয়ে তাকলো। ফোন কেটে প্রিতম উদ্বিগ্নতার সাথে প্রেরণাকে বলে,“আপু শুভ বাইক অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। চোট পেয়েছে ভীষণ।”
প্রেরণা আর ইনায়া জোর করে প্রিতমকে পাঠিয়ে দিলো শুভর কাছে। প্রিতম বন্ধুর বিপদে ছুটে যেতে চাইলেও হিমশিম খাচ্ছিলো একটা অজানা আতঙ্কে। প্রিতমের থেকে ভালো,প্রেরণাকে কেউ চেনে না। এই যে এই ভদ্রমহিলা এখন যতটা শক্তপোক্ত ভাব নিয়ে সবটা সামলাচ্ছে,এই মহিলা খানিক বাদে একটা বাচ্চা হয়ে যাবে। খুব ভে'ঙে পরবে প্রেরণা,প্রিতম জানে।
ইনায়া প্রিতমকে বোঝালো,প্রিতমকে ভরসা দিলো সে প্রেরণাকে সামলাবে। মনে বড় দ্বিধা নিয়ে প্রিতম ছুটলো শুভকে দেখতে।
নিজেকে সর্বসময় একটা শক্ত খোলসে আবৃত করে রাখা প্রেরণার পৃথিবীতে অন্যতম এবং সবথেকে বড় দুর্বল যায়গা তার ছেলে। সামান্য জ্বর হলেও যে মহিলা পানি মুখে দিতে ভুলে যায়,আজ চোখের সামনে এসব স্থির দাঁড়িয়ে দেখতে পারবে না সে।
ইনায়া যথেষ্ট আত্মপ্রত্যয়ী,ইনায়াকে বাড়ির লোক থেকে শুরু করে বন্ধুরা সবাই হাবলি নেকু বলে সম্বোধন করলেও সে খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে এক একটা দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। এই যে এখন প্রিতমকে যেহেতু সে বলেছে আপুকে সামলে নেবে,তার মানে নেবেই।
প্রেরণাকে ঠেলে বসিয়ে দিয়ে সে শুদ্ধর সব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলো। প্রেরণা ক্রমশ ভে'ঙে পরছে, রীতিমতো হাত পা ঘামছে। চোখের সামনে নিউজ পোর্টাল গুলোর চড়া দাগের আর্টিকেল সামনে ভেসে উঠছে,“ডক্টরের সামান্য ভুলে এক শিশুর মৃত্যু, খৎনা করতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত পাঁচ বছরের এক শিশুর মৃত্যু।”
দৃষ্টিপটে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে খবরগুলো। প্রেরণা ঘামছে, ঢোক গিলছে বারবার, একবার ভাবলো প্রিতমকে কল করবে, তার অবস্থা বেগতিক। কিন্তু দিলো না, শুভ ছেলেটার পাশে প্রিতমের সবার আগে থাকা উচিত। এ শহরে বিপদে আপদে ওরা সবসময় প্রেরণাকে দেখেছে।
শুদ্ধ তখন শক্ত হয়ে শুয়ে আছে,চোখ মুখ খিচিয়ে। ডক্টর এলো, সবকিছু গুছিয়ে যেই না কদম বাড়ালো শুদ্ধর দিকে অমনি প্রেরণা বিকট শব্দে কেঁ'দে উঠলো।
মায়ের মন, মা এমনই। সামান্য যন্ত্রণা সহ্য করতে পারবে না প্রেরণা।
ডক্টর থমকালো, রীতিমতো ভ্যাবচ্যাকা খেলো ডক্টর ভদ্রমহিলার এমন ভোল পাল্টানো দেখে। যথেষ্ট শক্ত গোছের মনে হয়েছিলো প্রেরণাকে।
ইনায়া এবার মাথায় হাত দিলো, প্রেরণার এহেন মানসিক অবনতি ঘটবে সে ভাবতেই পারেনি। শুদ্ধ চোখ বড়বড় করে মায়ের কান্না দেখছিলো, আশ্চর্যের বিষয়, শুদ্ধ ভয় পাচ্ছে না তবে মাম্মা কাঁদছে।
শত বোঝানোর,শত ভরসা দেওয়ার পরেও প্রেরণা কাঁদছিল বাচ্চাদের মতো, সে সহ্য করতে পারবে না।
ডক্টর ঘাবড়ে গিয়ে ইনায়াকে বললো,“এভাবে আমি কাজ করতে পারবো না তো! আপনাদের সাথে কোন পুরুষ লোক নেই? কি আশ্চর্য। ওনাকে সামলান!”
একদিকে প্রেরণা,আরেকদিকে শুদ্ধ। ইনায়া কাকে রেখে কার কাছে যাবে! প্রিতম তাকে কল করে মিনিট দুয়েক আগে জানিয়েছে শুভকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, প্রিতম এই পরিস্থিতিতে দুশ্চিন্তা করবে তাই ইনায়া এদিকের কথা জানালো না কিছু, সবটা যেভাবে হোক সামলে নেবে সে।
কিন্তু কীভাবে সামলাবে? আজ প্রেরণা আপুর অন্যতম দুর্বল রূপটা দেখে নিলো ইনায়া, কিছু মুহুর্তের জন্য ইনায়া থমকালো, প্রেরণা আপুর জন্য বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো তার, দুলাভাই এই সময়ে পাশে থাকলে কত না সুন্দর হতো সবটা! এমন ভয়ংকর পরিস্থিতি যেন কোনো মেয়ের জীবনে না আসে।
ডাক্তার হতাশ হয়ে আরো কিছুক্ষণ সময় দিলো তাদের। প্রেরণা পারছিলো না নিজেকে সামলাতে, হুটহাট তার প্যানিক অ্যাটাক হয়। তখন কোনোভাবেই নিজেকে সামলাতে পারেনা সে। শুদ্ধর জন্মের দিনটার কথা মনে পরে যায় প্রেরণার। স্বামীর সাথে কোন যোগাযোগ করতে না পেরে ধীরে ধীরে যখন অসুস্থ হয়ে পরছিলো প্রেরণা,শুদ্ধ তখন তার পেটে জানান দিচ্ছিলো সে আসতে চলেছে।
প্রিতম তখন কেবল রওনা দিয়েছিলো এই শহর থেকে, মিস জেনি প্রনমিকে নিয়ে গিয়েছিলেন হসপিটালে। সে সন্ধ্যায় প্রেরণার লেবার পেইন ওঠে। ঐ অতো বড় বাড়িতে কেউ ছিলো না তখন। কাউকে যে কল করবে,ফোনটাও খুজে পাচ্ছিলো না, অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে বাথটাবে গিয়ে বসেছিল প্রেরণা, শুদ্ধকে সেখানেই জন্ম দেয় সে।
তখনও প্রেরণার মনে উত্তেজনা ছিলো, শাওকাত ফিরে চ'ম'কে যাবে,একসপ্তাহ পরেই তো মেজর সাহেবের ফেরার কথা ছিলো।
আসলো না শাওকাত,ফিরলো না। ছেলেকে দেখলো না,প্রেরণাকে দেওয়া কথা রাখলো না।
নিঃস্ব হয়েও সেই প্রেরণা ছেলেকে বুকে আগলে শক্ত থেকেছে। যখন জানতে পারলো তার স্বামীর লাশটাও দেখতে পারবে না সে, সে তখনও শক্ত থেকেছে। কিন্তু মাঝে মাঝে কি যে হয় প্রেরণার! শুদ্ধকে নিয়ে যে তার দুনিয়া,এই দুনিয়া ব্যাথা পেলে সে ম'রেই যাবে।
ইনায়া বিপদ থেকে উতরানোর একটা উপায় খুঁজে পেলো,জলদি জলদি কল দিলো ইনশিরাহর কাছে। আপু যথেষ্ট দৌড় ঝাঁপ করতে পারে,নিশ্চয়ই এই পরিস্থিতি সামলে নিতে পারবে ইনশিরাহ।
কিন্তু ইনশিরাহ কলটা ধরলো না। বারকয়েক চেষ্টা করে হতাশ হয়ে কিছুসময় বসে থেকে ইনায়া লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। ব্যস্ত আঙুল চালালো ফোনের স্ক্রিণে,ডায়াল করে একটা নাম্বার।
______
অস্বস্তি আর উটকো দুশ্চিন্তা নিয়ে কিছুক্ষণ চেয়ারে ঠেসে বসে থাকলো ইহান। ছেলেদের সাথে টুকটাক আলোচনা করে পার্টি অফিস ফাঁকা করলো। দেবেনা দেবেনা করেও,বেশ দ্বিধা নিয়ে হুট করে কল করে দিলো ইনশিরাহকে। নিজেকে যথেষ্ট শান্ত রাখার চেষ্টায় ইহান, ফোনে কোন ইন্টেরোগেশন নয়। শুধু জানতে চাইবে ইনশিরাহ এখন কোথায়।
কলটা ধরলো না ইনশিরাহ। ফোনটা রীতিমতো শব্দ করে টেবিলে রেখে দিয়ে দুহাতে কপাল চেপে ধরে ইহান। সাগর ভুঁইয়ার চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই দপদপ করতে থাকে মাথাটা রাগে।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে ওঠে। কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ইনু তাড়াহুড়ো করে বলতে থাকে,“দাদান একটু লাইফস্প্রিং-য়ে আসতে পারবে? ত্রিশ মিনিটের মধ্যে!”
ইহানের সময় লাগলো সর্বোচ্চ বারো মিনিট। ফুল স্পিডে গাড়ি চালিয়েছে সে। ইনায়া খুলে কিছুই বলেনি, একটা দুশ্চিন্তা মাথা থেকে দূর করতেও পারলো না, ইনায়ার ফোন পেয়ে পাগলের মতো ছুটে এসেছে ইহান।
ইহান ওদের কেবিনে ঢুকেই থ'ম'কে দাঁড়াল। ইনায়া ছুটে এসে বললো সবটা। সে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো প্রেরণাকে, যে কাঁদছে। দেখলো শুদ্ধকে,যে টানটান হয়ে শুয়ে আছে চোখ মুখ খিচিয়ে।
ইনায়া চিন্তিত হয়ে বললো,“আর কি করতাম বলো দাদান! তুমি একটু শুদ্ধের কাছে কাইন্ডলি থাকো। আমি আপুকে দেখছি!”
বারবার ইহান দেখছে প্রেরণাকে,এমন নাকি কান্নাও কাঁদতে জানে নাকি নীলিমা! ভীষণ অবাক সে।
ডক্টর এলো ঠিক সময়ে। এবার তাকে তার কাজ টা করতেই হবে। ইহানকে দেখেই চিনতে পেরে কুশল বিনিময় করে সে, বলে,“এরা কারা? রিলেটিভ?”
_জি। আপনি শুরু করুন। আমি সামলে নিচ্ছি।
শুদ্ধ তখনও চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে ছিলো, দাঁতে দাঁত চেপে ছিলো। ডক্টর ওর শিশ্নে একটা ঠান্ডা তরল মেডিসিন লাগাতেই শুদ্ধ মৃদু আওয়াজ করে ওঠে।
ব্যস হয়ে গেল, প্রেরণা তড়াক করে লাফিয়ে উঠে, চেঁচিয়ে কাঁদে,“আমার বাবা! আমার বাবা! আমার বাচ্চা! আমার বাবা!”
ইহান ভড়কে যায়। ইনায়া ছুটে শুদ্ধর কাছে যায়। ইহান বুঝতে পারছে না কাকে রেখে কাকে সামলাবে। ডক্টর ধ'ম'কে ওঠে প্রেরণাকে,“মিস আপনি ছেলেটাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছেন। আপনি যান এখান থেকে।”
প্রেরণা কান্না থামিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রয়, তার শরীর কাঁপছে, কেমন ঘোলাটে লাগছে চারপাশ। এমন একটু কম হতো যদি প্রেরণা সকাল থেকে কিছু মুখে দিতো। সে সকাল থেকেই নির্জলা। ইহান প্রেরণার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ডক্টরকে বলে,“উনি থাকুক। আপনি কাজ শুরু করুন।”
ডক্টর এগোয় কাঁচি নিয়ে। সাথে একজন সহকারী। শিশ্নের অগ্রভাগের অতি সন্নিকটে ডক্টরের কাঁচি পৌঁছাতে পারেনা। ইহান হুট করে,কি মনে করে ঘা'ড় ঘুরিয়ে তাকালো প্রেরণার দিকে, ঠিক তখনই,ঠিক তখনই শক্ত পোক্ত হুমকি ধামকি আপা লুটিয়ে পরে যেতে চাইলো , আর জানা কথা! আমাদের গল্পের ভদ্রলোক ইহান তাজওয়ার তার বলিষ্ঠ হাতে ধরে ফেললো প্রেরণাকে।
ডক্টর থেমে গেলো। চোখ বড়বড় করে তাকালো। ইনায়া শুদ্ধকে আগলে নিয়ে বসে আছে। সে উঠতে পারছিলো না। ডক্টর বললেন,“ভদ্রমহিলা ভীষণ অদ্ভুত তো!”
ইহান চুপচাপ একহাতে আগলে ধরে দেখছিলো অদ্ভুত ভদ্রমহিলাকে। সমুদ্র নীল চোখ দুটো বুজে আছে, ইহান আজ চোখ দুটো নয়, দেখে নিলো নীলিমার ঘন অক্ষিপল্লব, খাঁড়া চিকন নাক, একটা স্নিগ্ধ সরল মুখ, চোখের নিচে অস্পষ্ট বলিরেখা, বয়সের ছাপ, শুকনো গোলাপী ঠোঁট, তবুও অপরূপ মোহনীয় একটা মুখশ্রী।
ইহানের হাত কাঁপছে। উচ্চতায় পাঁচ ফুট সাড়ে এগারো ইঞ্চির, ব'লিষ্ঠ দেহী লোকটা একহাতে একটা টিঙটিঙে শরীরের ভদ্রমহিলাকে সামলাতে পারছিলো না,সংকোচে, আড়ষ্টতায়।
ভীষণ বিব্রত ইহান। নিজের আচরণে নিজেই বিরক্ত। তার হ্যাংলা বেহায়া দৃষ্টি সরিয়ে নিলো প্রেরণার মুখ থেকে।
দুজন নার্স ছুটে এলো। অতি অল্পবয়সী নতুন নার্স। ভীষণ অপটু।বারবার বলতে লাগলো,“স্যার আপনার ওয়াইফকে ঐ বেডে শুইয়ে দিন।”
ওদিকে শুদ্ধর খৎনা হয়ে গিয়েছে। ছেলেটা পাথরের মতো হয়ে আছে। ডক্টর ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছে শিশ্নে।
এদিকে নার্স দু'টো বারংবার বলতে থাকে,“স্যার আপনার ওয়াইফকে বেডে শুইয়ে দিন।”
ইহান আবারও তাকালো প্রেরণার মুখের দিকে। এভাবে একটা পরনারীকে ধরে থাকায় তার পা থেকে মাথা কেমন ঘামছিলো। নার্স দুটোকে ঠান্ডা স্বরে বললো,“ক্যুড ইউ প্লিজ স্টপ অ্যাড্রেসিং হার “মাই ওয়াইফ”! শি ইজ নট মাই ওয়াইফ।”
ভড়কালো নার্স। আমতা আমতা করে বললো,“না মানে স্যার এভাবে ধরে আছেন...”
ইহান ধ'ম'কে উঠলো, রাশভারী আওয়াজে বললো,“তো কি ফেলে দেবো?”
চলমান.......
এটা একাধিক জুটির প্রণয় পরিণয়ের গল্প। খাস বলতে গেলে লুতুপুতু গল্প। এখানে রাজনৈতিক ভাইব, থ্রিল খুঁজতে গেলে পাবেন বাবাজি কা ঠুল্লু। এই গল্প প্রেম থেকে দৌড়ে দৌড়ে বাসর ঘরে ঢোকার গল্প।
অন্য কোন স্পাইস নেই,থাকবে না।