ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 44

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৪৪
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

গাড়িতে তিনটা মানুষ নিরব। আজ রাস্তায় মোটামুটি জ্যাম। ইহান কেমন অধৈর্য হয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। হর্ন দিচ্ছে অকারণে। কিন্তু সে শান্ত। কোনো নড়চড় নেই, কোনো কথা নেই মুখে।

ইনশিরাহ বারবার পাপার দিকে তাকায়, তাকায় দাদানের দিকে। সে নিজেকে সামলে নিয়েছে, এখন শুধু সুযোগ খুঁজছে এই দু'জনকে ব্যাখ্যা দেওয়ার। সামিন সিটে গা এলিয়ে বাইরের দিকে অহেতুক তাকিয়ে আছে। এখন অবধি মেয়েকে সে কিছুই বলেনি, একটা শব্দও না।
দীর্ঘসময় পরে থেমে থেমে ইনশিরাহ বললো,“পাপা! দাদান! লিসেন টু মি!”

ইহান জবাবই দিলো না,আর না দিলো সামিন। ইনশিরাহ অধৈর্য হলো, চেঁচালো,“ইউ গাইজ! ট্রাই টু আন্ডারস্টান্ড! আই ক্যান এক্সপ্লেইন!”

গাড়ি ততক্ষণে শান্তিনীড়ের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলো। ইহান ধীরে ধীরে নয়,হুট করে ব্রেক কষলো। ইনশিরাহর দিকে তাকিয়ে বরফ শীতল কন্ঠে বললো,“ট্রাস্ট মি ইশি! ইউ কান্ট!”

_____

সবার প্রথমেই অদ্রিতা আলো মেয়ের গালে পরপর চারটা চ'ড় দিলো। প্রত্যেকটা চ'ড়ের শব্দ ভীষণ কানে বাজছিল সবার। ইনশিরাহ চ'ড় খেয়ে একটুও নড়লো না, সে তার যায়গায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। মায়ের এমন প্রতিক্রিয়া জায়েজ,এতে অবাক হবার তো কিছু নেই ইনশিরাহর !
সে একদৃষ্টে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রয়।

আলো পঞ্চম বারের মতো হাত ওঠাতে গেলে ইহান ফিরিয়ে নিলো তাকে। নম্র হয়ে বললো,“বড় মা,চলো আমরা আগে বসি! আলোচনা করি।”

আলো কোনো স্বান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছে না নিজেকে দেওয়ার মতো। ডুকরে কেঁদে উঠে ফ্লোরে বসে পরলো ধপ করে, অতঃপর বাচ্চাদের মতো হাত পা ছুড়ে কাঁদতে লাগলো।

ইনশিরাহ ঘুরে ঘুরে তাকায় সবার দিকে। রিতু,পরী, ইলহাম, ইশমাম তাজ্জব হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। কারো মুখে কোন কথা নেই।

ইনশিরাহ দু'চোখ বন্ধ করে বুক ভরে শ্বাস নিলো, তারপর সরাসরি সামিনের দিকে তাকিয়ে বললো,“পাপা! আমাকে বোঝো!”

সামিন একদৃষ্টে মেয়েকে দেখছিলোই। কিছু বললো না আর। ধীরপায়ে হেঁটে গিয়ে মেঝে থেকে টেনে তুললো আলোকে। আলো কাঁদছে ভীষণ। চোখ চেপে ধরে কাঁদছে।

ইনশিরাহ চেঁচালো,“তোমরা এমন কেন করছো! একটু বোঝো! আমি খারাপ কিছু করিনি। ও আর আমি একটা লম্বা সময় ধরে বোঝাপড়া করেছি। ওটা একটা সুস্থ সম্পর্ক। আমরা বিয়ে করতে চাই। এটা তো ভুল না তাইনা?"

ইহান দাঁতে দাঁত চেপে বোনের দিকে এগিয়ে গেলো, ভীষণ মেজাজী লাগছে তাকে, এতক্ষণে ঝাঁঝালো কন্ঠে বললো,“মুখ দিয়ে আর একটাও আবোল তাবোল কথা বের করলে একটা থাপ্পড় খাবি! তুই খুকি? তোর বোধ নেই? ভালো মন্দের মাথা খেয়ে বসে আছিস? এটা তোর আবেগের বয়স?”

_না এটা আমার আবেগের বয়স না। আর আমি আবেগের বশে কোনো সিদ্ধান্তও নিইনি। আমি প্রাপ্তবয়সস্ক, বুঝে শুনেই পা বাড়িয়েছি।

সামিন নিস্তেজ হয়ে মেয়ের কথা শুনছিলো, এই কথাটির পরে সে ম্লান হেসে মেয়েকে বললো,“জি আম্মা! আপনি প্রাপ্ত বয়স্ক। স্বাধীনচেতা। স্বাধীনতার ষোলো আনা ব্যাবহার করার জন্য ধন্যবাদ। তবে এটা উচিৎ হয়নি আম্মা!”

ভীষণ দুর্বলকন্ঠে সামিন বললো মেয়েকে। ইশমাম ইনশিরাহকে বললো,“ও তো ভুঁইয়ার ছেলে। তুই কি জানিস না, ওদের জন্য তোর মা কত ভুগেছে? তোর বাবা কত ভুগেছে! ওরা তো কেউটে! তুই এতো বোকা কিভাবে হলি? বুঝে শুনেই যদি পা বারাস তবে তো তোর বোঝা উচিত ছিলো ওদের সাথে আমাদের যায়না!”

ইনশিরাহ ইশমামের দিকে তাকিয়ে বলে,“ছোটোবাবা যা করেছে ওর বাবা চাচা করেছে! সাঈম কিছু করেছে? সংসার টা তো আমার আর সাঈমের হবে ছোট বাবা, ওনাদের নিয়ে এতো ভাববো কেনো? বিয়ে করে আমরা অ্যাবরড চলে যাবো। পুরনো কাসুন্দি ঘেটে করবো টা কি? যেখানে আমার অলরেডি সাঈমের সাথে যথেষ্ট ভালো বোঝাপড়া হয়েছে। একসাথে সারাজীবন কাটাতে পারবো সুস্থ ভাবে দুজন।”

আলো স্বামীর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তেড়ে গেলো মেয়ের দিকে,“বিয়ে? সে আর এজন্মে হচ্ছে আমি জীবিত থাকতে। অসভ্য ফালতু মেয়ে একটা! মুখের ওপর যুক্তি ঝারছে,তোর যুক্তি বেটে তোকে খাওয়াবো আমি বেহায়া মেয়ে! ইনুকে সবাই মাথামোটা বলে, আরে ওর তো যোগ্যতা আছে একটা ভালো পরিবারের ছেলেকে পছন্দ করার। তোর তো সেটাও নেই। তোর রুচি! ছিঃ! জঘন্য! ইরফানকে আমরা অসুস্থ বলি, ও রাগের মাথায় নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারে বলে, আর তুই কি? তুই তো নাচতে নাচতে কোপ খেতে যাচ্ছিস! ”

সামিন আলোকে আবারও টেনে ধরলো। ইনশিরাহ বলে ওঠে,“আমার রুচি জঘন্য না ভালো সেটা তো বিষয় না মাম্মা। বিষয় হচ্ছে এই রুচি দিয়ে পছন্দ করা লোককে নিয়ে একটা গোটা জীবন আমি সুস্থ একটা সম্পর্কে থাকতে পারবো কিনা। আর আমার মনে হচ্ছে আমি পারবো, মাম্মা বিয়ে ছেলেখেলা নয়। আর এটা তোমাদের যুগ না মাম্মা,যে একজন জোর করে তোমাকে বিয়ে করবে আর তুমি ধীরে ধীরে তাকে মেনে নেবে। এটা আমাদের যুগ, আমাদের চাহিদা ভিন্ন মাম্মা। বুঝতে হবে তোমার!”

সামিন আলো হতভম্ব হয়ে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
ইহান বহু কষ্টে নিজের ক্রোধটুকু সংবরণ করলো, বোনের গায়ে হাত তুলতে সে ইচ্ছুক নয়। শুধু ইনশিরাহকে ধাক্কা দিয়ে বললো,“ইশি আমার ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙবি না! আ'ম ওয়ার্নিং ইউ!”

আলো চেঁচালো স্বামীর ওপর,“এই নরম কেনো কাটছেন ওর সাথে? ওর সাথে নরম কেনো কাটছেন? আপনি আমাকে ছাড়ুন। ওকে আজ আমি বোঝাবো স্বাধীনতার অমর্যাদা করলে কি শাস্তি পেতে হয়। যুগ পাল্টেছে তাই একটা ক্রিমিনাল ফ্যামিলির ছেলের সাথে বোঝাপড়া করতে গিয়েছে আপনার আদরের দুলালী। কুলাঙ্গার একটা। আপনি আমাকে ছাড়ুন। ওকে আমি কেটে ফেলবো আজকে!”

সামিন ম্লান হাসলো,মেয়ের দিকে তাকিয়ে স্ত্রীকে বললো,“ও কোনো বুঝ নেওয়ার অবস্থায় আছে? তোমার মনে হয় আছিয়া? ওর প্রত্যেকটা কথা শুনছো না?”

ইহান একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ইনশিরাহকে বললো,“ এই আমার দিকে তাকা।”

ইনশিরাহ তাকালো ভাইয়ের দিকে। ইহান দাঁতে দাঁত চেপে দৃঢ় ভাবে বলতে লাগলো,“তুই একটা বেয়াদব ছাড়া কিছুই না! তোকে আমার কিছু বলার নেই আর। তবে শুনে রাখ, আমি ইহান তাজওয়ার মির্জা। তোর ঐ ছেলেকে বিয়ে করতে হলে আমাকে টেক্কা দিয়ে করতে হবে। শুনেছিস তুই? ঢুকেছে মাথায়?”

ইনশিরাহ তাকিয়ে আছে ইহানের দিকে। সামিন ইহানকে বলতে লাগলো,“আরে এভাবে বলছিস কেন! শুনলি না বললো, ওর লাইফ, ও ভালো বুঝবে। ওর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছিস!”

এই কথাটি অসহায়ের মতো বললো সামিন। ইনশিরাহ পাপার দিকে তাকায়। ইহান সামিনকে বলে,“বড় বাবা স্টপ! এতো ভেঙে পরার কিছু হয়নি! আর ওর এসব ফালতু সিদ্ধান্ত তোমাকে আমি মেনে নিতে দেবো না মরে গেলেও। পিতৃস্নেহে অন্ধ কিংবা তুমি দুর্বল হলেও আমরা কেউ হবো না। আমি আমার বোনকে একটা জঘন্য পরিবারে মরে গেলেও বিয়ে দেবো না।”

ঘুরে ইহান ইনশিরাহর দিকে তাকায়, ক'র্কশ স্বরে বলে,“শোন। তোর বয়ফ্রেন্ডের বাবা! নিজের অর্ধেক বয়সী মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে হেনস্থা করে। এমন লোককে শশুর বানানোর পাঁয়তারা করছিস।”

ইনশিরাহ অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো ইহানের দিকে, অস্ফুটে বললো,“কাকে?”

_যাকে-ই হোক। তোর না শুনলেও চলবে।

কিছু মুহূর্ত চুপ থেকে ইনশিরাহ বললো,“আমি বারবার বলছি দাদান। আমার সাঈমের ফ্যামিলি,আর সাঈমের আমার ফ্যামিলি নিয়ে মাথা ব্যথা নেই। বিয়েটা আমাদের দুজনের,জীবনটা আমাদের দুজনের,গোটা জীবন আমাদের দুজনের। ইউ গট ইট?”

বড়রা সবাই স্তম্ভিত। এই মেয়ে ভীষণ জেদি। সবটুকু দেখিয়ে দিলো আজ।
আলো তে'ড়ে গিয়ে এবার ইনশিরাহর চুলের মুঠি ধরলো, চেঁচিয়ে বললো,“আমাকেও চিনতে তুই ভুল করেছিস তবে। তোর মতো একশো মেয়ে কাটবো আর নদীতে ভাসাবো তবুও আজীবন জ্বলতে দেখবো না। হবো না আমি আবেগী মা। আমি তোর বাপ না। আমি আলো।”

মায়ের হাত থেকে শান্ত হয়ে ইনশিরাহ নিজের চুল ছাড়িয়ে নিয়ে বললো ,“আমি বুঝতে পারছি তোমাদের অনুভূতি। যা করছো সব জায়েজ। চিন্তা করো না মাম্মা,আমি ইনুর মতো কিছুই করবো না, না বিয়ের জন্য উতলা হবো। তোমাদের যা বোঝানোর বুঝিয়েছি,আর কিছুই বোঝানোর নেই আমার। আমি নিজেকে সময় দিয়েছি, তোমাদেরও দিলাম। পাঁচ,দশ, কুঁড়ি বছর সময় নাও। আমি তোমাদের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করবো না, এবং আমি নিজের পছন্দ জলাঞ্জলি দিয়ে তোমাদের ইচ্ছেতে সো কলড অ্যারেঞ্জ ম্যারেজও করবো না।
বিয়ে করলে সাঈমকে করবো,আর তোমাদের অনুমতি নিয়েই করবো। নয়তো না।

বাকহারা সবাই ইনশিরাহর শান্ত হয়ে বলা কথাগুলো শুনলো। ইনশিরাহ আবারও বললো,“আমি আবারও বলছি। আমি এতো দুর্বল নই যে আমাকে পালিয়ে বিয়ে করতে হবে। একজনকে পছন্দ করেছি, দূর্ভাগ্যবশত সে তোমাদের শত্রুর ছেলে। তবে পালিয়ে বিয়ে তো আমি মরে গেলেও করবো না। তাই আমাকে পাহারা দিয়ে রাখার কোন প্রয়োজন নেই। সবাই সময় নাও। আশা করছি আমাকে বুঝবে। না বুঝলে না বুঝবে, তবে অন্য কাউকেও গ্রহণ আমি করবো না, প্রয়োজনে আজীবন কুমারী থাকবো। ইনশিরাহ কখনও নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়নি, আর যাবেও না। একটা গোটা জীবন চার দেয়ালের মধ্যে একটা মানুষকে সহ্য করবো আমি, তোমরা নয়। আমার যদি সেই মানুষটা পছন্দেরই না হয়, তাহলে অমন বেকার সম্পর্কে যাওয়ারও কোনো প্রয়োজন নেই। একা একা দিব্যি কাটিয়ে দেওয়া যায় একটা গোটা জীবন।”

কথাগুলো শেষ করলো ইনশিরাহ। বাবা,মা, চাচা,চাচী,দাদানের অসহায় দৃষ্টি উপেক্ষা করে ড্যাম কেয়ার ভাব নিয়ে ত্রস্ত পায়ে হেঁটে দোতলায় চলে যায়। নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পরলো ইনশিরাহ। মাথাটা ভীষণ ধরেছে। বুকটা ফাঁকা লাগছে তার।

______

শুদ্ধর খিলখিল হাসির কলরব উঠেছে গোটা অ্যাপার্টমেন্টে। তাকে আজ সকালে হসপিটাল থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। বিছানায় চিৎ করে আধশোয়া করে রাখা হয়েছে ছেলেটাকে। তার হাতে একটা রিমোট কন্ট্রোলড ইউএফও। যেটা কেনা তার কাছে “ড্রিম” ছিলো। মাম্মা ওয়াদা করেছিলো সামার ভ্যাকেশনের আগে তাকে এটা কিনে দেবে, কিন্তু শুদ্ধ আগেই পেয়ে গেলো। ঐ আঙ্কেলটা দিলো। শুধু ইউএফও নয়, আরো দিলো ক্যাপ্টেন আমেরিকা। ঘর ভর্তি হয়ে আছে খেলনায়।
অতটুকু শুদ্ধর উত্তেজনার শেষ নেই। খুশিতে ফেটে পরছে। এতো খেলনা একসাথে পেয়ে ব্যাথা ভুলে গিয়েছে ছেলেটা। কৌতুহল আর বিস্ময় নিয়ে প্রত্যেকটা খেলনা হাতে নিয়ে দেখছে।

