#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৪৮
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
পরনে তার জাতীয় পোশাক ধূসর রঙের মলিন শাড়ি। চুলে লম্বা একটা বিনুনি। শাড়ির আঁচল ঘুরিয়ে ডান কাঁধে রাখা। একটা চামড়ার পার্সব্যাগ,আজ হাতে অতিরিক্ত হিসেবে একটা ছাতাও রয়েছে। বাইরে রোদের তাপ বেশ। স্কার্ফ দিয়ে মাথাটাকে পেঁচিয়ে একটা সানগ্লাস লাগিয়েছে চোখে।
ইহান চিনতে পারলো তার শাড়ি দেখেই। এই শাড়িগুলো কি শাড়ি ইহানের ধারণা নেই, তবে এর নাম হওয়া উচিত “প্রেরণা শাড়ি।”
ইহান অপেক্ষরত, বসে আছে অফিসে। মনিটরে দেখছে প্রেরণা তার ম্যানেজার সাব্বিরকে নিয়ে ক্রমশ এগোচ্ছে। একদৃষ্টে মনিটরে তাকিয়ে থেকে ঠোঁটে কয়েক সেকেন্ডের জন্য অস্পষ্ট হাসির রেখা দেখা দেয় তার।
ইহানকে সালাম দিতেই ইহান জবাব দিলো সালামের। বসতে বলল প্রেরণাকে,সাব্বিরকে।
প্রেরণা বসলো। ইহান যেন বুঝতে পারছে না প্রেরণার এখানে আসার কারণ, ঠিক এমন ভাবে বললো,“বলুন কি সাহায্য করতে পারি। তার আগে বলুন শুদ্ধ কেমন আছে?”
_পুরোপুরি সুস্থ।
প্রেরণা হাসিমুখেই বলল। তার পাশে বসে থাকা সাব্বির চোখ বড় বড় করে অবাক হয়ে ইহানকে দেখছে,ইহানের সাথে তার সবকথা হয়ে গিয়েছিল অথচ প্রেরণার সামনে কেমন ভান ধরছে ইহান তাজওয়ার কিছুই বুঝতে পারছে না। কেমন রহস্য রহস্য গন্ধ পাচ্ছে সাব্বির।
প্রেরণা কোনো রকম বাড়তি আলাপে না গিয়ে সরাসরি বললো,“আপনাদের গ্রাউন্ড ফ্লোর ভাড়া দেবেন, বিজ্ঞাপন দেখলাম। মির্জা এন্টারপ্রাইজের হেড অফিসের ম্যানেজারের সাথে যোগাযোগ করে জানলাম এটি মির্জা এন্টারপ্রাইজের কোন সম্পত্তি না, আপনার ব্যক্তিগত। আসলে আমি রেন্ট নিতে ইচ্ছুক। আপনার সাথে আলোচনায় বুনলে আমরা উকিল নিয়ে বসতাম।”
ভেতরের কামরায় দলের ছেলেগুলো রহস্য উদঘাটনে ব্যস্ত। হুট করে ইহান তাজওয়ার দলীয় অফিসের অর্ধেকটা ভাড়া দিয়ে দিতে চাচ্ছে,এতোটা আর্থিক টানাপোড়েন ইহান মির্জার এসেছে এটা ভেবেই ভীষণ অবাক সবাই। তাও কাকে ভাড়া দিচ্ছে? ঐ হুমকি ধামকি আপা, বাবুর্চি আপাকে! এই এরিয়ায় একটা বাঙালি রেস্তোরাঁর অভাব ঠিকই,তবে সেটা তাদের দলীয় অফিসের নিচতলায় হবে?
মানে ঐ বাবুর্চি আপা গ্রাউন্ড ফ্লোরে বেশ জমিয়ে শর্ষে ইলিশ রাঁধবে,আর এই থানার অপজিশন পার্টির সভাপতি ইহান তাজওয়ার সেকেন্ড ফ্লোরে তার দলীয় কাজ পরিচালনা করবে?
আলোচনার একপর্যায়ে নাহিদ দাঁত বের করে বাকিদের বললো,“একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। আপার রেস্তোরাঁর খাবার ফার্স্ট ক্লাস। খিদে পেলেই ছুটে যাবো।”
_হু । সে যাবি! ঐ রেস্তোরাঁতে আমাদের দলের ছেলেদের প্রবেশ নিষেধ, ভাই ঐ ঝামেলার পরে কি বলেছিল মনে নেই?
_আরে চিন্তা করিস না, খাবারের সুঘ্রাণে ভাই নিজেই টিকতে পারবে না। আমাদের আগে সে দৌড়াবে!
______
“ওয়েসক্যাফে,সকাল দশটা। টেবিল নাম্বার এল থ্রি,এল ফাইভ বুক করা আছে।”
মেসেজটা স্ক্রিণে জ্বলজ্বল করছিল। ইনশিরাহ আরও একবার দেখে উঠে,ছুটে ওয়াশরুমে গেলো। গতরাতে মুঈন মেসেজ পাঠিয়েছে। আজ বেলা অবধি ঘুমিয়েছে সে, ইতোমধ্যে নয়টা বেজে গিয়েছে। ইনশিরাহ চটজলদি ফ্রেশ হয়ে নেয়।
একটা সাদা টি-শার্টের ওপরে কটনের ব্লু অ্যান্ড ব্ল্যাক চেকের ক্যাজুয়াল শার্ট। শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে ইনশিরাহ নিজেকে আয়নায় দেখলো। ভীষণ জঘন্য হয়ে উঠেছে চেহারা। মরা মাছ নয়, মাছের কংকাল লাগছে তাকে।
চুলে উঁচু করে একটা পনিটেল করে মাথায় একটা ক্যাপ পরে নিয়ে পার্সটা এবং ফোনটা হাতে নিয়ে স্নিকারসে পা গলিয়ে দ্রুতপায়ে ধুপধাপ শব্দে সিঁড়ি ভাঙতে থাকে সে।
নিচতলায় তখন আলো,সামিন এবং ইনায়া ছিলো। সবাই ইনশিরাহকে দেখছে, তবে সামিন একপলক মেয়েকে দেখে চোখ নামিয়ে নেয়।
ইনশিরাহ স্বাভাবিক গলায়, সামিনকে শুনিয়ে আলোকে বলে,“আমি মুঈনের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি।”
আলো পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখলো মেয়ের। কপাল কুঁ'চ'কে ফেলে তৎক্ষণাৎ, কন্ঠে একরাশ বিরক্তি মিশিয়ে বলে,“যাচ্ছো ভালো কথা! এই পোশাকে যাবে?”
ইনশিরাহ বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলল,“তবে কি পরবো?”
_একটা সুন্দর দেখে সালোয়ার স্যুট পরবে। ওড়নাটা সুন্দর করে রাখবে।
_কেন ?
মেয়ের ত্যাড়া ত্যাড়া জবাবে রাগ উঠছে আলোর, তবে সে আর সামিনের সামনে মেয়ের সাথে ঝগড়া ঝাটি করতে চায়না। বললো,“হবু বরের সামনে যাচ্ছো তাই...”
আলো মুখ থেকে কথাটা বের করতে পারলো না ইনশিরাহ বলল,“কিন্তু মাম্মা এটা তো ভণ্ডামি!”
_ভণ্ডামি?
আলো অবাক হয়ে জানতে চায়।
_হ্যা। ভণ্ডামি। দেখো মাম্মা, আমি এমন। আমার জীবন ধারা এমন, চালচলন এমন, এভাবে বেঁচে এসেছি, আর ভবিষ্যতেও বাঁচব। আজ তার সামনে অন্য বেশে যাবো তার কাছে ভালো ইম্প্রেশন রাখতে, কিন্তু পরবর্তীতে তো আমি এভাবেই থাকবো !
আলো তাকিয়ে আছে মেয়ের দিকে। ইনশিরাহ বলতে থাকে,“কেউ যদি আমাকে পছন্দ করে,বেছে নেয়, তাকে আসল আমিটাকেই বেছে নিতে হবে মাম্মা,আমার সবকিছুকে রেসপেক্ট দিয়ে এই সম্পর্কে জড়াতে হবে,আমি নরম কোমল “মিউমিউ” টাইপ মেয়ে নই, আমি ইনশিরাহ। ইনশিরাহ কারো জন্য নিজেকে বদলাবে না মাম্মা! কোনো ভণ্ডামিও করতে পারবে না একদিনের জন্য।”
কোনো কথা বলছে না আলো। শুকনো মুখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ইনশিরাহ ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,“তুই যাবি? গেলে চল!”
ইনায়া তৈরিই ছিলো। তার আজ আপুর সাথে যাওয়ার কথা। সে দ্রুত মাথা ঝাকাল।
ইনশিরাহ ইনায়াকে নিয়ে চলে যাওয়ার পরে আলো মলিন মুখে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল তাদের প্রস্থানের দিকে চেয়ে। অদূরে সামিন বসে স্ত্রীর মলিন মুখটা লক্ষ্য করে কিছুক্ষণ। অতঃপর আস্তেধীরে বলে,“কেউ কারও জন্য বদলায় না আছিয়া।”
আলো ঘুরে স্বামীর দিকে চায়। সামিন বলতে থাকে,“কেউ কারও জন্য বদলায় না, কিন্তু কেউ কাউকে ভালোবাসলে তার জন্য অবশ্যই বদলায়। সেও বদলাবে। দুশ্চিন্তা করো না।”
আলো তাচ্ছিল্য করে বলে,“বদলাবে? আপনার মেয়ে? কি ঢ্যাটা দেখেছেন? আমার সব বদ গুণ পেয়েছে। একটা ভালো গুণ পায়নি। কি খামখেয়ালি দেখেছেন?”
_মুঈন বুঝে সাহস করলে এগোবে।
_কি জানি কি হয়। আমার কপালটাকে একটু ঠুকতে ইচ্ছে করছে দেয়ালে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলো বলে।
সামিন অসুস্থের মতন হাসলো স্ত্রীর কথায়। আলো বলল,“কথা বলেন না কেন মেয়ের সাথে? কি ঢং শুরু করেছেন আপনারা বাবা মেয়ে? কতদিন চলবে এসব?”
সামিন নিশ্চুপ, আবারও দৃষ্টি ঘুরিয়ে হাতের বিজনেস ম্যাগাজিনে রাখে।
আলো দীর্ঘক্ষণ স্বামীর মুখের দিকে চেয়ে থেকে আরও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে যায়।
_______
“অ্যাডভান্সের ত্রিশ লাখ টাকা এবং মাসিক ভাড়া চব্বিশ হাজার টাকা।”
স্থান,সুযোগ সুবিধা বিবেচনা করে প্রেরণা প্রস্তাবটা রাখলো। যদিও সে সন্দিহান ইহান মির্জা তার এই প্রস্তাবটাতে রাজি হবে কিনা। সে বললো,“আপনার কোন say থাকলে বলুন।”
ইহান তাকিয়ে আছে প্রেরণার মুখের দিকে, খুবই ধারালো ভদ্রমহিলার কথাবার্তা, হিসেবে একেবারে পাক্কা। সে কিছুটা সময় নিয়ে বললো,“রেস্তোরার জন্য আমার কোনো প্রবলেম নেই, তবে আমি চাচ্ছিলাম অন্য কোন প্রতিষ্ঠান যেমন কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার অথবা যুব উন্নয়ন সংস্থাকে ঘরটা ভাড়া দিতে।”
সাব্বিরের চোয়াল ঝুলে গেলো। কি অদ্ভুত! এই লোক তো নিজেই আগ বাড়িয়ে বলেছে তাদের ঘর ভাড়া দেওয়া হবে,সাব্বির চাইলে যেন তার ম্যামকে নিয়ে যোগাযোগ করে। এখন ম্যামের সামনে এতো টালাচ্ছে কেন বিষয়টিকে!
প্রেরণার মুখ শুকিয়ে গেলো, ইহানের কথা শুনে। তার মানে ইহান হয়তো রাজি হবেন না। সে শুকনো মুখে তাকিয়ে আছে। প্রেরণার অভিব্যক্তি লক্ষ্য করে ইহান তাজওয়ার মনে মনে এক দফা হেসে নিল,অথচ বাহিরে সে যথারীতি গম্ভীর।
কিছু সময় চুপ থেকে বলল,“কিন্তু আমার আপত্তি নেই আপনাকে ঘরটা ভাড়া দিতে।”
তৎক্ষণাৎ হাসি ফুটলো প্রেরণার মুখে। নীল দু'টো চোখ তুলে তাকাল ইহানের দিকে, চোখ দু'টো চিকচিক করছে স্বস্তিতে।
ইহান ভদ্রমহিলার স্বস্তিটুকুও অবচেতন মনে মুগ্ধ হয়ে দেখলো।
আলোচনা শেষে ঠিক হলো দু একদিনে উকিল নিয়ে বসবে তারা। পাঁচ বছরের চুক্তিতে যাবে । প্রেরণা আর ব্যবসায়িক আলাপ না বাড়িয়ে ইনশিরাহর বিয়ের ব্যাপারে টুকটাক কথা জানতে চায়, আন্তরিক হয়ে বাড়িতে ইনায়ার কান্ডকারখানা ইহানের কাছে বলতে বলতে বাচ্চাদের মতন হাসে। ইহান শুধু তাকে দেখেই যাচ্ছিল, প্রেরণাকে আজ ভীষণ মনখোলা লাগছে, একটা বড় দুশ্চিন্তা ঘাড় থেকে নেমে গেলে যেমন খুশি হওয়ার কথা,তাকে তেমন খুশি লাগছে। কথা বলার সময় ভদ্রমহিলাকে আজ গম্ভীর লাগছে না।
দীর্ঘ আলাপ শেষে প্রেরণা উঠে দাঁড়ায়, ইহানের থেকে বিদায় নিয়ে টেবিলের ওপর থেকে তার পার্স এবং সানগ্লাসটা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই,ইহান দেখতে পেলো প্রেরণা বেখেয়ালে নিজের ফোনটা রেখে যাচ্ছে।
গম্ভীর,হাস্কি স্বর কালক্ষেপণ না করে ডেকে উঠল,“নীলিমা আপনার ফোন!”
থমকালো প্রেরণা। থ'ম'কে দাঁড়িয়ে গেল। চকিতে ফিরে তাকালো। ইহান তার দিকে তাকিয়ে আছে। আবারও বললো,“আপনার ফোন।”
কয়েক মুহূর্ত প্রেরণা চেয়ে থেকে অস্ফুটে ইহানকে বললো,“কি ডাকলেন আপনি?”
ইহান বললো,“কি ডেকেছি?”
_এই মাত্র নীলিমা ডাকলেন আমাকে!
ইহান ভ্যাবচ্যাকা খেয়ে যায় পুরো। হুট করে খেয়ালে চলে আসে সবকিছু। পা মাথা অস্বস্তি নিয়ে হাশফাশ করছে। প্রেরণা অদ্ভুত দৃষ্টিতে দেখছে তাকে। ইহান নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,“স্যরি ,অ্যাকচ্যুলি আমাদের দলে নীলিমা নামের একজন নারীকর্মী আছে, ওনার নামটা ভুল করে ডেকে ফেলেছি আপনাকে। আ'ম স্যরি। আপনার ফোন।”
প্রেরণা ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে ফোনটা হাতে তুলে নেয়। তারপর বেড়িয়ে যায় অফিস থেকে।
ইহান তখন একটা লম্বা শ্বাস ফেললো। নিজের কাণ্ডে নিজেই বেশ অবাক সে! এতোটা গোলমেলে কেনো হয়েছে তার মন! ভারী অদ্ভুত! ভীষণ লজ্জায় পরে যাচ্ছিল আজ।
কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে একা একাই হাসে সে, অস্ফুটে তিনবার আওড়ায়,“নীলিমা ,নীলিমা, নীলিমা।”
______
“যে একটা টি-শার্ট নিজের পছন্দের না হলে পরে না সে বাবা মায়ের পছন্দে ডিরেক্ট বিয়ে করে নিচ্ছে? আমি সত্যিই ভীষণ অবাক হচ্ছি ইনশিরাহ।”
রেস্তোরাঁয় আজ ইনশিরাহর পাঁচ বান্ধবী এসেছে, মুঈনকে জানিয়েছে ইনশিরাহ, তার বন্ধুরাও আসবে। মুঈন সেজন্যই বোধ হয় দু'টো টেবিল বুক করে রেখেছে। ইনায়া আপু আর আপুর বান্ধবীদের মাঝখানে চুপচাপ বসে আছে। তার বিরক্ত লাগছে এদের কথা বার্তা।
ইনশিরাহ ওয়াসিফার কথার জবাবে কিছু বললো না। মানহা আবারও বললো,“বারবার বলছি ভেবে দেখ আরও। লোকটা কী ভীষণ রাগী, ভীষণ জেদি মনোভাব লোকটার, মেল ইগোতে ভরপুর। আমার তো এটাই মনে হয় শুধু ।”
মানহার কথার বিরোধীতা করে তিথি বলে,“তোদের ঐ লোকটার সাথে ফার্স্ট মিটিং যখন হয়েছে তখন তোরা অভিযুক্ত ছিলি, উনি ছিলেন পুলিশ অফিসার, এবং তোরা বেয়াদবিও করেছিলি। ঐ লোকটা নিশ্চয়ই তোদের থানায় না নিয়ে ছেড়ে দেবেন না। এতে জেদের কি দেখলি? মেল ইগো কোথায় দেখলি?”
তিথি হচ্ছে ওদের গ্রুপের সবথেকে বুঝদার মেয়েটা। ছমাস আগে বিয়ে হয়েছে পারিবারিক ভাবে। একটু থেমে বলতে লাগলো,“আর তোদের অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে এতো প্রবলেম কি আমি বুঝিনা। আরেঞ্জ ম্যারেজ ইজ নট স্ক্যারি। এটা সুন্দর। ভীষণ সুন্দর।”
তুনা বললো,“হু। ভাগ্য করে হয়তো এমন কাউকে পেয়েছিস। কিন্তু সবাই পায়না। আর আমরা ইশিকে বলছি বুঝে শুনে নিতে। দোষ করছি না কোনো!”
ওয়াসিফা বলতে লাগলো,“আরেঞ্জ ম্যারেজে এই পুরুষ লোকগুলো এক একটা স্বৈরাচারী হয়ে যায় পুরো। মানে ওদের দিলের মধ্যে কনসিডারেশন বলে কোন ওয়ার্ড থাকে না।”
মানহা বলে,“ভাই একটা লোক তোকে পয়সা দিয়ে,খাইয়ে পরিয়ে পালবে আর তোর ওপর মাতব্বরি করবে না? বুঝিস না?”
_স্বামী মাতব্বরি করলে অসুবিধা কি? বিয়ের পরে একটা মেয়ের অভিভাবক স্বামী। এটুকু বুঝতে হবে। মাতব্বরি করবে,ভালো বাসবে। সব মিলিয়ে স্বামী।
তিথি ওদের সাথে বিতর্ক শুরু করে।
তাজরি বলে ওঠে,“তুই কত লক্ষিরে তিথি। একেবারে এই বাদামী পুরুষদের মন মতন। তবে জানিস তো,আমরা এতো ভালো নই। নিজেদের নিঃশ্বাস নেওয়ার নাকটা যেহেতু আলাদা, তেমনি জীবনটাও আমাদের। অন্য কারো মাতব্বরি কেন হজম করবো? করবো না। আর সেজন্যই বলছি,আরেঞ্জ ম্যারেজে পুরুষরা হলো লাইক মাতব্বর। ওদের কাছে ওদের স্বামীত্ব,প্রভুত্ব ইম্পরট্যান্ট। আর প্লিজ এতো জ্ঞান দিস না। সব মেয়ে তোর মতো লক্ষি হলে কেমনে চলবে? কি হয় এই বিয়েতে? চেনা জানার আগেই বাসর রাতে অচেনা এক লোক স্বামী অধিকারের নামে চিৎ করবে আর....”
ভীষণ অশ্লীল কিছু কথা বলে দিলো তাজরি, ইনায়া তৎক্ষণাৎ কান চেপে ধরল। এসব ব্যাপারে সে জীবনেও ভেবে দেখেনি। সত্যিই তো, প্রিতমকে সে ভালোবেসেছে বলে প্রিতমের ছোঁয়া তার একটুও খারাপ লাগেনি প্রথম রাতে। যদি প্রিতমের যায়গায় অন্য পুরুষ হতো যাকে সে চেনে না তবে? গা কাঁটা দিয়ে উঠলো ইনায়ার।
তবে আপুর বান্ধবীগুলো ভীষণ ডার্টি কথা বলে। ইনায়ার গাঁয়ের পশম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।
ইনশিরাহ ওদের কথা শুনছিলো না, সে চুপ করে বসে আছে। হঠাৎ তার ফোনে একটা মেসেজ আসে। মুঈন পাঠিয়েছে।
“স্যরি ইনশিরাহ। দশমিনিট লেট হবে। ডিউটিতে আটকে গিয়েছি। প্লিজ ওয়েট।”
ইনশিরাহ চুপচাপ,“ওকে।” লিখে পাঠিয়ে দেয়।
তুনা বললো,“কি আসছে না কেন? প্রথম দিনেই তোকে দিয়ে অপেক্ষা করালো?”
_উনি ডিউটিতে। একটু সময় লাগবে।
নিচুস্বরে জবাব দেয় ইনশিরাহ।
মানহা বলে,“আচ্ছা ওনার এক্সাক্ট বয়স কত রে?”
_একত্রিশ রানিং।
ওয়াসিফা সাথে সাথে বিজ্ঞের মতো মাথা ঝাঁকিয়ে বলতে থাকে,“হুম। বেশ বড়। সাত বছরের এইজ গ্যাপ! এই লোক নিশ্চিত ডমিনেটিং হবে!”
তিথি চেঁচিয়ে উঠল ওদের ওপর,“এই তোরা ওকে ডিসকারেজড কেন করছিস! তোদের সমস্যা কোথায়! ইহান ভাইয়াও তো একত্রিশ বছর বয়সী। পারলে তাকে বুড়ো বলে দেখা!”
ওয়াসিফা বললো,“আরে না না। উনি বুড়ো নন।”
ইনশিরাহ ভীষণ বিরক্ত হয় এসব তর্ক বিতর্কে। মুখে চ বর্গীয় শব্দ করে বলে,“থামবি তোরা? আমার মাথা ব্যাথা করছে। প্লিজ থাম! আমার সাথে যেটা হবে আমি বুঝে নেবো। থাম প্লিজ।”
মুঈন কিছুসময় পরেই রেস্তোরাঁয় ঢোকে। তার গায়ে নেই ইউনিফর্ম। একটা ব্লু জিন্স প্যান্ট, ব্ল্যাক শার্ট, মেদহীন ব'লিষ্ঠ শরীরে আঁটসাঁট হয়ে মানিয়েছে বেশ, শার্টটা হাফ টাকড ইন করে পরেছে। হাতা ফোল্ড করে নিয়েছে।লম্বা কদমে চলনে পুরুষালি আভিজাত্য নিয়ে এগিয়ে আসছে, চওড়া কপাল, খাঁড়া নাকের ভীষণ আকর্ষণীয় লোকটাকে দেখে ইনশিরাহর বান্ধবীদের হুট করে একটা কথাই মাথায় এলো,“শ্যামলা পুরুষদের জন্য পারফেক্ট কালার ব্ল্যাক।”
চোখ থেকে সানগ্লাসটা নামিয়ে, গম্ভীর চেহারায় ওদের সবার দিকে একপলক তাকিয়ে এগিয়ে আসছে।
ইনশিরাহর বান্ধবীগুলো হা করে দেখছিল মুঈনকে। ইউনিফর্মে লোকটাকে জাঁদরেল লাগে, তারা তিতকুটে,ত্যাড়া, জাঁদরেল হিসেবেই জানে মুঈনকে, এখন এই বেশে মুঈনকে আলাদা লাগছে, ভীষণ আলাদা লাগছে।
ইনশিরাহ মাথা তুলে তখনও দেখেনি। সে বসেছিল উল্টো ফিরে। মুঈন তাদের খুব কাছে যাওয়ার আগেই মানহা বিড়বিড় করে বলে,“বান্দা ড্যাশিং আছে ইশি।”
ইনশিরাহ মাথা তুলে তাকায়। উঠে দাঁড়িয়ে ঘুরে তাকায়। তার চোখে মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। শুধু নির্লিপ্তের মতন দাঁড়িয়ে।
মুঈন এসে থামলো সেখানে। চেহারা থেকে গাম্ভীর্য সরিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে,“হ্যালো।”
ওরা সবাই এক টেবিলে বসেছে। মুঈন আর ইনশিরাহ আরেক টেবিলে। খাবারের অর্ডার দেওয়া হয়েছে।
ইনশিরাহর বান্ধবীগুলো ঘুরে ফিরে বারবার ইনশিরাহ আর মুঈনকেই দেখছিলো। ইনায়া লটকানো মুখ নিয়ে বসে। তিথি ইনায়াকে বললো,“আচ্ছা ইহান ভাইয়ার বিয়ে করাবে না তোমরা? সবাই বিয়ে করে নিচ্ছো।”
ওয়াসিফা হাসতে হাসতে বলল,“পাত্রী হিসেবে আমাকে দেখতে পারো ইনু। আমার অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে এলার্জি আছে। তবে ইহান তাজওয়ারের সাথে অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে আপত্তি নেই। হাসতে হাসতে তার মাতব্বরি মেনে নেবো।”
ইনায়া মনে মনে ভেংচি কেটে বলে,“ইশশ শখ কত! যাও না,মেজো মা একেবারে বরণডালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে! বরণডালায় আছে জু'তো।”
তুনা বলে,“তোমার দাদানের একটা গার্লফ্রেন্ড ছিলো না? তোশা ।তার সে বন্ধুটির সাথে বিয়ে হয়ে গিয়েছে। গতকাল ইনস্টাগ্রামে দেখলাম।”
মানহা বলল,“মানে?”
_আরে ইহান তাজওয়ার,তোশা, এবং ওনাদের আরো একটা ফ্রেন্ড ছিলো নাম রিশাদ। মিলিটারি কলেজ থেকে একসাথে বেরিয়েছে তিনজন। তিনজন কমন ফ্রেন্ড। ইহান তাজওয়ার মিশন থেকে আহত হয়ে ফিরে খুব ডিপ্রেসড ছিলো, হঠাৎ একদিন তোশা আর ওনার অন্য ফ্রেন্ডের সেক্স চ্যাট ইহান তাজওয়ার দেখতে পায়। খুব ভয়ংকর ভাবে বিচ্ছেদ ঘটায় ইহান ভাইয়া,রিশাদকে মেরেছিল ভীষণ। তোশা মেয়েটা একটা বিচ! নয়তো অমন সুদর্শন, শুদ্ধ পুরুষকে কেউ চিট করে! কি বোকার বোকা!
ইনায়ার এতো কথা শুনতে ইচ্ছে করছে না। মেয়েগুলো অতিরিক্ত নাক উঁচু আর বাঁচাল টাইপের। সে বারবার হাই তুলছে।
মুঈন কিছু মুহূর্তে ইনশিরাহকে দেখে নেয়। খানিকটা রোগা, এবং অসুস্থ লাগছে ইনশিরাহকে। মুখটা মলিন, তবুও স্নিগ্ধতা লেপ্টে আছে। নম্রস্বরে সে ইনশিরাহকে বললো,“আর ইউ ওকে?”
ইনশিরাহ মাথা নাড়িয়ে বলে,“জি।”
খাবার এসে যায়। খেতে খেতে মুঈন ইনশিরাহকে বললো,“বলো। কি কথা বলতে চাও,বা জানতে।”
_আমার কিছু জানার নেই। আমি বলতে চাই।
শুকনো গলায় ইনশিরাহ বললো।
মুঈন বললো,“বলো।”
কোনো রকম ভণিতা নয়, ইনশিরাহ সরাসরি বলতে লাগলো,“আই হ্যাভ আ পাস্ট মুঈন,আমার রিসেন্টলি বিচ্ছেদ হয়েছে। ছয়বছরের চেনাজানা। এরপরই বিয়েতে মত দেই আমি। আমি চাই বিয়ের আগেই এসব বিষয় আপনাকে জানিয়ে নিতে।”
এটুকু বলে ইনশিরাহ থামলো, মুঈন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ইনশিরাহর দিকে। ইনশিরাহ কিছুটা গম্ভীরতা নিয়ে বলতে থাকলো,“এই মহাদেশ খুব এগিয়েছে, কিন্তু গত একদশক ধরে যে ব্যাপারটা আমার কাছে বিরক্ত লাগে সেটা হলো পুরুষদের চাহিদা, চিন্তা,চেতনা। পুরুষ সবসময় একটা নারীর প্রথম প্রেম হতে চায়। এটা এই মহাদেশের বাদামী পুরুষদের “clumsy vanity”! ভাবেন পাস্ট থাকলেই একটা মেয়ের চরিত্র বিচ্যুতি ঘটেছে। এবং ম্যারেইড লাইফে, বিশেষ করে অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে স্বামী স্ত্রীর পাস্টলাইফ নিয়ে ঝামেলা টা ভীষণ ট্রমাটিক। আমি চাইনা এটা আপনাকে লুকিয়ে যেতে,চাইনা বিষয়টি নিয়ে আপনি আমাকে পরবর্তী জীবনে খোটা দিন, আজ পরিষ্কার ভাবে জানাতেই এলাম আপনাকে, ইয়েস আই হ্যাভ আ পাস্ট মুঈন। এবং আপনি আমার জীবনে প্রথম পুরুষ হবেন না। এই তথ্যটি অত্যন্ত সম্মানের সাথে মেনে নিয়ে আমাকে আপনার জীবনের সাথে জড়াতে হবে।”
মুঈন চুপচাপ দেখছিলো ইনশিরাহকে। ইনশিরাহও সরাসরি তাকিয়ে আছে মুঈনের চোখের দিকে। এই মেয়েটির দৃষ্টিতে কোনো নমনীয়তা নেই,নেই চলনে বলনে,নেই কথায়।
ইনশিরাহ বলতে থাকলো,“স্বাভাবিক ভাবে মা বাবা নিশ্চয়ই মেয়ের হবু বরের সাথে মেয়ের পাস্ট নিয়ে আলোচনা করবে না কারণ তাদের মধ্যে একটা ইনসিকিউরিটি থাকে। তাই হয়তো আপনাকে আমার চাচারা,পাপা,দাদান কিছু বলেনি। কিন্তু এসব আমার বলাটা কর্তব্য।”
মুঈন এবার ম্লান হাসলো, গম্ভীর গলায় বলল,“ তারপর?”
_তারপর কি? এখন আপনি ভেবে দেখুন আপনি কি করবেন।
_এটা কার পাস্ট?
ইনশিরাহ অবাক হয়ে বলে,“আমার পাস্ট!”
_Does it bother you?
মুঈন স্পষ্ট জানতে চায়।
ইনশিরাহ বললো,“ Absolutely not! ”
_তাহলে এটা আমাকে কি করবে? তোমার পাস্ট নিয়ে প্রবলেম থাকার কথা তোমার। আমার নয়। আর এই মহাদেশের পুরুষদের নিয়ে একটা ভুল কনসেপশনে ভুগছো তুমি ইনশিরাহ। এই যুগে পাস্ট ছাড়া কোন মেয়ে পাওয়া যাবে না, কোনো পুরুষ পাওয়া যাবে না। পুরুষরা চায় একজন লয়াল পার্টনার। যে তার সাথে ফিউচার সুন্দর করবে। ব্যস এটুকুই চায় পুরুষ। পুরুষের “clumsy vanity” কোনো মেয়ের জীবনে প্রথম পুরুষ হওয়া এই কথাটি কতটুকু সত্যি জানিনা,তবে আমার ক্ষেত্রে,আমার পুরো মাথা ব্যথা হবে আমার স্ত্রী এবং তার সাথে আমার সম্পর্ক নিয়ে।
ইনশিরাহ চুপ করে থাকে। মুঈন বিনয়ী সুরে বলে,“খাও।”
খেতে খেতে আবারও মুঈন ইনশিরাহকে বললো,“আর এসব কথা সামিন বাবা নিজেই আমাকে শুরুতে বলেছে। সে তোমার পাস্ট নিয়ে ইনসিকিউরড নয়। তোমার পাপাকে হয়তো তুমি চিনতে পারোনি ইনশিরাহ। সে তার মেয়েকে নিয়ে মন ছোট করে নেই। আমি তোমার পাস্টের ব্যাপারে আগেই জেনেছি তার কাছে।”
ইনশিরাহ ভীষণ অবাক। বললো,“পাপা বলেছে?”
_হু।
হতভম্ব ভাব কাটছে না ইনশিরাহর। মুঈন হাসলো।
দু'জন দীর্ঘ সময় ধরে চুপ থাকল, খাওয়া শেষ করে মুঈন বিল পে করতে গেলে ইনশিরাহ বললো,“আমি আপনাকে ডেকেছি। বিলটা আমি দিতে চাচ্ছি।”
মুঈন হেসে বললো,“একজন পুরুষ কোন নারীর হয়ে রেস্তোরাঁর বিল পে করলে একজন নারীর আত্মমর্যাদা কমে যায়,এটাও এই মহাদেশের, মানে তোমাদের বাদামী মেয়েদের নতুন মিস কনসেপশন। পুরুষের সামনে বিল পে করা বর্তমানে আত্মমর্যাদার বহিঃপ্রকাশ কম, নারীদের “Clumsy Vanity” হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
ইনশিরাহ হঠাৎ ভীষণ লজ্জা পেলো। লোকটা অতি বিনয়ের সুরেও ভীষণ কথা শুনিয়ে দিতে পারে।
ইনশিরাহকে অপ্রস্তুত হতে দেখে মুঈন স্মিত হেসে বললো,“আমি এখানে পুরুষ বলে আমার পুরুষালি দাম্ভিকতা বজায় রাখতে বিলটা দিচ্ছি না। এখানে তোমরা সবাই আমার ভীষণ ছোট। এটা সোস্যাল ভ্যাল্যুজের অন্তর্গত আই থিংক,আমি তোমাদের বড় বিধায় বিলটা আমি পে করছি।”
চলমান.......
দু'দিন ছুটি নিয়ে একদিন পরে দিলাম। কি নির্লজ্জ আমি। 🫠
আর হ্যা ইতির নায়িকা মানেই হ্যাগো অ্যাকছের দেমাগ থাকবে,ক্লিয়ার?