#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৫৮ [ ১ম অংশ ]
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
[ ১ম অংশ ]
পুরো বাড়ি কিছুটা হলেও শান্ত এখন। কিছু কাছের দূরের স্বজন এবং ইনশিরাহ-ইনায়ার বান্ধবীরা থেকে গিয়েছে বাড়িতে, বাদবাকি সবাই চলে গিয়েছেন। একের পর এক প্রোগ্রাম, বাড়ির সকলেই তখন হতক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলো যে যার ঘরে। কিছুক্ষণ আগের ঘনঘটার চিহ্ন মাত্র নেই শান্তিনীড়ের অন্দরমহলে। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের লোকজন তাদের কাজের তদারকি করে আপাতত ছুটি নিয়েছে,আজ রাতের জন্যে।
দোতলার সবথেকে পূবের দুটো ঘর দখল করে শুয়েছে মেয়েরা। বিয়ে বাড়িতে খুশি খুশি আমেজে, বিছানা ব্লক করে,মেঝেতে ম্যাট্রেস বিছিয়ে গা এলিয়ে দিতেও দ্বিধা করেনি সবাই। ঘুমোতে গিয়েও খুনসুটিতে ব্যস্ত তারা। চাপা হাসিতে ফেটে পরছে সবাই।
ইনশিরাহ তখন ফ্রেশেনআপ হয়ে,সাজ মুছে,শাড়ি খুলে একটা ওভারসাইজড টি-শার্ট পরে বেলকোনিতে গিয়ে চেয়ারে বসে আছে চুপ করে। সন্ধ্যা থেকে ভীষণ ক্লান্ত সে। বাইরে থেকে ভেসে আসা সুবাসিত বাতাস গায়ে লাগাতে লাগাতে সে ভাবছিল অন্য কথা, আজ রাতটা পেরোলেই তার জীবনে নতুন মোড় আসবে, নিজের এই প্রিয় ঘরটা ছেড়ে সম্পূর্ণ অচেনা এক পুরুষ,যে নাকি তার স্বামী তার বাড়িতে,তার ঘরে,তার বিছানায় থাকতে হবে। তার সাথে ভাগাভাগি করতে হবে সব কিছু, একেবারে সবকিছু !
ইনশিরাহ সেসব ভাবতে থাকে। উদাস হয়ে। কিন্তু মাম্মা পাপা কি ভীষণ খুশি! দু'চোখ বন্ধ করে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে নেয় ইনশিরাহ। সামিন আলোর হাসিহাসি মুখটা চোখের পাতায় ভাসে। এতো অস্বস্তির মাঝে এতোটুকুই স্বস্তি তার,মাম্মা পাপা ভীষণ খুশি!
পেছন থেকে হঠাৎ তুনা গিয়ে ইনশিরাহর কাঁধে হাত রাখে। চ'ম'কে উঠে ইনশিরাহ ঘুরে তাকিয়েই একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলে,“ওহহহ তোরা!”
তুনা,মানহা,তাজরী,তিথি,অনামিকা কেউই ঘুমোয়নি। চেয়ার পেতে ইনশিরাহকে ঘিরে বসে পরলো ওরা।
ইনশিরাহর শুকনো মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে তুনা বলে,“দ্যাখ! তোকে কিন্তু শুরু থেকে বলেছি ভেবে দ্যাখ, এভাবে হুট করে রাজি হোস না! এখন সবকিছু হয়ে যাওয়ার পরে আফসোস আমরা মানবো না!”
_আমি আফসোস করছি না তো! একটু টায়ার্ড আরকি!
গলার স্বর খাদে নামিয়ে ইনশিরাহ জবাব দিলো।
মানহা বলতে লাগলো,“আরে চিল! ফরাজীকে তো তখন চিনতাম না, কিন্তু লাস্ট কয়েকদিন তাকে দেখে বুঝলাম সে নিতান্তই ভদ্রলোক। তুই ঠিকঠাক ভাবে হ্যান্ডেল করতে পারলেই হয়তো ভালো থাকবি!”
তাজরী বলে,“আচ্ছা এতো ঘাবড়ে যাস না! তোকে একটা বুদ্ধি শিখিয়ে দিই! ফার্স্ট নাইটেই সাফ সাফ বলে দিবি তুই একটু সময় চাস!”
ইনশিরাহ ম্লান হাসলো ওদের কথায়। ওর বান্ধবীরা নিজেদের মতো বকবক করেই যাচ্ছে, বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছে ইনশিরাহকে। ইনশিরাহ চুপচাপ শুনে যাচ্ছে। তবে তার মন পরে আছে অন্য কোথাও, দৃষ্টি হাতের “MUYIN” লেখাটাতে নিবদ্ধ।
তিথি ইনশিরাহর পিঠ চাপড়ে হঠাৎ বলে,“আরে এতো ঘাবড়ানোর কিছুই নেই। ওদের কথা কানে নিস না। মানুষটা তোর স্বামী। দেখবি তোকে কাছে টানলে তোর একটুও খারাপ লাগবে না, তখন তোরই স্বাভাবিক লাগবে এসব। তার প্রতিটা স্পর্শ উপভোগ করবি তুই। এসব দুশ্চিন্তা না করে একটা ঘুম দে তো!”
তিথির কথায় মানহা হাসতে হাসতে বলে,“উই হোপ সো তিথি! তবে আমি হলে এসব মানতে পারতাম না ফার্স্ট নাইটে! বাব্বাহ! কমপক্ষে ছ মাস সময় নিতাম। অচেনা এক লোকের ঘর্মাক্ত বুকে লেপ্টে থাকবো ভাবলেই কেমন গা ঘিন ঘিন করে!”
তিথি ওদের ধ'ম'কের সুরে বলে,“তোরা কি করবি সেটা তোদের কাছে রাখ, এখন ইনশিরাহকে অভয় দিতে হবে আমাদের!”
তুনা বলে,“আসলে সমস্যাটা আমাদেরই হয়তো, ভালো মেয়ে গুলোকে দেখ,বাসর ঘরের দরজা বন্ধ হতেই টপাটপ.....”
তাজরী তুনার মুখটা চেপে ধরলো তৎক্ষণাৎ। বাকিরা চাপা হাসিতে ফেটে পরলো!
রাত গভীর হয়, সখীরা মিলে গুটুর গুটুর করতে থাকে ইনশিরাহর ফার্স্ট নাইট নিয়ে। ভীষণ রোমাঞ্চকর এ আলোচনা! ইনশিরাহ ছিলো নির্লিপ্ত শ্রোতা।
কফির মগ হাতে তখন দোতলার টানা বারান্দায় পায়চারী করছিলো ইরফান। বিকেল থেকে একটানা ঘুমিয়ে এখন যেন সে রাত জাগা পাখি হয়েছে। দোতলার লিভিং রুম বাদে বাড়ির প্রতিটা কামরার বাতি নেভানো। ইনায়ার ঘর থেকে ওর বান্ধবীদের হাসাহাসির কলরবও এতক্ষণে থেমেছে। ইরফান চলনে গাম্ভীর্য নিয়ে পায়চারি করছে। সময় কিছুটা গড়াতেই উত্তরের খোলা বারান্দায়,আধো আলোতে এক নারী কায়া দেখে ইরফান এগিয়ে যায়। মৃদু বাতাসের দাপটে মেয়েটির চুলগুলো উড়ছিল। ইরফান দুকদম এগিয়ে গম্ভীর কন্ঠে ডেকে ওঠে,“শেহু!”
শেহা চ'ম'কে ওঠে, তড়িৎ বেগে ঘুরে তাকায়। ঘাবড়ে যাওয়া দুটি চোখে দেখে সে ইরফানকে। ধরা পরেছে সে। পালাবার পথ নেই। ইরফান দুকদম এগিয়ে গিয়ে বললো,“একটা গাট্টা মারবো ফাজিল! তুই কোথায় ঢুকে বসে থাকিস? সামনে আসিস না! ”
শেহা চুপচাপ দেখছে ইরফানকে। তার পা যেন আটকে গিয়েছে, হঠাৎ করে নড়তে পারছে না মনে হলো। ইরফান বলতে লাগলো,“কি! কি! আ'ম আস্কিং ইউ সাম কোয়েশ্চন! তোর হয়েছে টা কি! যোগাযোগ করতে পারি না, তুই করিস না! এই,এই! আবার ঐ আকিব তোকে জ্বালায়? ডিসটার্বড তুই!”
শেহা নিশ্চুপ। ইরফান ধ'ম'কে ওঠে,“কিরে বল!”
_ওসব কিছুই না। মেডিকেলের পড়াশোনা তো বোঝোই! খুব চাপ।
ধীরে ধীরে,নিচু স্বরে, গুছিয়ে জবাব দিলো শেহা!
ইরফান বিশ্বাস করে না, বলে,“দাদানকে দিয়ে পুলিশ কমপ্লেইন করাবো আবার? আকিবকে নিয়ে চিন্তা করিস না! আমাদের বোনদের দিকে চোখ তুলে তাকানোর মূল্য খুব বাজে ভাবেই দিতে হবে!”
হঠাৎ শেহার খুব রা'গ ধরে গেলো,কেমন অস্থির হয়ে উঠলো মন। রাগটা ইরফানের ওপর হলো সে বোন বলেছে বলে,নাকি নিজের উপর হলো সে নিজের বেহুদা অনুভূতিকে আটকাতে পারেনা বলে সেটা শেহা বুঝতে পারলো না। কিন্তু অস্থিরতায় মুখ থেকে উল্টোপাল্টা বেড়িয়ে গেলো হঠাৎ, ধীরস্থির বললো,“ঠিক তুমি যেমন অন্যের বোনের দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে আজ এভাবে,এতটা বাজে ভাবে মূল্য দিচ্ছো?”
ইরফান হঠাৎ কথা হারিয়ে ভীষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রয় শেহার দিকে। এটা শেহা কথা বলছে না, হঠাৎ তার এটাই মনে হলো!
ইরফান কিছু বলতে যাবে তার আগে শেহা হুহু করে কেঁদে ওঠে, চিল্লিয়ে বলে,“এতো আলগা যত্ন কেউ দেখাতে বলে তোমাকে? আমি বড় হয়েছি! আমি ছোটো শেহা নই! প্লিজ আমার ব্যাপারগুলো থেকে দূরে থাকো! আর কখনও আমার অনুমতি ছাড়া আমার প্রতি এতো যত্ন,এতো কনসার্ন দেখাতে আসবে না!”
ভীষণ ভীষণ ভীষণ বিস্মিত ইরফান নির্নিমেষ দেখছে শেহাকে। শেহা কান্নার বেগ কমিয়ে বললো,“আমি বড় হয়েছি! ভীষণ বড় হয়েছি! তোমাদের সবার এতো কনসার্ন আমার অসহ্য লাগে বুঝলে?”
কিছু বললো না আর ইরফান। শেহা ঘন ঘন শ্বাস ফেলে ছুট লাগালো ইনায়ার ঘরের দিকে। ঘাড় ঘুরিয়ে ইরফান শুধু ওর যাওয়া দেখতে থাকে।
_______
সকাল সাতটা তখন। বিয়ে বাড়ীতে তখন থেকেই প্রত্যেকের ব্যস্ততা বেড়ে গিয়েছে। ছুটে ছুটে এক একটা কাজ তদারকি করছিলো সববাই। ইনশিরাহ আর ইনায়াকে আজ শশুর বাড়ী তুলে দেওয়া হবে না। প্রথম রাত এ বাড়িতেই থাকবে বর বধূ। কাল সকালে কনে বিদায় হবে। এটা এ বাড়ির প্রচলিত একটি নিয়ম, অপ্রয়োজনীয় এবং বানোয়াট। তবুও সবাই মানতে পছন্দ করে। বাসর ঘর মেয়ের বাড়িতে হয়। যদিও দু'টো বিয়েই হয়েছে অদ্ভুত ভাবে তবুও এটা মানা হবে। তিন সিনিয়র মির্জার ব্যস্ততার অন্ত নেই। সবকিছু দেখভাল করা, খোজ নেয়া, ওয়েডিং প্ল্যানারের সাথে কথা বলা। আর তাদের বৌয়েরা ব্যস্ত তাদের পেছন পেছন ঘুরতে।
আজ সকালেই আজান আয়াত এসে পৌঁছেছে বিয়ে বাড়িতে,তারা আসাতে কাজ গুলো হাতে হাতে হয়ে যাচ্ছে।
ওয়েডিং প্ল্যানারের চাকচিক্য, চোখধাঁধানো ঘনঘটায় গমগম করছিলো গোটা এরিয়া। সকাল থেকে মৃদু সানাই বাজছে সামিনের নির্দেশে,নয়তো বিয়ে বাড়ি মনে হচ্ছে না বাড়িটাকে।
ইরফান তখন নিজের ঘরে চুপচাপ বসেছিল। তার ঠিক পাশে, বিছানার ওপর একটা পাঞ্জাবি রাখা। সময় তখন ছুটতে ছুটতে দুপুর সাড়ে বারোটা বেজে গিয়েছে,একটু বাদেই বরপক্ষের লোকজন এসে পরবে।
রিতু ছেলের ঘরের সামনে এসে দাড়িয়ে বলে,“আসবো?”
অন্যমনস্ক ভাব কেটে যায় ইরফানের। মাম্মাকে বলে,“জি!”
রিতু ঘরে পা রাখলেও ছেলের কাছে গেল না, দূর থেকেই ছেলেকে কিছুক্ষণ দেখে বললো,“পাঞ্জাবিটা এভাবে ফেলে রেখেছো কেন? তোমার দাদান আর তোমার জন্য একই পাঞ্জাবি নিয়েছি, রং টাও এক। আর কোটি টাও। পরে নিচে এসো। তোমার ভগ্নিপতিরা এসে পরবে। তোমার উপস্থিত থাকা প্রয়োজন । গতকাল ঘুমিয়ে কাটিয়েছো,আজ এসো। দ্বিতীয়বার ডাকতে আসবো না আমি।”
রিতু স্বাভাবিক গলায় কথাটি বলে চলে যায়। ইরফান চুপচাপ পাঞ্জাবিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে পাঞ্জাবিটা হাতে তুলে নেয়।
দু'জন খ্যাতনামা মেইকআপ আর্টিস্টকে হায়ার করা হয়েছে বৌ সাজাতে,তারা সকাল দশটা থেকে বৌ সাজাচ্ছে। ইনায়া ভীষণ উত্তেজিত তার সাজ নিয়ে, চাপা আনন্দে ফেটে পরছে গোলুমোলু খ্যাত মিষ্টি মেয়েটা। অন্যদিকে ইনশিরাহ ততখানিই বিরক্ত ভারী মেকআপ এবং গয়নাগাটি নিয়ে। কিন্তু কপাল কুঁচকে সে থাকতে পারছে না, কিছুক্ষণ পরপর তার মাম্মা পাপা আসছে, তাদের দেখিয়ে দেখিয়ে জোর করে হাসছে ইনশিরাহ, যেন খুশি উপচে পরছে তার ভেতর থেকে।
একটা কোটি পাঞ্জাবি সেটে নিজের ব'লিষ্ঠ শরীরটা গলিয়ে ইহান রেডি হয়ে ঘর থেকে বেরোনোর সাথে সাথেই মুখোমুখি হলো তুনাদের গ্রুপের। ওরা ইহান তাজওয়ারকে দেখে কথা হারিয়ে ড্যাবড্যাব করেই তাকিয়ে রইল। যেন আশেপাশে কেউ নেই, যেন চোখের পলক ফেললে ওরা অনেক কিছু মিস করবে। তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখতে লাগলো মোস্ট এলিজিবল ব্যাচেলর ইহান তাজওয়ারকে!
ইহান পাশ কাটিয়ে চলে যায়, সামিনের নির্দেশে দু পক্ষের সাথে ফোনে যোগাযোগ করছিলো। মুঈনেরা রওনা দিয়েছে জানতে পেরে ইহান প্রেরণাকে কল দেয়। প্রেরণা কলটা রিসিভ করে, ইহান গম্ভীর কন্ঠে বলে,“বড় বাবা জানতে চাইছে আপনারা কতদূর!”
_অলমোস্ট পৌঁছে গিয়েছি।
_সাবধানে আসবেন।
_জি অবশ্যই।
ফোন কেটে প্রেরণা পাশে বসে থাকা প্রনমির দিকে তাকায়। একটা মভ পিংক কালারের লেহেঙ্গা পরিয়ে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছে বোনটাকে আজ। কপালে একটা টিকলি,ব্যাস আর কোনো অলংকার,আর কোনো প্রসাধনীর প্রয়োজন হয়নি! প্রেরণার নিজেরই বারবার নজর লেগে যাচ্ছিল।
গাড়িতে সবাই হৈ হৈ করছে। বরযাত্রী হয়ে প্রেরণাদের সাথে যাচ্ছে প্রিতমের বন্ধু বান্ধবীরা। মিস জেনি এবং প্রেরণার ফুপি একপ্রকার প্রেরণার মাতৃস্থানীয়া, বাড়িতেই থেকে গিয়েছে তারা,ওদিকটা সামলে নিতে। প্রেরণা ঘা'ড় ঘুরিয়ে ভাইকে দেখে। একটা শেরওয়ানি পরায় ভাইটাকে লাগছে সুদর্শন রাজার মতো। মম আর ড্যাডের বিয়ের ছবি প্রেরণার কাছে আছে। অবিকল ড্যাডের মতোই লাগছে প্রিতমকে।
দু'পক্ষের বর যাত্রীই এসে পৌঁছেছে পরপর। প্রথমে মুঈন এবং কিছুক্ষণ বাদে প্রিতম নতুন জামাই বেশে পা রাখলো মির্জা বাড়িতে। মেয়েগুলো খবর পেয়ে ছুট লাগালো গেট ধরতে, নতুন জামাইদের পকেট খসাতে। ওদের হৈ হৈ দেখে ভারী লেহেঙ্গা পরে ইনায়াও দৌড়াতে শুরু করলো। পথিমধ্যে আলো ওর এক হাত টেনে ধরলো,রেগে বললো,“তুই কোথায় যাচ্ছিস?”
_বাহ রে! আমারও তো আপুর বিয়ে,আমি গেট ধরবো না?
কাঁচুমাচু মুখ করে বলে ইনায়া!!
_না,তুইও কনে। যা ভেতরে যা।
ধ'ম'কে বলে আলো। সামিন হাসতে হাসতে বলে,“মোটেই না আছিয়া। ছোটো আম্মা, তুমি যাও। গেট ধরো। একটুও ছাড় দিও না দুলাভাইকে।”
বড় বাবার কথা শুনে ইনায়া লাফিয়ে লাফিয়ে নামলো নিচে। সামিন আর আলো হাসতে হাসতে ঢুকলো ইনশিরাহর ঘরে। যে কিনা কমলা টুকটুকে রানী সেজে চুপচাপ বসেছিল নিজের ঘরে,বেডের ওপর।
সামিন ঘরে ঢুকে মেয়েকে নরম গলায় ডাকলো,“আম্মা।”
ঘুরে তাকায় ইনশিরাহ। বাবা মায়ের দিকে দীর্ঘসময় তাকিয়ে থেকে ইনশিরাহ এগিয়ে আসে। এসে দাঁড়ায় বাবার মুখোমুখি। সামিন মেয়ের এই বেশ দেখে ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে পরে, তার আম্মাকে আগলে নিয়ে কপালে চুমু খায়। ইনশিরাহ চোখ দুটো বুজেই থাকে,স্বস্তিতে। আলো পাশে দাঁড়িয়ে বাবা মেয়েকে দেখে।
মেয়ের মাথায় হাত রেখে সামিন স্নেহভরা কন্ঠে বলে,“আম্মা! ঘাবড়ানোর কিছুই হয়নি।”
নিশ্চুপ ইনশিরাহ। সামিন বলতে থাকে,“বিয়ে....একটা মিরাকল আম্মা। তুমি নিজেই সুন্দর একটা আগামীর খোজ ধীরে ধীরে পেয়ে যাবে। তোমার হতাশাগুলো ধীরে ধীরে কেটে যাবে আম্মা।”
ইনশিরাহ কোনো জবাব না দিয়ে বাবার হাতটা শক্ত করে ধরলো। আলো এগিয়ে এসে মেয়ের গালে হাত রেখে বলে,“অনেক লক্ষি একটা বৌ হবি কেমন? একদম মাম্মাকে কপি করবি না!”
ইনশিরাহ ঝাপসা চোখেই হেসে ফেললো। বললো,“কাকে কপি করবো তবে?”
_তোর মেজো মা, ছোটো মা। ওরা আমার থেকে তুলনামূলক ভালো। ওদের।
হাসছে তিনজন।
সামিন হাসতে হাসতে হাতের ফোনটা ইনশিরাহর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,“কাউকে কপি করতে হবে না আম্মা। পৃথিবীর সব বধূ যার যার নিজের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে বধূ হয়ে থাকুক। নিন ধরুন আম্মা, আপনার ফুয়াদ চাচ্চু। মিটিং ফেলে রেখে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে আপনার রানীর বেশ দেখার জন্য।”
ফুয়াদ চাচ্চুর কথা শুনে ইনশিরাহ ফোনটা ছোঁ মেরে নিয়ে নেয়। কতদিন কথা হয়না লোকটার সাথে। ইনশিরাহর ভীষণ প্রিয় একজন ব্যক্তি ফুয়াদ। ছুটতে ছুটতে সে একটা নিড়িবিলি স্থানে চলে যায়।
সামিন-আলো ঘর থেকে বেরিয়ে মুখোমুখি হয় শান্তর। শান্তও আজ সকালে ফিরেছে। নিচে চলে যেতেই সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,“জামিল আবারও বলেছে জাহিনের খালা শাশুরির কথা! আমি তো শান্তর সাথে অতটা ফ্রি নই! তুমি যদি একটু বোঝাতে! একা একা এভাবে আর কত থাকবে?”
_বাদ দিন না! মানবে না শান্ত ভাইয়া!
_দেখো আছিয়া ওকে বুঝিয়ো,এটা যদি আমার বোনের জন্য তার আনুগত্য হয়ে থাকে তবে আমার শান্তর অনুভূতিকে অসম্মান করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই,তবে এসব যদি সমাজের লোকের পাঁচ কথা শোনার ভয়ে করে থাকে তবে সেটা আমি মানবো না। শেহু বড় হচ্ছে, একাকিত্ব ভয়ংকর এক জিনিস আছিয়া,এতো ভালো লোককে এভাবে দেখতে ইচ্ছে করে না আমার।
_এটাও একটা বিষয় হতে পারে মেয়র সাহেব! “এই বয়সে পুরুষ মানুষ বিয়ে করবে কেন? এতো শখ কেন? বৌ মরলেই বিয়ে করতে হবে কেন! ” এসব কটুবাক্য ছুড়ে দেয় অনায়াসে।
_হুহ! ব্লাডি হিপোক্রেটের দল বুঝলে আছিয়া! অথচ এরাই দেখবে নিজেদের ভাইয়ের বৌ মরে গেলে মরা বাড়িতেই নিজেদের বিপত্নীক ভাইয়ের জন্য পাত্রী খোঁজে! শুধু অন্যের ভালো থাকার বেলাতেই এদের সুড়সুড়ি লাগে!
আলো দাঁড়িয়ে পরলো, ঘুরে সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,“একটা কথা বলুন তো! আল্লাহ না করুক আমি হুট করে এখন মরে গেলে আপনি পারবেন অন্য কাউকে গ্রহণ করতে? নতুন সঙ্গীনিকে নিয়ে নিজের একাকিত্ব দূর করতে?”
থতমত খায় সামিন। নির্নিমেষ দেখতে থাকে স্ত্রীর মুখটা। আলো ভীষণ কৌতুহলী হয়ে ওঠে উত্তরটা জানতে।
সামিন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে বলে,“চলো নিচে চলো,মেয়েকে জামাইয়ের কাছে নিয়ে যেতে হবে আমাদের। আজ রাতে এ নিয়ে বিশদ আলোচনা করবো।”
______
রীতিমতো যুদ্ধ লেগেছিলো বিয়েবাড়ির গেটে। মুঈন নিতান্তই ভদ্রলোক,শ্যালিকা শ্রেনীর সাথে তর্কাতর্কি না করেই বিশ হাজার টাকা খসিয়েছে পকেট থেকে। কিন্তু ঝামেলা বেঁধেছে প্রিতমদের সাথে। জামির সাথে ঝগড়া করে ওরা কেউ পারলো না, সর্বসাকুল্যে বারো হাজার তুলতে পেরেছে। এতো কিছু ইনায়া নিজে করেছে। অতিথিরা ব্যাপারটা উপভোগ করেছে,কনে নিজের বরের গেট নিজে আটকেছে বলে।
বরযাত্রীকে বর আসনে নিয়ে বসানো মাত্রই ক্যামেরা ম্যানরা ছুটে চলে আসলো। তখনই খোঁজ পরলো কনের।
ইনায়া ছুটতে ছুটতে, লাফাতে লাফাতে গিয়ে তার প্রিতমের পাশে বসে পরলো, হাসিমুখে।
ইশমাম মির্জা দূরে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলো মেয়ের ছটফটানি।
ইনশিরাহকে তার বাবা মা দুপাশ থেকে আগলে ধরে নিয়ে গেলো তার বরের পাশটাতে বসিয়ে দিতে।
মুঈন সাদার ওপর সোনালী সুতোর কাজ করা শেরওয়ানি,মাথায় মেরুন পাগড়ী পরে বরবেশে অপেক্ষা করছিল তার বধূর জন্য। অতঃপর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এলো, রানীর বেশে তার সুসজ্জিত বধূকে, মুঈনের জীবনের কাঙ্খিত অস্বস্তিকে তার পাশে বসিয়ে দিল তার শশুর শাশুড়ি। ঠিক সে মুহূর্তে মুঈনের পৃথিবীটা রঙিন হয়ে খিলখিলিয়ে উঠলো যেন। দু'জনের চোখাচোখি হলো, মুঈনের মুগ্ধ,মদ্যক চাহনি থেকে ইনশিরাহ একটুও বাঁচতে পারলো না তখন,পারলোই না।
বর বধূ এক সাথে হতেই ছবি তোলার হিড়িক পরে গেলো চারিপাশে। ক্যামেরার আলোকছটায় ইনশিরাহ তিতিবিরক্ত হলেও মুঈনের ঠোঁট জুড়ে খেলা করে অস্পষ্ট নির্মল,স্নিগ্ধ হাসি। পাশাপাশি বসে ক্যামেরা বন্দি করলো তাদের নতুন জীবনের সূচনা লগ্ন।
অতিথিদের সাথে বর বৌয়ের শুভেচ্ছা বিনিময় করিয়ে দিতে ব্যস্ত এ বাড়ির বড়রা। প্রেরণা এবং প্রনমি অন্দরমহলে চলে এসেছে, তাদের আলো নিয়ে এসেছে। বিয়ে বাড়ীতে অযথা, অকারণে বাচ্চাগুলো ছোটাছুটি, হুটোপুটি করছিলো। শুদ্ধ এসেই ওদের সাথে অংশ নিলো। গতদিনে আজানের ছোটো ছেলে মুয়ীজের সাথে ভীষণ ভাব করে গিয়েছিলো সে। তাকে আর খুঁজে পায় কে,মাম্মার বারণ সত্তেও দৌড়াদৌড়ি করছে মামার শ্বশুড় বাড়িতে। প্রেরণা শুদ্ধর আনন্দ দেখে ওভাবে আর বারণ করলো না।
দোতলার লিভিং রুম তখন ফাঁকা, সবাই বর-বৌ আসনের কাছে ব্যস্ত। অন্দরমহলে কেবল গুটিকয়েক লোকজন। মারিয়ার সেজেগুজে বের হতে একটু সময় লাগলো। ঘর থেকে খোঁপা ঠিক করে বের হতে হতে তার ছেলে দু'টোকে খুঁজছে সে। হঠাৎ সামনে সে আজানকে দেখলো আজান ত্রস্ত পায়ে হেঁটে কোথাও যাচ্ছিলো। মারিয়া আজানের হাত টেনে ধরেই বলতে লাগলো,“আরে এই তুমি বোতাম লাগাওনি কেন!”
কথাটি বলেই মারিয়া আজানের কোটির বোতাম লাগিয়ে দিতে থাকে। ওটা আজান ছিলো না,ওটা ছিল আয়াত। আয়াত ঘাবড়ে যাওয়া মুখ করে নিচু স্বরে মারিয়াকে বললো,“আমি আয়াত মারিয়া।”
তিন লাফে মারিয়া পিছিয়ে গেলো। পা থেকে মাথা আয়াতকে পর্যবেক্ষণ করতেই মুহুর্তেই তার মাথায় রাগ চেপে গেল, এতো বারণ সত্তেও দুই ভাই একই আউটফিট পরেছে! এরা কবে শুধরোবে?
আয়াতকে কিছু বললো না মারিয়া, রেগেমেগে সামনে আলো-সামিনের রুম দেখতে পেতেই গিয়ে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিয়ে বসে রইল। আয়াত ভীষণ বিব্রত হয়েছে। মাথা নিচু করে চুপচাপ সে নিচে নামলো।
প্রনমির হৈচৈ ভালো লাগছিলো না, চারিপাশে এতো অচেনা লোকদের অস্তিত্ব তাকে স্রেফ অস্বস্তি দিচ্ছিলো, শান্তিনীড়ের অন্দরমহলেও তার মন টিকছিলো না। প্রেরণাকে অগত্যা আটকে রেখে বসে আছে নিজের কাছে। যদিও প্রেরণা বিরক্ত হচ্ছিল না। সে চারপাশে তার সাবধানী নজর বুলাচ্ছিলো, বোনকে ঐ অসভ্য ছেলেটির সামনেই পরতে দেবে না সে, কোনো ভাবেই না।
ওদের দুবোনকে ঘিরে মহিলা অতিথি শ্রেনীর কৌতুহলের শেষ নেই। অতিমাত্রায় সুন্দরী দুবোন। কেউ কেউ তো প্রেরণার কাছে ইনিয়ে বিনিয়ে জানতে চাইছে তার বিয়ে হয়েছে কি না, নয়তো তার হাতে ভালো পাত্র আছে। ছেলে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ইউএসএ থাকে।
এসব দেখে দেখে বিরক্তির চরম পর্যায়ে যখন পৌঁছাল প্রেরণা ঠিক তখনই প্রনমি তার ঘাবড়ে যাওয়া মুখটা নিয়ে প্রেরণাকে বললো,“আপু।”
চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকায় প্রেরণা। প্রনমি আতঙ্কিত হয়ে পরলো ভীষণ, কাঁচুমাচু মুখ করে প্রেরণার কানে বললো,“আপু । মেইবি আই গট মাই পিরয়ড!”
বিয়ে বাড়ীর হৈচৈয়ের মাঝে প্রেরণা প্রথমে বোনের কথাটা বুঝতে পারেনি।
প্রনমি দ্বিতীয়বার বলতেই প্রেরণা অস্বস্তি নিয়ে আশেপাশে তাকালো। এ বাড়ির কাউকে খুঁজে পাচ্ছিল না সে, উঠে দাঁড়ায় প্রেরণা একটা ব্যবস্থা করার জন্য। ঠিক তখনই আলো এসে দাঁড়ায় সেখানে,হেসে বলে,“ও মা! তোমরা এখানে মা! চলো ওদিকে চলো! ছবি তুলবে।”
প্রেরণা আন্তরিক হেসে নিচুগলায় বললো,“তার আগে একটু সাহায্য করুন আন্টি।”
চলমান.......
[ ২য় অংশের লিংক কমেন্টে ]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৫৮ [ ২য় অংশ ]
#ইসরাত_ইতি
[ ২য় অংশ ]
বাচ্চারা নিচে হুটোপাটি করছিলো। বিয়ে বাড়ির গমগম শব্দ, মৃদু সানাইয়ের আওয়াজ ছাপিয়ে দিয়ে ওদের হৈ হল্লা যেন সবার মনোযোগ কাড়ছিলো।
আলোর পিছু পিছু প্রেরণা আর প্রনমি দোতলায় ওঠে। ইনশিরাহর রুমে ঢুকে আলো কাবার্ড থেকে স্যানিটারি ন্যাপকিন বের করে প্রেরণার হাতে দিয়ে বলে,“দুবোন তাড়াতাড়ি স্টেজে চলে এসো। সবাই খুঁজছে তোমাদের। আমি যাই এবার?”
_জি। থ্যাংক ইয়ু আন্টি!
প্রেরণার দিকে তাকিয়ে আলো হেসে চলে যায়। যেতে যেতে ঠিক ইরফানের ঘরের সামনে পৌঁছাতেই আলোর কদম থামলো। কথার তালে চলে আসাতে তার খেয়ালই ছিলো না ইরফানও দোতলায় রয়েছে। একটা বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হবার আগেই আলো ইরফানের দরজায় টোকা মেরে বলে,“নিচে এসো তাড়াতাড়ি। ছবি তুলবে। তোমার ভগ্নিপতিরা তোমার অপেক্ষা করছে।”
ইরফান আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে কোটির বোতাম গুলো লাগিয়ে নিতে নিতে শান্ত স্বরে জবাব দিলো,“জি। আসছি। দশমিনিট!”
ঠিক তখনই নিচে চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ শোনা যায়। বাচ্চারা আতঙ্কিত হয়ে চেচাচ্ছে এমন মনে হচ্ছে! আলো দেরি না করে ছুটতে ছুটতে নামলো নিচে।
শুদ্ধ ছোটাছুটি করতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পরে সামনের পাটির একটা দাঁত নাড়িয়ে ফেলেছে নিজের। দাঁতটা আরও দুদিন আগে থেকেই নড়ছিলো অল্পস্বল্প, এখন আঘাত লেগে রক্ত পরছে অনবরত। তা দেখে আতঙ্কিত বাচ্চারা, আতঙ্কিত শুদ্ধ। মাম্মা মাম্মা করে চেঁ'চি'য়ে যাচ্ছিলো বাচ্চাটা, কাঁদছিল ভীষণ। স্টেজের পাশ থেকে ইহান বেরিয়ে বাড়ির অন্দরমহলে ঢুকে দেখলো এই কাহিনী। ছুটে এসে শুদ্ধকে কোলে তুলে নিলো, শুদ্ধ চেঁচিয়ে কেঁদে যাচ্ছে। আলো নেমে এসে আয়াতের মেয়ে আরিশাকে বললো,“তোমার ইনশিরাহ আপুর ঘরে প্রেরণা আপু আছে,ওকে একটু ডাকো, তাড়াতাড়ি।”
চেঁচামেচিতে রিতু চলে এসেছে। শুদ্ধর দাঁত দেখে ইহান আলোকে বললো,“ওকে ডেন্টিস্টের কাছে নিয়ে যেতে হবে আই থিংক!”
রিতু এসে দাঁড়ায় সেখানে, শুদ্ধর কাছে এগিয়ে গিয়ে ওর দাঁতটা দেখলো, অতঃপর ইহানকে বললো,“দে আমার কোলে দে! কোথাও নিতে হবে না!”
প্রনমি নিজেকে সামলে নিয়ে বিছানায় বসে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলো। প্রেরণাও তার ঠিক পাশেই বসেছে। আরিশা এলো ছুটতে ছুটতে,হুরমুর করে ইনশিরাহর ঘরে ঢুকে গিয়ে বললো,“প্রেরণা আপু! শুদ্ধ ব্যাথা পেয়েছে।”
লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল প্রেরণা, প্রনমির দিকে তাকিয়ে বলে,“প্রনো আমি না আসা অবধি এখান থেকে নড়বি না।”
মাথা ঝাঁকায় প্রনমি। প্রেরণা ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটতে ছুটতে নিচে নামে। শুদ্ধকে ওভাবে দেখে ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে চেঁ'চি'য়ে ওঠে একপ্রকার। ইহান অবাক চোখে তাকায় প্রেরণার দিকে।
বাড়ির সবাই ওখানে এসে দাঁড়িয়েছে স্টেজ ছেড়ে। রিতু ততক্ষণে শুদ্ধর নড়বড়ে দাতটাকে তুলে ফেলেছে সন্তর্পণে।
এহেন দৃশ্য দেখে প্রেরণা কেঁদে ফেলে। ওর এই কান্না দেখে ও বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষই খানিকটা অবাক। সামান্য দাঁত পরা নিয়ে কোনো মা এতোটা কাঁদতে পারে !
প্রিতম নিচু স্বরে সবাইকে বলে,“শুদ্ধর ব্যাপারে আপু একটু বেশিই দুর্বল। তাই এমন করছে!”
রিতু শুদ্ধর দাঁতটা প্রেরণাকে দেখিয়ে বলে,“ভারী অদ্ভুত মেয়ে তো তুমি! শুদ্ধকে দেখো! ও তো এখন কাদছেই না! তুমি এমন করছো কেন?”
এটুকু বলে রিতু থেমে পর পর খুনসুটি মাখা কন্ঠে শুদ্ধকে বলে,“এমা! শুদ্ধ এখন মামার বিয়েতে মুরগির ঠ্যাং চিবোতে পারবে না যে!”
নিচে শোরগোলের শব্দে ইরফান ঘর থেকে বেরোনোর সিদ্ধান্ত নেয়। শেষবারের মতো আয়নায় নিজেকে দেখে পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নিতে নিতে দ্রুতপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে লম্বা কদমে দোতলার লবি ধরে সিঁড়ির দিকটাতে যেতে নিলে তার বাহুর সাথে ধাক্কা লেগে দ্রিপ্তর ঘরের সামনে দাঁড় করানো তাক থেকে দু'টো কাঁচের শোপিচ নিচে পরে যায়।
তৎক্ষণাৎ চুড়মার হয়ে যায় দুটোই। কাঁচের টুকরো গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায় আশেপাশে। ইরফান দাঁড়িয়ে পরে। এ তো মহা মুসিবত হলো! আশেপাশে কাউকে খুঁজে পেলোনা ইরফান, কাঁচের টুকরো গুলো এভাবে পরে থাকলে একটা দুর্ঘটনা ঘটবে নিশ্চিত। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সে নিজেই ঝুঁকে বসলো টুকরো গুলো পরিষ্কার করতে।
প্রনমি বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। আপু নিচে গিয়েছে দীর্ঘসময় হয়ে গিয়েছে। এখনও ফিরছে না দেখে প্রনমির শুদ্ধর জন্য দুশ্চিন্তা হতে থাকে। বিছানা হাতরে ছড়িটা খুঁজে পায় সে, এ বাড়ির কিছুই তার জানা নয়, ভাবলো ঘর থেকে বেরিয়ে কাউকে বলবে নিচে দিয়ে আসতে তাকে।
সাহস নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে প্রনমি ডানদিকে হাঁটতে শুরু করলো ধীরপায়ে।
ইরফান নিচু হয়ে ঝুকেই কাঁচের টুকরো গুলো একটা একটা করে একটা টিস্যু পেপারের তুলে নিচ্ছিলো। আচমকা মেয়েদের কাঁচের চুড়ির রিনিঝিনি শব্দে ইরফান মাথা তুলে সোজাসুজি তাকাতেই থ'ম'কে যায়।
ততক্ষণে প্রনমি তার নিকটেই চলে এসেছে। ইরফান সামান্য সময়টুকুও পেলোনা মেয়েটিকে সাবধান করার। মুহুর্তেই প্রনমি নিজের ফরসা টুকটুকে, সুগঠিত পা কাঁচের টুকরোতে রেখে দেওয়ার আগেই ইরফান হতবিহ্বল হয়ে কি করবে বুঝতে না পেরে প্রনমির পা টা সরিয়ে দিতে যায়। ততক্ষণে প্রনমি পা রেখে দেয় ইরফানের হাতেই।
এতোকিছু তিন সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে গিয়েছে। প্রনমি চ'ম'কে উঠে ডানে ঘুরে পিছিয়ে যেতেই দেয়ালে বারি খায় পিঠে। ইরফান যন্ত্রণাটুকু গিলে ফেলে মেঝে থেকে হাত টা তুলে নেয় নিজের। ডান হাতের পিঠ ছিড়ে-ফুড়ে গিয়েছে। ইরফান নিশ্চুপে নিজের হাত দেখতে থাকে।
প্রনমি হাপাচ্ছে। ইরফান ক্ষত বিক্ষত হাত থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পা থেকে মাথা প্রনমিকে দেখছে, ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছিল হাতে, তবুও সে টু শব্দটিও করলো না।
হাঁপাতে হাঁপাতে প্রনমি বলে,“এখানে কি কেউ আছেন? আচ্ছা আমি কি কারো হাতে পা দিয়ে ফেলেছি? বলুন?”
ইরফান কোনো কথা বলছে না, হাত দিয়ে টপটপ করে রক্ত পরছে, সে তাকিয়ে আছে প্রনমির দিকে। প্রনমি বলতে থাকে,“বলুন না! এখানে কেউ আছেন? আমি কারো হাতের ওপর পা রেখে ফেলেছি?”
ইরফান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। সে মুখ খুললেই এই মেয়ে এখানে অজ্ঞান হয়ে পরে আরেক কেলেঙ্কারি করে ফেলবে,তা সে জানে। প্রনমি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়েই আছে। ইরফান কয়েক সেকেন্ড দেখে চোখ সরিয়ে প্রনমির গালের লাল তিল দেখে। প্রনমি যখন কথা বলছে,ওর গালের তিলটাও কথা বলছে যেন।
নিচ থেকে তখন ছুটতে ছুটতে আসে প্রেরণা, বড্ড দেরী করে ফেলেছে সে। কারো পায়ের শব্দ পেয়ে ইরফান চুপচাপ পাশের বারান্দায় পর্দার আড়ালে চলে যায় ।
প্রেরনা এসে এতো কাঁচের টুকরোর পাশে প্রনমিকে স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চেঁচিয়ে বলে,“আল্লাহ এসব কি! এই তোকে আমি ঘর থেকে বেরোতে বলেছি? ফাজিল মেয়ে!”
প্রনমি বোনের কথার জবাব না দিয়ে বললো,“আপু আমি সম্ভবত কারো হাতের ওপর পা রেখে ফেলেছি। এখানে কেউ আছে? আমি কিছু বুঝতে পারছি না! কে আছে এখানে?”
প্রেরণা মেঝের দিকে তাকিয়ে দেখলো ফোঁটা ফোঁটা রক্ত। সে আশেপাশে তাকায়, কিন্তু কোথাও কারো অস্তিত্ব নেই। ছুটে এসে বোনকে আগলে নিয়ে বললো,“পরে দেখবো। চল নিচে চল!”
ওরা সিঁড়ির দিকে পৌঁছাতেই আড়াল থেকে ইরফান বেরিয়ে, কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে থাকা স্থানে এসে দাঁড়ায় টান টান হয়ে।
সামিন-আলোর রুমের দরজা খুলে তখন মারিয়া বেরিয়েছে, রাগটা পরে গিয়েছে তার ততক্ষণে। সে বেরিয়ে ইরফানকে দেখতেই চেঁচিয়ে ওঠে,“সেকি! এ কি হাল তোমার হাতের ইরফান!”
ইরফান নিচু স্বরে বলে,“ছোটো মায়ের ঘর থেকে ফার্স্ট এইড বক্সটা নিয়ে এসে একটু কষ্ট করে ড্রেসিং করে দিন মামী,কাউকে ডাকবেন না প্লিজ।”
_______
ইরফানের হাতে ব্যান্ডেজ দেখা মাত্রই আলো ছুটে আসে ওর কাছে। ইরফানের হাতটা ধরে বলে,“এসব কিভাবে হলো?”
_শেভ করতে গিয়ে।
শান্ত জবাব ইরফানের।
_শেভ করতে গেলে গাল কাটবে, হাতের পিঠ কেন কাটবে?
_মেশিনটা চালু রেখে হাত রেখেছিলাম অসাবধানতাবশত।
কথাটা বিশ্বাস যোগ্য না হলেও আলো বিশ্বাস করলো, এটা নিয়ে ইরফানের মিথ্যাচার করার পেছনে কোনো কারণ তো নেই!
সে ইরফানকে বলে,“চলো ওদিকটায়, সবাই ওখানে আছে।”
স্টেজে দু'পক্ষের লোকজনই ছিলো। কিন্তু কোথাও প্রনমি নেই, প্রেরণা যেই না শুনেছে ইরফান আসছে স্টেজে সে প্রনমিকে শান্তিনীড়ের অন্দরমহলে ইনায়ার বান্ধবীদের কাছে রেখে এসেছে।
ইরফান ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় ওদের সবার কাছে। গম্ভীর মুখভঙ্গি, গাম্ভীর্য নিয়ে হাঁটছে সে। প্রেরণা দৃষ্টি ঘুরিয়ে ইরফানের হাত দেখে।
ইরফান গিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে সবাইকে উদ্দেশ্য করে সালাম দিয়ে মুঈনের সাথে করমর্দন করে। এরপর গিয়ে মুখোমুখি দাঁড়ায় প্রিতমের । প্রিতম শান্ত চোখেই তাকিয়ে আছে ইরফানের দিকে, একইভাবে ইরফানও দেখছে ওকে। দু'জনের ঠোঁটে অস্পষ্ট বাঁকা হাসি লেপ্টে আছে। সৌজন্য করমর্দন করে ইরফান প্রেরণার দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। প্রেরণা অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। ইরফান ম্লান হাসে , আশেপাশে তাকিয়ে প্রনমিকে দেখতে পেলো না সে। জ্ঞানী আপা তার দুধুভাতু বোনকে নিয়ে ইরফানের সাথে লুকোচুরি খেলছে সম্ভবত! বাঁকা হেসে ইরফান প্রেরণাকে পাশ কাটিয়ে সামিন, ইলহাম আর ইশমামের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
ভোজন পর্ব, শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাট চুকিয়ে আরো এক দফা ফটোসেশন হয়।
ইনশিরাহ হাঁপিয়ে উঠেছে, কাউকে কিছু বলতেও পারছে না। সে একটা ডিভানে গা এলিয়ে বসে আছে চুপচাপ। মুঈন লক্ষ্য করছে খুব করে বিষয়টি, কিছুক্ষণ পরে ইনশিরাহকে বললো ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিতে। ইনশিরাহ গেলো না। যে কয়বার তাকে উঠে দাঁড়াতে বলা হচ্ছে ছবি তোলার জন্য,সে উঠে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। একদম কলের পুতুল যেন!
সন্ধ্যা নাগাদ নিমন্ত্রিত অতিথিরা বিয়ে বাড়ি ফাঁকা করে চলে যায়। ধীরে ধীরে জমজমাট পরিবেশ, লোকসমাগমের কোলাহল শান্ত হয়। সন্ধ্যা পেরোতেই প্রেরণা আসে বাড়ির মুরব্বিদের কাছ থেকে বিদায় নিতে। তারা চলে যাবে,প্রিতম আগামীকাল সকালে বৌ নিয়ে যাবে এটাই ঠিক করা আছে।
যাওয়ার আগে শুদ্ধ মাম্মার কথামত তার ফোকলা দাঁত বের করে রিতুর কাছে এসে তাকে বললো,“থ্যাংকিউ নান্নান!”
প্রেরণা শুদ্ধকে শিখিয়ে দিয়েছে এ বাড়ির সব মুরব্বি মহিলাকে নান্নান ডাকতে। সম্পর্কে সবাই শুদ্ধর নানী হয় কি না!
রিতু হেসে শুদ্ধকে কোলে তুলে নিয়ে দু'গালে চু'মু খেয়ে বললো,“আবার এসো,আরেকটা দাঁত তুলে দেবো তখন, কেমন? আমি তোমার ডেন্টিস্ট হবো।”
খিকখিক করে হাসছে শুদ্ধ। হাসছে রিতুও। মাম্মার হাত ধরে এ বাড়ি থেকে যাওয়ার আগে এ বাড়ির সব মুরব্বিদের থেকে বিদায় নিলো,আদর নিলো। সামিন ইয়াসার মির্জা, ইলহাম মির্জা, ইশমাম মির্জার থেকে শুদ্ধ গিফটও পেলো,তার দাঁত হারানোর দুঃখ সে ভুলে গিয়েছে গিফট পেয়ে।
শেষে গিয়ে ইহানের কাছ থেকেও আদর নিলো শুদ্ধ, অনেক অনেক আদর।
তখন সন্ধ্যা সাতটা বেজে গিয়েছে প্রায়। ইরফান দোতলার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে নিচতলায় সবাইকে দেখছিলো। প্রনমি আপুর হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে মুখটা কাঁচুমাচু করে। ইরফান ওর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিজের হাত দেখলো। তারপর আবারো তাকালো প্রনমির দিকে। চুপ চাপ দেখতেই থাকলো প্রনমিকে ওরা শান্তিনীড় থেকে বের না হওয়া অবধি।
শেহা সারাদিনে দুবার ঘর থেকে বেরিয়েছিল, অতিথিদের সাথে ফটো সেশনে অংশ নিয়ে বিকেলেই মাথা ধরার বাহানায় ঘরের দোর লাগিয়েছিলো সে। সন্ধ্যার পরে পারলো না একা থাকতে, ইনায়ার বান্ধবীরা টেনে বের করলো ওকে। সন্ধ্যার পরে দুধ মধু রিচ্যুয়াল করতে চায় তারা। এটি একটি বানোয়াট রীতি, দক্ষিনাঞ্চলের বিয়েতে,বাসরের আগে মানুষ আনন্দ করার উদ্দেশ্যে করে থাকে, বাসর ঘরে ঢোকানোর আগে বর বৌকে পাশাপাশি বসিয়ে, দু'জনের মাথার ওপরে একটা চাদর দেয়া হয় । তারপর দু'জনকে দু'চামচ মধু, দু চামচ দুধ, মিষ্টি খাইয়ে দেয়া হয়।
রিতু দক্ষিণাঞ্চলের মেয়ে, ইনশিরাহ ইনায়ার বান্ধবীগুলো রিতুর মুখে এই রীতির কথা শুনে ভীষণ আগ্রহী এটা পালন করার জন্য।
ডিনারের পরে দুই জোড়া কপোত কপোতীকে বসিয়ে ওরা তাদের মাথার ওপর চাদর টেনে দিলো। ইনশিরাহ বিরক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছেও শক্ত হয়ে বসে রইলো। মুঈন ফরাজী চাদরের নিচে মিটিমিটি হাসছিলো তার নাক উঁচু বৌয়ের মেজাজ আন্দাজ করে।
দুধ মধু রিচ্যুয়াল শেষ হতে হতে রাত সাড়ে নয়টা বেজে যায়। আলো ছেলেমেয়ে গুলোর মাঝে এতক্ষণ নাক না গলালেও, এবার এসে তুনাকে বলে,“আর কত? ওদের তো একটু বিশ্রাম দরকার মা। ওদের ঘরে পাঠিয়ে দে!”
বড়রা সবাই যার যার ঘরের দোর লাগিয়েছে, এসবের ধারে কাছেও কেউ নেই। মুঈনকে ঠেলতে ঠেলতে তার শ্যালিকারা ইনশিরাহর ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছে,রাত তখন দশটা।
আবছা অন্ধকার হয়ে আছে পুরো ঘরটা, ক্যান্ডেল আর গোলাপ দিয়ে সাজানো মুঈন-ইনশিরাহর বাসরের খাট। মুঈন এতক্ষণে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে । শ্যালিকাদের অত্যাচার সারাটা দিন মুখ বুজে সহ্য করেছে, এবার যেন হাঁফ ছাড়ল সে। দরজার সিটকিনি তুলে ঘাড় ঘুরিয়ে মুঈন বিছানার দিকে তাকায়।
আবছা অন্ধকারে দেখলো এক হাত ঘোমটা টেনে বসে আছে ইনশিরাহ। মুঈন ভীষণ অবাক হলেও হাসলো, এসব নিশ্চয়ই ইনশিরাহ তার চাচীদের ধ'ম'কের প্রভাবে করেছে।
একপা দুপা করে এগিয়ে গিয়ে মুঈন ধীরে ধীরে বিছানায় বসলো ইনশিরাহর মুখোমুখি। ইনশিরাহর কোনো নড়চড় নেই দেখে মুঈনই হাত বাড়িয়ে ধীরে ধীরে ঘোমটা টা তুলে তাকায়, অতঃপর ছিটকে পিছিয়ে যায় মুঈন। আজানের বড় ছেলে মুগ্ধ হেসে ওঠে খিলখিলিয়ে, চেঁ'চি'য়ে বলে,“দুলাভাই! প্রাংক!”
মুঈন বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ায়। ত্রস্ত পায়ে হেঁটে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখে তুনাদের গ্যাং এবং রুশফিদের গ্যাং হাসতে হাসতে মাটিতে গড়িয়ে পরছে। মুঈনের হতভম্ব ভাব দেখে তুনা নেত্রীদের মতো ওদের সবার সম্মুখে দাঁড়িয়ে বলে,“এই যে জাঁদরেল অফিসার! আপনি কি ভেবেছেন? এতো স্বস্তায় বৌয়ের ঘোমটা তুলতে দেবো? কি শখ আপনার বাবাগো বাবা! হাহ! আগে আমাদের হাদিয়া দিন! সারাদিন কম খাটিনি আমরা।”
_হাদিয়া? কয়বার নেবে? দেখো আমি কিন্তু এখনও ঘুষ খাওয়া শুরু করিনি। এভাবে তোমাদের ঘুষ দিতে থাকলে নতুন বৌ নিয়ে তবে চলতি মাসটা টেনে টুনে খেতে হবে!
_অত কথা শুনছি না। মাত্র দশ হাজার! মাত্র!
সবাই মিলে ধরলো মুঈনকে। মুঈন একা পরে গিয়েছে, ওদের সাথে পেরে না উঠে অগত্যা দশ হাজার টাকা দিতেই হলো।
মানহা টাকা গুনতে গুনতে বললো,“একটু পুল সাইড থেকে ঘুরে আসুন দুলাভাই, ততক্ষণে আমরা আপনার চাঁদকে এখানে এনে রাখি!”
বড়দের সবার ঘরের বাতি নিভে গিয়েছে। মুঈন ফরাজী শেরওয়ানি পরে পুলসাইডে দাঁড়িয়ে আছে,রাত তখন এগারোটা।
ইনায়া দোতলার লিভিং রুমে ছোটাছুটি করছে, এতক্ষণ শেহাকে ধরে টানছিলো মুঈন-ইনশিরাহর বাসর ঘরে আড়ি পাতবে বলে । শেহা কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। হঠাৎ প্রিতম এসে ইনায়ার হাত টেনে ধরলো,ইনায়া মেজাজ দেখিয়ে বললো,“এভাবে টানছো কেন?”
_ঘরে যাবে না?
_না তুমি গিয়ে ঘুমাও, আজ আপু দুলাভাইয়ের ঘরে আড়ি পাতবো আমরা।
প্রিতম অবাক হয়ে বলে,“ছিঃ এসব ব্যাড ম্যানার্স! চলো ঘরে চলো।”
_না,ব্যাড ম্যানার্স না,এটাও রীতি। যাও তো তুমি,জ্ঞান দিও না এতো।
_তুমি যাবে না? আমাদের ঘর সাজানো হয়েছে। আজ তো আমাদের বাসর!
ইনায়া চূড়ান্ত অবাক হয়ে বলে,“মানেহ! আজ আমাদের বাসর মানে? দেড়মাস আগে ওটা কি ছিলো তবে?”
_______
ইনশিরাহকে বাসরের খাটে বসিয়ে দিয়ে তুনা ওর কানে বলল,“একদম আগ বাড়িয়ে ধরা দিবি না। এই পুরুষ জাত মাথায় চ'ড়ে বসে তবে। আগে ওজন বোঝাবি তারপর সব। অল দ্য বেস্ট!”
ইনশিরাহর এক হাত লম্বা ঘোমটাটা টেনে দিয়ে,বেডসাইড টেবিলে রিতুর কথামত একটা দুধের গ্লাস রেখে তুনারা এবং রুশফিরা চলে যায়। কিছুক্ষণ পরে মুঈনকে ডেকে এনে ইনশিরাহর ঘরে ঢুকিয়ে দেয় ওরা। তবে ওরা সবাই দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল কান খাড়া করে।
রাত তখন এগারোটা বেজে কুড়ি মিনিট। মুঈন ঘরে ঢুকে দেখলো এবার ঘরটা আলোকিত, সবগুলো বাতি জ্বেলে দেয়া। এবার বিছানায় যিনি বসে আছেন তিনি যে ইনশিরাহই তা মুঈন জানে।
তবুও সে ঘুরে দরজার সিটকিনি তুলে দিতে দিতে বললো,“দ্যাখো! এবারও যদি আমার সাথে প্রাংক করার মতলব থাকে তবে বলে দিচ্ছি কপালে শনি নাচছে তোমাদের, শ্যালক বা শ্যালিকা যেই হও! বেঁধে খাটের নিচে ঢুকিয়ে রাখবো।”
ইনশিরাহ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ঘোমটার নিচ থেকেই নিচুগলায় জবাব দিলো,“আমি ইনশিরাহ।”
মুঈন স্মিত হাসলো। চুপচাপ এগিয়ে গেল ইনশিরাহর কাছে। মুঈনের প্রতি কদম ইনশিরাহ অনুধাবন করলো। মুঈন গিয়ে ঠিক তার মুখোমুখি বসে পরলো। কিছুক্ষণ ইনশিরাহর ঘোমটার দিকে তাকিয়ে থেকে মুঈন শান্ত স্বরে বললো,“এত বড় ঘোমটা কেন?”
_এটাও মেজো মায়ের বানানো রীতি।
স্পষ্ট জবাব ইনশিরাহর।
মুঈন মৃদু হাসলো। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে ইনশিরাহর ঘোমটা তুললো মুঈন। মুহুর্তেই যেন তার ব্যক্তিগত চাঁদের আলোয় আরও আরও আলোকিত হলো চারপাশটা।
ইনশিরাহ মাথা তুলে তাকায় মুঈনের দিকে। দু'জনের চোখাচোখি গভীর হলো।
ইনশিরাহ চোখ নামায় না,তার অনুভূতিহীন দৃষ্টি দেখে মুঈন হতাশ, মুঈন ফরাজী ভীষণ রকমের হতাশ। কোনো নারীসুলভ লজ্জার ছিটেফোঁটাও নেই ঐ রমনীর দৃষ্টিতে, রোবটের মতো তাকিয়ে আছে তার বধূ।
কিছুক্ষণ হতাশ হয়ে তাকিয়ে থেকে মুঈন বললো,“একটু লজ্জা পাওয়া উচিত ছিলো!”
চলমান........
গতকাল রাতে না ঘুমিয়ে লিখলাম। ৫০০০+ শব্দ সংখ্যা। আমি বুঝি না আমি এইসব ছাতার মাথা লিখে নিজের শরীর স্বাস্থ্যের ক্ষতি কেন করছি!
গল্পটা মাত্র শুরু হয়েছে। যাদের ধৈর্য্য আছে তারাই সাথে থাকুন। আর হ্যা,এটা রোমান্টিক গল্প শুরুতেই বলা আছে, হুটহাট আমার মাথার তার উল্টে পাল্টে গেলে রোমান্স-টোমান্স লিখবো, কোনো রকম এলার্ট ছাড়াই। ওসব ঢং ইদানিং করতে ইচ্ছে করে না। এই লাইনে এসে বহুত ঢং করেছি। এখন থেকে ছন্নছাড়া বেপরোয়া লিখবো।
জুটিগুলোর কাহিনী আরো বিস্তৃত হবে। তাই শেষবারের মতো বলবো ধৈর্য্য থাকলে তবেই পড়বেন।