#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৪৭
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
মেয়েটার কথা ভীষণ মনে পরে ইশমামের। মনে পরে ঠিক দু'দিন আগেও যেন হাতে তুইলে খাইয়ে দিয়েছিল মেয়েটাকে। স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি তীব্র অনীহা ছিলো, সারাক্ষণ কান্নাকাটি করতো জাঙ্কফুডের জন্য। রেগে, ধ'ম'কে, বুঝিয়ে,মানিয়ে খাওয়াতে হতো। আজ সেই মেয়ে কি নিজে নিজেই ভাত খেয়ে নেয়? বহুদিন হয়েছে মেয়েটা স্বামীর ঘরে, সামনে বসিয়ে মেয়েটার খাওয়া দেখা হয়না।
কলিং বেল টিপে দাঁড়িয়ে আছে ইশমাম। তার হাতে কিছু প্যাকেট। বারবার চোখ নামিয়ে প্যাকেটগুলো দেখছে। অপেক্ষা করছে মেয়ের মুখটা দেখার।
দরজা খুলল প্রেরণা, বিস্ময়সূচক কন্ঠে সালাম দিলো। ভীষণ অবাক, ভীষণ খুশি সে। কুটুম এসেছে, ভাইয়ের শশুর এসেছে, কি করবে না করবে পুরো দিশেহারা অবস্থা হয়েছে প্রেরণার।
ইশমাম কুশল বিনিময় করে হাতের খাবার-দাবারের প্যাকেট গুলো প্রেরণার হাতে দিয়ে মেয়ের কথা জানতে চাইলো। প্রেরণা একটা রুম দেখিয়ে দিল ইশমামকে।
পাপাকে দেখে চোক্ষুজোড়া ছানাবড়া হয়ে গিয়েছে ইনায়ার। অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে অস্ফুটে বললো,“পাপা!”
ইশমাম ম্লান হাসলো মেয়েকে দেখে। ইনায়া তার স্টাডি টেবিলের চেয়ারটাতে বই হাতে নিয়ে বসেছিল। তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো। ইশমাম তখন দৃষ্টি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘরটাকে দেখছিলো। ভীষণ গোছালো একটা স্টাডিরুম। শান্তিনীড়ে ইনায়ার পড়ার ঘরটির মতন।
ইনায়া এগিয়ে এসে বাবাকে জরিয়ে ধরে ফ্যাচফ্যাচ শব্দে কেঁ'দে দিল। ইশমাম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে বলল,“তোমার পড়ার ঘর?”
_হু।
নাক টানলো ইনু।
_কে বানিয়ে দিয়েছে?
_প্রিতম।
পাপার দিকে তাকিয়ে বলল ইনায়া।
ইশমাম দেখল মেয়েটি প্রিতমের নাম উচ্চারণ করবার সময়টিতে তার চোখ দুটি চকচক করছে। বললো,“পড়াশোনা হয়?”
প্রিতমকে ঠেলতে ঠেলতে তার শশুরের কাছে নিয়ে যাচ্ছে প্রেরণা। প্রিতম বাচ্চাদের মতো ইনিয়ে বিনিয়ে বলছে,“আপু একদম পাত্তা দেয়না আমাকে। দেখলেই কপাল কুঁচকে ফেলেন। ওনাদের মাঝখানে ঢুকবো না আমি। পরে সালাম দেবো না হয়।”
_না তুই যাবি!
জোরপূর্বক প্রিতমকে ইনায়ার স্টাডি রুমে ঢুকিয়ে দিয়ে প্রেরণা চলে গেলো। প্রিতম ভীষণ নার্ভাস। শশুরের দিকে তাকিয়ে বোকা বোকা হাসলো। ইশমামের আবারও হঠাৎ ভীষণ রাগ উঠে গেলো প্রিতমকে দেখে। এতো নিজেকে বোঝাতে বোঝাতে এলো, তবুও তার মনটা বেঁকে বসলো। এই ছেলেকে তার মেয়ের পাশে কিছুতেই সহ্য হয়না কেন! সবচেয়ে বড় কথা এই ছেলে যতই ইনোসেন্ট ভাব ধরে থাকুক,ইশমামের কাছে প্রিতমকে ডেভিল লাগে। মিচকে শয়তান লাগে জামাইকে! দেখলেই মনে পরে যায় তার সরল মেয়েটাকে ফুঁসলিয়ে ফাসলিয়ে বিয়ে করেছে বদমাশটা!
প্রিতম মুসলিম পাড়ার গনি ময়রার দোকানের ফার্স্ট ক্লাস মিষ্টির চেয়েও মিষ্টি করে হেসে শশুরকে বললো,“আসসলামু আলাইকুম বাবা,ভালো আছেন? মা কেমন আছে? ওনাকে আনলেন না কেনো?”
মুখ দিয়ে মধু ঝরছে! এভাবেই তার হাবলি মেয়েটার মাথা খেয়েছে ইশমাম নিশ্চিত। রা'গে শরীর চিড়বিড় করছে। নিজেকে সামলে নিয়ে ঠান্ডা মাথায় ইশমাম এক এক করে প্রিতমের সব প্রশ্নের উত্তর দিলো। রিসিপশনের আগে পরী মেয়ের বাড়িতে আসবে না তাও বললো।
ইনুকে টেনে একপাশে দাড় করিয়ে প্রিতম ফিসফিসিয়ে জানতে চাইলো,“আমি বাজারে যাচ্ছি! বাবা কি খেতে ভালোবাসেন?”
_পাপা? পাপা আমার মতো সব কিছু খেতে ভালোবাসে।
_তবে সবকিছু নিয়ে আসি বাজার থেকে?
প্রিতম সত্যি সত্যি ওয়ালেট ফাঁকা করে শশুরের জন্য বাজার করেছে। সে মোটামুটি নিশ্চিত হিটলার শশুর খাবেন না, তবুও এনেছে। প্রেরণা হেল্পিং হ্যান্ড নিয়ে গুছিয়ে বসেছে কিচেনে। মোট এগারো টা আইটেম প্রস্তুত করে টেবিল সাজাল।
ক্ষোভ একপাশে রেখে ইশমাম সত্যি সত্যি জামাইয়ের বাজার করা খাবার খেল। খেতে খেতে জানাল তার এখানে আসার কারণ। সামিন পাঠিয়েছে তাকে, ইনশিরাহর বিয়ের কথাবার্তা চলেছে। এই অবস্থায় ইনুকে কটা দিন ইনশিরাহর কাছাকাছি থাকতে হবে। সব পাকা হয়ে গেলে ইনুর রিসিপশনের সময়ে ইনশিরাহর আংটিবদল হয়ে থাকবে।
ইনু অবাক হয়ে বললো,“আপুর বিয়ে? হুট করে? এভাবে! এভাবে হুট করে কিভাবে?”
ইশমাম খেতে খেতে মেয়ের দিকে তাকায়, শীতল কন্ঠে বলে,“আমার বড় আম্মা লক্ষি বাচ্চা, বড়দের সিদ্ধান্তই তার কাছে সবকিছু। হুট করে বিয়ে হচ্ছে না,ধীরে সুস্থেই হবে। হুট করে বিয়েটা তোমার হয়েছিল।”
ইনায়া চুপ হয়ে যায়। প্রিতম খাওয়া থামিয়ে শশুরের দিকে তাকায়। একমাত্র তার কারণে এই খোটা আজীবন ইনুকে শুনে যেতে হবে,তা সে জানে।
প্রনমিকে ধরে ধরে আনলো প্রেরণা, মেহমানের সাথে খেতে বসেছে সবাই। ইশমাম প্রনমিকে দেখেই মনখোলা একটা হাসি দিয়ে বললো,“কেমন আছো আম্মু তুমি!”
প্রেরণার এই ব্যাপারটি বেশ ভালো লাগে, ও বাড়ির মুরব্বিরা বরাবর প্রনমিকে মেন্টালি সাপোর্ট দিয়েছে। “আম্মু” ছাড়া অন্য কোন সম্বোধনে ডাকেনা প্রনমিকে।
প্রনমি ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটিয়ে ইশমামকে নিচুগলায় বলে,“আলহামদুলিল্লাহ আংকেল। আপনি কেমন আছেন?”
_ভালো। তুমি তোমার ভাবীর সাথে আমাদের বাড়িতে যাবে? ভালো লাগতো তোমার। যাবে তুমি?
অত্যন্ত আন্তরিকতা নিয়ে ইশমাম বলে প্রনমিকে, প্রনমি দিন দিন স্বাভাবিক হয়ে উঠছিল, শুধু ও বাড়ির কথা শুনলেই মুখটা পাংশুবর্ণের হয়ে যায়। ও বাড়ির সাথে একটা লোক জুড়ে আছে, একটা উগ্র লোক, প্রনমি যার কথা সহ্য করতে পারে না, গোটা মানুষটাকে প্রনমি সহ্য করতে পারেনা, ফালতু লোক, বেয়াদব, উন্মাদ, আর আতঙ্ক প্রনমির জীবনের, একটা গ্লানি।
সে দু'পাশে মাথা নেড়ে অস্ফুটে বললো,“না আংকেল। যাবো না।”
ইনায়ার একদম ইচ্ছে করছে না প্রিতমকে ছেড়ে যেতে। রোজ রাতে প্রিতমের বাহুডোরে আবদ্ধ হয়ে, উষ্ণতার চাদরে মুড়ে ঘুমিয়ে থাকার একটা সুখমিশ্রিত বাজে অভ্যেস হয়ে গিয়েছে মাত্র ক'দিনেই। মূলত সমস্যাটা এখানেই। লোকে শুনলে হাসবে, এই কথা সেই কথা বহু কথা ইনায়াকে শোনাবে। তবে ইনায়ার স্বীকার করতে আপত্তি নেই সে ভীষণ বরপাগল হচ্ছে।
যাওয়ার আগে ইশমাম মেয়ে জামাইয়ের থেকে বিদায় নেওয়ার সময় প্রিতমকে শান্তস্বরে বলল,“সময় সুযোগ হলে তোমার শাশুরি আর চাচা শশুরেরা তোমাকে ও বাড়িতে যাওয়ার অনুরোধ করেছে।”
ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে জামাইকে নিমন্ত্রণ করেছে ইশমাম। জামাই অপছন্দের হলেও সামাজিকতা করলেন। বাবারা করে এমন, বাবারা এক সময় না একসময় করতে বাধ্য হয়, মানতে বাধ্য হয়।
_______
নিচতলা থেকে হাসাহাসির মৃদু গুঞ্জন ভেসে আসছিল। বহুদিন পরে এমন হাসির ঝংকারে মুখরিত হচ্ছে শান্তিনীড়। কিন্তু কি কারণ?
ইনশিরাহ বুঝতে পারছিল না, সে সবার কাছ থেকে আলাদাই থাকে।গতকাল বিকেলে ইনায়া আসার পরেও সে নিজের ঘর থেকে বেরোয়নি। কুমিরের মতো শুয়ে আছে বিছানায়।
তবে এবার যে তাকে একটু নিচে যেতেই হবে, বিশেষ কাজ আছে তার।
নিচতলায় বাড়ির অনেকেই ছিলো, হাসছিল ইনায়ার হাতের রান্না খেয়ে। ইনশিরাহ ধীরপায়ে হেটে নিচে নামে। তাকে দেখতে লাগছে ভীষণ অসুস্থ, রোগা লাগছে আগের থেকেও। এমনিতেও ইনশিরাহ লম্বা পাতলা, ক'দিনের ধকলে আরো রুগ্ন লাগছে।
তার পরনে একটা খয়েরী টি-শার্ট,একটা ঢিলেঢালা সাদা পাজামা। চুলগুলো উস্কো খুস্কো। শ্যাম্পু করা হয়নি দুদিন হয়েছে।
ওকে দেখে সবাই হাসি থামিয়ে ওকেই দেখতে লাগলো। ইনশিরাহর বিয়ে হবে, মুঈন ফরাজী পাত্র। যত যাই হোক সবাই আনন্দিত, ভীষণ আনন্দিত। মেয়েটা সব ভুলে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে ভেবে।
সামিন আর ইলহাম অফিসে ছিলো তখন,পরী চেম্বারে।
ইনশিরাহ গিয়ে সরাসরি আলোর সামনে দাঁড়িয়ে শুরুতেই বললো,“কথা ছিলো মাম্মা।”
_বলো।
অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখে জবাব দেয় আলো।
_মুঈনের নাম্বার টা দাও।
দৃঢ় ভাবে বললো ইনশিরাহ।
আলো মেয়ের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকায়,“কেন? কি কথা তোমার? কথা তো আমরা বলছি!”
একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ইনশিরাহ বললো,“ভয় নেই, আমি বিয়ে ভাঙবো না। আমার ওনার সাথে কিছু কথা আছে!”
_কোনো কথা নেই তোমার।
তেজ নিয়ে বলে আলো।
_তুমি নাম্বারটা দেবে না?
_না।
ইনশিরাহ ঘুরে ইহানের কাছে গেলো,“দাদান মুঈনের নাম্বারটা দাও।”
ইহান বোনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মুচকি হেসে মুঈনের নাম্বারটা দিলো। ইনশিরাহ নাম্বারটা সেইভ করতেই আলো একটানে তার ফোনটা নিয়ে নেয়।
ইনশিরাহ অবাক হয়ে বলে,“এসব কি মাম্মা!”
_আগে বলো তুমি কি বলবে মুঈনকে!
_বললাম তো বিয়ে ভাঙবো না, আমার কথা আছে ওনার সাথে।
_কি কথা? আমাদের বলো আগে।
ইনশিরাহ কিছু না বলে মায়ের থেকে ফোন নিতে গেলে আলো ফোন দেয়না। রীতিমতো মা মেয়েতে হাতাহাতি লেগে যায়।
সবাই হতভম্ব হয়ে দেখছে ওদের।
আলোর এমন আচরণে ইশমাম বিরক্ত হয়ে বলল,“মেয়ের সাথে এমন আচরণ করছো কেন তুমি অদ্ভুত! ওরা দুজন দুজনের সাথে কথা বলবে না? মুঈনও ওর থেকে জানতে চায় ও রাজি কি না বিয়েতে। দুজন দুজনের মতামত নিজের কানে শোনা জরুরি। তুমি এমন অদ্ভুত আচরণ করছো কেন! মেয়ে হবু জামাইয়ের সাথে কি বলবে সেটা আমাদের শুনিয়ে বলবে?”
আলো চুপ করে থাকে। ইহান বলে,“বড় মা একটু বোঝো! ওভার হয়ে যাচ্ছে সবকিছু।”
ইনশিরাহ দাদানের কথার পিঠে বললো,“আমাকে কারো বুঝতে হবে না দাদান।”
কথাটা বলেই আলোর হাত থেকে নিজের ফোনটা নিয়ে ইনশিরাহ দোতলায় চলে যায়। ইহান ঘুরে আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,“একটু শান্ত,নরম হয়ে কথা বলা যায়না ওর সাথে? বড় বাবা ওর সাথে কথা বলে না, তুমি বলো তাও এভাবে বলো। দুদিন পরে যখন বাড়ি থেকে চলে যাবে তখন তো নাকের পানি চোখের পানি এক করবে।”
আলো ইহানের কথা গায়ে না মেখে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলে,“তুই যা। গিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে শুনবি মুঈনের সাথে ওর জরুরী কথাগুলো ঠিক কি। যদি শুনতে পাস বিয়ে ভাঙতে চাইছে তাহলে সাথে সাথে একটা ডাক দিবি আমাকে। এক সেকেন্ডও দেরী করবি না। আমি চপ্পল নিয়ে রেডি আছি!”
বড় মা'র কথা শুনে ফাঁকা ঢোক গিলে ফেলে ইনায়া, ইনায়া পরেছে বিপদে, সে এখন আপুর ঘরে আড়ি পাতবে?
রুমে ঢুকে ধুপধাপ আওয়াজ তুলে দরজাটা বন্ধ করে দিল ইনশিরাহ। মেজাজটা ভীষণ গরম করে দিয়েছে সামিন ইয়াসার মির্জার জাঁদরেল বৌ অদ্রিতা আলো।
কিছুসময় চুপ করে থেকে ইনশিরাহ ফোনের দিকে তাকায়, ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে নিজের মেজাজটাকে শান্ত করে সে । তারপর দীর্ঘসময় নির্লিপ্তের মতো দাঁড়িয়ে থেকে, রোবটের মতো মুঈনের নাম্বারটাতে কল লাগায়।
মুঈন তখন সিটি গার্লস স্কুলের বৃক্ষরোপণ সপ্তাহের প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়েছিলো। সচরাচর ডিউটি টাইমে মুঈন তার পার্সোনাল নাম্বারটা অফ রাখে, আজ ব্যতিক্রম।
স্ক্রিণে ইনশিরাহর নাম্বারটা দেখে মুঈনের চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল, ইনশিরাহর নাম্বারটা তার ফোনে সেইভ করা, আজ সকালেই সামিন ইয়াসার মির্জার থেকে অনুমতি নিয়েছে ইনশিরাহর সাথে কথা বলার, তারপর ইহানের থেকে নাম্বারটা নিয়েছে, বড়দের কাছে ইনশিরাহর নাম্বার চাইতে অস্বস্তি হচ্ছিল মুঈনের।
মুঈন চেয়েছিলো রাতে নিড়িবিলিতে কথা বলতে। এই দুপুরের সময়ে, অসময়ে ইনশিরাহর ফোনকল পেয়ে একটু অবাকই সে। সে ইনশিরাহর থেকে ফোনকল আশা করেনি।
বিশেষ অতিথি তখন বক্তৃতা দিচ্ছেন। মুঈন হুট করে অতিথি আসন থেকে উঠে সবাইকে “এক্সকিউজ মি” বলে চলে যায় বাইরে। তার আচরণে তাড়াহুড়ো ভাব, সে চাইছিল না ইনশিরাহর সাথে প্রথম ফোনকল টা মিস করতে। হবু বৌয়ের সাথে প্রথম আলাপচারিতার লোভে একজন পেশাদার পুলিশ অফিসার ছটফটে আচরণ করছে।
কলটা যখন রিসিভ হলো, দুপাশের দুজন ব্যক্তিই এক রাশ অস্বস্তি নিয়ে চুপ করে ছিলো। শুরুটা করলো ইনশিরাহ, সালাম দিলো। মুঈন সালামের জবাব দিলো।
ইনশিরাহ স্বাভাবিক গলায় বলল,“মুঈন?”
মুঈনের নাম ধরে ডাকলো, অতটুকু মেয়ে মুঈনের নাম ধরে ডাকলো! এ থানার এসপি মুঈন ফরাজীর নাম ধরে ডাকলো!
অমন ডাকে কি হলো যেন মুঈনের, নার্ভাসনেসে ঘামছিলো, তুতলে বললো,“হেই...হ্যালো...হ্যা...না মানে জি আমি মুঈন। কেমন আছো ইনশিরাহ।”
ইনশিরাহ থেমে থেমে ক্লান্ত স্বরে বললো,
_ভালো । আপনি কিভাবে বুঝলেন এটা আমি?
_তোমার নাম্বারটা সকালে সেইভ করেছিলাম, ইহানের থেকে নিয়ে।
_ওহ।
শুকনো গলায় বললো ইনশিরাহ। মুঈন কিভাবে কথা আগাবে বুঝতে পারছিল না, হুট করে বললো,“সামিন বাবা কেমন আছেন?”
মুঈন জানে সামিন বাবা কেমন আছে। তবুও জানতে চাওয়া। ইনশিরাহ নিচুগলায় বলতে লাগলো,“জি ভালো।”
_বাড়ির সবাই ভালো আছে?
_জি ভালো আছে।
রোবটিক জবাব ইনশিরাহর।
মুঈন কথা খুজে পাচ্ছেনা কেন? অথচ অনেক কথা ভেবে রেখেছিলো সে ইনশিরাহর সাথে প্রথম ফোনালাপে বলবে, অদ্ভুত তো! ভীষণ রাগ উঠছে মুঈনের। কথা গুলো খুজে পাচ্ছে না কেন? কোথায় লুকালো কথা গুলো!
নিরবতা ভেঙ্গে ইনশিরাহ ডাকলো,“মুঈন।”
আবারও সুমিষ্ট কন্ঠস্বরে তার নামটা উচ্চারিত হলো। মুঈন তো ওখানেই আটকে যাচ্ছে বারবার। এতো সুন্দর করে তার নাম কেউ ডেকেছে বলে মনে পরছে না।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুঈন সম্বিত ফিরে পেলো নিজের। গলা খাঁকারি দিলো। ইনশিরাহ বলতে লাগলো,“আপনার সাথে আমার কিছু কথা ছিলো মুঈন।”
_জি বলো। আমি ফ্রি আছি।
_এভাবে নয়। কথাগুলো আপনাকে সামনাসামনি বলতে চাই আমি। আই থিংক আমাদের মিট করা প্রয়োজন।
মুঈন কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। তারপর বলল,“ঠিক আছে আমি সামিন বাবার থেকে পারমিশন নিয়ে তোমাকে টাইম এবং মিটিং প্লেস জানিয়ে দেবো।”
ইনশিরাহ চুপ করে থেকে বলে,“জি!”
_আর কিছু বলবে?
হুট করে কথাটা বলে কপাল চাপড়াচ্ছে মুঈন। সে এটা কেন বলল? কোনো কান্ডজ্ঞান নেই তার। মেয়েটা হয়তো ভাবছে তার ফোন রাখার তাড়া। নার্ভাসনেসে গুছিয়ে কথা বলতে পারছিলো মুঈন। ইনশিরাহ বললো,“জি না, এটা বলতেই ফোন দিলাম। রাখছি।”
কলটা দুম করে কেটে দিলো, মুঈন কপাল কুঁ'চ'কে ফোন হাতে দাঁড়িয়ে। আরেকটু সময় কথা বলতে চেয়েছিল মুঈন, অথচ নিজেই কথা হারিয়ে বসে ছিলো। তাবড় তাবড় সাংবাদিকের সামনে ব্রিফিং দেওয়া মুঈন ফরাজী কথা হারিয়ে বসেছিল। ভীষণ অদ্ভুত লাগছে! এই অনুভূতিও মুঈনের জীবনে প্রথম।
ইনায়া দরজায় আড়ি পেতে দাঁড়িয়ে ছিল। ইনশিরাহ ঘর থেকে বেরোবে তাই রুমের দরজার সিটকিনি সরিয়ে দু'টো কপাট ধরে টান দিতেই ইনায়া হুমরি খেয়ে নিচে পারলো।
ভীষণ হতভম্ব ইনশিরাহ বললো,“তুই?”
ইনায়া মেঝেতে বসে মৃদু আর্তনাদ করছিল, ভীত কন্ঠে বললো,“আপু বড় মা পাঠিয়েছে। আমি কিচ্ছু করিনি। আমি কিচ্ছু করিনি!”
ইনশিরাহ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তার “বাড়াবাড়ি” খ্যাত মাম্মাকে কিছুই বলতে ইচ্ছে হলো না আর।
তখনই ইহান এলো নিচতলা থেকে। ইনশিরাহকে দেখে হাতের ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো,“ইরফান। তোর সাথে কথা বলতে চায়।”
ভাইয়ের কথা শুনে আবেগতাড়িত হয়ে ফোনটা নিয়ে নিলো ইনশিরাহ। আজ কতদিন পরে কথা হবে ভাইটার সাথে! ইনায়া ফোনের ওপর হুমরি খেয়ে পরলো সে আগে কথা বলবে ইরফানের সাথে তাই। ইনশিরাহ তাকে সুযোগ না দিয়ে ইহানের ফোনটা নিয়ে দৌড়ে আবারও নিজের ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো।
বোনের অসুস্থ, মলিন চেহারার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ইরফান। ইনশিরাহ মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করলো। ইরফান বলতে লাগলো,“ ঐ ব্যাটা এসপি মুঈন! তোকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে? কি জঘন্য পছন্দ ব্যাটার!”
ইনশিরাহ ম্লান হেসে ক্ষীণস্বরে বললো,“আসলেই জঘন্য পছন্দ!”
ইরফান তাকিয়ে আছে বোনের শুকনো মুখটার দিকে, কিছুসময় পর ইরফান কন্ঠস্বর পাল্টে গম্ভীর হয়ে ডাকল,“ইশি!”
_হু।
_তোকে কেউ জোর করছে?
_না তো, কে জোর করবে?
_এই এদিকে তাকা।
ইনশিরাহ স্ক্রিনে ইরফানের দিকে তাকায়। ইরফান বলে,“জোর করছে না তো তোকে?”
হেসে দু'পাশে মাথা ঝাঁকায় ইনশিরাহ। ইরফান বলতে থাকল,“তবে কেন? হুট করে এভাবে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেলি? এই এই, তুই কি ঐ মুঈনকে পছন্দ করতিস?”
গম্ভীরতা বাদ দিয়ে আবারও ফাজলামোর সুরে বললো ইরফান। ইনশিরাহ হেসে ফেললো। ইরফান বলতে লাগলো,
_বল তোর ঐ জাঁদরেল এসপির ওপর ক্রাশ ছিলো? হু বল, বল বল।
_থামবি তুই?
চেঁচিয়ে উঠল ইনশিরাহ।
ইরফান হাসছে। ইনশিরাহ এই প্রসঙ্গ পাল্টে বললো,“সবাই খুশি হচ্ছে। তুই খুশি হোসনি? বিয়ে করে নিচ্ছি আমি!”
_হয়েছি। তোর হবু বরের কথা চিন্তা করে ভীষণ খুশি হয়েছি। ঐ এসপিকে আমার পারসোনালি পছন্দ নয়। ব্যাটার ওপর ভীষণ রাগ ছিলো । কত ইনোসেন্ট আমিটাকে লকাপে মশার কামড় খেতে রেখেছিলো, তুই, তুই ইশি সব কিছুর প্রতিশোধ নিবি। ভাইয়ের হয়ে প্রতিশোধ নিবি ইশি।
_প্রতিশোধ নিতে বিয়ে করবো?
হেসে বলল ইনশিরাহ।
_হু।
_তুই যেমন প্রিতমের ওপর প্রতিশোধ নিতে প্রনমিকে বিয়ে করেছিলি?
ইরফান হাসি থামিয়ে হঠাৎ চুপ হয়ে যায়।
ইনশিরাহ হাসছে। ইরফান বলতে লাগলো,“এমনিতেও তোকে বিয়ে করে এসপির তামাম জীবন শেষ হয়ে যাবে। এটা ভেবে সেই তখন থেকে মনের মধ্যে একটা পৈশাচিক আনন্দ হচ্ছে।”
ইনশিরাহ নিশ্চুপ হয়ে যায়। মাথা নুইয়ে রাখে সে। দীর্ঘসময়ের নিরবতা ভেঙ্গে ইরফান বলতে থাকে,“বিয়ে কর! আমি অনেক খুশি হচ্ছি ইশি। মুঈন ভাইয়ার পাশে তোকে দারুণ মানাবে।”
হঠাৎ কি হলো, নিজেকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভে'ঙে ইনশিরাহ কেঁদে ফেলে হুহু করে। ইরফান হতবাক হয়ে বোনের দিকে তাকিয়ে বলে,“এই এই! কি হয়েছে? এই? এই ইশি তোকে জোর করছে তাইনারে বিয়েতে?”
কাঁদতে কাঁদতে দুপাশে মাথা নাড়ায় ইনশিরাহ। ইরফান বলে,“তুই দাদানকে ফোনটা দে। দে, এক্ষুনি দিবি।”
চলমান.....