বাইরের ঘরে প্রেরণার উচ্চহাসির শব্দে শুদ্ধ হাসি থামিয়ে দেয়। মাম্মা এভাবে কেন হাসছে সে বুঝতে পারছে না। প্রেরণা হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। সাথে প্রিতমও, ইনায়াও। তাদের হাসির কারণ,প্রেরণার ফুপি মুবিনা শুদ্ধকে দেখতে এসেছেন। ছোটো লুঙ্গি নিয়ে এসেছেন তিনি, এটা শুদ্ধকে পরানো হবে ক'দিন। লুঙ্গি পরিহিত ছোটো শুদ্ধকে কল্পনা করেই ওরা হেসে কুটিকুটি হচ্ছিলো।

মুবিনা সবাইকে ধ'ম'কে বলে,“থামবি! তোরা এমন করলে ও তো পরতেই চাইবে না এটা।”

ওরা হাসি থামাতে পারছে না। প্রিতম লুঙ্গিটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে। আর বলছে,“আপু আমার ছোটো বেলার সেই দিনগুলোর কথা মনে পরে যাচ্ছে।”

ইনু পাশ থেকে ফিসফিসিয়ে প্রিতমকে মজার ছলে বললো,“কেন তোমারও মুসলমানি হয়েছে শুদ্ধর মামু প্রিতম?”

প্রিতম বিষম খেয়ে কাশতে শুরু করলো। ইনায়া মুখ চেপে হাসছে ‌‌। প্রিতম নিজেকে সামলে নিয়ে লাজুক হয়ে বললো,“শোনো, আমার খৎনা হয়েছিলো মস্কোতে। মম তো লুঙ্গি কি তা জানেই না। এটা তার কাছে ভীষণ অদ্ভুত পোশাক লেগেছিলো। ড্যাডের সাথে রীতিমতো ঝগড়া করেছে এটা আমাকে পরতে দেবে না তাই।”

প্রেরণা তখন মুবিনার সাথে সব গোছগাছ করছিলো। ও বাড়ি থেকে গতকাল সন্ধ্যায় সামিন ইয়াসার মির্জা আর ইলহাম মির্জা হসপিটালে এসে দেখে গিয়েছেন শুদ্ধকে, এনেছিলেন নানা পদের মিষ্টি। তার আগে ইহান মির্জা বিকেলে কত খাবার কিনে দিয়েছে, ঘর ভরে গিয়েছে প্রেরণার।

এই মির্জারা কুটুম্বিতায় ওস্তাদ, প্রেরণা মনে মনে সেটাই ভাবছে। কানাঘুষা শুনেছে সেই, ইনু-প্রিতমের রিসিপশনের জন্য কাড়ি কাড়ি টাকা বাজেট তাদের। এদিকে প্রেরণা-প্রিতম সর্বোচ্চ পাঁচ লক্ষ টাকা খরচ করার সামর্থ্য রাখে। তাদের সাথে মির্জাদের কখনোই যায়না, প্রিতমের দুঃসাহসের কথা ভাবলে মাঝেমাঝে প্রেরণা অবাকই হয়।

সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে প্রেরণা ইনায়াকে ধ'ম'কে পড়তে পাঠালো, ইদানিং কেমন পড়াচোর হয়েছে ইনায়া, এতো সাপোর্ট দেওয়ার পরেও না পড়তে পারলেই যেন বাঁচে। ইশমাম মির্জার সামনে প্রিতম-প্রেরণার নাক কাটাবে এই মেয়ে নির্ঘাত।

ধ'ম'ক খেয়ে লটকানো মুখ নিয়ে ইনায়া নিজের পড়ার ঘরে গেলো। মেয়েটার বাচ্চামো দেখে হাসলো প্রিতম প্রেরণা। দুমিনিট খুব জ্ঞানী আচরণ করলে পরের দুমিনিট বাচ্চা হয়ে যায়।

প্রণমির ঘরে মিস জেনি প্রণমির চুলে ওয়েল মাসাজ দিচ্ছিলেন,আর প্রণমিকে “প্রাইড অ্যান্ড প্রেজ্যুডিস” পড়ে শোনাচ্ছিলেন। মেয়েটা চুপচাপ বসে আছে।

প্রেরণা একপলক উঁকি দিলো, তবে ঘরে ঢুকলো না। সে গেলো শুদ্ধর কাছে। ঘরে গিয়েই থ'ম'কে দাঁড়াল প্রেরণা। খেলনা গুলোকে দুহাতে আগলে নিয়ে আধশোয়া হয়ে আছে ছেলেটা।

সবগুলো ভীষণ দামী খেলনা। প্রেরণা ইহানকে গতকাল বিকেলে বারণ করতে পারেনি ভদ্রতার খাতিরে। তবুও মনে খচখচানি থেকে গিয়েছিলো। এতো দামী উপহার শুদ্ধকে কেউ দিক সেটা প্রেরণার পছন্দ নয়। কিন্তু এখন,ছেলের মুখের অমন হাসি দেখে প্রেরণা গলে গেলো।
কত উচ্ছ্বসিত লাগছে ছেলেটাকে। থাক, লোকটা ছেলেটাকে ভালোবেসেই তো দিয়েছে! কোনো ভুল নেই এতে!

_______

দীর্ঘসময় ওভাবে পরে থেকে উঠে বসলো ইনশিরাহ। তীব্র গ্লানিতে মনটা পুরো বিষিয়ে গিয়েছে তার। মাম্মা পাপার সামনে, তাদের চোখে চোখ রেখে অতগুলো তেঁতো কথা ইনশিরাহ বলেছে জেদের বসে, এই কথাগুলো মাম্মা পাপার কোথায় লেগেছে এতোটুকু বোধ তার হলো। কতগুলো কথা সে শোনালো আজ। পাপার শুকনো মুখটা বারবার দৃষ্টিপটে ভেসে উঠছে তার।
শরীরটা ক্লান্ত লাগছে ভীষণ। কি করবে,কি করবে না সবকিছু জট পাকাচ্ছে। ধীরপায়ে হেঁটে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলো নিজের মুখটা, দেখলো একটা কুলাঙ্গারের মুখ। যেটা মাম্মা কিছুক্ষণ আগে বললো।
কিছুক্ষণ নিজের মুখটার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থেকে ইনশিরাহ হাতে ফোনটা তুলে নেয়। একটা সুপ্ত বিশ্বাস আছে তার,সবাই মানবে। তাকে আরো চেষ্টা করতে হবে। চেষ্টা না করে হাল ছেড়ে বসে থাকলেই বা কি লাভ!

একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ইনশিরাহ ব্যস্ত আঙ্গুল চালিয়ে সাঈমের নাম্বারটা ডায়াল করে।

নিচতলায় তখন পিনপতন নিরবতা বিরাজমান। আলো আর সামিন দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা অন্যকিছু দেখছে না,অন্যকিছু শুনছে না।

ইহান আলোর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে,“সবটা আমাকে হ্যান্ডল করতে দাও বড় মা! তুমি হুট হাট এতো উত্তেজিত হবে না।”

আবারও ডুকরে কেঁদে ওঠে আলো। কপাল চাপড়াতে থাকে সে। আহাজারি করে বলতে থাকে,“এতো বোকা কেউ হয়? আসলেই হয়?”

আলোর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে না কেউ। ইশমাম একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,“দোষ হয়তো আমাদেরই। ছেলেমেয়েগুলোকে বাস্তব জ্ঞান শেখাইনি। দোষ আমাদের, দায় এড়াবো কিভাবে? দেখলে না একজন কি কাহিনী করে ছাড়লো।”

সামিন ধপ করে বসে পরলো সোফাতে। কেমন কাঁপছে শরীর, ঘামছে সে। দৃষ্টিপটে ভেসে উঠেছে সেই দৃশ্য গুলি।
ছোটো ইনশিরাহকে কোলে নিয়ে রাতের পর রাত জেগে গান শোনানোর কথা, ইনশিরাহর খিলখিল হাসি।
আজ সেই ছোট্ট ইনশিরাহ কেমন নিজের বাবার চোখে চোখ রেখে তার অধিকারের কথা বললো, কেমন সামিনকে আসামীর মতো মনে করলো না মেয়েটা? এমনটাই তো দেখলো সামিন মেয়েটার চোখে।

পরী অসুস্থ শরীর নিয়ে ছুটে এসে সামিনকে ধরলো,“ভাইয়া কি হয়েছে আপনার!”

তাকে হাত দিয়ে ইশারা করে সামিন থামিয়ে দিয়ে বললো,“তুই নিজেই অসুস্থ। চেচাস না। আমি ঠিক আছি।”

______

কলটা রিসিভ হবার সাথে সাথে ইনশিরাহ অধৈর্য হয়ে বলল,“সাঈম! সাঈম তুমি শুনতে পাচ্ছ!”

_পাচ্ছি।

_সাঈম, আংকেল কাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন?
কাঠ কাঠ গলায় ইনশিরাহ জানতে চায়।

সাঈম বললো,“হোয়্যাট! হোয়্যাট আর ইউ টকিং আবাউট!”

_বাদ দাও, শোনো মাম্মা পাপাকে মানাতে পারিনি। আমার মনে হয়না এতো তাড়াতাড়ি মানাতে পারবো, সাডেন রিয়াক্ট করেছে সবাই, তবে মানিয়ে নেবো। তুমি আংকেলের সাথে কথা বলেছো তো? ওনাকে নিয়ে পাপার সাথে কথা বলতে এসো। আমার মনে হচ্ছে পাপা খানিকটা নরম হলেও হতে পারে সাঈম। পাপা আর যাই হোক কঠোর থাকবে না, পরে মাম্মাকেও মানিয়ে নেবো।

কিছুসময় দু'পাশে নিরাবতা। ইনশিরাহ উদ্বিগ্নতার সহিত বলে,“সাঈম শুনতে পাচ্ছো!”

_হ্যা পাচ্ছি।
শীতল স্বর জবাব দেয়।

ইনশিরাহ আকুল হয়ে বলতে থাকে,“আংকেলকে নিয়ে এসো।”

_কেন?

সাঈমের এমন প্রশ্নে ভীষণ অবাক ইনশিরাহ। বললো,“কেন মানে? বিয়ের কথা বলতে আমাদের, বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।”

_কার বিয়ে?

ইনশিরাহ বিস্মিত স্বরে বললো,
_আমাদের সাঈম। কাম অন সাঈম আমার এতো ঘ্যানঘ্যান করতে ভালো লাগছে না, যা বলছি শোনো।

_কে বিয়ে করবে তোমাকে?
সাঈম মৃদু হেসে, শীতল কন্ঠে বললো।

ইনশিরাহ থমকাল, কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,“মানে!”

কিছুক্ষণ হাসলো সাঈম, তারপর বলল,“মানে আয়নায় দেখো নিজের মুখটা।”

ইনশিরাহ উদ্ভ্রান্তের ন্যায় সত্যি সত্যি ঘুরে তাকাল আয়নায়। ওপাশ থেকে সাঈম শান্ত স্বরে বলতে লাগলো,“আয়নায় রোজ নিজের মুখটা দেখো? তুমি ভাবলে কি করে তোমার মতো একটা ঠান্ডা মরা মাছকে আমি বিয়ে করবো?”

_সাঈম তুমি আমার সাথে মজা করছো?
ক্লান্ত স্বরে আওড়াল ইনশিরাহ।

একটু পর বললো,“ছয় বছর তাহলে ওসব কি ছিলো? তখন আমি ঠান্ডা মরা মাছ ছিলাম না? তখন আমি কি ছিলাম!”

সাঈম নিরুত্তর। ইনশিরাহ চেঁ'চি'য়ে ওঠে,“আই ওয়ান্ট মাই আন্সার! তখন আমি কি ছিলাম?”

_চড় টা কেন মেরেছিলে।

ইনশিরাহ দ্বিতীয় বারের মতো থমকায়। ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে সে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,“ওসব তো পুরনো কাসুন্দি সাঈম!”

_তোমার কাছে যেটা পুরনো কাসুন্দি,আমার কাছে সেটা দগদগে ঘা। যেটা এখনও শুকায়নি।

ইনশিরাহ বোকার মতো এলোমেলো দৃষ্টি দিলো, অস্ফুটে বিড়বিড়ালো,“কাম অন সাঈম। এসব প্রাংক তাই না? সাঈম আমি অলরেডি মাম্মা পাপার সাথে আমার সম্পর্কে চিড় ধরিয়েছি, আমাকে ছোট করে দিও না সাঈম, এটা অনেক বড় শোধ হয়ে যাচ্ছে একটা চ'ড়ের।

সাঈম হাসলো,বললো,“ওয়াও। ইগোইস্টিক ইশি বিয়ের জন্য বয়ফ্রেন্ডের কাছে আকুল হয়ে গিড়গিড়াচ্ছে? এতে ইশির আত্মসম্মানে আঘাত লাগছে না?”

ইনশিরাহ থেমে গেলো। সাঈম বলতে লাগলো,“এটা সামান্য শোধ তুললাম ইনশিরাহ বিনতে সামিন। আমাকে লাঞ্ছিত করেছিলে অনেক মানুষের সামনে, আমি কেবল মাত্র তোমাকে তোমার পরিবারের কাছে ছোটো করলাম। কি ক্ষতি হয়েছে তোমার? আর কি ক্ষতি হয়েছে? আই লেফ্ট ইউ ভার্জিন, ইজন্ট ইট এনাফ? কিচ্ছু ক্ষতি করিনি!”

কথাটা শুনে দু'চোখ বন্ধ করে ফেলে ইনশিরাহ। সাঈম খুবই ঠাণ্ডা স্বরে বলে,“বিয়ে হয় ভালোবাসা থাকলে। যেটা কখনোই হয়নি। গুড বাই।”

কল কাটলেও বিশ্বাস করতে পারছিল না ইনশিরাহ, তখনও বিড়বিড়াচ্ছে,“সাঈম ছোটো করো না আমাকে, সাঈম। সাঈম।”

কলটা ততক্ষণে কেটে গিয়েছে। ইনশিরাহ ঠায় দাঁড়িয়ে ফোন কানে চেপে। তার দৃষ্টি আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে, শ্যামবর্ণের একটা ঠান্ডা মরা মাছ দাঁড়িয়ে আছে। একটা কুলাঙ্গার দাঁড়িয়ে আছে। সে সেটাই দেখছে।”

খানিক বাদে গগন কাঁপিয়ে চিৎকার দিলো ইনশিরাহ। না,সে কাঁদছে না। শুধু চেচাচ্ছে। হাতের আইফোন ছুঁড়ে ড্রেসিং টেবিলের আয়না ভাঙলো। ভাঙতে থাকলো ঘরের সবকিছু,এক এক করে। উন্মাদ হয়ে উঠেছে ইনশিরাহ।

গুড়ুম গুড়ুম বজ্রপাতের মতো শোনাচ্ছিলো শব্দ গুলো, সাথে ইনশিরাহর অমন পাগলের মতো চিৎকার।

নিচতলা থেকে হতবাক হয়ে সবাই ছুটে যায়। সবার প্রথমে ইহান। ঘরে ঢুকে থ'ম'কে দাঁড়াল সে। ইনশিরাহর ঘরটা একটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সবকিছু ভাঙচুর করে হাপাচ্ছিলো ইনশিরাহ।

ইহান দুকদম এগলো বোনের দিকে, ইনশিরাহ হাঁপাতে হাঁপাতে শান্ত হয়ে যায়, রক্তচক্ষু নিয়ে তাকায় ইহানের দিকে। অস্ফুটে ইহানকে বলে,“হি চিটেড অন মি দাদান!”

চলমান.....

গল্পে প্রতিদিন লিখে দেওয়া হয় প্রাপ্তমনস্কদের জন্য। মানে গল্পে অনেক কিছুই লেখা হবে যেটা একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী,আই মিন মুক্ত মনা না হলে হজম হবে না। এখনও কিছুই লিখিনি সেসব। আপনারা যারা এসবে অভ্যস্ত নন,যারা নিউট্রাল ওয়েতে ভাবতে পারেননা কিছু, যাদের কাছে পৃথিবীর সব আবেগ অনুভূতির একটাই সংজ্ঞা থাকে, তাদের গল্পটি এড়িয়ে গেলেই ভালো হয়। নয়তো পীড়াদায়ক হবে আপনাদের জন্য।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 44 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন