ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 56

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৫৬
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

শান্তিনীড়ে আজ সন্ধ্যার পরে ইনশিরাহ ইনায়ার মেহেদী-সঙ্গীত প্রোগ্রাম। তুনারা দলবেঁধে পার্লারে এসেছে দুপুরেই।
প্রতিযোগিতা হবে,এখন থেকে প্রোগ্রামের কয়টা দিন সুন্দরী প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে কে!
তাজরী হাসতে হাসতে বলছে,“ট্রাস্ট মি। ইশির ধারেকাছেও যাবো না আমরা। ঐ মেয়ে ধারালো সৌন্দর্য নিয়ে জন্মেছে।”

মানহা বলে,“আসলেই! সাঈমের জন্য আফসোস হয়, ব্যাটা অন্ধ! বলে কিনা ঠান্ডা মরা মাছ!”

তুনা বলে,“ঠান্ডা মরা মাছ ধীরে ধীরে মুঈন ফরাজীর উষ্ণ মৎস্যকন্যা হয়ে যাবে,চোখে দেখলেই দেখিস হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরবে!”

তুনার কথায় হেসে ওঠে বাকিরা।

রিং বাজছে তুনার ফোনের, ইনশিরাহ আর মুঈনকে নিয়ে আরও কিছু চমকপ্রদ মন্তব্য করে ফোনটা হাতে নিতেই তার চক্ষু চড়কগাছ! বাকিরা ওর দিকে তাকিয়ে বলে,“কিরে? কার ফোন?”

_সাঈম।
অস্ফুট স্বরে বলে তুনা। রিসিভ করবে না করবে না ভেবেও কলটা রিসিভ করে সে কানে ধরে। ওপাশ থেকে সাঈমের ঠান্ডা স্বর,“তুনা কলটা কেটো না, হাউ ইজ ইশি নাউ!”

তুনার মুখটা হা হয়ে গেল,পর পর কপাল কোচকালো,“হাউ ইজ ইশি নাউ মানে! ঐ, ঐ, তাতে আপনার কি?”

_কিছুই না! যাস্ট টেল মি,ইজ শি ওকে? ওদিন রাতে কি হয়েছিল!

_ওদিন রাতে ইশির বিয়ে হয়ে গিয়েছে, আকদ হয়েছে। বুঝলেন?
চেঁ'চি'য়ে বলে তুনা।

সাঈম চুপ হয়ে যায় কিছুক্ষণের জন্য, বললো,
_বিয়ে হয়েছে! বিয়ে তো দুদিন পরে!

_দুদিন পরে হবার কথা ছিলো! বাট মুঈন ভাইয়া আর ইশি বড্ড তাড়াহুড়ো করলো। ওরা দুজন দুজনের প্রতি এতোটাই দুর্বল হলো যে,ওদের আর তর সইছে না ! সোজা বিয়ে করে ফেললো। বুঝলেন ব্লাডি চিটার!

_দুর্বল হলো?
রোবটিক জবাব সাঈমের।

তুনা একটা পৈশাচিক হাসি হেসে বলে,“জি। মুঈন ভাইয়া এতোটাই হ্যান্ডসাম যে ইশি তো পুরো গলে গিয়েছে আর মুঈন ভাইয়া তো ইশির জন্য জান হাজির করে এখনই!

চুপ করে রয় সাঈম, তুনার মেজাজ ধীরে ধীরে বড্ড গরম হয়ে উঠেছে। গা জ্বলছে,সাঈমকে বলে,“ন্যাকামি হচ্ছে এখন? হাউ ইজ ইশি নাউ! এহহহ! যান গিয়ে বাপের পছন্দ করা একটা উত্তপ্ত জীবন্ত ইল মাছ বিয়ে করুন! যত্তসব ন্যাকা বোকা গর্ধব ছেলে। অ্যান্ড ইউ,লিসেন! আমাদের ইশি ঠান্ডা মরা মাছ নয়,ওটা আপনি! রাখুন ফোন!

দুম করে কল কে'টে বড় বড় নিশ্বাস নিচ্ছে তুনা। ওপাশে ফোন হাতে নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছে সাঈম। তার দৃষ্টি স্থির ফোনে, বিড়বিড় করে বললো,“বিয়ে হয়ে গিয়েছে!”

_______

সাত প্লেট ভাত খাবার ইচ্ছা পোষণ করেছিলো ইরফান মির্জা। কিন্তু ভাব-গতি দেখে মনে হচ্ছে একপ্লেটও ঠিকঠাক ভাবে খেতে পারবেনা। খাচ্ছে ধীরে ধীরে। ইহান মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসে ওকে দেখছে। ইনশিরাহ আর ইনায়া একটু পর পর ইরফানের প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছে। ইরফান খেয়ে এগোতে পারছে না যদিও।

বাইরে তখন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের লোকজন বাড়িটা সাজাচ্ছে, ব্যাক ইয়ার্ড সাজাচ্ছে, শান্তিনীড়ের গোটা এরিয়া সাজিয়েছে সেই সকাল থেকে।

ইরফান খেতে খেতে ইহানকে বলে,“এতো তাড়াহুড়ো। আজ মেহেদী-সঙ্গীত। কাল প্রোগ্রাম। পরশু ইশি শশুরবাড়ি যাবে,মানে এতো তাড়াহুড়ো!”

_তোর জন্য। তোর ছুটি তিনদিন।

ইরফান চোখ তুলে তাকায়,“তাই বলে ঠিকঠাক ভাবে আনন্দ করবে না!”

_তোকে ছাড়া আনন্দ হতোও না!

_আর আমি জেলে থাকলে?

ইহান চুপ করে রয়। ইনশিরাহ ভাইয়ের প্লেটে বিফ তুলে দেয়।

গেটের বাইরে তখন বাড়ির বড়দের দু'টো গাড়ি এসে থামে। সব কাজ শেষ করে দুই জামাইকে নিয়ে রেস্তোরাঁয় দুপুরের লাঞ্চ করে প্রিতম আর মুঈনকে তাদের গন্তব্যে ছেড়ে দিয়ে তারা এলো। ইলহাম মির্জাও তাদের সাথে আছে।
গাড়ি থেকে নামলো সবাই হাসতে হাসতে। বেশ ফুরফুরে মেজাজ সবার। কতদিন পরে একটু ঘোরাঘুরি করেছে এভাবে তিনভাই তাদের বৌ নিয়ে।
তবে হাসাহাসি হচ্ছিল অন্য একটি ব্যাপার নিয়ে। দুই জামাইয়ের কান্ড নিয়ে, বাড়ির বড়রা দর্শকের মতন বসে ছিলো, রেস্তোরাঁর বিল পে করা নিয়ে বাড়ির নতুন দুই জামাইয়ের মধ্যে রীতিমতো হাতাহাতি লেগে গিয়েছিল। কেউ কারো থেকে কম না। মুঈন বলেছে বিলটা আমি দিচ্ছি, প্রিতম বলেছে না ভাইয়া আমি দিচ্ছি।
মুরব্বিরা চেয়ে চেয়ে দেখছিলো তাদের। সামিন উঠে দাঁড়িয়ে একটা সুরাহা করেছিল অবশেষে, দু'জনকে অর্ধেক অর্ধেক বিল পে করার সাজেশন দিয়েছিলো।
আজ জামাইরা শশুর শাশুড়িদের ট্রিট দিয়েছিলো।
জামাইদের নিয়ে আলোচনা করতে করতে তারা সদর দরজার দিকে এগিয়ে যায় । পোর্চের ডানপাশে ইহানের গাড়িটা রাখা। সবাই থ'ম'কে দাঁড়িয়ে পরে সেখানেই। মুখ চাওয়াচাওয়ি করে একজন আরেকজনের সাথে। ইহানের তো রাতে ফেরার কথা ছিলো!
রিতুর বুকটা কেমন করে ওঠে। কয়েকপল গাড়িটাকে দেখে ছুটতে ছুটতে ভেতরে যায় ভদ্রমহিলা।

মুঈনকে তার কটেজের সামনেই লিফট দিয়ে গিয়েছিলো তার শশুর শাশুড়িরা। আজ নিয়ে সামনের তিনদিন তার ছুটি। কটেজের গেটের বাইরে বিশালাকার একটি ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। মুঈনের নববধূর আগমন উপলক্ষে কিছু ফার্নিচার অর্ডার করেছিলো সে। তার মধ্যে আছে একটি বিশালাকার ড্রেসিং টেবিল। বাড়ির মধ্যে বধূর জন্য একটা ছোট খাটো স্যালন বানিয়ে দেবে সে। কিছু কাবার্ডও অর্ডার করেছে। আরও ছিলো হোম ডেকরেশনের সামগ্রী। সে ছিল ব্যাচেলর এক ছন্নছাড়া মানুষ। অতি প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস ব্যাতীত তেমন কিছুই কেনার আগ্রহ পায়নি কখনো। এখন পাচ্ছে। গেটের দারোয়ান মুঈনকে দেখে সালাম দিলো, মুঈন এগিয়ে গেলো। দাড়োয়ানের হাতে একটা বিশাল ফ্লাওয়ার বুকে দেখে জিজ্ঞাসা সূচক দৃষ্টি দিয়ে তাকায় সে। দাড়োয়ান বলে,“স্যার এক লোক এসে দিলো। আপনার বিবাহিত জীবনের শুভেচ্ছা জানিয়ে।”

মুঈন গম্ভীর হয়ে বলে,“কোন লোক? আপনি আমাকে না জানিয়ে নিলেন কেন?”

দাড়োয়ান আমতা আমতা করছে,বললো,“স্যরি স্যার লিয়াকত চৌধুরীর লোক পাঠিয়েছে। ওনাদের বুকে ফিরিয়ে দেওয়ার সাহস ছিল না। আপনাকে ফোনে পায়নি কেয়ারটেকার।”

মুঈনের চোয়াল শক্ত হয়, দুদিন আগে প্রেস ক্লাবের একটা ঘটনায় মুঈন তাদের সাথে সমঝোতা করেনি দেখে লিয়াকত চৌধুরী মাইন্ড করেছিলেন। আজ ঘটা করে ফ্লাওয়ার বুকে পাঠিয়েছে!
মুঈন বুকেটা কয়েকপলক দেখে দাড়োয়ানকে ঠান্ডা স্বরে বললো,“ওটা বাইরের ডাস্টবিনেই রাখুন।”

কটেজে ঢুকে মুঈন একটা একটা লম্বা শাওয়ার নিয়ে বেরোলো। ধবধবে সাদা রঙের তোয়ালে দিয়ে মাথা টা ঠিকঠাক ভাবে মুছলোও না,তোয়ালেটা দু'কাধে ঝুলিয়ে বেডে বসলো। তার রুমের বিশালাকার ওয়াশরুমে তখন দুজন মিস্ত্রি ছিলো, মুঈন ইনশিরাহর জন্য একটা বাথটাব সেট করিয়েছে ওয়াশরুমে।

শ্যামলা সুদর্শন মুখটা,ভেজা ভেজা চুল থেকে টুপ টুপ করে পানি গড়িয়ে পরছে। সেদিকে খেয়াল নেই মুঈনের,সে একে একে তার বন্ধুদের কল দিতে ব্যস্ত। আজ শশুর বাড়িতে মেহেদী সঙ্গীত প্রোগ্রামের ইনভিটেশন আছে। সন্ধ্যার পরেই যাবে সবাই।
সবার সাথে যোগাযোগ করে মুঈন বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পরলো, এখন সে তার বৌয়ের সাথে কথা বলবে। ইনশিরাহ কলটা রিসিভ করলো, প্রতিদিন যতটুকু কথা হয় ঠিক ততটুকুই হলো। ইনশিরাহ জানালো তার ভাই এসেছে। মুঈন তাকে আনন্দ করার কথা বলে ফোন কাটলো। তারপর বাগদানের রাতে ইনশিরাহর ছবিগুলো একটার পর একটা দেখতে লাগলো। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো এক চিলতে পরিতৃপ্তির হাসি। এই এক নিখুঁত সৌন্দর্যের অধিকারীনি আর দুদিন বাদে তার ঘরময় পায়চারী করবে। যাকে দেখে মুঈনের সকাল হবে,যার সান্নিধ্যে রাত হবে।

রিতু এক ছুটে চলে গেলো ভেতরে। বাকিরা তার পেছন পেছন। ছুটতে ছুটতে রিতু ডাইনিং টেবিলের নিকটে গিয়ে দাঁড়াল। ইরফান খাওয়া থামিয়ে মাথা তুলতেই চোখাচোখি হলো মায়ের সাথে। শুকনো মরুভূমির মতো খড়খড়ে এক মাতৃআত্মা ছটফটাচ্ছে। রিতু ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রয়।

ইলহাম এসে দাঁড়ায় সেখানে। বাকিরাও অবাক হয়ে দেখছে ইরফানকে। সামিন ইহানকে বললো,“সন্ধ্যায় ফেরার কথা ছিলো না?”

_ছাড় পেয়ে গেলাম আগে ভাগেই!

সবাই দেখতে লাগলো ছেলেটাকে। বয়স কম কম লাগছে,মনে হচ্ছে বাইশ তেইশের প্রানবন্ত এক যুবক সদ্য ভার্সিটিতে উঠেছে।

রিতুর গলা ভেঙে আসে। ইরফান মায়ের থেকে চোখ নামিয়ে ধীর স্থির শেষ লোকমা মুখে পুরে চিবুতে চিবুতে বলে,“সব ঠিক ছিলো তবে মাম্মা লবণ বেশি হয়েছে! আর মাছ ভুনাতে জিরে টা কেন দাও! বিরক্ত লাগে মাম্মা!”

রিতুর চোখ বেয়ে পানি পরছে, আলগোছে সে তা মুছেও নিলো। ইরফান প্লেটে হাত ধুয়ে ফেলে, উঠে চলে আসে মায়ের কাছে। এসে রিতুর মাথা থেকে আঁচল নামিয়ে হাত টা মুছে নেয়। রিতু ছেলেকে দেখে,কিছু বলে না মুখে।
ইরফান মুখটা মুছে নিয়ে মাকে দু'হাতে আগলে ধরে নিজের কাছে টেনে মায়ের দু'গালে চুমু খায় দু'টো।
তারপর মাকে ছেড়ে ধীরে হেঁটে ইলহামের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলে,“আসসালামু আলাইকুম পাপা।”

ইলহাম একটু অবাক হয়েই সালামের জবাব দিলো ছেলেকে,শান্ত স্বরে। ইরফান একে একে বাড়ির সব বড়দের সাথে কুশল বিনিময় করে। বড়মায়ের হাত ধরে হাতে চুমু খেলো,ছোটোমায়ের হাত ধরে হাতে চুমু খেলো। রিতু গম্ভীর কন্ঠে ছেলেকে বলে,“গিয়ে গোসল করে একটু ঘুমিয়ে নাও। বিকেলের পর থেকে সব মেহমানরা চলে আসবে। তখন তোমাকে প্রয়োজন হবে আমাদের।”

ইরফান ভদ্রভাবে মাথা নেড়ে বলে,“জি।”

ধীরস্থির হেঁটে সিঁড়ির কাছটাতে যায় ইরফান। ভীষণ কৌতুহলী হয়ে ওকে দেখছিলো ইনশিরাহ ইনায়া, ইনশিরাহ অস্ফুটে পাশে দাঁড়ানো ইহানকে বলে,“একটু আগে না কত বাঁদরামি করলো! এখন ভোলটা পাল্টে কি নিষ্পাপ সেজেছে দেখেছো বড়দের সামনে! একটা আস্ত গিরগিটি!”

ইহান শুধু দেখে সবাইকে। বাইরে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের লোকজনের কথার আওয়াজ হচ্ছে। সামিন একটা লম্বা শ্বাস ফেলে সবার দিকে তাকিয়ে বলে,“সবাই সন্ধ্যার পরে অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি হও, দু বাড়িতে যোগাযোগ করো। আমি আর ইলহাম উপরে যাচ্ছি। আমাদের হিসেব নিয়ে বসতে হবে।”

________

দীর্ঘ দেড়মাস পর নিজের ঘরটাতে পা রাখে ইরফান। কেমন যেন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে তার। ঘরে ঢুকে একলাফে বিছানায় শুয়ে পরলো সে, এসির পাওয়ার বাড়িয়ে বিছানায় কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করলো। তারপর উঠে নিজের ঘরটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। সবকিছু নিজের যায়গা থেকে এক ইঞ্চিও এদিক সেদিক হয়নি!
কাবার্ড থেকে একটা তোয়ালে,একটা থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট বের করে নেয় ইরফান গোসল করবে বলে। পরপর নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে থ্রি কোয়ার্টার প্যান্টটাকে রেখে একটা ফুল ট্রাউসার্স বের করে নেয় সে।

দীর্ঘসময়ের গোসল শেষে বেড়িয়ে এসেই দেখে বড় বাবা তার বিছানায় চুপচাপ বসে আছে। ইরফান জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় সামিনের দিকে। সামিন রাশভারী গলায় বলে,“বসো।”

ইরফান বড় বাবার থেকে অনেকটা দূরত্ব বজায় রেখেই সামনাসামনি বসে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে লাগলো।

সামিন ওকে দেখতে দেখতে বলে,“ও বাড়ি,মানে ইনুর শশুরবাড়ির লোক আসবে সবাই।”

ইরফান মাথা তুলে বড় বাবার দিকে চায়। সামিন বলতে থাকে,“একটু ঘুমিয়ে নাও। সন্ধ্যার পরে এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ইচ্ছে করলে নেবে। তবে প্রিতমের সাথে হেসে সালাম বিনিময় করবে, প্রেরণাকে দেখলে সালাম দেবে। এবং....”

এটুকু বলে সামিন একটু থেমে বলে ওঠে,“ভুল করেও প্রনমি মেয়েটার সামনে যাবে না।”

ছেলেকে খুব কড়া করে বলতে চাইলেও পারলো না সামিন। অত্যন্ত নম্র স্বরেই বললো কথাটা। ইরফান কিছুক্ষণ বড় বাবাকে দেখে স্মিত হাসে। তারপর বলে ওঠে,“ডোন্ট ওরি! আমি একটা লম্বা ঘুম দিতে চাচ্ছি বড় বাবা,এসব অনুষ্ঠান নিয়ে মাথাব্যথা নেই। আসলে ঐ শালারা.....”

এটুকু বলে থতমত খেয়ে যায় ইরফান, সামিন তাকিয়ে আছে, ইরফান নিজেকে শুধরে নিয়ে বললো,“মানে ওই ওখানের লোকগুলো খুব ডিসিপ্লিনড! বিকেলে একটু ঘুমাতে পারিনা। এখন ঘুম দেবো। তুমি যাও।কাল প্রোগ্রামে থাকবো চিন্তা করো না। যাও।”

সামিন চুপচাপ উঠে চলে যায়। ইরফান সত্যি সত্যি বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে দু'চোখ বুজে থাকে।

_______

সন্ধ্যা নাগাদ মেহমানরা আসতে শুরু করেছে। ঝা ঝকঝকে বাড়িটায় অন্দরমহলে, আঙ্গিনায় ঠিকরে পরছে আলোক রোশনাই। মৃদু আওয়াজে ক্লাসিক মিউজিক বাজছে। ইনায়ার বান্ধবীরা নিচতলার গেস্ট রুমে নিজেদের পছন্দের গানে নাচ প্রাকটিস করছিলো,নাচবে তারা আজ। তখন বাইরে লিভিং রুমে সামিনের হাকডাক শোনা গেলো, একে ডাকছে, তাকে অর্ডার করছে। আলো বারবার করে বলছে,“আপনি শান্ত হোন। যথেষ্ট মানুষ আছি আমরা কাজ করার। অতিরিক্ত চাপ নিচ্ছেন।”

সামিন স্ত্রীর কথায় পাত্তা না দিয়ে হাক ছাড়তে ছাড়তে ইলহামকে ডাকে,“আরে এই ইলহাম। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের লোকজন কোথায়। এদিকে আয়।”

তিন ভাইয়ের একই অবস্থা। শুধু শুধু পাক খাচ্ছে গোটা বাড়িতে। বাড়ির বৌয়েরা এই দৃশ্য দেখে চেয়ে চেয়ে।

শেহা এসেছে বাড়িতে। শান্ত কিছুক্ষণ থেকে চলে গিয়েছে বিকেলেই। মারিয়া সোফিয়ারাও এসে পরেছে। কাছের দূরের আত্মীয় স্বজনে বাড়িটা গিজগিজ করছে। তবে দু'বোনের শশুর বাড়ী থেকে কোনো মেহমান এসে এখনও উপস্থিত হয়নি।

ইহান সবকিছুর দেখভাল করছিলো। খুব খাটুনি গিয়েছে বিকেল থেকে।
ইনশিরাহর ঘরে তখন ইনশিরাহ আর ইনায়াকে সাজাচ্ছিল তুনারা। আজকের প্রোগ্রামের ড্রেসকোড,প্রত্যেককে মেরুন রঙের পোশাক পরতে হবে।
দুই বোনকে ওরা মেরুন রঙের শিফনের শাড়ীতে জরালো, সাজিয়ে দিলো।
শেহা চুপচাপ বিছানায় বসে ছিলো। ইনায়া ওকে বারবার ধ'ম'কে ওঠে,“কিরে রেডি হ! ঐ সালোয়ার স্যুট টা পর। তোর জন্য নিয়েছি!”

মেহেদী পরানোর জন্য চারজন আর্টিস্ট আনা হয়েছে। দুই কনেকে নিয়ে স্টেজে বসানো হলো পাশাপাশি। এই অনুষ্ঠানটা বাড়ির অন্দরমহলে হবে।
ঠিক সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ এসে পৌঁছাল এ বাড়ির বড় জামাই মুঈন ফরাজী। নিজেকে আবৃত করেছে একটা মেরুন রঙের পাঞ্জাবিতে। পাঞ্জাবিতে কখনো কেউ দেখেনি মুঈনকে। মেদহীন শরীরে ভীষণ মানিয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী পোশাকটা। নতুন বরকে দেখে মুগ্ধ হতে হবেই হবে আজ!
তার শ্যালিকা সমাজ তাকে এনে বসালো ঠিক ইনশিরাহর পাশে। দু'জনকে দেখে চোখ জুড়িয়ে নিচ্ছিল সবাই,ঠিক রাজযোটক যেন।

মুঈন আড়চোখে বৌকে দেখছিলো। আজ সাজসজ্জা ভীষণ আলাদা। শ্যামা গাল দু'টো গোলাপী আভায় জ্বলজ্বল করছে। পাতলা দু'টো অধর রাঙা হয়েছে একেবারেই হালকা মেরুন রঙের লিপস্টিকে। গলায় কানে ফুলের গয়না। সামিন ইয়াসার মির্জার রোবট কন্যাকে বাগানের একমাত্র মেরুন জারবেরা মনে হচ্ছে। বেহায়া চোখ নামাতে চেয়েও পারেনা মুঈন। ইনশিরাহ স্বাভাবিক ভাবে মুঈনকে বলে,“আপনাকে কোল্ড ড্রিংকস দিতে বলবো?”

এটুকু রিতু ঝারি মেরে মেরে একশো বার বলে দিয়েছে ইনশিরাহকে, জামাই এলে যেন ইনশিরাহ তার কাছে পাঁচ মিনিট পরপর তার কিছু লাগবে কিনা, অসুবিধা হচ্ছে কিনা এসব জানতে চায়। ইনশিরাহর হাত তখন মেহেদী-রাঙা হচ্ছিল,একটু একটু করে দুহাত ভরে গেলো অভূতপূর্ব আঁকাবাঁকা নকশাতে। হেনা আর্টিস্ট বললেন,“কি নাম লিখবো গ্রুমের?”

ইনশিরাহ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে মহিলার দিকে। তিনি আবারও বললেন,“কি নাম লিখবো গ্রুমের?”

মুঈন পাশ থেকে জবাব দিলো,“ইটস মুঈন। M U Y I N...মুঈন।”

চকিতে ফিরে মুঈনের দিকে একপলক তাকালো ইনশিরাহ। মুঈন তার চোখের দিকেই তাকিয়ে ছিলো। তার অমন মদ্যক চাহনি দেখে ইনশিরাহর ভেতরটা কোথাও লজ্জায় কাঁপল, এই অনুভূতি কিন্তু তখনও ধরতে পারেনি নববধূ, তার বোঝার কথাও নয়। ধীরে ধীরে দৃষ্টি নত করে ইনশিরাহ দেখলো তার নকশা আঁকা হাতের ফাঁকা গোল যায়গাটা দখল করেছে পাঁচটা ইংরেজি অক্ষর,M U Y I N। ইনশিরাহ অবাক হয়ে দেখতে লাগলো নিজের হাত।

মুঈনের শ্যালিকারা এসে হুমরি খেয়ে পরলো,“এই দুলাভাইয়ের হাতে ইশির নাম লিখে দাও কেউ।”

মুঈনের পক্ষ থেকে যারা এসেছে তাদেরকে আপ্যায়ন করছে আলো আর রিতু। পরী এতো ছোটাছুটি করতে পারেনা,হাফ ধরে যায়, তাই সে মেয়েগুলোকে সঙ্গ দিচ্ছিলো।

আজান আয়াতের বাচ্চারা বাড়িতে আগত মেহমানদের বাচ্চাদের সাথে হৈহৈ করছে। পুরো জমজমাট বাড়িটা।

ঠিক তখনই গেটের সামনে প্রেরণাদের ক্যাব এসে দাঁড়ায়। তাদের স্বাগত জানাতে ইহান এবং ইলহাম গেটের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলো।

ক্যাব থেকে নেমে প্রেরণা ইলহাম মির্জাকে সালাম দিলো। একটা সাদা রঙের বেনারসী সফট কাতান, শাড়ির পাড়টা মেরুন রঙের। চুলে সেই একটা লম্বা বেনী। এই এতটুকু সাজ সাজলো সে।
ইহান দেখলো, সাথে সাথে চোখ নামিয়েও নিলো। প্রিতম নেমে এসে প্রনমিকে ধরে ধরে নামাল। ওদের বাড়ি থেকে জামি শুভ সাফওয়ান এসেছে, মিস জেনি প্রেরণার ফুপির সাথে বাড়িতে থেকে গিয়েছে।

ইলহাম মির্জা প্রনমিকে দেখে একটু স্বস্তি পেলো যেন! যাক মেয়েটা কিছুটা ঠিক আছে তবে! নাহলে এ বাড়িতে আনা এতোটাও সহজ ছিলো না ওকে।
শুদ্ধকে জামি কোলে তুলে নিলো, শুরুতেই শুদ্ধর চোখ গেল ইহানের দিকে। দু'জনের চোখাচোখি হতেই দু'জনে ঠোঁট প্রশ্বস্ত করে হাসলো। হাত নেড়ে ইহান শুদ্ধকে বললো,“হ্যাললোওও”
শুদ্ধও ঠিক সাথে সাথে শব্দটি বলেছে। দু'জনে আবারও হেসে ফেললো। শুদ্ধ হাসছে মুখে হাত চেপে। এই আংকেলটার সাথে কথা বলতে গেলেই এমন হয়। শুদ্ধ দারুণ মজা পায় এতে।

প্রেরণা গিয়ে প্রনমির আরেকটা হাত ধরলো। নিচু স্বরে বোনকে অভয় দিয়ে বললো,“সামনে ইলহাম আংকেল আর তোমার ইহান ভাইয়া। সালাম দাও।”

প্রণমি নিচুগলায় সালাম দিলো।

একটা মেরুন রঙের সালোয়ার স্যুট পরেছে প্রনমি। দীঘল চুলগুলো ছড়িয়ে আছে পিঠে। সাজিয়ে দেয়নি তাকে প্রেরণা,আর তার সাজবার প্রয়োজনও পরেনা।

ভাইয়া আপুর হাত ধরে আরো একবার পা রাখলো এই বাড়ির গেটে। যেখানে সে আরও একবার এসেছিল। তাকে টেনে হিচরে নিয়ে আসা হয়েছিলো।

আর্টিস্ট রা মেয়েগুলোর হাত রাঙিয়ে দিচ্ছে। এখনও মেয়েদের নৃত্যানুষ্ঠান আরম্ভ হয়নি। ওদের খিলখিল হাসিতে মুখরিত হচ্ছে চারপাশ। প্রেরণাদের আপ্যায়নের পরে এখানে বসিয়ে রাখা হয়েছে। অদূরে স্টেজে মুঈন ইনশিরাহ চুপচাপ বসে আছে। প্রিতম ইনায়া একপাশে বসে গল্প করছে, জামিরাও ওদের কাছে।

ইনায়ার বান্ধবীগুলো প্রেরণাকে টানতে টানতে আর্টিস্টের কাছে নিয়ে এসে বসিয়ে দিলো। বাধা দিয়ে প্রেরণা বললো,“এই না। আমি মেহেদী পরবো না।”

বোনের হাত ধরে চুপচাপ বসে আছে প্রনমি। আলো আর পরী বারবার খোজ নিচ্ছে এসে।
এতো কিছুর মাঝেও প্রেরণা সতর্ক হয়ে আশেপাশে দেখে শুধু। ঐ ছেলেটাকে খোঁজে, যার কাছ থেকে প্রনমিকে আগলাতে চায় সে।

বাড়ির বড়রা যথেষ্ট অমায়িক। এমনকি ঐ রিতু আন্টিও। প্রনমিকে দেখেই মাথায় হাত বুলিয়েছে। একটু একটু স্বস্তি পাচ্ছে প্রেরণা।

ওর আশেপাশে হাসাহাসির চাপা শব্দ। ইনায়ার দুজন বান্ধবী আর্টিস্টকে দিয়ে নিজেদের হাতে ই অক্ষর টা লিখিয়ে হাসিতে ফেটে পরলো।
প্রেরণা কৌতুহলী হয়ে ওদের দেখলো,খেয়াল করলো ওদের হাত। ইনায়ার এই বান্ধবীগুলো ইরফানকে গণহারে পছন্দ করে প্রেরণা শুনেছে ইনুর কাছে।
হঠাৎ রাগে প্রেরণার গা রিরি করে ওঠে এমন ছ্যাবলামি দেখে। কত বড় বড় এক একটা মেয়ে অথচ মাথায় বুদ্ধি বিবেচনা কিছুই নেই! একটা গালিবাজ,গুন্ডা ছেলেকে নিয়ে মাতামাতি!
কি অদ্ভুত এই উঠতি মেয়েগুলো! কি ভয়াবহ ফ্যান্টাসিতে ভোগে এরা!

ওদের সাথে প্রেরণা অনেকটাই ফ্রি। মাঝেসাঝে যায় ইনায়ার সম্পর্ক ধরে প্রেরণাদের অ্যাপার্টমেন্টে। ওদের এই নির্লজ্জতা দেখে কড়া গলায় প্রেরণা বলে উঠলো,“হাইব্রিস্টোফিলিয়া.....টক্সিক গালিবাজ,ক্ষ্যাপাটে, গুন্ডাটাইপ, অপরাধী ছেলেদের নিয়ে ফ্যান্টাসিতে ভোগা মেয়েদের এই রোগটার নাম হাইব্রিস্টোফিলিয়া। বর্তমানে গণহারে সবাইকে ধরছে এই রোগে, বিশেষ করে তোমাদের বয়সী মেয়েদের! একটা গালিবাজ, গুন্ডা, মারকাটারি পুরুষকে নিয়ে তীব্র ফ্যান্টাসি! এদের প্রতি দুর্বল হওয়া। তাদের মধ্যেই আসল পৌরুষত্ব খুজে পাওয়া! এই ধরণের মেয়েদের সাথে উচিত কি জানো? উল্টো করে ঝুলিয়ে দুই বেলা নিয়ম করে চাপকে সিধে করা। এদের মানসিক ডাক্তার দিয়ে কিছু হয়না। এদের লাই দিলে নিজের জীবন আর পরিবারে ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনে এরা। তবে তোমাদের সাবধান করে দিচ্ছি মেয়েরা,একটা কথা মাথায় রাখবে। কঠোরতা একইসাথে কোমলতা, গম্ভীরতা, দু'চোখে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নারীর প্রতি অগাধ সম্মান। তিনটা জিনিসই একজন পুরুষের পৌরুষত্ব প্রকাশ করে। এসব ফিল্ম দেখে কখনো ফ্যান্টাসিতে ভুগতে যেও না। বিপদে পরবে। ”

হুট করে কেন জানি প্রেরণার রা'গ উঠেছে,তাই গড়গড় করে বলেছে কথাগুলো। ওরা সবাই হা করে তাকিয়ে আছে প্রেরণার দিকে। প্রেরণা এই জ্ঞানগুলো ওদের কেন দিচ্ছে ওরা বুঝতে পারলো না। প্রেরণা হঠাৎ গম্ভীরতা কমিয়ে মিষ্টি করে হাসলো ,বললো,“এই দেখো! কি থেকে কি বললাম! আসলে বয়স হচ্ছে তো! তাই ছেলেমেয়ে দেখলেই জ্ঞান ঝাড়তে ইচ্ছে করে,স্যরি!”

ওরা বোকা বনে গিয়েছে পুরো। প্রেরণা প্রনমিকে বসিয়ে রেখে একটু উঠে দাঁড়ায় ইনশিরাহর কাছে যাবে বলে, ইনায়ার ইচড়েপাকা বান্ধবীদের হা হয়ে যাওয়া মুখটা উপেক্ষা করে ঘুরে দাঁড়াতেই ইহানের মুখোমুখি হলো সে।

চলমান......

[ এই গল্পটা আমি আজীবন লিখবো। স্লো স্লো লিখবো। তাই দুম করে কাপলদের একে অপরের প্রেমে ফেলতে পারছি না। দুঃখিত। এই বাড়িতে দুমদাম বিয়েই হয়, অনুভূতি হয় একফোঁটা দুফোঁটা করে। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 56 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন