ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 54

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৫৪
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

ইনশিরাহ পাপার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে। সামিন মৃদু হেসে মাথা নাড়ায়, নরম গলায় মেয়েকে বলে,“মুঈন তোমাকে আগে থেকেই পছন্দ করে আম্মা। মুঈন কখনও সাহস করে প্রকাশ করেনি কথাটা। সেদিন মুঈন আমার কাছে নিজে কনফেস করেছে বিষয়টা,যেদিন আমি ওকে প্রশ্ন করেছি ও কেন এই বিয়েতে মত দিলো।”

একটু থেমে সামিন সেদিনের কথা বলতে শুরু করে,“ওর সম্মতি পেয়ে আমি নিজেই যাই ওর কাছে। জিজ্ঞেস করি,“কেন রাজি হয়েছো? আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকে রাজি হলে আমি খুব ছোট হবো বাবা। আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকে আমার মেয়েকে গ্রহণ করো,এ আমি চাইনা।”
তারপর সে মাথা নিচু করে বললো,“আমি খুব আগে থেকেই আপনার মেয়েকে পছন্দ করে ফেলেছি সামিন বাবা। প্রথম প্রথম ওকে আমার অদ্ভুত লাগতো, কিন্তু যেদিন ইনশিরাহ পরী আন্টিকে নিয়ে হসপিটালে ছোটাছুটি করেছে, ওকে আমার হুট করে ভালো লেগে গিয়েছে সেদিন। আর ধীরে ধীরে সে ভালোলাগা কারণ ছাড়াই বেড়েছে। আপনার মেয়েকে বিয়ে করতে চাওয়ার পেছনে আমার লুক্কায়িত অনুভূতি আছে।”

ইনশিরাহ চুপচাপ মাথা নুইয়ে নেয় বাবার মুখে এসব কথা শুনে। সামিন মেয়ের দু'গাল ধরে বলে,“আমার ষাট ছুঁই ছুঁই, আর দুদিন বাঁচব হয়তো। কিন্তু আমি একটা মানুষ চাই যে আমাদের মেয়ের দরদ বুঝবে। মুঈন তেমনি। ওকে আমি ছোট থেকে চিনি। ও ভীষণ ভালো, শুদ্ধ একটি ছেলে। ও কখনো পরিবার পায়নি। ভীষণ কষ্টে মানুষ। ও তোমাকে বুঝবে। আর তুমিও ওকে অসম্মান করো না কখনো। আমি তোমার থেকে আর কিছু চাইনা। দু'জনে নতুন জীবন নিজেদের মতো করে শুরু করো, একে অপরের প্রতি সহনশীল থেকো।”

বাড়ির সবাই দাঁড়িয়ে বাবা মেয়ের এমন মধুর মুহূর্ত উপভোগ করছিল। সামিন সবার দিকে তাকিয়ে বলে,“যাও,আমাকে আর আমার আম্মাকে একটু একা থাকতে দাও।”

সবাই বেরিয়ে গেলেও দাঁড়িয়ে থাকে ইনায়া। ভেজা দু'চোখ তার। আপুর দিকে তাকিয়ে কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বলে,“আপু আমি তোমাকে সত্যিই জেনে বুঝে কেস খাওয়াতে চাইনি। আরে আমিই তো কেস খেয়ে বসে থাকি সারাদিন। আর আমি কি করে বুঝবো ভর সন্ধ্যা বেলায় কেউ বারান্দায় গিয়ে ঘুমাতে পারে?”

ইনশিরাহ ম্লান হেসে বোনের দিকে হাত বাড়িয়ে বলে,“এদিকে আয়।”

ইনায়া ছুটে গিয়ে বোনকে জড়িয়ে ধরে, ইনশিরাহ বোনের গালে হাত ছুঁইয়ে বলতে থাকে,“ব্যাথা পেয়েছিস?”

দু'পাশে মাথা নাড়ায় ইনায়া। ইনশিরাহ বলে,“যা ঘুমা।”

আলো আর সামিন মেয়ের বিছানায় চুপচাপ বসে আছে। ইনশিরাহ তার মাম্মা পাপাকে কিছুসময় দেখে আবারও এসে বেড়াল ছানার মতো গুটিসুটি মেরে সামিনকে জরিয়ে ধরে বসে থাকে চুপচাপ। দু'চোখ বন্ধ করে একের পর এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিল ইনশিরাহ। এই পাপা, পাপার বুক, পাপার আম্মা ডাক। বহুদিন শোনেনি সে। বহুদিন বিষাক্ত নিঃশ্বাস নিয়েছে ইনশিরাহ।

আলো বাপ বেটিকে দেখে নরম হয়ে বললো,“আমি কি চলে যাবো?”

_না, তুমিও এসো তবে কোনো বাড়াবাড়ি করো না মাম্মা।
ইনশিরাহ ক্ষীণ স্বরে আকুল হয়ে বললো।

আলো মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ইনশিরাহ পাপার বুক থেকে মাথা তুলে মায়ের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেলে। আলো ছুটে গিয়ে সামিনের থেকে ছাড়িয়ে তার বুকের ধনকে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। ইনশিরাহ মায়ের গাঁয়ের গন্ধ নেয় দু'চোখ বন্ধ করে, হাই তুলতে তুলতে বলে,“মাম্মা তুমি পাপা আর আমাকে বড্ড ভোগাও।”

আলো ফোপাচ্ছে। ইনশিরাহ বলে,“ভুগিয়ে বরাবর নিজেই কাঁদো। ছোট থেকে দেখছি। তুমি এমন কেন?”

আলো মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ইনশিরাহর খুব ঘুম পাচ্ছে মায়ের কোলে। ঘুম ঘুম কন্ঠে বলে,“আতাউর আলমের প্যারেন্টিং ঠিকঠাক ভাবে হয়নি।”

এবার সামিন মেয়েকে টেনে নেয়। ইনশিরাহ যেন একটা ছোট পাঁচ বছরের বাচ্চা। ওকে সেভাবেই কোলবদল করা হচ্ছে। সামিন মেয়েকে নিজের কোলে শুইয়ে দেয়। ইনশিরাহ ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে যাচ্ছে যেন, যখন চেতনা ছিলো তখনও বলছে,“আজ তোমরা কোথাও যাবেনা খবরদার। এই ঘর ছেড়ে কোথাও না। তোমরা একসাথে এভাবে আমাকে বহুদিন আদর করোনি।”

পাপার কোলে মাথা রেখেই ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পরে ইনশিরাহ। আলো সামিনকে বলে,“ওকে ঠিক ভাবে শুতে বলি। আপনি সারারাত এভাবে বসে থাকবেন নাকি!”

সামিন স্ত্রীর কথার জবাব না দিয়ে ঘুমন্ত মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বলে,“ভুল তো তোর আম্মা। কেন বড় হতে গেলি! কেন!

সেদিন রাতে ইনশিরাহর বাবা মা সত্যিই না ঘুমিয়ে তাকে আদর দিয়েছে। মাথায় হাত বুলিয়েছে সারারাত। ইনশিরাহ দীর্ঘদিন পর একটু স্বস্তিতে ঘুমিয়েছে। একটু স্বস্তিতে।

______

ইহানকে তাড়াহুড়ো করে তৈরি হতে দেখে সামিন বললো,“কোথাও যাচ্ছো?”

ইহান ঘুরে সামিনকে দেখে বললো,“বড় বাবা! এসো! বসো।”

সামিন ঢুকলো ইহানের ঘরে। আজ সে অফিসে যায়নি। তবে মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছে। সে বসলো। ইহান একটা চেয়ার টেনে তার সামনেই বসলো। বড় বাবার দু'টো হাত ধরে বলে,“কাজ বেড়েছে বড় বাবা।”

সামিন ম্লান হাসলো। ইহান বলতে লাগলো,“ফুয়াদ,তৌফ,রাহাত আঙ্কেল রা এতো করে বলে, তোমাকে পার্টির ভীষণ দরকার। একটু আমার আগের বড় বাবা হওয়া যায়না? তুমি সেই আগের মতো রাজত্ব করবে, আমি হবো তোমার সেনাপতি!”

সামিন ম্লান হেসে দু'পাশে মাথা নেড়ে বলে,“খুব যন্ত্রণার পরে এসব ছেড়েছি রে বাবা। আমার সেদিনের কথা ভেবেই লজ্জা লাগে। পুরো দেশ যখন আমার নামের পুত্তলিকা পুড়িয়েছে। রাস্তায় আমার স্ত্রীকেও ছাড় দেওয়া হয়নি লাঞ্ছনা থেকে। যে সদ্য সন্তান হারিয়েছিল। ঐ মহিলা মেয়ে নিয়ে দাঁত কামড়ে পরে ছিল আমার সংসারে। আমার ভাইদের সাথে উকিলের কাছে ছুটতে ছুটতে শীর্ণকায় হয়ে গিয়েছিল। অন্যকেউ হলে ডিভোর্স দিয়ে চলে যেত। সে যায়নি। জেল থেকে বেরিয়ে আমি ঐ মহিলার কাছে ওয়াদা করেছি, আর এ জীবন নয়। আমি ভালো আছি ইহান। এই জীবনটা ভীষণ শান্তির। কাছের কটা মানুষ,ব্যাস!”

ইহান তাকিয়ে আছে। তার ভীষণ মায়া লাগে এই মানুষটার জন্য। সামিন বলতে থাকে,“আমি চাইনা আমার বাড়ির কেউ রাজনীতিতে জড়াক। তোকে বাঁধা দিতে পারিনি, মিশন থেকে ফিরে এসে নিজের খুশি হিসেবে জনসেবা বেছে নিয়েছিস। আমি খুশি। দোয়া করি যাতে সততা বজায় রেখে চলতে পারিস।”

ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে সামিন বাইরে বেরোয়। আজ বহুদিন পরে তার শরীরটা বেশ চাঙ্গা লাগছে। একটু আড্ডা দিতে ইচ্ছে করে এই বয়সে, কিন্তু কোন মানুষ খুঁজে পায়না সে। সবাই ভীষণ ব্যস্ত। আলো তাকে খুব একটা সময় দিতেই চায়না। সবসময় অকারণে রান্নাঘরে ঢুকে বসে থাকে। আর মেয়ে তো মেয়ে!
এই বয়সটা ছোট ছোট নাতি নাতনিদের নিয়ে খেলাধুলা করার বয়স। অথচ তার কি দুর্ভাগ্য! ছেলেমেয়ে গুলো মানসিক ভাবে বড়ই হচ্ছে না তারা কিভাবে সামিনকে নাতি নাতনির মুখ দেখাবে! নাতি নাতনি দেখার আগে অক্কা না পেলেই হয়। হাসতে হাসতে ভাবে সামিন।

সামিন হেঁটে ইনশিরাহর ঘরের সামনে গেলো। ইনশিরাহ তখন নিজের অগোছালো ঘর গোছাচ্ছিল। কতদিন নিজের ঘর সে নিজ হাতে গোছায়না।

সামিন ঢুকতেই বাবা মেয়েতে মুখোমুখি হলো। দু'জনেই একসাথে চওড়া করে হাসলো। ইনশিরাহ এসে বাবাকে আলিঙ্গন করে বলে,“গুড মর্নিং পাপা।”

সামিন তার সেই পুরনো সুরে আদরের সহিত বলে,“তাড়াতাড়ি রেডি হন আম্মা। বাজারে যাবো।”

মেয়েকে নিয়ে অনেকদিন পরে বাজারে ঘোরাঘুরি করছে সামিন। ভীষণ ফুরফুরে তার মেজাজ। ইনশিরাহ আড়চোখে শুধু নিজের পাপাকে দেখছিলো। কী ভীষণ খুশি পাপা। একটা বাচ্চা লাগছে পাপাকে। আচ্ছা সাঈমের সাথে বিয়েটা হলে, কোনো ভাবে পাপা যদি মেনেও নিতো তাদের, তবে কি পাপা এভাবে হাসতো? পাপা তো স্বস্তিই পেতো না!

মেয়েকে নিয়ে দরদাম শেখাচ্ছে সামিন, হাসতে হাসতে বলছে,“শোনো আম্মা, ভীষণ ব্যস্ত লোকের বৌ হয়েছো তুমি। নিজের ক্যারিয়ারের পাশাপাশি বাড়ির বাজার টাও মাঝে মাঝে তোমাকে দেখতে হতে পারে। প্র্যাকটিস করে নাও কেমন? আমি এখন তোমাকে শেখাবো কিভাবে ভালো মাছ বেছে কিনতে হয়। তোমার মাম্মা এসব পারে না। তার শুধু মুখেই হম্বিতম্বি। আমি বাজার করে নিয়ে গেলেই খুঁত ধরবে। অথচ তার পছন্দ অতি জঘন্য!”

ইনশিরাহ হেসে বলে,“মাম্মার পছন্দ জঘন্য এটা আমি জানি পাপা,তবে তার একটা পছন্দ বেস্ট বেস্ট বেস্ট। তুমি। কখনো তোমার হাত না ছাড়া।”

সামিন হাসে, মেয়ের হাত ধরে টানতে টানতে সুপার মার্কেটের ভেতরে যায়।

ইনশিরাহ ঝাপসা চোখে পাপার পাগলামি দেখছে। সামিন মেয়ের হাত ধরে ঘুরে ঘুরে সুপার মার্কেটের মাছ দেখেছে।

বাড়ির গাড়ি আনেনি তারা। বাবা মেয়ে অযথা, অকারণে একটা বড় বোয়াল মাছ কিনে আইসক্রিম খেতে খেতে ফুটপাত ধরে ধরে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দিকে যায়।

আজ বহুদিন পরে যেন একটু প্রাণ ফিরে পেয়েছে বাড়িটা। তার মধ্যে কানাঘুষা শোনা যাচ্ছে ইরফানের তিনদিনের ছুটি মঞ্জুর করেছে। একটু বেশিই খুশি ইনশিরাহ। তবে এই ব্যাপারে এখনও চুপচাপ রিতু। ইরফানের আসা নিয়ে এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি সে।

ইনায়া আর ইনশিরাহর বিয়ের অনুষ্ঠান হবে একই সাথে,তবে বিরাট বড় আয়োজন। ইরফান দুই বোনের অনুষ্ঠানেই উপস্থিত থাকবে তাই সামিনের এমন আয়োজন।

দুপুরের ভাত খেয়ে সামিন অযথা গিয়ে মেয়ের কাছে বসে থাকে। ইনশিরাহ বসে বসে পাপার গল্প শোনে,পাপার খুশি দেখে। মুঈন হঠাৎ ইনশিরাহকে কল করলে সামিন লাজুক হেসে ইনশিরাহর ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ইনশিরাহ কলটা রিসিভ করে, মুঈন জিজ্ঞেস করে সে কি করছে। জবাবে ইনশিরাহ জানায়,পাপার সাথে গল্প করছে সে। তবে সে কোন বাড়তি কথা খুঁজে পায়না বলার। কেমন অদ্ভুত লাগে তার। বিয়ে হতে না হতেই লোকটা কতটা ফ্রি হচ্ছে। দরদ নিয়ে জানতে চায় ইনশিরাহ খেয়েছে কিনা, শরীর ঠিক আছে কিনা। ইনশিরাহ এমন পারে না। তার কাছে মুঈন অচেনা একটা লোক, ইনশিরাহ ঘাবড়ে যায়, মুঈনের সাথে তার প্রথম রাত কিভাবে কাটবে সেটা ভেবে সে গুটিয়ে যায়, ভীষণ দ্বিধা হয় তার। এসব কথা কাউকে বলা যায়না, মায়ের সাথেও শেয়ার করা যায়না। একটু পরামর্শ চেয়ে ইনশিরাহ একটা কাউন্সেলিংয়ের গ্রুপে পোস্ট করেছিলো। সবাই কত কত পরামর্শ দিয়েছিল। কেউ কেউ ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়েছে। কিন্তু ইনশিরাহ নিজেকে এসব কোন কিছুতেই বোঝাতে পারেনা। কিভাবে! কিভাবে পারে মানুষ যাকে ভালোবাসেনা তার কাছে নিজেকে সঁপে দিতে! কিন্তু মুঈনকে আটকানোর,বাধা দেওয়ার যুক্তি তো নেই। মাম্মা পাপা ভীষণ খুশি, তবে ইনশিরাহ নিজের সাথে দ্বন্দ কিভাবে করবে? বুঝে উঠতে পারেনা সে। চার দেয়ালের মাঝে একজন পুরুষ কি বুঝবে তাকে? বোঝার চেষ্টা করবে? তবে বান্ধবীদের কাছে ইনশিরাহ যা শুনেছে এমনটা হলে সে ভীষণ হতাশ হবে অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ নিয়ে, যে হতাশা নিয়েই সে সারাজীবন সংসার করবে!

বিকেলে সামিন এসে তাড়া দেয়। একটু ঘুমাতে নিয়েছিলো ইনশিরাহ। সামিন হাত ধরে টেনে তোলে,“এই অলস মেয়ে। তৈরি হও। শিগগির বেড়োবো আমরা।”

ইনশিরাহ জানতেও চায়না কোথায় বেড়োবে। দেখে বাবার হৈ হুল্লোড়, সে চুপচাপ রেডি হয়ে নেয়। একটা টি শার্ট পরে,একটা ওয়াইড জিন্স পরে।‌
আলোও আর ইনশিরাহর পোশাক নিয়ে কিছু বলেনা, ইনশিরাহ মায়ের নমনীয়তা দেখে নিজে থেকেই গলায় একটা স্কার্ফ পেঁচিয়ে নেয়।

তারা এসেছে প্রেরণার এপার্টমেন্টে। ভীষণ ব্যস্ত প্রেরণা সামিন আলো ইনশিরাহকে দেখে প্রচণ্ড রকমের খুশি হয়ে যায়। রীতিমতো হিমশিম খায় অতিথি আপ্যায়নে।‌

সামিন নিষেধ করে প্রেরণাকে চুপ করে বসতে বলে। আলো প্রনমিকে কোলের কাছে নিয়ে বসেছে। ভীষণ মায়াবী, মিষ্টি একটা এতিম মেয়ে। কত চড়াই উৎরাই পার করে,কত দূর্ঘটনার স্বীকার হয়ে এ পর্যন্ত এসেছে।
প্রণমি আপুর কথা মতো ও বাড়ির কারো সাথে অস্বাভাবিক আচরণ করেনা, সালাম দেয়। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে জবাব দেয়।

সামিন এখানে কেন এসেছে তা জানায় প্রেরণাকে,প্রেরণা আলো সামিনের পাশে বসে। সামিন বলে,“তোমরা নিকট আত্মীয় প্রেরণা। শুনেছো তো দুই মেয়ের অনুষ্ঠান একসাথে করছি, বাধ্য হয়ে এই তাড়াহুড়ো সিদ্ধান্ত। রিসেপশন পূর্ববর্তী অনুষ্ঠানে তোমাদের আসাটা একান্ত কাম্য মা।”

প্রেরণা নিজের বোনের দিকে তাকায়। সামিন বলতে থাকে,“আর প্রনমির আসাটাও।”

প্রেরণা হেসে জবাব দেয়,“কেন যাবে না! অবশ্যই যাবো,আমরা প্রত্যেকে যাবো। এভাবে বলার তো কিছু নেই আঙ্কেল!”

আলো এবার ঝেড়ে কাশে,বলে,“মা ওদের দু বোনের মেজো ভাই ওদের বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবে। আমরা, আমরা তোমাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি কোনো রকম বাজে পরিস্থিতির মুখোমুখি আমরা তোমাদের হতে দেবো না। তুমি যদি একটু সহজ হতে! দুই মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান বুঝতেই পারছো। ইনায়ার কাছে তুমি প্রনমি খুবই ইম্পরট্যান্ট। ইভেন আমাদের কাছেও!”

প্রেরণা প্রণমির দিকে তাকায়। প্রণমি নিশ্চুপ বসে আছে। প্রেরণা একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলে,“আর কোনো কিছুরই ভয় পাইনা আন্টি। আমার বোনকে আগলে রাখার ক্ষমতা আছে আমার। আপনাদের এতো হীনমন্যতায় ভোগার কিছু নেই। আমরা যাবো। আমি আপনাদের ভরসা করি। চিন্তা করবেন না।”

স্বস্তি পায় সামিন। মূলত এজন্যই এখানে আসা। যেসব শ্বাসরুদ্ধকর,বাজে দিন একজন অভিভাবক হিসেবে পার করেছে সে,বাড়ির বড়রা, এখন সবকিছু স্বাভাবিক হোক সেটাই চাচ্ছে সে। দুই মেয়ে তার, দুই মেয়েকে আনুষ্ঠানিক ভাবে বিদায় দেবে তারা।

প্রেরণার অতিথি আপ্যায়নে বরাবর মুগ্ধ সামিন আর আলো। ভীষণ যোগ্য মেয়েটা, তবে কি দুঃখী!

শুদ্ধকে কোলে নিয়ে সামিন আলোকে বলে,“ইহানকে বিয়ে করিয়ে দিলে এরকম একটা শুদ্ধ এতদিনে আমাদের বাড়িতেও থাকতো,তাই না বলো?”

আলো হাসে, ইহানের কথা মনে করে সামিনকে বলে,“এরকম একটা শুদ্ধ পেতে আপনাদের কয় ভাইকে কতদিন অপেক্ষা করতে হয় সেটা দেখুন। ছেলের মতিগতি বুঝিই না।”

প্রেরণাদের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে সামিন স্ত্রী কন্যাকে নিয়ে যায় রিভানায়। ইনশিরাহ ভাবে পাপা এখানে বহুদিন পরে মেয়ে বৌ নিয়ে হঠাৎ সময় কাটাতে এসেছে। কিন্তু যখন মুঈনকে দেখতে পেলো তখন ইনশিরাহ বুঝলো এসব পাপার পূর্ব পরিকল্পিত।

রাত তখন সাড়ে আটটা। মুঈন সিভিল ড্রেসে আসে। একটা গ্রে ডেনিম শার্ট পরিহিত। হাতা গুটিয়ে রাখা। ইনশিরাহ নিজের দৃষ্টি নত করে বসে থাকে।

সামিন দু'টো আলাদা টেবিল বুক করলেও মেয়ে জামাই নিয়ে একই সাথে বসেছে।

মুঈন বসে আলো সামিনের দিকে তাকিয়ে চওড়া হাসি হেসে ইনশিরাহকে দেখে নেয় এক পলক। তার বধূ্র সাথে তার এ'কদিনে দেখা হওয়ার কথা ছিলো না। তার উদার,স্মার্ট, সচেতন শ্বশুরের কল্যাণে সে সুযোগ হয়েছে!

খাবার চলে আসে। সামিন খেতে খেতে মুঈনের সাথে হাসতে হাসতে গল্প করে। আলোও তাদের সাথে অংশ নেয়।

শুধু মনমরা হয়ে খাচ্ছে ইনশিরাহ। দেখছে,লোকটা যেন ধীরে ধীরে তার যায়গাটা নিয়ে নিচ্ছে মাম্মা পাপার জীবনে। আড়চোখে বারকয়েক দেখে সে। সভ্য শান্ত, দায়িত্ববান, আরো বহু গুণে গুণান্বিত একজন লোক। ইনশিরাহ জানতে পারলো না লোকটাকে, ইনশিরাহকে ঠিক ভাবে জানলো না লোকটা, কি ভাবে কি হবে! অবশ্য জেনে শুনেই বা কি হয়! যেখানে ছয় বছরের জানা শোনাও মিথ্যা হয়ে যায়। তবে ইনশিরাহ বুঝলো,ওসব ভাগ্যের দোহাই সব মিথ্যে, পারিবারিক বিয়ে মানেই অ্যাডজাস্টমেন্ট। যে যত অ্যাডজাস্ট করে থাকতে পারবে,সেই ভালো বধূ,ভালো বর, লোকে বলবে ঐ দ্যাখো কপাল করে কত ভালো বর পেয়েছে,বৌ পেয়েছে! ইনশিরাহ কেমন বধূ হবে ইনশিরাহ জানে না।

ভাবতে ভাবতে খেতে খেতেই বিষম খায় ইনশিরাহ। জোরসে কেশে ওঠে। তৎক্ষণাৎ দু'টো ব'লিষ্ঠ হাত তার দিকে পানি ভর্তি গ্লাস এগিয়ে ধরলো।

ইনশিরাহ কাশতে কাশতে দেখলো হাত দু'টো। সে বিভ্রান্ত হলো কিছুটা। আলো তখন চোখ বড় বড় করে শশুর জামাইকে দেখছে। এমন একটি দৃশ্য,এমন ঘটনা তার জীবনে বহুবার ঘটেছে! বহুবার। যতবার সে স্বামী আর বাবার সাথে একসাথে খেতে বসেছে।

সামিনের হাত দেখে মুঈন হেসে নিজের হাতটা সরিয়ে নেয় । ইনশিরাহ পাপার হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে পানি খায়।

চলমান....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 54 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন