ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 49

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৪৯
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

সেদিন ইরফান প্রচন্ড ক্ষে'পে গিয়েছিলো। তার ধারণা হয়েছিল ইনশিরাহকে জোরপূর্বক বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোনোমতে শান্ত করতে পেরেছিল ইহান। এতো অল্পতেই কী ভীষণ রা'গ দেখিয়েছে! এই ছেলের উন্নতি কবে হবে!
সেই থেকে কারও সাথে কথা বলেনি, না ইহানের ফোনকল রিসিভ করেছে।
আজ বহু সাধণার পরে ইরফান দয়া করলো, দাদানের কলটা ফেরালো না।
ইহান ভাইয়ের গোমড়া মুখের দিকে তাকিয়ে রাশভারী আওয়াজে বললো,“কন্সটিপেশন হয়েছে? মুখটা এমন কেন করে রেখেছিস?”

_ইশিকে ফোনটা দাও।
ইরফানও চাপা রা'গ দেখিয়ে বলল।

ইনশিরাহ সারাদিন উবু হয়ে বিছানায় শুয়ে থাকে,কারো সাথে মেশে না, নিয়ম করে খেতেও যায়না। মুঈনের সাথে ইদানিং দিনে কয়েকবার বার্তালাপ হয়। মুঈন কাজের ফাঁকে কখনও মেসেজ দিলে ইনশিরাহ রোবটের মতো রিপ্লাই করে দেয়। উত্তর গুলো হয় দু-তিন শব্দে এবং এদিক থেকে কোন প্রশ্ন তোলে না ইনশিরাহ।
বাড়ির বড়রা মুঈনের সাথে বসে ঠিক করেছে আগামীকাল আংটিবদল হয়ে থাকবে। বিয়ে হবে ইনায়ার রিসিপশনের পরপর।
আংটিবদল নিয়ে তাড়াহুড়া দেখিয়েছে আলো। হয়তো তার মন বলেছে আংটিতে বাঁধা পরলে একে অপরের প্রতি সহজ হবে এরা দুজন।

ইনশিরাহ হাসি হাসি বড়দের সিদ্ধান্ত মেনে নিলো। শুধু একা একা হাসতে পারেনা ইনশিরাহ। ভীষণ অগোছালো লাগে জীবনটা, মনে হচ্ছে কিছু একটা কখনো ঠিক হবে না, সব সুখও এমন পীড়াদায়ক লাগবে। নিজের সিমকার্ড টাই চেঞ্জ করেছে সে, সাঈমের সোস্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট গুলো ব্লক করে রাখা। ফোন থেকে লাস্ট একটা ছবি ডিলিট করে তবেই নিঃশ্বাস নেয় ইনশিরাহ।

ইরফানের সাথে আজ কথা বলে ইনশিরাহ দীর্ঘক্ষণ ধরে বোঝালো ইরফানকে, এই বিয়ে জোরজবরদস্তির বিয়ে নয়। ইরফান পারছিল না ওখান থেকে ছুটে আসতে, সে নিশ্চিত বোন স্বাভাবিক নেই। তাকে আসলে সাঈমের বিষয়টি এখনও জানায়নি কেউ। তবে বোনের শুকনো মুখ দেখে ইরফান অনেক কিছু বুঝে নেয়।

ইহান রেগে ধ'ম'কে ইরফানকে শান্ত করে। জানিয়ে দেয় আগামীকাল বাগদান হবে।

বাগদানের জন্য ইয়াসার মির্জা আংটি কিনেছেন। মুঈনও হবু বৌকে পরাবে বলে আংটি কিনেছে। সবার সব প্রস্তুতি শেষ। আলো এসে ইনশিরাহর গালে চন্দন পেস্ট লাগিয়ে দেয় জোর করে, একটু রূপচর্চা প্রয়োজন। রিতু দুধের গ্লাসে জাফরান মিশিয়ে খাইয়ে দেয়, আগের লাবন্যতাটুকু ফিরুক মেয়ের। ইনশিরাহ চুপচাপ বসে থাকে, মা চাচীদের উৎকণ্ঠা দেখে। দেখে সামিনের সাথে নিজের দূরত্ব টুকু। পরী এসে মেয়েকে বোঝায়, বুঝিয়ে বলে, সামিনের থেকে ক্ষমা চাইতে। ইনশিরাহ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে পরীকে বলে,“ঠিক সময়ে চাইবো ছোট মা।”

রাতে মুঈন কটেজে ফেরে, তাড়াহুড়ো করে ফ্রেশেনআপ হয়ে ফোন নিয়ে বসে পরে, আংটির ছবি পাঠায় ইনশিরাহকে । জানতে চায় পছন্দ হয়েছে কিনা। নয়তো চেঞ্জ করবে।

ইনশিরাহ রোবটের মতো রিপ্লাই পাঠিয়ে দেয়,“জি হয়েছে।”

বিয়ে উপলক্ষে বাড়িতে প্রচুর শপিং হচ্ছে। এটা সেটা এনে সবাই ইনশিরাহকে জিজ্ঞেস,“পছন্দ হয়েছে?”

ইনশিরাহ একইভাবে রোবটিক কায়দায় জবাব দেয়,“জি হয়েছে।”

রাতে মুঈন ঘুমাতে পারেনা। অদ্ভুত উত্তেজনায় ঘুম আসে না। যে নরম হাত দু'টো তাকে সামলাবে, মুঈন নিজেকে যার কাছে উজার করবে, পৃথিবীর সব ভালোবাসা এক করে মুঈন যাকে নিবেদন করবে, আগামীকাল সেই নরম হাতের মালকিনের অনামিকা মুঈন দখল করবে, কদিন পরে গোটা মানুষটাকে, তারপর একটা পরিবার, মুঈনের অবসাদ,আজীবনের নিঃসঙ্গতা মিটিয়ে দেওয়া একটা পরিবার। আর শুধু সুখ,সুখ,সুখ। রোজ মুঈন ডিউটি থেকে ফিরলে মুঈনের ইউনিফর্মের বোতাম খুলে দেওয়া, কাজ হবে তার এটুকুই। ঐ নরম হাতে আর কিছু করতে দেবে না মুঈন। ওহ হ্যা, আরেকটা কাজ করতে হবে তাকে। মুঈনের দুষ্টু বাচ্চাগুলোকে খুব শাসন করতে হবে।
একটা, দুটো,তিনটা বাচ্চা। তাদের ঘুম পাড়িয়ে খুব সাবধানে পাশের রুমে যাবে, জানালা খোলা রেখে জোৎস্নার আলো ঘরে ঢুকতে দেবে, তারপর ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত মুঈন বৌয়ের কাছে খুব আবদার করবে একটু স্বস্তির। তার জীবনের প্রথম অস্বস্তি ইনশিরাহর কাছে একটু স্বস্তি চাইবে রোজ রাতে, বড্ড হ্যাংলা হয়ে চাইবে মুঈন।

ভাবতে ভাবতে লজ্জায় লাল,নীল হয়ে যায় মুঈন। পরক্ষনেই ইনশিরাহর কপাল কোচকানো গম্ভীর মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মুঈন আরেকদফা হেসে নেয় মনে মনে। এই মেয়ে জানে না সে ভীষণ রোমান্টিক বর পেতে চলেছে। মুঈনকে কিভাবে সামাল দেবে এই মেয়েটা? কি করে মুঈনকে সহ্য করবে এই ত্যাড়া ত্যাড়া তবে বড্ড মায়া মায়া মেয়েটা?

ভাবনার মাঝেই ফোনে অফিশিয়াল কল আসে। মুঈন গম্ভীর হয়ে কথা বলে ফোন কাটে। আবারও নিদ্রাহীন জেগে থাকে,একটা ছোট্ট পরিবারের চিত্র তাকে ঘুমাতে দেয়না। যে পরিবার মুঈনের কখনো ছিলো না।

ইনশিরাহও নিদ্রাহীন জেগে রয়। শুধু তার জেগে থাকার কারণ ভিন্ন। তার দু'চোখে কোন স্বপ্ন নেই। একটুও ভাবতে ইচ্ছে করেনা কিছু। একটা লোক, মাম্মা পাপার খুব প্রিয়, লোকটা ভীষণ ভালো সম্ভবত, মাম্মা পাপা মেয়েকে যার কাছে রেখে স্বস্তি পাবে। এর বাইরে ইনশিরাহর এক ফোঁটা অনুভূতি আসে না। ও মনে জং ধরেছে ইনশিরাহর। এই মনের কিচ্ছু হবে না।

এসবকিছুর মাঝে ইনায়া ভীষণ বিপদে পরেছে। মির্জা বাড়ির লোকজন তাকে পুরো আটকে দিয়েছে । ও বাড়ি আর যেতে দিচ্ছে না রিসিপশনের আগে। ওদিক থেকে প্রিতমও আসেনা লজ্জায়। রিসিপশনের আগে এতো ঘনঘন শশুর বাড়ি যাওয়াটা দৃষ্টিকটু। রাতে দুজন ভিডিও কলে দীর্ঘসময় কথা বলে ‌। ইনায়া তার মন খারাপের কথা শোনায়, কল না কেটেই ঘুমায়। প্রিতম চেয়ে চেয়ে বৌকে দেখে।

প্রেরণা এ'কদিন যাবত ভীষণ ব্যস্ত। স্বাদে আহ্লাদের নতুন দালানের ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন সম্পূর্ণ হয়েছে। রেস্তোরাঁ চালু হয়েছে।

লোনের টাকা এক তৃতীয়াংশ রেখে বাকিটা দিয়ে একটা অফিস নিয়ে বসেছে নিউটাউনে, কেটরিং সার্ভিসের। দু'টো ব্যাবসা সমান তালে সামলে হিমশিম খেতে থাকা প্রেরণা ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানের সব দায়িত্ব মাথায় তুলে নিয়ে বসে আছে। অনুষ্ঠান হবে ছোট পরিসরে, তবুও যেন ইনায়াকে কেউ কথা না শোনাতে পারে।

________

আজ সকাল থেকে শান্তিনীড় গমগম করছে। একটা অনুষ্ঠান বাড়ি,কাছের দূরের আত্মীয়রা এসেছে,আসছে। এ বাড়ির বড় মেয়ের আংটিবদল, কোনো কিছুর কমতি থাকা চলবে না। ভীষণ জাঁকজমক করেই শহরে ঘোষণা দেওয়া হবে মুঈন ইনশিরাহর বিয়ের।

ইলহাম বা সামিন কেউই অফিসে যায়নি, সকাল থেকে সবকিছু দেখভাল করতে ব্যস্ত। রিতু ব্যস্ত রান্নাঘরে, পরী চেম্বারে গিয়েছে, ইশমাম গিয়েছে রাজশাহী,শেহাকে আনতে। আলো ব্যস্ত উৎকণ্ঠা নিয়ে স্বামীর পেছন পেছন ছুটতে, মানুষটা আবার না অসুস্থ হয়ে পরে।

সামিন স্বাভাবিক। দোতলায় ইলহামের সাথে বসে লিস্টে নিয়ন্ত্রিতদের নাম দেখছিলো, দেখছিলো কেউ বাদ পরলো কিনা।

ইনশিরাহ তখন ঘর থেকে বেরোয়। কত আর শুয়ে বসে থাকা যায়! পার্লার থেকে লোক এসে তার মেনিকিউর পেডিকিউর করে দিয়েছে কিছুক্ষণ আগে। লিভিং রুমে এসে দাঁড়াতেই ইনশিরাহ মুখোমুখি হয় সামিনের। বাবা মেয়ে দু'জন দু'জনের দিকে তাকিয়ে থাকে। সামিন পরপর চোখ নামিয়ে নেয়। ইলহাম বাবা মেয়ের দূরত্ব দেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

ইনশিরাহ কিছু পল দাঁড়িয়ে থেকে ছুটে নিজের ঘরে চলে যায়। ইলহাম উঠে দাঁড়ায়, ঠিক ঐ সময়ে আলো এসে সামিনের পাশে বসে। সে দেখেছে দৃশ্যটা। ধীরে ধীরে একটা হাত সামিনের কাঁধে রাখে, সামিন স্ত্রীর দিকে ফিরে তাকিয়ে ম্লান হাসে, বলে,“তুমি কোনো কথা শুনিয়েছো ওকে ঐ কথাটার জন্য?”

আলো দু'পাশে মাথা নাড়ায়। সামিন বলতে থাকে,“শোনাবেও না দয়া করে, এমনিতেই তীব্র গ্লানিতে ভুগছে, সবকিছুর জন্য কথা শোনাতে থাকলে খুব ভে'ঙে পরবে। শাসন একটু কম করো ওকে আছিয়া। নাজুক অবস্থায় আছে।”

আলো সামিনের দিকে তাকিয়ে রয়। মানুষটাকে দেখে চেয়ে চেয়ে। অস্ফুটে বলে,“কি ধৈর্য্য আপনাকে দিয়েছে আমাদের দেওয়া ব্যাথা সহ্য করার!”

ইনশিরাহ গিয়ে দরজা বন্ধ করে তার আর সামিনের পুরনো ভিডিও রেকর্ড গুলো নিয়ে বসে।

দেড় মাসের, সাত মাসের,দেড় বছরের, তিন বছরের ইনশিরাহকে কোলে নিয়ে দুলতে দুলতে সামিন গাইছে,“খুকু ঘুমালো পাড়া জুড়ালো, বর্গী এলো দেশে। বুলবুলিতে ধান খেয়েছে,খাজনা দেবো কিসে। না না আম্মা, বাংলাদেশ একটি গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র।”

রেকর্ড করছিলো আলো, শোনা যায় তার খিলখিল হাসি ক্যামেরার পেছন থেকে।

ইনশিরাহর চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। দ্রুত সে অন্য একটি ভিডিও প্লে করে। ক্যামেরা চালু করে আলো ইনশিরাহকে ধরে ধরে হাটা শেখাচ্ছে, হঠাৎ কোথা থেকে সামিন ঘরে ঢুকে সরাসরি আলোকে জাপটে ধরে চুমু খায়, চুমু খেতেই থাকে দু'গালে। ছোট্ট ইনশিরাহ তাকিয়ে থাকে মাম্মা পাপার দিকে। আলো লজ্জা পেয়ে ক্যামেরার দিকে তাকায়, সামিনও ক্যামেরা দেখে লজ্জা পেয়ে ছেড়ে দেয় আলোকে।

বাবা মায়ের ভিডিওটা দেখে ইনশিরাহর সেদিন লিভিং রুমে দাড়িয়ে বলা বাক্যটা মনে পরে,“এটা তো তোমাদের যুগ না মাম্মা যে একজন তোমাকে জোর করে বিয়ে করবে আর তুমি তাকে ধীরে ধীরে ভালোবাসবে।”

জেদের বশে কথাটা বললেও ইনশিরাহ এমনটা মিন করতে চায়ইনি।সে বোঝাতে চেয়েছিলো এখনকার মেয়েরা ভিন্ন মতাদর্শের, তারা কোন ক্রমেই হুট করে বিয়ে হলেই স্বামীর মায়ায় জড়ায় না। বাবা মায়ের সম্পর্ক নিয়ে উদ্ভট মন্তব্য করাটা ইনশিরাহর উদ্দেশ্য ছিলোই না।
তবুও কতবড় একটা আঘাত করে বসলো সে মাম্মা পাপাকে।
ফোন রেখে বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে দু'চোখ বন্ধ করে থাকে ইনশিরাহ। কানের কাছে বাজতে থাকে সামিনের “আম্মা” ডাকটা।

_______

ইহান কার ওয়াশ করাতে এসেছে। তার বড্ড তাড়া, বাড়ি থেকে বারবার আলো ফোন করছে, মেহমান আসছে। সন্ধ্যা নাগাদ আংটিবদল হবে। আজ তাড়াহুড়োতে পার্টি অফিস থেকে বেড়িয়ে ‌হাইওয়েতে না গিয়ে শর্টকাট পথ ধরতে গিয়ে পরেছে বিপাকে, ঝিলবাড়ি রোড সংস্করণের এর কাজ চলছিল। ঘুরে ডিসি অফিস রোডের গলি ধরে আসতে গিয়ে কাদাপানিতে নোংরা হয়ে যায় গাড়িটা।
বারবার হাত ঘড়িতে সময় দেখছে সে। ইরফানকে কল লাগাতে হবে গিয়ে, কত উৎকণ্ঠা নিয়ে বসে আছে ইশির আংটিবদল দেখবে বলে।
এমন সময় গ্যারেজে সাগর ভুঁইয়ার গাড়ি এসে ঢোকে।

ইহানের চোয়াল শক্ত হয়, হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে সে। সাগর ভুঁইয়াও কিছুটা বিরক্ত ইহানকে দেখে, প্রেরণা যে ইহানের দালান রেন্টে নিয়েছে তা সাগর ভুঁইয়া জানে, মূলত চাপা ক্ষোভটা তার এখানেই। ইহানের সাথে ঐ ভদ্রমহিলার গা ঘেঁষাঘেঁষির কথা বহুবার বহুজনের কাছে শুনেছে সে। কিছু একটা হয়তো চলছে। সাগর শুনেছে প্রেরণাকে নাকি দুয়েকবার ইহান তাজওয়ারের গাড়ি থেকে এলোমেলো শাড়ি ঠিক করতে করতে নামতে দেখেছে অনেকে। ভদ্রমহিলাকে ইনোসেন্ট ভেবেছিল সাগর ভুঁইয়া। এ তো রীতিমত একটা বে'শ্যা! বিয়ে করবে না অথচ নেতাশ্রেণীর লোকের খায়েশ মেটাবে,ব্যাবসা টিকিয়ে রাখতে। আর এই মির্জা বাড়ির ভালো ভালো ছেলে গুলো হঠাৎ এভাবে ফায়দা লোটা ক্ষুদার্থ শুয়োর কবে হলো!

ইহান চুপচাপ তার কার ওয়াশিংয়ের বিলটা পে করছিলো,ঠিক তখনই সাগর ভুঁইয়া ইহানকে খোচাতে বলে ওঠে,“শুনলাম বোনের বিয়ে দিচ্ছো। এসপির কাছে।”

ইহান ঘুরে তাকায় সাগরের দিকে, নিজের ক্রোধটুকু সংবরণ করে ঠান্ডা গলায় বলে ওঠে,“হ্যা। ধুমধাম করে বিয়ে দিচ্ছি। আপনার স্কাউন্ড্রেল ছেলেটাকে বলবেন আমার বোনের হবু বরের পায়ের কাছে যাওয়ার যোগ্যতা ওর হয়নি। আর ও জেতেনি। আমার বোন শেষটাতে ভালো থাকবে। কিচ্ছু বিগড়াতে পারেননি আপনারা বাপ ছেলে প্ল্যান করে। গট ইট?”

সাগর হাসলো তাচ্ছিল্যের হাসি। ইহান এবার রাগ নিয়ে বলে ওঠে,“আর ভবিষ্যতে আপনার স্কাউন্ড্রেলকে বলবেন আমার পরিবার,আমার বোনের সুখ থেকে দূরে থাকতে কারণ...আপনার গুষ্টি গায়েব করে দেবো নয়তো।”

সাগর এবার খানিকটা চেতে যায়,গলায় তেজ নিয়ে বলে,“স্কাউন্ড্রেল কাকে বলছো? তুমি খুব ভালো? সমাজ সেবার নামে কি চলে বুঝিনা? দেখিনা?....

এটুকু বলে সাগর কিছু মুহূর্ত থামে, তারপর একটা পৈশাচিক হাসি হেসে বলে,“তোমাদের বাপ চাচারা কখনও ঝুটা মাল খায়নি, ঝুটা মাল বোঝো? সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিস। তুমি তো দেখছি রেকর্ড ভেঙে দিলে, অন্যের উচ্ছিষ্ট খাচ্ছো, সাহায্য করার নামে প্রেরণা আহসানের থেকে সময়ে অসময়ে ফায়দা তুলছো আর, মির্জা বাড়ির ছেলেদেরও গণিকার কাছে যেতে হয়.....”

কথাটা পুরোপুরি বলে শেষ করতে পারলো না সাগর ভুঁইয়া। ইহান প্রচন্ড বেগে, একপ্রকার থাবা মেরে কলার চেপে ধরলো তার।

গ্যারেজ ম্যানেজার হতভম্ব। এই দৃশ্য দেখে তার চক্ষু চড়কগাছ। কে কার কলার ধরেছে, এখন এখানে কোন ঝামেলা হবে!

সাগর শান্ত দৃষ্টিতে ইহানের দিকে তাকিয়ে বলল,“কলার ছাড়ো।”

ইহান কলার ছাড়লো না, ঝাকুনি দিয়ে গর্জন করে উঠলো,“তোর ছেলের ভাগ্য ভালো আমি আমার পরিবারকে ভীষণ ভালোবাসি,নয়তো আমার বোনকে ব্যাবহার করার অপরাধে ওকে খু'ন করে জেলে যেতাম। আর তোর ভাগ্য ভালো আমি আগের মতো নেই।”

একটু থেমে ইহান সাগরের চোখে চোখ রেখে বলল,“প্রেরণাকে নিয়ে একটাও বাজে কথা নয়! পুঁতে ফেলবো। বয়স দেখবো না।”

নিজেই ধাক্কা মে'রে সাগরের কলার ছেড়ে বলিষ্ঠ কদমে গাড়ির কাছে গিয়ে গাড়ি স্টার্ট করে ইহান। সাগর ভুইয়া কলার ঠিক করে একটা পৈশাচিক হাসি হাসে। চাচার সাথে লেগেছিল বহু বছর আগে, এখন ভাতিজার সাথে তার লাগতে যাচ্ছে....

_______

তাড়াহুড়ো করে ড্রাইভ করছে ইহান। মেজাজ টা কিছুতেই শান্ত করতে পারছে না। গাড়ি চালাচ্ছে নির্দিষ্ট গতির বাইরে।

এখনও কানে স্পষ্ট বেজে চলেছে প্রেরণাকে নিয়ে সাগরের বলা কুৎসিত মন্তব্য গুলো,“ সাহায্য করার নামে প্রেরণা আহসানের থেকে সময়ে অসময়ে ফায়দা তুলছো আর, মির্জা বাড়ির ছেলেদেরও গণিকার কাছে যেতে হয়.....”
হুট করে রাগ পরে গিয়ে ভীষণ উদাস লাগছে ইহানের, প্রেরণা আহসানের উপকার করতে গিয়ে কোনো বাজে পরিস্থিতিতে প্রেরণাকে সে ফেলতে চায়নি। যদি প্রেরণাকে এমন তিক্ত পরিস্থিতিতে পরতে হয় তাহলে ইহানের গ্লানির শেষ থাকবে না।

লাগাতার ফোন বাজছে তার, ইলহাম ফোন দিচ্ছে। ইহান নিজেকে যথারীতি শান্ত করে কলটা রিসিভ করে বাবাকে বলে,“অন দ্য ওয়ে।”

ও বাড়ি থেকে অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত ছিলো প্রত্যেকেই, বাড়ির মুরব্বিরা দু তিনবার করে কল করে করে জানিয়েছে। প্রনমি আসেনি মির্জা বাড়িতে, মিস জেনি তার কাছে থেকে গিয়েছে।
আংটি বদল অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে এসেছে প্রিতম,প্রেরণা এবং শুদ্ধ।

বাড়ি ভর্তি মেহমান। এদের কাউকে প্রিতম প্রেরণা চেনে না। মির্জাদের লতায় পাতায় পেঁচানো স্বজনের অভাব নেই। প্রিতম নতুন জামাই, তাকে নিয়ে মেহমানদের কৌতুহল বেশ। ইলহাম মির্জা নতুন জামাইকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।

সামিন ইয়াসার মির্জা ব্যস্ত বাইরের ভি.আই.পি. মেহমানদের রিসিভ করতে। পুরো এলাকাতেই উৎসব উৎসব ভাব। সবার বিস্ময়ের শেষ নেই, ইয়াসার মির্জা মেয়ের আংটিবদলেই এমন এলাহী কান্ড করতে পারে,সে বিয়েতে কি করবে?

মুঈন তার পরিচিত বন্ধু বান্ধব,কলিগ, সিনিয়রদের নিয়ে ঠিক সন্ধ্যাতে আসবে জানিয়েছে।

প্রেরণার এতো ভিড় পছন্দ হচ্ছিলো না, সে পরীর সাথে দোতলায় উঠলো, ইনশিরাহর কাছে যাবে বলে। শুদ্ধ তখন ইসাম দ্রিপ্তের প্লে রুমে বসে কম্পিউটারে গেমস খেলছে, মুখ শুকনো করে বসে থাকতে দেখে আলো বাচ্চাটাকে দ্রিপ্তের কামরায় রেখে এসেছিল।

ইনশিরাহর ঘরের দরজায় এসে প্রেরণা দাঁড়িয়ে যায়। রিতু আর পরী নিচে নামে তাড়াহুড়ো করে, নতুন জামাই, তার আপ্যায়ণ কেটরিং সার্ভিসের লোকজন করবে কেন? তারা দুজন প্রিতমের কাছে যায়।

ঠিক তখনই ইশমাম মির্জা বাড়িতে ফেরে। সে গতকাল রাতেই গিয়েছিলো শেহাকে ধরে আনতে। শেহা আসেনি দেখতে পেয়ে সামিন ভীষণ অবাক হয়। ইশমাম বলে,“সত্যিই ওর এক্সাম চলছে ভাইয়া,মিথ্যা বলেনি মেয়েটা। সন্ধ্যায় ভিডিও কলে দেখবে আংটিবদল। বিয়ের তিনদিন আগে আসবে, প্রমিজ করেছে আমাকে।”

একটু যেন স্বস্তি পেল সামিন। একটার পর একটা দুশ্চিন্তা নিয়ে থাকা যাচ্ছিল না। এই শেহাকে নিয়ে তার তিন মামার দুশ্চিন্তা একটু বেশিই, কারণ মেয়েটা আলাদা, ভীষণ চাপা।

ইনশিরাহর ঘরে এসে হতভম্ব প্রেরণা। মা মেয়েতে আবার লেগে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রেরণার কি করা উচিত সে বুঝতে পারছে না।
ইনশিরাহর জন্য পরী নিজে পছন্দ করে একটা পার্টি শাড়ি কিনেছে এংগেজমেন্ট উপলক্ষে। আলো শপিংয়ের দায়িত্ব পরীকে দিয়েছিলো, ও যথেষ্ট আধুনিক বৌদের মধ্যে, ফ্যাশন সেন্স ভালো।

ব্ল্যাক কালার,শিফন জর্জেট শাড়ি,ওপরে হালকা সিকোয়েন্সের কাজ। সাথে ফুল স্লিভ ব্লাউজ। আলো কল্পনায় মেয়েকে দেখেও নিয়েছে মন ভরে এই শাড়িটাতে। ইনশিরাহ উচ্চতা কিংবা শারীরিক গঠনে ভীষণ লাস্যময়ী, হলিউডের কোনো হিরোইন লাগে তাকে। তাকে কখনোই আর পাঁচ জন বাঙালী রূপবতী নারীর মতো লাগে না শাড়িতে, বরং একটু বেশিই আকর্ষণীয়া লাগে। শাড়ির সাথে পরার জন্য আলো তার আলমারি থেকে ডায়মন্ডের একটা লকেট বের করেছে,বের করেছে একজোড়া দুল। এই সাজেই মেয়ের হয়ে যাবে।

কিন্তু আলোর ইচ্ছাতে বরাবরের মতো পানি ঢাললো ইনশিরাহ। তার সাফ কথা এসব শাড়ি টারি গহনা সে পরবে না। বাগদানের সময়ে সে তার পোশাক পরে থাকবে।

রাগ ওঠাতে চেয়েও ওঠায়না আলো, প্রেরণার সামনে ঝগড়া হোক মেয়ের সাথে সে চায়না ‌। ইনায়া একপাশে শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আপু এতো জেদী কেন সে সেটাই বুঝতে পারে না।

আলো হুট করে রেগে গিয়ে মেয়েকে বলল,“তোর পাপার স্যুট এনে দেই তবে? সেটা পর?”

ইনশিরাহ চুপ করে আছে। প্রেরণা কিছুক্ষণ মা মেয়েকে দেখে আলোকে বললো,“আন্টি আপনি যান। ওকে আমি শাড়ি পরিয়ে নিয়ে আসছি।”

কথাটা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল প্রেরণা। আলো চুপচাপ বেরিয়ে গেলে প্রেরণা শাড়িটা নিয়ে ইনশিরাহর মুখোমুখি বসলো। ইনশিরাহ নম্র স্বরে বলতে থাকলো,“আপু আমি পরবো না। প্লিজ।”

_কেন পরবে না?

_আমি বলেছি আমি এমনই থাকবো, আমাকে এভাবেই গ্রহণ করতে হবে সবার।

প্রেরণা হাসলো, কিছুক্ষণ ইনশিরাহর দিকে তাকিয়ে থেকে বলতে লাগলো ,“তো এসপিতো জানেই তুমি কেমন। সে কি জানে না তুমি কোন পোশাক পছন্দ করো? তোমাকে চেনে জানে,সবটা জেনেই তো তোমাকে গ্রহণ করেছে। কিন্তু ইনশিরাহ এটা তো একটা অনুষ্ঠান। এখানের কিছু ড্রেসকোড রয়েছে। অ্যাজ আ বাঙালি তুমি এই পোশাকে আংটিবদল করলে সেটা বেমানান হয় না বলো? আমরা সবাই ট্রেডিশনাল ড্রেস পরেছি দেখো। ইভেন বিয়ে শাদির সাথে সংযুক্ত একটি অনুষ্ঠান বলে ভিআইপি গেস্টরাও ট্রেডিশনাল কোটি পাঞ্জাবি,শাড়ি, সালোয়ার স্যুট পরেছে।”

ইনশিরাহ চুপ করে থাকে, আড়চোখে একবার শাড়িটার দিকে তাকায়। পরমুহূর্তেই নাক চোখ কুঁচকে ফেলে, সে মরা মাছ, মরা মাছের মতোই থাকবে।

প্রেরণা মানলো না, একপ্রকার জোর করে ইনশিরাহকে শাড়িটা পরিয়ে দিতে দিতে বললো,“চুপ! আজ আর বিয়ের কটাদিন। এই কদিন একটু সামাজিকতার খাতিরে ট্রেডিশন টা মেইনটেইন করো, তোমার বর যেহেতু সবটা দেখে শুনেই বিয়ে করছে তোমাকে,বিয়ের পর এসব পোশাক আরামছে পরবে না হয়।”

ইনশিরাহ একেবারেই চুপ হয়ে যায়। খুব মেজাজ খারাপ হচ্ছে যদিও। প্রেরণা সুন্দর করে শাড়িটা পরিয়ে দেয় ইনশিরাহকে, শাড়ি পরানোয় অত্যন্ত দক্ষ প্রেরণা।
ইনশিরাহকে সাজিয়েও দিলো, ইনশিরাহ কোনো প্রসাধনী ছোঁয়াতে দেয়নি যদিও। লকেট আর দুলটা পরেছে শুধু। প্রেরণা এতেই মুগ্ধ হয়। বলে,“ট্রাস্ট মি ইশি, আমার আরেকটা ভাই থাকলে এসপিকে আমি কিছুতেই নিয়ে যেতে দিতাম না তোমাকে!”

ইনশিরাহ ম্লান হাসলো। প্রেরণা ইনশিরাহকে ঘুরিয়ে আয়নার সামনে দাড় করিয়ে দেয়। বলে,“দেখো।”

মলিন মুখ তুলে ইনশিরাহ তাকাল নিজের প্রতিবিম্বের দিকে। দেখতে পেলো একজন অতি রূপবতী,মায়া মায়া উদাস তরুণীকে। একটা ঠান্ডা মরা মাছকে।

চলমান......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 49 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন