#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৪৩
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
যা যা অর্ডার করেছিলো,সব খাবার সেরকমই পরে আছে। ইনশিরাহ শুধু কোল্ড ড্রিংকসটাতে চুমুক বসিয়েছে মাত্র একবার। আপাতত অন্যমনস্ক হয়ে স্ট্র দিয়ে তরলটুকু নাড়াচাড়া করছে। সাঈম দীর্ঘসময় ধরে ওকে খেয়াল করছে,তবে তার পক্ষেও নীরবতা বিরাজমান।
এখানে,এই রেস্তোরাঁতে ঢোকার কিছু মুহূর্ত পূর্বে ফোনটাকে সাইলেন্ট মোডে ফেলে রেখেছিল ইনশিরাহ। ওদিকে যে সবাই তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে সে খবর কি রাখে কেউ!
পারিবারিক ঝামেলায় রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠে আজ কিছুটা সময় কাটাতে এখানে এসেছে সে। বিশতলা বহুতল ভবনের রুফটপে এই ইটালিয়ান রেস্তোরাঁটি। কাটছাঁট চোখধাঁধানো।
ইনশিরাহ হুট করে,কি মনে করেই ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে, ফোন চেক করে দাদান,ইনু আর পাপার অতগুলো মিসড কল চোখে পরতেই তার চক্ষু চড়কগাছ।
দেরী না করে ইনশিরাহ উঠে দাঁড়ায়, অর্ডার করা সব খাবার পার্সেল করে নিয়ে সে সাঈমকে বলে দ্রুত প্রস্থান নেয়।
আজ ইনশিরাহ স্কুটি সাথে করে নিয়ে আসেনি,না এনেছে বাড়ির গাড়ি। অত কাঠফাঁটা রোদ্দুর যখন মাথার ওপরে, ইনশিরাহ পার্সেল করা খাবার গুলো ওভার-ব্রিজের নিচে উদোম শরীরে বসে থাকা দুজন পথশিশুকে বিলিয়ে দিয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকে। মাঝেমধ্যে ইনশিরাহ এমন করে, রাস্তায় রাস্তায় উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটে। ইরফান এজন্য তাকে বলতো “মহিলা হিমু।”
নিউটাউনের মোড় ঘুরতেই ইনশিরাহর পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পরলো একটা লাল টয়োটা। তুনাদের বাড়ির গাড়ি। ইশিকে এভাবে রাস্তায় ঘুরতে দেখে তুনা অবাক।
জলদি জলদি ভেতরে ওঠার তাড়া দিলো।
ইনশিরাহর ঠোঁটে লেপ্টে আছে ম্লান হাসি। দেখে মনে হলো ক্লান্ত বেশ। তুনা বলতে লাগলো,“কিরে ইদানিং তোকে ট্রেস করা যাচ্ছে না। ডিসটার্বড তুই?”
নিশ্চুপ ইনশিরাহ। তুনা বলতে লাগলো,“সাঈমের কথা ফ্যামিলিকে এখনও কেনো জানাচ্ছিস না? বোঝাপড়া কি হয়নি তোদের? দীর্ঘদিন ডেট করলি একে অপরকে।”
_হয়েছে।
ক্লান্ত গলায় বলে ইনশিরাহ। তুনা ড্রাইভ করতে করতে বলতে থাকে,“বলে দে বলে দে। নয়তো তোদের পরিবার যা কনজারভেটিভ! হুট করে একদিন দেখবি আংকেল আন্টি হঠাৎ কোনো যদু মধুর সাথে বিয়ে ঠিক করলো, আর তুই তাদের মানাও করতে পারবি না আ'ম শিয়র। তারপর আজীবন ভুগবি।
ইশশ আমার তো ভাবতেই ভয় লাগে আরেঞ্জ ম্যারেজের কথা। চিনি না জানি না,যার সাথে কোনো কিছুর মিল হয়ে ওঠেনি এমন একটা লোকের উদোম ঘর্মাক্ত শরীরটা রোজ রাতে জাপটে ধরতে হবে দু'হাতে। ইয়াক! থু!
আমার আত্মা কেঁপে ওঠে এসব ভাবলে। অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ ইজ রিয়েলি স্ক্যারি ব্রো!
ধর সে জানেই না তোর পছন্দের রং কি, খবরও রাখে না, কিন্তু রোজ রাতে বিছানায় তোর ব্রা খুলতে খুলতে বলবে “পার্পল কালারটাতে তোমাকে উষ্ণ লাগে। এই রংটাই পরবে।”। ভাবতে পারিস কি ভয়ংকর ব্যাপার স্যাপার? একটা কথা আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি রে ইশি, অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে পুরুষেরা একটা মেয়েকে সেক্সটয় ছাড়া অন্য কিছু ভাবে না আজকাল। বড় আপুর কথা তো জানিস! আমি মরে গেলেও অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ করবো নারে ইশি!”
অনর্গল অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের ভয়াবহতা ইনশিরাহকে শুনিয়ে যাচ্ছিলো তুনা, ইনশিরাহ ওসব শুনছিলো না। সে ভীষণ অন্যমনস্ক।
কিছুক্ষণ ভেবে সে সিদ্ধান্ত টা নিয়েই নিলো। সামনের সপ্তাহে সাঈমের কথা মাম্মা পাপাকে জানিয়ে দেবে সে। নয়তো মিছে আশা মনে পুষে রাখবে মাম্মা পাপা, মুঈনের সাথে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে তাদের,এমন হতে থাকলে প্রত্যেকেই একটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরে যাবে।
যা হবার হোক,যে অনল জেনে বুঝে ইনশিরাহ জ্বেলেছে নিজের জন্য, সে অনলে পুড়তে দেরী কিসের!
দীর্ঘ ছয় বছর উপেক্ষা করার পরে সবটা জেনেই সাঈমকে গ্রহণ করেছে ইনশিরাহ, এই সম্পর্ক শুধু তার তরুণী আবেগ থেকে হয়নি, এই সম্পর্ক বোঝাপড়ার। মাম্মা পাপা ঠিক মানবে। না মানলেও ইনশিরাহ মানিয়ে নেবে,যেভাবেই হোক।
______
নির্নিমেষ দেখছিলো ইহান ভদ্রমহিলাকে। একজন ডক্টর এসে পালস রেট চেক করে চলে যায়, সে তখনও তার দৃষ্টি স্থির রেখেছে পাংশুবর্ণের মুখটার দিকে। ফরসা মুখটা কেমন নীলচে হয়ে আছে। নীলিমার নীল মুখ!
ঠোঁটের কোণে অস্পষ্ট হাসি ইহানের, অত্যল্পকাল পরেই তা মিলিয়ে গেলো। কিছুক্ষণ আগের ঘটনায় সে রীতিমত বিব্রত।
প্রেরণাকে ইহান নিজে কোলে তুলে এই বেডে রেখেছে। বিব্রত, দ্বিধান্বিত ইহান নিজের হাতের দিকে তাকায়, আবারও তাকায় নীলিমার দিকে।
ছোটোবেলার কথা মনে আছে ইহানের,তার সুন্নতে খৎনার দিনে রিতু এমন করেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল, ইরফানের সময়টিতেও সে ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেছিলো রিতু। দ্রীপ্তর খৎনার দিনে বড় মা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল।
ইহান হাসলো। সন্তানের প্রতি মায়েদের ভালোবাসা,আবেগ,স্নেহ “ইউনিভার্সাল” সেটা তো জানা কথা, তবে ছেলে বাচ্চার সুন্নতে খৎনার দিনে মায়েদের হুট করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলাও যে “ইউনিভার্সাল” ইহান এখন বুঝতে পারছে।
কিছুসময় নিজের অবচেতন মনেই হ্যাংলার মতো একজন পরনারীকে দেখে, সম্বিত ফিরতেই সে চোখ নামিয়ে নেয়। নিষিদ্ধ কাজটি করে ইহান তাজওয়ার ভীষণ লজ্জিত। এটা,এই চোরা ইচ্ছা, মুগ্ধতার অনুভূতিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে , ইহান দিনকে দিন টের পাচ্ছে ।
চোখ নামিয়ে গলা খাঁকারি দেয় সে। ইনায়া এসে তাড়াহুড়ো লাগিয়ে বলে,“আমি দেখছি দাদান। তুমি যাও।”
ইহান নড়লো না। গম্ভীর হয়ে বলল,“প্রিতম কই! তোরা একা কেন?”
_শুভ অ্যাক্সিডেন্ট করেছে দাদান, হাতে ভীষণ চোট পেয়েছে। ও সকাল থেকে এখানেই ছিলো। খবরটা পেয়ে বেড়িয়েছে। তোমাকে কষ্ট দিলাম দাদান। বিরক্ত হওনি তো?
ইহান বোনের দিকে তাকিয়ে হাসলো সামান্য,“হ্যা খুব বিরক্ত হয়েছি।”
ইনায়া হাসলো, পর পর মলিন মুখে বলল,“আপু এমন সাংঘাতিক দুর্বল আমি বুঝতেই পারিনি। আপুকে এরকম ভাবিনি।”
ইহান পুনরায় প্রেরণাকে দেখলো, গম্ভীর কন্ঠে ইনায়াকে বললো,“কেমন ভেবেছিলি?”
_সবথেকে আলাদা, শক্তপোক্ত, জানো সেদিন হাতে গরম তেল পরেছে। অথচ তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। পাথরের মতো মহিলা দাদান। পারলে হাতটা আগুনে রেখে রান্না করে।
প্রেরণার মুখের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখেই ইহান ইনায়াকে বললো,“পাথরের মতো মহিলা? তোর ননদ তোকে স্নেহ করে?”
_আপু? একটু রাগী রাগী, তবে ভীষণ ভীষণ ভীষণ আদর করে আমাকে।
_রাগী রাগী?
_ঠিক বুঝিনা। তবে আপু ডিপ্রেসড থাকে সবসময়, এটুকু বুঝি। শুদ্ধ ,প্রনমি, রেস্তোরাঁ সবকিছু নিয়ে ডিসটার্বড থাকে এটুকু বুঝি। সেজন্য হয়তো কপাল কুঁ'চ'কে থাকে সারাক্ষণ। আসলে রাগীও না,আমাকে তো কখনই মুখ অন্ধকার করে কিছু বলে না।
প্রেরণা নড়েচড়ে ওঠে হঠাৎ। আওয়াজ পেয়ে ইহান চুপচাপ,মাথা নিচু করে কেবিন থেকে বেরোয়।
শুদ্ধকে সোজা করে শুইয়ে রাখা হয়েছে। একজন ওয়ার্ডবয় তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে ডাক্তারের নির্দেশমতো। আজ রাতটা শুদ্ধকে রেখে আগামীকাল সকালে ছাড় দিয়ে দেওয়া হবে।
শুদ্ধ ইবনে ওয়াসীত চোখ বড় বড় করে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। সে নিঃশ্বাস অবধি নিচ্ছে না মনে হলো। তার মনে হচ্ছে নিঃশ্বাস নিলেই নুনু থেকে রক্ত বেরোবে। ছেলেটার মুখ শুকিয়ে চিমসে হয়ে আছে। কথাও বলছে না,মাম্মার কথাও জানতে চাইছে না। ওয়ার্ডবয় বুঝতে পারছে বাচ্চাটা মারাত্মক ঘাবড়ে আছে এখনো। সে কেবিনের এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দিয়ে শুদ্ধকে বললো,“তোমার মাম্মা আসবে একটু পরে। তোমার পাপাকে ডেকে দেবো?”
ওয়ার্ডবয় পূর্ববর্তী শিফটে ছিলো না, সে এসেছে বিশ মিনিট আগে। ইহানকে সে মনে মনে ধরে নিয়েছে শুদ্ধর বাবা হিসেবে, অবশ্য অচেনা কেউ প্রাথমিক ভাবে এরকমটাই ধারণা করবে।
আংকেলটার কথা শুনে শুদ্ধ চোখ বড় বড় করে ফেলে। পাপা! পাপা কে শুদ্ধর? পাপা কিভাবে এলো ? ঐ অতটুকু মস্তিস্ক বুঝে উঠতে পারছে না কিছু! এই সাদা পোশাক পরিহিত আংকেলটা এসব কি বলছে!
শুদ্ধর কৌতুহলী দৃষ্টি উপেক্ষা করে,তাকে কিছু বলবার সুযোগ না দিয়েই ওয়ার্ডবয় ছুটে বেরোয় কেবিন থেকে। কেবিনের বাইরে তার সামনে পরলো ইহান। ওয়ার্ডবয় ব্যস্ত ভঙ্গিতে বললো,“আপনার ছেলে আপনাকে দেখতে চাইছে। কাঁদছে বাবুটা।”
ইহান বোকার মতো তাকিয়ে রয় ওয়ার্ডবয়ের দিকে। নার্সগুলো তাকে কারো হাজবেন্ড বানিয়ে দিলো আর এখন রীতিমতো একলাফে প্রমোশন পেয়ে বাপ হয়ে গেল সে!
ওয়ার্ডবয় চলে যায়। ইহান অলসতা করে আর বললো না সে শুদ্ধর বাবা না। এরা বাবা ভেবে বসে থাকলেই বা কি! ধীরপায়ে হেঁটে কেবিনে ঢুকে দেখলো ছোট্টো মিষ্টি মলিন মুখটাকে, ইহান এগিয়ে গেলো কাছটাতে। শুদ্ধ চোখ বড়বড় করে ইহানকে দেখছে। ইহান মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো,“হেই বাচ্চা!”
ছোট্ট শুদ্ধ ভীষণ ভয় পেয়ে ছিলো,কাউকে কাছে না পেয়ে এমনিতেই মনটা বিষিয়ে ছিলো, হঠাৎ ইহানকে দেখতে পেয়ে ঝরঝর করে কেঁদে দিয়ে বললো,“কেটে ফেলেছে।”
ইহানের মায়া লাগছে, কিছুটা হাসিও পাচ্ছে। একটা চেয়ার টেনে শুদ্ধর বেডের পাশে বসে ধীরে ধীরে একটা হাত রাখে শুদ্ধর মাথাতে। বলে,“কেটে ফেলেছে?”
_হু।
কাঁদতে কাঁদতে জবাব দেয় শুদ্ধ। তার নাকে সর্দি এসে যাচ্ছে। সর্দিতে বেলুন ফুলছে নাকে। ইহান আশেপাশে তাকিয়ে একটা বক্স থেকে এক খামচা টিস্যু পেপার তুলে শুদ্ধর নাক পরিষ্কার করে দেয়। ইহানের এসবে অভ্যেস আছে, ইনু আর শেহুর নাক পরিষ্কার করিয়েছে ছোটবেলায়।
ইহান বলতে লাগলো,“সেরে যাবে বাচ্চা।”
_ছোটোদের কেনো কাটতে হয়, রকির কাটতে হয়েছে,আইজানেরও কাটতে হয়েছে। বড়দের কেনো কাটতে হয়না।
কাঁদতে কাঁদতে জানতে চাইছে শুদ্ধ।
ইহান বহু কষ্টে নিজের হাঁসি চেপে রেখে গম্ভীর হয়ে বলে,“এটা সত্যিই খুব অন্যায় শুদ্ধ। বড়দের কেন কাটতে হয়না, আমি জানতে চাইবো ডক্টরের কাছে বাবু!”
_মাম্মা কোথায়!
শুদ্ধ কান্না মুছে জানতে চায়।
_মাম্মা একটু অসুস্থ। তুমি বলো তুমি কি খাবে? কিছু খেতে ইচ্ছে করছে? পেস্ট্রি অর চকোলেট?
শুদ্ধর খেতে ইচ্ছে করছে,কিন্তু মাম্মা সাফ মানা করেছে বাইরের কারো থেকে কিছু না খেতে। তাই সে কিছু বলছে না।
ইহান উঠে দাঁড়ায়,বলে,“বলো বাবু। পেস্ট্রি খাবে?”
_মাম্মা বকবে।
_কেন?
অবাক ইহান।
_কোনো আংকেলের থেকে কিছু খাওয়া যাবে না। মাম্মা বলেছে।
ইহান হাসলো, বললো,“তোমার মাম্মার ম্যানার্স? আচ্ছা,আমি আজ তোমার মাম্মাকে ম্যানার্স শিখিয়ে যাবো, বলবো শুদ্ধ বাবু মাঝে মাঝে আংকেলদের থেকে খেতে পারবে।”
ঠিক তখনই অসুস্থ শরীর নিয়ে ত্রস্ত পায়ে শুদ্ধর কেবিনে ঢোকে প্রেরণা। জ্ঞান ফেরার পরে সামান্য কিছু খাইয়ে দিয়েছে ইনায়া। ঐ জোরেই এসেছে। বেচারি গিয়ে বসলো শুদ্ধর মাথার কাছে। ইহান কেবিনের একপাশের দেয়ালের দিকে সরে দাঁড়ায়।
প্রেরণা শুদ্ধের চোখে মুখে গালে ঠোঁটে অজস্র চুমু খেতে খেতে আহাজারি করে,“স্যরি বাবা আমি তোমার কাছে থাকতে পারিনি। আ'ম স্যরি। মাম্মা ভেরি ভেরি স্যরি আব্বা!”
শুদ্ধ খানিকটা অভিমান-ই করেছিলো মাম্মার ওপর,এখন আদর পেয়ে সব অভিমান উধাও হয়ে গেলো।
মাথা তুলে প্রেরণা ইহানের দিকে তাকায়। এতক্ষণে সে খেয়াল করলো ইহানকে। গাঁয়ের শাড়ির আঁচল ডানকাধে টেনে বিব্রত হয়ে এলোমেলো দৃষ্টি দিলো প্রেরণা । লোকটা ঘন্টার পর ঘন্টা তাদের জন্য এখানে আটকা পরেছে, ভীষণ মন ছোটো লাগছে প্রেরণার। ভাইয়ের শ্বশুর বাড়ির লোক। তারপর দুদিন আগে এতোবড় একটা ঝামেলা হয়েছে! কি না কি মনে করছেন লোকটা, সামাজিকতার খাতিরে হয়তো বিরক্তি প্রকাশ করছেন না। প্রেরণা শান্ত হলো, নিচু স্বরে বলল,“আপনাকে এখানে অযথা ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। এই অবস্থায় এখানে আতিথেয়তা করবো সে সাধ্য টুকু নেই বুঝতে পারছেন। আপনি বরং এখন বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম করুন। কাল আমাদের বাড়িতে যাবেন ইনশিরাহকে নিয়ে, নিমন্ত্রণ রইলো।”
ইহান কিছুই বলছে না। শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে ভদ্রমহিলাকে দেখছে। ভদ্রমহিলা বহুরূপী সত্তার অধিকারিনী। কখনো মেজাজী, কখনো তেজী, কখনো শিতল, কখনো ছিঁচকাদুনে, কখনো স্নিগ্ধ। এই এখন কুটুম্বিতা করছে ইহানের সাথে। ভীষণ স্নিগ্ধ লাগছে ভদ্রমহিলাকে, একজন মা'কে।
ইহান পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নিতে নিতে বরফ শীতল গলায় বললো,“ধন্যবাদ। আপনি বরং আপাতত একটা কাজ করুন।”
_কি কাজ?
_আমি শুদ্ধকে কিছু কিনে দিতে চাচ্ছি। আপনার গুড বয় আপনার শেখানো ম্যানার্স ভোলেনা। ওকে পারমিশন দিন আজ অপরিচিত আঙ্কেলের কিনে দেওয়া কিছু খেতে।
ভেজা চোখে সামান্য হাসলো প্রেরণা।
ইহান বাইরে গেলো। একঘন্টা পরে শুদ্ধর কেবিন ভর্তি হয়ে গেলো খাবার এবং খেলনায়।
_______
হসপিটাল থেকে বিকেল নাগাদ ইহান বাড়িতে ফিরেছে। মাথা থেকে ইনশিরাহর ব্যাপারটা সরে যায়নি। তাকে চিন্তিত দেখে সবাই একটা একটা করে প্রশ্ন করেছে কিন্তু সে নিরুত্তর। লিভিং রুমে আলোকে অ্যাকুরিয়ামের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে থ'ম'কে দাঁড়ায়। নিস্তব্ধ বাড়িটাতে ঐ মাছগুলোর সাথে সময় কাটাচ্ছে এখন। কতবড় বাড়িটা এক নিমিষেই কেমন ফাঁকা।
দোতলা থেকে ফোন হাতে ছুটতে ছুটতে নামে ইনশিরাহ। ইহান বোনের দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে আছে। ইনশিরাহ এসে হাঁপাতে হাঁপাতে ইহানকে বলে,“দাদান ইরফান। ইরফান কল করেছে।”
ইরফানের নামটা শোনা মাত্র ইলহাম আর রিতু ব্যতীত বাকিরা চারপাশ থেকে ছুটতে ছুটতে আসে। ভিডিও কলে কথা হচ্ছে। ইরফানের নতুন হেয়ারস্টাইল দেখে ইনশিরাহ হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
ইরফান লাজুক হেসে মাথায় হাত বুলাচ্ছে বারবার।
পরী উত্তেজিত হয়ে একটার পর একটা প্রশ্ন ছুঁড়তে থাকে। ইরফান এক এক করে সবার প্রশ্নের উত্তর দেয়। তার হাতে সময় বিশ মিনিট।
ইনশিরাহ বললো,“কি করছিলি?”
_ঘাস কাটছিলাম।
সবাই তাকিয়ে আছে। ইরফান হেসে বলে,“আমি সিরিয়াস! এখানে প্রত্যেক মেম্বারদের কিছু টাস্ক দেওয়া হয়। আজ আমাকে ত্রিশ মিনিট গ্রাস কাটার দিয়ে ঘাস কাটতে হয়েছে,কাল ঐ প্লে গ্রাউন্ডে ফুটবল ম্যাচ হবে। পাগল বনাম মাদকাসক্ত।
আমি টিম পাগল, খেলবো মাদকাসক্তদের বিপক্ষে।”
বলতে বলতে হাসলো ইরফান। আলো নরম গলায় বললো,“ওখানের খাবার কেমন বাবা?”
_খাবার খুবই ভালো, তবে রান্না জঘন্য বড় মা। মাম্মার রান্না খুব মিস করছি। এখানে খেতে পারছি না কিছু, আমি কোনোদিনও ভালো হবো কি না জানি না, আমার স্বভাব চরিত্র বদলাবে কি না জানি না, তবে শুকিয়ে চিমসে হয়ে যাবো নির্ঘাত।
ইরফানের কথা শুনে সবার মুখটা মলিন হয়ে যায়। রিতু সবকিছুই শুনছিলো। তবুও সে উঠলো না, ইলহামও তাই। চুপচাপ বসে আছে অদূরে।
ইরফান ইহানকে ডাকলো,“দাদান!”
_হুম।
_দাদান ক্লাসের পরে সময় কাটে না এখানে। মুভি-টুভি বরাবর ক্রিঞ্জ লাগে জানো তো, বই টই আমার দ্বারা পড়া হবে না। কাইন্ডলি একটু আমার গিটারটা দিয়ে যাবে! সাফোকেটিং লাগে দাদান।
ইহান ভাইয়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো, অত বড় ভাইটাকে একটুখানি বালক লাগছে, যে বায়না করছে। ইহান একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,“আর কি লাগবে?”
_আর কিছু না।
_ঠিকাছে দিয়ে আসবো।
বিশ মিনিটের তের মিনিট কে'টে গিয়েছে, ইনশিরাহ তাড়াহুড়ো করে ইরফানকে বললো,“আমাদের সবার সাথে তো কথা বললি, একটু ইনুর সাথে বলবি না? মেয়েটা চেয়েছে তোর সাথে কথা বলতে। ”
_বলবো। আচ্ছা শেহু কি তোদের সাথে যোগাযোগ করেছে? ও এমন করছে কেন!
_ওর পরীক্ষা,শান্ত বাবা বললো বইয়ে মুখ গুজেই রাখে নাকি সারাদিন। বলে দিয়েছে কেউ যেন ওকে বিরক্ত না করে।
ইরফান আর কথা বাড়ালো না, কলটা কে'টে তাড়াহুড়ো করে ইনায়াকে কল দেয়। তার হাতে আর সময় পাঁচ মিনিট।
ইনায়া প্রিতমের কাঁধে মাথা রেখে বসে ছিলো হসপিটালের ওয়েটিং রুমে। প্রিতম একটু আগে শুভর কাছ থেকে ফিরেছে। স্ক্রিণে “hope” এর অফিশিয়াল নাম্বারটা দেখতে পেয়েই তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে সে। প্রিতমও দেখলো আড়চোখে। বুঝলো সব।
ইনায়াকে একা রেখে প্রিতম ওখান থেকে উঠে চলে যায় শুদ্ধ আর প্রেরণার কাছে।
ইনায়া দ্রুত কলটা রিসিভ করে। চোখের সামনে দাদানের মুখটা দেখে আপ্লুত হয়ে পরে ইনায়া। কেমন অন্যরকম লাগছে, তবুও কত সুন্দর লাগছে দাদানকে।
ইরফান হেসে বললো,“তোর হাজবেন্ড কই! দিলো আমার কলটা রিসিভ করতে?”
ইনায়া কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বলল,“দিলো।”
_গ্রেট! মহান তোর হাজবেন্ড। আমি হলে দিতাম না,ট্রাস্ট মি।
ভাইয়ে-বোনে সর্বোচ্চ তিন মিনিট সময় পেলো কথা বলার। তারপর ইনায়াকে কাঁদতে রেখেই কলটা কাটলো ইরফান। ইনায়া ভেজা চোখে ফোন হাতে দাঁড়িয়ে আছে এক কোণে। কিছুক্ষণ বাদে প্রিতম ঘুরেফিরে এলো সেখানে,তবে ইনায়ার কাছে গেলো না, দূর থেকে দেখলো তাকে।
______
ধ্বংসস্তুপের কাছে একটা নিথর দেহ, রক্তাক্ত জংলি ছাপার ইউনিফর্ম। ক্ষীণ আর্তনাদ, আর বাঁচার তীব্র আকুতি। তাকে বাঁচানোর সমস্ত পথ রুদ্ধ। শত্রুদের নলের মুখে কিছু ব্যার্থ অধীনস্থ অফিসার,সৈনিক।
এই স্বপ্নটা ইহানের প্রায়শই আসে। ইহান অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে এতে। মনরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে দুতিনবার কথা বলে জেনেছে দৈনন্দিন জীবনে ঐ দুর্ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট কোন ঘটনা চোখের সামনে ঘটতে দেখলে স্বপ্নটার পুনরাবৃত্তি হতেই পারে। তবে ইহানের সাথে এমন কিছুই ঘটেনি ইদানিং। তবুও কেন দেখে ইহান জানেনা।
ভোর ভোর দেখলো আজ দুঃস্বপ্নটা। ইহান ঘুম ভেঙে উঠে বসে হাপাচ্ছিলো, তার ঘরের দরজা খোলাই থাকে, আলো নক করে ঢুকলো, ছেলেকে দেখে ঘাবড়ে গিয়ে আলো বললো,“কি রে ! দুঃস্বপ্নটা দেখেছিস!”
ইহান ঘেমে গিয়েছে পুরো। মৃদু মাথা নাড়ায়। আলো শুকনো মুখে দেখে তাকে, কত বড় একটা উটকো ঝামেলা পিছু নিয়েছে ছেলেটার। এর থেকে কবে মুক্তি মিলবে কে জানে!
খাবার টেবিলে ইহান আজ সবাইকে পেলেও ইনশিরাহকে পেলো না। আলোর থেকে জানতে পেরেছে বান্ধবীর সাথে ভোর ভোর বেরিয়েছে।
ইহান শান্ত হয়ে ব্রেকফাস্ট শেষ করে বেরিয়ে যায়। আজ কেমন উদ্ভ্রান্তের ন্যায় লাগছে ইহানকে।
ইহান বাড়ি থেকে বেরোনোর পর পর তাকে নিয়েও বাড়ির বড়দের মধ্যে বিশদ আলোচনা হতে থাকে।
সামিন চিন্তিত ভীষণ, এই পরিস্থিতিতে এমন কথা তোলা নেহায়েত অযৌক্তিক তবুও সে ইলহামকে বললো,“ও তো নিজে থেকে কিছু বলছেও না। বিয়ের ব্যাপারে আমাদেরকেই কিছু একটা ভাবতেই হবে। এভাবে তো চলতে পারে না তাই না? তুই একটু চাপ দে!”
_চাপ? ভাইয়া চাপ দেবো কিভাবে! আধমরা ফিরেছিলো ছেলেটা মিশন থেকে। নিজেকে সামলে উঠতে না উঠতেই আরেকটা ধাক্কা পেলো ঐ মেয়েটার থেকে। এখন যেভাবে চাইছে চলুক। ওর ব্যাপারে কোনো অগ্রীম সিদ্ধান্ত আমি নেবো না। নিজের জীবনে সবকিছু ভুলে যাকেই বাছবে ও। বাবা হিসেবে আমি খুশি খুশি ছেলের ইচ্ছা মেনে নেবো। ও নিজেকে যত খুশি সময় দিক,যাকে ইচ্ছা তাকে গ্রহণ করুক।
সামিন আলো খুশিই হয় ইলহামের কথা শুনে। আলোর হঠাৎ মনে পরে যায় ইহান বলেছিল একটি মেয়ের কথা। যার সমুদ্রনীল চোখ, মেয়েটির কথা বলতে গিয়ে কেমন লজ্জা পাচ্ছিল ছেলেটা। আলো ঠিক করলো আরেকবার তুলবে আলো কথাটা ইহানের সাথে, ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে ,ইরফান সুস্থ হয়ে বাড়িতে আসবে। ইনশিরাহ আর মুঈনের ব্যাপারটাও আগাবে, তারপর এ বাড়িতে সামনে দু'টো বিয়ে হবে।
______
প্যাচপেচে গরমে ঘেমে নেয়ে অস্থির ইনশিরাহ। মনে হচ্ছে সূর্যি মামা আজ তার ওপর ভীষণ ক্ষেপেছেন । পোশাকের ওপর থেকে চামড়া পুড়িয়ে দিচ্ছে।
এই এতো রোদেও ইনশিরাহ কোনো রকম সানস্ক্রিন লোশন না মেখেই বেরিয়েছে। স্কুটির ফ্রন্ট মিররে নিজের চেহারা দেখে নিজেই ভয় পেলো, মুখমন্ডল থেকে তেল চুয়ে চুয়ে নামছে। তাকে দেখাচ্ছে ভয়ংকর। পৃথিবীতে এই বেশে একমাত্র সে-ই বোধহয় বয়ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। অন্যান্য মেয়েরা হলে এতো বড় দুঃসাহস করতোই না। সেটা ভেবে নিজেকে মনে মনে সাহসী তকমা দিলো ইনশিরাহ।
রেডিও কলোনির “কফি ডেট” কফি বারে তাদের “মিটিং প্লেস” ঠিক হয়েছে।
সাঈম সর্বসময় সময়ের আগে পৌঁছে যায়, এটা ইনশিরাহর ভালো লাগে।
আশেপাশে সাবধানী নজর বুলিয়ে ইনশিরাহ মাস্ক খুললো । এভাবে দীর্ঘসময় মাস্ক পরে থাকায় শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
সাঈম বললো,“দৌড়ে এসেছো নাকি!”
ইনশিরাহ ভীষণ হাপাচ্ছে। হাঁপাতে হাঁপাতে জবাবটা দিতেই যাবে ঠিক তখনই তার মুখ শুকিয়ে একটুখানি হয়ে যায়। পাংশুবর্ণের মুখটা নিয়ে তাকিয়ে আছে সোজাসুজি। কপালে পুনরায় বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠলো। চেয়ার থেকে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল সে। ঢোক গিললো দুবার। সাঈম ইনশিরাহর এমন আচরণ দেখে ধীরে ধীরে ঘা'ড় ঘুরিয়ে পিছনে ফিরে তাকাল। পর পর চেয়ার ছেড়ে সেও উঠে দাঁড়ায়।
ইহান ক্যাফের দরজা ঠেলে ধীরেপায়ে এগিয়ে আসলো। বোনের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে আছে সে। দেখছে সাঈমকেও।
ইনশিরাহ একটা ফাঁকা ঢোক গিললো, সে তো প্রস্তুত সবটা সামলে নিতে, মুখোমুখি তো হতেই হতো দাদানের, তবে এতো বুক কাঁপছে কেন হঠাৎ সে সেটাই বুঝতে পারছে না।
ইহান আরও দুকদম এগোলো। ইনশিরাহর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সাঈমকে দেখলো। সাঈমও শীতল চোখে দেখছে তাকে,তার ঠোঁটে লেপ্টে আছে রহস্যময় হাসি।
ইনশিরাহ যতখানি থমকালো হঠাৎ দাদানকে দেখে, তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো যখন দেখলো ক্যাফের এক্সিট দিয়ে ভেতরে ঢুকেছে স্বয়ং সামিন ইয়াসার মির্জা।
ভীষণ হতবাক ইনশিরাহ একপাশে হেলে পরলো যেন, সে তো এমন ভাবে মুখোমুখি হতে চায়নি কারো। হঠাৎ এখানে, এভাবে! দাদান,পাপা! কি করবে এরা! পাপাকে কিভাবে সামলে নেবে সে! সাঈমকে দাদান মারধর করলে কি করবে!
হাত কাঁপছে তার। সামিন অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে মেয়েকে দেখছে, দেখছে সাঈমকে। ধীরপায়ে এগোচ্ছে সে।
ইনশিরাহ আরো দুবার ঢোক গিলে অস্ফুটে বললো,“পাপাহ!”
সামিন কোনো কথা বলছে না। একবার মেয়েকে দেখছে, একবার সাগরের ছেলেকে।
ইহান শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো চোটপাট নয়, কোনো ধ'মকা ধ'মকি নয়, সাঈমের দিকে একপলক ক্রোধান্বিত দৃষ্টি দিয়ে বোনের দিকে তাকালো। ক্যাফেটা এলিট শ্রেণীর। যথেষ্ট মার্জিত পরিবেশ। আশেপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে ইহান তপ্ত শ্বাস ফেলে বোনকে বরফ শীতল কন্ঠে বলল,“বাইরে গাড়িতে গিয়ে বোস ইশি! তিন সেকেন্ডের মধ্যে।”
চলমান.....