ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 45

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৪৫
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

ফোন কে'টে সাঈম দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ। তার দৃষ্টি তখনও স্থির হয়ে আছে হাতের ফোনটাতে।
পাশে ওর বন্ধুরা ওর দিকে তাকিয়ে আছে। একজন ভীষণ কৌতুহল নিয়ে বলল,“এতো সহজে? তোর বাঁধলো না? আই মিন ও অন্য মেয়েদের মতো নয়, কতটা লয়াল ছিলো তোর সাথে! শি হ্যাজ স্ট্রং পারসোনালিটি।”

_না বাঁধলো না!
শান্ত স্বরে জবাব দিলো সাঈম।

_তোর ইগোকে জেতাতে গিয়ে এতো কাহিনী করলি ভাই?

_খুব ইগো ওর। এসব মেয়েদের কোথায় আঘাত করতে হয় জানিস? আত্মবিশ্বাসে।
ছেলেটার কথার জবাব না দিয়ে সাঈম উল্টো বলে দেয়।

_তুই সত্যিই পারলি? না মানে, এতো ইজি?

_পারলাম।

_এখন তোর প্ল্যান কি?

সাঈম হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বসে পরে। দৃষ্টি ঘুরিয়ে কম্পিউটার টেবিলের ওপরে রাখে। ওর এক বন্ধু এগিয়ে গিয়ে টেবিলের ওপর রাখা কাগজগুলো হাতে তুলে নিয়ে দেখলো পাসপোর্ট আর ইউএসএর ভিসা। বিস্ময় নিয়ে তাকাল সাঈমের দিকে। সাঈম একটা সিগারেট ধরিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে বলতে লাগলো,“পাপা ইউএসএ পাঠিয়ে দিচ্ছে।”

_আর ইনশিরাহ?

_এভ্রিথিং ইজ ফিনিশড। বারবার একই কথা কেন বলছিস!

ওরা বিষয়টা তখনও হজম করতে পারছিলো না। একজন বললো,“আর ইউ শিয়র তোর ওর প্রতি কোনো অনুভূতি জন্মায়ইনি এই ক'বছরে? একটা সামান্য ভুল করেছে মেয়েটা, তারজন্য মন ভাঙবি এভাবে! তুই এতো হিংস্র বুঝতে পারিনি! একটা কথা বল, ডিড ইউ টাচ হার?”

_নো।
দৃঢ় ভাবে বললো সাঈম।

_তাহলে এটা কেমন শোধ তুললি!

_সেটা ইনশিরাহ বিনতে সামিনকে জিজ্ঞেস করলেই বুঝতে পারবি। ওর কোথায় লেগেছে। আ'ম স্যাটিসফাইড!

বিস্ময় নিয়ে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে ছেলেগুলো। ধীরে ধীরে আবারও বলে উঠলো,“তোর মায়া লাগছে না ওর জন্য?”

হঠাৎ সাঈম ওদের দিকে ঘুরে তাকালো, কিছু পল চেয়ে থেকে বললো,“না। লাগছে না।”

______

আরো দুকদম এগিয়ে গেল ইহান। ইনশিরাহ ধপ করে কাঁচের টুকরোর মধ্যেই বসে পরলো। নরম ত্বক ক্ষতবিক্ষত হলো। ইহান ছুটে গিয়ে বোনকে টেনে তুলে সোজা করে দাঁড় করালো। ইনশিরাহ টলছে, রিতু ছুটে এলো,ধরলো মেয়েকে।

ইনশিরাহ তখন ইহানের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করতে লাগলো,“আমাকে প্লিজ ওর কাছে নিয়ে চলো দাদান। একবারের জন্য, একবারের জন্য দাদান।”

ইহান আশেপাশে তাকায়। সামিন আলোও ছুটে এসে দরজার কাছে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছিলো, তাদের হতবিহ্বল দৃষ্টি ইনশিরাহর মুখপানে।

মেয়ের অমন দৃশ্য দেখতে দেবে না তাই ইলহাম আর পরী,সামিন আর আলোকে সরিয়ে দিচ্ছে ওখান থেকে ঠেলে।
সামিন নড়ছে না,আলোও না।

ইশমাম ছুটে এসে ইনশিরাহকে ধরে ঝাকুনি দিয়ে বললো,“মা! বি স্ট্রং! তুই আপাতত শান্ত হ!”

ইনশিরাহ শান্ত হয় না, হুমরি খেয়ে পরে ইশমামের বুকে, চেঁ'চি'য়ে কাঁদতে থাকে,“ছোটো বাবা প্লিজ নিয়ে চলো,আমি ওকে জু'তোর বাড়ি মারবো। প্লিজ নিয়ে চলো। প্লিজ!”

একই কথা বারবার আওড়াচ্ছে ইনশিরাহ, পাগলের মতো, ক্ষ্যাপাটে হয়ে উঠেছে কেমন! ইহান বোনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে সামিন আর আলোকে দেখে। ছুটে গিয়ে সামিনকে ধরে টানতে থাকে ইহান । টেনে নিয়ে ঘর থেকে বের করে দোতলার লিভিং রুমের একটা ডিভানে বসিয়ে দিয়ে আবারো বোনের কাছে যায়। ইশমামের থেকে ইনশিরাহকে ছাড়িয়ে মাথায় হাত রেখে ইহান বলতে থাকে,“এমন একটা পরিস্থিতি ইশি, আমি তোকে কি বলবো বুঝতে পারছি না। তুই বল, আমার কি বলা উচিত! তুই কি চাস! ”

হাউমাউ করে কাঁদছে ইনশিরাহ,ভাইয়ের পাঞ্জাবি খামচে ধরে বলছে,“আমি ওকে খুন করতে চাই দাদান। ও আমার থেকে আমার মাম্মা পাপাকে কেড়ে নিলো, আমার আত্মবিশ্বাস কেড়ে নিলো, আমি ঠান্ডা মরা মাছ দাদান। আমি ওকে যাস্ট খু'ন করতে চাই!”

বিলাপ করছে সে। বোনের কথাগুলো কানে বাজছে ইহানের। মনের কোথাও তীব্র ইচ্ছা জন্মাল এহেন অপরাধের শাস্তি হিসেবে সাঈমকে সত্যি সত্যি খু'ন করার।

ইহান বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। রিতুকে চোখ দিয়ে ইশারা করলো ইনশিরাহর ফার্স্ট এইড করে দিতে।

আলো দরজার কাছে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। নির্নিমেষ দেখছে উন্মাদের মতো আচরণ করতে থাকা মেয়েকে, সে না মেয়ের কাছে যাচ্ছে,না স্বামীর কাছে। তিনজন তিন প্রান্তে।

ইহান বলছে,“একটা জানোয়ার তোর আত্মবিশ্বাস কিভাবে ভাঙলো? মাম্মা পাপাকে হারিয়েছিস মানে? এই পাগল! কিসব বলছিস! প্লিজ শান্ত হ!”

_তুমি বুঝবে না দাদান, আমি হারিয়েছি! মাম্মা পাপাকে আমি হারিয়েছি। তুমি বুঝবে না।
পাগলের মতো বকে যাচ্ছে ইনশিরাহ।

আলো হঠাৎ ও ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটে যায় সামিনের কাছে। লোকটার শার্টের দু'টো বোতাম খুলে বুকে হাত বুলিয়ে বলতে লাগলো,“কি হয়েছে? আপনার শরীর ঠিক আছে?”

ও ঘর থেকে ইনশিরাহর কান্না ভেসে আসছে। সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বললো,“সামলাও ওকে। আমি ঠিক আছি।”

______

ছুটির দিনগুলোতে মুঈন শহরের চেনা পরিচিত বন্ধু বান্ধব,যারা মুঈনের মতোই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সবাই একযোগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নিকটবর্তী স্পোর্টস ক্লাবে যায়।

টেনিস অতি প্রিয় একটি ইনডোর গেমস মুঈনের। আজ তার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে এখানকার এসিল্যান্ড সুজয় ভৌমিক।

প্রথমে একদফা খেলেও ক্লান্ত হয়নি কেউ। গত পর্বের বিজয়ী মুঈনের দিকে বলটা সার্ভ করে সুজয় বললেন,“আই এগ্রি উইদ রিশাব, আসলেই তোমার শটগুলো হয় রাফায়েল নাদালের মতো মুঈন।”

জোরালো হাসলো মুঈন, নিজের প্রশংসা শুনে। সুজয় নিজের শট টা দারুণ ভাবে দিয়ে মুঈনকে বললো,“ম্যাট্রিমোনি সাইটে তোমার অ্যাকাউন্ট দেখলো তোমার বৌদি। তারপর থেকে ভিশন খোচাচ্ছে আমাকে।
তুমি ওভাবে পাত্রী খুজছো? আরে আমাদের বললেই তো এতদিনে একটা হিল্লে করে দিতাম। আমাদের সার্কেলের বন্ধু বান্ধবদের সুন্দরী সুন্দরী শ্যালিকার অভাব নেই ইউ নো!”

চোখ টিপ দিয়ে কথা টা মুঈনকে বললো সুজয়। মুঈন হেসে বললো,“আরে কৌতুহল বশত খোলা ওটা, কারো সাথে চ্যাটিং শুরু করিনি। সেদিন প্রফেসর তন্ময় ওর পরিচিত কারো লিংক আমার অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেখতে বললো, দেখলাম মেয়ে ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ার পড়ছে,
কান্ড দেখো তন্ময়ের! আমি বাপ বাপ করে পালিয়েছি! তারপর অ্যাপ থেকে লগ আউট করে নিয়েছি। মানে ইন্টারেস্ট খুঁজে পাইনা!”

টেনিস কোর্টের বাইরে বসে বাকিরা হাসছিল। ইংরেজি প্রফেসর নাজির বললো,“তো খারাপ কি! সুইট সিক্সটিন! আইনের লোক হয়ে একটু বেআইনী কাজ করবেন না হয়। দেখতে কিন্তু আপনাকে বুড়ো লাগে না মুঈন, আপনার পিঠপিছে আপনার সৌন্দর্য নিয়ে বন্ধুমহলে ভীষণ কথা হয়। হিংসে হয় আমাদের, আমাকে দেখুন, ভুড়ি বেড়ে এক শেষ হয়েছে।”

মুঈন হাসলো। সুজয় বলতে লাগলো,“একটা প্রেম করলেই পারতে!”

_সময় পাইনি।

_হুম বুঝলাম। তবে মাথায় রেখো, আজকাল আরেঞ্জ ম্যারেজ টিকিয়ে রাখা ইজ লাইক বিশ্বযুদ্ধ জয় করার মতো।

পাশ থেকে জাহিদ বললো,“আহা বেচারাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছো কেন!”

সবার কথা শুনে হাসলো মুঈন। সুজয় বলতে লাগলো,“হেসো না ব্রাদার! আচ্ছা বলোতো একজনকে চেনো না,জানো না তাকে নিয়ে কিভাবে সংসার করবে! এজন্য বারবার বলছি একটা প্রেম করো!”

_এটা আমার প্রেম করার বয়স?

_তো আরেঞ্জ ম্যারেজে কিভাবে কি করবে! মানে যদি পছন্দ অপছন্দ না মেলে,কত জটিল হবে!

মুঈন নিজের শটটা দিয়ে বলতে লাগলো,“তোমরা বিয়েটাকে আরেঞ্জ অ্যান্ড লাভ এই দুইভাগে ভাগ করে দেখো কেনো এটা আমি বুঝিনা। আসলে আমার জীবনবোধ ভিন্ন, আমার কাছে দু'টোর একটাই অর্থ, একটাই শব্দ,“বিয়ে” যার গুরুত্ব অনেক। লাভ হোক,আর আরেঞ্জ হোক, যেভাবেই গড়ে উঠুক ঐ সম্পর্কটা, সম্পর্কটাকে লালন করতে হয়। ঐ সম্পর্কটা আমাদের থেকে বহুত কিছু চায়। দিতে হয়। ধৈর্য্য,বিনয়,সহনশীলতা ইত্যাদি ইত্যাদি।

শুধু আরেঞ্জ ম্যারেজে কেন? যেকোনো বিয়েতে, বিয়ের পরে,ঐ সম্পর্কে থাকতে গেলে দুজন ব্যক্তির পছন্দ অপছন্দ মিলতে হবে এটা একটি বেহুদা কথা। দুজন মানুষ, তাদের পছন্দ অপছন্দ মিলতেই বা যাবে কেন? এটা একটা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে ম্যাটার করে না, ম্যাটার করে একজন আরেকজনের পছন্দ অপছন্দের প্রতি কতটুকু শ্রদ্ধাশীল, মতামতের প্রতি কতটুকু সহনশীল। বুঝলে ব্রাদার?”

এতটুকু বলে মুঈন থামলো। নিচ থেকে সাদা বলটা উঠিয়ে সুজয়ের দিকে সার্ভ করে পুনরায় বলতে লাগলো,“আর বলছো অচেনা মানুষের সাথে সংসার করার কথা! তাহলে আমি বলবো,আই হ্যাভ দ্য রেস্ট অব মাই লাইফ টু নো হার! জানতে থাকবো, অসুবিধা কি! ”

______

বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে সামিন।‌ আলো তার বুকে মাসাজ করতে করতে কাঁদছে, আর বলছে,“ডক্টর যতই বলুক ঠিক আছে, আমার ভালো লাগছে না । চলেন হসপিটাল যাই।”

সামিন হাসলো। স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,“আমি সত্যিই ঠিক আছি আছিয়া। আসলে কিছুটা হতভম্ব হয়ে গিয়েছি,সেটা থেকে বেরোতে একটু সময়ের প্রয়োজন।”

আলো চুপ হয়ে যায়। সামিন বলতে থাকে,“কিভাবে বাবা-মায়ের সম্পর্কটাকে নিয়ে কথা শুনিয়ে দিলো দেখলে! ও কেন! পৃথিবীর সবাই-ই তো আমাদের সম্পর্কটাকে এভাবেই জাজ করে। আসলে সব কারমা! এড়াতে তো পারবো না।”

আলো সামিনের দুহাত ধরে আকুল হয়ে কাঁদছে। এই বার নম্র হয়ে বলছে,“বাদ দিন। আমি পেটে ধরেছি না ঐ মেয়েকে? আমার মতোই খারাপ হয়েছে,আপনাকে কষ্ট দেয়!”

_আমি মেয়ের ওপর একটুও রেগে নেই আছিয়া, একটুও না বিশ্বাস করো। আসলে আমার লজ্জা লাগছে,যে মুহূর্তে শুনতে পেয়েছি ও বাবা মায়ের সম্পর্কটাকে “বোঝাপড়া,মানিয়ে নেয়া” হিসেবেই দেখে, আমার তখন থেকে লজ্জা লাগছে মেয়ের সামনে দাঁড়াতে।
তুমি যাও, মেয়ের কাছে যাও। উন্মাদ হোক, বোকা হোক, জেদী হোক, মেয়ে তো আমাদের। বোঝাপড়া কিংবা মানিয়ে নেওয়ার নয়, মেয়ে আমাদের ভালোবাসার ফসল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ওর ভালো চেয়েই যেতে হবে। কষ্ট পেয়েছি বলে মুখ ফিরিয়ে বসে থাকলে ক্ষতি টা হবে কার? আমাদের মেয়ের। যাও ওর কাছে, এটুকু বলে ওকে শান্ত করো, ও ওর মাম্মা পাপাকে হারায়নি। ওর মাম্মা পাপার অনেক ধৈর্য্য।

একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেলো সামিনের ভেতর থেকে। আলো অভিমানী গলায় বললো,“যাবো না আমি। কিছুতেই যাবো না। কাদুক। বড় বড় কথা বলেছিলো না? জেনে বুঝে ওজন নিয়েছিলো না এই সম্পর্কের? কাদুক! আমি যাবো না। যাবোই না আমি!”

ইনশিরাহর ফার্স্ট এইড করে দিয়ে ইহান চুপচাপ বোনের পাশে বসে। ইনশিরাহর একপাশে রিতু। ইনশিরাহ মেজো মায়ের বুকে মাথা গুঁজে রেখেছে।

একটা সুনামী শেষে শান্ত পরিবেশ, অথবা পশ্চিম রনাঙ্গন নিশ্চুপ।

ইহান গম্ভীর কিন্তু নিচু স্বরে ডাকে,“ইশি!”

ইনশিরাহ সারা দেয় না। ইহান বলতে লাগলো,“আমি পাল্টা জবাব দিলে তুই খুশি হবি?”

নিরাবতা বজায় রাখলো ইনশিরাহ। রিতু মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ইহান ইনশিরাহকে বলতে লাগলো,“ও চেয়েছে তোর আত্মবিশ্বাস ভাঙতে, চেয়েছে ছোটো করতে। তোর মনে আবেগ তৈরি করে তোকে মাঝরাস্তায় ধাক্কা মেরে ফেলতে। এতেই ওর প্রতিশোধ হয়ে গেলো!
এখন তুই কাদছিস। কেন কাদছিস? তার চেয়ে ওকে ভুল কেন প্রমান করে দিচ্ছিস না! ওর পৈশাচিক আনন্দে জল ঢেলে দিচ্ছিসনা কেনো,আই থিংক এটা হবে ওকে জুতো মারার থেকেও বেটার।”

ইনশিরাহ তবুও চুপ করে রয়। ইহান চুপচাপ বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে অসহায়ের মতো। কতবড় বোনটা,কত বুদ্ধিমতি বোনটার কি হাল! সহ্য করার মতো নয় এই পরিস্থিতি । হাত নিশপিশ করছে তার। গলায় পাড়া দিয়ে ঐ জানোয়ারের জানটা বের করে দিতে ইচ্ছে করছে।

ইলহাম, ইশমাম বাইরে বেরোয়নি আজ, পরীও চেম্বারে বসেনি। বাচ্চাদের নিয়ে একটার পর একটা ঝড় সামলে তারা রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠেছে।

ইহান উঠে দাঁড়ায় বোনের পাশ থেকে। ইশমাম তাকে বললো,“তুই কোথায় যাচ্ছিস।”

ইহান কোনো জবাব না দিয়ে চুপচাপ চলে যেতে নিলে ইশমাম, ইলহাম ওকে ফেরালো। ইলহাম ধ'ম'কে উঠলো ছেলেকে,“হ্যাভ ইউ লস্ট ইয়র মাইন্ড? রাগের মাথায় একটা স্টেপ নিয়ে আবার একটা বিপদ ডেকে আনবি! থেমে যা। বোনকে শান্ত কর। এসব করার বহুত সময় পাবি!”

ইনশিরাহ মাথা তুলে তাকায় ইহানের দিকে। ইশমাম ইলহাম টানছে ইহানকে। ইনশিরাহ ভীষণ শান্ত। ক্ষীণ স্বরে বললো,“দাদান।”

ইহান ঘুরে তাকায় বোনের দিকে। ইনশিরাহ বলতে লাগলো,“কিচ্ছু করতে হবে না তোমাকে। আমি চাই না পাল্টা জবাব দিতে। হাস্যকর ! স্টপ। থেমে যাও তোমরা।”

_______

আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পরছে আজ। বাতাসের দাপটে উত্তরের খোলা জানালার কপাট গুলো ধুপধাপ আওয়াজ তুলে একটার সাথে আরেকটা বারি খাচ্ছে। ঝমঝম বৃষ্টির আওয়াজ ছাপিয়ে সে শব্দ ভীষণ বিরক্তি দিচ্ছে।
এমন বৃষ্টি গত ছয় মাসে কখনও হয়নি।
ইনশিরাহ মেঝেতে বসে,দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ছিলো। তার দৃষ্টি ঘরের কোণে টবে রাখা টিউলিপ গুলোর দিকে, ঘুলঘুলি থেকে আসা বাতাসের দাপটে যেগুলো নাচছে। এই টিউলিপ গুলো গতকাল বিকেলেই সাঈম দিয়েছিলো! ভালোবেসে নয়,শোধ নিতে!

ইহান ঘরে বসেই দলীয় নেতাদের সাথে জরুরি কনফারেন্স করছে। আলোচনা শেষ করে তাড়াহুড়ো করে উঠে সে ঘর থেকে বেরিয়ে উত্তর পাশের খোলা জানালা গুলো লাগিয়ে দেয়। এই কপাট গুলো সাবেকি ডিজাইনের,খোলাই থাকে সবসময়। ইতোমধ্যে ঘরের ভেতরের অনেকটা ভিজিয়ে দিয়েছে।
ইহান আশেপাশে তাকালো, পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ। যেন কোন প্রাণী নেই বাড়িতে। অথচ রাত মাত্র দশটা!

আলো নিচতলা থেকে ক্লান্ত পায়ে হেঁটে ওপরে উঠছিল তখন। ইহানের মুখোমুখি হলো। বড় মায়ের মুখটা কিছুক্ষণ দেখলো ইহান, জানতে চাইলো সামিনের কথা।

_ঘুমাচ্ছে।
আলো নিচু স্বরে বললো। সামিন তখন আসলেই ঘুমাচ্ছিলো, ডক্টর কিছু ওষুধ দিয়েছে, খেয়ে ঘুমিয়েছে।

বড় মায়ের হাতটা মুঠি করে ধরলো ইহান। গলার স্বর খানিকটা খাদে নামিয়েই বললো,“বড় মা ওর কাছে যাও।”

হাতটা সরিয়ে নিলো আলো। কাঁপা গলায় বললো,“কেন? সে তো নিজে বোঝাপড়া করেছে। তার জীবন নাকি তার মায়ের নয়, সাফ জানিয়ে দিয়েছে। এখন কেন মাকে লাগবে নিজের কষ্ট ঘোচাতে? এতো বড় হলো সে, এখন কি ছোটো হয়ে গেলো? এখন মাম্মা পাপাকে প্রয়োজন?”

কি তীব্র অভিমান মিশিয়ে আলো কথাগুলো বলছে। গলার স্বর উঁচুতে তুলেই, শুনিয়ে বললো ইনশিরাহকে।

ইনশিরাহ মায়ের কথাগুলো শুনলো। সে তখন নিষ্পলক তাকিয়ে ছিলো ভাঙা আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে। শুধু দেখেই যাচ্ছিলো নিজেকে। নানুমনি ভাঙা আয়না নিয়ে একটা কথা বলতেন সবসময়, ভাঙা আয়নায় যে মেয়ে মুখ দেখে ঐ মেয়ের জীবনে লাঞ্ছনার শেষ থাকে না। ইনশিরাহ এসব কুসংস্কার শুনে খুব হাসতো নানুমনির ওপর। আজ লাঞ্ছিত হয়ে ভাঙা আয়নায় মুখ দেখছে ইনশিরাহ। উল্টো হয়ে গেলো।

ইহান চুপ করাচ্ছে আলোকে। আলো চুপ হয় না, উল্টো আবারও কেঁদে ওঠে। চেঁচিয়ে বলে,“অমন বোকামি মানুষ জীবনে দুয়েকটা করে, এতো ন্যাকামি করার কিছু হয়নি ওকে বলে দে। এসব বন্ধ করে ঘুমিয়ে পরতে বল।”

ইহান তাকিয়ে আছে বড় মায়ের দিকে। আলো চলে যায় নিজের ঘরে।

ইহান একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ধীরপায়ে হেঁটে এগিয়ে যায় ইনশিরাহর ঘরের কাছে। দরজা খোলাই ছিলো। ইহান বাইরে থেকে স্বাভাবিক গলায় বলল,“ইশি আমি আসলাম ভেতরে।”

কয়েক সেকেন্ড পরে ইহান পা রাখলো ইনশিরাহর ঘরে। ভাঙা আয়নায় নিজেকে তখনও দেখছিল ইনশিরাহ।

দুকদম এগোয় ইহান। ইনশিরাহ ঘুরে তাকায় দাদানের দিকে, কিছুসময় চেয়ে থেকে ইনশিরাহ অস্ফুটে বললো,“দাদান ধরো কেউ যদি রিভেঞ্জ নেওয়ার জন্যও রিলেশন করে, তবুও তো মায়া জন্মানোর কথা ছয় বছরে। কম তো সময় নয়‌।”

কেমন রুগ্ন লাগছে ইনশিরাহর কন্ঠ। ইহান চুপ করে দেখছে। ইনশিরাহ বললো,“দেখো একটা কুলাঙ্গারকে দেখো দাদান । একটা ঠান্ডা মরা মাছ! ”

একটু থেমে ইশি বলতে লাগলো,“কোথাও একটা কথা পড়েছিলাম ঠিক খেয়াল নেই, “জানালাটা সারা রাত ঝড়ের সাথে যুদ্ধ করে দেখলো জানালার এপাশে কেউ ছিলোই না।”
আমি ঠিক ওই জানালার মতো দাদান। এর থেকে বড় লাঞ্ছনা আর নেই। তোমরা সবাই প্রতিদিন অন্তত একবার করে আমাকে কুলাঙ্গার ডেকো।”

ইহান বেশ কিছুক্ষণ ধরে ইনশিরাহকে দেখে বোনের মাথায় একটা হাত রাখলো, হঠাৎ করে বরফ শীতল কন্ঠে বললো,“ডোরেমন দেখবি ইশি?”

ইনশিরাহ মাথা তুলে ভাইয়ের দিকে অবাক চোখে তাকালো।

_______

ঠিক রাত এগারোটার সময়ে প্রিতমের ফোনে ইহানের কল এলো। ভীষণ চিন্তিত হয়ে প্রিতম রিসিভ করলো কলটা। ইনায়া তখন বেঘোরে ঘুমাচ্ছে।

কলটা রিসিভ করে প্রিতম চিন্তিত হয়ে বলে,“কি হলো দাদান? এতো রাতে? সব ঠিক? কেউ অসুস্থ?”

_শান্ত হও। সব ঠিক আছে। তুমি ইনুকে নিয়ে একটু আসতে পারবে?
ঠান্ডা গলায় বলে ইহান।

ভীষণ অবাক প্রিতম। বললো,“এখন?”

ইহান ওপাশ থেকে বললো,“হ্যা এখন। বাড়ির গাড়ি তোমাদের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে।”

পুরো রাস্তা ইনায়া হাই তুলেছে। এই বৃষ্টির মধ্যে দাদানের হয়েছেটা কি ইনায়া বুঝতে পারছে না।

শান্তিনীড়ের সামনে রাত ঠিক সাড়ে বারোটার সময়ে তাদের গাড়ি পৌঁছাল। ইনায়া তাড়াহুড়োতে নাইট স্যুট পরেই রওনা দিয়েছে।‌

বৃষ্টি ততক্ষণে থেমেছে। ইনায়া গাড়ি থেকে নেমে প্রিতমকে বললো,“এসো! বসে আছো কেন। নামো!”

প্রিতম হাসলো, দু'পাশে মাথা নেড়ে বললো,“দাদান তোমাকে ডেকেছে,ভাই বোনেরা সময় কাটাবে বলে।”

_তো হয়েছেটা কি! তুমি শ্বশুর বাড়ির সামনে থেকে চলে যাবে?

প্রিতম হেসে বললো,“এখন ভেতরে গেলে সবাই আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরবে। তোমাদের ডিসটার্ব হবে। যাও সময় কাটাও। আমি কাল বিকেলে এসে নিয়ে যাবো।”

ইনায়া কিছুসময় প্রিতমের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ঘুরে দাঁড়ায়। প্রিতম আবারও ডেকে ওঠে,“ইনু।”

_হু‌।

_আ'ম স্যরি!

ইনায়া অবাক ভীষণ। বললো,“কেন?”

_আমার আসলেই তিনভাইবোনের এতো আদরের ছোট বোনটাকে এতো তাড়াতাড়ি কেড়ে নেওয়া উচিত হয়নি! তোমার চাইল্ডহুড নষ্ট করে দিলাম!

কথাটা বলেই প্রিতম ইনায়াকে একটা চমৎকার হাসি উপহার দিলো ।

ইহানই বাড়ির দরজা খুলে দাড়িয়ে ছিলো। ইনু ঢুকে দাদানকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ইহান ওকে চুপ করিয়ে দিয়ে বললো,“আমার পিছু পিছু আয়।”

দোতলার লিভিং রুমটাকে ছোটো খাটো একটা মুভি লাউঞ্জ বানিয়ে ফেলেছে ইহান। কার্পেটের ওপর কুশন বিছিয়ে দিলো। তিন মগ কফি বানিয়েছে নিজের হাতে। ইনশিরাহ মেঝেতে চুপচাপ, নির্লিপ্ত হয়ে বসে আছে। তার গায়ের ঢিলেঢালা কফি রঙের টি-শার্টটার বেহাল দশা, দীর্ঘসময় ধরে পরে আছে সে এটা।

ইনায়া এমন আয়োজন দেখে ভীষণ আপ্লুত, ভীষণ উচ্ছসিত হলো। ঝাঁপিয়ে বসে পরলো কুশনে। আহ্লাদী গলায় ইহানকে বললো,“তুমি এতো পাগল দাদান। আমি ভাবলাম কি না কি! ”

ইহান হাসলো। ডোরেমনের “নোবিতা অ্যান্ড দ্য আরাবিয়ান নাইটস” মুভি ছেড়ে দিলো। ছোটোবেলায় এভাবেই চার ভাইবোন সময় কাটাতো। ইনায়া বললো,“মেজো দাদান থাকলে কত মজা হতো।”

ইহান ম্লান হাসে এবার। ঘুরে ইশির দিকে তাকায়। জোর করে তার হাতে কফির মগ তুলে দিয়ে বলে,“খা!”

ইশি নিলো,তবে মাথা তুলে তাকাল না। মুভি শুরু হলো। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, তিনভাইবোন চুপচাপ দেখতে
লাগলো মনযোগ দিয়ে, কেমন সম্মোহিত হয়ে।

কিছুসময় পরে ইহান ইশির দিকে তাকিয়ে বলে,“বোকামির কথা বলতে গেলে, বোকামি আমাদের সবার হয়েছে রে ইশি। বড় হয়ে বোকামি করেছি। ঐ যে স্ক্রিণে ঐ জীবনটা কত জয়ফুল ছিলো তাইনারে!”

ইশি কেঁদে ফেললো হঠাৎ ফুঁপিয়ে। ইনায়া বোকাটা, বোকার মতোই দেখতে লাগলো দাদান আর আপুকে, সে তো কিছুই জানেনা আজ এই বাড়িতে কি ঘটে গিয়েছে।

ইহান বোনের দিকে এগিয়ে বসলো। ইশি বলে উঠলো,“দাদান আমি এতোটা বড় হতে চাইনি।”

_আমিও না।
ইহানও জবাব দেয়।

লিভিং রুম থেকে চাপা আওয়াজ ভেসে আসছে। বাচ্চারা কথা বলছে মনে হচ্ছে। এক এক করে বড়রা সবাই ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে উঁকি দিলো,সামিন বাদে। ভীষণ অবাক প্রত্যেকে। বাচ্চাগুলো অত রাতে কার্টুন দেখছে!

কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পরে তারা অবচেতন মনে দেখলো,ওখানে তিনজন বাচ্চাই বসে আছে। যাদের জীবনে কোন জটিলতা ছিলোনা। ছিলো শুধু বাবা মা,চাচা চাচী, ফুপি, একটা গোটা পরিবারের আদর আর আদর!

ইনশিরাহ নিশ্চুপ কাঁদছে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই শেষ কান্না,যেটা দাদানকে দেখাবে। আর কখনও কাঁদবে না সে। ইহান তাকিয়ে আছে বোনের দিকে মায়াভরা দৃষ্টিতে। কখনো যদি এরা বড় না হতো তাহলে কতই না ভালো হতো! ইহান মনে মনে ভাবছে!

চলমান........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 45 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন