#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৫১
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
অতিথিরা সবাই চলে গেলেন। বাড়ি ফাঁকা হলো। কিছু কাছের স্বজন থেকে গিয়েছে। তারা গেস্টরুম দখল করে শুয়ে পরেছে। বাড়ির সবাই-ই শুয়ে পরেছে। কেটরিং সার্ভিসের লোকজন সব গুছিয়ে নিয়েছে। ইলহাম মির্জা সেসব দেখভাল করে সদরদরজা বন্ধ করালো কাজের লোককে বলে।
তখন রাত বারোটা প্রায়, ইনশিরাহ সেই কখন শাড়ি খুলে তার আরামদায়ক পোশাকে নিজেকে আবৃত করেছে। খোলা চুলগুলো উঁচু করে এলোমেলো অবস্থায় একটা ক্লিপে আটকে রেখে ফোঁস শব্দে একটা নিঃশ্বাস ফেলে। তার মনে হচ্ছে তার মধ্যে আসলেই নারীর সহনশীল স্বভাবটা নেই, এই অল্পতেই তার বিরক্তি ধরে গিয়েছে এই পোশাকে,মোট দুবার সে পরলো শাড়ি। অথচ সবাই শখ করে পরে ঘন্টার পর ঘন্টা থাকে, তার মা চাচীরা তো সবাই শাড়িই পরে।
এক এক করে সবার ঘরের বাতি যখন নিভে গেল, ইনশিরাহ গুছিয়ে বসলো তার ফোনটা নিয়ে। শেহাকে কল লাগায়। শেহা কলটা রিসিভ করে চুপ করে থাকে। ইনশিরাহ বলে,“আমার ভালোলাগছে না শেহু! তুই আসবি না?”
আপুর কথায় মন বিগলিত হলো শেহার। নিশ্চুপ দু'পাশে নাড়িয়ে বলল,“আসবো।”
বোনের সাথে মনের জমানো সমস্ত গ্লানি উগড়ে দিয়ে ইনশিরাহ খানিকটা শান্ত হলো। শেহা ওপাশ থেকে নরম হয়ে বলল,“আপু। ভাইয়াকে তোমার পছন্দ হয়েছে?”
ইনশিরাহ চুপ করে থাকে। শেহা বলতে লাগলো,“পছন্দ নয়?”
এলোমেলো দৃষ্টি দিয়ে ইনশিরাহ একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,“বিষয়টা পছন্দ অপছন্দের নয় শেহু। আমার মতো মেয়েকে অ্যাক্সেপ্ট করার ক্ষমতা বা ধৈর্য্য শক্তি এ শতাব্দীর পুরুষের নেই সম্ভবত। বিষয়টা সেখানে। তুই বুঝতে পারছিস আমি কি মিন করতে চাইছি?”
শেহা হাসলো অসুস্থের মতন। বললো,“বাজে বকো না। রাখো তো। বিয়ে হলেই দেখবে আম দুধে পুরো মাখামাখি অবস্থা।”
ইনশিরাহ প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,“তুই কেমন অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিস শেহু। অসুখ করেছে তোর?”
দুপাশে মাথা নাড়ায় শেহা। ইনশিরাহ বলতে লাগলো ,“তুই হলি এবাড়ির সবথেকে লক্ষি মেয়ে। তুই আয়। তোকে সবার দরকার। ইনুটা তো ইনু।”
কথা শেষ করার আগেই ইনশিরাহর দরজায় টোকা পরে। তাড়াহুড়ো করে ইনশিরাহ ফোন কে'টে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই দেখলো দরজার ওপাশে আলো দাঁড়িয়ে আছে। মুখভঙ্গি গম্ভীর,হাতে একটা প্লেট ঢাকনা দেয়া।
ইনশিরাহ কিছু বলার আগেই গম্ভীর হয়ে আলো বলল,“দুপুরের পরে আর কিছু মুখে দাওনি। সরো, হাত এঁটো করতে হবে না। আমি খাইয়ে দিচ্ছি। কষ্ট করে চিবিয়ো।”
বিছানায় মায়ের মুখোমুখি চুপ হয়ে বসলো ইনশিরাহ। আলো প্লেটে ভাত মাখাতে মাখাতে বললো,“ভাত কি কিছুটা কমাবো? এরপর দুধভাত খাবে?”
কন্ঠস্বর ভীষণ গম্ভীর আলোর। ইনশিরাহ বাচ্চা মেয়ের মতো মাথা ঝাঁকিয়ে অস্ফুটে বললো,“আজ দুধভাত খাবো না।
একটু থেমে আবারও বলে,“আমার আসলে খিদেও নেই। তুমি খাইয়ে দিচ্ছো বলে খাচ্ছি।”
ধীরে ধীরে মেয়েকে খাইয়ে দিতে দিতে আলো ঠান্ডা গলায় বললো,“জোরাজুরি করার ইচ্ছা নেই আর তোমাকে। কারণ তুমি তো তুমি, তুমি ইনশিরাহ। আসলে বুকটা খুব পোড়ে তবুও। কারণ তুমি যতই মাম্মা পাপার সম্পর্ক নিয়ে বিদ্রুপ করার দুঃসাহস দেখাও না কেন, সবকিছুর উর্ধ্বে তুমি আমাদের মেয়ে। তোমার কাছে আমাদের সম্পর্ক শুধু মানিয়ে নেয়া হতে পারে, তবে আমাদের কাছে তুমি আমাদের দুজনের শুদ্ধ ভালোবাসায় জন্ম নেয়া এক অতি মূল্যবান রত্ন। জানো ঠিক কতটা ত্যাগ স্বীকার করে তোমার পাপা আমাকে জয় করেছে? জানো প্রতিদিন বাচ্চাদের মতো বায়না করতো তোমার পাপা আমার কাছে, তার মেয়ে চাই বলে?”
ইনশিরাহর চোখ ছাপিয়ে জল এলো। খাবারটা আর গিলতে পারছে না। আলো ঠান্ডা গলায়ই বলতে লাগলো,“আমি বাড়াবাড়ি করতাম তোমার স্বাধীনতা নিয়ে। আমার আপত্তি ছিলো তোমার স্বাধীনতা নিয়ে, কারণ তোমার এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ভালো না খারাপ সেই প্রসঙ্গে যাবো না, শুধু বলবো এমন আচরণ বারবার জীবনে সমস্যা সৃষ্টি করে, আমি নিজের জীবনে বহুবার প্রমাণ পেয়েছি। তাই আমি একজন বাঙালি মা হিসেবে তোমাকে এতটা স্বাধীনতা দিতে চাইনি। কিন্তু তোমার পাপা, তার ছিল তোমার প্রতি অগাধ বিশ্বাস,ভরসা, বড় গলায় আমাকে শাসাত,“নাহ, আমার মেয়ে আমাকে কষ্ট দিয়ে কিছু করতেই পারে না। আশেপাশে তাকিয়ে দেখো আছিয়া, যেখানে উঠতি বয়সী সব ছেলে মেয়েরা লিভ ইন রিলেশন নিয়ে ব্যস্ত সেখানে আমার মেয়ের নৈতিকতা দেখো। ওর কাজ দেখো, সমাজের প্রতি ওর কর্তব্য দেখো। ওর স্বাধীনতা নিয়ে একটুও আপত্তি তুলবে না তুমি।”
তোমার স্বাধীনতার ব্যাপারে ঠিক এতোটাই সাপোর্টিভ তোমার বাবা,যাকে তুমি নিজের অজান্তে বুঝিয়ে দিয়েছো সে তোমার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেছে।
টুপটুপ করে জল পরতে থাকলো ইনশিরাহর গাল বেয়ে। আলো মেয়েকে আর কথা না শুনিয়ে মুখ মুছিয়ে দিয়ে সামিনের ক্রেডিট কার্ড টা ইনশিরাহর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে,“কাল মুঈনের সাথে গিয়ে বিয়ের শপিং টা করবে। ছেলেটা ভালো, তোমাকে ভালো রাখবে। অবশ্য যদি তুমি ভালো থাকতে চাও। আমি জানি, ছয় বছর একটা দীর্ঘসময় আমি জানি। তবে তোমাকে বাকি জীবনের চিন্তাও করতে হবে।”
কাঠকাঠ ভাবে কথাগুলো বলে আলো চলে যায় মেয়ের ঘর থেকে। ইনশিরাহ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। হুট করে তার ফোনে টুং টাং আওয়াজ হয়, একটা মেসেজ এসেছে। ইনশিরাহ মেসেজটা দেখলো, মুঈন পাঠিয়েছে,“কাল শপিংয়ে যেতে হবে। আমি ডিউটি শেষ করে তোমাকে রিসিভ করে নেবো।”
ইনশিরাহ সময় দেখলো। রাত বারোটা আটচল্লিশ মিনিট। সে অবাক হলো, এই লোকটা কি ঘুমায় না নাকি!
সে ছোটো করে উত্তর পাঠিয়ে দেয়,“জি ঠিক আছে।”
______
কানাডা থেকে আসছে আজান আয়াতের পরিবার। আজান আয়াত উভয়েই কানাডার একটি নামী সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকুরী করে। দু'জনের এপার্টমেন্ট পাশাপাশি। আজান এবং আজানের স্ত্রী মারিয়ার দু'টো ছয় এবং আটবছরের ছেলে রয়েছে, অন্যদিকে আয়াত এবং তার স্ত্রী সোফিয়ার একটি বারো বছরের কন্যা রয়েছে। আয়াত কানাডায় পড়াশোনা করতে গিয়ে এক বিদেশিনীর প্রেমে পরে তাকে বিয়ে করে নিয়েছিল। এ নিয়ে বিশাল ঝামেলা হয়েছিল আলোর বাপের বাড়িতে। সামিন বহু কষ্টে শশুর শাশুড়িকে মানিয়েছিল শ্যালকের বিয়েতে।
দীর্ঘ পাঁচ বছর পরে ভাইয়ের বৌ দুজন দেশে আসছে। শেষ আতাউর আলমের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীকে এসে গিয়েছে সবাই। ভাইরা তো আসে যায়, তবে ওরা খুব কম আসে। আলোর ভাইয়ের বৌদের নিয়ে আয়োজন প্রচুর।
বাড়িতে মেহমান আসতে থাকে,যেতে থাকে। এতো বড় বাড়ি অথচ ছোটো মনে হয়। কিছুক্ষণ আগে জামিলের পরিবার এসে গিয়েছে। বিয়ে বাড়ি, বেশ আমেজে উন্মাতাল সবাই।
রিতু শুকনো মুখে নিজের ঘরে চুপচাপ বসে আছে সকাল থেকে। সবসময় কাজ কর্মে নিজেকে ব্যস্ত রাখা মহিলা আজ কাজেও হাত লাগায় না। সে খোলা জানালার দিকে চেয়ে থাকে।
অফিস যাওয়ার আগে ইলহাম মির্জা স্ত্রীর মুখোমুখি গিয়ে বসলো। কিছুক্ষণ স্ত্রীর মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ইলহাম বলে,“ওকে আনা হবে রিতু। আমি নিজে প্রেয়ার দেবো গিয়ে।”
রিতু উদাস মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলে,“আমি কারো আসার অপেক্ষায় নেই। বোনের বিয়ে খাওয়ার দরকার নেই ওর।”
ইলহাম ম্লান হেসে উঠে দাঁড়ায়। এদিকে মা-ছেলেতে মান অভিমান,ওদিকে বাবা-মেয়েতে মান অভিমান। কি যে হচ্ছে এ বাড়িতে!
মির্জা বাড়িতে যা-ই হোক না কেন, আহসান পরিবার হাসিখুশি। প্রনমি সকালে গুনগুন করে গান করেছে। প্রেরণার বুক থেকে বড় একটা বোঝা নেমে গিয়েছে। ধীরে ধীরে বোনটাকে তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দিতে হবে। দু'হাতে দশ কাজ সামলাতে হচ্ছে প্রেরণার। রেস্তোরাঁ, কেটরিংয়ের বিজনেস, ভাইয়ের বিয়ের রিসেপশন। ছোট পরিসরে আয়োজন হবে, মধ্যম মানের একটা কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করে, এবং কেটরিং সার্ভিস তার নিজের কোম্পানি দেবে। ওহ হ্যা, পাঠকদের জানাতে ভুলে গিয়েছি। প্রেরণার বাচ্চা কোম্পানির নাম,“প্রেরণা কেটরিং সার্ভিস।”
প্রিতম খুব ব্যস্ত তার কাজ নিয়ে, দু'টো ক্লায়েন্টের ঝামেলা সামলে দিতে পারলে লাখ তিনের একটা চেক পাওয়া যাবে। সামনে অনুষ্ঠান। শশুরের গোমড়া মুখটা কল্পনা করেই প্রিতমের গলা শুকিয়ে আসে। আর যাই হোক, এবারে সে শশুরের কাছে ছোটো হবে না, হবেই না।
_______
ঠিক সন্ধ্যা নাগাদ ইনশিরাহ তৈরি হলো মুঈনের মেসেজ পেয়ে। পাপার কার্ড আর পার্সটা নিয়ে নিচে নেমে মাম্মার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলে,“আসছি মাম্মা। মুঈন গেটের সামনে।”
আলো মেয়েকে দেখলো, আজ পরেছে একটা আলখাল্লার মতো সাদা রঙের ঢোলা প্যান্ট, আর একটা কালো টি-শার্ট। গলায় কোনো মতে একটা স্কার্ফ পেঁচিয়ে রেখেছে। একেবারেই উদ্ভট লাগছে। আলো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবে,এই মেয়ের কিচ্ছু হবার নেই আর। ঠিক নিজের জেদে অটল থাকে!”
আলো ভাবে সে তো এতোটাও জেদী ছিলো না, অন্তত কেউ কিছু বুঝিয়ে বললে সে বুঝতো। কিন্তু এই মেয়ে কার মতো হয়েছে? এই মেয়ে এমন হয়েছে কেন? এতো এতো এতো ত্যাড়া কেন?
পাশাপাশি হাঁটছে দুজন। মুঈন তেরছা নজরে ভবিষ্যৎ বধূর মুখটা দেখে নেয় কয়েকবার। ওরা ফুড লাউঞ্জ থেকে কফি খেয়ে কেনাকাটার জন্য বেড়িয়েছে এই মাত্র। এখন রিভানার এগারো তলায় শাড়ির শোরুমে এসেছে।
ইনশিরাহ জানেনা সে কি করতে চলেছে, শপিংয়ের নেতৃত্ব মুঈনই দিচ্ছে। তার পক্ষ থেকে সে নিশ্চুপ। শুরুতে তারা লেহেঙ্গা কুটির থেকে লেহেঙ্গার কিছু ইন্ডিয়ান কালেকশন দেখলো, লেহেঙ্গা দেখে ইনশিরাহর জ্বর এসে গেলো। মেয়েদের বিশ ত্রিশ কেজি ওজনের এই অদ্ভুত পোশাক টা তার অপছন্দের শীর্ষে। এই পোশাকটা রীতিমতো একটা অত্যাচার, এক কথায় এসব ঢং জাতীয় পোশাক। তার এখনই গা চুলকাতে শুরু করে অত ভারি কাজ দেখে।
মুঈন ইনশিরাহর অভিব্যক্তি বোঝে। মিষ্টি আন্টি তাকে এমনিও বলেছিলো শাড়িই নিতে,তবে মুঈন ভেবেছিল অন্যান্য মেয়েদের মতো এই পোশাকের দিকে ঝোক থাকবে ইনশিরাহর। আর এখানে সব এক্সক্লুসিভ কালেকশন। বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার রিম্পি আগরওয়ালের নিজস্ব কালেকশন।
শাড়ির শোরুমের স্টাফ একটার পর একটা শাড়ি দেখিয়ে চলেছে। ইনশিরাহ একইভাবে নিশ্চুপ। মুঈন এর আগে কখনো মেয়েদের শপিং করেনি তবুও সে সবগুলো শাড়ি ছুঁয়ে দেখছে, যেন সে খুব ভালো বোঝে শাড়ির ব্যাপারে! যেন সে প্রতিমাসে বৌকে নিজে শাড়ি কিনে উপহার দেয়!
সে প্রত্যেকটা শাড়িতে ইনশিরাহকে কল্পনা করে করে দেখছে। তবে বারবার তার চোখ আটকে যাচ্ছে কমলা রঙের শাড়ি গুলোতে। ইনশিরাহকে বললো,“কালার?”
ইনশিরাহ দুপাশে মাথা নেড়ে নিচুস্বরে বলে,“এনি কালার।”
মুঈন কি মনে করে একটা কমলা রঙের বেনারসীর দিকে তাকালো। একেবারে গাঢ় কমলা। টকটকে কমলা। হাত বাড়িয়ে মুঈন শাড়িটা ছুঁলো, মুহূর্তেই ইনশিরাহর শিল্পকলা একাডেমীর অনুষ্ঠানে কমলা শাড়ি পরিহিতা মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার।
ইনশিরাহর কাছে জানতে চায়,“ শাড়িটা কেমন। পছন্দ হয়েছে?”
ইনশিরাহ রোবটের মত বলে,“জি হয়েছে।”
তারা এসেছে মূলত আকদের শাড়ি আর শেরওয়ানি নিতে। এটা বড়দের পরিকল্পনা দু'জনকে একসাথে কিছুক্ষণ রাখার। বাকি শপিং বড়রা দেখবে। মুঈনের তরফ থেকে তার বৌয়ের শপিং পরী করবে বলে ঠিক হয়েছে।
শাড়ির শোরুম থেকে বেরিয়ে ইনশিরাহ সামিনের কার্ডটা বের করে মুঈনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,“মাম্মা আপনাকে দিতে বলেছে, আপনার শেরওয়ানি....।”
মুঈন একপলক ইনশিরাহর দিকে তাকায়,এক পলক তাকায় ইনশিরাহর হাতের দিকে। অতঃপর নম্রস্বরে বলে,“তুমি পছন্দ করে দেবে না ইনশিরাহ?”
_______
ক্যাব থেকে নেমে দাঁড়ালো ইনশিরাহ। ঘুরে দাঁড়িয়ে মুঈনকে বললো,“আপনি ভেতরে আসবেন?”
_শশুর বাড়িতে বিয়ের আগে এতো ঘনঘন যেতে নেই।
সরল জবাব মুঈনের। তারপর ইনশিরাহকে বললো,“ভেতরে যাও।”
ইনশিরাহ কথা না বাড়িয়ে গেটের ভেতর পা রাখে। ভেতরে না যাওয়া অবধি মুঈন ক্যাবে অপেক্ষা করছিল।
অন্দরমহলে পা রাখার সাথে সাথে কয়েকজোড়া কৌতুহলী দৃষ্টি ইনশিরাহকে ঘুরে ঘুরে দেখছিলো। সবার প্রথমে ছিলো আলো, মেয়ের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল,“হয়েছে কেনাকাটা?”
জবাব না দিয়ে হাতের শপিং ব্যাগটা মাম্মার হাতে দিয়ে দেয় ইনশিরাহ। আলো সাথে সাথে বলে,“মুঈনের শেরওয়ানি তুমি পছন্দ করে দিয়েছো তো?”
এখন একটু বিরক্ত লাগছে ইনশিরাহর। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,“জি।”
_সত্যি করে বলবে। ওখানে তোমাদের পাঠানো হয়েছে দুজন দুজনের পছন্দের পোশাক কিনতে।
ইনশিরাহ মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,“মিথ্যা বলবো কেন?”
_বলতেই পারো।
আরো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো ইনশিরাহ। পর পর পার্স থেকে ফোনটা বের করে মুঈনকে কল দেয় সে। বাড়ির সবাই অবাক। মুঈন কলটা রিসিভ করলে ইনশিরাহ লাউড স্পিকার অন করে মুঈনকে জিজ্ঞেস করে,“মুঈন আপনার শেরওয়ানি কে পছন্দ করে দিয়েছে?”
মুঈন পথে ছিলো। অবাক হয়ে উত্তর দেয়,“তুমি! কেন!”
_এমনি।
ফোন কেটে দিয়ে ইনশিরাহ আলোকে বলে,“শুনেছো? পেয়েছো শান্তি?”
আলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে। ইনশিরাহ বেনারসীর প্যাকেটটা ফেলে রেখে ধুপধাপ আওয়াজ তুলে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে ওঠে। পরী আলোর দিকে কপাল কুঁ'চ'কে তাকিয়ে বলে,“বড্ড বাড়াবাড়ি করো তুমি মেয়েটার সাথে।”
আলো কিছু বলেনা, হঠাৎ করে তার ফোনটা বেজে উঠলে সে দেখে মুঈন কল দিচ্ছে। আলো কলটা রিসিভ করে। মুঈন বলে,“ইজ এভরিথিং ফাইন আন্টি? আপনি ইনশিরাহকে কিছু বলেছেন?”
আলো হাসে হবু জামাইয়ের কাণ্ড দেখে। অফিসার ঠিক আন্দাজ করে নিয়েছে। ঐ প্রসঙ্গে না গিয়ে আলো বলতে লাগলো,“মুঈন। চিন্তা হয়, মেয়েদের ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে, মেয়েরা নাকি পানি। তাকে যেমন পাত্রে রাখা হয় সে তেমন আকার ধারণ করে। কিন্তু মুঈন আমার মেয়েটি অমন নয়। ও নিজের জীবনের কিছু ছক নিজে নির্ধারণ করে নিয়েছে, ও আপোষে বিশ্বাসী নয়। মা হিসেবে একটু চিন্তা হয়। তাই এমন করি। আমার মেয়ে পানি নয় মুঈন।”
ওপাশে মুঈন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,“আন্টি আপনার মেয়েও পানি।”
আলো অবাক হলো, মুঈন বলতে লাগলো, “আপনার মেয়েও পানি, তবে এক টুকরো বরফ খন্ড আন্টি। যে ধীরে ধীরে গলবে।”
আলো চুপ করে শুনলো মুঈনের কথা। ঠোঁটে ফুটে উঠলো হাসি। মুঈন কলটা কেটে দিলে এগিয়ে গিয়ে আলো শপিং ব্যাগটা হাতে তুলে নেয় বেনারসী দেখবে বলে। তার হবু জামাইয়ের পছন্দ কেমন সেটাই দেখবে।
বেনারসীটা হাতে নিয়ে আলো কিছুক্ষণ থ'ম'কে দাঁড়িয়ে থাকে। বেনারসীর রং টকটকে কমলা। কমলা সামিনের অপ্রিয় রং, তবে কমলা শাড়িতে আলো তার খুব প্রিয়, বরাবরের প্রিয়!
কমলা শাড়িতে তার মেয়েও কি তার মেয়ে জামাইয়ের কাছে খুব প্রিয় হবে?
_______
সেদিন রাতে ইনশিরাহ মাথা ব্যথার কারণে ঘুমাতে পারলো না। শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়েও কাজ হয়নি। মাথা ব্যথা কমছেই না। ভোরের আলো যখন প্রস্ফুটিত হলো তখন মির্জা বাড়িতে হৈচৈয়ের শব্দে বিছানা ছাড়ল সে। মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে তার। কৌতুহলী হয়ে সে ঘর থেকে বেরিয়েই মুখোমুখি হলো সামিনের। সামিন মেয়ের দিকে একপলক তাকিয়ে নিচে নামলো। ইনশিরাহও নামলো। বাবা মেয়েতে শীতল অভিমানের পাহাড়। ইনশিরাহ পাপার সাথে নিজের সম্পর্কের অধঃপতন চেয়ে চেয়ে দেখে প্রতিদিন। ইনশিরাহর ইচ্ছে করে পাপার স্মৃতি থেকে সেদিনের ঐ মুহূর্ত গুলো ভ্যানিশ করে দিতে। কিন্তু এমনটা হবে না কখনো।
নিচতলায় গিয়ে ইনশিরাহ ভীষণ রকমের অবাক হয়। লিভিং রুমে তার দুই মামীকে দেখে বিস্ময়ে বাকহারা সে।
আজানের স্ত্রী মারিয়া ছুটে এসে ইনশিরাহকে জরিয়ে ধরে। ইনশিরাহ অস্ফুটে বলে,“তোমরা! তোমাদের না কাল আসার কথা?”
আটত্রিশের সুন্দরী রমণী মারিয়া হেসে বললেন,“সারপ্রাইজ!”
ইনশিরাহ তার মারিয়া মামি,সোফিয়া মামি দু'জনকেই পছন্দ করে ভীষণ। সোফিয়া কানাডিয়ান। তবে চৌদ্দ বছরের সংসারে বাঙালির সাথে থেকে থেকে নিজেকে খুব সুন্দর মানিয়ে নিয়েছে।
আলো ব্যস্ত তার ভাইপো আর ভাইঝিকে নিয়ে। ভাইপো দুটোকে জরিয়ে ধরে এ গালে ওগালে চু'মু খাচ্ছে সেই তখন থেকে। বাঙালি ফুপুরা ভাইঝি ভাইপোগুলোর মাঝে সবসময় নিজের বাবা মায়ের প্রতিচ্ছবি খোঁজে। আলোও ব্যাতিক্রম না, সব কিছু রেখে সে ভাইঝি ভাইপো দুটোকে নিয়ে বসেছে, আদর দিতে দিতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে আতাউর আলম আর রেহেনার নাতি নাতনিদের।
_______
এদিকে ইনায়ার রিসিপশনের কেনাকাটা আশি শতাংশ হয়ে গিয়েছে। বাড়ির বৌয়েরা নিজেরা গিয়েই কেনাকাটা করেছে। ওদিকে প্রেরণা একা হাতে সবটা সামলাচ্ছে তাদের পক্ষের।
অনুষ্ঠান দু পক্ষ থেকেই ধুমধাম করে হবে।
আগামী বিশ তারিখে অনুষ্ঠান,আজ দশ তারিখ। এখনও মেলা দেড়ি। তবে বিয়ে বিয়ে আমেজ চারিদিকে।
ইনায়া আর প্রিতম দু'জন এমন সুখ সুখ দূরত্বটুকুও সইতে নারাজ। খুবই কষ্টে আছে দুজনে,এদের মুখ দেখলে এটাই মনে হয়।
আজ সকালে বাড়িতে প্রেরণা এসেছিল, আজকাল একটা বিয়েই চার পাঁচ ধাপে সম্পন্ন হয়। তাই সেটার স্কেজিওল নিয়ে আলোচনা করতে চায় প্রেরণা।
ভীষণ রোগা লাগছিল প্রেরণাকে, মুখ শুকিয়ে আরো কমবয়সী লাগছে। গলার বিউটিবোন স্পষ্ট। আগে একটু ভরাট ছিলো । আলো প্রেরণাকে দেখে হাসে আর বলে,“একা হাতে ভালোই পারছো। আমরা তিন বৌ,আর আমার দু'জন ভাইয়ের বৌ। মানে পাঁচজন মিলে শপিং করলাম তবুও পারলাম না সব করতে। এই এযুগের ট্রেন্ডি ম্যারেজ সেরিমনিতে কতো ঝক্কি! তোমার এলেম আছে মা। তা তোমার বিজনেস কেমন চলছে?”
প্রেরণা গুছিয়ে বসে বিজনেসের আলাপ পাড়ে। আলো মুগ্ধ হয়ে শোনে,দেখে। একসময় সেও তো কতো দৌড় ঝাঁপ করতো,দ্রীপ্তর জন্মের পরে সবকিছু থেকে গুটিয়ে নিয়েছিলো নিজেকে।
এই মেয়েটিকে আলোর দারুণ পছন্দ। একজন নারীর চরিত্রে যেটুকু নীতি থাকার প্রয়োজন, এ যুগে প্রেরণা তা ধরে রাখতে পেরেছে।
এযুগে প্রেরণাদের মতো সাদামাটা নারীরাই আধুনিকতার সঠিক উদাহরণ।
ইহানের জন্য এমন একটা মেয়ে পেলে দারুণ হতো, এ বাড়ির বৌ হিসেবে এমন মেয়েই দরকার। কিন্তু খুঁজে পায়না আলো। দুয়েকটা পেলেও তার বয়স দেখা যায় কম। ইহান তখন রাজী হয়না।
প্রেরণা আলাপ সেরে কুটুম বাড়ি থেকে বিদায় নেয়। আলো ভাইয়ের বৌ আর ভাইপো ভাইঝিদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরে।
ইনশিরাহর ঘরে উঁকিঝুঁকি মারে না তেমন একটা এখন আর। মেয়ের মনে পরিবর্তন আসছে ভেবে একটু স্বস্তি পায় আলো। সবথেকে বড় স্বস্তি মুঈন তার গুণধর মেয়ের সত্যিটা জেনেই এগিয়েছে, মুঈন বুঝদার ছেলে, আশা করা যায় সবকিছু সুন্দরভাবে সামলে নেবে।
সারাদিন হৈ হুল্লোড় লেগে থাকে বাড়িতে। আজানের ছেলে মুয়ীজ এবং মুগ্ধ ভীষণ দুষ্টু,চঞ্চল। তবে পাঁচ মিনিট পর পর দু'টোর মাঝে বিশাল যুদ্ধ লাগে। এদিকে আয়াতের মেয়ে আরিশা খুবই শান্ত।
বাড়ির সবাই ওদের তিনজনকে খুব উপভোগ করে। অনেকদিন পরে বাড়িটা হেসে খেলে উঠেছে।
ইনায়া ভীষণ ব্যস্ত নিজের রিসেপশনের মেকোভার নিয়ে ভাবনা ভাবতে। এটা আসলেই খুবই চিন্তার বিষয় একটা মেয়ের কাছে।
বিকেলে ইনায়া ঘর থেকে বেরোয়। বাড়ির সবাই ছাদে ব্যস্ত আড্ডায়। মহিলা পাঁচজন একসাথে হয়েছে আর আলোচনা সভা হবে না তা কি করে হয়!
ইনশিরাহর ঘরের কাছে এসে থামে ইনায়া। গতকাল রাতে শেষ একবার কথা হয়েছিলো আপুর সাথে। তারপর আপুকে দেখেনি সে। আজ সকাল থেকে দেখেনি। আপু কারো সাথে মেশে না,তাই বিরক্ত করা হয়না আপুকে।
একবার উঁকি দিলো ইনায়া, ডাকলো,“আপু।”
ভেতরে কেউ নেই। ইনায়া কোথাও খুঁজে ইনশিরাহকে পেলো না। ইনশিরাহর ফোন নেই, ট্রাভেল ব্যাগটা বিছানার ওপর এলোমেলো করে রাখা।
ইনায়া নিচে নামলো, বাড়ি ফাঁকা। এখানেও পেলো না ইনশিরাহকে। পুল সাইডে গিয়েও পেলো না। ভীষণ চিন্তিত ইনায়া ফোন বের করে ইনশিরাহকে কল লাগায়। ফোনটা আনরিচেবল বলছে।
একটা ফাকা ঢোক গিলে আবারও তন্নতন্ন করে ইনায়া খুজে দেখে সব ঘর।
একটা অজানা আতঙ্ক ভর করেছে তার মনে। কাউকে কিছু না বলে ইনায়া ছুটে গেলো বড় মায়ের কাছে। ধুপধাপ শব্দে সিড়ি ভেঙে ছাদে উঠে বড় মায়ের দিকে তাকিয়ে চেঁ'চি'য়ে বলে,“আপুকে কোথাও পাচ্ছিনা বড় মা।”
চলমান......