#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৬৪
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
শুদ্ধ বুঝতে পারলো না তার মাম্মা এভাবে তাকে ধমকালো কেনো। তার মুখটা চুপসে গিয়ে একটুখানি হয়েছে। গুটিগুটি পায়ে সে চলে যায় ঘরে। প্রেরণা তখন ইহানের দিকে ঘুরে বললো,“আমি ওদের ডাকছি।”
বলেই ফোনটা হাতে নিলো, ইহান বললো,“না আমি আজ আসছি। আমার কাজ আছে।”
প্রিতমদের ডাকতে হলো না। ধুপধাপ আওয়াজ তুলে দরজা খুলে ইনায়াই কাঁদতে কাঁদতে বেরোলো। আশেপাশে তাকালো না মেয়েটা, বেরিয়ে সোজা দৌড়ে গেলো পশ্চিমের খোলা বারান্দায়। দেখলোও না ইহানকে।
এমন কাণ্ডে প্রেরণা ইহান দু'জনেই ভীষণ হতবাক। ইহান সাথে সাথে উঠে দাঁড়ায়। কয়েক সেকেন্ড পর অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে ঘর থেকে বেরোয় প্রিতম। তার পুরো বিধ্বস্ত অবস্থা,চুল উসকোখুসকো।
প্রেরণা হা করে ভাইকে দেখছিলো, লিভিং রুমে পা রেখে ইহান মির্জাকে দেখে প্রিতম আরো অপ্রস্তুত হয়ে পরেছে, সালাম দিলো তৎক্ষণাৎ। প্রেরণা তাড়াহুড়ো করে বললো ,“ও কাঁদছে কেন!”
_একটু ধমকেছি।
বিড়বিড় করে বলে প্রিতম।
_ধমকেছি মানে! কেন ধমকেছিস!
আশ্চর্য প্রেরণা।
প্রিতম ইহানের দিকে লজ্জিত ভঙ্গিতে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে বলতে লাগলো,“দুটো থিসিস মুখস্থ করতে দিয়েছিলাম পরশু রাতে। আজ সকালে পড়া ধরলাম, তখন বললো সে বোঝেনি, ভালোকথা! বুঝিয়ে দিলাম। এগারো বার বুঝিয়ে দিলাম, তারপর বললাম পুরোটা না পারলেও টপিক আর সূত্রটা লিখে দিতে। সে নোটবুকে সূত্র না লিখে নকশা আঁকে।”
ইহান আর প্রেরণা উভয়ই বোকার মতো তাকিয়ে আছে। প্রেরণা ভাইয়ের ওপর মেজাজ দেখাবে নাকি হাসবে বুঝতে পারছে না। শুধু বললো,“এমন কি ধমকেছিস যে এভাবে কাঁদবে! আর তুই যেটা পারিস না সেটা করতে যাস কেন? ও তোর কাছে পড়বে? ও কোচিংয়ে যায়। আর তুই,এগারোবার বুঝিয়েছিস এটা বলে কি প্রমাণ করতে চাইলি, ও বুঝতে অক্ষম? হতে পারে তোর বোঝানোর ধরণ ঠিক ছিল না, মেধাবীদের এই এক সমস্যা,অন্যদের ছোটো করে।”
প্রিতম দেখলো তার আপু ব্যাপারটাকে আরও টানছে। সে হতাশ। ইহান বলে উঠলো প্রেরণাকে,“বাদ দিন। প্রিতম ইনুকে অক্ষম বা কম মেধাবী বলতে বা বোঝাতে চায়নি। ও বোঝাতে চেয়েছে ইনু অমনোযোগী হয়েছে। আপনি গিয়ে ইনুকে নিয়ে আসুন।”
প্রেরণা গিয়ে দেখলো ইনু তখনও কাঁদছে। গিয়ে পেছন থেকে ধরে বললো,“একটু বকেছে, পড়াশোনার জন্য। তাতে এভাবে কান্নার কিছু হয়নি। চলো।”
_বকেছে? আপনার ঐ মিনমিনে শয়তান ভাই বলেছে বকেছে? আপনার ভাই আমার মাথায় গাট্টা মেরেছে আপু!
প্রেরণা হা করে তাকিয়ে আছে,অস্ফুটে বললো,“গাট্টা মেরেছে! কি ফাজিল!”
নাক টানে ইনায়া,বলে,“ও সবসময় ওর জেদ বজায় রাখে আপু, এই যে আমাকে ঘাড় ধরে রোজ পড়তে বসানো, এটাও ওর জেদ। কারণ পাপার কাছে ওর মুখটা যে ছোট হয়ে যাবে। আমাকে নিয়ে ঘুরতে যায়? কখনো যেতে চায়? অন্যকিছু নিয়ে তো এতো আদিখ্যেতা দেখায় না!”
প্রেরণা ফ্যালফ্যাল করে ইনায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে মিনিট খানেক, তারপর হেসে ফেলে,বেশ শব্দ করে হেসে ফেলে।
ইনায়া চোখ মুছে বলে,“হাসছেন আপনি আপু!”
প্রেরণা কিছুক্ষণ হেসে বলে,“হুহহ! হাসছি। তোমাদের জীবনে কত কিউট কিউট দুঃখ ইনায়া, ইশশ যদি এই কিউট দুঃখ গুলো আমার হতো! ”
ইনায়া আবারও নাক টানে, বলে,“কথা ঘোরাচ্ছেন আপু। অবশ্য আপনি তো ভাইয়ের দোষ ঢাকতে ওস্তাদ, কখনো ভাইকে শাসন করেন না।”
প্রেরণা ইনায়ার অভিমান মাখা কথাগুলো শুনে আরো কিছুক্ষণ হেসে নিল , বললো,“ইহান মির্জা এসেছে, চলো। অপেক্ষা করছে তোমার জন্য। আজ অফিস থেকে জলদি ফিরে খুব শাসন করবো প্রিতমকে! খুব। চলো এখন।”
_______
বিয়ে কোনো শোধ বোধ খেলা না, তা ইনশিরাহ বিনতে সামিন খুব ভালো করে জানে। বিয়ে একটি বাস্তবতা। বিয়ের বিভিন্ন সংজ্ঞা রয়েছে এক একজনের কাছে, পাপার মতানুযায়ী বিয়ে একটা মিরাকল।
মুঈনের সাথে ইনশিরাহর বিবাহিত জীবনের আজ এগারোতম দিন। এই কদিনে রোবটকন্যা ইনশিরাহ মুঈনের সাথে সহজ না হলেও মুঈন আর তার এই সংসারটার সাথে সহজ ঠিকই হয়েছে, উহু, বড্ড বেশিই সহজ হয়েছে। সবখানে অবাধ বিচরণ তার।
সকাল ন'টার কাছাকাছি যখন, ইনশিরাহর আজ এই সময়ে ঘুম ভেঙেছে। অবশ্য ইদানিং এমন হচ্ছে। সে জগিংয়েও যাচ্ছে না। এমনিতেও ইনশিরাহ বিয়ের পর পর খুব বেশি অলস হয়ে গিয়েছে। সারাটাদিন ঘুম পেতেই থাকে তার। এতো ঘুমায় তবুও ঘুম পরিপূর্ন হয়না। এর কারণ ইনশিরাহর অজানা। ইনশিরাহ মনে মনে ভাবে, আগে সে হয়তো ঠান্ডা মরা মাছ ছিল, কিন্তু বর্তমানে সে মরা মাছের ফসিল হয়েছে। এটা ইনশিরাহর সত্যিকারের অনুভূতি নিজেকে নিয়ে।
ঘুম থেকে উঠে মুঈনকে কোথাও পেলো না,মুঈন অফিসে। ইনশিরাহর এক মগ কড়া কফি খাওয়ার জন্য মনটা আঁকুপাঁকু করছে। বুয়া আসেনি তখনও, ইনশিরাহ দেখলো টেবিলে ব্রেকফাস্ট রাখা।
কেবিনেটে কোথাও কফির ক্যানটা খুঁজে না পেয়ে ইনশিরাহ মুঈনকে মেসেজ করলো,“মুঈন কফির ক্যান?”
খানিকবাদে মুঈনের রিপ্লাই এলো,“থার্ড কেবিনেটে। তুমি উঠেছো? খেয়েছো?”
_না খাবো।
জবাব ছিলো এতটুকুই, সে পাল্টা জিজ্ঞেস করলো না মুঈন খেয়ে গিয়েছে কিনা। মুঈনের চোখে লাগে বৌয়ের এমন আচরণ, পরক্ষনেই মানিয়ে নেয়।
আলোর ফোন আসে ইনশিরাহর ফোনে, আজকাল মাম্মার ফোন পেলেই ইনশিরাহ আতঙ্কিত হয়ে পরে। ভদ্রমহিলা ভীষণ জ্বালাতন করে ইনশিরাহকে। সারাক্ষণ মুঈনের জন্য এটা করবে,ওটা করবে, এমন কেন করলে, মুঈনকে জানিয়েছো! হ্যান-ত্যান , মাথা খারাপ করে দেয় পুরো।
ইনশিরাহ কলটা রিসিভ করে হাই তুলতে তুলতে বললো,“গুড মর্নিং! মাম্মা।"
_ঘুমাচ্ছো নাকি!
_হ্যা ঐ আরকি!
_মুঈন অফিসে? তুমি এখন ঘুম থেকে উঠলে, ও কি খেয়ে গিয়েছে!
_খেয়েছে,দেখছি তো টেবিলে ব্রেকফাস্ট!
_দেখছি তো মানে? তুমি জানো না? জানতেও চাওনি?
ইনশিরাহ একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,“মাম্মা,সে অকারণে না খেয়ে কেন থাকবে! শারীরিক মানসিক ভাবে সুস্থ একজন লোক, নিশ্চয়ই খেয়েছে! রোজই তো খায়! এটা জানতে চাওয়ার কি আছে ঘটা করে!”
আলো যেন তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো মেয়ের এমন গা ছাড়া আচরণে, রাগ দেখিয়ে বললো,“এটা জানতে চাইলে তো তোমার খুব কষ্ট হয়ে যাবে না! আমার যেমন কষ্ট হয়না তোমার পাপার খাবার দাবারের খোজ নিতে! তোমার মেজো মায়ের হয়না, তোমার ছোটো মায়ের হয়না। হয়? বলো?”
ইনশিরাহ হাই তুলতে তুলতে বললো,“ক্ষমা চাইছি মাতা! আমি এক্ষুনি জানতে চাইছি!”
কল কেটে ইনশিরাহ মুঈনকে মেসেজ করলো,“মুঈন আপনি খেয়েছেন?”
মেসেজ টা দেখে মুঈন কিছুক্ষণ চেয়ে রইল স্ক্রিণে। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো তার অস্পষ্ট হাসিরেখা। দ্রুত আঙ্গুল চালিয়ে লিখলো,“জি।”
ইনশিরাহ তখন তাদের বার্তালাপের স্ক্রিণশট নিয়ে আলোকে পাঠিয়ে দিয়ে নিচে দুষ্টুমি করে লিখে দেয়,“মাতা দেখুন! আপনার জামাই খেয়েছে! দেখেছেন মাতা! সে খেয়েছে! আপনি খুশি হয়েছেন মাতা? আমি জিজ্ঞেস করেছি আপনার জামাইকে! আপনার জামাই আসলেই খেয়েছে। এই দেখুন প্রমান! আপনি খুশি হয়েছেন? আপনার হৃদয় প্রশান্ত হয়েছে মাতা? আপনার আদরের জামাই খেয়েছে মাতা!”
পরপর মেসেজ দিতেই থাকে ইনশিরাহ আলোকে।
আলো মেয়ের আচরণে বিরক্ত হয়ে ফোন অফ করে বসে থাকে চুপচাপ।
মাম্মা যে তার আচরণে ক্ষেপে গিয়ে অফলাইনে গিয়েছে তা ইনশিরাহ জানে। ইনশিরাহ হাসতে হাসতে বিছানায় গড়িয়ে পরে একা একা। ইদানিং গরম পরছে খুব। দুপুর বেলাতে ইনশিরাহর ঝিমুনির মতন এসে যায়, দুপুরে ঘুমিয়ে যায় সে।
ভ্যাক্যুম ক্লিনারের বিকট আওয়াজে ইনশিরাহর তন্দ্রা ভাব কাটে। ঝুমঝুমির মা ঘর পরিষ্কার করছিলো। ইনশিরাহ উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে তাকে ডাকতে ডাকতে তার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললো,“বুয়া। কিছু জামাকাপড় ধুতে হবে, লন্ড্রিতে নিয়ে যেও।”
ঝুমঝুমির মা ইনশিরাহকে সমীহ করে যদিও,তবে তার স্যারের পাশে এই ম্যাডামকে তার পছন্দ হয়নি। এতো ভালো মানুষ ফরাজী স্যার,অথচ এই ম্যাডাম স্যারের প্রতি কত উদাসীন। যেটুকু সময় ঝুমঝুমির মা এই কটেজে থাকে এসব তার চোখে পরে। স্বামী সারাদিন কাজ শেষে বাড়িতে আসলে তাকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়েও সাধে না ম্যাডাম,খাবার খেতে গেলে স্যারের কি লাগবে না লাগবে তাও খোজ নেয়না। আর পোশাকের ছিড়ি দেখেও ঝুমঝুমির মায়ের বিরক্ত ধরেছে ম্যাডামের ওপর। রূপ ছাড়া এই মেয়ের কোনো গুণই নেই স্বামীর সংসার করার! মোটকথা স্যার বৌ হিসেবে তার অযোগ্য মেয়েকে পছন্দ করেছে এটুকুই বোঝা যায়।
ইনশিরাহ বললো,“শুনেছো কি বললাম? জামাকাপড় ধুতে হবে! দিয়ে এসো লন্ড্রিতে।”
ঝুমঝুমির মা মাথা নেড়ে বলে,“জে আইচ্ছা!”
একটু থেমে অনেকটা সাহস করে ঝুমঝুমির মা আজ বললো,“একটা কথা বইলবো ম্যাডাম?”
_হ্যা। অবশ্যই!
_একটু বৌ মাইনষের মতন জামাকাপড় পইরা,সাইজা গুইজা থাকলে কি হয় ম্যাডাম। এতে স্বামী কত খুশি হয় জানেন?
ইনশিরাহ তাকিয়ে আছে, যদিও তার বিরক্ত লেগেছে কথাটায় তবুও সে কিছু বললো না ঝুমঝুমির মাকে, সে হেল্পিং হ্যান্ডদের কখনো কথা শোনায় না,চড়া গলায় কথা বলে না তাদের সাথে। ঝুমঝুমির মা বলতে লাগলো,“এই বয়সটা তো সাজন গোজনের, সাইজবেন, স্বামীর সাথে শখ আহ্লাদ করবেন, তারে বেশি বেশি আঁচলে বাইধবেন। সম্পর্কের তাগা মোটা করবেন। যেন একশো জনে টাইনলেও এ তাগা না ছিঁড়ে।”
ইনশিরাহ এবার আরও বেশি বিরক্ত হলো, একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,“হয়েছে বলা? এখন প্লিজ কাপড় গুলো নিয়ে যাও।”
ঝুমঝুমির মা বলতে লাগলো,“আর তাছাড়া, এই পোশাক পইরা থাকেন , কোনটা স্যার,কোনটা ম্যাডাম সেইটাই তো ফারাক করবার পারিনা।”
ইনশিরাহ শীতল চোখে তাকিয়ে বলে,“এসব পুরুষদের পোশাক তোমাকে কে বললো? মেয়েদের পোশাক মানে শাড়ি আর থ্রিপিস এটা বাংলাদেশের কোন সংবিধানে লেখা আছে?”
একটু থেমে ইনশিরাহ বলতে লাগলো,“আমার দিকে ভালো করে তাকাও। দেখো আমার লজ্জাস্থান দেখা যাচ্ছে? স্তনের ভাজ বোঝা যাচ্ছে? যাচ্ছে না। এই পোশাক টা সুন্দর করে সভ্যতা বজায় রেখে আমাকে কভার করেছে। এবং এটা খুব আরামদায়ক একটা পোশাক। এতে কোনো খারাপ কিছু নেই। বোঝা গিয়েছে?”
ঝুমঝুমির মায়ের মুখ থমথমে হয়ে যায়। ইনশিরাহ বলতে থাকে,“কেবিনেট খুলে দেখো ঝুমঝুমির মা,সব ময়লা কাপড় রাখা আছে। নিয়ে যাও। এতো কথা বলো না,আমার মাথা ধরেছে।”
শেষবারের মতো বলে ইনশিরাহ মিঠিকে নিয়ে পেছনের বারান্দায় চলে যায় উত্তপ্ত দুপুরে হাওয়া খেয়ে তার মেজাজ টা ঠান্ডা করতে।
ঝুমঝুমির মা কেবিনেট খুললো ইনশিরাহর, পেলো সব টিশার্ট, ট্রাউজার,জিন্স। নাক সিটকিয়ে ঝুমঝুমির মা সেগুলো হাতে নিতে নিতে বিড়বিড় করে বললো,“জমানাই এমন, সহজ বান্দার কপালে কি বৌ জুটলো! সুন্দরী দেইখাই বিয়ে করতে অয়না।”
হঠাৎ থেমে গিয়ে ঝুমঝুমির মা কেবিনেটে চোখ বোলালো,পুরো কেবিনেট ভর্তি ইনশিরাহর পোশাক। সালোয়ার স্যুট আছে, শাড়ি আছে । পাশে কিছু ধোওয়া টি-শার্ট আর ট্রাউজার সেটও রয়েছে ইনশিরাহর। হুট করে ঝুমঝুমির মায়ের মাথায় একটা কুবুদ্ধি চেপে বসে। সে কিছুক্ষণ হেসেও নেয়, তারপর এক এক করে ইনশিরাহর ধোওয়া পোশাক গুলোও ধুতে নিতে চলে যায়। পরার জন্য রেখে দেয় শাড়িগুলো।
ইনশিরাহ ঘরে ঢুকে গোসলের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে কেবিনেটের সামনে দাঁড়িয়েই চেঁচিয়ে উঠলো। ঝুমঝুমির মা ছুটে এলো,সে বহু কষ্টে তার হাসি চেপে রেখেছে।
ইনশিরাহ ফোঁস ফোঁস করতে করতে বললো,“আমার পোশাক কোথায়?”
_আপনি না কইছিলেন ধুইতে? সব তো লোন্ডিরিতে দিয়া দিছি ম্যাডাম।
_সব মানে? সব?
আরো জোরে চেচালো ইনশিরাহ। ঝুমঝুমির মা কাঁচুমাচু মুখ করে মাথা ঝাঁকায়, পরপর বলে,“কাইল সক্কাল সক্কাল দিয়া যাইবোনে।”
_কাল সকালে মানে? এখন আমি কি পরবো? একটা সালোয়ার স্যুটও রাখোনি, তুমি কি কানে কম শোনো? কি করে এতো বড় ভুল হলো?
ঝুমঝুমির মা বললো,“জে ম্যাডাম,কানে একটু কমই শুনি। একদিন ঝুমঝুমির বাপে মেজাজ দেখায়া ডাইন কানে একটা চটকনা মারছিলো, সেই থেকে কানে কমই শুনি।”
ইনশিরাহ বিরক্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে শাড়ি গুলোর দিকে তাকিয়ে। ঝুমঝুমির মা শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ চেপে কিছুক্ষণ হেসে বলে,“ঐ তো কত্তো সুন্দর সুন্দর শাড়ি ম্যাডাম। ঐখান থেকে একটা পরেন।”
রীতিমতো গাঁ জ্বালা করছে ইনশিরাহর। বললো,“সে আমি বুঝবো। তোমার সব গোছানো হয়ে গেলে ঝুমঝুমির জন্য খাবার নিয়ে চলে যাও।”
_জে আইচ্ছা ম্যাডাম।
পৈশাচিক হাসি হেসে ঝুমঝুমির মা চলে যায়। ইনশিরাহ লটকানো মুখ নিয়ে বিছানায় বসে পরে চুপচাপ। গরমে ঘেমে গা চুলকাচ্ছে, গোসল করতে হবে। কিন্তু গোসল করে সে পরবে টা কি? শাড়ি?
ইনশিরাহ আরো কিছুক্ষণ বসে থেকে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ফোনটা হাতে নিয়ে ইউটিউবে শাড়ি পড়ার একটা টিউটোরিয়াল দেখলো । মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছে না সে, কিভাবে ধরবে, কিভাবে প্যাচাবে, সব যেন মাথার ওপর দিয়ে চলে গিয়েছে। আর কুঁচি ফেলবে কিভাবে!
একটা সময় বিরক্ত হয়ে ইনশিরাহ ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে বলে,“বাল, পরবো না শাড়ি। পরবোই না।”
অতঃপর ধীরপায়ে হেঁটে সে মুঈন ফরাজীর কাবার্ডের কাছে যায়।
কলিং বেল চাপার দীর্ঘসময় পরেও যখন ইনশিরাহ দরজা খুলছিলো না,মুঈন তখন পাসওয়ার্ড দিয়ে ঘরে ঢুকলো।
ওয়াশ রুমে পানি পরার শব্দ,তার মানে ইনশিরাহ ওয়াশরুমে। মুঈন আজ এক ফাঁকে চলে এসেছে লাঞ্চ করতে, এটা তার জীবনে প্রথম হলো, কারণ তার আগে কখনো ফ্যামিলি ছিলো না। কোনো কারণ ছিলো না একঘন্টার লাঞ্চ পিরিয়ডে অন্ধকার নির্জন কটেজে আসার!
ইউনিফর্মের গলার কাছের বোতাম আলগা করলো মুঈন,এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দিয়ে বিছানায় দুমিনিট বসে গা জুড়ালো। তারপর উঠে একগ্লাস ঠান্ডা পানি এনে আবারও বিছানায় বসে পানির গ্লাসে চুমুক দিতেই খট করে ওয়াশ রুমের দরজা খোলার শব্দ হয়। মুঈন মাথা তুলে তাকায় তৎক্ষণাৎ।
ইনশিরাহ সাদা রঙের তোয়ালেটা চুলে পেঁচিয়ে হাতে ভেজা জামাকাপড় নিয়ে বেরোতেই মুঈনের মুখোমুখি হলো। পানি খেতে থাকা ফরাজী ইনশিরাহর পা-মাথা অবলোকন করতেই তৎক্ষণাৎ গোল গোল চোখে চেয়ে রইল ইনশিরাহর দিকে। আবারও চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো ইনশিরাহকে।
ইনশিরাহ কিছুটা বিব্রত হলেও,নিজেকে সামলে নিয়ে মুঈনের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির বললো,“আসলে বুয়া ভুল করে আমার সবকিছু লন্ড্রিতে পাঠিয়ে দিয়েছে,অ্যান্ড আই হ্যাভ নাথিং টু ওয়্যার! তাই আপনার এই নতুন টিশার্ট আর ট্রাউজার টা নিয়ে নিলাম। আপনার জিনিস না বলে ব্যবহার করায়,আপনি বিরক্ত হননি তো!”
মুঈন উঠে দাঁড়ায়। ইনশিরাহ পুরোপুরি সংকোচ কাটিয়ে চলে যায় বারান্দায়। তার ভেজা জামাকাপড় মেলে দিতে। মুঈন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে ইনশিরাহকে । তার হোয়াইট টিশার্ট, এবং ব্রাউন-ব্ল্যাক ট্রাউজার টা ইনশিরাহর শরীরে। যদিও ইনশিরাহ যথেষ্ট লম্বা,তবে মুঈনের এক্সএল সাইজের টিশার্টও বেশ বড় লাগছে অমন সুডৌল,চিকন শরীরে। আর ট্রাউজার,সেটা পায়ের কাছে বেরিয়ে আছে সামনে কিছুটা, কারণ মুঈন ইনশিরাহর থেকে পাঁচ ইঞ্চির মতো লম্বা।
ইনশিরাহ ঘরে ঢুকলো, মুঈনের দিকে তাকিয়ে বললো,“আপনি বসুন আমি টেবিল সেট করছি। আজ হঠাৎ এলেন যে,আপনি বললেন লাঞ্চে আসেন না!”
প্রশ্নটি করে ইনশিরাহ উত্তরের অপেক্ষা না করে যেতে নিলে মুঈন ওর হাত টেনে ধরলো, ইশি অবাক হলেও নির্লিপ্ত রইলো, চেয়ে রইল মুঈনের মুখপানে। মুঈন ধীরে ধীরে এক হাঁটুতে ভর দিয়ে ঝুকে বসলো মেঝেতে, ইনশিরাহর পায়ের কাছ থেকে ট্রাউজারের বাড়তি অংশ টুকু ফোল্ড করে দিলো।
স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কাজটা করছে মুঈন। লোকটাকে ইনশিরাহ যত দেখছে তত অবাক হচ্ছে, মুহুর্তে মুহুর্তে চ'ম'কে যাচ্ছে সে লোকটার প্রতিটি আচরণে।
মুঈন উঠে দাঁড়িয়ে তার নিকষ কালো বাদামি চোখ দিয়ে ইনশিরাহর চোখে দৃষ্টি স্থির রেখে বললো,“এখন থেকে মাঝে মাঝে আসা হবে হয়তো!”
লাঞ্চ শেষ করে ইনশিরাহকে মুঈন ডাকলো ঘরে। তার পেছন পেছন ইনশিরাহ ঘরে ঢুকে দাঁড়িয়ে রইল, মুঈন এক্ষুনি অফিসে যাবে, ইউনিফর্মের খুলে রাখা বোতাম গুলো লাগিয়ে নিয়ে ইনশিরাহর দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললো,“ছুটি পেয়েছি।”
_হঠাৎ আবার!
অবাক হয় ইনশিরাহ। মুঈন বলতে থাকে,“এটা আইজিপি স্যারের পক্ষ থেকে আমাদের বিয়ের গিফট। পাঁচ দিনের ছুটি। কোথাও ঘুরতে যেতে চাইলে বলো।”
ইনশিরাহ তাকিয়ে আছে শুধু, লোকটা পরোক্ষভাবে হানিমুনে যাওয়ার প্রস্তাব রেখেছে,সেটাও ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে।
মুঈনের মুখভঙ্গি স্বাভাবিক, দৃষ্টি অনুসন্ধানী। দেখতে চাইছে,বুঝতে চাইছে ইনশিরাহর মনের কথা। দু'জনের সহজ হওয়ার জন্য এরচে দারুণ উপায় আর হতেই পারেনা। মুঈন বোঝে ইনশিরাহ চেষ্টা করছে, তবে পারছে না। মুঈনও নিজের পক্ষ থেকে তার সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে চাইলেও এই ছকে বাঁধা দিন গুলো যথেষ্ট নয়। তাদের আরো সময় চাই, যে সময় শুধু তাদের দুজনের হবে।
আগ্রহ নিয়ে মুঈন আবারও জানতে চায়,“যদি তোমার আপত্তি না থাকে তো!”
আপত্তি! আপত্তি কেন থাকবে ইনশিরাহর! এক লোক তার ইচ্ছেকে দাম দিলো এতো গুলো দিন, তার এই ইচ্ছেকে অসম্মান করার কোনো কারণ তো ইনশিরাহর নেই। লোকটা অমায়িক, সমস্যাটা ইনশিরাহর সে সহজ হতে পারছে না, সে পারছে না নিজেকে ঐ লোকের কাছে তুলে দিতে। যেটা একদিন দিতেই হবে, তালবাহানা করে, সিনক্রিয়েট করে কি হবে! এই সমস্যা গুলো ইনশিরাহর, তার জন্য এই লোকের এই সম্পর্কের প্রতি যে মনোযোগ, অনুভূতি, তা ফিকে করে দিতে চাচ্ছে না সে।
ইনশিরাহ জবাব দিলো,“আমার অসুবিধা নেই।”
মুঈন সেদিন বেশ ফুরফুরে মেজাজে বেরিয়ে যায় কটেজ থেকে, তখন ইনশিরাহ চুপচাপ বসে থাকে বিছানায়। ফোনটা তুলে নিয়ে সে তারিখ দেখলো, তাদের বিয়ের এগারো দিন পেরিয়ে গিয়েছে। ইনশিরাহর মনে পরলো,সে দশ বারোদিন সময় চেয়েছিলো লোকটার সাথে সহজ হতে, তবে এখন দেখলো ফলাফল শূন্য। ইনশিরাহ নিজের ওপর রাগ করবে নাকি পরিস্থিতির ওপর সে বুঝত পারছে না।
হঠাৎ দরজায় আওয়াজ হয়। ইনশিরাহ মাথা তুলে দেখলো মুঈন আবারও ফিরে এসেছে, হন্তদন্ত হয়ে তার দিকে আসছে। ইনশিরাহ কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকটা তার হাত ধরে হ্যাচকা টানে তাকে কাছে নিয়ে তার কপালে চুমু খেয়ে বলে,“একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম! তুমি আমার জিনিস না বলে ব্যবহার করায় আমি খুব বিরক্ত হয়েছি। এটা তার শাস্তি। তবে মাঝে মাঝে এভাবে বিরক্ত করার অনুমতি দেয়া হলো।”
মৃদু হেসে মুঈন হন্তদন্ত হয়ে চলে যায়। ঘটনাটা সর্বোচ্চ পাঁচ সেকেন্ড নিয়ে ঘটেছে, ইনশিরাহ দাঁড়িয়ে আছে ঠাঁয়। একটা কথাই তার মাথায় ঘুরছে, লোকটা ভীষণ চালু!
চলমান.......