ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 62

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৬২
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

মুঈন স্থির দাঁড়িয়ে আছে। ইনশিরাহর কন্ঠস্বরে বুঝতে পেরেছে সে আসলেই ভয় পেয়েছে যথেষ্ট। পেছন থেকে মুঈনকে যেভাবে ধরে রেখেছিল সেভাবেই ধরে আছে, দাঁড়িয়ে আছে ঠাঁয়। পিঠের কাছ থেকে খামচে ধরে আছে মুঈনের টি-শার্ট।
সময় বেশিক্ষণের জন্য থামলো না,অত্যল্পকাল পরেই মুঈন সামান্য হেসে বলল,“ইদুরোফোবিয়া? আই মিন মুসোফোবিয়া! দ্যাটস গ্রেট ঠু!”

ইনশিরাহ সম্বিৎ ফিরে পেয়েছে ততক্ষণে। মুঈনকে ছেড়ে কেমন লাফিয়ে পেছনে চলে গিয়েছে এক পা,তবে মাথা থেকে ইঁদুর ভীতি সরেনি। পাংশুবর্ণের হয়ে আছে মুখটি।

মুঈন ঘুরে দাঁড়ায় ওর দিকে,অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে ওকে কিছুক্ষণ দেখে বললো,“বাইরে চলো!”

মুঈনের পেছনে স্টোর হাউজের বাইরে বেরোয় ইনশিরাহ। বিশালাকার একটি তালা স্টোরহাউসে লাগিয়ে মুঈন বলতে লাগলো,“তুমি ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার? সাপের ছবি তোলো তুমি?”

ইনশিরাহ কেমন কপাল কোচকালো,বললো,“সাপ আর ঐ গা ঘিনঘিনে জন্তু টা এক হলো? সাপ একটা কিউট প্রানী!”

_সাপ কিউট!!
মুঈন অবাকের পরেও অবাক হয়ে চেয়ে রইলো ইনশিরাহর মুখের দিকে। ইনশিরাহ হাঁটতে হাঁটতে বলছে,“অফকোর্স! স্নেইক ইজ আ কালারফুল ক্রিয়েচার! দেখতে সুন্দর! আর যাই হোক দেখলে মনে হয় ওরা গোসল করে রোজ! এই জন্তুটা তো জীবনে পানির ধারে যায়না! ইয়াক!”

মুঈনের কদম থামলো তার বধূর কথাবার্তা শুনে। ইনশিরাহ মুঈনের সামনে সামনে হাঁটছে, মুঈন অস্ফুটে বিড়বিড় করে বললো,“ওমেন!”

ইনশিরাহ পেছন ফিরলো তৎক্ষণাৎ, বললো,“কিছু বললেন?”

দু'পাশে না বোধক মাথা ঝাঁকিয়ে মুঈন বললো,“ঠিক! বড্ড নোংরা এই ইঁদুর,সাপ ভালো! সাপ কিউট! সাপ সুইট! ”

ইনশিরাহ দ্রুত হেঁটে কটেজে ফিরছে । মুঈন হাঁটছে ধীরে ধীরে,অস্ফুট স্বরে ইনশিরাহকে উদ্দেশ্য করে বললো,“তুমিও কিউট আছো! মারাত্মক কিউট!”

ইশি শুনতে পেলো না মুঈনের কথাগুলো।

বিকেলে মুঈন কোথাও বেরিয়েছিল। ইনশিরাহ গোটা কটেজে ছিল একা।
যাওয়ার আগে মুঈন বলে গিয়েছে যেকোনো প্রয়োজনে কল করে নিতে তাকে, কটেজের সর্বত্র ইনশিরাহ অবাধ বিচরণ করতে পারে, চাইলে গার্ডেনে অথবা আশেপাশে ঘুরতে পারে,মুঈন খুব বেশি সময় বাইরে থাকবে না।

ইনশিরাহ কোথাও বেরোলো না, কিছুক্ষণ অলস হয়ে বিছানায় পরে থেকে উঠে সে পাপাকে কল করে। সামিন যেন তার ফোনের অপেক্ষাতেই ছিল, রিসিভ করে একের পর এক প্রশ্ন ছুঁড়তে থাকে মেয়েকে,“ইনশিরাহ দুপুরে খেয়েছে কিনা, মুঈন কোথায়, ইনশিরাহর মুখটা এমন লাগছে কেন, গাঁয়ের তাপমাত্রা ঠিক আছে কিনা।”

ইনশিরাহ আপ্লুত হলো,ধরা গলায় বলল,“পাপা মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টা হয়েছে আমি এসেছি।”

সামিন আর কিছু বলে না। মেয়েকে দেখতে থাকে মন ভরে। বাপ বেটিকে বিরক্ত করতে চলে আসে আলো, আসে ইনশিরাহর চাচারা,চাচীরা, ফুপা, ভাইয়েরা, শেহা,মামারা,মামীরা।

এদের পাগলামি দেখে ইনশিরাহ হাসে, সবার সাথে ভিডিও কলে একঘন্টা আলাপ সেরে ফোন রেখে ইনশিরাহ উঠে দাঁড়ায়। মিঠি লেজ নেড়ে নেড়ে ঘরময় খেলছিল। ওকে দেখে ইনশিরাহর হঠাৎ মনে পরলো ওর খাবারের কথা, কিছুক্ষণ আগে দুধ খেয়েছে সামান্য। এরপর কিছু খায়নি।

ইনশিরাহ ফোনটা হাতে তুলে বিনা সংকোচে মুঈনকে কল করলো। মুঈন ছিলো তখন সুপারমার্কেটে। বাড়ির জন্য কিছু গ্রোসারিজ, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে গিয়েছিলো। ইনশিরাহর ফোন পেয়ে তার মুখটা আপনা আপনিই হাসে। রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে ইনশিরাহ বললো,“মুঈন?”

_জি।

_আপনি ব্যস্ত?

কাঁধ আর কানের সাহায্যে ফোনটাকে চেপে ধরে, দু'হাতে দু'টো ফ্রিজিং করা বিশাল চিংড়িমাছ তুলে বিচক্ষণ মানুষের মতন দেখতে দেখতে মুঈন বলে,“নাহ, মোটেও ব্যস্ত না। বলো।”

_মুঈন মিঠির ক্যাটফুড শেষ হয়েছে । আমার মনে ছিল না,ও দুধ ছাড়া আর কিছু খায়নি। আপনি একটু নিয়ে আসতে পারবেন?

মুঈন হাসলো অস্পষ্ট। ইনশিরাহকে বললো,“পারবো! তোমার কিছু লাগবে?”

“তোমার কিছু লাগবে?”
ভীষণ পরিচিত একটি বাক্য। ইশির মনে পরে যায় পাপা মার্কেটে গেলে মাম্মাকে ঠিক এভাবেই বলে,“তোমার কিছু লাগবে?”

ইশি বললো,“না,লাগবে না। ধন্যবাদ। রাখছি।”

কল কাটতেই মুঈনের পাশ থেকে তার এক বন্ধু বলল,“ভাবী? চোখে হারাচ্ছে?”

হাসলো মুঈন,বললো,“না! বাচ্চার জন্য খাবার নিয়ে যাওয়ার তাগিদ দিলো!”

ইনশিরাহ তখন ঘরময় পায়চারী করতে লাগলো। কটেজের ডান দিকটা দেখেনি সে এখনও। মোট তিনটা বেডরুমের সুন্দর একটি কটেজ, গোছালো, সুন্দর। হাঁটতে হাঁটতে গেস্টরুমের পাশের ঘরটিতে ইনশিরাহ কৌতুহল বশত ঢুকলো। এটা মুঈনের স্টাডিরুম, সেটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। একটা বেড অবশ্য আছে তবে পুরো ঘরটাকে মনে হচ্ছে একটা লাইব্রেরি। কম-সে-কম পাঁচশ বইয়ে ঠাশা তিনটে শেল্ফ।

ইনশিরাহ এগিয়ে গিয়ে সেগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখলো। লোকটা ভীষণ পড়ুয়া, মেধাবী। এই এতো বই সে পড়েছে! পড়ে। অথচ ইনশিরাহ একাডেমিক বইয়ের বাইরে হাতেগোনা কয়েকটাই বই পড়েছে।

ঘরের এক কোণে মুঈনের কম্পিউটার। একটা রকিং চেয়ারও আছে। ইনশিরাহ শুধু শুধু একটা বই তুলে নিয়ে,সেটা নিয়ে বসলো চেয়ারটিতে। এর মাঝে টের পেলো তার ফোনে পর পর কয়েকটি বার্তা এসেছে। ফোনটা হাতে তুলে চেক করে দেখতে পায় অনামিকার একটা মেসেজ, তাকে একটি কল রেকর্ড পাঠানো হয়েছে। নিচে লিখে দিয়েছে,“এটা একটু শোন ইশি!”

ইনশিরাহ রেকর্ডটি শোনার জন্য আঙ্গুল চালালো ফোনের স্ক্রিণে। সাথে সাথে তার কপাল কুঁ'চ'কে যায়। কন্ঠস্বরটি সাগর ভুঁইয়ার। কারো সাথে হাসাহাসি করছিল। তিন মিনিট বত্রিশ সেকেন্ডের রেকর্ডে ইশি শুনলো সাগর ভুঁইয়া কাউকে বলছে,“আরে! ঐ সামিনের মেয়ে! না না,ওসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না, আমার ছেলে সামলে নেবে। আমার ছেলে আমার কথা ছাড়া এক পা নড়ে না। কি বললে বিয়ে? হাহাহাহ! তাহলেও অসুবিধা নেই, চাকরানী বানিয়ে রাখবো। খুব দুর্বল সে আমার ছেলের প্রতি! যথা আজ্ঞা যথা আজ্ঞা বলে জুতা পরিস্কার করবে, সময়ের অপেক্ষা। আমি এসব নিয়ে ভাবছিই না! আমি তো দেখতে চাই সামিনের রিয়াকশন!”

______

মাগরিবের সময় হয়ে গিয়েছে তখন, মুঈন সবেমাত্র বাড়িতে ফিরলো। গতকালের মত আজ আকাশ ভীষণ ডাকাডাকি করছিলো, সবকিছু কিচেন কেবিনেটের ওপর রেখে হাতটাকে প্রথমেই স্যানিটাইজ করলো মুঈন। আশেপাশে খুঁজলো ইনশিরাহকে। গোটা কটেজে পিনপতন নিস্তব্ধতা বিরাজমান! ইনশিরাহর সাড়া শব্দটি নেই। হঠাৎ মিঠির আওয়াজ পেয়ে মুঈন তার স্টাডি রুমের দিকটাতে যায়। দরজাটা হাট করে খোলা আছে, ভেতরে পা রাখতেই মুঈন দেখলো মিঠি মেঝেতে খেলেছিল আর তার মা ইনশিরাহ জানালার গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে, বিষন্ন মুখে, শূন্যে তাকিয়ে আছে। যেন ডাকলেও সে শুনতে পাবে না কাউকে। কিছু কি হয়েছে! হঠাৎ করে কি হয়েছে! মুঈন বুঝতে পারছে না। সে অনিমেষে চেয়ে থাকে শ্যামা মুখটার দিকে,যে তখনও টের পায়নি মুঈনের অস্তিত্ব।

মুহুর্ত কাটে,মুঈন এবার বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলে,“হাই!”

ইনশিরাহ চ'ম'কে উঠে ঘুরে তাকালো। মুঈন এবার স্পষ্ট দেখলো ইনশিরাহর ফোলা ফোলা দু'টো চোখ,যেন কিছুক্ষণ আগেও কেঁদেছে। চোখে মুখে কেমন আতঙ্কময় লজ্জা এসে ভর করেছে, মুখভঙ্গি বলে দিচ্ছে জোর করে চাইছে মুখটাকে সহজ করতে।

মুঈন একদৃষ্টে দীর্ঘসময় ইনশিরাহর চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,“আপনার জীবনে কি অনেক হতাশা! আপনার বয়ফ্রেন্ড কি আপনাকে চিট করেছে, এবং পরে আপনার বাবা মা আপনাকে জোর করে এক গোমড়ামুখো লোকের সাথে বিয়ে দিয়েছে, আপনার জীবনের সকল আশা হতাশায় বদলে গিয়েছে? তবে এই সন্ধ্যে সন্ধ্যে এক মগ কড়া কফির সাথে হতাশাটুকু গিলে ফেলার আমন্ত্রণ রইলো!.........চিনি ক চামচ?”

ইনশিরাহ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে মুঈনের দিকে অক্ষিপল্লব প্রশ্বস্ত করে। মানুষটার মুখভঙ্গি গম্ভীর! অথচ কি সাবলীল ভাবে বললো কথাগুলো।

দু'জনে দু'জনের দিকে তাকিয়ে রয় মুহুর্ত থেকে মুহুর্ত! মুঈনের চোখে তখনও প্রশ্নটা নাচছিলো,“ক চামচে হতাশা দূর হয়?”

কাল কাটে, ইনশিরাহ হেসে ফেললো হঠাৎ। চোখ মুখের কাঠিন্যতা এক চুটকিতে বিদায় নিলো। মৃদু হেসে,হাসি থামিয়ে বললো,“এক চামচে!”

মুঈন ঘর থেকেই বেরিয়ে কিচেনের দিকে এগিয়ে যায়। ইনশিরাহ যায় তার পিছু পিছু, মুঈনকে বলে,“আমি কি হেল্প করবো?”

_হ্যা।

_বলুন।

_কেবিনেট থেকে মগ বের করো দু'টো।

ইনশিরাহ মগ দু'টো বের করে বলে,“আচ্ছা বুয়া আসবে না?!”

_না। ছুটি দিয়েছি আজ সন্ধ্যে টা, আমাদের দুজনের ইনভিটেশন আছে ডিসি মহোদয়ের বাড়িতে রাতে।

কফি বানিয়ে দু'টো মগে ঢেলে মুঈন ইনশিরাহকে বললো,“চলো বারান্দায় বসি!”

মেঘ ডাকছে,হাওয়া দিচ্ছে বাইরে,কটেজের বাগানে একটা বড় বকুল গাছ, বকুলের সুঘ্রাণ ভেসে এসে ঐ নির্জন, নিস্তব্ধ পরিবেশে অন্য মাত্রা যোগ করেছে। ইনশিরাহর দিকে এক ফাঁকে মুঈন তাকায়। চুলে দু'পাশে দু'টো জুটি করেছে,দেখতে লাগছে কিশোরী মেয়েদের মতো।
হঠাৎ কি মনে করে ইনশিরাহ বললো,“আমি আপনাকে গোমড়ামুখো মনে করি না!”

কফির মগে শেষ চুমুক দিয়ে মগটা টেবিলের ওপর রেখে বললো,“তোমার বয়স পঁচিশ বছর তিনমাস পনের দিন!”

ইনশিরাহ মাথা তুলে তাকিয়ে বললো,“হ্যা! কেনো?”

_এমনিই। চলো ওঠা যাক! আমাদের বেড়োতে হবে।

রেডি হতে গিয়ে ইনশিরাহ মহা মুসিবতে পরলো, এ ধরণের ইনভিটেশনে ঠিক কি পরে যাওয়া উচিৎ ইনশিরাহ বুঝতে পারছে না। ইদানিং এটা পর,ওটা পর শুনতে শুনতে তার মনে হচ্ছে এখনও তার আশেপাশে মাম্মা চাচীরা দাঁড়িয়ে আছে ,তার দিকে রাগারুণ চোখে তাকিয়ে আছে,আর বলছে,“ওটা পর!”

শাড়ি গুলো দেখে গা শিউরে উঠলো তার। এসব এখন সে পরবে না। না মানে না। যথেষ্ট ভালোমেয়েটি হয়েছে সে,আর না। তবে এতোটুকু বোধ তার হলো লোকটার সাথে একটা সামাজিক অনুষ্ঠানে গেলে, ভূষণে,বসনে কিঞ্চিত সামাজিকতা বজায় রাখা উচিত। অনেকক্ষণ ঘাঁটাঘাঁটি করে সে একটা আকাশী রঙের সুতি , আরামদায়ক চুড়িদার সেট তুলে নিলো, অবশ্য নাক সিঁটকিয়ে নিয়েছে বেশ কিছুক্ষণ।

মুঈন রেডি হয়ে বসে আছে। ভেবেছিল তার বৌয়ের সময় লাগবে, এটা বৌদের “বৌগত” বৈশিষ্ট্য,তাই যথেষ্ট ধৈর্য্য নিয়ে মুঈন বসে ছিল। তবে মুঈনের বেশিক্ষণ ধৈর্য ধরে বসে থাকতে হলো না, কারণ তার বৌ আর পাঁচটা বৌয়ের মতো একেবারেই নয়। একটা সাদামাটা চুড়িদার সেট পরে, চুলগুলো খোলা রেখে বেরিয়েছে ঘর থেকে ইনশিরাহ। না দিলো চোখে কালির প্রলেপ,না মাখলো গালে লাল গোলাপী প্রসাধনী,অথচ তাকে দেখতে লাগছে সম্পূর্ণ, নিখুঁত, মোহনীয়।
মুঈনের চোখ আটকে গেলো কিছুক্ষণের জন্য। ভীষণ অসহ্য লাগছে মুঈনের এখন! কেমন হ্যাংলা লাগে নিজেকে এমন ভাবে তাকিয়ে থাকতে, ভীষণ হ্যাংলা লাগে। ইচ্ছে করে এই মেয়েকে কপালে,গালে প্রশংসা লেপ্টে দিয়ে বলতে,“কিছুসময় এসব পরে আমাকে এভাবে অস্বস্তি দাও! কিছুসময়! বেশি সময় এসব পরতে হবে না,শুধু কিছুসময়!”

ইনশিরাহ ঘুরে মুঈনের দিকে তাকায়, তাড়াহুড়ো লাগিয়ে বলে,“আ'ম রেডি। চলুন।”

মিঠিকে তার স্লিপিং বাস্কেটে রেখে ওরা বেড়োলো । বাইকে মুঈনের পেছনে বসলো ইনশিরাহ। মাঝখানে কিছুটা দূরত্ব রেখেছে। হাত রাখেনি মুঈনের কাঁধে।

ডিসি মহোদয়ের বাড়িতে আজ সব উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ইনভিটেশন ছিলো,সস্ত্রীক। তবে পার্টির মধ্যমণি ছিলো মুঈন ও ইনশিরাহ।
শহরের সকল সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এবং তাদের স্ত্রীরা,যারা কিনা নিজেরাও সরকারি কর্মকর্তা, তাদের ভীষণ কৌতুহলী দৃষ্টিতে দেখছিল ইনশিরাহ। অন্যান্য অতিথিদের সাথে সামাজিক আলাপ সেরে,একপাশে চুপচাপ ফোন নিয়ে বসে আছে সে, মুঈন সবার সাথে হেসে হেসে কথা বলছিলো। ইনশিরাহ লোকটাকে আড়চোখে দেখছে। হঠাৎ একটা কথাই তার মাথায় এসেছে, এতো এতো মেধাবী মানুষদের মাঝে সে একাই একটা অপদার্থ!
হোক সে উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে,হোক তার বাবা চাচাদের বিত্ত বৈভবের অভাব নেই,হোক তারা ক্ষমতাশালী,তবে ইনশিরাহ যোগ্যতার দিক থেকে মুঈনের কাছাকাছি নেই, নেই মানে নেই। অন্যান্য কর্মকর্তাদের বৌদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে সে, কথা বার্তায় ভীষণ আত্মবিশ্বাসী এবং চটপটে।
এসব দেখতে দেখতে হঠাৎ সম্বিত ফিরে পায় ইনশিরাহ, এসব সে কি ভাবছে! কেন ভাবছে সে জানে না। তবে সাঈমের ঐ কথাগুলো শোনার পর থেকে ইনশিরাহ দিনকে দিন এভাবেই হুটহাট ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভোগে। ইনশিরাহর হঠাৎ মনে হলো তার মানসিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে একটা। যেটা সত্যি হলে খুব বিশ্রী ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।

রাত বাড়ার সাথে সাথে নিশ্চিত হওয়া যায় আজ আকাশ ঝেঁপে বৃষ্টি নামবে। ডিসির বাসভবনে ডিনার শেষ করে মুঈন ইনশিরাহ বেরোলো, রাত তখন দশটা ছাড়িয়ে গিয়েছে, আকাশও তার সংযমের মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছে, পথিমধ্যে ঝমঝমে বৃষ্টিতে মুঈন ইনশিরাহ ভিজে একাকার হলো।

রাস্তার একপাশে যাত্রী ছাউনীর সামনে বাইক টাকে দাড় করিয়ে দু'জনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে বধূর সাথে মুঈনের প্রথম বৃষ্টি বিলাস হয়ে গেলো। ভেজা চুল গুলো মুখের সামনে লেপ্টে আছে কিছুটা,ঐ ভেজা চোখ,তিরতির করে কাঁপছে পল্লব,রক্তাভ ঠোঁট। মুঈন চমৎকার একটা দৃশ্য উপভোগ করলো কিছুটা সময়। বৃষ্টি যখন থামবে মনে হচ্ছিল ইনশিরাহ তখন তাড়া দিলো মুঈনকে,“চলুন এখন যাই! মিঠি খুব ভয় পাচ্ছে একা একা!”

বৃষ্টি থেমে গিয়ে,কিছু সময়ের বিরতি নিয়ে আবার ঝরতে শুরু করেছে,এবার সাথে করে নিয়ে এসেছে বজ্রপাত।

তাড়াহুড়ো করে কটেজে ঢুকলো দুজন। ঘরে ঢুকতেই দেখলো পশ্চিমের জানালাটা খোলাই ছিলো,বিরাট অসুবিধায় পরা গেলো এইবার। ঝমঝমে বৃষ্টির ছাট এসে ঘরের এক পঞ্চমাংশ ভিজিয়ে ফেলেছে।

ইনশিরাহর মনে পরলো,এই অকাজটি তিনিই করে রেখে গিয়েছিলেন। কেমন লজ্জিত ভঙ্গিতে মুঈনের পিছু পিছু জানালা বন্ধ করতে গেলো। জানালার পর্দাগুলো ভিজে জবজবে, একপাশের গ্লাস ধরে যখন ইনশিরাহ টানছিল ঠিক তখনই আশেপাশে কোথাও বিকট শব্দে একটা বজ্রপাত হয়। হতবিহ্বল ইনশিরাহ অকস্মাৎ লাফিয়ে উঠে ঘুরে জাপটে ধরলো মুঈনকে।

অনুভূতির উত্তাপে দগ্ধ হতে বেশি সময় লাগলোনা মুঈনের, বহু প্রত্যাশিত সুখময় সময়টাও মুঈনের সুপ্রসন্ন ভাগ্যবলে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে এলো, তার প্রশ্বস্ত, অসহায়, গোবেচারা, হ্যাংলা, মরুভূমি সম, পেটানো বুকটাতে আশ্রয় নিলো পাখির মতো একটা শরীর।
চোখ বড় বড় হয়ে গিয়েছে মুঈন ফরাজীর। নরম শরীরটা যখন তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে রেখে কাঁপছিল, মুঈন হঠাৎ খুব বড় একটা বোকামি করে বসলো,এই মুহুর্তকে খুব বিচক্ষণতার সহিত লাই না দিয়ে বলে ফেললো,“অ্যাস্ট্রাফোবিয়া আছে ইনশিরাহ বিনতে সামিন?”

খুব বড় বোকামি ছিলো এটা মুঈনের, মুঈন খুব আফসোস করলো যখন তার বৌ তাকে ছেড়ে দূরে সরে, ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তার ভেতরে বেহায়া, অধৈর্য, সুযোগসন্ধানী,ছটফটে পুরুষ সত্তাটা তাকে গালি দিলো,“অপদার্থ অফিসার! এতো কথা বলার কি দরকার ছিলো!”

ইনশিরাহ ঘুরে দাঁড়িয়ে একটিবারের জন্যও চোখ ফেরায়নি মুঈনের দিকে। হালকা আকাশি কামিজ ভিজে শরীরের সাথে লেপটে আছে, ভয়ংকর লাস্যময়ী অপার্থিব এক নারী মুঈনের সামনে দাঁড়িয়ে,এই দৃশ্য,এই সময়,এই সবকিছু মুঈনকে বোকার মতো দাড় করিয়ে রাখলো।
ইনশিরাহ দাঁড়াল না, কেমন অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে ছোটাছুটি করে তোয়ালে আর শুকনো জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো।

উত্তপ্ত মস্তিস্ক, উন্মাতাল সব অনুভূতি বালিচাপা দিয়ে তার ঠিক সোজাসুজি আয়নাটায় নিজের মুখটাকে দেখে মুঈন হাসে।

ভেজা কাপড় পাল্টে ঘরের ভেজা আসবাবপত্র ঠিকঠাক করে মুঈন বিছানা ঠিক করে শুয়ে পরে, ইনশিরাহ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে মিঠির কাছে গিয়েছিলো ড্রয়িং রুমে। পৌনে একঘন্টা পেড়িয়ে যাওয়ার পরে মিঠিকে কোলে নিয়ে গুটিগুটি পায়ে ইনশিরাহ ঘরে ঢুকলো। মুঈন তাকিয়ে আছে ইনশিরাহর দিকে। ইনশিরাহর এসে নিচুস্বরে,তবে গম্ভীর হয়ে মুঈনকে বলল,“আপনার অসুবিধা না হলে একটা কথা বলবো?”

_হ্যা বলো।

মিঠিকে দুহাতে আগলে ধরে ইশি বললো,“আসলে মিঠিরও না অ্যাস্ট্রাফোবিয়া আছে,ও এমন শব্দে কেমন আ'ত'ঙ্কি'ত হয়ে পরেছে দেখুন। আপনার যদি অসুবিধা না হয় ওকে আমি আমাদের বিছানায় রাখি? ট্রাস্ট মি ওর লোম ঝরে না,শব্দ করে না, বিরক্ত করে না।”

মুঈন তাকিয়ে আছে বৌয়ের দিকে, ইনশিরাহ ভীষণ উৎসুক হয়ে দৃষ্টি রেখে দিয়েছে মুঈনের চোখে,তার দৃষ্টি বলছে সে আশাবাদী, মুঈন ভদ্রলোক, মুঈন এই আবদার মানবে।

মুঈন একবার ইনশিরাহর হাতের ভারি স্বাস্থ্যের গোলুমোলু,লোমশ মিঠিকে দেখে, একবার দেখে ইনশিরাহকে। কিছুক্ষণ দুজনকে দেখে বলে,“ঠিকাছে,রাখো।”

বাইরে মনে হচ্ছে তান্ডব চলছে প্রকৃতিতে। মুঈন শুয়ে পরলো, ইনশিরাহও মিঠিকে জরিয়ে ধরে শুয়ে পরলো। ক্লান্তিতে, ইনশিরাহর ঘুম এসে যায় দ্রুত। মুঈন জেগে জেগে বৃষ্টিস্নাত রাতে বৌ বাচ্চার মুখ দেখে দীর্ঘসময় ধরে।
একা একা সে হাসে,তার একটা পরিবার হয়েছে অবশেষে। “ফোবিয়াময় পরিবার।”

চলমান.....

[ গল্প এখন থেকে অনিয়মিত পাবেন। ধৈর্য না থাকলে গল্পটি আর রানিং না পড়ার পরামর্শ রইল। সুস্থ থাকবেন,ভালো থাকবেন! ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 62 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন