#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৪৬
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
শুদ্ধর মাথার কাছে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে প্রেরণা। কি ভীষণ উৎকণ্ঠায় আজ গোটা একটা দিন কাটিয়েছে । প্রথম তিনদিন সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও আজ সকাল থেকে শুদ্ধ বারবার বলছিলো তার নাকি ব্যাথা হচ্ছে। অতঃপর ডাক্তারকে আনা হলো, খুব সাবধানে ড্রেসিং করিয়ে দিলো,দেখলো ক্ষতটা। বলে দিলো ভয়ের কিছুই নেই।
এখন বাচ্চাটা ঘুমাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে বন্ধুরা এসে তাকে দেখে গিয়েছে। সবার কাছ থেকে প্রচুর গিফট পাচ্ছে সে।
প্রেরণার একটু বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ নেই। মেহমান আসছে,যাচ্ছে।
ঘুরে একবার মলিন মুখটাকে আয়নায় দেখলো প্রেরণা। বুড়ি হতে শুরু করেছে প্রেরণা আহসান।
বলি রেখা দেখা দিচ্ছে মুখমন্ডলে, আগের লাবন্যতাটুকু হারিয়ে ফেলছে মনে হচ্ছে, যা মেজর সাহেব মুগ্ধ হয়ে দেখতো, এই মুগ্ধতা আর দেখতে পাবেনা প্রেরণা কারো চোখে, দেখতে চায়ও না সে।
আচ্ছা বেঁচে থাকলে মেজর সাহেবের বয়স এখন কত হতো? বিয়াল্লিশ হতো! চুল কি পাকতে শুরু করতো?
বেঁচে থাকলে এই বয়সেও প্রেরণাকে তার গভীর কালো চোখের নেশালো দৃষ্টিতে দেখতো? বৃষ্টি হলে হাত ধরে হিরহির করে টেনে বৃষ্টির মাঝে দাড় করিয়ে রাখতো? জোর করে মাঝরাতে ঘুম থেকে তুলে গল্প করতো?
ঐ দু'চোখে প্রেরণার জন্য মুগ্ধতা দেখে প্রেরণা আর আপ্লুত হয় না। প্রেরণা আবিষ্ট নিবিষ্ট হয় না আর কারো গভীর ভালোবাসায়, নরম আদরে। আর কখনো রাতে প্রেরণা কোনো প্রশ্বস্ত,বিশ্বস্ত বুকে আশ্রয় নেবেনা। তার পাখির মতো হালকা শরীরটা দু'হাতে আগলে ধরে কেউ তাকে নিজের উদোম বাহুতে লুকিয়ে রাখবে না। কেউ তাকে ব্যাকুল হয়ে আদর করে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে তাকে ডাকবে না,“আমার নীলিমা।”
হবে না,হবে না,হবে না। আর এসব হবে না। লোকটা ভীষণ স্বার্থপর, ভীষণ!
হঠাৎ করে বুকটা খাঁখাঁ করে ওঠে, কন্ঠনালীতে পীড়া হয়। চোখ ঝাপসা হয়ে এলে নিজেকে সামলে প্রেরণা উঠে দাঁড়ায়। তার ফোন বাজছিল তখন। সাব্বির ফোন করেছে।
প্রেরণা কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সাব্বির তাড়াহুড়ো লাগিয়ে বলতে শুরু করলো,“ম্যাম পেয়ে গিয়েছি দালান, পশ্চিম সরকারি কলেজ রোড। একেবারেই উপযুক্ত স্থান। তাইনা ম্যাম?”
______
নিজের রিক্লাইনার চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন সাগর ভুঁইয়া। বর্তমানে রাজনীতিতে সক্রিয় নন তিনি। পরপর দু'বার গো হারা হেরে পরবর্তীতে আর সাহস করেনি। এরপর বহুবার চেষ্টা করেছে সাহলকে রাজনীতিতে সরব করার, কিন্তু ছেলেটা কোন কম্মের নয়। সারাদিন বৌকে শপিং করিয়ে দেওয়াই তার জীবনের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড় ছেলের ওপর রীতিমতো বিরক্ত সাগর ভুঁইয়া, তবে সাঈমের ওপর নন। সাঈম সবসময় তার কথামত চলে। পিতৃআজ্ঞা পালনে যথেষ্ট তৎপর সাঈম।
ইদানিং একটা বিষয় নিয়ে সাগর ভুঁইয়া খানিকটা চিন্তিত। প্রেরণার সাথে চুক্তি শেষ করার সিদ্ধান্তটা কেবল দেখানো ছিলো। তিনি ভেবেছিলেন চাপ দিলে যদি প্রেরণা রাজি হয় প্রস্তাবে।
তবে তার মনে হয়না প্রেরণাকে তিনি ভাঙতে পেরেছেন, দিব্যি নিজের ব্যবসা গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত মহিলা। শুনেছে কেটরিং সার্ভিসের বিজনেস শুরু করতে চলেছে। ভাবলেই ভীষণ উদাস লাগে সাগরের। বেহুদা খাটনি করছে মহিলা। আসলেই, প্রেরণা একবার রাজি হয়ে গেলে রানী বানিয়েই রাখতো সে। ভদ্রমহিলা বুঝলো না সাগরের নেক নিয়ত!
একটা ছোটো খাটো দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাগর নিজের ব্যাবসার হিসেব দেখতে শুরু করে। তাদের প্রতিষ্ঠান ভুঁইয়া ট্রেডার্স। এখানেও তার প্রতিপক্ষ মির্জাদের মির্জা এন্টারপ্রাইজ। রীতিমতো গা জ্বালা করে সাগরের, রাজনীতি কিংবা পারিবারিক ব্যাবসা! সবকিছুতে এসে তাকে “গেজাতে” না পারলে যেন মির্জাদের ভাত হজম হয়না!
হিসেবের পাতায় দৃষ্টি নিবদ্ধ তার। মৃদু আওয়াজে মাথা তুলে তাকিয়ে দেখলো তার বাধ্য ছোট ছেলে তার ঘরে প্রবেশ করেছে।
একটা প্রশ্বস্ত হাসি দিয়ে সাগর ভুঁইয়া সাঈমকে বললেন,“এসো।”
সাঈম ম্লান হেসে ক্লান্ত ভঙ্গিতে হেঁটে বাবার মুখোমুখি একটা সোফাতে বসলো।
সাগর তার মনযোগী দৃষ্টি হিসেবে নিবদ্ধ রেখেই বলতে লাগলো,“ভেবেছি বিয়ে করবে। আমার অবশ্য আপত্তি ছিলো না, সামিনকে আজীবন ভোগাতে পারতাম!”
সাঈম চুপ করে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সাগর বলতে লাগলো,“অবশ্য বিয়ে অবধি না নিয়ে ভালোই করেছো! ঐ মেয়ের মাকে চেনোনা! ঐ মহিলার পেট থেকে যে মেয়ে জন্মেছে সে তোমাকে,আমাকে, আমাদের সবাইকে উল্টো ভোগাতো!”
_তুমি খুশি?
বরফ শীতল কন্ঠে সাঈম বললো।
সাগর তৎক্ষণাৎ ছেলের মুখের দিকে তাকায়। সাঈম বলতে থাকে,“যা করেছি,তাতে তুমি খুশি?”
কিছুক্ষণ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে সাগর ভুঁইয়া বললো,“অবশ্যই! তবে আমার মনে হচ্ছে তুমি খুশি নও! তোমার চেহারা তাই বলছে!”
থতমত খেয়ে একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে হাসলো সাঈম, তাচ্ছিল্য ভরা কন্ঠে বললো,“কাম অন পাপা! এসব কিছুই না!”
_______
স্বামীকে ফরমাল স্যুট পরতে দেখে আলো অবাক হলো। ব্যস্ত হয়ে বলল,“কোথায় যাবেন আপনি? কোথায় যাবেন? এই শরীরে কোথায় যাবেন?”
ঠোঁটে খানিকটা জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে সামিন বললো,“অফিসে বসা হয়না বহুদিন। তিনটা শিপমেন্টের ঝামেলা ইলহাম একা হাতে সামলায়। গিয়ে একটু মেইন অফিসে বসবো।”
_কিন্তু আপনাকে দেখে আমার ভালো লাগছে না। আপনি অযথা চাপ নিচ্ছেন। সুস্থ হতে পারলেন না এই দুদিন হলো।
স্ত্রীর অহেতুক দুশ্চিন্তা হালকা করে দেখে সামিন। আলোর এক গালে একটা হাত রেখে আরেক গালে চুমু খায়। নিচুগলায় বলে,“মেয়ে খেয়েছে?”
নিজেকে বন্দিদশা থেকে উদ্ধারের পণ নিয়েছে ইনশিরাহ। বিছানায় চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে শুয়ে বসে থেকেও ক্লান্ত হয়ে পরেছে। আজ ক'দিন ধরে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে সে। ডক্টরের নির্দেশিত ঘুমের ওষুধ খেয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না। পেঁচার মতো হয়ে গিয়েছে মুখটা। এমনিতেই শ্যামলা তার গাঁয়ের রং, তার ওপর চোখের নিচে ঐ কালির প্রলেপ। ভীষণ অসহায় এক নারী মনে হচ্ছে তার মুখটা দেখে।
খোলা চুলগুলো একটা ক্লাচারে আটকে নিয়ে আয়নায় নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে সে। গায়ে ছাই রঙা ঢোলা টি-শার্টটা টা পাল্টে নতুন একটা টি-শার্ট পরে সে ঘরের বাইরে পা রাখে।
প্রতি কদমে সংকোচ তার। কেমন অদ্ভুত লাগছে। আচ্ছা নিচে গেলে সবাই তার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে থাকবে? ইনশিরাহ মনে মনে প্রার্থনা করে,কেউ যেন ওর দিকে না তাকায়! কেউ না!
দোতলার বারান্দায় সামিন মুখোমুখি হলো মেয়ের, চোখ নামিয়ে নিলো সামিন। ইনশিরাহ পাপার দিকে তাকিয়ে আছে ফ্যালফ্যাল করে। দুজনের দূরত্ব কয়েক গজ, কিন্তু বাবা মেয়ের এক ঝড়ে জন্ম নেয়া মানসিক দূরত্ব কতটুকু তার হিসেব মেলাতে ব্যর্থ হলো আপাতত দু'জনেই।
ইনশিরাহ নির্নিমেষ দেখছিলো বাবার সারল্যে ভরা সুদর্শন,পবিত্র মুখটা। এক কোটি বছর ধরে সে পাপা ডাকে না,এক কোটি বছর ধরে সামিন তাকে আম্মা ডাকে না। এটাই মনে হচ্ছে তার। গলার কাছে পাপা ডাকটা এসে লুটোপুটি খাচ্ছে, তবুও ডাকতে পারছেনা ইনশিরাহ।
চোখ তুলে মেয়েকে আবারও দেখলো সামিন। ইনশিরাহ কিছুই বলছে না। শুধু তাকিয়ে আছে। পাপা তাকে দেখে ঘৃণায় চোখ নামিয়ে নেয়, বিষয়টা ইনশিরাহ বুঝে নিলো। সামিন চুপচাপ পাশ কাটিয়ে চলে যায়। ইনশিরাহ কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে সামিনের পিছু পিছু নিচে নামলো।
চার চারটা দিন পরে ব্রেকফাস্ট টেবিলে ইনশিরাহর উপস্থিতি খানিকটা স্বস্তি দিলো সবাইকে।
চুপচাপ খাচ্ছিলো সবাই। ইনশিরাহ প্লেটে আঁকিবুঁকি করছিলো। স্বভাব সুলভ সামিন মেয়ের প্লেটের দিকে একপলক তাকায়। তবে মুখে আর কিছু বলেন না,“খাচ্ছো না কেন আম্মা! আরেকটা ডিম খাও আম্মা।” এসব কিছুই বলেননা।
ইনশিরাহ একা একাই ম্লান হাসে। আলো চেহারায় গম্ভীরতা বজায় রেখেই মেয়ের প্লেটে ডিম তুলে দেয়।
বাকিরা সবাই টুকটাক কথা বলতে থাকে শান্তিনীড়ের ব্রেকফাস্ট টেবিলে আগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনবার নিমিত্তে।
ইনশিরাহর গলায় আটকে আটকে আসছে কথাগুলো। তবুও একটা গোটা জন্মের মানসিক শক্তি নিয়ে বাড়ির সবাইকে সাক্ষী রেখে আলোকে উদ্দেশ্য করে বললো,“মাম্মা।”
কথা থামালো সবাই। ইনশিরাহ এই চারদিনের ঝড়ে ভেসে যাওয়া নিজের মনকে শুনিয়ে, জীবনের তীব্র গ্লানি, মানসিক অবসাদ কন্ঠে মিশিয়ে ধীর স্থির হয়ে কয়েকটি বাক্য উচ্চারণ করলো, “ মাম্মা, পাপা। তোমাদের দুজনকে আমি একটা কথা জানাতে চাচ্ছি।”
একটু সময় নিলো ইনশিরাহ, পরপর বলতে লাগলো,“তোমরা যদি আমার বিয়ে দিতে চাও, আমার কোনো আপত্তি নেই। আমি তোমাদের পছন্দের যেকোন ছেলেকে বিয়ে করতে রাজি।”
ভীষণ ভীষণ ভীষণ অবাক সবাই, তাকিয়ে রয় ইনশিরাহর মুখপানে। সামিন শুধু মাথা নিচু করে কফির মগে চুমুক বসিয়েছে। না কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলো,না মেয়ের দিকে তাকাল।
ইহান শান্ত স্বরে বোনকে বললো,“কেউ তোর বিয়ের কথা ভাবছে না ইশি। চাপ নেওয়ার কিছু হয়নি। তুই নিজেকে সময় দে! অফিসে যা পাপার সাথে। গুছিয়ে নে নিজেকে! আমাদের কোন তাড়াহুড়ো নেই!”
ইনশিরাহ নিজের কফির মগটা হাতে তুলে নিয়ে নিচুগলায় বললো,“যখন ভাববে আমার এই সিদ্ধান্তটা সেদিনের জন্যই দাদান। আগেভাগে জানিয়ে দিলাম।”
আলো একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে মেয়ের মুখের দিকে।
রুগ্ন কন্ঠে বলে, ক্লান্ত পায়ে হেঁটে ইনশিরাহ দোতলায় চলে যায়।
পরী ইহানের দিকে তাকিয়ে বলে,“আমি ওর ফ্রেন্ডদের ডাকি বরং! বন্ধুদের সাথে সময় কাটালে একটু যদি বেরোতে পারে এসব থেকে!”
আলো হঠাৎ করে ইলহাম আর ইশমামকে উদ্দেশ্য করে বলে,“তোমরা একটু আমার কথা শুনবে? জরুরী কিছু কথা ছিলো তোমাদের দুজনের সাথে। খুব জরুরী।”
______
যারপরনাই অবাক ইহান। দু'চোখ ভরা বিস্ময় নিয়ে বড় মাকে বললো,“বিয়ে মানে! তুমি কি পাগল হয়েছো! এখন কেন বিয়ের কথা হচ্ছে! শি নিডস টাইম বড়মা! এবার তুমি বাড়াবাড়ি করছো!”
_ওটা তো আজীবন করে এসেছি। আর করতে থাকবও।
ঠান্ডা গলায় বলে আলো। নিজের ঘরে সামিনের ইস্ত্রি করা কাপড় গুলো কেবিনেটে তুলে রাখছিল সে। ইহান স্থির দাঁড়িয়ে। রাশভারী গলায় বলল,“মুঈন?”
_হ্যা মুঈন! কেন? আমার পছন্দ খারাপ? তোর বোনের ঐ অখাদ্য পছন্দের থেকে একশো গুণ ভালো,সেটা অন্তত স্বীকার কর। মুঈনকে তোর পছন্দ নয়?
_বড় মা, মুঈন ইজ আ জেন্টলম্যান! ভীষণ ভালো একজন মানুষ। সব দিক থেকে পারফেক্ট। ওকে বোনের জন্য অপছন্দ করার তো কিছু নেই। কিন্তু তুমি এভাবে হুট করে!
_হুট করে নয়,বহু আগে থেকেই তোর বড় বাবা আর আমি ওকে পছন্দ করে রেখেছি, তোর আদরের বোনকেও জানিয়েছি, সময় দিয়েছিলাম ভাবতে।
_কিন্তু বড় মা, এই অবস্থায়!
_কি অবস্থায়? বিধবা হয়েছে ও? চারমাস না গেলে বিয়ের কথা তোলা যাবেনা? তাছাড়া ওই তো বললো ও রাজি!
_বড় মা সেটা তো তোমাদের খুশি করতে বলেছে হয়তো। মন থেকে নয়!
_ওর মন থেকে বলারও দরকার নেই। যার নিজের জন্য একটা সঠিক মানুষ বাছার মুরোদ নেই, সে যেন মা বাবার চেয়েও আর বেশি না বোঝে। বলেই তো দিয়েছে ও রাজি, এবার ওকেও গিয়ে বল চুপচাপ মানসিক প্রস্তুতি নিতে।
মাম্মা পাপার ঘর পেরিয়ে নিজের ঘরে যেতে নিলে মাম্মার কথাগুলো সব শুনলো ইনশিরাহ। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেলো সে।
ইহান বলতে লাগলো,“আর মুঈন?”
_বিয়ের জন্য পাত্রী খোঁজার সম্মতি দিয়েছে তোর বড় বাবাকে, তিন কূলে কেউ নেই তো, তার সামিন বাবাকে সে অভিভাবকের মতো দেখে। এখনও ইনশিরাহর কথা জানাইনি। তোর পাপা আর ছোটো বাবা কথা বলবেন। ঘটক ধরার কিছু নেই। রাজি হলে হবে, না হলে নেই। জোর করে তো মেয়ে গলায় ঝোলাবো না । সে জেন্টলম্যান হয় হোক,আমার মেয়ে একটু ত্যাড়া, তবে ফেলনা নয়। রাজ্যের যায়গা থেকে প্রস্তাব আসতে শুরু করেছে। আর এন গ্রুপের মালিক নিজে তোর বড় বাবাকে কল করে তার ছেলের জন্য চেয়েছে ইনশিরাহকে। ওর সোস্যাল ওয়ার্ক দেখে চতুর্দিক থেকে হাত চাইছে ওর। আমরা বড়লোক খুঁজছি না, টাকা পয়সা তো আমাদের যথেষ্ট আছে, আমাদের মতো উচ্চবিত্ত,নামী পরিবার খুঁজছি না। আমরা খুঁজছি একটা উপযুক্ত ছেলে, যে আমার সন্তানকে মায়া দেবে শুধু। মুঈন সেরকম। তাই ওর প্রতি আমার এতো ঝোক।
সবকিছু কেমন কেমন লাগছে ইহানের কাছে। বড় মা একটু তাড়াহুড়ো করছে। এখন একে কিভাবে বোঝাবে ইহান! এভাবে হুট করে তো সব হয়না!
আলো ইহানের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো,“কি? তাড়াহুড়ো করছি মনে হচ্ছে? মোটেও না, ওর অবস্থা দেখেছিস?”
_সেজন্য বিয়ে? এটা কেমন কথা? ওকে একটু সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে.....
কথাটা মুখ থেকে ফেলতে পারলো না ইহান,আলো গর্জে উঠলো,“হ্যা তোর ছোট ভাইয়ের ট্রিটমেন্ট প্রয়োজন। তোর ছোট বোনের ট্রিটমেন্ট প্রয়োজন, এক কাজ কর, বাড়িটাকেই মেন্টাল অ্যাসাইলাম বানিয়ে দে! পাগলের বাচ্চা কতগুলো!”
কথাটা আলো রেগে চেঁচিয়ে বললেও, ইহান হেসে ফেললো। কিছুক্ষণ হেসে আলোর হাত দু'টো মুঠি করে ধরে নরম গলায় বলতে লাগলো,“বড় মা, আমরা তোমাদের বাচ্চা!”
তখন আলোও হেসে ফেললো। প্রসঙ্গ পাল্টে পুনরায় গম্ভীর হয়ে বলতে লাগলো,“মুঈন সম্মতি দিলে বিয়েটা হবেই ইহান। এখন থেকে তোর বড় মায়ের বাড়াবাড়ি শুরু হলো। এই বাড়াবাড়ি চলতে থাকবে যতক্ষন না আমার মেয়েটাকে সুখী দেখি আমি, ততক্ষণ পর্যন্ত। ওকে প্রস্তুতি নিতে বল, তোরাও প্রস্তুতি নে।”
_______
আজ একটা নিমন্ত্রণ রক্ষা করে রাত দশটা নাগাদ মুঈন ফিরলো কটেজে। এক পরিচিত বন্ধুর বাগদান অনুষ্ঠান ছিলো আজ।
কটেজের গেট দিয়ে বাইক নিয়ে ঢুকতেই রীতিমতো অবাক মুঈন। ইলহাম মির্জার গাড়ি তার ইয়ার্ডে পার্ক করে রাখা।
ভেতরে ঢুকতেই দেখলো ড্রয়িং রুমে বসে আছে ইলহাম মির্জা, এবং ইশমাম মির্জা। কটেজে মুঈনের কেয়ারটেকারের স্ত্রী সুরাইয়া খালা ছিলো।
মুঈন হাসি মুখে এগিয়ে যায়,সালাম দিয়ে করমর্দন করলো দুজনের সাথে।
ইলহাম হেসে বললো,“তোমাকে কল করে আসিনি। তাই দীর্ঘ এক ঘন্টা ধরে বসে আছি।”
_স্যরি আঙ্কেল একটা ইনভিটেশন ছিলো। এক্সট্রিমলি স্যরি!
_আরে এতে স্যরি বলার কি আছে? তুমি তো আমাদের নিমন্ত্রণ করোনি, আমরা যেচে এসেছি! দাঁড়িয়ে কেন,বসো!
মুঈন বসলো,বললো,“নিমন্ত্রণ কিন্তু বারবার করেই যাচ্ছি আঙ্কেল আপনাদের। আপনারা আসেন না।”
ইলহাম স্মিত হাসলো, নিচুগলায় বললো,
_বাড়ির অবস্থা তো বোঝোই।
মুঈন উঠে দাঁড়ায়, তাদের কে বসতে বলে ফ্রেশ হয়ে কেয়ারটেকারের স্ত্রীকে কফি বানানোর নির্দেশ দেয়। ইশমাম হেসে বললো,“উনি আমাদের কফি বানিয়ে দিয়েছেন। তবে তুমি চাইলে আরো দুকাপ খেতে পারি। কারণ তোমার সাথে দীর্ঘক্ষণ আড্ডা দেওয়ার প্রয়াশ নিয়ে এসেছি আজ।”
মুঈন তখন আন্তরিক হেসে,মাথা নেড়ে নিজেই চলে যায় কফি বানাতে।
ইলহাম বলতে লাগলো,“থানার এসপি আমাদের কফি বানিয়ে খাওয়াচ্ছে! ভীষণ অদ্ভুত লাগছে!”
_আপনারা থানার এসপিকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে রোজ রোজ ছেলের মতো ভালোবেসে খাওয়ান।
মুঈন হাসতে হাসতে বলল।
ইলহাম বলতে থাকে,“বিয়ে থা করিয়ে দিই বলো? বৌমার হাতের কফি খেয়ে যাবো তখন মাঝেমাঝে।”
কথাটা শুনে লাজুক হাসলো মুঈন, বললো,“আপনারা যা ভালো বোঝেন।”
কফি বানিয়ে নিয়ে বসলো তাদের সামনে। জিজ্ঞেস করলো,“সামিন বাবা এলো না কেন?”
_তোমার সামিন বাবা ভীষণ ব্যস্ত।
ইশমাম জবাব দেয়।
কফি খেতে খেতে টুকটাক আলাপ চারিতার মাঝে ইলহাম হঠাৎ করে বলে ওঠে,“এখানে আমরা তোমার সাথে আজ একটি বিষয়ে আলাপ করতে এসেছি মুঈন। ইনফরমাল ওয়েতেই বলি, তোমার কাছে একটা প্রস্তাব রাখতে চাচ্ছি মুঈন।”
মুঈন চোখ তুলে তাকায়। ইলহামের কথায় মুঈন বুঝলো,তারা আজ আড্ডা দিতে আসেননি। তবে কিসের জন্য! সে ভীষণ কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকায় ইশমাম, ইলহামের দিকে, বলে,“প্রস্তাব?”
_হ্যা প্রস্তাব। ভনিতা না করেই বলি, তুমি বিয়ের জন্য আগ্রহী, পাত্রী খুজছো। আমরাও একজন পাত্র খুঁজছি মুঈন। তোমার সামিন বাবার মেয়ে ইনশিরাহ, মানে আমার ভাস্তির জন্য তোমাকে আমাদের সবার পছন্দ মুঈন।
মুঈন কফির মগে চুমুক বসাচ্ছিল, কথাটা প্রথমে বুঝতে একটু সময় নেয়,পরে যখন বুঝতে পারলো, রীতিমতো বিষম খেলো মুঈন। কাশি উঠে গেলো তার।
ইলহাম ইশমাম বিব্রত, মুঈন নিজেকে সামলে নিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকায়। হতভম্ব হয়ে বলে,“জি আংকেল?”
_মানে ইনশিরাহর জন্য তোমাকে ভীষণ পছন্দ করেছে তোমার সামিন বাবা আর মিষ্টি আন্টি! তুমি যদি চাও,আমরা কথা এগোতে পারি।
মুঈন হঠাৎ ঘামছে খুব। ভীষণ অসম্ভব একটি কথা, যেটা তার কল্পনায় অন্তত কখনো সম্ভব ছিল না, সেটি শুনে খুব স্বাভাবিক থাকার কথা নয়। বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখে বিস্ময় খেলা করে তার। কেমন অস্বস্তি বোধ হয়।
ইলহাম সাথে সাথে বলে,“তুমি ভেবে চিন্তে জানাও। তোমার সায় না থাকলে আমরা তোমার জন্য অন্য মেয়ে দেখবো, ইনশিরাহর জন্য অন্য ছেলে। এতে এতো অপ্রস্তুত হবার কিছুই নেই। আসলে বোঝোই তো, বাবা মা হলে বাচ্চা কাচ্চাদের ব্যাপারে কতশত ভাবতে ইচ্ছে করে।”
মুঈন মাথা নিচু করে নেয়। হুট করে চোখের সামনে একটা ছোটো পুতুলের মতো মিষ্টি দেখতে একটা বাচ্চা পুতুলের মুখ ভেসে ওঠে, যাকে সে প্রথম দেখেছিলো এতিমখানার বারান্দায়। সামিন বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল,লাল ফ্রক পরে। তখন মুঈনের নয় বছর বয়স ছিলো। পুতুলটার বয়স ছিলো বছর দুই। তারপর বহুবছর পরে,বহুবার, বহুরূপে দেখেছে। একটা শ্যামবর্ণের পানপাতার মতো মুখ, লম্বা পাতলা লাস্যময়ী এক নারী,যে নিজের সৌন্দর্যকে কিছু অদ্ভুত, বেমানান পোশাকের আড়ালে ফিকে করে রাখে। তার সৌন্দর্য সম্পর্কে সেও হয়তো অবগত নয়, নয়তো এভাবে থাকতো না সে। সেই মেয়েটা,যে মুঈনকে অস্বস্তি দেয়, স্রেফ আর স্রেফ অস্বস্তি দেয়।
ইশমাম তাকে ডাকলো,“মুঈন!”
মুঈন নিজের খেয়ালে ফিরে তাকাল,বললো,“জি!”
_দেখো তুমি ভেবে আমাদের জানাও। তারপর আমরা কথাবার্তা এগোবো, তুমি আমাদের পরিবারের একজনের মতো, তাই আমরা নির্দ্বিধায় এসব তোমাকে বলছি, কোনো থার্ড পার্টি ঢুকাইনি দু পক্ষের মাঝে। তুমি জানিও,যদি তোমার মন সায় দেয় তবে তুমি আর ইনশিরাহ একে অপরের সাথে শুরুতে কথা বলবে। তারপর তোমরা সিদ্ধান্ত জানালে আমরা বিয়ের কথা এগোবো,নচেৎ নয়।
মুঈন কি বলবে,তার কি বলা উচিত বুঝতে পারছে না। শুধু টের পাচ্ছে তার ভেতরে ধুকপুক করছিল হৃদপিন্ডটা। ভীষণ বিরক্ত হচ্ছিল সে তাতে। শেকড়হীন, এতিম, পরিবার বিহীন একটা লোকের কাছে রাজবাড়ী থেকে পয়গাম নিয়ে এসেছে, রাজা তার রাজকন্যার হাত দিতে চাচ্ছে। কি সাংঘাতিক কথা!
ইলহাম এবার কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে বলল,“জানিও। আমরা উঠছি।”
গেট থেকে ইশমাম মির্জা আর ইলহাম মির্জাকে বিদায় জানিয়ে ওখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ। কটেজে ফিরে আয়নার সামনে গিয়ে অকারণে দেখলো নিজেকে। দেখতে পেলো একটা শেকড়হীন লোক, একটা সরকারি চাকরি বাদে যার কোন যোগ্যতা নেই, ভ্যালু নেই। এই চাকরিটা হবার আগ পর্যন্ত যে ছিল দুই পয়সার মানুষ। মেয়েরা ঘুরেও দেখতো না যাকে, তার কাছে রাজা রাজকন্যা দিতে চাইছে! কি অবাক কান্ড!
একটা সীমিত চাহিদার জীবন, একটা হিসেবী মানুষ, ছাপোষা মানুষ, আর অমন রাজকন্যা। এদের একসাথে যায়? ওজন বহন করা সম্ভব?
সে রাতে মুঈনের ঘুম এলো না। যে সংযমে নিজেকে বেঁধে রেখেছিল,আজ তার কাছে সম্পূর্ণ অনুমতি আছে সে সংযম ভাঙার।
সিলিংয়ের দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে সে রাতে শুধু ভাবছিল মুঈন। ঠোঁটের কোণে লেপ্টে ছিল লাজুক হাসি। এই অনুভূতিও মুঈনের জীবনে প্রথম। ভাবতে লাগলো মুঈন, একটা গোটা রাত ভাবলো।
এদের একসাথে যায়? সত্যিই যায়? প্রশ্রয় দেবে মুঈন অবেলার এই সুখ সুখ অস্বস্তিকে? দেবে প্রশ্রয় নিজের মনের সুপ্ত বাসনাকে? এক রাজার আদরের রাজকন্যার প্রতি অদম্য কৌতুহল, অবচেতন মনে রাজকন্যাকে জয় করার স্পৃহা, এই দুঃসাহস, ধৃষ্টতাকে প্রশ্রয় দেবে সে?
শেষ রাতের দিকে মুঈন ফরাজী তার জবাব পেলো।
______
“হোয়্যাট! তুই বিয়েতে মত দিয়েছিস মানে!”
হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে আছে মানহা,তুনা। ইনশিরাহ নির্লিপ্ত হয়ে বসে আছে দোলনাতে। ওদের প্রশ্নের জবাবে ক্ষীণস্বরে বললো,“মত দিয়েছি মানে, মত দিয়েছি!”
_কিন্তু কেন! আই মিন একটু নিজেকে সময় দিতি! কেউ তো তোকে জোর করছে না!
_নিজেকে সময় দেওয়ার কিছু নেই।
কেমন ক্লান্ত ভঙ্গিতে ইনশিরাহ বলছে কথাগুলো। মানহা বললো,“আরেঞ্জ ম্যারেজ! আর তুই? ওজন সইতে পারবি?”
_পারবো।
রোবটিক জবাব ইনশিরাহর।
তুনা ইনশিরাহর দুই বাহু ধরে ঝাকুনি দিয়ে বলে,“স্টুপিড! কেন এমন করছিস! দেখ আঙ্কেল আন্টি তো তোকে জোর করছে না। তবুও কেন!”
_সবার আমাকে নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তা! মেজো মা এসে আমার রুম চেক করে লুকিয়ে, আমি ড্রাগ নিতে পারি এটা ভাবছে হয়তো, এছাড়াও আরো বহু দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে মাম্মা পাপা ঘুমাতে পারেনা। রাত তিনটার সময়ও পুরো ঘরময় অসুস্থ পাপা পায়চারি করে নির্ঘুম। এমন দিশেহারা পাপাকে কখনও দেখিনি।
_সেজন্য তুই এমন করবি! কি করে অ্যাডজাস্ট করবি নিজেকে!
_সবাই যেভাবে করে।
মলিন মুখে তাকিয়ে আছে মানহা,তুনা। তুনা বললো,“ঐ লোকটাকে তুই চিনিস?”
_চিনে কি করবো? একজনকে তো ছয়বছর ধরে চিনলাম।
রুগ্ন কন্ঠে জবাব দিলো সে।
_ইনশিরাহ লোকটার সাথে তুই সারাজীবন কাটাবি। তুই আগে কথা বলে নিবি না? এটা কেমন কথা!
_নেবো, কথা বলে নেবো।
উদাস গলায় বললো ইনশিরাহ। মানহা বলতে লাগলো,
_তুই! তুই এতো তাড়াতাড়ি মত দিবি না ইনশিরাহ,লোকটার সাথে আগে পরিচয় বাড়া।
_পরিচয় বাড়িয়ে কি হবে? প্রেম হবে? মানে একটা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আমাকে একজন অচেনা লোকের প্রেমে পরতে বলছিস তোরা!
_তো তুই তো অচেনা লোককে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলি।
চুপ করে রইলো ইনশিরাহ। তুনা বলতে লাগলো,“জীবনটা ছেলেখেলা? মা বাবাকে দুশ্চিন্তা মুক্ত করতে বিয়ে করলি, তারপর যদি তুই সারাটা জীবন জ্বলতে থাকিস তখন? লোকটা কেমন না কেমন জানিস না। কি করবি তুই! অ্যাডজাস্ট কিভাবে করবি!
_বললাম তো। সবাই যেভাবে করে!
চলমান......