ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 59

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৫৯
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

মুঈনের দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে ইনশিরাহর মুখপানে। পানপাতার মতো প্রিয়দর্শিনী মুখটাতে নেই কোনো অভিব্যক্তি। যেন চাবি দেয়া কলের পুতুল একটা। মুঈন ফরাজী তার নববধূকে নিয়ে কল্পনার জগতে যা যা ভেবে রেখেছিলো, তার ছিটেফোঁটাও দেখতে পাচ্ছে না সে ইনশিরাহর মুখে। মুঈন স্মিত হেসে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,“আই মিন! সব রীতি মানলে নববধূদের লজ্জা পাওয়ার রীতিটাও মানা উচিত।”

_অকারনে লজ্জা পাবো কেন?
ইনশিরাহর সাফ সাফ প্রশ্ন!

মুঈন ভ্যাবাচাকা খেয়ে যায় পুরো বধূর কথাতে। এই লজ্জা এক অন্য লজ্জা এটা ব্যাখ্যা করার মতো শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না সে। উঠে দাঁড়িয়ে বলে,“সেটাই! লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। বলছিলাম এতো বড় ঘোমটা টেনে দেওয়ার প্রসঙ্গে।”

ইনশিরাহ চুপচাপ বসে আছে। মুঈন আশেপাশে তাকিয়ে কিছু একটা খুঁজছে দেখে ইনশিরাহ বললো,“ঘরে কেউ নেই। ওরা এতোটাও অসভ্য নয় যে ঘরে ঢুকে বসে থাকবে।”

মুঈন হেসে বলে,“তার মানে তুমি বলতে চাইছো ওরা একটু হলেও অসভ্য!”

ইনশিরাহ নিশ্চুপ, মুঈন মৃদু হেসে বলে,“আ'ম লুকিং ফর মাই টয়লেট্রিজ! ফ্রেশেনআপ হবো!”

_সেগুলো সোফিয়া মামী কাবার্ডে রেখে গিয়েছে, আমি বের করে দেবো?

ইনশিরাহ বেনারসী সামলে উঠতে চায়, মুঈন ওকে থামিয়ে দিয়ে শান্ত হয়ে বলে,“ওখানেই বসে থাকো!”

বাইরে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে সবাই, দরজায় আড়ি পেতে আছে। রুশফি মলিন মুখে তুনাদের দিকে তাকিয়ে বলে,“ও বড় আপুরা! কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছি না তো!”

_কি শুনতে চাচ্ছো তোমরা?

_কিছুমিছু।

_ছোটো ছোটোর মতো থাকো। চুপচাপ থাকো,নয়তো ঘুমাতে যাও।
কড়া গলায় ইনায়ার বান্ধবীদের বললো তুনা।

মানহা দাঁত বের করে বলে,“এই ফরাজী বোধহয় ইনশিরাহর রূপের ঝাঁঝ সহ্য করতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে।”

তাজরী বললো,“ভাই একটা বড় কাজ তো করা হয়নি! সাঈমকে ছবিগুলো পাঠিয়েছিস?”

তুনার হঠাৎ মনে পরে গেলো, সে ফোনটা বের করে চেক করে দেখলো পাঁচ মিনিট আগেই সাঈম ছবিগুলো দেখেছে। ইনশিরাহ মুঈনের দু'টো ছবি পাঠিয়ে তুনা লিখেছে,“কাপল অব দ্য ইয়ার না? তা আপনার বাবা আপনার জন্য জীবন্ত ইল মাছ খুঁজে পেয়েছে?”

সাঈম ছবিগুলো দেখছিলো, জুম করে দেখছিল ইনশিরাহকে। ইনশিরাহর ঠোঁটের হাসির রহস্য উদঘাটনে ব্যস্ত সে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে ব্যস্ত সে।
সাগর ভুঁইয়া ডিনার টেবিলে ছেলেকে দেখে বলে,“খাচ্ছো না কেন?”

সাঈম ফোন নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,“ইচ্ছে করছে না।”

ছেলেকে হন্তদন্ত হয়ে দোতলায় উঠতে দেখে সাগর ভুঁইয়া বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করে বলে,“বেকুব একটা! ঐ মেয়ের জন্য আবার বুক পোড়াচ্ছে!”

______

এদিকে যুদ্ধ লেগেছে প্রিতম ইনায়ার মাঝে। এক হাতে প্রিতম টানছে ইনায়াকে, দাঁতে দাঁত চেপে বলছে,“ঘরে চলো বলছি!”

ইনায়াও জেদ দেখিয়ে ফিসফিসিয়ে বলছে,“আগে তুমি জবাব দাও এক জীবনে কতবার বাসর করবে?”

_বাড়াবাড়ি হচ্ছে ইনু। সিনক্রিয়েট করো না!

_আমি আপুর ঘরে আড়ি পাততে যাবো যাবো যাবো, তুমি যাও ঘরে!

_ইনু চলো না প্লিজ লক্ষিটি!
এবার হার মেনে নম্র হলো প্রিতম। তবে ইনায়া মানলো না,প্রিতমের হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে ব্যস্ত সে। রাত তখন পৌনে বারোটা প্রায়, ইরফান একটু নিচতলায় যাবে বলে ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে মুখোমুখি হলো প্রিতম ইনায়ার। প্রিতমের হাতের মুঠোয় ইনায়ার হাত, ইরফানের চোখ পরলো সেখানে। প্রিতম ইরফানকে দেখে ইনায়াকে ছেড়ে সরে দাঁড়ায় চুপচাপ। ইরফান নিজেও ভীষণ বিব্রত, চোখ নামিয়ে চুপচাপ ওদের পাশ কাটিয়ে চলে যায়।

ইরফান যেতেই প্রিতম ফোঁস শব্দে নিঃশ্বাস ফেলে বলে,“বিটকেল সম্বন্ধি! এখন আমার হিটলার শশুর চলে আসলেই ষোলোকলা পূর্ণ হবে!”

প্রিতমের মুখ ফুটে বলা কথাটাই ফলে গেলো। ইশমাম পরীর জন্য ওয়াটার ব্যাগে পানি ভরতে ঘর থেকে বেরিয়ে মেয়ের হাত ধরে জামাইয়ের টানাটানি দেখে চোখ নামিয়ে দ্রুতপায়ে নিচে চলে যায়। ইনায়া ভীষণ লজ্জা পেয়েছে, প্রিতম হয়েছে বিরক্ত। কন্ঠে বিরক্তি মিশিয়ে বিড়বিড় করে বললো,“ধূর ছাতা! বাসরই করবো না!”

হন্তদন্ত ঘরে গিয়ে প্রিতম বিছানায় চুপচাপ শুয়ে থাকে। ইনায়া আজ তাকে বিশেষ পাত্তা দিলো না,সে তো নাচতে নাচতে চলে গেলো আপুর ঘরে আড়ি পাততে।

শেরওয়ানি পালটে একটা লম্বা সময়ের শাওয়ার নিয়ে মুঈন বেড়োলো। নেভি ব্লু রঙের পলো টি-শার্ট, এবং কালো ট্রাউসার্সে ঘরোয়া বেশে মুঈন। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছে নিতে নিতে ইনশিরাহর কাছে যায় সে। ইনশিরাহ চুপচাপ বসেই আছে। মুঈন গিয়ে বিছানায় ওর সম্মুখে বসে কিছুক্ষণ ওকে দেখে একটা স্নিগ্ধ সুন্দর চমৎকার হাসি উপহার দিলো ইনশিরাহকে। বিনিময়ে ইনশিরাহও হাসার চেষ্টা করলো,কিন্তু কাঠিন্যতা ওর মুখ থেকে সরলো না।

মুঈন বেডসাইড টেবিলের ওপর থেকে একটা বক্স তুলে একটা ব্রেসলেট বের করে বললো,“ডান হাতটা দাও।”

ইনশিরাহ রোবটিক ভঙ্গিতে হাতটা বাড়িয়ে দিতেই মুঈন একটা সিম্পল ব্রেসলেট ওর ডান হাতে পরিয়ে দিতে দিতে বলে,“তুমি অলংকার পছন্দ করো না,আর আমি উপহার হিসেবে অলংকার ব্যতীত অন্য কিছু খুঁজেই পাইনা তোমাকে দেয়ার মতো। এই ব্যাপারে আমাকে একটু পড়াশোনা করতে হবে ইনশিরাহ বুঝলে!”

ইনশিরাহ নিজের চুড়ি পরা হাতে মুঈনের পরিয়ে দেয়া ব্রেসলেটের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে বললো,“অপছন্দ করি এমন না। আসলে আমি এগুলো পরে থাকতে পারি না। আমার ইচিং হয়। গিফট টা সুন্দর। থ্যাংক ইয়ু। আপনার দেয়া সবগুলো গিফট ভীষণ সুন্দর, কিন্তু ওগুলো আমি পরে থাকতে পারবো না।”

স্পষ্ট জবাব ইনশিরাহর। মুঈন চোখ তুলে ইনশিরাহর চোখের দিকে তাকায়। শ্যামলা সুদর্শন মুখটায় অমায়িক হাসি লেপ্টে আছে। ভেজা চুলে মুঈনকে আদতেই প্রিন্স চার্মিংয়ের মতো লাগছে, ওরা কেউ বাড়িয়ে বলে না মুঈনের পুরুষালি সৌন্দর্যের কথা, ইনশিরাহ বুঝলো!

তোয়ালেটা একটা চেয়ারের ওপর রেখে মুঈন গিয়ে ইনশিরাহর অতি নিকটে বসলো, গোলাপের গন্ধ ছাপিয়ে মেয়েলি সুবাসে আন্দোলিত হচ্ছে তার প্রতিটা রোমকূপ। ইনশিরাহ নড়চড় করলো না, তার অনমনীয় দৃষ্টি মুঈনকে দেখছিলো। এখন কি হবে! কি হতে চলেছে! একাধিক প্রশ্ন উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল তার মনে।

মুঈন স্থির হয়ে বসে ইনশিরাহর চোখে চোখ রাখলো, হাস্কি স্বর নমনীয় করে বললো,“ক্যান আই হ্যাভ মাই ফার্স্ট কিস ইনশিরাহ?”

ইনশিরাহ খানিকটা চ'ম'কে উঠলেও শান্ত হয়ে বসে রইলো, মাথাটা নিচু করে নিয়ে, কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল,“হু।”

সম্মতি দিলেও চোখমুখ শক্ত করে বসে রইল ইনশিরাহ,বা হাতে বিছানার চাদর শক্ত করে চেপে ধরল। মুঈন সম্মতি পেয়ে ইনশিরাহর ডান হাতটা তুলে মেহেদী রাঙ্গা হাতের পিঠে গভীর একটা চুমু খায়।

ইনশিরাহ ছটফট করছিলো,তার অদ্ভুত লাগছিল, তার মনে হচ্ছিল সে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। মুহুর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে শক্ত হয়ে বসে রইলো। মাথা তুলে মুঈন ইনশিরাহকে দেখলো কয়েক পলক, একটা অমায়িক হাসি হেসে সে আরও কাছে এগিয়ে গেল ইনশিরাহর, ইনশিরাহর এক হাতের ওপর হাত রেখে মুঈন ধীরে ধীরে ইনশিরাহর কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায়।

রুক্ষ পুরুষালি উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শ অনুভব করছে ইনশিরাহ, কিন্তু সে স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছে না। ম্যান পারফিউমের সুবাসও তাকে অস্বস্তি দিচ্ছে। মুঈনের বধূর কপালে চুমুটা ছিলো দীর্ঘ, ইনশিরাহ আর ধৈর্য রাখতে না পেয়ে নিজেকে সরিয়ে নেয় আলতো করে।

মুঈন চোখ খুলে দেখলো ইনশিরাহকে,কিছুটা সময় চেয়ে থেকে সে বললো,“ডিড আই এমব্যাররাস ইয়ু?”

দু'পাশে মাথা ঝাঁকিয়ে ইনশিরাহ বললো,“একটা কথা ছিলো।”

_শিয়র! বলো!

চুপ হয়ে যায় ইনশিরাহ,কিছু সময়ে আড়ষ্টতা কাটিয়ে ধীরে ধীরে বলতে লাগলো,“আমার সম্ভবত কিছুদিন সময় লাগবে। এই ধরুন কিছুদিন।”

_কোন ব্যাপারে?
মুঈনের তাৎক্ষণিক প্রশ্ন।

ইনশিরাহ নিশ্চুপ। মুঈন প্রশ্নটি করে নিজেই বিব্রত। সে বুঝতে পারলো কয়েক সেকেন্ড পরেই। মুঈন ফরাজী একটুও অবাক হলো না এতে, সে জানতো যুগের রীতি অনুযায়ী এমন একটি কথা তাকেও বাসর রাতে শুনতে হতে পারে। বাসর ঘরে বধূর মুখে “আমার সময় লাগবে” এই কথাটা বধূর সান্নিধ্য পেতে মরিয়া হওয়া পুরুষের জন্য একেবারেই বিষবাক্য, শুনলেই ভেতরটা জ্বলে যায় পুরুষের। কিন্তু ভদ্রলোকের জ্বললেও তা প্রকাশ করে না, আর মুঈন ফরাজী নিতান্তই ভদ্রলোক।

তার ভেতরটা জ্বলে গেলো কিনা তার অভিব্যক্তি দেখে বোঝার সাধ্যও নেই। তার ঠোঁটে লেপ্টে আছে অমায়িক হাসি। সে ইনশিরাহর চোখের দিকেই তাকিয়ে আছে। ইনশিরাহ দৃষ্টি নত করে না, ধীরে ধীরে বলতে থাকে,“ইটস আ বিগ ম্যাটার ফর মি! অনুভূতি জড়ো হবার আগে একটা কাগজের জোরে, ধর্মের বাধ্য অনুসারী হয়ে একটা লোকের সাথে সহজ না হয়েই ফিজিক্যাল ইনভল্বমেন্ট আমার রুচিতে আসে না। আমার মনে হয়েছে আপনাকে বললে আপনি বুঝবেন, তাই এসব মেয়েলি নাটক শুরু করেছি ফার্স্ট নাইটে। যদি আপনার অসুবিধা না হয় তবে সময় চাইবো কয়েকটা দিন,নয়তো আমার আপনাকে বাঁধা দেওয়ার ইচ্ছা নেই। আর দেবোও না।”

শেষের কথা গুলো দৃঢ় ভাবে বলে ইনশিরাহ। মুঈন চুপচাপ দেখছিলো ওকে, একদৃষ্টে।

ইনশিরাহ বলতে থাকে,“কয়েকটা দিন!”

হঠাৎ মৃদু হাসলো মুঈন,বললো,“সেটা কতদিন?”

_কয়েকটা দিন। ধরুন দশ-বারোদিন!

_এরপর রুচিতে আসবে?

মুঈন ভীষণ মজা পাচ্ছে, কিন্তু সে হাসতে পারছে না। ইনশিরাহ ঐ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললো,“যদি আপনার একান্তই অসুবিধা না হয় তো!”

একটা লম্বা শ্বাস ফেললো মুঈন। হাসিহাসি মুখ করেই বললো,“কেন নয়! একত্রিশ বছর বিনা অসুবিধায় কাটিয়ে দিতে পারলে আরো কয়েকটা দিন বিনা অসুবিধায় কেটে যাবে!”

ইনশিরাহ চুপ হয়ে যায় । পরপর বলে ওঠে,“আমি আপনাকে অবজ্ঞা বা ফোর্স করছি না,এটা আপনাকে আবারও মেনশন করতে চাই। আপনি যদি আমার আর্জি না মানেন তবে আমি কখনোই আপনাকে কাপুরুষ ভাববো না। এমনিতেও আপনাদের ঐ ফেরেস্তাদের লাতন না যেন কি! হোয়্যাটেভার , ওহ হ্যা লানত ! ওসব পাওয়ার ইচ্ছে নেই!”

কথাটা ইনশিরাহ বিদ্রুপ করে বলেছে। মুঈন ওর মুখোমুখি বসে পরে বলে,“এটা নিয়ে বিদ্রুপ করাটা উচিত হয়নি।”

ইনশিরাহ আবারও বিদ্রুপ করেই হেসে বলে,“আ'ম স্যরি!”

মুঈন বলতে থাকে,“ধর্মে এর সুন্দর ব্যাখ্যা দেয়া আছে। স্বামীকে কষ্ট দিয়ে,তার সাথে দুর্ব্যবহার করে তাকে অকারণে অবজ্ঞা করা যাবে না। আর এখানে আমি বিন্দুমাত্রও কষ্ট পাইনি। কেউ তোমাকে লানত দেবে না। আমি কখনোই চাইনি এই এতো সুন্দর রাতটা কেউ আমার সাথে মনঃকষ্ট নিয়ে কাটাক! এমন রাত আমাদের জীবনে আগামীতে আসবে, সম্পর্কের স্নিগ্ধতা মাটি করে দিয়ে তাতে তাড়াহুড়ো বাধ্যতা ঢুকিয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী আমি নই।”

ইনশিরাহ চুপ হয়ে যায়। মুঈন ওকে কিছুক্ষণ দেখে বললো,“এভাবে ঘুমোবে? এই বেশে?”

ইনশিরাহ নিজের দিকে তাকায়। মুঈন নম্রস্বরে বললো,“এসব ছাড়তে পারো। মা চাচীরা কেউ নেই এখানে।”

ইনশিরাহ ম্লান হেসে উঠে দাঁড়ায়। ধীরপায়ে হেঁটে সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এক এক করে গয়নাগাটি খুলে রাখলো। ইনশিরাহর মনে হলো দশ কেজি ওজন সরে গিয়েছে শরীর থেকে তার । মুঈন বিছানায় বসে তাকে দেখছে।

চুলের খোপা খুলতে গিয়ে ইনশিরাহ পরেছে বিপদে। অগণিত সরু কালো ক্লিপ দিয়ে খোপাটা সেট করা হয়েছিল। এখন সে নিজে থেকে ওসব খুঁজে খুঁজে খুলতে পারছিলো না। মাত্র পনেরো টা খুলেই তার হাঁফ ধরে গেল।

মুঈন উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে যায় ইনশিরাহর কাছে। পেছনে দাঁড়িয়ে বলে,“আমি হেল্প করবো?”

খোঁপা থেকে হাত নামিয়ে ইনশিরাহ বলে,“হু।”

মোট সাইত্রিশ টা কালো ক্লিপ। মুঈন খুবই ধৈর্য নিয়ে খুলছে। ইনশিরাহ চুপচাপ আয়নায় মুঈনের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে আছে। লম্বা, সুদর্শন, তামাটে সুপুরুষ একজন , শত শত নারীর রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা এই লোকের আছে,তার অমায়িক হাসি, গম্ভীর বাচনভঙ্গি,আর বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখ দিয়ে।
মুঈন ক্লিপ গুলো খুলতে খুলতে নিজেও তাকায় আয়নায়। দু'জনের চোখাচোখি হতে ইনশিরাহ চোখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

খোঁপা খুলে ফেলতেই ইনশিরাহর সিল্কি কালো চুল পিঠ ছড়িয়ে যায়। নিজেকে মুঈনের থেকে দূরে সরিয়ে ইনশিরাহ নিচু গলায় বলে,“আপনি শুয়ে পরুন। আমি আসছি।”

বাইরে দাঁড়িয়ে হাই তুলছে সবাই। ইনায়া বিরক্ত হয়ে বললো,“কিছু শুনতেই পাচ্ছি না,একটা রেকর্ডার লুকিয়ে রাখা উচিত ছিলো তাইনা?”

ওরা কেউ তবুও দরজা থেকে নড়ছে না। অপেক্ষা করছে, কিছু যদি শোনা যায়!

ইনশিরাহ ফ্রেশ হয়ে, শাড়ি পাল্টে বেরোলো ভেজা চুলে তোয়ালে পেঁচিয়ে। তার পরনে তার আরামদায়ক পোশাক, পাজামা এবং একটা ওভারসাইজড টি-শার্ট।

মুঈন বিছানায় চুপ করে বসেছিল। ইনশিরাহকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,“বিছানা কি এভাবে থাকবে?”

_না আমি পরিষ্কার করে দিচ্ছি।

_অসুবিধা নেই। আমিই করছি।

ইনশিরাহ এগিয়ে যায়। ফুলে ফুলে সুসজ্জিত বিছানা পরিষ্কার করতে শুরু করে, মুঈন গিয়ে তাকে সাহায্য করলো।

বেডসাইড টেবিলে একটা দুধের গ্লাস রাখা। মুঈন ইনশিরাহকে বললো,“এটা এখানে কেন?”

_কি জানি! মামীরা বললো আপনাকে দিতে।

_আমি এটা দিয়ে কি করব?
অবাক হয়ে জানতে চায় মুঈন। তারপর বললো,“এটাও কোনো রিচ্যুয়াল? আমি না আসলে জানি না! গুগল করতে হবে।”

_আমিও জানিনা। আপনি খেলে খান এটা।

মুঈন গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে বলে,“আমার এলার্জি হয়! তুমি চাইলে খেয়ে নাও! খাবার অপচয় করা উচিত নয়।”

ইনশিরাহ মুঈনের দিকে তাকিয়ে চাপা স্বরে চেঁ'চি'য়ে বললো,“আমি আর তরল দুধ? ওটা আমার কাছে ফোবিয়া।”

মুঈন ঘা'ড় ঘুরিয়ে দেখলো গ্লাসটা আবারও, ইনশিরাহকে বললো,“ঠিক আছে!”

_জি!
ইনশিরাহ একশব্দে বলে বিছানার একপাশে গুটিসুটি মেরে বসতে যায়,তার ফোনটা সরিয়ে বেডসাইড টেবিলে রাখার সময়টিতে হাতের সাথে ধাক্কা লেগে দুধের গ্লাসটা মেঝেতে পরে যায় মুহুর্তেই।

মুঈন একদৃষ্টে ইনশিরাহর দিকে তাকিয়ে আছে। ইনশিরাহ কি করবে কিছু বুঝতে পারছিলো না, সেও বোকার মতন মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে।

বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যেকে কাঁচ ভাঙ্গার শব্দে চমকায়। তাজরী বলে,“সে কি রে! এরা ভাঙচুর করছে কেন!”

ঠিক এমন সময় মুঈন দরজা খুলতেই প্রত্যেকে লাফিয়ে ওঠে একপ্রকার। যেন ভুত দেখেছে তাই যে যার মুখ চেপে ধরে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। ইনশিরাহও এগিয়ে আসে,অবাক চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে বলে,“তোরা!”

______

প্রেরণার ঘুম আসছিল না, শুদ্ধকে ঘুম পাড়িয়ে ‌সে ড্রয়িং রুমে গিয়ে দেখে মিস জেনি আর মুবিনা চা খেতে খেতে গল্প করছেন অত রাতে। প্রেরণা গিয়ে বসলো ওদের কাছে, মুবিনা বললো,“ঘুমাচ্ছিস না কেনো? সারাদিনে কত ধকল কাটিয়ে এলি!”

_কি জানি কেন ঘুম আসছে না। প্রনো ঘুমিয়েছে?

মিস জেনি বললো,“হ্যা।”

প্রেরণা আগামী পরশুর প্রোগ্রামের ব্যাপারে আলাপ পারতে চায়। মুবিনা প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,“আজ ঐ শয়তান ছেলেটা প্রনমিকে দেখেছিলো নাকি?”

_নাহ! সামনেই পরতে দিইনি।
চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল প্রেরণা,যদিও তার মনের মধ্যে একটা খটকা রয়ে গিয়েছে।

মুবিনা বলতে থাকলো,“ওদের বাড়ির সবাই কত অমায়িক। ঐ বড় ছেলেটা, ইহান তাজওয়ার। আহা! কি ভালো একজন ভদ্রলোক। আর ঐ ছেলেটা ইনায়ার ভাই ভাবতেও অবাক লাগে! ভয়ংকর এক ছেলে।”

প্রেরণা ফুপির কথার জবাব দিলো না। মুবিনা বলতে থাকে,“প্রনমির গানটা চর্চায় রাখবি। এই মেয়ে গান নিয়ে এগিয়ে যাক! বিয়ে থা নিয়ে একদম ভাববি না।”

_মাথা খারাপ ফুপি? এই বোন অন্যদের কাছে খুত ওয়ালা হতে পারে,আমার বোন আমার কাছে সবকিছু! এই বোনকে মলিন করার ইচ্ছা নেই আমার। যা ঘটেছে ঘটেছে, ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই কেউ আসবে, একজন শুদ্ধ মানুষ আসবে। প্রনমিকে জয় করবে। আমার বিশ্বাস আছে। মাসুম ব্যক্তি দিনশেষে ভালো থাকবে। এতো তাড়াতাড়ি ওকে আমি বিয়ে দেবো না।

_সেটাই। আর ঐ ছেলেটা! খবরদার আর ও বাড়িতে প্রনমিকে যেতে দিবি না।

প্রেরণা হেসে ফুঁপিকে বলতে লাগলো,“এখন ভালো হবার ভং ধরছে ফুপি। দেখলেই ইচ্ছে করে দু গালে দু'টো ঠাশ ঠাশ করে লাগিয়ে দিই। আজ অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করেছি। অভিনয়ে একেবারে পাক্কা এই ছেলে! ও নিশ্চয়ই মনে মনে কিছু পাকাচ্ছে। আমিও রেডি আছি! আসুক আরেকবার আমার বোনের আশেপাশে!”

_______

মেইড ঘরটা পরিষ্কার করে দিয়ে চলে যায়। মুঈন-ইনশিরাহর ঘরের বাইরে এতক্ষণ যারা আড়ি পেতে দাঁড়িয়ে ছিল তারা এখন চোরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। মুঈন প্রত্যেককে একবার করে দেখে বললো,“ওখানে কষ্ট করে দাঁড়িয়ে ছিলে কেন? বলতে, আমরা দুজন গল্প করছিলাম, তোমরাও চলে আসতে!”

তুনা দ্য নেত্রী লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসলো। ইনশিরাহ ওদের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে আছে। তুনা সবার তরফ থেকে মুঈন আর ইনশিরাহকে বললো,“স্যরি!”

একপ্রকার চোরের মতো পালিয়ে গেলো সবাই, ছুটে বেরিয়ে গেলো।

মুঈন দরজাটা আবারও বন্ধ করে দিয়ে ঘুরে তাকায় ইনশিরাহর দিকে।

বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে পরলো দু'জন। দু'জনের চোখেমুখে কিছুটা সংকোচ,মধ্যিখানে এক হাত দূরত্ব। রাতের সময় তখন বারোটা বেজে আটচল্লিশ মিনিট। অদ্ভুত ভাবে দু'জনের চোখেই নেই ঘুম। নীরাবতা বড্ড ভারি লাগছে, মুঈনই ভে'ঙে দিলো তা। ঘাড় ঘুরিয়ে ইনশিরাহর দিকে তাকিয়ে বললো,“দুধে ফোবিয়া আছে, আরেঞ্জ ম্যারেজে ফোবিয়া ছিলো। দুধোফোবিয়া, অ্যারেঞ্জম্যারেজোফোবিয়া। একটা কথা বলো! আর কিসে কিসে ফোবিয়া আছে তোমার?”

ইনশিরাহ একটা লম্বা শ্বাস ফেললো অকারণে,নিচু স্বরে জবাব দিলো,“আমি আমার ওপর অন্য কারো কর্তৃত্ব অপছন্দ করি।”

_অধীনস্তফোবিয়া। আর?

_আমি হৈচৈ অপছন্দ করি।

_হৈচৈয়োফোবিয়া। আর?

চলমান.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 59 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন