#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্বসংখ্যা_৬৩
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
আধুনিক ঘড়িটা রোবটিক শব্দ করে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। সাথে সময়ও বলে দিলো,তখন সময় সকাল ছয়টা তেত্রিশ মিনিট। বাইরেটা ততক্ষণে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে, সূর্য তার মিঠা উষ্ণতা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন।
মুঈনের দৃষ্টি স্থির হয়ে ছিলো বিছানায়, ঘুমন্ত মেয়েটির দিকে। যার মাথার কাছেই মিঠি বসে আছে। মিঠির নির্লিপ্ততা দেখে মনে হচ্ছে সেও তার মায়ের জন্য চিন্তিত। মুঈন মুখ দিয়ে চুক চুক শব্দ করে মিঠিকে কাছে ডাকে হাত বাড়িয়ে। মিঠি তার বাবাকে তিনদিনে চিনে নিয়েছে, মুঈনকে বাবা হিসেবে পছন্দ করে ফেলেছেও সম্ভবত। তাই ডাকার সাথে সাথে মুঈনের কাছে ছুটে আসে।
ওর তুলতুলে শরীরটাকে একহাতে আগলে নিয়ে মুঈন বেডসাইড টেবিলে তাকালো, পিকপিক আওয়াজ করে ফোনটা মুঈনের মনোযোগ কেড়ে নেয় । ইনশিরাহর শ্যামা মুখটার দিকে তার নিকষ কালো বাদামি চোখের দৃষ্টি স্থির রেখেই ফোনটা রিসিভ করে মুঈন নম্রস্বরে বলে,“আসসালামু আলাইকুম মা।”
ফোনের ওপাশে আলো সালামের জবাব দিয়ে অস্থির হয়ে বললো,“বিরক্ত করলাম না তো? আসলে গতকাল অত রাতে ফোন করে তোমাদের বিরক্ত করতে চাইনি,তাই সকালের অপেক্ষা করে সকাল সকাল ফোন দিলাম। ও কই? ও কেমন আছে? জ্বর কি উঠেছিল আর?”
মুঈন শাশুড়িকে শান্ত করার চেষ্টায়, নিচুগলায় বলতে লাগলো,“জ্বর আসেনি মা। ও ঘুমাচ্ছে, চিন্তার কিছু নেই। অসুবিধা দেখলে আমিই আপনাদের জানাবো। বাবাকে বলুন দুশ্চিন্তা না করতে।”
আলো আশ্বস্ত হয়ে কল কাটলো, শাশুড়ি মাকে চিন্তামুক্ত করে মুঈনও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো,তবে পর পর তার ফোনে কল আসে ইনশিরাহর চাচাদের, ইহানের, ইনায়ার,শেহার।
একে একে সবাইকে আশ্বস্ত করে ঘুমন্ত ইনশিরাহর মুখের দিকে তাকিয়ে মুঈন একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বিড়বিড়ালো,“সবার আদরের দুলালীকে বিয়ে করে মহা মুশকিলে পরা গেলো!”
বলে নিজেই হাসলো। এরপর মিঠিকে কোল থেকে নামিয়ে দেয়। আজ মুঈন মর্নিং ওয়াকে যাবে না বলে ঠিক করলো, কিছুক্ষণ কটেজে থেকে ডিউটিতে যাবে।
কিছু মুহুর্ত চুপ করে বসে থেকে মুঈন এবার হাত বাড়িয়ে নিসংকোচে ইনশিরাহর কপাল ছুঁয়ে তাপমাত্রা দেখলো। গাঁয়ে জ্বর নেই,তবে খুব কাহিল লাগছে মুখখানি। সেদিন বৃষ্টিতে ভেজায় জ্বর পেয়ে বসেছিলো ইয়াসার মির্জার শক্তপোক্ত কন্যাকে, তাদের রিসেপশন, প্রিতম ইনায়ার রিসেপশন একশো দুই জ্বর নিয়ে পার করে আজ তিনদিনের দিন এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মিললো তার।
এর মাঝে মুঈনের তরফ থেকে রিসেপশনের দিনে মুঈনের শাশুড়ির এসে থাকতে হয়েছে ইনশিরাহর কাছে, জ্বর নিয়ে ইরফানকেও বিদায় জানাতে পারেনি। অ্যান্টিবায়োটিক চলেছে। গতকাল রাতে হুঁশ করে জ্বরটা নাই হয়ে গেলো।
মিঠি লেজ নাড়ছিলো ইনশিরাহর পাশে চুপচাপ বসে থেকে, মুঈন উঠে ঘরের সমস্ত পর্দা সরিয়ে ঘর আলোকিত করে দিতেই ইনশিরাহ কপাল কুঁচকে ফেললো,মিঠা রোদটুকুও কেমন চোখে লাগলো তার।
ধীরে ধীরে চোখ মেলে আশেপাশে তাকিয়ে উঠে বসলো। টের পেলো মাথাটা আজ যথেষ্ট হালকা লাগছে।
মুঈন শরীর থেকে তার জ্যাকেট টা খুলে রাখতে রাখতে বলল,“গুড মর্নিং!”
_গুড মর্নিং!
ইনশিরাহ জবাব দিয়ে উঠে দাঁড়ালো, জ্বর নেই দেখে দু'বার সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করলো মনে মনে। তবে নিজের দিকে ইনশিরাহ তাকাতে পারলো না। ভীষণ নোংরা লাগছিল নিজেকে, মনে হচ্ছে অসুখ বিসুখ তার পোশাকে ঢুকে পরেছে। এগুলো বদলে ফেলা অতীব জরুরি, তারচে' বড় কথা একটা লম্বা শাওয়ার নেওয়া ইনশিরাহর জন্য অপরিহার্য হয়ে পরেছে।
গোসল শেষে ইনশিরাহ টের পেলো শরীরটা অস্বাভাবিক ফুরফুরে লাগছে। একটা সাদা রঙের নরম তোয়ালে মাথায় পেঁচিয়ে ইনশিরাহ নিজেকে কিছুক্ষণ দেখলো ওয়াশরুম-মিররে, তিনদিনের হাড়কাঁপানো জ্বরে তার গলার বিউটিবোন গুলো বেশ সাহসী হয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে। টিশার্ট পেছন থেকে টেনে ধরে দেখলো আগের থেকে রোগা হয়েছে কিনা।
ইনশিরাহর একটা বদ অভ্যাস আছে, গোসল সেরে সবসময় ভেজা জামাকাপড় বালতি ভরে রেখে দেবে, ভেজা জামা পাল্টালেই বড্ড অলসতা চেপে বসে শরীরে,এসব তখন মাম্মা অথবা মেজোমা ধুয়ে দিতো।
এখানে এসেও এমন করে ইনশিরাহ,বুয়া এসে ধুয়েছে এ'কদিন, ইনশিরাহ বোঝে এই ব্যাপারগুলো খুব বাজে,তবুও অভ্যেস টা বদলাতে পারেনা।
আজও মনভুলো হয়ে ভেজা জামাকাপড় বালতিতে রেখে হনহন করে বেরিয়ে এলো আলালের ঘরের দুলালী।
মুঈন তখন কিচেনে ছিলো, ইনশিরাহ মুঈনকে অত সকালে কিচেনে দেখে ভীষণ অবাক, একটা কিচেন এপ্রোন গায়ে মুঈনের। তাকে দেখে আন্তর্জাতিক মানের কোনো শেফের মতো লাগছে। ইনশিরাহ দুকদম এগিয়ে গিয়ে বললো,“এখানে কি করছেন?”
মুঈন চপিং বোর্ডে দ্রুত হাত চালিয়ে বললো,“ব্রেকফাস্ট রেডি করছি।”
_বুয়া?
_ঝুমঝুমি,ওনার মেয়ে অসুস্থ। ছুটি দিয়েছি আজ।
ইনশিরাহ কিছুক্ষণ সংকোচ নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে মুঈনের কাছে এগিয়ে গেলো, জ্বরের ঘোরে কখনো কখনো খেয়াল করেছে সে,আজ তিনদিন এই লোকটাকে বিরক্ত করেছে ইনশিরাহ, ইনশিরাহ এই এতো ভাবে কারো বোঝা হতে ইচ্ছুক নয়। সে ক্ষীণস্বরে বললো,“আমি না রাঁধতে জানিনা।”
_দুপুরে লাঞ্চ অর্ডার করে দেবো। এখন আপাতত চিলি বেবিকর্ন করছি, সাদা ভাত দিয়ে দু'জন চালিয়ে দেবো। জ্বর থেকে উঠেছো,ভালো লাগবে।
ইনশিরাহ এগিয়ে যায় মুঈনের কাছে,ধিমি আওয়াজে বলে,“আমাকে দিন,আমি কেটে দিচ্ছি।”
মুঈন হাতের গতি থামিয়ে দিয়ে ইনশিরাহকে একপলক দেখলো, তারপর হাতের ছুড়ি টা ইনশিরাহকে দিয়ে রাইসকুকারের কাছে গিয়ে ভাত দেখলো,জল ফুটেছে কিনা।
ইনশিরাহ আসলে লজ্জায় পরে ছুড়িটা নিয়েছে, একজন লোক সব সামলাবে আর সে অপদার্থের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে সেটা যথেষ্ট লজ্জার ব্যাপার!
কিন্তু সে তো সবজি, পেঁয়াজ কিছুই কাটতে জানে না, লোকজন হাসবে শুনলে, তবে ইনশিরাহ কখনও এসবে ইন্টারেস্ট খুজে পায়নি, শেখেওনি।
নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে ইনশিরাহ ছুড়ি চালায় পেঁয়াজের ওপর, কয়েকসেকেন্ডের ব্যাবধানে চোখ ছাপিয়ে জল আসে, ইনশিরাহ কাঁদতে কাঁদতে আড়াইশো গ্রামের বড় পেয়াজটাকে কোনো মতে চার ফালি করে, ক্যাপসিকামের স্লাইস না করে ভোঁতা বানিয়ে থেঁতলে দেয় ক্যাপসিকাম । মুঈন এসব চুপচাপ দেখছিলো দাঁড়িয়ে, বেবিকর্ন গুলোতে ইনশিরাহ তার জাদুর হাত লাগিয়ে বাচ্চা কর্ন গুলোর সর্বনাশ করতেই যাবে তখনই মুঈন এগিয়ে আসে তার দিকে। এসে ঠিক ইনশিরাহর পেছনে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ায়, ইনশিরাহ হাতের কাজ থামিয়ে চুপ হয়ে যায় মুঈনের এমন আগমনে, সে কেমন জড়োসড়ো হয়, গুটিয়ে যেতে চায়। মুঈন ফরাজী ইনশিরাহর হাত থেকে ছুড়ি নিয়ে নিলো না,বললো না,“তোমার এসব করতে হবে না।”
উল্টো পেছন থেকে ইনশিরাহর ছুড়ি ধরে রাখা ডান হাতটাকে মুঈন কায়দা করে ধরলো তার শক্ত, বলিষ্ঠ হাতে। ইনশিরাহ চ'ম'কে উঠে একদৃষ্টে দেখতে থাকে নিজের হাত। ইনশিরাহর বাম হাত টাকেও মুঈন সুকৌশলে ধরলো। ইনশিরাহর ঘাড়ের কাছে লোকটার উষ্ণ শ্বাস টেরো পেলো সে, চপিং বোর্ডে একটা বেবিকর্ন রেখে ইনশিরাহর হাত দিয়ে মুঈন ছুড়ি চালাতে চালাতে হাস্কি তবুও ধিমি আওয়াজে বললো,“এভাবে কাটে। দু'টো হাতের ব্যালেন্স রাখতে হয়, খুব ইইজি দেখো! তোমার বা হাত কাঁপে কেন! আই মিন এটা তো ডেডবডি নয়!”
বলতে বলতে হাসলো মুঈন, কিছু মুহূর্ত হেসে নম্রস্বরে বললো,“রিল্যাক্স! এগুলো আমাদের রিজিক, এই সবজিগুলোর প্রতি তুমি কোনো অন্যায় করছো না জনদরদি বাপের প্রানী আর সবজি দরদি কন্যা। আরামসে কাটো। কাঁপা কাঁপির কিছু নেই।”
ইনশিরাহ জানেনা তার কাপাকাপির কারণ,সে আবিষ্কার করলো তার পাতলা ফিনফিনে শরীর,তার পিঠ ঐ লোকটার চওড়া বুকের মাঝে মিশে গিয়েছে। ম্যান পারফিউমের কড়া ঘ্রান যেনো তার গায়ে লেগে যাচ্ছে। ইনশিরাহ বুঝতে পারছে না,লোকটা কি সুকৌশলে তাকে ছুঁলো? না ছোঁয়ার ভান করে ছুঁলো?
মুঈন সবকটা কর্ন কেটে কেটে শেখালো ইনশিরাহকে, যেন ছোটো বাচ্চাদের হাতে খড়ি দিচ্ছে। দৃশ্যটা এমন ছিল কিছুটা।
ইনশিরাহ অস্থির হয়ে উঠলো দূরে সরে দাঁড়ানোর জন্য, তার অস্থিরতা যেন টের পেলো মুঈন। হঠাৎ মুঈন তাকে ছেড়ে দিয়ে রাইসকুকার অফ করে দিতে যায়। ভাত হয়ে গিয়েছে। এখন চিলি বেবিকর্ন রাঁধবে। ইনশিরাহ নড়লো না, চুপচাপ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো, তার হাত পা তখনও কাঁপছে, এতো কেনো কাঁপছে সে বুঝতে পারছে না, সে যেনো বোবাও হলো, কিছু বলতেও পারছে না।
চুলা থেকে বেবিকর্ন নামিয়ে মুঈন গা থেকে কিচেন এপ্রোন খুলে হাত ধুয়ে রুমে চলে যায়। ততক্ষণে ইনশিরাহ ধাতস্থ হয়ে মিঠিকে খাবার দেয়। হঠাৎ মনে পরে ওয়াশরুমে তার পোশাক বালতি ভরে রেখে এসেছিলো। ত্রস্ত পায়ে হেঁটে ইনশিরাহ রুমে গিয়ে, ওয়াশরুমে ঢুকে দেখলো বালতি ফাকা। তার জামাকাপড় নেই। সে অবাক হয়ে বেড়িয়ে এসে পশ্চিমের বারান্দায় উঁকি দিলো। মুঈন শাওয়ার নিয়ে বারান্দায় গিয়েছে ভেজা জামাকাপড় রোদে মেলে দিতে, ভীষণ রকম অবাক হলো ইনশিরাহ যখন দেখলো মুঈন তার পোশাকও পানি নিংড়ে রোদে মেলে দিচ্ছে।
একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ইনশিরাহ। লোকটা কি পাগল! যদি ইনশিরাহর অন্তর্বাস থাকতো পোশাকের সাথে তখন ! ভাগ্যিস ছিলো না! এটা কেন করছে লোকটা! এতো স্বাভাবিক হয়ে কিভাবে করছে!
চেয়ে রইল চুপচাপ ইনশিরাহ,তখন মনে পরলো পাপাও মাম্মার পোশাক এভাবে ধুয়ে দেয় প্রায়শই,মাম্মা অসুস্থ থাকে, কোমরে ব্যাথা থাকে মাম্মার। কিন্তু তারা তো মাম্মা পাপা নয়। তারা তো মুঈন-ইনশিরাহ, যাদের মধ্যে ভালোবাসা এখনও হয়নি। মুঈন এতোটা স্বাভাবিক কিভাবে তবে!
মুঈন জামাকাপড় গুলোতে ক্লিপ লাগিয়ে বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকতেই ইনশিরাহর মুখোমুখি হলো। এতক্ষণ ইনশিরাহ খেয়াল করেনি,তবে এখন চোখ পরলো মুঈনের উদোম শরীরটাতে। একটা গ্রে কালারের ট্রাউজার পরে আছে শুধু। চওড়া লোমশ বুকটাতে বিন্দু বিন্দু জলের ফোঁটা চিকচিক করছে, মাথার চুল গুলো তোয়ালে দিয়ে মুছে নিতে নিতে মুঈন ঘরে ঢুকে ইনশিরাহর মুখোমুখি হতেই তোয়ালে কাঁধে ঘুরিয়ে রেখে শরীর ঢেকে নেয়, সে বুঝতে পারলো ইনশিরাহ অপ্রস্তুত হয়েছে তাকে এভাবে দেখে।
ইনশিরাহ দৃষ্টি ঘুরিয়ে বারান্দায় রোদে মেলে দেওয়া তার পোশাক গুলো দেখছিলো।
মুঈন কাবার্ড থেকে একটা পলো টি-শার্ট বের করে গাঁয়ে চাপিয়ে নিতে নিতে খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,“জ্বর থেকে উঠেছো,খুব বেশি পানি ছানাছানি করার প্রয়োজন নেই , জামাকাপড় যা ধুতে হবে বুয়া এসে ধুয়ে দেবে, নয়তো লন্ড্রিতে পাঠিয়ে দেয়া হবে, ওয়াশিং মেশিনটা কিছুদিন আগে নষ্ট হয়েছে, নেক্সট মান্থে নতুন নিয়ে দেবো।”
ইনশিরাহ কিছু বলছে না,ঘুরে দাঁড়িয়ে মুঈনকে দেখে শুধু। হঠাৎ কেমন আনমনা হয়ে বলে ওঠে,“আমি কি আপনার কোনো হেল্প করবো?”
মুঈন হাত ঘড়িটা পরতে পরতে ইনশিরাহর দিকে তাকায়। দু'জনে দু'জনের দিকে তাকিয়ে আছে অনিমেষে। ইনশিরাহর চোখে তখনও প্রশ্নবোধক দৃষ্টি।
মুঈন হঠাৎ অস্পষ্ট হাসলো, হেসে সরাসরি ইনশিরাহর চোখে চোখ রেখে বললো,“কেন?”
_আপনি করেছেন।
মুঈন এবার চওড়া হেসে ইনশিরাহর কাছে এগিয়ে আসলো, ইনশিরাহর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে,“আমি তো আমার সেবার বিনিময়ে কারো থেকে সেবা চাইনা। আমাকে যাই দেওয়া হোক,সেটা কোনো কিছুর বিনিময়ে দেওয়া না হোক। তার পেছনে একজনের বাসনা থাকুক, ভীষণ রকমের ছটফটানি থাকুক। যেন আমাকে সেবা না দিতে পারলে তার বুকে চিনচিনে ব্যথা হয়, তার দিন ভালো না যায়, এমন অস্থিরতা থাকুক তার। এটা বিয়ে ইনশিরাহ,শোধবোধ খেলা নয়।”
ইনশিরাহ চোখ তুলে তাকায়, বিমূঢ় হয়ে চেয়ে রয় মুঈনের চোখে। মুঈনের ঠোঁটে লেপ্টে আছে অমায়িক হাসি। সে স্পষ্ট দেখছে তার কথার বাণে ইনশিরাহ কেমন ভড়কে গেলো। সুদর্শন,শ্যামবর্ণের মুখটা হঠাৎ মৃদু হেসে উঠে বললো,“চলো খেয়ে নিই। আমি বেরোবো।”
ব্রেকফাস্ট সেরে মুঈন ঘরে ঢুকে ইউনিফর্ম পরে নেয়। ইনশিরাহও তার পেছন পেছন ঘরে ঢুকে তাকে দেখছে, ল্যাম্পোস্টের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া তার যেন আর কোন কাজ নেই।
মুঈন আয়নায় তাকিয়ে ইউনিফর্মের বোতাম গুলো লাগিয়ে নিতে নিতে জিজ্ঞেস করে,“কিছু কি বলবে?”
ইনশিরাহ নড়েচড়ে দাঁড়ায়,মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,“আমি শোধবোধ করতে চাইনি। আপনি যেভাবে বললেন অমন ছটফটানি নেই,বাসনাও নেই তবে আমি অবশ্যই পার্টনার হিসেবে আমার দায়িত্ব গুলো পালন করতে ইচ্ছুক। বিয়ে যে শোধবোধ খেলা নয় তা আমিও জানি।”
মুঈন চোখ বড় বড় করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,“ওয়েট! তুমি এসব কথা এখনও ভোলোনি!”
ইনশিরাহ মাথা ঝাঁকায়। সে ভোলেনি।
মুঈন হেসে বললো,“হেল্প করতে চাচ্ছো?”
আবারও মাথা ঝাঁকায় ইনশিরাহ। মুঈনের হঠাৎ খুব হাসি পাচ্ছে, এ কেমন অদ্ভুত,একরোখা,খেয়ালি মেয়ের সাথে পালা পরলো তার। ইনশিরাহর ইনোসেন্ট ফেসের দিকে তাকিয়ে মুঈনের মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চেপে বসলো, মেয়েটিকে একটু জ্বালাতে ইচ্ছে হলো তার,বললো,“না পারবে না তুমি! বাদ দাও! সব কাজ তো সবার জন্য নয়। বলেছো এটাই অনেক!”
“সব কাজ তো সবার জন্য না” কথাটা যেন খুব আত্মসম্মানে লাগলো ইনশিরাহর, ঠান্ডা গলায় জিদ দেখিয়ে বললো,“আপনি বলুন।”
মুঈন তার বৌয়ের বাচ্চামি গুলো খুব উপভোগ করছিল, বললো,“কাবার্ডে আমার লাল শার্ট টা দেখতে পাবে। ওটার দু'টো বোতাম নেই, বোতাম দু'টো লাগিয়ে দিতে পারবে?”
ইনশিরাহ বোকা বোকা মুখ করে মুঈনের দিকে তাকিয়ে আছে। মুঈন বাঁকা হেঁসে বললো,“পারবে না জানতাম! বাদ দাও!”
ইনশিরাহ কপাল কুঁচকে কাবার্ডের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে গম্ভীর হয়ে বলে,“না পারার কি আছে?”
শব্দ করে কাবার্ড খুলে হাতাহাতি করতে লাগলো, খুঁজতে লাগলো লাল শার্ট। মুঈন দুষ্টের মতন হেসে এগিয়ে যায় ইনশিরাহর কাছে। গিয়ে পেছনে দাঁড়ায়। ইনশিরাহ বলে,“কোথায় শার্টটা! কোথায়!”
মুঈন আরেকদফা নিশ্চুপ হেঁসে নিয়ে গম্ভীর হয়ে বলে,“আরে ইঁদুর সাবধান!”
দুই সেকেন্ডের মধ্যে ইনশিরাহ চেঁ'চি'য়ে উঠে ঘুরে ঝাঁপিয়ে পরে মুঈনের গায়ে। মুঈনের ঠোঁটে বিশ্বজয়ের হাসি, ঠোঁট টিপে হাসতেই থাকে। ইনশিরাহ হঠাৎ নিজেকে সামলে নিয়ে অপ্রস্তুতের মতন বলে,“লাল শার্ট তো নেই, মিথ্যা বললেন!.”
মুঈন বৌয়ের থমথমে মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে কাবার্ডের দরজা লাগিয়ে দিতে দিতে বললো,“ইদুরও নেই। রিল্যাক্স!”
ইনশিরাহ চোখ বড় বড় করে মুঈনের দিকে হতভম্ব হয়ে তাকালো, মুঈন বাঁকা হেসে বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলল,“আসছি। যেকোনো কারণে মেসেজ করবে। বাই।”
মুঈন বেরিয়ে যাওয়ার পরেও ইনশিরাহ কাবার্ডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ।
______
ঘরময় পায়চারী করছিলো সামিন। আজ সে অফিসে যায়নি। ইলহাম একাই গিয়েছে। ইহান বেরিয়েছে, ইশমাম তার ভার্সিটিতে,পরী চেম্বারে। গোটা বাড়িটাতে এখন মোট তারা চারটি লোক মাত্র। সামিন,আলো,রিতু, শেহা।
আজান আয়াত সপরিবারে আতাউর আলমের দেশের বাড়িতে গিয়েছে কটাদিন থাকবে বলে, এরপর আবার ফিরে যাবে কানাডা।
আলো শেহার চুলে ওয়েল মাসাজ দিতে দিতে ইনশিরাহর সাথে ভিডিও কলে কথা বলছিলো। ইনশিরাহর সময় কাটছে না তাই ক্যামেরা নিয়ে বেরোবে ঠিক করেছে।
আলো গম্ভীর হয়ে বললো,“যেখানেই যাও মুঈনকে বলে যাও।”
ফোন কাটার সাথে সাথে সেখানে সামিন এলো, আলোর পাশে বসে বলতে লাগলো,“দিনে ক'বার মেয়েকে কল করো?”
_আপনার থেকে কমই করি।
সামিন হাসলো,বললো,“আমি তো মেয়ের খবর নিতে কল করি,তুমিতো কল করে ধ'মকা ধ'মকি করো।”
শেহা চুপচাপ বসে আছে। সামিন ভাগ্নির দিকে চেয়ে বলল,“বিকেলেই চলে যাবি মা?”
_মামা,আমার পড়াশোনা আছে না?
সোফায় গা এলিয়ে দেয় পুরোপুরি সামিন, বাড়িটা কিভাবে খালি হয়ে গিয়েছে পুরো! আলো স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে,“মেয়েরা বিদায় নিয়েছে, এখন নতুন মেয়ে আনতেই হয় বাড়িতে, ইহানের জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। ওর বাবা মায়ের শীত গরম দেখেন কোনো? আপনিও হাত পা ছেড়ে বসে থাকেন।”
রিতু চার কাপ চা বানিয়ে এনে আলোর মুখোমুখি বসলো,বললো,“আমার শীত গরম নেই? কেমন কথা বললে তুমি? ছেলের মতি গতিই তো বোঝা দায় । এতো এতো মেয়ে ওকে পছন্দ করে,ও কি তাদেরও চোখে দেখে না? ইনশিরাহর বান্ধবীগুলোর মধ্যে থেকে শুনেছি অনেকেই ইহানকে পছন্দ করে,মেয়েগুলো সুন্দরী.....”
_সুন্দরী!
আলো রিতুকে থামিয়ে দিয়ে বললো। পর পর বললো,“ওরা ইহানের টাইপের নয় রিতু!”
_এই এক কথা শুনতে শুনতে কান পচে গেলো আমার। ওর টাইপ টা কি বলবে? যে মেয়েই আনি না কেন রিজেক্ট করে দেয়, ব্রিগেডিয়ার আজিজের মেয়েটা,কি সুন্দরী একটা মেয়ে তাকেও! কত ভালো মানাতো দু'জনকে!
সামিন রিতুর এই কথাটার জবাব দিয়ে বললো,“আমাদের চোখে ইহানকে কার সাথে মানাবে সেটা নয়, দেখতে হবে ইহান কার সাথে ভালো থাকবে রিতু!”
সামিনের ফোনে হৌপ থেকে কল আসে, আজ ইরফানের কল করার কথা ছিল,তবে সন্ধ্যার পরে। এই সকাল সকাল ইরফানের কল পেয়ে সবাই অবাক। কলটা রিসিভ করে সামিন ছেলেকে দেখে বললো,“আজ নতুন সেশন ছিলো না?”
_প্রফেসর আসেননি। ভাবলাম এখন কল করি।
রিতু চুপচাপ ছেলের কথা শুনছে । কথাবার্তায় নমনীয়তা টের পায় সে, কিন্তু এই সংযম কতক্ষন থাকে? মেজাজ বিগড়ালেই তো সব শেষ!
সামিন হেসে,কন্ঠে ভীষণ আন্তরিকতা মিশিয়ে বলে,“ফাকি দাওনি দেখে ভালো লাগছে!”
ইরফান ম্লান হাসে,জবাবে কিছু বলে না। সামিন বলতে লাগলো,“আমরা, আমাদের এই শান্তিনীড়ের লোকগুলো একজন আরেকজনের থেকে সম্পুর্ন আলাদা তাইনা? কারো স্বভাবের সাথে কারো স্বভাবের মিল নেই, তবে একটা মিল আছে, আমরা ভীষণ পরিবারকেন্দ্রিক! পরিবারকে ভীষণ ভালোবাসি। তুমিও এর ব্যাতিক্রম নও জানি, আমরা সবাই ভীষণ অপেক্ষা করছি তোমার জন্য, পরিশ্রম করো, নিজেকে আর ফাঁকি দিও না ইরফান!”
_______
আকাশি রঙের সুতি শাড়ি,জমিনে সাদা সুতোর কাজ, আজকের জন্য এই শাড়িটা বেছে নিলো সে। শাড়িটা ইনায়া কিনে দিয়েছে গতকাল। ভীষণ পছন্দ হয়েছে প্রেরণার ভাইয়ের বৌয়ের দেয়া এই উপহার টা। মেয়েটা প্রেরণার রুচি সম্পর্কে ধারণা পেয়েছে।
শুদ্ধর স্কুল নেই আজ, কম্পিউটারে গেমস খেলছে সে। প্রনমিকে নিয়ে মিস জেনি সকাল সকাল বেরিয়েছে,আজ একাডেমীতে প্রতিযোগিতা আছে।
প্রেরণা তাড়াহুড়ো করে শাড়িটা পরে,ভেজা চুলে একটা তোয়ালে পেঁচিয়ে সদর দরজার কাছে যায় কলিং বেলের আওয়াজ পেয়ে, দরজা খুলতেই প্রেরণা দ্রুত হাতে আঁচল টেনে ডান কাঁধে তুলে সালাম দিলো।
ইহান সালামের জবাব দিলো। একটা কালো শার্ট পরেছে লোকটা আজ,আজ মোটেও কোন নেতা লাগছে না। ইহানের হাতে একটা মোটামুটি সাইজের বাক্স, প্রেরণার ফ্ল্যাটে ঢুকতেই প্রেরণা তাকে বসতে বলে আশেপাশে তাকাচ্ছে। লোকটা এমন সময়ে এলো যখন ইনায়া প্রিতমের রুমের দরজা বন্ধ। এই সময়ে ওদের কিভাবে ডাকবে প্রেরণা বুঝতে পারছে না।
ইহান প্রেরণাকে একপলক দেখে একটা সোফাতে বসতে বসতে বললো,“মাম্মা ইনুর পছন্দের চিপস বানিয়েছিলো, শুদ্ধ আর ইনায়ার জন্য পাঠিয়েছে। সেটা দিতে এলাম!”
প্রেরণা অল্প হেসে বললো,“আপনি বসুন। আমি চা নিয়ে আসছি!”
_আপনি বাড়িতে কেন? রেস্তোরাঁয় যাননি?
_আজ অফিসে বসবো।
ইহান আশেপাশে তাকায়। প্রেরণা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে নিজের ফোনটা হাতে তুলে নেয় প্রিতমকে কল করতে, কিন্তু কল না করে ফোনটা আবারও রেখে দেয়। ইহান ইনায়ার কথা জিজ্ঞেস না করে বললো,“শুদ্ধ কোথায়?”
প্রেরণা উঁচু গলায় শুদ্ধকে ডাকলো, গুটিগুটি পায়ে শুদ্ধ বেরিয়ে এসে খুশি হয়ে গেলো ইহানকে দেখে। দু'জনে একইসাথে বলে উঠলো,“হাই!”
বলেই হেসে ফেলে দুজন। শুদ্ধ জানতো আবারও এমন ম্যাজিক হবে।
প্রেরণা ওদের হাসতে দেখে ইহানকে বললো,“আপনাদের আমি বেশ কয়েকবার এভাবে অকারণে হাসতে দেখেছি। এর কারণ কি?”
ইহান শুদ্ধর দিকে তাকিয়ে প্রেরণাকে বললো,“এটা শুদ্ধ আর আমার সিক্রেট,আপনাকে বলা যাবে না।”
প্রেরণা হেসে চা এনে দেয় ইহানকে,ইহান শুদ্ধকে টেনে কোলে বসিয়ে বলল,“বাচ্চা! কি করছিলে?”
_গেমস খেলছিলাম কম্পিউটারে।
_তোমার মামী মনি কোথায় বাচ্চা?
প্রেরণা অপ্রস্তুত হয়ে বললো,“ওরা আছে ঘরেই। আমি ডেকে দিচ্ছি।”
ইহান শুদ্ধর দিকে তাকিয়ে বললো,“তোমার মামী মনিও একটা বাচ্চা, এতো কম্পিউটারে গেমস না খেলে ওর সাথে খেলবে।”
শুদ্ধ শুকনো মুখে বললো,“মামী মনি আমার সাথে খেলে না!”
_কেন! শুদ্ধ বাবুর সাথে খেলে না? ওকে বকে দেবো!
ইহানের লাই পেয়ে শুদ্ধ বলতে শুরু করে নালিশের ভঙ্গিতে,“মামা মামী মনিকে খেলতে দেয়না আমার সাথে, দরজা বন্ধ করে মামী মনিকে আটকে রাখে মামা।”
এতটুকু বাচ্চার মস্তিস্কে ব্যাপারগুলো এভাবেই আটকে যায়। যেমনটা শুদ্ধর সাথে হলো। ইহান প্রেরণা দু'জনেই ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পরলো। প্রেরণার ইচ্ছে করছিলো মাটি ফুঁড়ে চলে যেতে, ইহান দৃষ্টি নত করে নিলো সাথে সাথে,প্রেরণা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থমথমে মুখে বললো,“রুমে গিয়ে হোমওয়ার্ক করো শুদ্ধ! গো!”
চলমান.....