#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৬০
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
_আর কোন কোন ফোবিয়া আছে তোমার?
মুঈন ঘা'ড় ঘুরিয়ে ইনশিরাহর কাছে জানতে চায়। ইনশিরাহ চুপ করে আছে সিলিংয়ের দিকে দৃষ্টি দিয়ে। কিছু মুহুর্ত নিরব থেকে বললো,“ফোবিয়া বলছেন? আসলে আমার অপছন্দের লিস্ট বড়। বলতে পারেন আমার সহ্যশক্তি আর পাঁচজন নারীর থেকে তুলনামূলক কম। আমি আপনাদের বেঁধে দেওয়া ছকের আদর্শ নারীর একটি বৈশিষ্ট্যও ধারণ করি না।”
মুঈন নিচুগলায় বললো,“আমি মজা করে ফোবিয়ার কথা বলছি! তোমার সবার মতো সবকিছু সহ্য করতে হবে এমন কোনো কথা নেই।”
ইনশিরাহ এবার ঘা'ড় ঘুরিয়ে মুঈনের দিকে তাকিয়ে বলে,“আপনার কোনো ফোবিয়া নেই?”
মুঈন মৃদু হাসলো,বললো,“সৌভাগ্যবশত নেই!”
_আপনার বুঝি সবকিছু সহ্য হয়?
_এটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছে ইনশিরাহ। সবকিছুই সয়ে যায় আমার!
ইনশিরাহ পাশ ফিরে শু'লো, মুঈনের দিকে তাকিয়ে বললো,“একটু বেশিই ভালোমানুষী?”
_মোটেও না। আমিও তোমার মতোই খুঁতসর্বস্ব মানুষ। এটা আমার সাথে না থাকলে বুঝতে পারবে না। আমিও তোমাদের বেঁধে দেওয়া ছকের আদর্শ পুরুষের কিছু বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে ব্যর্থ ইনশিরাহ। আমি আতি পাতি এক পুরুষ, গলিতে গলিতে এমন পুরুষ তুমি খুঁজে পাবে। যে সাধারণ কিছু নীতি মেনে চলি, সাধারণ কিছু চাহিদা লালন করি,আর সাধারণ ভুল ত্রুটি রোজ করি।
ইনশিরাহ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,“ক্যান আই আস্ক ইয়ু আ কোয়েশ্চন?”
_গো আহেড!
_আপনি কারো সাথে কখনো কমিটেড হননি?
কথাটা খুব ইতস্তত করে জানতে চাইল ইনশিরাহ!
মুঈন ইনশিরাহর চোখের দিকে তাকায়, ধীর স্থির হয়ে জবাব দেয়,“না!”
ইনশিরাহ নিশ্চুপ। একত্রিশ বছর বয়সী একজন লোক কারো সাথেই কখনও কমিটেড হয়নি এটা একটু অবাক হবার মতো ব্যাপার ইনশিরাহর কাছে। সে বললো,“কাউকে কখনো ভালোও লাগেনি?”
মুঈন এবার হাসলো সামান্য। ইনশিরাহর দিকে ফিরে বললো,“ভালো লাগেনি এমনটা নয়! ভার্সিটিতে পাশাপাশি বসে ক্লাস করেছি, কথা বলেছি, দু একজনকে হুট করে ভালো লেগেছে, কিন্তু আমি ইনসিকিয়্যুরড থাকতাম নিজেকে নিয়ে। অনুভূতি ছিল ঐ ভালোলাগা অবধিই।”
ইনশিরাহ অবাক হলো,বললো,“ইনসিকিয়্যুরড? কেন?”
_কেউ আমাকে পছন্দ করবে কি না সেটা নিয়ে।
ইনশিরাহ হঠাৎ শোয়া থেকে উঠে বসলো। মুঈন তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ইনশিরাহ অবাক হয়ে বললো,“মেয়েরা আপনাকে পছন্দ করতো না? সিরিয়াসলি! ”
মুঈনও উঠে বসলো, হাসলো সে কিছুক্ষণ । তারপর ধীরে ধীরে বলতে লাগলো,“তখন আমি এই মুঈন ফরাজী ছিলাম না ইশি। আমি একটা মুঈন ফরাজী ছিলাম যার জিন্সের প্যান্টটা রং চটা ছিলো, এবং দু'টো শার্ট সে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরতো, ভার্সিটিতে গিয়ে ক্লাস করতো,যার একটা খুব দামি সানগ্লাস ছিলো না! এবং যে একটি রেস্টুরেন্টে পার্টটাইম জব করতো, কখনো ফুড প্যান্ডার ডেলিভারি ম্যানের কাজ করতো।”
ইনশিরাহ একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে মুঈনের দিকে। অস্ফুটে বললো,“আপনার গোটা জীবনটাই পরিশ্রম করে কাটিয়েছেন!”
একটু থেমে ইনশিরাহ সরাসরি মুঈনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,“আপনি আমাকে কেন পছন্দ করেছিলেন?”
_______
রাতের গভীরতা ঘুম নামাতে পারছে না আলোর চোখে, আজ তার চোখে ঘুম নেই। সামিন নিজেও ঘুমায়নি। এতক্ষণ সব নিস্তব্ধ থাকলেও গত আধাঘণ্টা ধরে সে স্ত্রীর অস্থিরতা দেখে আধো অন্ধকারে তার একটা হাত স্ত্রীর গাঁয়ের ওপর রাখে। আলো চমকায় সামান্য। মৃদু আওয়াজে সামিন বলে,“মেয়ের জন্য দুশ্চিন্তা হচ্ছে?”
সামিনের হাতের ওপর আলো একটা হাত রাখল। ধিমি আওয়াজে বলতে লাগলো,“কাল সকালে মেয়েটা চলে যাবে!”
সামিন ম্লান হেসে স্ত্রীকে কাছে টেনে বলল,“কাল সকালে মেয়েটা তার নতুন একটা দুনিয়ায় পা রাখবে। নতুন ভাবে জীবনটাকে উপলব্ধি করতে, জীবনে পরিপূর্ণতা আসবে মেয়ের!”
আলো বড় বড় শ্বাস ফেলছে। সামিন উঠে বসলো,স্ত্রীকেও টেনে তুলে বসালো, বিরক্তি নিয়ে বললো,“নিজে কত কাহিনী করলে, এখন কেন বাচ্চামো করছো!”
_একটা সত্যি কথা বলবো? আমার মেয়েটাকে পারলে আমি কখনোই বিয়ে দিতাম না। ওকে আজীবন রেখে দিতাম এ বাড়িতে। কিন্তু এটা তো হয়না!
সামিন হাসলো,বললো,“একটা সত্যি কথা আমিও বলবো? পারলে আমি মেয়েটাকে বড় হতেই দিতাম না। দিতামই না।”
আলো হাসছে। সামিন স্ত্রীকে জরিয়ে ধরে শুয়ে পরে আবারও। আলো বলতে থাকে,“কি করবে আমি কিছু বুঝতে পারছি না মেয়র সাহেব! এই মেয়ে কিভাবে সংসার করবে! আমি এই চিন্তায় ঘুমাতে পারছি না! সবকিছু কেন চাইলেও নিখুঁত করতে পারিনা আমরা। মুঈনকে যদি কখনও ওর দ্বারা কষ্ট পেতে হয় তখন সেই দায় কিভাবে এড়াবো আমরা!”
_কি বলতে চাইছো তুমি?
সামিন অবাক হয়ে জানতে চায়।
_দেখুন,আমরা এ পর্যন্ত সবসময় নিজেদের স্বার্থের দিকটা ভেবেছি। আমরা নিজেদের সন্তানের স্বার্থের দিকটা ভেবেছি। বরাবর আমাদের কনসার্ন ছিলো আমাদের মেয়ে কার কাছে ভালো থাকবে সেটা নিয়ে। কার কাছ থেকে আমরা সুবিধা পাবো সেটাই ভেবেছি। কিন্তু মুঈন? ও যদি কষ্ট পায়? তখন? বেচারা কখনো একটা পরিবার পায়নি।
সামিন নিশ্চুপ হয়ে শুনছিলো,একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,“কিছুই হবে না এমন। আমরা জটিল করে ভাবছি আছিয়া। ঘুমাও এখন!”
ইনায়া পা টিপে টিপে গিয়ে প্রিতমের পাশে শুয়ে দু'হাতে প্রিতমকে জরিয়ে ধরলো।
একটু নড়েচড়ে উঠে প্রিতম, গম্ভীর হয়ে বললো,“আড়ি পাতা হয়ে গিয়েছে?”
_হু,দুলাভাই দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে।
কাঁচুমাচু মুখ করে বলে ইনায়া।
_ভালো করেছে। এখন ঘুমাও।
_ঘুমাবো মানে? আজ না আমাদের বাসর?
চাঁপা স্বরে চেঁ'চি'য়ে বলে ইনায়া?
প্রিতম ওর হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলে,“দেড় মাস আগে হয়ে গিয়েছে!”
_______
মুঈন ইনশিরাহকে নির্নিমেষ দেখছিলো। ইনশিরাহর দু'চোখ ভরা কৌতুহল। সে তাকিয়ে আছে উত্তরের অপেক্ষায়। খানিক বাদে আবারও বললো,“বলুন কেন পছন্দ করেছেন আমাকে!”
মুঈন এবার মৃদু হাসলো। বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পরে বললো,“একটা সত্যি কথা বলবো?”
_বলুন।
_বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস এক্সামে দেশের মধ্যে আঠাশতম হওয়া মুঈন ফরাজীর কাছে এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই!
ইনশিরাহ চুপচাপ দেখছে মুঈনকে। বাইরে তখন মেঘ ডাকাডাকি শুরু হয়েছে। টানা দেড়মাস খড়ার পরে প্রকৃতি যেন একটু সদয় হলো আজই। ইনশিরাহ জানালার দিকে তাকায়, জানালা সবকটা খোলা। উঠে গিয়ে জানালা গুলো লাগিয়ে দিয়ে বিছানায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে পরলো আবারও।
মুঈন বলতে লাগলো,“বৃষ্টিফোবিয়াও আছে তোমার?”
_না তো! কেন?
_জেনে নিচ্ছি। কখনো হুটহাট আমার স্ত্রীকে নিয়ে ভিজতে ইচ্ছে হবে তাই।
ইনশিরাহ দৃষ্টি নত করে। মুঈন স্মিত হেসে বলে,“বাকিটা কাল থেকে জানবো। গুডনাইট।”
“গুডনাইট।”
অস্ফুটে জবাব দেয় ইনশিরাহ। রাত তখন দু'টোর কাছাকাছি। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হলো সে রাতে। ইনশিরাহ ঘুমিয়ে যেতে খুব একটা সময় নিলো না। আর ফরাজী তার বাসর রাতটা বৌয়ের মুখ দেখেই কাটিয়ে দিলো । একটা পানপাতার মতো শ্যামা মুখ, বড় বড় অক্ষিপল্লব,পাতলা রক্তিম দু'টো ঠোঁট, যে ঠোঁট নেড়ে নেড়ে স্পষ্ট কথা বলা হয়। আর তার মেহেদী রাঙা হাত, তাতে লেখা,“MUYIN”
এর মানে হলো এই চাঁদ মুঈনের।
এক রাতের বৃষ্টি প্রকৃতিতে ততটাও প্রভাব ফেলতে পারলো না। সকালে সেই ক্ষ্যাপা সূর্যটা তেঁতে উঠেছে। ইনশিরাহ তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ভোররাতের দিকে মুঈনও ঘুমিয়েছে।
সকাল যখন ন'টার কাছাকাছি , দরজায় ধাক্কা পরলো ওদের। মুঈন উঠে বসে ঘড়ি দেখলো। সে ভীষণ অবাক হলো এতো বেলা অবধি ঘুমিয়েছে বলে। ইনশিরাহ উঠলো তাড়াহুড়ো করে, খোলা চুলগুলো একটা ক্লাচারে আটকে হন্তদন্ত হয়ে দরজা খুলে দিতেই দেখলো শেহা দাঁড়িয়ে আছে।
মুঈন ওকে দেখে হেসে বললো,“গুড মর্নিং দ্য মোস্ট কিউটিয়েস্ট পারসন অব দিজ হাউস!”
_গুড মর্নিং ভাইয়া। আপনাদের খোঁজ পরেছে।
_হু! আমাদের আরো কিছু সময় দিয়ে অনুগ্রহ পূর্বক বাধিত করুন জনাবা!
শেহা মাথা নেড়ে হাসলো। মুঈন কাবার্ড থেকে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করে ওয়াশরুমে ঢুকতেই শেহা কপাল কুঁ'চ'কে ইনশিরাহর দিকে তাকাল, বললো,“এটা কি পরে আছো?”
_পোশাক! কেন?
_তোমাকে পাগলের মতো লাগছে আপু! এটা কেন পরবে,ভাইয়ার সামনে?
ইনশিরাহ কপাল কুঁ'চ'কে ফেলে,বলে,“সকাল সকাল তুই কি আমার শাশুড়ি মায়ের রোলটা প্লে করতে চাইছিস?”
_না, তুমি নিজে আয়নায় দেখো। পাগলের মতো লাগছে না দেখো?
_তো বারো হাতি একটা কাপড় পেচাবো? দ্যাখ বিয়ে পর্যন্ত ওসব পরবো বলেছি। বিয়ে উতরে গিয়েছে!
শেহা ওর কথা কানে নিলো না। ওয়্যারড্রোব থেকে একটা লাল রঙের ইক্কত শাড়ি বের করতে করতে বললো,“বিয়ে উতরে যায়নি! আরও দুদিন লাগবে। এটা পরো। নিচে অনেক গেস্ট। বড় মামা ফরাজীর সাথে কোনো পাগল দরবেশের বিয়ে দেননি। একটা ভুবনমোহিনী সুন্দরী মেয়ের বিয়ে দিয়েছে। এই শাড়িটা পরলেই বুঝবে!”
_______
খানিক বাদে মেয়েরা জামাইয়ের সাথে চলে যাবে। মির্জাদের বিষন্নতায় ভরা মুখ, কোলাহল মুক্ত বাড়িটা যেন আরও ভারি করে ফেলছে বিষাদময় পরিবেশ টা।
ইনশিরাহ-মুঈন, ইনায়া-প্রিতমের সমস্ত উপহার সামগ্রী তখন গাড়িতে তুলে দিচ্ছে ইহান নিজে দাঁড়িয়ে থেকে। এই গিফট গুলো অতিথিরা নতুন দম্পতিকে ভালোবেসে দিয়েছে। সবকিছু গুছিয়ে ইহান অন্দরমহলে এলো। মুঈন আর প্রিতম ভদ্রমতন তাদের শশুর,চাচা শশুর এবং মামা শ্বশুরদের পাশে বসে আছে ব্রেকফাস্ট করে। পুরুষদের আড্ডায় যত রাজ্যের অর্থনীতির আলোচনা। মুঈন আর প্রিতম ভদ্র হয়ে বসে মনোযোগী শ্রোতা হয়ে শুনছিলো।
আলো লিভিং রুমের এক কোণে একটা সোফাতে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় বসে আছে। তার দুপাশে বসে আছে মারিয়া,সোফিয়া।
সবকিছু গুছিয়ে রিতু এলো, ইনশিরাহর বান্ধবীদের দিকে তাকিয়ে বললো,“ওকে নিয়ে এসো।”
মুঈন উঠে দাঁড়ায় তখন। তুনা বললো,“আপনি রুমে যাচ্ছেন ভাইয়া?”
_হ্যা!
ওরা আর গেলো না, মুঈন সিড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলো।
শেহা ইনশিরাহকে শাড়ি পরিয়ে দিলো। ইনশিরাহ এই প্রথম লাল রঙের শাড়ি গায়ে জরালো। তবে ঠোঁটে,মুখে কোনো প্রসাধনী লাগালো না এইবার। একেবারে সাদামাটা, চুলগুলো খুলে রাখা। তার পাতলা,সুডৌল অঙ্গে লাল শাড়িটা ফুটে উঠেছে।
মুঈন আগে ভাগেই রেডি হয়ে ছিলো, একটু ফরমাল বেশে। নতুন জামাই বলে কথা। ওর স্যুটের রংটা ধূসর।
দরজায় এসে দাঁড়াতেই তার দৃষ্টি স্থির হয় লাল রমনীর দিকে। শেহা মুঈনকে দেখে হেসে চলে যায়। ইনশিরাহ কাঠের পুতুলের মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে। মুঈন এগিয়ে গেলো ওর কাছে। এক নজরে পা-মাথা দেখলো, কেমন নেশালো দৃষ্টিতে, ধীরে ধীরে একটা হাত বাড়িয়ে ইনশিরাহর ডান হাতটা ধরে হাতের পিঠে একটা চুমু খেলো, ইনশিরাহ নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। মুঈন ইনশিরাহর চোখে চোখ রেখে অস্ফুটে বললো,“ইট ওয়াজ অ্যান অ্যাপ্রেসিয়েশান টু ইয়র বিউটি। ইউ আর ভেরি প্রিটি ইন ইয়র ওউন ওয়ে বাট নাউ ইয়ু আর লুকিং এক্সেপশনালি বিউটিফুল........ঠিক ডানের কবিতা থেকে উঠে আসা সেই ভদ্রমহিলা, যে ডানের বর্ণনায় একটি জীবন্ত শিল্প!”
ইনশিরাহ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে মুঈনের দিকে। মুঈন অমায়িক হাসি হেসে ইনশিরাহর মুখমণ্ডল নিরীক্ষণ করে বললো,“মন খারাপ চলে যাবে তাই?”
দু'পাশে মাথা নাড়ে ইনশিরাহ! মুঈন বললো,“চলো। দেরি হচ্ছে আমাদের!”
ঘর থেকে ওরা দুজন বেরোলো। ইরফানের মুখোমুখি হলো দু'জন। মুঈন ভাই-বোনকে একা ছেড়ে দিয়ে সামনে এগোলো।
ইনশিরাহ ভাইকে দেখে মলিন হাসলো। ইরফানও তাই। ইনশিরাহর কাছে এগিয়ে আসে সে, পা থেকে মাথা ইনশিরাহকে দেখে বলল,“তোকে একেবারেই ভণ্ড লাগছে ইশি।”
ইনশিরাহ হেসে ফেললো, বলল,“তোকেও।”
ইরফান বোনের হাত ধরলো, বললো,“চল তোকে ঘা'ড় ধরে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে আসি।”
বোনের হাত ধরে হাঁটছে সে। সিঁড়ি থেকে নামতে নামতে বলছে,“বেচারা মুঈন ফরাজী। একটু রহম করিস!”
_আড়াইমাস পরে ফিরে তুই ব্যাবসাতে বসবি। সব ধরণের ঝামেলা থেকে দূরে থাকবি। মেজো মাকে কাদাবি না।
_তোকে যেন ঘনঘন এ বাড়িতে আসতে না দেখি।
_তোকে যেন আর কোনোদিন মারামারি করতে না দেখি।
_তোকে যেন সব ধরণের বোকামি থেকে দূরে থাকতে দেখি।
_তোকে যেন ইনায়ার সংসারের থেকে দূরে থাকতে দেখি!
ইরফান দাঁড়িয়ে পরলো, তাকালো ইনশিরাহর দিকে। ইনশিরাহ স্পষ্ট তবু নরম গলায় বললো,“তোকে যেন প্রনমির থেকে দূরে থাকতে দেখি!”
ইরফান তাকিয়েই আছে বোনের দিকে, ইনশিরাহ শক্ত করে ভাইয়ের হাত পেঁচিয়ে ধরে বললো,“আয় ঘা'ড় ধাক্কা দিয়ে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে যা!”
ওরা নিচতলায় নেমে আসে। সামিন আর আলো মেয়েকে দেখতে পেয়ে উঠে দাঁড়ায়।
ইনশিরাহ নামতেই প্রথমেই মুখোমুখি হলো ইহানের, বোনের দিকে কেমন উদ্ভ্রান্তের মতো তাকিয়ে আছে। ইনশিরাহ গিয়ে জরিয়ে ধরলো ভাইকে। ইহান বোনের মাথায় হাত রেখে বললো,“কালকেই দেখা হবে। আমাদের রোজ কথা হবে। আমি দুদিন পর পর তোর বাড়িতে যাবো, বড় বড় মাছ নিয়ে।”
ইনশিরাহর কেমন গলা ধরে এলো। সে ভাইকে ছেড়ে দিয়ে হেঁটে গেলো তার মা আর চাচীদের কাছে। তিনজন নির্বিকার চিত্তে দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁটের কোণে মিছে হাসি।
ইনশিরাহ বললো,“তোমরা কাঁদছো না কেন?”
ওরা ভান করছে তিনজন। পরী বললো,“আমাদের কান্না পাবে কেন?”
_তোমাদের আসলেই কান্না পাচ্ছে না?
রিতু ভাণ করে বললো,“না তো!”
আলো ভ্রু কুঁচকে বললো,“কাদার কিছু হয়েছে?”
ইনশিরাহ একপ্রকার ঝাপিয়ে পরলো মায়ের বুকে। আলো পরে যেতে নিলেও সামলে নিলো নিজেকে। শান্ত স্বরে বললো,“একটুও কান্না পাচ্ছে না আমার।”
_আমারও না।
মাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ইনশিরাহ। কিন্তু দু'জনেই কাঁদছে, নিশ্চুপ কাঁদছে।
কাঁদছিল ইনায়া। রুশফি রিন্তুরা অবাক হয়ে বললো,“তুই কাঁদছিস কেন? তুই তো আরো দেড়মাস আগে বিদায় নিয়েছিস!”
টিস্যু পেপারে চোখ মুছে নিতে নিতে ইনায়া জবাব দিলো,“আমার কান্না পেলে আমি কি করবো?”
প্রিতম এক এক করে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তার শশুরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, ইশমাম মির্জা টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অবিচল দৃষ্টি তার। প্রিতম ইতস্তত করছিল যদিও, সে তার শশুরকে ভয় পায়। নম্রস্বরে বলতে লাগলো,“বাবা। আমি আপনাকে অনেক বেশি কষ্ট দিয়েছি,এটা আমি সবসময়ই স্বীকার করে যাবো, এজন্য আমি প্রতিদিন সত্যিই অনুতপ্ত। শুধু একটা কথাই বলবো, কখনো কোনো অবস্থাতেই ইনায়ার জন্য আপনাদের দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। আপনি আর মা একে অপরের খেয়াল রাখুন। মাকে নিয়ে সাবধানে থাকুন।”
ইশমাম চুপচাপ দেখছে প্রিতমকে। আজ প্রিতম খুব সাহস করে নিজে থেকে শশুরের সাথে কোলাকুলি করলো। ইশমাম প্রস্তুত ছিল না, সে ছেলেটিকে পছন্দ না করলেও ফিরিয়ে দিলো না। প্রিতম বললো,“আমার বাবা মা নেই, আমি আমার নতুন অভিভাবক চাই বাবা। দোয়ায় রাখবেন।”
ইশমাম গম্ভীর মুখে প্রিতমের পিঠ চাপড়ে শান্ত স্বরে বললো,“ভালো থেকো!”
মুঈন ফরাজী এবার এগিয়ে গেলো ইনশিরাহর কাছে, মাকে ছেড়ে ইনশিরাহ তখন পাপার দিকে তাকায়। সামিন মেয়ে জামাইয়ের দিকে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে আছে।
মুঈন এগিয়ে গেলো, গিয়ে সামিনের মুখোমুখি দাঁড়াল। নম্রস্বরে ডাকলো,“বাবা।”
সামিন ইয়াসার মির্জা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললো,“ওর সাথে বন্ধুত্ব করে নিও। আমি বিশ্বাস করি তোমরা একে অপরের চমৎকার বন্ধু হবে।”
তারপর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটির,যাকে সে তার আম্মাকে দিয়ে দিয়েছে তার হাত ধরলো। মুঈন তাকিয়ে আছে নিজের হাতের দিকে। সামিন বলতে লাগলো,“বাবা,আমি কিন্তু তোমার সামনে একজন বাবা দাঁড়িয়ে আছি। আর পাঁচটা বাবার মতো সাধারণ আর্জি,আমার মেয়েকে তুমি ভালো রাখবে।”
এতটুকু বলে সামিন একটু থেমে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,“দুজনে মানিয়ে বুঝিয়ে চলো,দুজন দুজনের বন্ধু হও। দোয়া করি। তবে একটা কথা বাবা, যদি কখনও আমার মেয়ে,এই রক্ত মাংসে গড়া সাধারণ একটি মানুষ অকারণে, তোমার কাছে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যদি মেয়েটা বোঝা হয় তোমার,যদি তোমার কখনো এমনটা মনে হয়। তুমি একটু কষ্ট করে আমার মেয়েটাকে আমার কাছে দিয়ে যাবে। তবুও কখনো ওকে মলিন করবে না। কখনো আমার মেয়েকে অযথা কাঁদাবে না , কখনো যেন আমার মেয়ের চোখ দিয়ে তোমার দেয়া কষ্টের দরুন পানি না ঝরে।”
বুকের মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণা হতে শুরু করলো সামিনের। সে হাশফাশ করছে। ইনশিরাহ পাপাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো। মুঈন স্থির দাঁড়িয়ে আছে শশুরের দিকে তাকিয়ে। সামিন মেয়েকে দুহাতে শক্ত করে ধরে থাকলো, মুঈনের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো,“ছোটোবেলা থেকে ওকে গল্পে শুনিয়েছি রাজপুত্র এসে ওকে বিয়ে করে নিয়ে যাবে, চেষ্টা করেছি এমন কাউকে বাছার। মেয়েটা আদতেই বড্ড সরল বাবা, ওর একটা ভালো গুণ শুনবে? জানো এই মেয়ে কত দরদী? ওর কাছে সবসময় রাজপুত্র হয়ে থেকো। আমি আবার বলছি, বারবার বলছি, ওর প্রতি বিরক্তি ধরে গেলে চুপচাপ আমাকে এসে বলবে,“বাবা,আপনার মেয়ে নিন।”
কিন্তু কখনো ওকে কাঁদাবে না। কখনো না। ”
সামিন কেমন অস্থির হলো। হাঁপাতে হাঁপাতে বলতে লাগলো,“মুঈন আমি আমার কলিজা ছিঁড়ে তোমায় দিচ্ছি। তুমি সাবধানে রেখো।”
মুঈন বুঝতে পারছে না সে কি করবে। তার মুখ শুকিয়ে গিয়েছে। সামিন মেয়েকে বুকের সাথে চেপে ধরে বিড়বিড় করতে থাকে,“আম্মা। আম্মা তুই মেয়ে কেন হলি!”
বাবা মেয়ের এহেন দৃশ্য ভারি করে ফেলছে শান্তিনীড়ের অন্দরমহল। আলো ছুটে এসে স্বামীকে ধরলো, বললো,“আপনি থামুন। মুঈন অপ্রস্তুত হচ্ছে।”
মুঈন মলিন মুখে শাশুরির দিকে তাকায়। আলো চোখ মুছে ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে বলে,“বাবা! আমরা দু'জনেই সাধারণ বাবা মা। একেবারেই সাধারণ,আর পাঁচজন বাবা মায়ের মতো। সে জায়গা থেকে একটা অনুরোধ করবো, একটা বাচ্চামো ধরনের অনুরোধ করবো। স্বামী হিসেবে যতক্ষন পর্যন্ত তোমার আত্মসম্মানে আঘাত না লাগে, আমার এই ছোটো মেয়েটির টুকটাক ভুল ত্রুটি নজরআন্দাজ করো। কিছুটা মানিয়ে নিও, কখনো আমাদের অভিযোগ দিও, কখনো তুমি নিজেই ওকে শুধরে দিও। কিন্তু দোহাই তোমার তুমি কখনো ওকে কাঁদাবে না। তোমার শশুর এক জীবনে আমার চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি পরতে দেয়নি যখন থেকে আমি তার হাত ধরেছি। এই মানুষটার বড্ড কষ্ট হবে তবে!”
চলমান........