#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৫৫
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
আজ তাড়াহুড়োতে একটা ক্যাব নিয়েছিল প্রেরণা। আজ রবিবার। গত দু'দিন ছুটি ছিলো তাই ওদিকটা পুরোটা সামলে নিয়েছে সুযোগে। তবে আজ রেস্তোরাঁয় যেতেই হবে,কাজের চাপ আজ বেশি থাকবে। সেখান থেকে যাবে অফিসে। শুদ্ধকে স্কুলে দিয়ে ক্যাবে উঠেছিল,আজ প্রচন্ড ভিড়ে তাকে রাইড শেয়ার করতে হচ্ছে।
তাদের এপার্টমেন্টের সাত তলার ফারাজ ভাই প্রেরণাকে দেখে হাসলেন। লোকটা অমায়িক। সহজ সরল। প্রেরণার সাথে টুকটাক কথা বলতে বলতে বললেন,“তুমি এতো দৌড়ঝাঁপ করো। রিয়েলি ইম্প্রেসিভ! তোমার ভাবীও খুব দৌড় ঝাপ করে। বিজনেস অফিস সামলে বাড়িতে আসলেই তার মেজাজের কাছে টিকতে পারিনা,আমি আর আমার বাচ্চারা।”
_ওরকম একটু স্ট্রেসড আমিও থাকি।
প্রেরণা হেসে জবাব দিল।
ফারাজ সরল হাসি হেসে বললেন,“অথচ আমরা পুরুষরা বাইরে থেকে কাজ করে এসে একটু মেজাজ দেখালেই তোমরা নারীরা কত অভিযোগ করো। কি বোঝা যায়? বাইরের দুনিয়াটা কেমন? কতটা স্ট্রেস নিতে হয়! বোঝা যায়?”
লোকটা কথাটা বলেছে মনখোলা ভাবে,সহজ সরল লোক ভীষণ। তবুও প্রেরণার মুখের হাঁসি মিলিয়ে গেলো, জানালার বাইরে দৃষ্টি দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অস্ফুটে বললো,“জি বোঝা যায়।”
তার থেকে ভালো কে বোঝে আর? নিজের জন্য একটু “মি” টাইম নেই, একটু ছুটিছাটা নেই। প্রেরণারও ইচ্ছে করে একটু ফুরফুরে মেজাজে থাকতে, কখনো বিকেলে মন চাইলে শাড়ি পল্লীতে গিয়ে দু'টো শাড়ি কিনতে। একটু প্রতিবেশী ভাবিদের সাথে আড্ডা দিতে! একটু বই পড়তে! একটু গুছিয়ে বসে আচার খেতে, ইচ্ছে করে একটু বাথটাবে শরীর ভিজিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে, পপকর্ন নিয়ে বসে একটা মুভি দেখতে। এতো ছুটতে যে তাঁরও ভালো লাগেনা!
ক্যাব থেকে প্রেরণা নেমে পরলো, রেস্তোরাঁর সামনে তার স্বাদে আহ্লাদের সাইনবোর্ডটা ঠিকঠাক ভাবে সেট করা যায়নি এখনো। ইহান তাজওয়ারের ক্লাবের বড় সাইনবোর্ডটার পাশে কোনো মতে শিশু-বাচ্চার মতো লাগছে থ্রিডি সাইনবোর্ডটা। এ ব্যাপারে একটু তাজওয়ার মির্জার সাথে অফিশিয়াল আলোচনা করা দরকার।
রোজ তাদের দেখা হয়, আসতে যেতে মুখোমুখি হয়। ইহান চোখ তুলে চট করে একপলক তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। প্রেরণা সালাম দিলে, সালামের জবাব দেয়।
এখানে এভাবেই কথা হয় দু'জনের। এর বাড়তি কুটুম-আলাপ হয়না। আজও প্রেরণার মুখোমুখি হলো ইহান। চট করে চোখ নামিয়ে নিজেই সালাম দিলো, প্রেরণা সালামের জবাব দিলে বললো,“কোনো অসুবিধা হলে জানাবেন!”
_জি বলছিলাম ঐ সাইনবোর্ড টা....
_ঠিক করে দেবো।
হাস্কি স্বর সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলো। প্রেরণা আন্তরিক হেসে মাথা নেড়ে চলে যায়।
ইহান রোজকার মতো ঘা'ড় ঘুরিয়ে দেখে কী ভীষণ পরিশ্রমী গম্ভীর এক নারীকে, তার দুলতে থাকা বেনীকে, তার নম্র চলন অথচ দৃঢ় কদমকে, ইহান দেখে তার সমুদ্রনীলাকে, এক পরনারীকে, তরতর করে বুঝদার মনে বেড়ে যায় খামখেয়ালি জেদ। কেমন হ্যাংলা লাগে নিজেকে ইহান তাজওয়ারের। সেতো এমন ছিল না! কাউকে ভালোলাগলেই যে সেটাকে নিয়ে এতো ভুগতে হবে এই বয়স তো তার নেই! কি অদ্ভুত এই হ্যাংলামীর রোগটা! বেচারা পেয়ে তাকে ধরেছে!
আপন এসে পাশে দাঁড়াতেই ইহান চট করে চোখ নামিয়ে নেয়। আপন বলে,“ভাই এই আজকের এতিমখানার খাবারের অর্ডার টা বাবুর্চি আপাকে দেবো? মানে ওনার স্টাফদের।”
ইহান রাগী রাগী তাকালো আপনের দিকে, প্রেরণার রেস্তোরাঁ থেকে এই অফিসের সবকটা ছেলেকে দূরে থাকার কড়া আদেশ ইহানের। আপন ঘাবড়ে গিয়ে বলল,“ভাই রেস্তোরাঁয় যাবো না, অনলাইন অর্ডার করবো। পাক্কা!”
ইহান কোন জবাব না দিয়ে লম্বা কদমে বেড়িয়ে পরলো।
আজ হাতে তেমন কাজ ছিলো না, তবে বিশেষ একটি কাজে ইহান বেড়িয়ে পরলো। সে আজ হৌপে যাবে। ইরফানকে আনতে।
ভাইয়ের কথাটা ভেবে ইহানের মনটা ফুরফুরে লাগছে।
_______
ইয়াসার মির্জা সেই তখন থেকে স্ত্রীর মন বোঝার চেষ্টায় আছে। তবে বুঝে উঠতে পারছে না সে বুঝতে চাইছে কি আসলে! তার ধর্মপত্নীর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে ঠিক নেই কিছু একটা।
মজার ছলে বললো,“বলেছি চলো আমার সাথে মর্নিং ওয়াকে চলো, মেজাজ টা এতে ফুরফুরে থাকে সারাদিন।”
_আমার মেজাজ অ-ফুরফুরে আপনাকে কে বললো?
_ওহহ আমি তো ভুলেই গিয়েছি। তুমি আলো। তোমার চেহারাই এমন!
কপাল কুঁচকে আলো স্বামীর দিকে তাকায়, ইয়াসার মির্জা তার ভুবন ভোলানো হাসি দিয়ে স্ত্রীকে কাছে টেনে টুপ করে একটা গালে চুমু খেয়ে ফেলে।
বলে,“জোকিং।”
আলো হেসে ফেলে। সামিন বলে,“একদমই বদলায়নি তোমার রূপ। সেই পুরনো আলো।”
_হু তবে মর্নিং ওয়াকে কর্নেলের ওয়াইফের সাথে অত হাসাহাসি করলেন যে আজ?
সামিন অবাক হয়ে বলে,
_বুড়ো স্বামীর পেছনে গোয়েন্দা লাগিয়েছো শেষে? নাহ! এই লজ্জা আমাকে শেষ করে দেবে! আমি এই মুখ নিয়ে নাতি নাতনির মুখ কিভাবে দেখবো!
_গোয়েন্দা না! সুচিত্রা বৌদি বললেন আমাকে,“ভাবী জানেন! আপনার জনাবকে দেখলাম মিসেস তালুকদারের সাথে জুস খাচ্ছিলো মর্নিং ওয়াকে! সে কি হাসি তাদের!
সামিন কৈফিয়ত দেওয়ার মতো করে বলে,“মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে টুকটাক জানতে চাইলো। আর হ্যা, তোমার ঐ সুচিত্রা বৌদিকেও বলে দিও আমিও দেখি রোজ তার উত্তম কুমার এক সাবিত্রী চ্যাটার্জি নিয়ে কফি খায় গ্রিন পার্কে!”
আলো হা হয়ে যায়,বলে,“আপনারা পুরুষরা কেউ কারো থেকে কম না!”
_সেইম টু ইউ! এক একজন গোয়েন্দা হয়েছো!
আলো হেসে সামিনের কোট এগিয়ে দিয়ে বলে,“এতো না বকে রেডি হোন! সময় নেই হাতে।”
ইশমামকে চুপচাপ ঘরে বসে ম্যাগাজিন পড়তে দেখে পরী বিরক্ত হয়। ইশমাম স্ত্রীর বিরক্তি অনুধাবন করেও নড়চড় করেনা। রিক্লাইনার চেয়ার ঠেশে বসে আছে।
পরী এবার মেজাজ দেখিয়েই বললো,“বাড়াবাড়ি! ভীষণ বাড়াবাড়ি! আপনি উঠবেন?”
_আরে তোমরা যাও না। দুই জামাইয়ের জন্য স্যুট নেবে। এতে এতো দলবেঁধে যাওয়ার কি আছে! তাছাড়া ভাইয়া তো যাচ্ছে যাও।
তিতিবিরক্ত পরী রীতিমতো ক্ষেপে যায়, চেঁচিয়ে বলে,“ভাইয়া ভাবী নিজেদের জামাইয়ের স্যুট নিতে যাচ্ছে। আপনার কি একটুও আগ্রহ নেই নিজের মেয়ে জামাইয়ের জন্য? এখনও এতো ঢং করছেন? মেয়েটা কিন্তু ওর কাছে থাকবে আজীবন!
_আরে কি আশ্চর্য! এই বিয়ে নিয়ে তো আমার অমত নেই আর! যে যা চাও তাই করো! টাকা আমি খরচ করছি তো! আমাকে এখন একটু দূরে রাখো!
স্বামীর কথা শুনে মুখটা শুকনো করে পরী বসে থাকে। ইশমাম কিছুক্ষণ স্ত্রীকে দেখে চুপ করে উঠে দাঁড়ায়। এতো বছরেও এর ইশমামকে মানানোর বাচ্চামো ধরণের জেদ যায়নি। কি অদ্ভুত এই নারী চরিত্র গুলো। গোটা একটা সংসার সামলে ঠিক যায়গা বুঝে ঢলে পরে আহ্লাদ নিতে! আশ্চর্য!
উঠে এসে স্ত্রীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ইশমাম বললো,“চলো।”
আজ তারা মানে এ বাড়ির বড়রা তাদের দুই জামাইকে নিয়ে জামাইদের জন্য কম্প্লিট ফরমাল স্যুট নিতে যাবে। তবে মেয়েরা যাবে না। আজ শ্বশুর শাশুড়ি আর জামাইদের দিন। মারিয়া আর সোফিয়া বাচ্চাদের নিয়ে একদিনের জন্য আতাউর আলমের বাড়িতে গিয়েছে। তালাবদ্ধ হয়ে পরে আছে বাড়িটা। বাচ্চাদেরও তো পিতৃভূমি দেখানো প্রয়োজন!
রিতু চুপচাপ নিজের ঘরেই ছিলো। উদাস মনে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলো। এই এতো উৎসবে রিতু মন দিতে পারেনা। তার বুকটা শুধু হুঁ হুঁ করে, আজ এই বাড়ির উৎসব উৎসব দৃশ্যটা অন্যরকম হতে পারতো। সম্পূর্ণ অন্যরকম! এসব কিছু না ঘটলে ছেলেটা তার বোনদের বিয়েতে কি কি না করতো! এই নিস্তব্ধ বাড়িটাকে মাতিয়ে রাখতে ঐ বদরাগী চঞ্চল ছেলেটা একাই যথেষ্ট ছিলো!
ইলহাম মির্জা তখন অফিসে ছিলেন। সামিন রিতুকে ডাকছিলো, ভাসুরের ডাক কর্নগোচর হতেই রিতু ঘর থেকে বের হয়।
রিতুকে দেখে সামিন অবাক হয়ে রিতুর দিকে তাকিয়ে বলে,“তুমি যাবে না আমাদের সাথে? আরে এমন সুযোগ আর হবে রিতু? বিয়ে উতরে গেলে আমরা বুড়োরা সবাই ব্যস্ত হয়ে পরবো রিতু। ইলহামকেও ডেকে নেবো চলো।”
রিতু চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সামিন তাকে কিছুক্ষণ দেখে বলে,“ছেলেটা আসছে রিতু। এখন সহজ হও।”
_ভাইয়া, মা হিসেবে ন্যায় অন্যায়ের মাঝে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়েছে আমাকে। আমি ব্যর্থ মা। কিন্তু আমার ব্যর্থতা কোথায় ছিল?
আলো বলে ওঠে,“ব্যার্থ আমরা সবাই রিতু। একটা অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব,যেটা বাচ্চাদের সাথে আমরা কখনোই কমাতে পারিনি। আমরা সবাই ব্যার্থ। তাই বলে সন্তানের ভালো তো শেষ নিঃশ্বাসের আগেও চাই। তুমিও চাও,অযথা কষ্ট দিচ্ছো নিজেকে!”
সামিন বললো,“শুদ্ধ কে রিতু? আমাকে বলো শুদ্ধ কে? শুদ্ধ কেবল মানুষ মৃত্যুর পরে হয়।”
রিতু চুপটি করেই দাঁড়িয়ে আছে। সামিন নম্রগলায় বলে,“আমরা বুড়ো হচ্ছি রিতু। ওদের বাকি জীবনটা পরে আছে। হাল ছাড়লে হবে না। বাবা মায়েরা হাল ছাড়তে পারেনা। যা হয়েছে হয়েছে, চেষ্টা করো সবটা ঠিক করার। বাচ্চাগুলো যেন অসম্ভব ভালো থাকে। অভিভাবক হিসেবে নিজেদের ব্যর্থতার গ্লানি যেন ওদের নিয়ে গর্বে পরিণত হয়!”
একটু থেমে সামিন রিতুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,“ছেলেটা আসছে, তিনদিন থেকে চলে যাবে। ও একজন অপরাধী, ও জানে সেটা! তবে সেটা ওর মায়ের চোখে এভাবে দেখতে থাকলে ও তো শুদ্ধ হওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। প্লিজ সহজ হও রিতু।”
________
কর্তৃপক্ষ ইহানকে দিয়ে সমস্ত ফর্মালিটিজের কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে ওয়ার্ডেনকে বললো ইরফান মির্জাকে গিয়ে খবর দিতে।
আধাঘণ্টা অপেক্ষার পরে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো! চোখের সামনে কেমন সরল দেখতে ছেলেটাকে দেখে ইহান তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল।
একটা সাদা ট্রাউজার এবং বাদামী ফুল স্লিভ টি-শার্ট পরিহিত ইরফান মির্জা নির্নিমেষ দেখছিলো ভাইকে, এক কদম এগোলো ধীরে, তারপর আরো দুকদম। হা করে দেখছিল দাদানকে। সে কিছুই জানেনা। তাকে কেউ বলেইনি!
ইহান ম্লান হেসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে ভাইকে বললো,“তিনদিনের ছুটি! বোনদের বিয়েতে যাবি না?”
হাই-ওয়ে পুরোটা ফাঁকা। একটা গাড়িও নেই এই ভরদুপুরে। ইহান গতানুগতিক স্পিডটা আজ বাড়িয়ে দিলো। কেমন ভীষণ তাড়া ঠেকছে তার ভেতর থেকে!
গাড়ির জানালার বাইরে মাথা বের করে লম্বা একটা শ্বাস ফেললো ইরফান মির্জা। পর পর বুক ভরা শ্বাস নিলো সে। দু'চোখ বন্ধ করে মাথা সরিয়ে সিটে হেলান দিলো। একটা বদ্ধ এরিয়ায় এই বাতাসটাকে সে ভীষণ মিস করেছে! ভীষণ!
ইহান ড্রাইভিং সিটে বসে তেরছা নজরে ভাইকে দেখছে। মিটিমিটি হাসছে সে।
গাড়িতে মৃদু মিউজিক চলছে! ইরফান সুরের তালে তালে মাথা দুলিয়ে প্রথম যে কথাটা বললো, সেটা হলো,“বাড়িতে গিয়েই আমি মাম্মার হাতের রান্না দিয়ে সাত প্লেট ভাত খাবো দাদান আই সোয়্যার!”
_______
“শেহুকে কল দিয়েছিলে আপু?”
_হু । আসছে। শান্ত বাবা দিয়ে চলে যাবে। প্রোগ্রামের দিন আসবে শান্ত বাবা।
দুবোন একবাটি চিপস নিয়ে বসেছে ভর দুপুরে।
ইনায়া এসে গুটিসুটি মেরে ইনশিরাহর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পরে।
বলে,“শেহুটা কেমন হয়ে গিয়েছে আপু।”
_পড়াশোনার চাপ। চিন্তার কিছু নেই। আমাদের রোজ কথা হয়।
বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে ইনশিরাহ।
ইনায়া উঠে বসলো, হঠাৎ করে একটা কথা মনে পরলো তার। খুব ভয়ে ভয়ে বললো,“আপু একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
_হু করো।
_আচ্ছা আপু, আমি রিলেশনের পনেরো দিনের মাথায় কেস খেয়ে গেলাম আর তুমি ছয় বছর ধরে শহরে পালিয়ে পালিয়ে প্রেম করলে,অত সহজে ধরা গেলো না তোমাকে। কেনো বলোতো?
_আমি তোর মতো নেইলসে বয়ফ্রেন্ডের নামের প্রথম অক্ষর লিখে ঘুরে বেড়াতাম না স্টুপিড।
ইনায়া আপুর কথায় বোকা বোকা হাসলো লজ্জিত ভঙ্গিতে। তারপর হুট করে বলে ফেলল বেফাঁস কথা,“আপু সাঈমকে ভুলতে পেরেছো তুমি?”
থমকালো ইনশিরাহ। ইনায়া ঘাবড়েছে, একটা চ'ড় হয়তো তার গালে পরবে,ভাবছে সে। কিন্তু ইনশিরাহ খুবই শান্তস্বরে বললো,“না। একজন প্রতারককে ভোলা উচিত নয়।”
দু'জনের মাঝে আবারও পিনপতন নীরবতা। ইনায়া বোনের শক্ত হয়ে যাওয়া মুখবিবর দেখে নম্রস্বরে বলে,“আপু ভাইয়ার সাথে তোমার নরমাল হয়েছে সম্পর্ক? দুলাভাইয়ের সাথে!”
_নরমাল! কেমন নরমালের কথা বলছিস তুই?
_এই যেমন ধরো....যেমন ধরো....তোমরা নরমাল স্বামী স্ত্রীর মত কথা বলো?
_নরমাল স্বামী স্ত্রী কেমন কথা বলে?
_আরেহ আপু বোঝোনা। আর দুদিন পরে তো তোমরা এক ঘরে থাকবে! তোমাদের সাংসারিক আলাপ হয়েছে?
_সাংসারিক আলাপ সংসার হওয়ার পরে হয় ইনু।
_আরে তোমাদের মধ্যে রোমান্টিক আলাপ হয়েছে? ধূর বোঝোও না!
ইনশিরাহ বোনের দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ইনায়া বোকা বোকা হেসে বললো,“ভাইয়া আই লাভ ইউ বলেছে তোমাকে?”
আই লাভ ইউ! আই লাভ ইউ কেন বলবে? লোকটা ইনশিরাহকে পছন্দ করে! অনুভব করে কি? কেনো বলবে হুট করে আই লাভ ইউ তবে? এই বাক্যটা এতোটা হুট করে কাউকে বলা যায়? ইনশিরাহ বলতে পারবে?
অন্যমনস্ক হয়ে ভাবছে ইনশিরাহ।
ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির হর্ন বেজে ওঠে। বড়রা মাত্রই বেড়িয়েছে,তাদের এই সময়ে ফেরার কথা নয়। আর শেহু! তারও তো ফিরতে তিন চার ঘন্টা দেরী হবে!
দুইবোন দুজন দুজনের দিকে চোখ বড় বড় কয়েকপল তাকিয়ে থেকে একই সাথে একপ্রকার চেঁ'চি'য়ে বলে ওঠে,“ইরফান মির্জা!”
ঘর থেকে ছুটতে ছুটতে বেরোলো ওরা। এ যেন দৌড় প্রতিযোগিতা চলছে কে কার চেয়ে বেশি ছুটতে পারে, আগে যেতে পারে গন্তব্যের কাছে।
ইনুর স্বাস্থ্য ভারী হলেও আজ সে তার আপুকে হারিয়ে দিয়ে ছুটছে। সিঁড়িতে ধুপধাপ আওয়াজ তুলে নামছে দু'জন। বুকের মধ্যে তীব্র আনন্দময় উত্তেজনা ভাইকে চোখে দেখার সামনা সামনি।
সিঁড়ি থেকে নেমে লিভিং রুম পেরিয়ে,লবি পেয়ে সদর দরজার বাইরে পা রাখতেই থমকায় ওরা।
ইহান তাজওয়ার মির্জার লাল বিএমডব্লিউ থেকে আঙিনায় পা রেখেছে এ বাড়ির মেজো ছেলেটা, ইনশিরাহ আর ইনায়া নিঃশ্বাস আটকে দেখছিলো ভাইকে,পা থেকে মাথা।
জিন্স এবং একটা সাদা রঙের শার্ট। চুলগুলো ট্রিম করা। হাতে তার অদ্ভুত, বিদঘুটে রিস্টলেট টা নেই। কী ভীষণ মার্জিত আর অমায়িক লাগছে ভাইটাকে।
কিন্তু একি হাল! মাত্র ক'দিনে দানবীয় শরীরটা কেমন শুকিয়ে গিয়েছে, একটা কিশোর সুলভ ভাব এসেছে চেহারাতে! আগের রাগী মির্জাটি যেন নেই। এ যেন বাহ্যিকভাবে অন্য একটি ছেলে! শান্ত একটি ছেলে!
ইনশিরাহ আর ইনায়া একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। ইরফান দুই বোনকে দেখে একটা সরল হাসি হেসে দু'জনকে ডাকে হাত দিয়ে, শ্যামলা চেহারায়, ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে সরল হাসি, অল্পসময়ের জন্য।
ইহান বুকে হাত বেঁধে পাশেই হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। ভীষণ রকমের আবেগপ্রবণ হয়ে ইনশিরাহ আর ইনায়া ছুটে যায় ভাইয়ের কাছে।
ইনায়া গিয়ে আগে ধরলো, কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,“ও দাদান,তুমি অসুস্থ দাদান?”
ইরফান হেসে মাথা নাড়ে। ইনুকে দেখে। কিছুক্ষণ দেখে বলে,“শাড়িই পরিস? এমন মহিলা সেজে থাকিস সবসময়?”
চোখের পানি মুছে,হাসতে হাসতে ইনায়া মাথা নাড়ায়। ইনশিরাহ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, ঠোঁট কাঁপছে তার। ইরফান ইনায়াকে রেখে ইনশিরাহর দিকে তাকায়, ধীরে ধীরে একটা হাত বাড়িয়ে দেয় ইনশিরাহর দিকে। তৎক্ষণাৎ ভাইয়ের হাতটা লুফে নিয়ে ইনশিরাহ কপালে ঠেকিয়ে কান্নায় ভেঙে পরলো।
ইরফান হাসছে বোনের কাণ্ড দেখে। ইহান কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে ওদের তিনজনকে দেখছে, আদরের তিনজনকে।
ইরফান ইনশিরাহকে বলতে লাগলো,“তুই এমন কবে হলি! এতো ছিঁচকাদুনে কবে হলি! ছোটো ভাই! এই ছোটোভাই! এই শোন শোন। আচ্ছা কান্না থামা শোন!”
ইনশিরাহ নাক টানে, ওর গালে হাত রেখে ইরফান বলে,“এক হাতে তালি বাজানো দেখবি?”
দু'পাশে মাথা নাড়ে ইনশিরাহ। ইরফান বলে,“আমি তবুও বাজাবো।”
কথাটা শেষ না করেই ইরফান ইনশিরাহকে একটা মোটামুটি ধরণের চ'ড় মারে। খুবই সিরিয়াস ভঙ্গিতে। এটা আদৌও মজা ছিল না!
গালে হাত চেপে শ্বাস আটকে,চোখ বড় বড় করে ভাইকে দেখে ইনশিরাহ।
ইনায়া আর ইহান হতভম্ব ঘটনার আকস্মিকতায়! ইনশিরাহ ভীষণ রকমের হতবাক হয়ে অস্ফুটে বলে,“মারলি কেনো!”
শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে গা ছাড়া ভঙ্গিতে ইরফান জবাব দিলো,“এটা হচ্ছে ভাই জাতীয় শাসন! আ'ম হান্ড্রেট পার্সেন্ট শিয়র বড় দাদান নিশ্চয়ই তোকে এই চ'ড়টা মারেনি!”
এটুকু বলে,একটু থেমে সে আবারও বলতে শুরু করে,“ছিঃ শেষমেশ সাঈম ভুঁইয়া? দ্য গ্রেট রাঙ্গামুলা! ওয়াক থু!”
একদলা থুতু ফেলল ইরফান মাটিতে। ওরা তিনজন তখনও অবাক হয়ে দেখছে ইরফানকে। ইরফান ঘুরে সদরদরজার দিকে যেতে যেতে বলে,“অবশ্য তোদের তিন ভাইবোনের রুচি মিলে যায়, ছোটো থেকেই! আমার মতো ইউনিক নোস!”
কথাটা বলে ইরফান শিষ বাজাতে বাজাতে বাড়ির ভেতরে ঢোকে। ইনশিরাহ ঘুরে ইহানের দিকে তাকিয়ে চেঁ'চি'য়ে ওঠে,“এটাকে তুমি আনলে কেন দাদান! চেক করে আনোনি? এ তো একটুও শোধরায়নি!”
চলমান....