ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 57

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৫৭
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

ইনায়ার ইচড়েপাকা বান্ধবীদের হা হয়ে যাওয়া মুখটা উপেক্ষা করে ঘুরে দাঁড়াতেই ইহানের মুখোমুখি হলো প্রেরণা।

কঠোরতা একইসাথে কোমলতা, গম্ভীরতা আর দু'চোখে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নারীর প্রতি অগাধ সম্মান নিয়েই দাঁড়িয়ে ছিলো এ বাড়ির শান্ত, গম্ভীর বড় ছেলেটি।

প্রেরণা দেখলো,তবে টের পেলো না ঘুনাক্ষরেও,এক পরনারীর প্রতি মুগ্ধতা জড় করার পাপ,পাপের ঘড়া দিনকেদিন ভর্তি করে ফেলছে এই বাড়ির বড় ছেলে ইহান তাজওয়ার। যদি এতো বুঝ নিয়ে চলা প্রেরণা এটুকু বুঝে ফেলতো,তবে সে ভুল করেও আসতো না এই লোকের সামনে। যদি ইহানের মনের ভাবনা বুদ্ধিমতী প্রেরণা বুঝে নিতো তবে ভীষণ রকম ক্ষে'পে যেত প্রেরণা। বলতো,“আপনি পাগল? এ হয়? দূরে থাকবেন আমার থেকে!” এমন অনাসৃষ্টি কান্ড প্রেরণা কি সহজ ভাবে নেবে? কখনো নয়!

প্রেরণা ভদ্রভাবে একটা স্নিগ্ধ হাসি ইহানকে উপহার দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। ইহান তার অভ্যেস মতন ঘা'ড় ঘুরিয়ে দেখে প্রেরণাকে, গম্ভীর মুখভঙ্গি অথচ অন্তরে অদ্ভুত আন্দোলন। ইহান ঘুরে শুদ্ধকে দেখলো। হাত বাড়িয়ে ইশারা করে ডাকলো শুদ্ধকে। শুদ্ধ ছুটতে ছুটতে এলো মামার কোল থেকে, ইহান হাত বাড়িয়ে লুফে নিলো আদুরে প্রাণটাকে। কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলে,“হেই বাচ্চা! কোল্ড ড্রিংকস খাবে?”

শুদ্ধ দু'পাশে ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলে,“না না! মাম্মা ওগুলো খেতে বারণ করেছে! বলেছে ওসব বড়রা খাবে।”

_তোমাদের জন্যে আছে তো! অরেঞ্জ জুস, ওয়াটার মেলন জুস, ম্যাংগো জুস, লেমন জুস, স্ট্রবেরী, কোনটা খাবে?

_অরেঞ্জ!

ইহান শুদ্ধকে জুসবার থেকে একটা অরেঞ্জ জুস নিয়ে দেয়। এখানে,এই পরিবেশে বাচ্চাদের জমছে না। ইহান শুদ্ধকে মুগ্ধ, মুয়ীজ আর বাকি বাচ্চাদের সাথে দোতলায় পাঠিয়ে দেয়,প্লে রুমে।

সোফিয়া আর মারিয়া শাড়ি পরে সেজেগুজে এলো নাচবে বলে। ওরা দু'জনেই খুব ফুর্তিবাজ। আজান আয়াত এখানে উপস্থিত নেই, দু'জনেই আগামীকাল সকালে এসে পৌছাবে।

ইহান ঘুরে আবারও প্রেরণার দিকে তাকায়, তাকায় প্রনমির দিকে। তারপর তাকায় দোতলায় । ইরফান এখনও ঘুমাচ্ছে! অস্বাভাবিক ঠেকছে ইহানের কাছে বিষয়টা!

শেহা রেডি হয়ে ঘর থেকে বেরোয়, ত্রস্ত পায়ে হেঁটে রাগী মির্জার ঘরের সামনে এসেই থ'ম'কে দাঁড়ায় সে। বিকেলে এ বাড়ি পৌঁছে রাগী মির্জার সাথে দেখা হয়নি তার, পালিয়ে পালিয়ে থাকে সে। মানুষটার সামনে দাঁড়াতে পারবে না সম্ভবত শেহা। শেহার এই লুকোনো অনুভূতি,এই অস্বাভাবিকতা ঐ বুদ্ধিমান ছেলে পড়ে নেবে। তারপর! তারপর খুব খারাপ হবে! একটু থেমে শেহা ছুটতে ছুটতে নিচতলার সিঁড়ির কাছে যায়। ইরফানের চোখ বাঁচিয়ে।

নিচে নেমেই শেহা প্রথমেই দেখলো প্রনমিকে। যে ইনায়ার বান্ধবীদের কথা শুনছিলো চুপ করে বসে। শেহা আপাদমস্তক দেখলো মেয়েটাকে। কি সুন্দর! কি সুন্দর একটা মেয়ে! শেহার মেয়েটার সৌন্দর্য নিয়েও হিংসা হয়। বেশিক্ষণ তাকিয়ে না থেকে শেহা ঘুরে ইনশিরাহর কাছে গিয়ে চুপ করে বসে থাকে।

দু'হাতে মেহেদী রাঙিয়ে ইনশিরাহ মেয়েদের নাচ দেখছিলো। রুশফি নাচছে। বাড়ির বড়রা কেউ এই প্রোগ্রামে অংশ নেয়নি। তারা ব্যাকইয়ার্ডে আড্ডা জমিয়েছে মুরব্বি মেহমানদের সাথে। এখানে কেবল তরুণেরা!

রুশফি মেয়েটা দারুণ নাচে,সবাই নাচ তুলেছে বহু পুরনো দিনের গানে।
ইনশিরাহ দেখছিলো নাচ,মুঈন দেখছিলো তার বধূকে। খোলা চুলগুলো মৃদুমন্দ বাতাসের দাপটে এলোমেলো হয়ে মুখের সামনে এসে হুমরি খেয়ে পরে বিরক্ত করছিলো ইনশিরাহকে। মুঈন কিছুক্ষণ তা দেখে, চুম্বকের মতন তার আঙুল কেউ টেনে নিচ্ছে,বুঝতে পারেনি ফরাজী। নেশালো দৃষ্টিতে তাকিয়ে,বৌয়ের কপাল থেকে চুল গুলো সরানোর নিমিত্তে আঙুল ছোঁয়াতেই হুট করে ইনশিরাহ কেঁপে উঠে ছিটকে যায় একপ্রকার।

ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব মুঈন ভীষণ রকমের লজ্জা পেয়ে চোখ মুখ শক্ত করে বসে থাকে। কেউ ওদের এই দৃশ্যটা খেয়াল করেনি। ইনশিরাহ নিজেকে সামলে আবারও এগিয়ে আসে, নির্লিপ্ত হয়ে বসে থাকে মুঈনের পাশে। তার দৃষ্টি নত। হুট করে ঘাবড়ে গিয়ে ধরফরিয়ে উঠেছিল সে। মুঈন চুপচাপ থাকে কিছুটা সময়। তারপর ইনশিরাহকে বলে,“স্যরি! চুলগুলো!”

ওদিকে হৈচৈ পরে যায়। দলবেঁধে নেমেছে ইনায়ার বান্ধবীরা। এতো নাচানাচি দেখে জামি দাঁত বের করে হাসলো। প্রিতমের দিকে তাকিয়ে বলে,“হেহেহ! তোর নিব্বি শ্যালিকারা এক একটা কেঁচো নাকি! এতো মোচরামুচরি করছে কেন!”

সাফওয়ান আর শুভ দু'হাতে মুখ চেপে ধরে হাসছে। প্রেরণা গিয়ে আবারও বোনের পাশে বসে পরে বোনকে আগলে নিয়ে।
এতো হৈচৈয়ের মাঝে মনক্ষুণ্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো ইনায়া। এতো নাচানাচি দেখে তারও নাচতে ইচ্ছে করছে! কিন্তু ঐ যে সবাই! বলবে কি বেলাজ মেয়ে! যদিও কেউ বলবে না মুখে,মডার্ন যুগ। কিন্তু মনে মনে ভাববেই ভাববে, মনে মনে বলবে হাতির মতো শরীরটা নিয়ে নাচতে এসেছে দেখো!

কিছুক্ষণ উসখুস করে শেষমেষ পারলো না নিজেকে ধরে রাখতে,রিন্তুকে ফিসফিসিয়ে বলে,“তোরা আমাকে টেনে নিয়ে যাবি। আমি ভাব দেখাবো আমি নাচতে চাইনা। কিন্তু তোরা জোর করবি? ঠিকাছে?”

রিন্তু তখনই টানাটানি শুরু করলো,ইনায়া বলে,“এই এখন না। একটু পরে।”

প্রিতম পাশে দাঁড়িয়ে বৌকেই লক্ষ্য করছিলো। দু ঠোঁটে চঞ্চলতা ,দু চোখে সংকোচ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে ধাক্কা দিয়ে ঠেলে পাঠিয়ে দেয় ওদের কাছে। বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে ইশারায় বলে,“অল দ্য বেস্ট!”

যে যেভাবে পারছে নাচছে! নাচানাচি শেষ করে যখন ক্লান্ত হলো সবাই তখন বাড়ির বড়রা এলো। তাড়া দিলো ডিনারের। খেয়ে দেয়ে গানের আসর বসবে এখানে। তখন বড়রাও পার্টিসিপেট করবে।

ইরফানের ঘুম ভাঙে ঠিক রাত আটটায়। আসলেই একটা লম্বা ঘুম দিয়েছে সে। চোখ মেলে পরিস্থিতি বুঝতে সময় নিলো সে। সে কোথায়! এখানে কি করছে ভাবতে ভাবতে কানে ঝড় তুললো টুইনটিজের গান,“বোলে চুড়িয়া! বোলে কাঙ্গানা!”

তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বসে কপাল কুঁচকে আশেপাশে তাকায় সে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে এতো শব্দ নেয়া যাচ্ছে না। জলদি জলদি মুখে পানি ছিটিয়ে এসে কানে বালিশ চেপে ইরফান শুয়ে থাকে। ভীষণ রকমের ইচ্ছে করছে কফি খেতে! তবে ঘর থেকে বেরোনোর ইচ্ছে নেই তার! চুপচাপ শুয়ে থাকে নিজের ঘরে।

নৈশভোজের পাট চুকিয়ে সবাই বসলো গানের আসরে। রাত গভীর করবে না কেউ! কালই এ বাড়িতে অনুষ্ঠান।

গানের বেলায় ইনশিরাহ,ইনায়ার বান্ধবীরা লবডঙ্কা! এ তাকে মাইক্রোফোন দিচ্ছে,ও একে মাইক্রোফোন দিচ্ছে! বড়রাও এসে অংশ নিলো সবার সাথে।

ইহান হঠাৎ করে প্রণমিকে ডেকে উঠলো,“প্রণমি!”

প্রণমি সাড়া দিলো। ইহান বলতে লাগলো,“তুমি গান শোনাবে না আমাদের?”

পরপর ফাঁকা ঢোক গিললো প্রণমি। প্রেরণা শুকনো মুখ করে বোনের দিকে তাকায়। এ বাড়ির বড়রা প্রত্যেকেই একবার করে কথাটি তুলেছে। প্রেরণা খুব সংকোচ নিয়ে প্রণমির পিঠে একটা হাত রেখে নিচুগলায় বলে,“একটা গাও প্রণমি। আমরা একটু পর বেড়োবো।”

আড়ষ্টতায় জমে থাকে প্রণমি। ইনায়া বলে ওঠে,“গাইবে না?”

ভাবীর কথায় মুখ শুকিয়ে যায় প্রণমির। কথাটা বলেছে ভাবী রাগ দেখিয়ে। সামিন বললো,“তুমি তো এতো অবাধ্য নও শুনেছি!”

_আমি শুধু রবীন্দ্র সংগীত গাইতে পছন্দ করি আংকেল।
কিছুসময় নীরব থেকে প্রণমি মুখ খুললো। সামিন বললো,“আমরা তোমার গলাতে রবীন্দ্র সঙ্গীতই শুনতে চাই!”

মিউজিকের আওয়াজ থেমেছে। ইরফান কান থেকে বালিশ সরিয়ে উঠে বসলো। নিচে কি হচ্ছে সেটা কল্পনা করছে ইরফান! সবাই নাচছে, গাইছে! ইনায়া তার পেয়ারের বরকে নিয়ে নাচানাচি করছে! ইনশিরাহ চোখমুখ কঠিন করে অফিসারের পাশে বসে আছে। আর ঐ জ্ঞানী আপা, সে সম্ভবত তার দুধের দাঁত না পরা বোনকে কোলে নিয়ে বসে আছে। আর ইরফানের অতি ভদ্রলোক দাদান, সে নিশ্চয়ই হাবলার মতো ঐ জ্ঞানী আপাকে হা করে দেখছে! এটা ছাড়া তো আর কিছু করার মুরোদ নেই তার ভদ্রলোক দাদানের! সবদিক থেকে পারফেক্ট দাদানের এই একটা ব্যাপার ইরফানের বিরক্ত লাগে! সব রেখে ঐ জ্ঞানী আপাতে ডুবতে চায়! অবশ্য মাম্মা ডুবতে দিলে হয়। মাম্মা যেদিন এসব জানবে সেদিন!.....আর কিছু না ভেবে ইরফান বড় দাদানের ভবিষ্যত মনে করে হাসলো!

ইরফান শুয়ে পরলো! যার যা ইচ্ছা করুক। তাতে তার কি! প্রনমির মুখটা হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার। একটা লং ফ্রক,একটা আদুরে,স্নিগ্ধ পবিত্র মুখ, দু'পাশে দু'টো বেনী,আর গালে লাল তিল।

ইরফান দু'চোখ বন্ধ করে নেয়! আজ কি পরে এসেছে দুধের বাচ্চা প্রণতি,প্রমিলা স্যরি প্রনমি ? জানতে ইচ্ছে করছে খুব, দেখতে ইচ্ছে করছে! বুকের বা পাশে কেমন একটা অনুভুতি চলে এসেছে! ইরফান পাত্তা না দিয়ে উঠে একটা সিগারেট ধরালো, কিছুক্ষণ জ্বলন্ত সিগারেটটার দিকে তাকিয়ে থেকে সিগারেটটা ফেলে দিয়ে চুপচাপ গিয়ে বিছানায় বসে থাকে আবারও।

এক হাতে বোনকে আগলে ধরলো প্রেরণা। মাইক্রোফোন প্রণমির সামনে সেট করা হলো। বারবার ঢোক গিলতে থাকা প্রণমি স্বস্তি পাচ্ছে না, ইহান গম্ভীর কন্ঠে বলল,“প্রণমি!”

নিস্তব্ধতা কাটিয়ে রিনিঝিনি ঝংকারে মুখরিত হলো অন্দরমহল, এ বাড়ির প্রতিটি কোণ। এক রাশ মুগ্ধতা নিয়ে ঐ এক রত্তি মেয়েটার দিকে মনোযোগ দিলো প্রত্যেকে। প্রণমি যখন গাইতে শুরু করে তখন সে অন্য কেউ হয়ে যায়, যেন এক পরিপূর্ণ নারী,তার ভেতরের আবেগ নিংড়ে বের করে দিচ্ছে।

“প্রাণ চায় চক্ষু না চায়,
মরি একি তোর দুস্তরলজ্জা।
সুন্দর এসে ফিরে যায়,
তবে কার লাগি মিথ্যা এ সজ্জা।”

এক পরিণত সুমিষ্ট নারীকন্ঠ! ইরফান শোয়া থেকে উঠে বসলো তৎক্ষণাৎ! কন্ঠস্বর পরিচিত ঠেকছে! খুব শোনা শোনা এই স্বর। খুব কাছ থেকে শুনেছে এমন!

চুপচাপ বসে থাকে ইরফান, কান খাড়া করে।

“মুখে নাহি নিঃসরে ভাষ,
দহে অন্তরে নির্বাক্ বহ্নি।
ওষ্ঠে নিষ্ঠুর হাস,
তব মর্মে যে ক্রন্দন, ত্বন্বি!”

বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো ইরফান, ধীরপায়ে হেটে অতি সন্তর্পণে দরজা খুলে সে বাইরে বেরোয়। অতি ধীরগতির সাথে এগিয়ে যায়
পশ্চিম পাশের রেলিংয়ের কাছটাতে। ওখান থেকে নিচতলা সরাসরি দেখা যায়। তাকে এই কন্ঠস্বর যেন চুম্বকের মতন টানছে!

এক কদম, দুকদম, আঠারো কদমে ইরফান পৌঁছায় সেখানে। শ্যামলা সুদর্শন মুখে বিস্ময়, ভীষণ বিস্ময়! হঠাৎ করে থ'ম'কে গেলো, নির্নিমেষ অবলোকন করছে পুতঃপবিত্র গোলাকার মুখটাকে। তার বেশভুষা,তার চুল। আচ্ছা দেড় মাসে অনেকটা বড় হয়েছে নাকি মেয়েটা ! খানিকটা ম্যাচুরিটি এসেছে মুখশ্রীতে! নাকি গাইছে বলে এমন মনে হচ্ছে!

রেলিং ধরে লম্বা শক্ত পোক্ত শরীরটা দাড়িয়ে থাকে টানটান হয়ে, নিশ্চুপ দেখতে থাকে মেরুনে সুসজ্জিত প্রনতি,প্রমিলা স্যরি প্রনমিকে! ইরফানের অ্যাক্সিডেন্টাল বৌ! শুনেছে যার মানসিক প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে! এক জীবনে কতটা দুঃখ মেয়েটার! তাতে অবদান রেখেছে ইরফানও!

“মাল্য যে দংশিছে হায়,
তব শয্যা যে কণ্টকশয্যা-”

প্রনমি এই অন্তরাতে পৌঁছাতেই ইরফানের ঘোর কাটে! হঠাৎ ঠোঁটে ফুটে ওটে পরিতৃপ্তির হাসি। মুগ্ধতার হাসি। সম্মোহিতের নেয় সে প্রণমির সাথে সাথে ঠোঁট নেড়ে নিজেই বিড়বিড় করে গাইতে থাকে,

“মিলন সমুদ্র বেলায়
চির-বিচ্ছেদ জর্জর মজ্জা।”

সুন্দর এসে ফিরে যায়,
তবে কার লাগি মিথ্যা এ সজ্জা।”

প্রাণ চায় চক্ষু না চায়,
মরি একি তোর দুস্তর লজ্জা!”

প্রনমি যেন সত্যিই লজ্জা পাচ্ছিল। যেন তাই তার হাস্যজ্জ্বল চাহনি,আর গায়ের ঐ মেরুন সালোয়ার স্যুট! যেন গানটিকে ঐ পরিধেয় ঝঙকৃত করেছে!

একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ইরফান। গান শেষ হতে হাততালি আর একেরপর এক প্রশংসাসূচক বাক্যবাণে বিদ্ধ হচ্ছিল প্রণমি।

ইরফান কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে থাকে, এই গুণ আছে মেয়েটার ইরফান জানতো না! পরপর মুখভঙ্গি পাল্টে লাজুক হেসে মাথা চুলকে ঘুরে দাঁড়াতেই থমকায় সে। শুদ্ধ চোখ বড়বড় করে এতক্ষণ এই অচেনা আঙ্কেলটাকে তার খালামনির গান ভ্যাঙাতে দেখেছে! ইরফান এই বাচ্চাটাকে খুব ভালো করে চেনে! এটা জ্ঞানী আপার ছানা! আবার হতেও পারে এটা তার ভবিষ্যৎ ভাইপো! সে ভ্রু নাচিয়ে বলে,“কি ?”

_আপনি আমার খালামনির গান ভেঙাচ্ছিলেন কেন?

ইরফান হাসে,বলে,“ভেঙাচ্ছিলাম না। গাইছিলাম! তোমার খালামনির একা একা গাইতে ভয় করে!”

শুদ্ধ কপাল কুঁ'চ'কে তাকিয়ে আছে, গম্ভীর হয়ে বলে,“আপনি ভেঙাচ্ছিলেন। এটা ব্যাড ম্যানার্স,মাম্মা বলে!”

_ওওও আচ্ছা তোমার জ্ঞানী মাম্মা? তা বাচ্চা শুনেছি তোমার জ্ঞানী মাম্মা নাকি হসপিটালে নিয়ে গিয়ে তোমার পাখি কেটে দিতে বলেছে ডাক্তারকে!

_পাখি?
শুদ্ধ বুঝতে পারছে না।

ইরফান হেসে বলে,
_নুনুপাখি! একটু দেখি! দেখাও আমাকে! দেখি তো ঠিকঠাক ভাবে কাটা হয়েছে কিনা!

শুদ্ধ তৎক্ষণাৎ দুহাতে প্যান্টের জিপার চেপে ধরলো। ইরফানের বড্ড হাসি পাচ্ছে। জ্ঞানী আপার ছেলেটাকে একটু ক্ষ্যাপাতে ইচ্ছে করছে তবে বাচ্চাটা খুব সুইট,তাই ইরফান ছেড়ে দিলো সহজে।

শুদ্ধ আর দাঁড়ালো না সেখানে,মুয়ীজ বল নিয়ে ছুটতে ছুটতে এলো ওর কাছে, তারপর বাচ্চারা দলবেঁধে পুলসাইডে গেলো।

ইরফান এসে আবারও রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ। নিচে তখন সবাই হাসাহাসি করছিলো। মেহমানরা একটু পরে সবাই চলে যাবেন। আগামীকাল দুপুরে কনে বাড়িতে ভোজ,রাত গভীর করবেননা কেউ।

মুঈন চুপচাপ ইনশিরাহর পাশে গম্ভীর হয়ে বসে আছে। কিছুক্ষণ আগের সিচুয়েশনটা মাথা থেকে যাচ্ছে না তার। সে কোন অন্য ইনটেনশন নিয়ে হাত বাড়ায়নি, আনমনে হয়ে গিয়েছে! তবে প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক ছিলো ইনশিরাহর। দারুন অস্বস্তি নিয়ে মুঈন তার অস্বস্তির পাশে বসে আছে! একটু পরে তাকেও বেরোতে হবে! রাত বাড়ছে।
ইনশিরাহকে চোখ গরম করে রিতু বারবার কিছু একটা বলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইশারায়। ইনশিরাহ মেজো মায়ের ইশারা বুঝে উঠতে পারেনা ঠিক, আন্দাজের ওপর ভিত্তি করে মুঈনকে বলে,“আপনার কিছু লাগবে!”

মুঈন চট করে চোখ তুলে তাকায়! অবাক হয়ে বলে,“কি লাগবে?”

_খাবার! পানি! অর এনিথিং লাইক দ্যাট!

_নো থ্যাংকস!

একটু থেমে মুঈন ইনশিরাহকে বললো,“এখানে ঠেসে বসে আছো নিশ্চয়ই রিতু আন্টির কথাতে! যাও গিয়ে রেস্ট নাও! আগামীকাল সকাল থেকে তোমার উপর দিয়ে বুলডোজার যাবে। একটু বিশ্রাম নাও। এখানে বসে থাকতে হবে না! আমি উঠবো! গুডনাইট!”

ইরফান ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে চেয়ে দেখছে প্রনমিকে, বড়দের সাথে হাসিমুখে কথা বলছে মেয়েটা। আর এদিকে তার বড় বোন তাকে এক হাতে আগলে ধরে বসে আছে। ইরফান এ দৃশ্য দেখে বাঁকা করে হাসে। জ্ঞানী আপার ভয় করছে খুব,তার দুধুভাতু বোনকে ইরফান মির্জা চিলের মতো ছো মেরে নিয়ে দৌড় লাগাবে,তাই এভাবে সতর্কতা অবলম্বন করছে হয়তো।

ইরফান দোতলার রেলিং ধরে একে একে প্রত্যেককে অবলোকন করে লুকিয়ে লুকিয়ে। তার কল্পনার সাথে মিলে গিয়েছে পুরো দৃশ্যটা। ইনু তার স্বামীর সাথে এককোণে দাঁড়িয়ে আহ্লাদীপনা করছে, এসপি গম্ভীর হয়ে তার বৌয়ের পাশে বসে আছে দেখে মনে হচ্ছে বৌ নয় আসামী নিয়ে বসে আছে, ইনশিরাহর মুখভঙ্গি একটা চোরের মতন, এসপির কাছে অ্যারেস্ট হয়েছে এমন লাগছে। আর তার ভদ্রলোক দাদান ঠিক চেয়ে চেয়ে জ্ঞানী আপাকে দেখছে। জ্ঞানী আপা হাত নেড়ে নেড়ে কিসব বলছে সেসব শুনছে সে মনোযোগ দিয়ে!

সবার আগে মুঈন বড়দের থেকে বিদায় নিয়ে বের হলো বাড়ি থেকে। এদিকে ইনশিরাহকে ঠেলতে ঠেলতে রিতু আর পরী সদর দরজার কাছে নিয়ে যাচ্ছে। ধ'ম'কে বলছে,“যা! গেট পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আয় জামাইকে! তোর কবে বুদ্ধিসুদ্ধি হবে?”

_এতে বুদ্ধিসুদ্ধি হবার কি আছে?
অবাক হয়ে জানতে চায় ইনশিরাহ।

পরী ঠেলে দিচ্ছে তাকে,“যা! যা গিয়ে গেটের কাছ থেকে বিদায় দে। নিভৃতে কিছু কথা বল, জানতে চা কোনো অসুবিধা হলো কিনা! জামাই ইহানের সাথে গেটের কাছেই দাঁড়িয়ে কথা বলছে, যা না মা!”

ঠেলতে ঠেলতে একেবারেই চৌকাঠের বাইরে এনে দাঁড় করালো ইনশিরাহকে। ইনশিরাহ একপ্রকার বিরক্ত হয়ে বলে,“তো তোমরাই তো আমার সাথেই চলে এলে! তো যাও! তোমরাই যাও! বিদায় জানাও তোমাদের জামাইকে!”

রিতু আর পরী একইসাথে হেসে ওঠে, তারপর ভেতরে চলে যায়। ইনশিরাহকে দেখে ইহান মুঈনকে “বাই” বলে চলে যায়। ধীরকদমে এগিয়ে আসে ইনশিরাহ মুঈনের দিকে। মুঈন টানটান দাঁড়িয়ে আছে। ইনশিরাহর মুখটা ভালোকরে পর্যবেক্ষণ করে বলে,“আন্টিরা পাঠিয়েছে?”

চুপ করে থাকে ইনশিরাহ। মুঈন বলে,“ভেতরে যাও। কাল দেখা হবে। গুডনাইট!”

হাঁটতে হাঁটতে পুলসাইডে গিয়ে দাঁড়িয়ে পরলো ইরফান। ধীরে ধীরে মেহমান ফাঁকা করে যাচ্ছে বাড়িটা। আনন্দ উৎসব আবারও আগামীকাল সকাল থেকে শুরু হবে। বাচ্চারা তখনও হৈহৈ করে খেলছে ব্যাডমিন্টন কোর্টে।
ইরফান ট্রাউসার্সের দুপকেটে হাত গুজে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে এগিয়ে যায়, পশ্চিমে নীল অপরাজিতার এক বিশাল ঝোপ। সেখান থেকে একটা নীলকন্ঠ তুলে ঘা'ড় ঘুরিয়ে শুদ্ধকে দেখলো। তারপর ডাকলো,“এই মামু!”

শুদ্ধ আবারও ঐ অদ্ভুত আংকেলকে দেখলো। ইরফান এইবার মুখ হাসি হাসি করে বললো,“কাম!”

শুদ্ধ এগিয়ে যেতেই ইরফান ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো। শুদ্ধর নরম তুলতুলে ডান হাতটা নিয়ে হাতের মুঠিতে একটা নীল অপরাজিতা গুজে দিয়ে বললো,“এটা তোমার খালামনির হাতে দেবে।”

শুদ্ধ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। ইরফান বললো,“যাও!”

শুদ্ধ কেমন বাধ্য ছেলে হলো,ছুটে চলে যায় সে। ইরফান উঠে ধীর কদমে এগিয়ে যায় পশ্চিম পাশের রেলিংয়ের ধারে,গিয়ে চোখ রাখে নিচতলায়।

প্রেরণারা এখন উঠবে, শুদ্ধকেই খুঁজছিলো সে গোটা বাড়িতে। শুদ্ধ ফুলটা নিয়ে তখন তার খালামনির কাছে যায়,প্রনমি সোফাতে চুপচাপ বসে ছিলো। শুদ্ধ গিয়ে খালামনির একটা হাত টেনে ফুলটা গুজে দিলো খালামনির হাতে। প্রনমি চ'ম'কে ওঠে, বলে,“শুদ্ধ? এটা কি?”

_ফুল।

_ফুল? কি ফুল? কোথায় পেলে? কে দিলো?

শুদ্ধ কিছু বলতে যাবে তখনই প্রেরণা ত্রস্ত পায়ে হেঁটে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,“শুদ্ধ কখন থেকে খুঁজে চলেছি তোমাকে বাবা!”

চলমান......

[ সবাইকে অগ্রিম ঈদের শুভেচ্ছা। ঈদের পরে আবার ফিরবো। সে পর্যন্ত ভালো থাকবেন! ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 57 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন