ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 61

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৬১
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

মুঈন অনিমেষ দেখছে তিনজন ব্যক্তিকে। এরা এখন খুব খুব কাছের মুঈনের। তার স্ত্রী,তার শ্বশুর-শাশুড়ি, মুঈনের পরিবার এরা। এমন হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি মুঈন কিভাবে সামলাবে তা সে জানে না। এমন পারিবারিক ইমোশনের সাথে মুঈনের পরিচিতি নেই। সে বুঝে উঠতে না পেরে অনেকটা সংকোচ নিয়ে আলোর একটা হাত ধরলো। মৃদু আওয়াজে আলোকে বললো,“মা! ইনশিরাহ ভালো থাকবে।”

আলো হুহু করে করে কাঁদছে। কেমন দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। ওদিকে ইনশিরাহ কাঁদছে সামিনকে শক্ত করে ধরে রেখে। সামিন হাপাচ্ছে মেয়েকে আগলে ধরে, লোকটা কথা বলতে পারছে না এখন আর।

ইনশিরাহর বান্ধবীরা এসে আলোকে ধরলো,আজান এসে সামিনের থেকে ইনশিরাহকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিছুতেই কেউ থামছিলো না যেন।
খানিক বাদে ইরফান এসে বোনের হাত ধরে টানছে, ইহান এসে আলোকে সামলে নিলো।

সামিন বিড়বিড় করতে থাকে,“আমার আম্মাকে কাঁদাবে না তুমি!”

ইহান নরম গলায় বললো,“বড় বাবা স্টপ! ইশির যাওয়ার সময় হয়েছে। ওরা যেতে পারবে এই পরিস্থিতিতে?”

ইরফান মুখে চ বর্গীয় শব্দ করে বললো,“ও কি কাঁদবে? তোমার মেয়ে নিজেই ওর বরকে কাঁদিয়ে কূল পাবে না! কটাদিন যেতে দাও,দেখবে কে কাকে কাঁদায়!”

এতো কান্নাকাটির মাঝেও এক তৃতীয়াংশ মানুষ হেসে ফেললো ইরফানের কথায়। মুঈন মাথা নিচু করে অস্পষ্ট হাসে। ইনশিরাহ বাবার বুক থেকে মাথা তুলে ভাইয়ের দিকে অশ্রুশিক্ত নয়নে তাকায়, ইরফান বললো,“কি? সত্যি কথা না?”

ইনশিরাহ ছুটে এসে ইরফানকে ধরলো,এক হাতে টেনে ইহানকেও ধরলো। দুই ভাইকে ধরে কেমন বাচ্চাদের মতন কাঁদতে লাগলো মেয়েটা। ওরা দুই ভাই থ'ম'কে গেলো মুহুর্তেই। বোনের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে বাকহারা হয়ে।

রিতু কাঁদছে,পরী কাঁদছে, ইনশিরাহর মামীরা কাঁদছে। শেহা,ইনায়া কাঁদছে।

আর সামিন ইয়াসার মির্জা, তাকে মনে হচ্ছে একজন মৃত মানুষ। ইশমাম, ইলহাম বোঝাচ্ছে তাকে। শান্ত টানছে হাত ধরে, তাকে একটু বসিয়ে দেওয়ার জন্য। সামিন পারলে মেয়েকে ছাড়ে না, ইনশিরাহও তাই। বাবার পাঞ্জাবি আকরে ধরে রেখেছে।

মুঈন বেচারা এক এক করে সবার মুখ দর্শন করে। সবার অনুভূতি একই রকম, ভঙ্গুর সবাই।

আর সে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক মানুষ। হঠাৎ তার নিজেকে কেমন অপরাধী মনে হলো, একটা সাময়িক অনুভূতি ছিলো এটা। মনে হলো সে ইনশিরাহকে এদের কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছে।

একটু সময় নিয়ে মুঈন ফরাজী আস্তে ধীরে বললো,“বাবা! আমি কি ইনশিরাহকে আরো কয়েকদিন রাখবো আপনার কাছে?”

আলো চোখ মুছলো আঁচলে, নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,“আরে না না, একদম না। তোমার স্ত্রীকে তুমি নিয়ে যাও। আমরা ঠিক আছি।”

সামিন ঠিক নেই। আলো এসে অনুরোধ করলো স্বামীকে,“এখন বাচ্চামো আপনি করছেন! ওরা আপনাকে এই পরিস্থিতিতে রেখে যাবে? শান্ত হোন না!”

সামিন শান্ত হতে পারছে না, বুক থেকে কিছু একটা ছিঁড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তার। সকাল থেকে সন্ধ্যা এই বাড়িময় হেঁটে বেড়াবে না এই মেয়েটা। মেয়েটিকে ফোন করে বলতে হবে,“তুই কবে আসবি মা?”
স্ত্রীর চোখের দিকে তাকায় সামিন,বলে,“তোমার কেমন লাগছে জানি না আছিয়া, কিন্তু আমার মন মানছেই না। আমি মনে হচ্ছে মরে যাবো।”

ইনশিরাহ পাপা বলে চিৎকার দিয়ে আবারও জড়িয়ে ধরলো সামিনকে। চেঁচিয়ে বললো,“আমি যাবো না।”

এদের অবস্থা দেখে মুঈন চুপ করেই দাঁড়িয়ে রইল। সে এখন কি করবে! তার কি করা উচিত! কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মুঈন ইনশিরাহকে উদ্দেশ্য করে বললো,“তোমার মন শান্ত হলে বেড়োবো। যদি তুমি আরও কয়েকটা দিন থাকতে চাও তো...”

_ইনশিরাহ যাবে মুঈন।
ইহান জবাব দিয়ে বোনকে বড় বাবার থেকে সরিয়ে আনলো। মুঈন সামিনের দিকে দৃষ্টি দিলো, কাঁচাপাকা চুলের, সুদর্শন, শুদ্ধ এই মানুষটির প্রতি এক অন্যরকম টান মুঈন বরাবর অনুভব করে, এখন যেন তা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে। নম্রস্বরে বললো,“আপনি আমাদের সাথে যাবেন বাবা?”

সবাই অবাক হয়ে মুঈনের দিকে ফিরলো।

আলো বললো,“এটা হয় বাবা? কি সব বলো!”

_মা ইনশিরাহকে যেতে দেখছে বলে মন মানছে না, ইনশিরাহকে বাবা নিজে তার বাড়িতে রেখে আসলে বাবার এতোটা খারাপ লাগবে না। দু'টো পরিস্থিতি তার অনুভূতি দুইভাবে সামলাবে। বাবা আমাকে আর ইনশিরাহকে দিয়ে আসুক আমাদের বাড়িতে।

ইহান মুঈনের দিকে তাকায়, তাকায় সামিনের দিকে। কিছুক্ষণ ভেবে বলে,“যাবে তুমি ওদের সাথে? যাও বড় বাবা! আমিও যাবো চলো।”

রিতু বললো,“এভাবে কেনো যাবি?”

_অসুবিধা কোথায় আন্টি? ওনারা আমাদের পৌঁছে দিয়ে চলে আসবে,সিম্পল একটা ব্যাপার! এতোটাও জটিল নয়!
মুঈন জবাব দেয় তৎক্ষণাৎ।

আলো স্বামীর দিকে তাকায়, সামিনের চেহারা দেখে বুঝলো সে তার মনের কথা। ছুটতে ছুটতে দোতলায় এসে সামিনের ফোন আর ওয়ালেট নিয়ে নিচে গিয়ে স্বামীর হাতে দিয়ে বলে,“যান মেয়ের সাথে! আপনি লোক সুবিধার না, আমি আপনাকে সামলাতে পারবো না। মেয়েকে তার ঘরে পৌঁছে দিয়ে, ওদের দোয়া করে দিয়ে আসেন। যান।”

সামিন এক এক করে সবার মুখের দিকে তাকায়। ইশমাম, ইলহাম, শান্ত, আজান-আয়াত একই কথা বলতে লাগলো।

গাড়িতে যখন ইনশিরাহ বসলো,তার ঘাড় ধরে নয়, এক হাত ধরে বসিয়ে দেয় ইরফান। ইনশিরাহ গাড়ির জানালার বাইরে মুখ বের করে পোর্চের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সবার দিকে ভেজা চোখে তাকিয়ে হাসলো। রিতু এসে ইনশিরাহর বিড়াল মিঠিকে ওর কোলে বসিয়ে দিলো। আলো মেয়ের দু'হাতে চুমু খায়, এখন আর কাঁদছে না সে, মেয়েকে তাড়া দিয়ে বলে,“বাবাকে ধরে বসে থাকো।”
ইনশিরাহ পাপার গলা জড়িয়ে ধরে বসে রইলো। মুঈন বসলো সামনে,ড্রাইভিং সিটের পাশে, ড্রাইভিং সিটে ছিলো ইহান।

মারিয়া হাসতে হাসতে বলল,“এমন কনে বিদায় আমি এই প্রথম দেখলাম। বাঁচা গেলো, আমার কোনো মেয়ে নেই।”

বিদেশিনী সোফিয়া তখন চোখের পানি মুছতে মুছতে ভাঙা ভাঙা বাংলাতে বললো,“আমি তো বাঁচতে পারলাম না মারিয়া।”

ইনশিরাহ আবারও মাথা বের করে তার ছোটো বাবা,মেজো বাবার হাত ধরলো,শান্ত বাবার হাত ধরলো, মামাদের হাত ছুঁয়ে দিলো। তার মন ভরছিলো না যেন। শান্ত ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,“আম্মু গাড়িতে তো এতো যায়গা নেই! আমরা কি এখন অন্য গাড়িতে আসবো?”

ইনশিরাহ হাসলো। মাথা নেড়ে বলে,“না। তোমরা নিজেদের যত্ন নিও।”

ইরফান চুপচাপ বুকে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। ইহান ভাইকে বললো,“তুই যাবি?”

ইরফান মাথা নেড়ে গম্ভীর হয়ে বললো,“ইনু যাবে এখন। আমি এখানে থাকি!”

ইহান স্বস্তি নিয়ে ভাইকে কয়েক পলক দেখলো, কত দায়িত্ববান একটা ভাইয়ের মতো আচরণ করে, অথচ কখনো কখনো এই ছেলে কেন অন্যরকম হয়ে যায়?

বাড়ির বড় মেয়ে জামাই বিদায় হলো। প্রিতম ছিল নিরব দর্শক এতক্ষণ। এখন যখন তার বধূর পালা এলো সে গিয়ে সবার কাছ থেকে আবারও বিদায় নিলো। প্রিতম যখন ইরফানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, ইরফান একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। প্রিতম আজ বাইরে তিক্ততা টুকু প্রকাশ না করে বরফ ঠান্ডা গলায় বলে,“আসছি।”

ইরফান নিরুত্তর। ইনায়া কান্না থামিয়ে ভাই আর স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকে, সে মনে মনে প্রার্থনা করছে এখানে কোনো তর্কবিতর্ক না হোক। কখনোই যেন আর অমন পরিস্থিতি না হয়। তার স্বামীও তার সবকিছু,তার ভাই বোনও তার সবকিছু।

ওখানে কোন তর্কবিতর্ক হলোও না। কারণ ইরফান নিশ্চুপ ছিলো। ইনায়া এসে সবাইকে রেখে ইরফানকে ধরে বললো,“পরশু আমার রিসেপশনে যাবে না ও বাড়ির?”

ইরফান প্রিতমের দিকে চায়,প্রিতমের মুখভঙ্গি গম্ভীর। দৃষ্টি ঘুরিয়ে ইরফান বোনকে দেখে বলে,“ছুটি শেষ আমার,ভালো থাকবি!”

_______

কটেজ সাজিয়ে দিয়েছে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের লোক,যদিও মুঈনের তরফ থেকে রিসেপশন পার্টির জন্য একটা কমিউনিটি সেন্টার বুক করা আছে। কিন্তু এই কটেজটা মুঈন সাজিয়েছে নিজের ইচ্ছেতে।

ইনশিরাহ বাবার হাত ধরে গাড়ি থেকে নামলো। তার আরেক হাতে মিঠিকে পেঁচিয়ে ধরে রেখেছে। গেটের ঠিক পাশেই একটা বিশাল সাইনবোর্ড। তাতে লেখা,“পুলিশ অফিসার্স রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া।”

ইনশিরাহ কখনও এখানে আসেনি। মাম্মা পাপা বহুবার এখানে ইনভিটেশন পেয়ে এসেছে,তার আসা হয়নি, আসতে ইচ্ছে হয়নি। আজ যখন এলো, একেবারেই এই লোকের বৌ হয়ে এলো। কি অদ্ভুত!

গাড়ি থেকে কেয়ারটেকারকে জিনিসপত্র নামাতে বলে মুঈন গিয়ে কটেজের মেইন লকটা খুললো। কেয়ার টেকার শারাফাত বললো,“বুয়া সবকিছু রান্না করে রেখে গিয়েছে স্যার, ম্যাডামের আসার কথা শুনে,আপনি যা যা বলেছিলেন সব কিছু করে রেখেছে।”

মুঈন হেসে বলল,“ঠিক আছে! ধন্যবাদ!”

ইহান বোনের দিকে তাকিয়ে বললো,“আয়!”

বাবার হাত ধরে ইনশিরাহ ধীরে ধীরে পা রাখলো তার সংসারে। আশেপাশে দৃষ্টি বুলাচ্ছিলো সে। একটা অচেনা দুনিয়া, অচেনা পরিবেশ।
দৃষ্টি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছিলো সে সবকিছু। তাদের বাড়ির থেকে অতি ক্ষুদ্র একটা কটেজ। বেশ নিড়িবিলি। বেশ নয়, একেবারেই নিড়িবিলি। মুঈনের হৈচৈয়োফোবিয়ায় আক্রান্ত বৌয়ের জন্য উপযুক্ত স্থান।

মুঈনের তিনদিন লেগেছিলো ঘরটাকে তার বৌয়ের জন্য সাজাতে। ঘরের প্রতিটি কোণ গোছালো, সর্বত্র সৌখিনতার ছোঁয়া।

ঘরে ঢুকে মুঈন ওদের তিনজনকে বসতে বলে। সামিন চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মেয়ে জামাইয়ের সংসার দেখে নিলো এক পলকে। বুকের ভেতর কেমন একটা প্রশান্তিময় অনুভূতি হলো তার। এখন আর আগের মতো হাশফাশ লাগছে না।

ইহান বড় বাবার দিকে তাকালো। মুঈনের বুদ্ধিটা একদমই ভালো ছিলো। ইহান সামিনকে বললো,“চলো এখন উঠি? ওরা বিশ্রাম নিক!”

সামিন একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ক্লান্ত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। মুঈন বললো,“উঠবো মানে! তুমি আর বাবা আমাদের সাথে লাঞ্চ করবে।”

ইহান হেসে মাথা নাড়লো,বললো,“তোমাদের পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিলো। এখন আমরা যাই। আর কোন কথা নয় মুঈন। তোমরা বিশ্রাম নাও।”

ইনশিরাহ বাবার মুখের দিকে তাকায়। সামিন মেয়ের একটা হাত ধরে ঘনঘন শ্বাস ফেলে বলে,“আম্মা পাপা যাক?”

ইনশিরাহ বিমূঢ় চেয়ে রয় বাবার মুখের দিকে, খানিকবাদে বলে,“বলো আসি!”

মেয়েকে জরিয়ে ধরে কপালে চুমু খায় সামিন। এবার আর থামে না সে, তাড়াহুড়ো করে উঠে মুঈনকে আসছি বলে কটেজ থেকে বেরোয়। বসে থাকলে চলবে না,যতক্ষন বসে থাকবে,মন বলবে আরেকটু থাকি মেয়েটার কাছে। এরকম করলে তো চলবে না! ইহানও বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে,ধীর পায়ে হেঁটে বেরোয় কটেজ থেকে।

মুঈন গেট পর্যন্ত তাদের এগিয়ে দেয়, সামিন যখন গাড়িতে উঠে বসলো,তখন মুঈন ঝুঁকে গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে সামিনকে বললো,“আপনি ঠিক আছেন বাবা?”

মাথা নাড়ে সামিন। ইহান গাড়ি স্টার্ট দিতেই সে ক্লান্ত ভঙ্গিতে সিটে গা এলিয়ে দেয়,অস্ফুটে মুঈনকে বলে,“ভেতরে যাও।”

রাস্তার ধূলো উড়িয়ে গাড়িটা দৃষ্টি সীমার বাইরে যেতেই গেট বন্ধ করে মুঈন কটেজে ফিরে দেখে ইনশিরাহ সোফাতে চুপচাপ বসে আছে। মিঠি তার পাশে চুপচাপ বসে লেজ নাড়াচ্ছে। মুঈন ওর ব্যাগেজ গুলো হাতে তুলে নিয়ে বললো,“আমাদের বেডরুম এদিকে ইনশিরাহ।”

“আমাদের বেডরুম” কথাটাও হঠাৎ অদ্ভুত অনুভূতি দিলো ইনশিরাহকে। কিছুক্ষণ বসে থেকে সে উঠে দাঁড়ায়,তার কৌতুহলী দৃষ্টি চারপাশটা দেখছিলো খুব ভালো করে। মুঈনের চোখ এড়ালো না তা।
স্বামীর পিছু পিছু ইনশিরাহ “তাদের বেডরুমে” ঢুকলো। চারপাশটাতে এক নজরে চোখ বুলিয়েই ইনশিরাহ খানিকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। রুমটা তার পছন্দ হয়েছে, একটা সাদামাটা বেডরুম, দু'পাশে দু'টো খোলা বারান্দা। আলো,বাতাসে ভরপুর। ঘরের কাটছাঁট সত্যিই প্রশান্তিদায়ক, সবকিছু সাদা রঙের। একরাশ স্নিগ্ধতা যেন লেপ্টে আছে সব কিছুতে।

মুঈন ইনশিরাহর ব্যাগেজ ঘরের এককোণে রেখে দিলো, হাতের তর্জনী তুলে ইনশিরাহকে ওয়াশরুম দেখিয়ে বললো,“ওটা ওয়াশরুম। তোমার প্রয়োজনীয় টয়লেট্রিজ ওখানে রাখাই আছে।”

ইনশিরাহ মাথা নাড়লো সামান্য। মুঈন কাবার্ড থেকে নিজের পোশাক বের করে বলে,“আমি পাশের রুমের ওয়াশরুমে যাচ্ছি।”

মুঈন ঘর থেকে বেরোতে ইনশিরাহ ডান পাশের বারান্দার দিকটাতে যায়, পুরো বারান্দাটা হরেক প্ল্যান্টস দিয়ে সাজানো। একপাশে একটা বিশাল দোলনা।
ইনশিরাহ বেরিয়ে পশ্চিমের বারান্দার দরজা খোলে। ধীর পায়ে হেঁটে ঘরের প্রতিটা কোণ দেখে, সে কি দেখছে নিজেও বুঝতে পারছে না। শুধু হাঁটছে, শাড়ির আঁচল টা বড্ড ঝামেলা দিচ্ছিলো তাকে, ইনশিরাহ মুখে চ বর্গীয় শব্দ করে আঁচল টেনে মাম্মার মতন কোমরে গুঁজে নেয়।

মুঈন তখনও বেরোয়নি। ইনশিরাহর কেমন অলসতায় ধরেছে, এসির পাওয়ার বাড়িয়ে সে বিছানার এক কোণে চুপচাপ বসলো। ক্লান্তিতে যেন ভে'ঙে যাচ্ছে শরীরটা। গত এক সপ্তাহের ধকল হঠাৎ যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। সে ফ্রেশ হতে না গিয়ে বিছানার এক কোণে গা এলিয়ে দিলো চুপচাপ। যায়গাটা,ঘরটা,পরিবেশটা এতোটাই নিড়িবিলি যে সামান্য পাতা পরারও শব্দ হচ্ছিল না। ইনশিরাহ অলস দুপুরে,অলস হয়ে দু'চোখ বুজতেই, ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পরলো।

মুঈন গোসল সেরে পাশের রুম থেকে বেরিয়ে এসে এই ঘরে ঢুকলো তোয়ালেতে মাথা মুছে নিতে নিতে। ঘরে ঢুকেই তার পা থমকালো এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য,তার বহু কাঙ্খিত একটি দৃশ্য দেখে।

এক রমনী,লাল টুকটুকে এক রমনী তার বিছানায় ঘুমিয়ে আছে জড়োসড়ো হয়ে অলস দুপুরে, গভীর নিদ্রায় মশগুল সে। মাথার নিচে তার মেহেদি রাঙা হাত।
মুঈন মাথা মুছছিল,ক্রমে হাতের গতি থামিয়ে তোয়ালে হাতে দাঁড়িয়ে রইলো। অনিমেষে চেয়ে রইল ইনশিরাহর দিকে। শাড়ির আঁচল কোমরে গোঁজা, অগোছালো বেশ পুরো তবুও যেন পরিপূর্ণ লাগছে দৃশ্যটা।

একজন পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে এমন একটি দৃশ্য নারী কায়ার লুক্কায়িত সব সৌন্দর্যের থেকেও মোহনীয়। মুঈন চোখ নামিয়ে নিলো, আবার তাকালো, আবার চোখ নামায়, আবার তাকায়, আবার চোখ নামায়, আবার তাকায়। এক নিদারুণ অস্থিরতা চেপে বসে তার পুরুষ মনে।
হাতের তোয়ালেটা বারান্দায় মেলে দিয়ে এসে আবারও একটু দেখলো ঘুমন্ত ইনশিরাহকে তারপর স্মিত হেসে জানালার পর্দা গুলো টেনে ঘরটা অন্ধকার করে দিলো। পরে দরজা টেনে বারান্দায় চলে গেলো, ইনশিরাহর ঘুম ভাঙাল না।

শান্তিনীড়ে তখন পিনপতন নীরবতা। বাড়িতে কিছু গেস্ট আছে,কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না তাদের উপস্থিতি।
সামিন ফিরেছে কিছুক্ষণ আগে, দু'টো মেয়ে বেরিয়ে গিয়েছে পর পর,বাড়িটা ফাঁকা, মরুভূমির মতন ঠেকছে।

সবার নির্লিপ্ততায় বাড়িটা কেমন ভুতুড়েও লাগছে, রান্নাঘরে চুলা ধরায়নি হেল্পিং হ্যান্ডরা, বাড়ির কর্ত্রীদের মতিগতি তারা বুঝে উঠতে পারছে না। চোখের ওপর আঁচল রেখে লিভিং স্পেসে বসেছিল আলো এতক্ষণ, যোহরের আজানের সময় হতেই সে উঠলো, মেইড দুটো চুপচাপ বসে ছিল। আলো বিরক্তি নিয়ে বললো,“বাড়িতে মেহমান রয়ে গিয়েছে শানুর মা! তোমরা এভাবে হাত পা ছেড়ে দিও না, রান্নাঘর তোমাদের। তোমরা আমার থেকে বেশি জানো। আমি ঠিক আছি। তোমরা ফটাফট রান্না চাপাও। লিস্ট কিচেন কেবিনেটে রাখা আছে।”

বড় ম্যাডামকে দেখে তাদের খুব খারাপ লাগছে, আদেশ পেয়ে তারা রান্নাঘরে গেলো।

আলো দোতলায় উঠে ঘরে উঁকি দিলো, সামিন বিছানায় শুয়ে আছে চুপচাপ, কপালে একটা হাত রেখে, ঘুমাচ্ছে কি না বোঝা যাচ্ছে না।আলো আর ও ঘরে ঢুকলো না। গিয়ে দোতলার লিভিং স্পেসে একটা ডিভানে বসলো ।

খানিক বাদে ইশমাম এলো, অন্য একটি ডিভানে বসে আলোর দিকে তাকালো সে। আলোকে কিছুক্ষণ দেখে নিচুগলায় বললো,“এতো ভেঙে পরো না,প্লিজ।”

আলো ইশমামের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, ও প্রসঙ্গে না গিয়ে বলতে লাগলো,“আজ একটা বিষয় তোমার সাথে শেয়ার করতে ইচ্ছে হচ্ছে ইশমাম।”

_বলো।
ইশমাম কিছুটা অবাক হয়ে বলে।

_ইনায়ার ঝামেলার পরে তোমাকে বহুভাবে জাজ করেছি আমরা, কিন্তু আজ একটা জিনিস রিয়ালাইজ করলাম, বাবা মায়ের ছটফটানি সকল জাজমেন্টের ওপরে। তোমাকে কটুকথা শুনিয়েছি অনেক, রাগ রেখোনা।

ইশমাম হাসলো। বললো,“রাখিনি তো। নয়তো “পরিবার” শব্দটার অস্তিত্ব থাকলো কই বলো!”

______

ইনশিরাহর ঘুম ভাঙল ঠিক দেড় ঘণ্টা পরে,এতো জলদি ভাঙতো না যদি না মুঈনের ফোনটা বেজে উঠতো। ইনশিরাহ উঠে বসে চোখ ডলতে লাগলো, মুঈন ততক্ষণে ফোনটা রিসিভ করে হু হা তে উত্তর দিয়ে কল কে'টে ইনশিরাহর দিকে তাকায়।

ঘুম ঘুম চোখে,ফোলা মুখের শ্যামা সুন্দরী। মুঈন মুগ্ধ হয়ে কয়েক মুহূর্ত দেখে নিজের হাতের ঘড়ির দিকে ইশারা করে ইনশিরাহকে বললো,“লাঞ্চ!”

ইনশিরাহ বিছানা থেকে নেমে তাড়াহুড়ো লাগিয়ে,তার জামাকাপড় খুঁজতে লাগল, মোট চারটা ব্যাগ তার। দু'টো খুলে তাতে দেখলো শুধু শাড়ি আর শাড়ি। মেজাজ টা ভীষণ চটে যায় তার। এগুলো নিশ্চয়ই মেজো মায়ের কাজ। ইনশিরাহ তিন নাম্বার ব্যাগটা খুলে পেলো সালোয়ার স্যুট। মুঈন ইনশিরাহর অস্থিরতা দেখছে, কিছুটা আন্দাজ করতে পেরে বললো,“বাড়িতে একটা ফোন করে দেখো! যেটা খুজে পাচ্ছো না,সেটা হয়তো অন্য কোথাও রেখেছে।”

ইনশিরাহ চার নাম্বার ব্যাগটা খুলে তার টি-শার্ট গুলো পেলো। একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ইনশিরাহ সেগুলো নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো।

কিছুক্ষণ পরে মাথা মুছতে মুছতে ইনশিরাহ বেড়োলো। মুঈন তখন উপহার সামগ্রী গুলো সব ঘরের এক কোণে গুছিয়ে রাখছিল। ইনশিরাহর পরনে একটা পালাজো, এবং তার অ্যাংরি বার্ডের কার্টুন ওয়ালা টি শার্ট। ইনশিরাহকে দেখে সে উঠে দাঁড়ায়, গম্ভীর কিন্তু নম্রস্বরে বললো,“চলো খেয়ে নিই।”

দুপুরের লাঞ্চ সেরে দু'জনে ঘরে ঢুকে গিফট গুলো নিয়ে বসলো। ছোটোমা বারবার করে মেসেজ করছে গিফটগুলো সামলে নিতে, সুন্দর কর গুছিয়ে রাখতে। এগুলো হেলায় ফেলে রাখা উচিত না।

অসংখ্য গিফট,একটা একটা করে মোড়ক উন্মোচন করে একেকটা জিনিস আবিষ্কার করছে দুজন। সবকিছু অতিরিক্ত দামি, দামী ওয়ালমেট-পেইন্টিং থেকে শুরু করে ডায়মন্ডের কাপল রিং। মুঈন শুধু দেখছে, কিছু অদ্ভুত ধরনের গিফটও ছিল সেখানে, যেমন বাচ্চাদের ফিডিং বোতল,স্কুল ব্যাগ,বাচ্চা ক্যারি করার ব্যাগ, বাচ্চাদের চুসনি।

ইনশিরাহর হাত থামলো এসব দেখে। দুজন দুজনের দিকে তাকালো কিছু সময়ের জন্য, তারপর সেগুলো একপাশে সরিয়ে রেখে ইনশিরাহ নিচুগলায় বললো,“তুনাদের কাজ।”

মুঈন চুপচাপ নিজের মাথা নেড়ে বলে,“হুম।”

গিফটগুলো সব সাজিয়ে রেখে বক্সগুলো নিয়ে ইনশিরাহর বিপদে পারলো। মুঈন বললো,“এগুলো এখানে থাকুক। আমি রেখে আসবো স্টোর হাউসে।”

ইনশিরাহ আপত্তি তুলে বললো,“সামান্য কাজ। আপনি আমাকে স্টোর হাউস টা দেখিয়ে দিন। আমিই রেখে আসছি।”

মুঈন কিছু মুহূর্ত ইনশিরাহকে দেখে বললো,“চলো,আমার সাথে।”

কটেজের ঠিক পেছন দিকে দুই রুমের একটি স্টোর হাউস । প্রথম তালাটা খুলে মুঈন বললো,“বক্সগুলো আমার কাছে দাও, তোমার ভেতরে ঢোকার প্রয়োজন নেই। ভেতরে ধূলোবালি।”

_ধূলোবালিতে আমার ফোবিয়া নেই।

বলে ইশি পা রাখলো ভেতরে। মুঈন মেয়েটির আত্মবিশ্বাসী কথার ধরণ দেখে হাসে। অসংখ্য বাক্স ,বাইরে থেকে একটা একটা নিয়ে গুছিয়ে রাখার একপর্যায়ে ইনশিরাহ নিজের হাতে টান অনুভব করলো। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে মুঈন টেনে তাকে নিজের পেছনে নিয়ে নিয়েছে। ইনশিরাহ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়। মুঈন বলে,“ককরোচ।”

ইনশিরাহ মেঝেতে দেখলো দু তিনটে তেলাপোকা, সে তেলাপোকা গুলো চটি জু'তোর দ্বারা পিষে,মুঈনকে ঠান্ডা গলায় বলে,“আমার ককরোচোফোবিয়াও নেই। আমি এসব ভয় পাইনা। এসব ধরে ধরে ছবি তুলি আমি।”

বধূর সাহসিকতা দেখে কুপোকাত মুঈন। এই মারকাটারি মেয়ের কাছে কখনো তার হিরো হওয়ার সম্ভাব্যতা নেই,উনি একাই একশো। বধূকে এপ্রিশিয়েট করে মুঈন বললো,“দ্যাটস গ্রেট!”

বাকি বক্স গুলোও দু'জনে হাতে হাতে নিয়ে রাখলো। শেষ বক্সটা নিতে যখন মুঈন স্টোর হাউসের বাইরে বেরোবে ঠিক তখনই ইনশিরাহ বিকট চিৎকার দিয়ে উঠলো। মুঈন তড়িৎ গতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই তাকে পেছন থেকে আকরে ধরলো ইনশিরাহ । মুঈনের চোখ দু'টো রসগোল্লা সাইজের মতো বড় বড় হয়ে গেলো। টের পেলো নরম দু'টো হাত তাকে কিভাবে ছুঁয়েছে। মুঈন চাইলো সময় এখানেই কিছুক্ষণের জন্য থেমে যাক। পরক্ষনেই গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,“ইশি আর ইউ ও.....”

_ইঁদুর ফোবিয়া আছে আমার, ইঁদুর ফোবিয়া আছে।

মুঈনকে ধরে রেখে হরবরিয়ে বললো ইনশিরাহ।

চলমান.........

[ অসুস্থ আবারও। কাল গল্প দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারছি না।]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 61 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন