#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৫০
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
ইহান এসে শান্তিনীড়ে পা রেখেছে মাত্র। অতিথিদের সম্ভাষণ জানিয়ে ত্রস্ত পায়ে হেঁটে সোজা দোতলায় উঠলো সে। প্রথমে একটু বিশ্রাম, তারপর ফ্রেশেনআপ হয়ে নিচে যাবে বলে পরিকল্পনা তার। সবকিছু দ্রুত করতে হবে, মুঈনরা রওনা দিয়ে দিয়েছে কিছুক্ষণ আগে।
দোতলার লিভিং রুম পেরিয়ে ইহান যখন নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিল তখন শুনলো দ্রিপ্তের ঘরের ভেতর বাচ্চাদের কন্ঠস্বর। কেউ কাউকে অর্ডার করছিলো,কথা শুনে এমনটাই মনে হচ্ছে। ইহান ওখানেই থামলো, কৌতুহলী হয়ে এগিয়ে গিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখে শুদ্ধ কম্পিউটারে গেমস খেলতে খেলতে প্রোগ্রামারকে ইন্সট্রাকশন দিচ্ছে,“গো রাইট রাইট। নাউ গো লেফ্ট।”
ইহান কামরার ভেতরে প্রবেশ করলো। ইহানের আওয়াজ পেয়ে শুদ্ধ ঘুরে তাকালো। দুজন দুজনের দিকে কিছু মুহূর্ত অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে দু'জনে একইসাথে মিষ্টি করে হাসলো। আবার একই সাথে বললো,“হ্যালো।”
আবার একই সাথে বলে ফেলায় একইসাথে দুজন লজ্জা পেয়ে হেসে উঠে আবার একইসাথে বলে উঠলো,“হাউ আর ইউ।”
শুদ্ধ হাসছে। হাসছে ইহানও। ইহান ছোটো বাচ্চাটাকে বললো,“তুমি আর আমি একই ম্যানার্স শিখেছি শুদ্ধ। তাই সবকিছু মিলে যাচ্ছে।”
শুদ্ধ হাসি থামিয়ে তাকিয়ে আছে। এই কথাটার মানে ধরতে পারলো না সে। এটা একটু জটিল কথা তার কাছে। ইহান গিয়ে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নেয়। শুদ্ধ এতেও লজ্জা পেয়েছে। এভাবে কোন আঙ্কেল তাকে কোলে তোলেনা। এই আঙ্কেলটাকে ভীষণ ভালো লাগে শুদ্ধর,তবে মামার পরে।
ইহান কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে স্নিগ্ধ বাচ্চাটাকে দেখলো, শুদ্ধর কপালে কপাল ঠেকিয়ে আদর দিয়ে বললো,“টেল মি ফার্স্ট বাচ্চা । হাউ আর ইউ?”
_আম ফাইন।
চটপট উত্তর শুদ্ধর। আবার বলল,“অ্যান্ড ইউ?”
_আ'ম বেশি বেশি ফাইন!
শুদ্ধ আবারও হেসে দিল। কি অদ্ভুত সুন্দর বাচ্চাটার হাসি। ইহান খেয়াল করেছে প্রেরণা আর শুদ্ধর হাসি একেবারেই একরকম। ভয়ংকর সুন্দর !
ইহান হুট করে আশেপাশে তাকিয়ে শুদ্ধকে বললো,“তোমার মাম্মা আসেনি?”
বলেই ইহান মনে মনে ভাবলো এটা বোকাবোকা প্রশ্ন। প্রেরণা এসেছে বলেই তো শুদ্ধ এখানে। শুদ্ধ সাথে সাথে উত্তর দিলো,“মাম্মাও এসেছে !”
_কোথায় সে?
_ইশারা আন্টির কাছে।
শুদ্ধ ইনশিরাহর নামটা ঠিকঠাক ভাবে বলতেই পারেনা। তাকে ডাকে ইশারা আন্টি।
মুঈন এসেছে, সাথে এসেছে মুঈনের পরিচিত বন্ধু,বন্ধুপত্নীরা এবং এসেছে মুঈনের কিছু কলিগ। এছাড়া মুঈনের ব্যক্তিজীবনে কেউ নেই মুঈনের এতো বড় দিনের সাক্ষী হবার।
আজ মির্জা বাড়ির হবু বড় জামাই মুঈন ফরাজী গোটা শান্তিনীড়ে উপস্থিত মানুষগুলোর চোখ আটকে দিচ্ছে।
এককথায় সুদর্শন, গম্ভীর শ্যাম পুরুষটিকে গ্রে কালারের ফরমাল স্যুটে দেখে প্রিন্স চার্মিং এর কথাই মাথায় আসছে সবার।
প্রিতম আর মুঈন যখন কথা বলছিল তখন সবাই ওদের দু'জনকে দেখতেই ব্যস্ত ছিলো।
মুঈনের পক্ষ থেকে আসা অতিথিদের সামিন, ইলহাম, ইশমাম আপ্যায়ন করতে ব্যস্ত।
মুঈনের দৃষ্টি তখন খুঁজছিল তার একমাত্র কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে।
মুঈনের একমাত্র কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি তখন চুপচাপ বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসেছিল। তার ঘরে ইনায়া শাড়ি পরে রেডি হচ্ছে, ইনশিরাহর বান্ধবীরা মেইক আপ লাগাচ্ছে। সে চুপচাপ ওদের কান্ডকারখানা দেখছিলো।
তিথি এসে ইনশিরাহকে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে,“একটু হাস!”
ইনশিরাহ ভান করে হাসলো। তিথি বলতে লাগলো,“উকি মেরে দেখলাম তোর বরটাকে একেবারে প্রিন্স চার্মিংয়ের মতো লাগছে। এ নিশ্চয়ই শত তরুণীর হৃদয় ভেঙে তোকে বিয়ে করছে রে ইশি। তোর সংসারে একটু কাজল পরিয়ে রাখিস।”
______
হালকা আপ্যায়নের পরে আংটিবদল টা সেরে নিতে চাচ্ছে সবাই। তারপর “মেইন কোর্স” দেয়া হবে অতিথিদের।
সামিন আর মুঈন একস্থানে দাঁড়িয়ে হেসে হেসে গল্প করছে। এদেরকে দেখলে কেউই বিশ্বাস করতে চাইবে না এরা জামাই শশুর হতে চলেছে। মুঈনের সাথে সামিন ভীষণ মনখোলা, তেমনি মুঈনও। এটা সবাই জানে,যারা তাদের জানে।
ইহান রেডি হয়ে নিচে নেমে এসে তাদের দুজনের মাঝখানে অংশ নিলো।
দূর থেকে ইশমাম সামিন আর মুঈনকে চেয়ে চেয়ে দেখছিলো, ইয়াসার মির্জা মনের মতন মেয়ে জামাই পেয়েছে, তাই তো এতো খুশি। আর সে? সে কি পেয়েছে? ইশমাম অদূরে “স্যুটেড ব্যুটেড” প্রিতমের দিকে তাকায়। প্রিতমও হঠাৎ শশুরের দিকে চায়, জামাই শশুর চোখাচোখি হলো। প্রিতম বোকা বোকা হাসলো, শশুরকে দেখে তার নার্ভাসনেস বেড়ে যায় ! তাই এমন বোকাবোকা হাসে। যে হাসি দেখলে ইশমামের হুট করে রাগ ধরে যায়। প্রিতমকে মিচকে শয়তান মনে হয় প্রিতমের হাসি দেখলে।
ইশমাম কপাল কুঁচকে ফেলে। ইনায়া তখন লাল শাড়ি সামলে লাফাতে লাফাতে নিচতলায় নেমে আহ্লাদী হয়ে প্রিতমকে বলে,“প্রিতম দেখো তো আমাকে কেমন লাগছে।”
প্রিতম দূরে দাঁড়িয়ে থাকা শ্বশুরের দিকে একপলক তাকিয়ে,তার “ন্যাকারানীকে” অত্যন্ত ধীরে বলে,“ওপাশে চলো। এখানে বসে ঠিকঠাক ভাবে দেখতে পারবো না তোমাকে। কেউ আমাকে দেখে ভষ্ম করে দিচ্ছে।”
আংটিবদলের সময়ে ইনশিরাহর ডাক পরলো। ইনশিরাহকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছে প্রেরণা। তাদের পেছনে ইনশিরাহর বান্ধবীরা।
মুঈন তখনও ইনশিরাহকে দেখেনি, ওদিকে ফিরে ইহানের সাথে কথা বলছিলো। লিভিং রুমে অতিথিদের মৃদু গুঞ্জন যখন থেমে গেল ইনশিরাহকে দেখে, মুঈন তৎক্ষণাৎ ঘুরে তাকাল।
অতগুলো দৃষ্টি শুধুমাত্র ইনশিরাহতে নিবদ্ধ। মুগ্ধতা প্রত্যেকের চোখে। মুঈন নির্নিমেষ দেখছে ধীর পায়ে সিঁড়ি ভাঙতে থাকা ইনশিরাহকে, একটা কালো শাড়িতে ইনশিরাহকে মুঈনের একটাই উপমা দিতে ইচ্ছে করছে, আর সেটা হলো,“ব্ল্যাক রোজ।”
পা মাথা দেখলো মুঈন, দেখতেই থাকলো। সিঁড়ির ধাপ যেন শেষ হচ্ছে না। সবার দৃষ্টি ইনশিরাহতে নিবদ্ধ থাকলেও ইহান কিছু সময় বোনকে দেখে ধীরে ধীরে দৃষ্টি সরিয়ে ইনশিরাহর পাশের জনকে দেখে। যার মুখে লেপ্টে আছে অমায়িক, স্নিগ্ধ হাসি। এই এতটুকুই যথেষ্ট ইহানের অবচেতন মনকে মুগ্ধ করতে। সে কয়েক পল দেখে চোখ নামিয়ে নেয়, অতঃপর হাতের ফোনটা নিয়ে চলে যায় ওপাশে।
ইনশিরাহ ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় মুঈনের দিকে। মুঈন অপলক দেখছে মাথা নিচু করে তার দিকে এগিয়ে আসতে থাকা রমনীকে, টমবয়কে।
ইনশিরাহকে নিয়ে একদম মুঈনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে প্রেরণা আলোর কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।
মুঈন আর ইনশিরাহ মুখোমুখি। হবু বর কনের থেকে কারো নজর হটছিলো না। মুঈন সরাসরি ইনশিরাহর চোখের দিকে তাকিয়ে একটা সরল হাসি উপহার দিলো ইনশিরাহকে। বিনিময়ে ইনশিরাহও অল্প হাসলো।
ইহান তখন ইরফানকে কল লাগিয়েছে। যে অধীর আগ্রহে বোনকে দেখবে বলে বসেছিল। আলো কল দিলো আজান-আয়াতের পরিবারকে। তাদের দুদিন দেরি হবে কানাডা থেকে আসতে। ইশমাম শেহা আর শান্তকে দিলো কল। কাছের মানুষ গুলো স্বশরীরে উপস্থিত নেই,কিন্তু এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেই।
আলো প্রেরণাকে আস্তে ধীরে বলল,“শাড়ির ব্যাপারে মানলো তোমার কথা?”
_শুধুমাত্র বিয়ের কদিন এসব পরবে বলেছে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আলো নিচুগলায় বললো,“প্রনমিকে আনলে না কেন?”
_ওর সর্দি জ্বর।
কথাটা মিথ্যা,আলো জানে।
সামিন চুপচাপ দূরে দাঁড়িয়ে ইনশিরাহ আর মুঈনকে দেখছিলো,তার চেহারায় স্বস্তির ছাপ। ইলহাম মির্জা অতিথিদের সাথে আবারও হবু দম্পতির পরিচয় করিয়ে দেয়।
ভদ্রতা দেখিয়ে সবার সাথে হাই হ্যালো করে যাচ্ছে ইনশিরাহ। আর মুঈন আড়চোখে দেখছিলো ইনশিরাহকে।
আংটি এলো। পরী মুঈনের জন্য কেনা আংটিটা নিয়ে এসে ইনশিরাহর হাতে ধরিয়ে দিলো। মুঈনও পকেট থেকে ইনশিরাহর জন্য কেনা আংটিটা বের করে। ওদের দু'পাশে ইশমাম আর পরী দাঁড়িয়ে আছে। পরী মুঈনকে বলল,“পরিয়ে দাও।”
তারপর ঘুরে ইনশিরাহর দিকে তাকিয়ে বলে,“হাত বাড়িয়ে দাও।”
ইনশিরাহ তার কাঁপা কাঁপা বা হাতটা বাড়িয়ে দেয় মুঈনের দিকে। মুঈন একপলক ইনশিরাহর হাত দেখে, একপলক দেখে ইনশিরাহর মুখ।
ইরফান শত কিলোমিটার দূরে বসে বোনকে দেখছিলো, দেখছিলো বোনের নতুন জীবনের সূচনা লগ্ন। বাড়ির লোকজন এবং অতিথিরা যখন চুপচাপ আংটিবদলে মনযোগ দিচ্ছে তখন ইরফান তার স্বভাব সুলভ ফাজলামির সুরে বলে ওঠে,“আরেকবার ভেবে নিলে ভালো হতো না?”
সবাই কিছুটা হতভম্ব ইরফানের এমন আচরণে। মুঈন আর ইনশিরাহ চোখ বড়বড় করে ইহানের হাতে ফোনটার দিকে তাকায়।
ইরফান হেসে ফেলে ইনশিরাহকে বলে,“ইশি তোকে না, মুঈন ভাইয়াকে বলছিলাম, আরেকটু ভেবে নিলে ভালো হতো না?”
হেসে ফেললো সবাই। প্রেরণা প্রিতম গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শুধু। ইনশিরাহ চুপ করে রয় ইরফানের ফাজলামির কোন প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে। মুঈন মিটিমিটি হেসে কালবিলম্ব না করে ইনশিরাহর হাতের আঙ্গুলের ডগা ধরলো, ইনশিরাহ দেখছে মুহুর্তেই তার অনামিকা দখল করে নিয়েছে একটা সুন্দর আংটি, থানার সেই খিটখিটে অফিসার মুঈন ফরাজীর আংটি।
এবার পরী ইনশিরাহকে বলল মুঈনকে আংটি পরিয়ে দিতে। ইনশিরাহর কেমন হাত কাঁপছে, ইশমাম বললো,“দাও আম্মা।”
কোনো মতে মুঈনকে আংটিটা পরিয়ে দিয়ে ইনশিরাহ হাত সরিয়ে নেয়। মুঈন ইনশিরাহর এই অস্বস্তি টুকু উপভোগ করে। সে তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখে নাক উঁচু স্পষ্টভাষী মেয়েটার চোখে মুখে কি নিদারুন সংকোচ, একটা মেয়ে এই সংকোচ টুকু এড়াতে পারেনা সে যতই স্রোতের বিপরীতে চলুক।
আংটিবদল সম্পন্ন হয়। সামিনের তরফ থেকে ইলহাম মির্জা বিয়ের সম্ভাব্য দিন ঠিক করে জানিয়ে দেয়। এই খুশি খুশি আমেজে মুখটা শুকনো করে দাঁড়িয়ে আছে ইনশিরাহ।
ইনায়া এবং ইনশিরাহর বান্ধবীরা এসে মুঈন আর ইনশিরাহকে পাশাপাশি দাড় করিয়ে ছবি তুলে নেয়।
অতিথিদের খাবার পরিবেশন করা হয়েছে, আয়োজন ব্যাপক। পরী ইনায়াকে বললো ইনশিরাহ আর মুঈনকে নিয়ে দোতলায় যেতে। হবু দম্পতির নিজেদের মধ্যে কত কথা থাকতে পারে।
ইনায়া আগে নিজে ছুটে গিয়ে ইনশিরাহর ঘর গোছাতে শুরু করলো,ঘরটা পুরো এলোমেলো করে রেখে গিয়েছে ইনশিরাহর বান্ধবীগুলো।
আলো ইনুকে দেখে অবাক হয়ে বলে,“ঘর গোছাচ্ছিস কেন? তোকে না বলা হলো ইনশিরাহ আর মুঈনকে নিয়ে আসতে?”
_আপু ভাইয়ার জন্যই তো ঘর গোছাচ্ছি।
আলো একটা লম্বা ধ'ম'ক দিয়ে বলল,“ইনশিরাহর শোবার ঘরে ঢুকবে মুঈন? এক চ'ড় খাবি, যা পুল সাইডে নিয়ে যা।”
ইনায়া ছুটছে তো ছুটছে। তাকেই মানুষ পেয়েছে, একে ডেকে দাও, তাকে ধরে আনো, একে নিয়ে যাও। এই শেহাটা আসল সময়ে একেবারে গা ঢাকা দিয়েছে। ইনায়া মনে মনে খুব বকলো শেহাকে।
হুট করে একটা হাতে টান অনুভব করলো ইনায়া। প্রিতম তাকে টেনে দোতলার বারান্দার আড়ালে নিয়ে গিয়েছে। ভীষণ চ'ম'কেছে ইনায়া। ধাতস্থ হবার সময় না দিয়ে প্রিতম দু'গালে অগণিত চু'মু খেয়ে বাতাসের বেগে চলে যায় সেখান থেকে। দীর্ঘ পনেরো দিনের বকেয়া চু'মু গুলো খেয়ে নিলো।
শুদ্ধকে কোলে করে দ্রিপ্তের ঘর থেকে বেরোলো প্রেরণা, ছেলেটা খেলতে খেলতে ওখানেই ঘুমিয়ে গিয়েছে। রাত অনেক,একটু পরেই তারা বেরোবে। পথিমধ্যে দেখা হলো ইহানের সাথে, প্রেরণা হেসে তাকে সালাম দিয়ে, আসছি বলে সিঁড়ির কাছে যায়।
ইহান চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে প্রেরণার প্রস্থানের দিকে চেয়ে। দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত ইহান তাকিয়ে থাকে।
“কেমন আছেন ভাইয়া।”
একাধিক পরিচিত কন্ঠস্বর শুনে ইহান ঘুরে দাঁড়ায়। ইনশিরাহর বান্ধবীগুলো দল বানিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই অমায়িক হাসি হাসছে ইহানকে দেখে। এই লোকটাকে দেখলে এমনিতেও সবার মুখ থেকে মিষ্টি ঝরে পরে। কেমন নম্র ভদ্র আচরণ করে।
ইনায়া দূরে কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে আপুর বান্ধবীগুলোর দিকে। কেমন ঢং করে পাছা দুলিয়ে দুলিয়ে কথা বলে। আর ভাব দেখাচ্ছে এখন,যেন এরা অনেক ভদ্র! এরা যে এক একটা শাকচুন্নী তা ইনায়া জানে।
ইহান ইনশিরাহর বান্ধবীদের সংক্ষেপে,“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তোমরা সবাই ভালো?” বলে চলে যায়।
চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ইহানের হাঁটা দেখে সবাই। চোখ চকচক করছে। পাঞ্জাবির ওপর থেকে বাহুর ফুলে ফেঁপে থাকা পেশীর দিকে তাকিয়ে থাকে এক ধ্যানে।
তুনা ইহানের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে হাতের ফোনের দিকে তাকিয়ে সবাইকে বলে,“আরে আসল কাজটাই করা হলো না এখনো! এই মিলিটারিকে দেখে খেয়ে বসে আছি!”
তাদের আসল কাজ হচ্ছে মুঈন ইনশিরাহর যুগলবন্দী ছবি সাঈমকে পাঠানো।
তুনার সাথে সাঈম সোস্যাল মিডিয়া সাইটে এখনও সংযুক্ত। তুনা মুঈন-ইনশিরাহর ছবিটা সাঈমকে পাঠিয়ে লিখে দেয়,“মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ফরাজী। কি সুন্দর না?”
সাঈমকে আরো বেশি জ্বালাতে ইচ্ছে করছিল ওদের। তবে বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করলো না। এতটুকু লিখে পাঠিয়ে দেয়।
ছবিটা পাঠানোর কুড়ি মিনিটের মাথায় সাঈম ছবিটা দেখে। ফোনটা হাতে নিয়ে বড় করে দেখলো সাঈম ছবিটা। ইনশিরাহকে দেখলো, ইনশিরাহ হাসছে কিনা সেটা দেখলো। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে সে। পাশ থেকে ওর এক বন্ধু ফোনটা কে'ড়ে নিয়ে অফ করে বলে,“এখন নাটক বন্ধ কর। ও হাসলেও কি আর কাদলেও কি তোর?”
_______
পুল সাইডের সবগুলো বাতি নিভিয়ে দেয়া। আজ পূর্নিমা। চাঁদের আলোয় ফকফকে পরিষ্কার লাগছে চারপাশ। রুপালি আলোয় পুলের স্বচ্ছ পানি ঝকঝক করছে। ঠিক পাশেই,সহস্র বেলীর বিশাল টব। ভীষণ রকমের সুবাস ছড়াচ্ছে, আলোড়িত হয়ে আছে আশপাশ। মুঈন আর ইনশিরাহ পাশাপাশি বসে। মাঝখানে দুহাতের মতো দূরত্ব। ইনশিরাহ বসে ছিল হাতের অনামিকায় চকচকে আংটিটার দিকে দৃষ্টি দিয়ে , মুঈন আড়চোখে বারকয়েক ইনশিরাহকে দেখে। দুপাশেই সমান নীরবতা বিরাজমান। এভাবেই বিশমিনিটের মতো কেটেছে। মুখে তালা লাগিয়ে থাকার প্রতিযোগীতায় মুঈন ফরাজী তার হবু স্ত্রীর কাছে হার মেনে নিয়ে মুখ খুলল নিজে, বললো,“রেজাল্ট কবে দেবে?”
_কিছুদিন পরেই আই গেস।
রোবটিক জবাব ইনশিরাহর।
মুঈন বলতে লাগলো,“তারপর কি করতে চাচ্ছো আই মিন ক্যারিয়ার....”
_লেখাপড়া বরাবর বাধ্য হয়ে করেছি। আমার ফোটোগ্রাফির শখ খুব। ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফি প্রফেশন হিসেবে নিতে চেয়েছিলাম বাট মেন্টাল সাপোর্ট পাইনি দেখে শখ পর্যন্ত রেখেছি ওটাকে। আর ক্যারিয়ার......... গ্রাজুয়েট হয়ে বাড়ির ব্যাবসা দেখার কথা ভাবছি। বসে থাকতে চাচ্ছি না। আর্ন করতে চাই আমি।
নিচু স্বরে বলতে লাগলো ইনশিরাহ। মুঈন অবাক হয়ে ইনশিরাহকে দেখে, সে বেশ কয়েকবার ইনশিরাহকে ক্যামেরা নিয়ে দেখেছে তবে খেয়াল করেনি অতোটা। বললো,“ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফি?”
_হু।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুঈন বলে,“শখটা বেশ ইউনিক লাগলো শুনে, তবে আ'ম স্যরি ইনশিরাহ। পরিবার থেকে যে সাপোর্ট টা পাওনি সেটা হাজবেন্ডের কাছ থেকেও পাবেনা তুমি ,ব্যাড লাক।
কারন আমি আমার চাকরি রেখে বৌকে নিয়ে আফ্রিকার জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরতে পারবো না আর আমার বৌকেও আমি একা একা অতদূরে ছাড়বো না কখনো। এ ব্যাপারে আমি একটু বেশি রক্ষনশীল । তাই তোমাকে এটা শখ পর্যন্ত রাখতে হবে,প্রফেশন নয়। ”
বলতে বলতে হাসলো মুঈন। আবারও বললো,“আরেঞ্জ ম্যারেজে পুরুষ কত স্বৈরাচারী জানিনা, তবে ট্রাস্ট মি ইনশিরাহ তোমার সাথে যদি আমার লাভ ম্যারেজ হতো আমি তবুও তোমাকে এই একটা ব্যাপারে সাপোর্ট দিতে পারতাম না।”
ইনশিরাহ চুপ করে থাকে মুঈনের মশকরা শুনে। মুঈন বললো,“দেখাও আমাকে তোমার ফোটোগ্রাফি।”
খুবই শান্ত স্বরে, অনুরোধের সুরে বললো মুঈন। ইনশিরাহ চোখ তুলে তাকায়। জোৎস্নার আলোয় কালো রঙের ঝকঝকে সিকোয়েন্সের কাজ করা শাড়ি পরিহিতা,ডাগর ডাগর চোখের,খোলা চুলের মোহমোয়ী রমনীর অবাক দৃষ্টি সোজা আঘাত হানে মুঈনের বক্ষপটে। সে মোহগ্রস্তের ন্যায় তাকিয়ে থেকে আবারও বলে,“কি হলো দেখাও?”
_সত্যিই দেখবেন?
অস্ফুটে শুধায় ইনশিরাহ।
_হুম। তোমার এলেম দেখবো। ইউ নো,অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে একে অপরের এলেম দেখে নেওয়াটাও ইম্পরট্যান্ট। বাট আ'ম স্যরি ইনশিরাহ এতো ইউনিক গুণের অধিকারিনী তুমি,পাচ্ছো এক আপাদমস্তক গুণহীন ব্যক্তি যার পড়াশোনা ছাড়া আর কিছু জানা নেই।
এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা ইনশিরাহ জানে, এর কাছে ওর কাছে ইনশিরাহ শুনেছে মুঈন অলরাউন্ডার। ইনশিরাহ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে উঠে দাঁড়ায় তারপর ধীরপায়ে হেঁটে নিজের ঘর থেকে ল্যাপটপটা এনে মুঈনকে দেখাতে লাগলো নিজের কিছু কাজ।
মুঈন অভিভূতের ন্যায় দেখছে সবকিছু। ভীষণ কৌতুহল দু'চোখে। ইনশিরাহ কতদিন পরে নিজের কাজগুলোতে চোখ বুলিয়ে উত্তেজিত হয়ে পরলো, নিজের ছকে বাধা আচরণ পাল্টে হঠাৎ কিশোরী মেয়েদের মতো বলে উঠলো,“মুঈন দিস ওয়ান, দিস ওয়ান। লুক, এটা দিয়ে আমি আর্ন করেছিলাম প্রথম। পুরষ্কারও পেয়েছিলাম।”
মুঈন দেখলো না ছবিটা। মুঈন দেখতে লাগলো ইনশিরাহকে। হুট করে ভীষণ খোশমেজাজী লাগছে। ল্যাপটপ নিয়ে মুঈনের অতি নিকটে বসে একটার পর একটা কাজ দেখিয়ে যাচ্ছে মুঈনকে। মুঈন চোখ নামিয়ে নেয়। ইনশিরাহ কিসব বলে চলেছে সেসব কিছু কানে ঢুকছে না তার। মুঈন চাঁদের দিকে তাকায়, ঠিক এমনই জ্বলজ্বল করছে ইনশিরাহ কথা বলার সময়।
মুঈনের চোখে চোখ পরতেই হঠাৎ করেই কথা থামিয়ে ইনশিরাহ চুপ হয়ে যায়, আবার সেই চিরাচরিত গম্ভীর মুখ। ল্যাপটপ নিয়ে দূরে সরে বসে।
মুঈন আবারও চাঁদের দিকে তাকায়। তার চাঁদ আর ঐ চাঁদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কখনো পূর্নিমা আনে, কখনো অমাবস্যা।
ইনশিরাহ জড়োসড়ো হয়ে বসে। মুঈন ইনশিরাহকে গম্ভীর হয়ে বলে,“চলো ওঠা যাক। সবাই অপেক্ষা করছে।”
সামনে সামনে হাঁটছে মুঈন। পেছনে ইনশিরাহ। দোতলার বারান্দা পেরোতেই সামিনের সাথে দেখা ওদের।
মুঈনকে দেখে সামিন চওড়া হাসলো,তবে মেয়ের দিকে তাকাল না।
মুঈন ইনশিরাহকে নিচু স্বরে “আসছি” বলে হবু শ্বশুরের সাথে কথা বলতে বলতে সামনের দিকে এগোয়।
ইনশিরাহ নিজের স্থানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে তার পাপা আর মুঈনকে দেখে। দেখতেই থাকে অপলক।
চলমান.....
[ এই পরিচ্ছেদে চরিত্রগুলোর রূপের বর্ণনা দিতে দিতে আমি শেষ। কম কম লাগলে জানিও। ]