ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 52

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৫২ [ ১ম অংশ ]
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

[ ১ম অংশ ]

আলো প্রথমে শুনতে পায়নি ইনায়ার চিৎকার। যখন শুনতে পেলো তখনও ঠিক বুঝতে পারেনি ইনুর কথাটা।

ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে আলো। তার দুপাশে বসে থাকা রিতু,পরী,মারিয়া এবং সোফিয়া তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায়।

আলো তবুও চেয়ারে ঠেসে বসে আছে। ইনুর ফরসা মুখটা লালাভ হয়েছে দৌড়াতে দৌড়াতে। আলো অস্ফুটে শুধোয়,“কি হয়েছে?”

ইনুর গলা কাঁপছে, ঢোক গিলে বলে,“আপু নেই বড় মা।”

ইনশিরাহ নেই। ইনশিরাহ সত্যিই কোথাও নেই। ইনশিরাহর নাম্বারটা বন্ধ। গেটের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করতে গিয়ে দেখা গেলো গতকাল থেকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অফ হয়ে আছে।

আলো ঠকঠক করে কাঁপছে। পরী নিজেও শারীরিক ভাবে অতটা স্টেবল না এখনও, এক প্রকার জোর করেই চেম্বারে বসা হয়। ছুটে এসে আলোকে ধরলো। পরীকে সরিয়ে মারিয়া আর সোফিয়া আলোকে ধরলো।

ইনু হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রিতু ধ'ম'কে বলে,“শিগগির ওর বান্ধবীদের ফোন লাগা।”

ইনু কাঁপা কাঁপা হাতে এক এক করে আপুর বান্ধবীদের, আপুর পরিচিত ক্লাসমেট, পরিচিত স্বজন,জামিল, তৌফ, রাহাত, সবাইকে ফোন করে সুকৌশলে জানতে চাইলো ইনশিরাহর কথা। কোথাও না কোথাও তো যেতে পারে। কিন্তু সবার থেকেই না বোধক উত্তর এলো।

ইনায়া করুণ দৃষ্টি দিলো বড় মায়ের দিকে। আজ থেকে দেড়মাস আগে যে ব্যাথা সে মাম্মা পাপাকে দিয়েছে, আপুও তবে একই পথে হাটলো অবশেষে? আর মুঈন ভাইয়া! সে তো কোন দোষ করেনি! তবে তাকে মাঝখানে কেন ঢোকালো আপু!

নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়। অতকিছু ভাববার সময় কই! সে ছুটে গেল বড় মায়ের কাছে। আলো দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না আর। দুলতে দুলতে বসে পরলো, ক্ষীণ স্বরে বিড়বিড়ালো,“এসব কিছু যেন না হয়। ঐ মানুষটা সইতে পারবে না। এসব কিছু যেন না হয়! আমি ঐ মানুষটাকে কিভাবে সামলাবো তবে!”

ইনায়া আর কালবিলম্ব না করে ইহানকে কল দেয়। ইহান একটা সালিশে ছিলো। মাঝখান থেকে উঠে বোনের কলটা রিসিভ করতেই এপাশ থেকে ইনায়া কেঁদে ফেলে, বলে,“আপু কোথাও চলে গিয়েছে দাদান!”

ইশমাম খবরটা পেয়ে ছুটে এসেছে। তখন সন্ধ্যা পেরিয়েছে। আলোকে সামলাতে পারছিলো না কেউ। কাঁদতে কাঁদতে মুর্ছা যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে। বুক চাপড়ে আহাজারি করছে শুধু, বলে যাচ্ছে,“ঐ মানুষটাকে আমি কিভাবে সামলাবো।”

রিতু চাইলো সামিন আর ইলহামকে ফোন দিতে। ইশমাম বাঁধা দিলো,“না এখনই নয়। আগে আমরা দেখি। আর কিছুক্ষণ দেখি।”

আর কিছুক্ষণ দেখেও কোনো লাভ হলো না। পেলো না ওরা ইনশিরাহর নাগাল। সন্ধ্যা পেরিয়ে সময় রাত নামিয়ে আনছে, অন্ধকার ভয়ংকর হচ্ছে, ভয়ংকর ভাবে বাড়ছে আলোর দুঃখ, অসহায়ত্ব, গ্লানি।

ইহানের যখন খুব অস্থির লাগে সে গাড়ির গতির কথা মাথায় রাখে না
। দেদারসে গতি বাড়িয়ে ছোটায়। তবে আজ তার মধ্যে তাড়াহুড়ো নেই, কেমন নির্জীব হয়ে বসে আছে ড্রাইভিং সিটে। ফোনটা পেয়ে ইহান প্রথমে ইনুকে খুব বকা ঝকা করেছে, যখন ওপাশ থেকে আলোর আহাজারি শুনলো, তখন সে বুঝলো খুব বড় একটা অঘটন ঘটে গিয়েছে। ইহান বাড়িতে ফিরলো না, ইনুকে শান্ত স্বরে বলেছিল,“আমি ফোন না করা পর্যন্ত বাইরের কোনো লোকের কাছে টু টা সাউন্ড করবি না!”

সেই থেকে পাগলের মতো খুঁজে চলেছে ইহান বোনকে, প্রত্যেকটা বান্ধবীর বাড়িতে খোঁজ নিয়েছে নানা বাহানায়, গিয়েছে ইনশিরাহর পছন্দের যায়গা গুলোতে।

শুরুতে যতটা তাণ্ডব করেছে ইহান, এখন যারপরনাই শান্ত সে। অনুভূতি ভোঁতা হয়েছে, বোনের উপর রাগ করবে নাকি মায়া করবে বুঝতেই পারছে না ইহান। ইনুর ঘটনা খুব সুন্দর ভাবে সামলে নেয়া গিয়েছে। কিন্তু ওরা যে ভুঁইয়া!

আরও কিছুক্ষণ নিউমার্কেট এরিয়ার মসজিদের সামনে গাড়ি থামিয়ে বসে ছিল ইহান। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় আশেপাশে তাকাচ্ছে। তার মস্তিস্কও কাজ করছে না। চলতি পথে লোকের ভিড়ে উদ্ভ্রান্ত দু'টো চোখের দৃষ্টি এমন ভাবে নিক্ষেপ করছে যেন ইনশিরাহকে এখনই পেয়ে যাবে।

ইলহামের সাথে কারখানার একটা শিপমেন্টের ব্যাপারে আলোচনা করতে করতে বাড়ির আঙিনায় গাড়িটা প্রবেশ করালো সামিন। আজ সেজন্যই একটু যা দেরি। বাড়ির এরিয়ার সোডিয়াম লাইট গুলো জ্বালা হয়নি দেখে বিরক্ত হলো সামিন,ইলহাম । গৃহকর্ত্রীদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা নিয়ে দুয়েক লাইন বললো দুই ভাই-ই।

তারপর খোশমেজাজে যখন অন্দর মহলে পা রাখলো তখন শুধু হতবিহ্বল দৃষ্টি দিয়ে দেখেই যাচ্ছিলো সবাইকে। আলো মুখে শাড়ির আঁচল চে'পে স্বামীর দিকে তাকিয়ে আছে। দু'চোখ বেয়ে দরদর করে পানি ঝরছে। ঠকঠক করে কাঁপছে সে, এখন? কি হবে! কি করবে! দিশা খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়।

ইহান কোথায়, ফোন ধরছে না কেন! পরী আর রিতু এক কোণে গিয়ে ছটফট করছে।

সামিন হতভম্ব হয়ে এগিয়ে যায় স্ত্রীর কাছে, ভারী আওয়াজে বললো,“কি হয়েছে? শরীর খারাপ?”

আলো যেন আছড়ে পরলো সামিনের গায়ে মুহুর্তেই। কেঁদে কেটে অস্থির হওয়া একজন মা খুব দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে তার স্ত্রী সত্তায় ফিরে স্বামীকে অনুরোধ করলো,“প্লিজ আপনি সুস্থ থাকেন। প্লিজ!”

সামিন কিছুই বুঝতে পারছে না। ইলহাম সবাইকে ধ'ম'কে বলে,“আরে কেউ বলবে হয়েছে টা কি!”

________

ইহান ভুঁইয়া ম্যানশনের গেটের কাছে এসে গাড়ির গতি শ্লথ করে। নিউ মার্কেট থেকে এখানে, প্রায় দুই কিলোমিটার দূরত্ব। এই দুই কিলোমিটার দূরত্ব ইহান চোখের পলকে শেষ করেছে যেন। যখন এখানে আসার সিদ্ধান্ত টা সে নিয়েছে, তারপর থেকে না কোন কিছু ভেবেছে, না মাথায় এনেছে। মাথায় শুধু বোনের জন্য দুশ্চিন্তা ছিলো। ছিলো প্রাণের পরিবারের প্রতি উদ্বেগ।

গাড়ি থেকে নেমে ইহান লম্বা কদমে গেটের কাছে গিয়ে শান্ত স্বরে সিকিউরিটিকে বললো,“দরজা খুলুন।”

ইহানের বলার ধরণেই সিকিউরিটি ঘাবড়েছে। সে ইন্টারকমে কল করে বলে,“স্যার ইহান তাজওয়ার এসেছে।”

সাগর ভুঁইয়া বাড়িতে ছিলেন। ইহানের নাম শুনেও অবাক হলো। কত বড় কলিজা আজ বাড়িতে এসেছে! সাগর সিকিউরিটিকে বললো,“একা থাকলে আসতে দাও।”

মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শুরুতেই ইহান তার স্বভাবের শান্ত ভাব বজায় রেখে বললো,“আপনার ছেলে কোথায়।”

_আমার ছেলেকে দিয়ে কি কাজ!

ইহান এগিয়ে গেলো দুকদম। অমন সৈনিক মার্কা পেটানো দানবীয় শরীরের হম্বিতম্বি কিছুটা হলেও ভড়কায় সাগর ভূঁইয়াকে। সে দুকদম পিছিয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে বলে,“বাড়িতে ঢুকে মাফিয়া গিরি! আমি পুলিশ ডাকবো। তোমার নেতা গিরি বার করে দেবো।”

_তোর ছেলে কই?
ক্ষ্যাপাটে হয়ে বলে ইহান।

সাঈম দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে উঁচু গলায় বলে,“স্টপ! পাপার সাথে উল্টোপাল্টা নয়,নয়তো আমি ভদ্রতা ভুলে যাবো।”

ইহান সাগরের থেকে ঘুরে সাঈমের দিকে তে'ড়ে এলো হাতা গুটিয়ে, “যাস্ট গো টু দ্য হেল উইদ ইয়র ভদ্রতা! আমার বোন কই স্কাউন্ড্রেল!”

গর্জে উঠলো ইহান, ভীষণ ক্রোধান্বিত। আগ্নেয়গিরির লাভা ঝরছে দৃষ্টি থেকে।

সাঈম ভীষণ অবাক, অবাক হয়ে ইহানের দিকে তাকিয়ে বলে,“ইনশিরাহ! হোয়্যাট হ্যাপেনড টু হার!”

_নাটক বন্ধ! আমার বোনকে ম্যানিপ্যুলেট করেছিস না তুই? এই শোন! শিগগির বল আমার বোন কই! বল! বল! তিন সেকেন্ডের মধ্যে বলবি!

________

সামিন একটা সোফাতে বসে আছে। আলো কাঁপা হাতে সামিনের গলা টাইয়ের বাঁধন থেকে আলগা করে। কোটের বোতাম খুলতে খুলতে কাঁদে,“প্লিজ আপনি শক্ত থাকেন। দোহাই আপনার!”

ইলহাম চেনা পরিচিত জায়গা গুলোতে আবারও কল দেয় এক এক করে, সু কৌশলে জানতে চায় ইনশিরাহর কথা। ইশমাম তাকে বাধা দিয়ে বলে,“আর দিও না কাউকে ফোন মেজো ভাইয়া। লোকজন সন্দেহ করবে!”

আলো ডুকরে কেঁদে ওঠে,“আর লুকিয়ে কি হবে ইশমাম? সকাল হবে। লোকজন জেনে যাবে সামিন ইয়াসার মির্জার মেয়ে ভেগে গিয়েছে। বিয়ে ভে'ঙে,বাপের মুখে চুনকালি মেখে ভেগে গিয়েছে।”

হাতের শপিং ব্যাগ গুলো খুব সাবধানে সামলে ক্যাব থেকে নেমে দাঁড়ায় মুঈন। হাত ঘড়িতে সে সময় দেখে। রাত নয়টা। তার হাতে যে শপিং ব্যাগ গুলো, এগুলো তার শশুর বাড়ির লোকের জন্য প্রি ওয়েডিং গিফটস। ডিউটি শেষ করে, গতকাল সব কিনে ফেলেছিল।‌তবে দেয়া হয়নি। আজ ডিউটি শেষ করে দেরি না করেই গিফট গুলো দিতে এলো সবাইকে। তার তরফ থেকে কেউ নেই এসব করার। মুঈন চেষ্টা করে নিজেই সবটা গুছিয়ে নিতে। বন্ধু এবং বন্ধুপত্নীদের থেকে জেনে নিয়েছে একজন “গ্রুমের” দায়িত্ব কর্তব্য, সামাজিকতা , টুকিটাকি অনেক কিছু। নিজের সময় এবং সাধ্যের সমন্বয় রেখে করে যাচ্ছে সে সব।

গেট পেরিয়ে, বিশালাকার আঙিনা পেরিয়ে সদর দরজা পর্যন্ত এসে মুঈন থামলো। সদর দরজা খোলা। সে তবুও কলিং বেল টিপলো। ছুটে এলো ইনায়া। বাকিরা সবাই দাঁড়িয়ে গিয়েছে। সবার চোখে মুখে উৎকণ্ঠা।

ইনায়ার মাথায় যেন বজ্রপাত পরলো এই মুহূর্তে মুঈনকে দেখে । মুঈন হেসে বললো,“হাই ইনু।”

মুঈনের কন্ঠস্বর শুনে সবাই কথা হারিয়ে ফেলল। মুঈন ইনায়াকে বললো,“ভেতরে আসতে দেবে না?”

রোবটের মতো সরে দাঁড়ায় ইনায়া। বাকিরা তাকিয়ে আছে স্থির হয়ে। মুঈন ভেতরে ঢুকলো।‌ পায়ের গতি কমে আসলো মানুষ গুলোকে দেখে। আলোর চোখে পানি,সামিন বসে আছে অসুস্থের মতন। বাকিরা চেয়ে আছে বিমূঢ় দৃষ্টিতে। মুঈন আরও তিন কদম এগোলো, কন্ঠস্বর গম্ভীর করে বললো,“হোয়্যাট হ্যাপেনড! কেউ অসুস্থ? সামিন বাবা! আপনার কি হয়েছে!”

_______

সাঈম হতভম্ব দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ইহানের দিকে। ইহান বলতে থাকে,“আমি যদি টের পাই এসবের পেছনে তোমার হাত আছে। তাহলে......”

_আরে আমার ছেলের বয়েই গিয়েছে তোমার ঐ হাফলেডিস বোনকে ভাগিয়ে নিতে। দেখো নতুন কার সাথে ভেগেছে। তোমাদের বাড়ির ছোটো মেয়েটা তো বিশ বছরেই ইচরে পাকা,ভেগে টেগে একশেষ করেছে!

সাঈম সাগরের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে বলে,“স্টপ পাপা!”

তারপর ইহানের দিকে ফিরে বলে,“সেদিনের পর থেকে ইশির সাথে....

_ডোন্ট কল হার ইশি....

শাসায় ইহান। সাঈম বলতে থাকে,“সেদিনের পর থেকে ইনশিরাহর সাথে কোন যোগাযোগ হয়নি,করিনি। ইউ ক্যান চেক। ইউ ক্যান ফাইল আ কেস, দেন পুলিশ তদন্ত করুক। আমার ওকে ম্যানিপ্যুলেট করার ইচ্ছে নেই....”

_সেটা তো ছয় বছর ধরে করেছিস!
সাঈমের কলার চে'পে বললো ইহান।

_আপনি তুই তোকারি করবেন না। যান থানায়।
ইহানের হাত থেকে নিজের কলার ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলল সাঈম।

বাপ ছেলের দিকে তীব্র ক্ষোভ নিয়ে আরও একপলক তাকিয়ে, ইহান হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে যায় ভুঁইয়া ম্যানশন থেকে। গাড়ি স্টার্ট করে দেদারসে গতি বাড়িয়ে ছুটতে থাকে শান্তিনীড়ের উদ্দেশ্যে।

_______

মুঈন তাকিয়ে আছে হতবাক দৃষ্টি মেলে। থানার খিটখিটে অফিসারটির কপালে ঘাম ফুটে উঠলো। তার হতবিহ্বল দৃষ্টির দিকে সরাসরি তাকাল না কেউ। মুঈন একপলক সবার দিকে তাকায়, একপলক হাতের ফোনটার দিকে। মনে পরে আজ সারাদিনে অসংখ্য বার্তা সে ইনশিরাহকে পাঠিয়েছে অথচ সেগুলো পৌঁছায়নি।

আলো কাঁদছে, মুঈনের দিকে না তাকিয়ে কেঁদে কেঁদে বলছে,“আমাদের ক্ষমা করো বাবা! তোমার সময়,সম্মান নষ্ট করার ইচ্ছে আমাদের ছিলো না। ক্ষমা করো।”

মুঈন শান্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে গেলো,“আন্টি স্টপ! আগে আপনি আর সামিন বাবা ঠিক হোন।”

কথাগুলো বলে একটা ডিভানে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বসে পরলো মুঈন। এলোমেলো দৃষ্টি মেলে তাকায় সে, অস্থিরতা পা মাথা তাকে কব্জা করেছে। সে ফোনটা বের করে, আবার পকেটে ঢুকিয়ে নেয়। ফোনটা বের করে, আবার রেখে দেয়। তার খুব বেশি সময় লাগবে না ইনশিরাহকে ট্রেস করতে, তবে কেউ যদি নিজে থেকে হারায় তাকে খুঁজে পেয়ে কি লাভ? নিজের অনুভূতিকে অপমান করার জন্য তাকে খুঁজে লাভ নেই! কোনো লাভ নেই! মুঈন অসম্মানিত হতে চায়না!

রাত এগারোটা নাগাদ ইহান বাড়িতে ফিরলো দলের কিছু ঘনিষ্ঠ ছেলে নিয়ে শহরে চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে। এখন শুধু আইনগত ভাবে একটা পদক্ষেপ নিতে হবে, বাড়ির বড়দের থেকে তার অনুমতি চাই।

বাড়িতে যখন ঢুকলো তখন মুঈনকে দেখে তার চক্ষু চড়কগাছ! বাড়ির সবার প্রতি তার ক্ষোভ জন্মাল। রিতুকে একপাশে টেনে নিয়ে বললো,“সবাই বুড়ো হচ্ছো আর আক্কেল বুদ্ধি সব চলে যাচ্ছে? ওকে কেন জানাতে গেলে এখনই? সময় তো চলে যাচ্ছে না!”

_ও নিজেই চলে এসেছে রে,আমরা কি করে লুকাই,ভাইয়া আর ভাবী ঠিক নেই। দেখছিস না!

সামিন এখন পর্যন্ত একটা কথাও বলেনি ,সে ইহানের দিকে তাকায়। অমন অসুস্থ মানুষটাকে দেখে ইহানের বুক কাঁপে। কন্ঠে নমনীয়তা নিয়ে বলে,“বড় বাবা, ইশিকে পেয়ে যাবো আমরা। হয়তো ও ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়েছে। মন ভালো করতে।”

এই বুঝ কে নেবে? আলো তখন কন্যা শোকে উন্মাদ প্রায়। বুক চাপড়ে চেঁ'চি'য়ে ইহানকে বলে,“আমাদের একটু রহম করলো না তোর বোন ইহান, একটুও না। আর ঐ ছেলেটা, মাঝখানে ওকে টেনে ওকেও ঠকালো। আমরা না হয় ব্যর্থ বাবা মা, আমাদের থেকে শোধ নিলো, ঐ ছেলেটা কি করেছে?”

_আন্টি আপনি থামুন। প্লিজ থামুন।
উঠে দাঁড়ায় মুঈন। বাড়ির প্রত্যেকের মুখের দিকে তাকিয়ে আলোর দিকে তাকায়, শান্ত ভঙ্গিতে বলে,“ইশির খোজ এনে দিলে শান্ত হবেন?”

আলো কিছু বলে না, সামিনও না। মুঈন তখন মিনিট খানেক চিন্তা করে সিদ্ধান্তটা নিলো। তারপর ফোন বের করে সে। ইহান তাকিয়ে আছে মুঈনের হাতের দিকে। বাড়ির প্রত্যেকেই চুপচাপ। শান্ত পরিবেশ। আজানের দস্যি ছেলে দুটোও চুপ। নিস্তব্ধতা কাটিয়ে হঠাৎ একটা ক্ষীণ আওয়াজ তাদের প্রত্যেকের কানে যায়।

ওপর থেকে কেউ ডাকছে। কেমন একটা বেড়াল ছানার মতো আওয়াজ। হতে পারে ইনশিরাহর বেড়াল। তবে না, ওটা ইনশিরাহর বেড়াল ছানার ডাক না, ওটা ইনশিরাহ নিজেই। দোতলা থেকে দুলতে দুলতে সিঁড়ি ভাঙছিল মেয়েটা। ভীষণ বিধ্বস্ত লাগছে তাকে। একটা ট্রাউজার,আর গায়ে একটা রঙ চটা ওভারসাইজড টি-শার্ট ।‌চুল গুলো খোলা তবে উসকোখুসকো। হাই তুলতে তুলতে ক্ষীণ,ঘুম ঘুম কন্ঠে আবারও ডাকে,“মাম্মাহ!”

সবাই তাকিয়ে আছে বিমূঢ় হয়ে সিঁড়ির দিকে।

অফিসার মুঈন ফরাজী আপাদমস্তক তার বধূকে অবলোকন করে বোকা বোকা হেসে ধপ করে বসে পরে ডিভানে, নির্বাক সে।

ইনশিরাহ আরো নিচে নামতে লাগলো,হাই তুলতে তুলতে বলতে লাগলো,“মাম্মাহ কফি!”

চলমান.....

[ দ্বিতীয় অংশের লিংক কমেন্টে ]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৫২ [ দ্বিতীয় অংশ ]
#ইসরাত_ইতি

[ ২য় অংশ ]
( ১ম অংশের লিংক কমেন্টে )

ওরা সবাই এ জগতে নেই। সামিন বুকে হাত চেপে ধরেই মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ইনশিরাহ চোখ ডলতে ডলতে নিচতলায় নেমে সবাইকে দেখে, দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেলে। মুঈনকে দেখে সে বিব্রত হয়। বাড়ির প্রত্যেকের দিকে তাকিয়ে সে ধীর স্থির জিজ্ঞেস করে,“হোয়্যাট! কি হয়েছে?”

ওরা কেউ ইনশিরাহর কথার জবাব না দিয়ে একযোগে চেঁচিয়ে ওঠে,“তুই কই ছিলি!”

শুধুমাত্র সামিন আর মুঈন চুপ করে আছে। পুরো ঘটনায় মুঈনের ভীষণ হাসি পাচ্ছে, কিন্তু পরিবেশটা হাসির নয়। সে দাঁতে দাঁত চেপে হাসি আটকে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে।

ইলহাম চেঁ'চি'য়ে ওঠে বাড়ির মহিলাদের ওপর,“বুদ্ধিভ্রস্ট হয়েছে সবার! সবার সাধারণ বুদ্ধিটুকুও শেষ। ননসেন্স। ননসেন্স। ননসেন্স!”

ইলহাম গণহারে সবাইকে বললো কথাগুলো। তার খেয়াল নেই বাড়ির হবু জামাই তাদের সামনে বসে আছে।

মুঈন মাথা নিচু করে চুপ করে বসে ছিলো,এর মাঝে একপলক ইনশিরাহকে দেখে আবারও চোখ নামিয়ে নেয় সে।

আলো ক্ষ্যাপাটে দৃষ্টি দিয়ে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলো, উঠে দাঁড়ায় সে। ইনশিরাহ বলে,“কি হচ্ছে মাম্মা?”

_তুই কোথায় ছিলি?
ঠান্ডা স্বর আলোর।

_ঘুমাচ্ছিলাম।
হাই তুলতে তুলতে জবাব দেয় ইনশিরাহ।

_কোথায় ঘুমাচ্ছিলি?

_ইরফানের বেলকোনির দোলনাতে।

_তোর ফোন কই?

ইনশিরাহ ভাবুক হয়ে পরলো, বিড়বিড় করলো,“আমার ফোন.....আমার ফোন.....আমার ফোন.... জানিনা তো মাম্মা কোথায় রেখেছি মনে পরছে না।”

আলো আর এক সেকেন্ডও থামতে পারলো না, গিয়ে মেয়ের চুল টেনে ধরে চেঁচাতে লাগলো,“তুই শুধরাবি না? শুধরাবি না তুই? কোনো জম্মে তোর আক্কেল হবে না?”

বাড়ির সকলে হতবাক। মুঈন এহেন দৃশ্য দেখে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায়। ইনশিরাহ ভীষণ ঘাবড়েছে,মাম্মার হাত থেকে নিজের চুল ছাড়িয়ে দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে ঠিক মুঈনের পেছনে গিয়েই দাঁড়ায়, তারপর কল্লা বের করে উকি দিয়ে ভীত চোখে মাম্মাকে দেখে আর চেঁচিয়ে বলে,“আমি করেছি টা কি একটু কেউ বলবে?”

কেউ জবাব দেয়না। আলো তে'ড়ে যায়। মুঈন মা মেয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। আলো বলতে থাকে,“তুই জানিস না? আমাদের সবার অবস্থা কি বর্তমানে? একটুও দয়া হয়না তোর? একটুও না?”

ইনশিরাহ আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছে না। মুঈন মা মেয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আলোকে বলে,“আন্টি শান্ত হোন। এখন তো উত্তেজিত হবার কিছু নেই।”

আলো কেঁদে ফেলল,“বাবা ,বাবা তুমি এই মেয়েকে বিয়ে করো না। করো না, তোমার জীবন নষ্ট করবে এই মেয়ে। এই ননসেন্স মেয়ে।”

মুঈন মাথা নিচু করে মুচকি হাসে আলোর কথায়।

ইনশিরাহ অভিমানী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এভাবে অপমান করছে তাকে। ভীষণ রাগ জমছে ইনশিরাহর।

চেঁচিয়ে বলে,“এখন আমি ঘুমাতে যাবো, ওয়াশরুমে যাবো সব বলে বলে যেতে হবে? একে তো মেহমান আসছে যাচ্ছে, একটু স্পেস পাচ্ছি না আমি। ফালতু সামাজিকতা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। গত এক সপ্তাহ ধরে আমি ঘুমাতে পারছি না। আমার কতটা দুর্বল লাগে বোঝো? তাই ডক্টরের প্রেসক্রাইব করা স্লিপিং পিলস দু'টো খেয়ে ইরফানের ঘরের বারান্দায় গিয়ে ঘুমাই,কারণ তোমাদের ঢাক ঢোলের শব্দে তো ঘুম হারাম। এটা আমার অন্যায়? হু? মানে আমি এখন নিজে নিজে নিঃশ্বাস নিলেও স্বার্থপরতা হয়ে যাবে? আমার ঔদ্ধত্য হয়ে যায়?”

মুঈন গম্ভীর গলায় ইনশিরাহর কথার জবাবে বললো,“এমনটা নয় ইনশিরাহ, আন্টি সেটা বোঝাতে চায়নি। তবে তোমার তো ইনফর্ম করে যাওয়া উচিৎ ছিলো! আন্টি চিন্তিত থাকে।”

আলো তে'ড়ে যায় মেয়ের দিকে,“তুই আয়! তুই আমার কাছে আয়। তোকে আমি আজ...”

আলো থাবা মেরে মেয়ের হাত ধরলে ইনশিরাহ ছাড়িয়ে নিয়ে পালাতে চাইলে পা পিছলে পরে যেতে নেয়। মুঈন শক্ত হাত ইনশিরাহকে আগলে ধরে। কেঁপে উঠলো ইনশিরাহ। চোখাচোখি হলো দু'জনের।

বাড়ির সবাই চোখ নামিয়ে নেয়। বাচ্চাগুলো চোখ বড় বড় করে দেখছে দৃশ্যটা। ইনায়া মিটিমিটি হাসছে। ইনশিরাহ এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সামিনের দিকে তাকায়। সামিন মেঝের দিকে দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে। ইনশিরাহ ঘুরে ইহানের দিকে তাকায়, চেঁচিয়ে বলে,“কি ভেবেছিলে? আমি পালিয়ে গিয়েছি? দাদান আর সবার কথা বাদ দিলাম, তুমিও এটাই ভেবেছো তাইনা? বলো, তুমি বলো তুমিও এটাই ভেবেছো, আই সোয়্যার দাদান আমি তবে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো।”

ইহান থতমত খেয়ে যায়। মনে পরে যায় ভুঁইয়া ম্যানশনে গিয়ে সে কি কান্ডটাই না করেছে। বোনকে মিথ্যা বলে ইহান,“না ইশি আমি এমনটা ভাবিইনি। আমিতো সবাইকে বোঝাচ্ছিলাম তুই কোনো কাজে বেরোতে পারিস।”

ইনশিরাহ মায়ের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, অভিমানী গলায় বলে,“আমি কার সাথে ভাগমো মাম্মা? কার সাথে? মানে এসব কথা তোমাদের ভাবার আগে একবারও মাথায় এলো না আমি কেমন? আমার এথিকস কি?”

বাড়ির সবাই খানিকটা লজ্জিত। ইহান প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে তার মা চাচীদের চেঁ'চি'য়ে বলে,“আচ্ছা আরেকটু ভালো করে তো খুজে দেখতে পারতে তোমরা! পারতে না? ইরফানের ঘর দেখেছো, ওর বারান্দায় দেখতে পারলে না? আচ্ছা এবার সত্যি সত্যি দেখছি সবাইকে পাগলা গারদ যেতে হবে ইনক্লুডিং মি,কজ তোমাদের এসব কাহিনী দেখতে দেখতে আমি আধা পাগল হয়ে গিয়েছি অলরেডি বড় মা!”

চোখ মুছছে ইনশিরাহ, ভীষণ অপমানিত হয়েছে আজ সে। মুঈন এবার বিপদে পরে গিয়েছে, এক পলক ইনশিরাহকে দেখে, একপলক আলোকে। এই পরিস্থিতিতে সে কি করবে বুঝতে পারছে না। তবে এটা বুঝতে পারলো তার শশুর বাড়ীর সব লোক ভীষণ অদ্ভুত। তার ধারণার থেকেও অদ্ভুত। ইনশিরাহর থেকে বাকিদের মুঈনের কাছে বেশি অদ্ভুত মনে হচ্ছে এই পরিস্থিতিতে।

আলো ঘুরে নির্লিপ্ত হয়ে বসে থাকা সামিনের দিকে তাকায়। তারপর একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ইহানকে বলে,“কে পাগলা গারদ যাবে। আর কে যাবে না। সে পরে দেখা যাবে। তুই আগে কাজী আন। ওদের বিয়ে পড়ানো হবে।”

কথাটা আলো বলেছে খুবই শান্ত স্বরে। শুনে হতভম্ব সবাই। ইহান হা করে তাকিয়ে আছে বড় মায়ের দিকে। মুঈন তার থেকেও বড় হা করে তাকিয়ে আছে হবু শাশুড়ির দিকে। ইনশিরাহ বিমূঢ় চেয়ে থেকে অস্ফুটে মা'কে বলে,“হোয়্যাট!”

ইনশিরাহর কথার জবাব না দিয়ে আলো ইহানের দিকে তাকিয়ে বলে,“আমি এতো টেনশন নিয়ে থাকতে পারবো না। দশ দিনের অপেক্ষার কাঁথা পুড়ি। ওদের আজ আকদ হবে, আজ রাতেই। তুই কাজী ডাক‌।”

মুঈন বোকার মতো একবার ইনশিরাহকে দেখে, একবার আলোকে, বলে,“আন্টি কাম ডাউন!”

_বাবা বিয়েটা করে রাখো, বৌ দশদিন পরে ধুমধাম করেই উঠিয়ে নিয়ে যাবে।

ইনশিরাহ চেঁচালো,“নেভার। পাগল হয়েছো? আমি আমার ভাইকে ছাড়া বিয়ে করবো না। বাড়াবাড়ি থামাও মাম্মা।”

_মেইন প্রোগ্রামের সময় ইরফান থাকবে। তুমি একটা কথাও বলবে না।
তেজ নিয়ে ইনশিরাহকে চুপ করিয়ে দেয় আলো।

এতক্ষণে সামিন মুখ খোলে,ধীর স্থির বলে,“আছিয়া বাড়াবাড়ি করার দরকার নেই। যাও গিয়ে রেস্ট নাও। তোমরা সবাই যে যার ঘরে যাও।”

আলো তার বাড়াবাড়ি থামায় না, তরুণী বয়সের জেদটা মাথায় চেপেছে, ভীষণ অধৈর্য হয়ে পরেছে সে, ইহানকে বলে,“বললাম না কাজী আন, বিয়ে পড়ানো হবে ওদের। এই ইনু,তোর বরকে ফোন করে ডাক। রিতু শান্ত ভাইয়াকে কল লাগাও। মেজো ভাইয়া রিহ্যাব সেন্টারে যোগাযোগ করো, সবাই-ই উপস্থিত থাকবে ওর বিয়েতে।”

ইহান বাকহারা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মুঈনও কিছু বলতে পারছে না। আলো ইহানের ওপর আবারও চেঁ'চি'য়ে উঠলো,“একটা কাজী ধরে আন ইহান। আমাকে দিয়ে এতো কথা বলাস না!”

ইনশিরাহ বাড়ির সবার দিকে তাকাচ্ছে। পাপার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে হেঁটে মেজো বাবার কাছে যায়, হতাশ হয়ে বলে,“তোমরা এমন পাগলামী মেনে নেবে মেজো বাবা! এসব কি! আমি কি মানুষ না? কি হচ্ছে আমার সাথে!”

তারপর ঘুরে মুঈনকে দেখে, কাঠকাঠ বলে,“আপনি কি এমন বাড়াবাড়ি সমর্থন করছেন?”

মুঈন তার হাসি চেপে রেখে মুখটাকে গম্ভীর করে, দুপাশে মাথা নেড়ে ইনশিরাহকে বলে,“না।”

তারপর আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,“আন্টি বিয়ে দশদিন পরেই হবে।”

_না, বিয়ে আজ হবে। এখনি হবে। এই মেয়ের নামের অর্থই স্বস্তি, তবে ও কখনো আমাদের স্বস্তি দেবে না বাবা। আমি জানি,ও এসব ইচ্ছে করে করে, ও ভাবে ওকে আমরা কেউ বুঝিনা তাই এমন করে। তুমি রাজি হও। আমার অনুরোধ রাখো।

মুঈন আলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ইনশিরাহর মুখটা দেখে। যে ভেজা চোখে বসে আছে একটা সোফাতে। হঠাৎ করে কেমন নির্লিপ্ত লাগছে। এই অদ্ভুত পরিস্থিতিতে মুঈনের হঠাৎ ইচ্ছে হলো আলোর বাড়াবাড়িকে লাই দেওয়ার। এই ইচ্ছেটা কেন হলো মুঈন জানেনা, তবে নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর হয়ে বলে,“ক্ষমা করবেন আন্টি তবে ইনশিরাহর মতামত টা খুবই ইম্পরট্যান্ট আমার কাছে।”

ইলহাম ইশমাম আলোর উপর ক্ষেপে যায়। ইলহাম বলে,“ভাবী তুমি তো বাড়াবাড়ি করে করে জীবন পার করে দিলে, বলছিলাম এই বয়সে একটু ক্ষান্ত হও। মেয়েটা কাঁদছে দেখো!”

ইশমাম বলে,“ও এসব ইচ্ছে করে করে না। এভাবে কথা শোনালে!”

আলো থামে না, সে স্বামীর দিকে তাকায়। তারপর জেদ দেখিয়ে কিছু বলতে যাবে, মুঈন বলে,“আর কোনো কথা না আন্টি। শান্ত হোন। বিয়েটা দশদিন পরেই হোক...”

“নাহ,বিয়ে আজই হোক। আমার আপত্তি নেই।”
ইনশিরাহ নিচুগলায় তবে দৃঢ় ভাবে বললো কথাটা। মুঈন বেশ অবাক হলো। বাড়ির প্রত্যেকটা প্রাণী চোখ বড় বড় করে ইনশিরাহকে দেখলো। সামিনও মেয়ের দিকে তাকাল। আলো অবাক হলো না,আলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ইহান বললো,“ইশি বড় মাকে বোঝাচ্ছি!”

মুঈন বলল,“তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু করার প্রয়োজন নেই। রিল্যাক্স! আন্টিকে বোঝাচ্ছি।”

আলো বলে,“ইহান কাজী ডাক। শুনলি ওর অসুবিধে নেই।”

ইনশিরাহ চোখ তুলে ইহানের দিকে তাকিয়ে বললো,“হ্যা দাদান। আমার কোনো কিছুতেই আর কোনো অসুবিধা নেই। তুমি কাজী নিয়ে এসো।”

______

কাজী আফতাব উদ্দিন ভীত চোখে ইহানের দিকে তাকিয়ে আছে। এই বাড়ির লোক গুলো তার পিছু ছাড়ছে না কেন? কি চায় তার থেকে? তার সাথে কোন ব্যক্তিগত শত্রুতা তো নেই!
সে তার ফ্ল্যাটের দরজা মেলে দাঁড়িয়ে আছে। এতো রাতে সিটির সব কাজী অফিস বন্ধ। শহরের এতো এতো কাজী রেখে ইহান কি মনে করে আফতাব উদ্দিনকেই বাড়ি থেকে নিয়ে যেতে এসেছে!

ইহান ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে টানটান হয়ে। আফতাব উদ্দিন লুঙ্গি আর ফতুয়া পরে আছে, সে ফ্ল্যাটের দরজা থেকে সরে না। ভীত কন্ঠে ইহানকে বলে,“আমি তোমাদের বাড়ির কোনো বিয়ে পড়াবো না নানুভাই। ক্ষমা করো।”

_কেন কি সমস্যা?
অবাক হয়ে জানতে চায় ইহান।

কাজীর মনে পরে যায় ইরফান মির্জা নামের বদ্ধ উন্মাদ ছেলেটার হুমকি,“এই কাজী হাজী পাজী, এরপর থেকে আমাদের বাড়ির সব বিয়ে আপনি পড়াবেন কাজীর বাচ্চা!”

আতঙ্কে ঢোক গিলে কাজী বলে,
_আচ্ছা তোমাকে তোমার ছোট ভাই পাঠিয়েছে আমাকে ধরে নিতে?

ইহান চট করে বলে ফেলল,“না বড় মা পাঠিয়েছে আপনাকে ধরে নিতে....”

তারপর নিজেকে শুধরে নিয়ে বললো,“আই মিন। সামিন ইয়াসার মির্জার স্ত্রী অনুরোধ করেছে আপনাকে। এটা ইমার্জেন্সি!”

ইমার্জেন্সি! কাজী হতবাক। এদের বাড়িতেই এতো ইমার্জেন্সি বিয়ে হয় কেন! শহরে আর কোন বাড়িতে তো হয়না!

ইহান কন্ঠস্বর যথারীতি নরম রেখে বলে,“তৈরি হয়ে নিন। শরীয়াহ মোতাবেক বিয়ে পড়িয়ে চলে আসবেন। আপনার ফিস ব্যাতীত আপনাকে যথাযোগ্য সালামী এবং আপ্যায়ন করা হবে।”

আপ্যায়ন! কাজী দ্বিতীয়বার চ'ম'কে ওঠে, প্রথম বার আপ্যায়ন করে তাকে টানতে টানতে এসপি অফিসে নিয়ে গিয়েছে এরা, দ্বিতীয়বার আপ্যায়ন করে ডায়াবেটিস থাকা সত্তেও তাকে চারটা মিষ্টি ঠেসে ধরে খাওয়ানো হয়েছে। আফতাব উদ্দিনের সেই আপ্যায়নের কথা মনে পরে যায়। তার চাইনা আর আপ্যায়ন। সে বলে,“আমি যাবো না নানুভাই। তোমাকে আমি ভোট দেবো, তবে তোমাদের বাড়ির বিয়ে পড়াবো না। যাও।”

_দাদু সমস্যা টা কোথায় বলবেন?

_সমস্যা আমার পেট খারাপ।

_ওষুধ দিয়ে দেবো চলুন।

আফতাব উদ্দিন মুখ কাঁচুমাচু করে দাঁড়িয়ে থাকে, ইহানের ধৈর্যচ্যুতি হয়। একদিকে বড় মা,একদিকে এই কাজীরা। ইহান কিছুক্ষণ চিন্তা করে বড় মাকে ফোনে ধরিয়ে দিলো। আলো কাজী আফতাব উদ্দিনকে অনেক করে অনুরোধ করার পরেই সে পাঞ্জাবি পাজামা আর রেজিষ্ট্রার খাতা নিয়ে,গায়ে আতর মেখে তৈরি হলো মির্জা বাড়ির আরেকটা অদ্ভুত বিয়ে পড়াতে, তখন রাত সাড়ে বারোটা।

________

শান্তিনীড়ে খুব ভয়ে ভয়ে ঢুকলো আফতাব উদ্দিন। এদের কাহিনীটা সে ধরতে পারছে না। লিভিং রুমে যখন তাকে বসানো হলো সে তখনও ঘাবড়ে ছিলো।

ওদিকে প্রিতম এসে উপস্থিত, শেহা শান্ত লাইনে ছিলো। ইরফানকেও পাওয়া গেলো অবশেষে।
এক কোণে চুপচাপ বসে আছে ইনশিরাহ। তার গায়ে আকদের জন্য কেনা কমলা রঙের বেনারসীটা। পরী সুন্দর করে পরিয়ে দিয়েছে। মুঈন নিজের নেভি শার্ট এবং জিন্সেই ছিলো। দু'জনকে পাশাপাশি বসিয়ে রাখা হয়েছে।

ইনায়া এসে বারবার ইনশিরাহর মাথায় ঘোমটা তুলে দিচ্ছে। ঘোমটা টা পিছলে বারবার পরে যাচ্ছে। ইনায়া তবুও আসছে, ঘোমটা টেনে দিচ্ছে। একপর্যায়ে ইনশিরাহ বিরক্ত হয়ে চেঁ'চি'য়ে বলে,“একটা পেরেক মেরে আটকে দে আহাম্মক!”

তার ভালো লাগছে না,তার কিছু ভালো লাগছে না। কবুল বলে সে সবাইকে শান্তি দেবে। ততক্ষণ পর্যন্ত তার শান্তি হচ্ছে না।

মুঈন তার বধূর মেজাজ দেখে একা একা হাসছে। তবে তার মুখভঙ্গি গম্ভীর!

কাজী ইনশিরাহর মলিন মুখ দেখে যতনা অবাক হলো,তার চেয়েও অবাক হলো বর হিসেবে এসপিকে দেখে!

না মানে,মেয়ে তুলে এনে বিয়ে করা তো এদের পারিবারিক ঐতিহ্য। তবে এসপিটাকেও ছাড়লো না এরা! ধরে বেধে বিয়ে করাচ্ছে! কাজী চূড়ান্ত হতবাক, বিড়বিড় করে,“ইয়া মাবুদ!”

ইশমাম মির্জাকে বলে,“মেয়ে কে কি জোরপূর্বক বিবাহ দিচ্ছেন? পাত্রের মত আছে?”

_দুজনের বিয়ে ঠিক হয়েই ছিলো। দশদিন পরে হবার কথা ছিলো। আজ হুট করে বিয়েটা দিতে হচ্ছে, প্রয়োজনে।

কাজী আবারও বিড়বিড় করে,“ইয়া মাবুদ।”

তাকে নাস্তা পানি দেয় মারিয়া এবং সোফিয়া, সে নাস্তা পানি ছোঁয় না। একবার চুপচাপ বসে থাকা ইয়াসার মির্জা আর ইলহাম মির্জাকে দেখে, নিচু গলায় কাজী কৌতুহল বশত বলে ওঠে,“আপনাদের বাড়িতে এভাবে হুটহাট বিয়ে হয়, মানে ছেলেমেয়েরা হুট করে বিয়ে করে অনুষ্ঠানের টাকা বাঁচিয়ে দেয়। ঐ টাকা দিয়ে আপনারা কি করেন?”

সামিন চুপচাপ দেখছে কাজীকে,কিছু বললো না মুরব্বিকে। ইলহামও কৌতুক করে বলে,“ঐ টাকা বিজনেসে লাগাই। এজন্যই বিজনেস বড় আমাদের।”

আলো আসলো, তাকে ভীষণ খুশি লাগছে। এই দশকের সবথেকে বাড়াবাড়ি রকমের বাড়াবাড়ি মানে দুজন বাগদত্তাকে অযথা, অকারণে চেপে ধরে বিয়ে করিয়ে দেওয়ার মতো বাড়াবাড়ি করতে পেরে অদ্রিতা আলো বাড়াবাড়ি রকমের আনন্দিত।

কাজীকে এসে অনুরোধ করে বিয়ে পড়াতে। কাজী উঠে বর কনের সামনে গিয়ে বসে। ইনশিরাহ মাথা নুইয়ে রেখেছে। মুঈনও নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। বন্ধু বান্ধবদের কনফারেন্সে রেখে ইমার্জেন্সি বিয়েটা সারছে।

কাজী বিয়ে পড়ানো শুরু করে। বাড়ির প্রত্যেকটা সদস্য উপস্থিত। যারা নেই তারাও দূরে বসে দেখছে মন ভরে, কমলা শাড়িতে একজন দায়িত্ববান সুদর্শন পুলিশ অফিসারের পাশে বসে থাকা কমলা টুকটুকে বৌটাকে দেখছে।

কাজী যখন ইনশিরাহকে বললেন,“মরহুম মাহতাব ফরাজীর পুত্র মোহাম্মদ মুঈন ফরাজী ছয় লক্ষ টাকা মোহরানা ধার্য করে তোমাকে বিবাহ করতে ইচ্ছুক। তুমি কি রাজি? রাজি থাকলে কবুল বলো।”

ইনশিরাহ একসেকেন্ডও সময় নিলো না কবুল বলতে, জীবনের চরম হতাশা মেখে কন্ঠে, সে বললো,“কবুল.... কবুল...কবুল।”

রোবটিক ভঙ্গিতে কবুল বললো ইনশিরাহ। মুঈন বধূর থেকে তার তেরছা নজর সরিয়ে কাজীর নির্দেশে নিজেও কবুল বললো।

তৎক্ষণাৎ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সবাই তাদের দু'জনকে দেখতে লাগলো। সামিন তাকিয়ে আছে মেয়ে-জামাইয়ের দিকে। চোখ তার আরাম পেলো হঠাৎ,বুক থেকে চাপা একটা যন্ত্রণা হঠাৎ গায়েব হলো মনে হলো। আলো একটা সোফাতে বসে পরলো।

ঝামেলা হোক আর যাই হোক,মানতেই হবে সবাই সন্তুষ্ট এতে। খারাপ লাগার কিছু নেই তাদের। মুগ্ধ হয়ে দেখছিলো ওদের দু'জনকে। দুজন চুপচাপ পাশাপাশি বসে আছে। একজন বসে আছে অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের প্রতি এক রাশ বিরক্তি, অনীহা, তার পাশের মানুষটার প্রতি শূন্য অনুভূতি নিয়ে, আরেকজন বসে আছে একটা সুন্দর পরিবার, ভীষণ রকমের আদুরে পরিবারের স্বপ্ন নিয়ে যা তার কখনো ছিলো না।

ডেসটিনি দু'জনকে এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। তবে এদের সংসার জীবন কেমন হবে সেটা ঐ ওপরে মানুষের ডেসটিনি যিনি নির্ধারণ করেন,তিনিই জানেন। আপনারা সবাই দোয়া করবেন নবদম্পতির জন্য!

চলমান......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 52 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন