#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৬৫ [ ১ম অংশ ]
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
[ ১ম অংশ ]
ছেলের বোকামি দেখে রাগ,বিরক্তি দুটোই ধরে গিয়েছে সাগর ভুঁইয়ার। হাতের কাগজটার দিকে তাকিয়ে চোখের রিডিং চশমাটা তর্জনীর সাহায্যে একটুখানি ঠেলে রাশভারী গলায় বলল,“বোকার মতো বলো না! ইউএসএ যাবে না মানে? কি ধরণের পাগলামি এটা! সাঈম আ'ম ওয়ার্নিং ইউ! যা শুরু করেছো এসব বন্ধ করো! বুদ্ধিমানের কাজ হবে!”
_কি শুরু করেছি আমি?
বুকে হাত বেঁধে টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো সাঈম, ঠান্ডা গলায় জানতে চাইলো পাপার থেকে।
_ইএসএ যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ তোমার বেশি ছিলো!
_এখন নেই! ভালো লাগছে না।
কাঠ কাঠ জবাব সাঈমের।
সাগর ভুঁইয়া হতাশ। তার সাথে এমন একরোখা আচরণ সে সাঈমকে কখনও করতে দেখেনি। আজ রাখঢাক না রেখে সাগর ভুঁইয়া বলেই বসে,“মেয়ে দেখবো?”
_কার জন্য?
_তোমার জন্য! বিয়ে করবে!
_দরকার নেই। ধন্যবাদ।
শীতল জবাব খানা নিক্ষেপ করে হন্তদন্ত হয়ে রুমে ঢুকে সাঈম দরজা বন্ধ করে চুপচাপ বসে থাকে। কিছুক্ষণ বাদে ফোনটা হাতে নিয়ে অনেকটা সংকোচ একপাশে জড়ো করে রেখে কাউকে কল লাগায়। ওপাশের ব্যক্তি কলটা রিসিভ করতেই সাঈম ভীষণ অস্থিরতার সাথে গম্ভীর কন্ঠে বলে,“আমাকে কাইন্ডলি ইশির প্রেজেন্ট কন্টাক্ট নাম্বারটা যোগার করে দাও।”
________
হানিমুন ডেজ অন দ্য গো,
সেন্টমার্টিনে “দ্য ঔশান শোর” রিসোর্টের দু'টো কটেজ মুঈন ইতোমধ্যে নিজের নামে বুক করে ফেলেছে। দু'টো কটেজ, কারণ তাদের সাথে আরো একটা কাপল যাচ্ছে, প্রিতম-ইনায়া যাচ্ছে।
প্ল্যানটা মুঈন-ই করেছিলো, হুট করে প্রিতম আর ইনুকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বসে। অবশ্য এতে ইনশিরাহ খুশি হয় ভীষণ।
সবথেকে বেশি খুশি ছিল ইনায়া,বিয়ের পরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয়নি,একটার পর একটা ঝামেলায় তাদের হানিমুন সমাধিস্থ হয়ে গিয়েছিল। তবে প্রিতম প্রথমেই রাজি ছিল না, কারণ সামনে ইনায়ার মিড। সে আর প্রেরণা বহুবার বুঝিয়েও মানাতে পারেনি ইনায়াকে। শেষমেশ ওর জেদের কাছে হার মেনে প্রিতম রাজি হয়েছে।
এতে উল্টো বিপত্তি ঘটেছে, ইশমাম ভীষণ ক্ষেপেছে মেয়ে-জামাইয়ের এমন কান্ডজ্ঞানহীনতা দেখে । কদিন পরে ইনুর মিড আর তারা এখন ঘুরতে যাচ্ছে, এবং ইশমাম মির্জা দোষ পুরোটাই ফেলেছেন প্রিতমের ঘাড়ে।
সামিন ইয়াসার মির্জা খুব ভোরেই মেয়েকে কল করেছে আজ, আলো এসে দ্রুত তার পাশে বসে পরে। ইনশিরাহ কলটা রিসিভ করতেই সামিন জলদগম্ভীর কন্ঠে বললো,“কথা শুনছো না কেন! তোমাকে কি বলা হয়েছে গতকাল আম্মা?”
মাম্মার ওপর মেজাজ দেখাতে পারলেও পাপার ওপর পারে না ইনশিরাহ, আজ পাপা রাগী রাগী ভঙ্গিতে কথা বলছে যেন। এখন তো মেজাজ একেবারেই দেখানো যাবে না।
বিছানার ওপর বসলো ইনশিরাহ,আমতা আমতা করে বললো,“পাপা,মিঠিকে সাথে করে নিয়ে গেলে কি হবে?”
সামিন সাথে সাথে জবাব দিলো,“ওকে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই,ওর টেইক কেয়ার করার জন্য এ বাড়িতে অনেক মানুষ রয়েছে, তোমার বড় দাদান বাড়ি থেকে বেড়িয়েছে, তোমার কাছে যাচ্ছে, মিঠিকে ওর সাথে দিয়ে দিও।”
সামিনের কন্ঠে আদেশ, ধ'ম'ক দুটোই ছিল। ইনশিরাহ ফোনটা কানে চেপে ধরে শুকনো মুখে ঘরের এককোণে বসে থাকা মিঠির দিকে চায়। ওপাশে সামিনের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে আলো উঠে দূরে সরে যায়, দূরে গিয়ে মেয়েকে বলে,“অবুঝের মতো করবে না। তুমি বাচ্চা মেয়ে তো নও। এই সময়টা দু'জনের, তুমি মিঠির টেক কেয়ার করতে গিয়ে মুঈনকে সময় দিতে পারবে না, ও বিরক্ত হবে। ইনায়া প্রিতম পৌঁছেছে তোমার বাসায়?”
_হু।
একশব্দে জবাব দেয় ইনশিরাহ।
_ঠিক আছে, সাবধানে থেকো, অনেক আনন্দ করো সবাই। খাওয়া দাওয়ার প্রতি সতর্ক থেকো,ভয়ংকর গরম পরেছে। মুঈনকে ফোনটা দাও এখন!
ইনশিরাহ রোবটের মতো উঠে দাঁড়িয়ে বসার ঘরে চলে যায়, মুঈন প্রিতমের সাথে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলো তখন। ইনশিরাহ গিয়ে দাঁড়িয়ে বললো,“মাম্মা কথা বলবে আপনার সাথে!”
মুঈন ফোনটা নিয়ে নেয়। ইনশিরাহ ঘুরে এসে ঘরে ঢুকে ইনায়ার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, ইনায়া সকাল সকাল প্রিতমকে নিয়ে এসেছে,এখান থেকে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে তারা। ইনশিরাহর গোছানো ব্যাগেজ খুলে আবারও গোছাচ্ছে
ইনায়া, দুকদম এগিয়ে এসে ইনশিরাহ ধমকে বোনকে বলে,“এই! তুই শাড়ি নিচ্ছিস কেন আমার ব্যাগে? আমি নিতে বলেছি? এতো পাকামি করিস কেনো?”
ইনায়া আপুর ধ'ম'ক গায়ে না মেখে বেছে বেছে তিন চারটা শাড়ি ওর ব্যাগে ঢুকিয়ে জিপার আটকে উঠে ছুটে যায় ইনশিরাহর ড্রেসিং টেবিলের কাছে, আপুর অর্নামেন্টস কোথায় কোনটা রাখা,তা ইনায়া জানে, সে-ই দুদিন আগে সব গুছিয়ে দিয়ে গিয়েছে।
মুঈন এ যাবতকাল পর্যন্ত ইনশিরাহকে যত অলংকার উপহার দিয়েছে সবকিছু ইনায়া ইশির ব্যাগে পুরলো । ইনশিরাহ কোমরে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে গম্ভীর হয়ে বললো,“ওসব পরবো না আমি। অযথা নিচ্ছিস!”
ইনায়া যেন শুনছেই না। সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে সে বড় মা'কে ভিডিও কলে দেখালো সবটা, ইনশিরাহ একটা পিংক লং শার্ট আর হোয়াইট ওয়াইড প্যান্ট পরেছে, একটা স্কার্ফ পেঁচিয়েছে মাথায় রোদ থেকে বাঁচতে, আর একটা সানগ্লাস। এতটুকুই সাজ।
ওদিকে ইনায়া একটা লং ফ্রক পরেছে, এবং ইচ্ছেমত সেজেছে সে,ছবি ভালো আসতে হবে যে!
আলোরা তিন জা দুই মেয়ের হানিমুন লুক দেখে ওপাশে বসে হাসছে। আচমকা আলোর হাত থেকে ইশমাম মির্জা এসে ফোনটা কেড়ে নিয়ে কটমট দৃষ্টিতে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলে,“সাথে করে বই নিয়েছো তুমি?”
ইনায়ার মুখটা তৎক্ষণাৎ পাংশুবর্ণের হয়ে যায়। আলো ইশমামের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে কল কেটে ইশমামের দিকে তাকিয়ে বলে,“হানিমুনেও মেয়েটা বই নিয়ে যাবে? এবার তো তুমি বাড়াবাড়ি করে দিলে ইশমাম!”
ওদের ন'টায় ফ্লাইট। ঠিক সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ ইহান গিয়ে মিঠিকে নিয়ে আসে মুঈনের কটেজ থেকে। এয়ারপোর্ট পৌঁছাতে কিছুটা সময় লেগেছিল ওদের, রাস্তায় জ্যাম থাকার কারণে।
গরমে,জ্যামে আটকে দুই বোনের বিধ্বস্ত অবস্থা হয়ে গিয়েছিলো। ফ্লাইটে পৌনে একঘন্টা পুরোটাই ক্লান্তিতে ইনশিরাহ ঘুমিয়েছে, কিছুটা আত্মগড়িমা, কিছুটা আত্মমর্যাদায় পরিপূর্ণ পাখির মতো হালকা শরীরটা কাত হয়ে কখন মুঈনের কাঁধে রেখেছে সে খবর কি রেখেছে কেউ? শুধু মুঈন রেখেছে।
প্রিতম ইনুর পৌনে একঘন্টা কেটেছে গল্প করে,সেল্ফি তুলে। ইনশিরাহর কাটলো ঘুমিয়ে, আর মুঈনের কেটেছে সবথেকে দারুণ ভাবে! কাঁধে ইনশিরাহর মাথাটাকে ঠিকঠাক ভাবে রেখে বলিষ্ঠ এক হাতে আগলে রেখেছিল। মাতাল ঘুমে ইনশিরাহ কিছুই টের পায়নি তা।
মাথার স্কার্ফটাকে একটানে মুঈন খুলে দিয়েছিল, সিল্কি চুল গুলো ছড়িয়ে পরেছিলো মুখে। সুযোগ সন্ধানী, চালু লোক ফরাজী আঙ্গুলের দুষ্টুমিতে মেতেছিল একা একা। দুষ্টের মতন হাসছিলো ঠোঁট টিপে।
ইনশিরাহ জানেনা, টের পায়নি,রোজ রাতে সে ঘুমিয়ে গেলে মুঈন এটা করে, রোজ রাতে,একটি রাতও বাদ যায়নি।
ফরাজী এতোটাও ভদ্রলোক নয়,এই মেয়েটা ঘুনাক্ষরেও টের পায়নি এখনও। ফরাজী ভীষণ সুযোগ সন্ধানী। ঘুমন্ত মেয়েটিকে বরাবর তার কাছে আদুরে লাগে, এই পানপাতার মতো স্নিগ্ধ ঘুমন্ত মুখটা দেখলেই তার আদর করে দিতে ইচ্ছে হয়। সে আদরের নাম “ভয়ংকর আদর”।
কক্সবাজার পৌঁছে তারা আধাঘণ্টার জন্য বিশ্রাম নিলো, ইনশিরাহ ঘুমে টলছিলো তখনও। তার এতো কেনো ঘুম আসে সে জানে না।
মুঈন শক্তপোক্ত বৌয়ের ভাঙাচোরা অবস্থা দেখে বললো,“এখনও অনেকটা জার্নি বাকি!”
ইনশিরাহ গা ঝাড়া দিয়ে ধাতস্থ হয়। সেখানে তারা হালকা নাস্তা খেয়ে আর থামেনা। ওখান থেকে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পরলো যখন তখন দুপুর সাড়ে বারোটার কাছাকাছি।
এই গরমের মৌসুম টাতে সেন্টমার্টিনের ওপর থেকে মহাসমারোহে ঝক্কি চলতেই থাকে।
তাতে কিছুটা অবদান রাখতে,মির্জা বাড়ির দুই মেয়ে-জামাই তাদের হানিমুন সারতে এলো।
কোরাল দ্বীপের কাছাকাছি, বিলাসবহুল একটি রিসোর্টের দু'টো কটেজ দুই জোড়া কপোত কপোতীর দখলে।
প্রিতম আর ইনায়ার কটেজ টা মুঈন-ইনশিরাহর কটেজ থেকে কিছুটা দূরে। এই রিসোর্টটা সেন্টমার্টিনের সবথেকে প্রসিদ্ধ একটি রিসোর্ট। বিশাল এরিয়া জুড়ে রয়েছে তিনটি বাংলো এবং উনিশটি কটেজ। ছাটকাট, ডেকোরেশন, সবকিছুতে রয়েছে রুচিশীলতার ছোঁয়া। বেশ নিরিবিলি পরিবেশ দেখে ইনশিরাহ প্রথমেই মুঈনকে ধন্যবাদ দেয়।
ব্যাগপত্র রেখে বিশাল বিশাল জানালাগুলো খুলে দিয়ে ইনশিরাহ নরম গদির আরামদায়ক বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পরে। তার মুখে এতক্ষণে স্বস্তির ছাট দেখা যাচ্ছে।
কটেজের বিছানাটা গোলাকার, ইনশিরাহর সবমিলিয়ে দারুণ লাগছে সবকিছু। উঠে ঘুরে ঘুরে সব দেখছে। দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে মুঈন দেখছে ইনশিরাহকে। এটা ছিলো হানিমুন স্পেশাল কটেজ, তাদের জন্য কর্তৃপক্ষ ফুল দিয়ে সাজিয়ে রেখেছিলো ঘরটা। মেঝেতে লেখা “লাভ বার্ডস”!
মুঈন হাসলো মুচকি করে তা দেখে, ইনশিরাহর দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললো,“আমরা লাভ বার্ডস ইশি?”
ইশি চুপচাপ বসে আছে, মুঈন বলে,“নই? তবে অ্যারেঞ্জ বার্ডস? কর্তৃপক্ষকে বলা উচিৎ।”
ইনশিরাহ ফিক করে হেসে ফেলে মুঈনের এই কথাটাতে। তারপর মুখটা ঘুরিয়ে নেয়। মুঈন গিয়ে বিছানায় শুয়ে পরে,গা জুড়িয়ে নেয়।
ইনশিরাহ ব্যাগের কাছে বসে পরে, ব্যাগ খুলে সে খুঁজে খুঁজে সাদা রঙের একটা কুর্তি নিলো, এটা মাম্মা কিনে দিয়েছিল এ বছর মার্চে। এটা সে কি মনে করে ব্যাগে নিয়েছে সে জানে না, ভীষণ সুন্দর একটা ইন্ডিয়ান কুর্তি,সিম্পল ডিজাইনের।
আজ ইনশিরাহ এটা পরবে বলে ঠিক করেছে। সমুদ্রের সাথে এই পোশাকটা মিলে যাচ্ছে যেন।
গোসল শেষে ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে তাড়াহুড়ো লাগিয়ে ইনশিরাহ ভেজা চুল গুলো হেয়ার ড্রায়ারের সাহায্যে শুকিয়ে নিচ্ছিল, ওরা আজ সমুদ্রে নামবে না, খাওয়া দাওয়া করে সৈকতে ঘুরবে শুধু।
মুঈন কটেজের বারান্দায় ছিলো এতক্ষণ,যেখান থেকে সমুদ্র দেখা যায়। কক্ষের ভেতরে ইনশিরাহর অস্তিত্ব টের পেয়ে সে ভেতরে এলো,
সাদা রঙের কুর্তি পরিহিতা,ভেজা চুলের ইনশিরাহকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখছিলো সে । মুঈন কক্ষের ভেতরে চলে আসায় ইনশিরাহ হাত বাড়িয়ে শিফনের সাদা ওড়নাটা গলায় জরালো, সে যে পোশাকটা পরে আছে এই পোশাক টা বড্ড গা লাগানো, বেশ বড় গলা। বুকের কাছটা খুব চোখে লাগছে। ওড়না পরতেই হবে।
মুঈনের চোখে ইনশিরাহর চোখাচোখি হতেই ইনশিরাহ চোখ নামিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে, পরপর বলে,“আপনি এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন!”
মুঈন ফিচেল হাসে, ইনশিরাহর কাছে গিয়ে ওর কনুই চেপে ধরে খানিকটা কাছে এনে জড়ানো গলায় বলে,“কেন! লজ্জা লাগছে?”
ইনশিরাহ চুপ হয়ে যায়, মুঈন তার কনুই ছাড়ছে না। এখানে এসে লোকটা ভীষণ সাহসী হয়ে উঠেছে, ইনশিরাহ টের পেলো হঠাৎ। মুঈন রোবটিক মুখভঙ্গির বদলে দেখতে পায় মেয়েটির সংকোচ। হুট করে ইনশিরাহকে ছেড়ে দিয়ে মুঈন ব্যাগ থেকে নিজের পোশাক বের করে নিতে নিতে বললো,“স্বামী হবার তেত্রিশতম শর্ত হলো বৌকে যখন মারাত্মক সুন্দর লাগবে তখন তার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকা, নিঃশ্বাসও নেওয়া যাবে না, যখন মনে হবে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তখন নিঃশ্বাস নিতে হবে। সেটাই করছিলাম।”
ইনশিরাহ চোখ তুলে তাকায় মুঈনের দিকে, অস্ফুটে বলে,“স্বামী হবার প্রথম বত্রিশ টা শর্ত কি কি?”
তোয়ালে এবং পোশাক নিয়ে ওয়াশরুমের দিকটাতে যেতে যেতে মুঈন বললো,“জানি না, ধীরে ধীরে একটা একটা করে বানিয়ে নেবো।”
ইনশিরাহ কোন নড়চড় না করে দাঁড়িয়ে থাকে । দরজায় টোকা পরে তখন। ইনায়া গোসল করে, সেজেগুজে একেবারে পটের বিবি! একটা লাল শাড়ি পরেছে মিষ্টি মেয়েটা, ওদেরকে ডাকতে এসেছিলো সে। ইনশিরাহকে দেখেই প্রথমে নাক সিটকালো সে, তারপর শুরু করলো আরেক ঝামেলা। ইনশিরাহকে শাড়ি পরতেই হবে, না পরলে চলবে না।
ইনশিরাহ ধমকে যাচ্ছে বোনকে, কোনো কাজ হচ্ছে না, ইনায়া জেদ ধরে বলে,“একটা দিনের জন্য আপু! আই বেগ ইউ! কত প্লান করে এসেছি, দুইবোন যার যার বরকে নিয়ে ছবি তুলবো আপু! তারপর গ্রুপ ফোটো তুলে একটা অ্যালবাম বানিয়ে ফেলবো। আচ্ছা সন্ধ্যার দিকে না হয় খুলে ফেলো! প্লিজ আপু!”
রীতিমতো পা ধরে ঝুলে পরলো ইনায়া নাছোড়বান্দা। বোনের বাচ্চামি বিরক্ত লাগছে আবার বোনের জন্য মায়াও লাগছে ইনশিরাহর, মেয়েটা সবকিছু নিয়ে খুব শৌখিন, এতটুকু বাচ্চা মেয়ে গুছিয়ে সংসার করছে, পড়াশোনা করছে, তার মতো মরা মাছের ফসিল তো নয়!
বোনের প্রতি দরদ থেকে ইনশিরাহ একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,“ঠিক আছে! হালকা দেখে একটা পরিয়ে দে!”
ইনায়ার ঠোঁট জুড়ে বিশ্বজয়ের হাসি। মুঈন তখনও ওয়াশ রুমে। এদিকে ইনায়া চোখের পলকে একটা কমলা রঙের শিফন জর্জেট শাড়ি পরিয়ে দেয় ইনশিরাহকে। ফুলস্লিভ কমলা রঙের ব্লাউজের ওপর আঁচল টানতেই আভিজাত্যের ঝলকানি খেলে গেলো ইনশিরাহর সৌন্দর্যে।
ইনায়া তিনবার মাশাআল্লাহ বলে আপুকে জরিয়ে ধরে আহ্লাদ করলো, ইনশিরাহ হাসছে বোনের কাণ্ড দেখে।
ইনশিরাহকে শাড়ি পরিয়ে ইনায়া প্রিতম রেডি হয়েছে কিনা সেটা দেখতে বেরিয়ে যায়। ওয়াশ রুম থেকে তখনও অবিরত কলকল আওয়াজ ভেসে আসছে।
মুঈনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ইনশিরাহ কিছুক্ষণ বসে, কিছুক্ষণ উঠে দাঁড়িয়ে থাকে। খানিকবাদে ধীরপায়ে হেঁটে সে আয়নায় সামনে দাঁড়ায়। এই সৌন্দর্য, এই স্নিগ্ধতা, ঐ রুপ যেন তাঁরও চোখে বিধে যেতে চাইছে। ফ্যালফ্যাল করে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে আছে ইনশিরাহ, সে এতোটাই সুন্দর? এই রুপ সত্যিই তার?
এই রংটা! এই রংটা মুঈনের প্রিয় নাকি! এই শাড়িগুলো মুঈন কিনে দিয়েছে।
শাড়িটা বড্ড আরামদায়ক,হালকা। তাই অস্বস্তি কম হচ্ছে তার। ধীরে ধীরে ইনশিরাহ নিজের গলায় হাত রাখে, হঠাৎ তার মনে হলো গলাটা কেমন খালি লাগছে, একটা হালকা গয়না,যেমন চেইন,পরলে মন্দ হয়না।
হুট করে নিজের সৌন্দর্য বাড়িয়ে নেওয়ার ঝোক চেপে বসলো হঠাৎ, কেমন অন্য এক ইনশিরাহ অর্নামেন্টসের বক্সটা বের করে হাতাতে লাগলো। হঠাৎ তার মনে পরে যায় মুঈনের বলা কথাটা,“এটা তখন পরবে যখন মনে হবে এর চেয়ে সুন্দর কোনো অলংকার হতেই পারে না।”
দ্রুত হাতে সে-ই লকেটটাই ইনশিরাহ তুলে নিলো। তাই তো! এই এতো অর্নামেন্টসের মধ্যে এটাই সবথেকে সুন্দর। এমনিতেও মুঈনের পছন্দ ইউনিক,মুঈনের কিনে দেওয়া প্রতিটি জিনিস ভীষণ ভীষণ ভীষণ সুন্দর, রুচিশীল, অসুবিধা হচ্ছে ইশি সেসব পরতে পারেনা।
লকেট টা নিয়ে সে আয়নার সামনে গিয়ে লকেট টা গলায় পরলো, এবং সাথে সাথে তার এটাই মনে হলো, এই লকেটটা না থাকলে এই মেয়েলি সাজ তার সত্যিই অসম্পূর্ণ থাকতো।
খট করে ওয়াশ রুমের দরজা খুলে যায়, ইনশিরাহ আয়নাতেই তাকিয়ে আছে। মুঈন যখন বেরোলো, ইনশিরাহকে দেখে ওখানেই থমকালো তার পা। মুঈন কিছুক্ষণের জন্য ভেবেছে সে ভুল দেখছে, তারপর যখন সত্যিটা বুঝতে পারলো, তখনও নড়লো না যায়গা থেকে।
ইনশিরাহ এই লোকটার দৃষ্টিতে দৃষ্টি মেলাতে পারেনা,এটা খুব অবাক লাগে তার। এই লোকটার দৃষ্টিতে কিছু একটা থাকে যার মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। পা-মাথা অদ্ভুত অনুভূতিতে ছেয়ে যায়।
মুঈন চেয়ে চেয়ে দেখছে বৌকে, গলায় তার দেয়া লকেট, অতি দামীয় পাথরটি জানালা থেকে আসা সূর্যের আলোতে ঝলকানি দিয়ে উঠেছে। মুঈন ঐ গলার দিকে তার অসহায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। এমন সৌন্দর্য তার সামনে আর সে পরম আবেগ নিয়ে ছুঁতে পারছে না, এই মেয়েটাকে বোঝাতে পারছে না “The poor Forazi is an worshiper of her mysterious beauty” কথাটা ।
মুঈন একটু বেশিই থমকেছে, ইনশিরাহ বললো,“ওরা অপেক্ষা করছে চলুন।”
মুঈন ইনশিরাহর থেকে চোখ নামিয়ে অস্ফুটে বললো,“হুম, আ'ম রেডি। তুমি ক্যামেরা নিও। ছবি তুলবো।”
ইনশিরাহ দাঁড়িয়ে পরে,মুঈনের দিকে ঘুরে তাকিয়ে থাকে সে কিছুক্ষণ , তারপর অস্পষ্ট হেসে ক্যামেরা নিয়ে বেড়িয়ে যায়।
______
খাওয়া দাওয়া সেরে ওরা দুই জুটি সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে বেরিয়েছে। তখন সময়টা সন্ধ্যার কাছাকাছি। ইনায়ার জোরাজুরিতে সবাইকে রিসোর্টের বিচ ছেড়ে পাবলিক বিচে আসতে হয়েছে।
ওরা কিছু ছবি তুললো,কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পরে প্রিতম মুঈন- ইনশিরাহর দিকে তাকিয়ে বললো,“আপু এবং ভাইয়া। ইনু তখন থেকে রাখাইন পল্লীতে যাবে বলে আবদার করছে! আপনারা এদিকটায় ঘুরুন, আমি আর ইনু আসছি!”
মুঈন ইনশিরাহ হেসে ওদের সম্মতি দিলো। ইনু বোকার মতো তাকিয়ে আছে, সে কখন প্রিতমের কাছে রাখাইন পল্লীতে যাওয়ার জন্য আবদার করেছে সে বুঝতে পারছে না।
ওরা মুঈন ইনশিরাহকে সৈকতে ফেলে,কিছুটা দূরে আসতেই ইনায়া বললো,“তুমি মিথ্যে বললে কেন! আর রাখাইন পল্লীতে যাবেই যখন আপু ভাইয়াকে ইনভাইট করলে না কেন? কেমন অসামাজিক মানুষ তুমি?”
প্রিতম হেসে ইনুর মাথায় একটা মৃদু চাপড় মেরে বলে,“স্টুপিড! আপু ভাইয়ার প্রাইভেসি বলতে একটা ব্যাপার আছে! ওদেরকে একটু একা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়? ভাইয়া ইনশিরাহর হাতটাও ধরতে পারছে না আমাদের সামনে।”
ইনায়া হাসলো,বললো,“তাই তোহ! আমি কি বোকা দেখলে, আমি ভাইয়াকে সুযোগ না দিয়ে আপুর হাত ধরে হাঁটছিলাম! আমি এতো আহাম্মক কেন! ভাইয়া আমাদের সাথে করে নিয়ে এসে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মেরেছে!”
দাঁত বের করে হাসছে ইনায়া। প্রিতমও হেসে ইনুর কোমর চেপে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে হাঁটতে লাগলো, প্রসঙ্গ পাল্টে বললো,“আর সবচে বড় কথা,আমাদেরও তো একটু প্রাইভেসির দরকার না কি? আমাদের প্রথম হানিমুন!”
লজ্জার আতিশয্যে ইনুর গাল দু'টো লাল লাল হয়ে গেলো, বললো,“ছাড়ো, লোকজন দেখছে তো!”
প্রিতম হাতের বাঁধন আরও শক্ত করে বললো,“দেখুক! শশুর ইশমাম মির্জা আর সম্বন্ধি ইরফান মির্জা ব্যতীত এই প্রিতম কাউকে পরোয়া করে না।”
হাসিতে ফেটে পরে ইনু। প্রিতমও তার সাথে যোগ দেয়। দুই আত্মা সৈকতে দাঁড়িয়ে খিলখিল হাসিতে খুনসুটিতে মত্ত হয়। এখানে কেউ নেই তাদের বিরক্ত করার! আজ মন ভরে আহ্লাদ করবে ইনু প্রিতমের সাথে। স্বামীর সাথে আহ্লাদীপনায় শ্রেষ্ঠ আহ্লাদী হিসেবে গিনেস বুকে নাম লেখাবে ইনায়া মির্জা। হ্যাংলামি করে ওরা এই সৈকতের সবাইকে বিরক্ত করে ফেলবে। সবাই বাবাগো মাগো বলে দৌড়ে পালিয়ে যাবে সৈকত থেকে,সৈকতে ওদেরকে একা ছেড়ে দেবে।
কথাগুলো একে অপরকে বলে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খায় ইনায়া প্রিতম।
প্রিতম হাসি থামিয়ে বলে,“ভালোবাসি শত্রুর বোন।”
ইনায়া হাসতে হাসতে জবাব দেয়,“ভালোবাসি পাপার মিনমিনে শয়তান জামাই।”
______
প্রিতমরা দূরে যেতেই মুঈন ঠিকই ইনশিরাহর ডান হাতটা ধরলো, আলতো করে। ইনশিরাহ চুপচাপ মুঈনের পায়ে পা মিলিয়ে হাটছিলো, সন্ধ্যা হতে না হতেই সৈকতে ভিড় বাড়তে শুরু করেছে।
মুঈন আশেপাশে তাকিয়ে বলছে,“মনে হচ্ছে বৃষ্টি নামবে। অথচ ওয়েদার ট্র্যাকার কিছু জানায়নি! ওদের দু'জনকে একটা কল করি!”
ইনশিরাহ বাঁধা দিয়ে বললো,“ওরা এতোটাও ছোটো নয়, বৃষ্টি হলে সামলে নেবে নিজেদের। ইনুটা বিয়ের পর থেকে প্রিতমের সাথে একটু ঘুরতে পারেনি,ওরা আনন্দ করুক।”
মুঈন ফোনটা রেখে ইনশিরাহর ডান হাতটা আবারও ধরে বললো,“ঝাউবন যাবে?”
ইনশিরাহ মাথা নাড়ায়। কোরাল দ্বীপ থেকে আধা কিলোমিটার পুবে ঝাউবন, দিনের বেলা থেকে রাতের সময়টিতেই লোকসমাগম বেশি থাকে বলা যায়। বৃষ্টির তোয়াক্কা না করে মুঈন ইনশিরাহও এলো, আবহাওয়াটা চমৎকার,মনে হচ্ছে মেঘের দলা তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পরবে,অথচ পরছে না।
ইনশিরাহ শাড়ির কুচি সামলে হাঁটছে, মুঈনের পাশাপাশি, হঠাৎ একটা ফাঁকা যায়গা দেখে মুঈনকে বললো,“মুঈন আপনি এখানে দাঁড়ান। আমি আপনার একটা ছবি তুলি।”
মুঈন অবাক হয়ে বললো,“এই রাতে?”
_ছবিটা অ্যাস্থেটিক লাগবে। রাত তো কি হয়েছে? আপনি দাঁড়ান।
আজ ভীষণ সহজ লাগছে ইনশিরাহকে, মুঈন একবাক্যে ছবি তোলার জন্য দাঁড়িয়ে যায়। ইনশিরাহ কয়েক মুহূর্ত মুঈনকে দেখে,ক্যামেরা লেন্সে দৃষ্টি স্থির রেখেই বললো,“গলার কাছ থেকে একটা বাটন খুলে দিন মুঈন।”
মুঈন ভীষণ অবাক হয়ে তার শার্টের বাটন খুলে দেয়। ইনশিরাহ বলতে থাকে,“হাসুন।”
মুঈন হাসলো। ইনশিরাহ ছবি তোলার সময় ভীষণ সিরিয়াস হয়ে যায়,মুঈনকে বলে,“এটা ক্যাবলা ক্যাবলা হাসি মুঈন! ঐ হাসিটা হাসুন, আজ দুপুরে আমাকে ধরার সময় যেভাবে হেসেছিলেন, ওটা ভীষণ আকর্ষণীয় ছিলো।”
মুঈন তাকিয়ে আছে ইনশিরাহর দিকে,ওর কথা শুনে, ইনশিরাহ কথাটা বলেই চোখ সরিয়ে নেয়,আমতা আমতা করে বলে,“আই মিন,ওরকম হাসি সুন্দর।”
মুঈন সেরকম আর হাসতে পারছে না, তবে কাছাকাছি হাসতে পারলো, ইনশিরাহ তখনই মুঈনকে ক্যামেরা বন্দি করে।
আশেপাশে ভীষণ রকমের ভীড়। ইনশিরাহর হাতে ক্যামেরা থাকলে সে একটু চটপটে হয়ে যায়। মুঈনের বেশ কয়েকটা ছবি নিলো, সৈকতে ঘুরে বেড়ানো পথশিশুদের খাবার কিনে দিয়ে তাদের ছবি তুললো, সি-ফুডের দোকান গুলোতে ঘু্রে ঘুরে সেসবের ছবি তুললো। মুঈন বৌয়ের পার্স হাতে নিয়ে তার সেক্রেটারির মতো পেছন পেছন হাঁটছে,আর একটি অদ্ভুত মেয়ের সহজ-সরল সত্তা উপভোগ করছে।
মেঘদল এবার সিরিয়াস, হুঁশিয়ারি দিয়ে দিয়েছে আর কিছুক্ষণ বাদেই ঝাপ দেবে তারা। মুঈন এবার কটেজে ফিরতে চাইলো ইনশিরাহকে নিয়ে, প্রিতমরা অনেক আগেই ফিরেছে।
এখান থেকে কটেজ যেতে আধাঘণ্টা লাগবে, মুঈন আশেপাশে একটা রাইডার খুঁজছিলো, ইনশিরাহ ঝাউবনের প্রবেশ দ্বারে পার্স আর ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে, কোনো রাইডার খুঁজে না পেয়ে মুঈন হতাশ হয়ে সিদ্ধান্ত নিলো মেইন রোড পর্যন্ত হেঁটে যাওয়ার। ঠিক তখনই ইনশিরাহর বিকট চিৎকার তার কর্নগোচর হয়।
আশপাশটা ইনশিরাহর চিৎকারে কেমন গুমোট ভাব ধারণ করলো মুহুর্তেই। ইনশিরাহর থেকে মুঈনের দূরত্ব দুমিনিটের,মুঈন দৌড়ে বারো সেকেন্ডের মধ্যে ইনশিরাহর কাছে পৌঁছে ইনশিরাহকে এক মুহুর্তে অবলোকন করে, ইনশিরাহ তার গলায় হাত রেখে হাপাচ্ছে। মুঈন একটুও দেরি না করে ইনশিরাহর কাছে গিয়ে ওর গলায় হাত ছোয়ালো,গলার লকেট টা কেউ ছিনিয়ে নিয়ে ঝাউবনের দিকে ছুটেছে। মুঈনের চোখ মুখ মুহুর্তেই শক্ত হয়ে ওঠে, ইনশিরাহকে রেখে সেও ঝাউবনের দিকে ছুটতে শুরু করে। ইনশিরাহ ভীষণ আ'ত'ঙ্কি'ত হয়ে মুঈনকে পেছন থেকে ডাকতে ডাকতে ছুটে যায়,“মুঈন ইট ক্যান বি ডেঞ্জারাস,প্লিজ যাবেন না। আ'ম ওকে না? চলুন ফিরে যাই।”
ওদের গোলযোগের আওয়াজ পেয়ে টুরিস্ট পুলিশের দুজন লোক একই ভাবে ছুটতে থাকে ঝাউবনের দিকে। লোকজন দাঁড়িয়ে ওদের ছোটাছুটি দেখছে, কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছে লোকটা কোনদিকে ছুটেছে, আধো অন্ধকারে, ক্ষিপ্র গতিতে ছুটে মুঈন কিছুটা ভেতরে যাওয়ার পরেই লোকটার নাগাল পেলো, চারপাশের কিছু লোক টের পেয়ে ছিনতাইকারী লোকটাকে আটকে ফেলেছে সুকৌশলে, মুঈন গিয়ে এক থাবায় লোকটার কলার ধরে হ্যাচকা টানে ওকে বালির মধ্যে ফেলে শুরুতেই দু গালে দু'টো ঘুষি মেরে দিল,
পুলিশ গিয়ে মুঈনকে টানছে। ইনশিরাহ পৌঁছেছে সেকেন্ড তিনেক পরেই। ক্যামেরা আর পার্স হাতে, এলোমেলো শাড়িতে হাপাচ্ছে সে।
চলমান.....
[ দ্বিতীয় অংশের লিংক কমেন্টে ]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় অধ্যায় ]
#পর্ব_৬৫ [ ২য় অংশ ]
#ইসরাত_ইতি
মুঈন দু'টো ঘুষি মেরে শান্তি পেলো না, পরপর আরো কয়েকটা লাগিয়ে দেয়। ইনশিরাহ ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে চেঁচিয়ে বলে,“ছেড়ে দিন। আপনি উঠে আসুন। মুঈন! ”
টুরিস্ট পুলিশের লোক মুঈনকে তখনও টানছে। মুঈন এবার তার পা দিয়ে একটা লাথি বসিয়ে গর্জে উঠে বলে,“আমার বৌয়ের লকেট দে!”
ভীষণ ভয়ংকর শোনালো সে গর্জন। ইনশিরাহ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। মুঈন একপ্রকার অস্থির হয়ে উঠে হাতাহাতি শুরু করে দিয়েছে ছিনতাইকারী লোকের পকেটে। লোকটা এতো মার খেয়ে কেঁদে ফেলেছে, হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,“দি-দি-দিচ্ছি!”
লোকটা নিজেও নিজের শরীর হাতাহাতি করছে তবে লকেটটা খুঁজে পাচ্ছে না। মুঈন আবারও কলার চেপে ধরে বলে,“দে এক্ষুনি!”
ধস্তাধস্তিতে বালিতে পরে গিয়েছে লকেটটা, নাক বেয়ে রক্ত ঝরছে আহত লোকটার, কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পরে লকেট উদ্ধার হতেই মুঈন শেষবারের মতো একটা ঠাঁটিয়ে চ'ড় মারলো লোকটাকে। টুরিস্ট পুলিশ ছিনতাইকারী লোকটাকে ঘাড় ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়ার পরপর যায়গাটা ফাঁকা হতে শুরু করলো। মুঈন গা ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়ায়,লকেট টা নিয়ে। ইনশিরাহ তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল, মুঈন উঠে দাঁড়ানোর সাথে সাথে ইনশিরাহ গম্ভীর হয়ে চেচালো,“আপনি পাগল? এটা কি ছিল? এখানে যদি কোনো লোক না থাকতো? যদি আশেপাশে পুলিশ না থাকতো? ওরা গ্যাং নিয়ে চলে জানেন না? এমন হঠকারীতার মানে কি? আমি বললাম আমি ঠিক আছি। তবুও! আর এই লকেট! এটা কি অনেক দামী? না তো!”
মুঈন চোখ তুলে ইনশিরাহর দিকে তাকায় তৎক্ষণাৎ, ইনশিরাহ মুঈনের এমন দৃষ্টি দেখে হঠাৎ নিজেও অপ্রস্তুত হয়ে পরেছে, মুখ ফসকে একটা ছোটোলোকি কথা বলেছে সে বুঝতে পারলো,যদিও সে অন্যকিছু বোঝাতে চেয়েছে। সাথে সাথে ইনশিরাহ স্বর পাল্টে বলে,“আই মিন,এমন লকেট তো আপনি আরও কিনে দিতে পারবেন! এটার জন্য এমন পাগলামী করার কি ছিল!”
মুঈন আরো কিছুক্ষণ ইনশিরাহর দিকে চুপচাপ তাকিয়ে থেকে,ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে,“চলো মেইন রোডে যেতে হবে।”
মুঈনের কন্ঠস্বর গম্ভীর, ইনশিরাহর হঠাৎ খুব খারাপ লাগলো। সে কি লোকটাকে হার্ট করেছে কোনোভাবে? কিন্তু সে তো এভাবে বলতে চায়নি! ওর ইচ্ছে করছে নিচ থেকে একটা বড় সাইজের পাথর উঠিয়ে নিজের মাথায় মারতে, কেনো একটু গুছিয়ে কথা বলতে পারছে না ইদানিং!
মুঈন ডানহাতের মুঠিতে লকেটটা শক্ত করে চেপে ধরে দ্রুত পায়ে হাঁটছে। ইনশিরাহ মুঈনের সাথে পায়ে পা মিলিয়ে হেটেও পারছে না। লোকটা একটু থামছেও না, সে কি অনেক বেশিই অপমানিত হয়েছে!
মুখটা মলিন ইনশিরাহর,অপ্রস্তুতের মতন হঠাৎ বলে ওঠে,“আপনি কি রাগ করলেন মুঈন!”
মুঈন হাঁটছে চুপচাপ,কয়েক মুহূর্ত পরে গম্ভীর হয়ে বলে,“না।”
ইনশিরাহ জানে এটা মিথ্যা কথা। সে খানিক বাদে বলে,“আরে ও এসপি! আমি না ওভাবে বলতে চাইনি।”
মুঈনের কদম থামলো, সোডিয়াম আলোতে ইনশিরাহর কাঁচুমাচু মুখটার দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললো,“কিভাবে বলতে চেয়েছো? সেভাবে একটু বলো!”
_আমি বলতে চেয়েছি.....
_তুমি যেভাবেই বলতে চাওনা কেনো ইনশিরাহ,তোমার মর্মকথা একটাই ছিলো,এই লকেটটা এমন কিছু না যেটার জন্য এমন পাগলামী করতে হবে! অথচ আমি অর্থ দিয়ে এই জিনিসটার মূল্য নির্ধারণ করিনি, অনুভূতি দিয়ে করেছি,এটা আমার বৌকে দেওয়া প্রথম গিফট,এমন বহু লকেট আমি কিনতে পারলেও এটা কখনো কিনতে পারবো না যেটা আমার বৌ তার অপছন্দ সত্তেও আজ গলায় পরেছে।
ইনশিরাহ চুপ হয়ে যায়। পরপর বলে,“স্যরি।”
মুঈন হাসলো হঠাৎ,গলার গাম্ভীর্য ঝেড়ে ফেলে বলে,“রাগ করিনি,চলো ফিরি।”
পাশাপাশি হাঁটছে দুজন, ইনশিরাহ তখনও ভীষণ লজ্জিত। সে নিজেকে প্রমিস করেছে নিজের অনুভূতির সাথে দ্বন্দ হলেও এই লোকটার অনুভূতিকে অপমান করবে না অথচ সে বারবার সেটাই করে ফেলছে। কিছুটা দূরে এগিয়ে যেতেই মুঈন লকেটটা এগিয়ে দিয়ে বললো,“এটা পার্সে রাখো।”
ইনশিরাহ দাঁড়িয়ে পরলো, কিছুক্ষণ মুঈনের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,“ওটা তো গলায় ছিলো,পার্সে কেনো রাখবো।”
মুহুর্তেই মুঈনের ঠোঁট প্রশ্বস্ত হয় অমায়িক হাসিতে, কিছুক্ষণ আগের পরিস্থিতি ভুলে গিয়ে ইনশিরাহকে হ্যাচকা টানে কাছে এনে লকেটটা ইনশিরাহর গলায় পরিয়ে দেয়।
আকাশ ঝেঁপে বৃষ্টি নামে তখন,ওদের সামান্য ঘনিষ্টতাটুকুও সহ্য হলো না আকাশের। মুঈন খপ করে ইনশিরাহর হাত ধরে ছুটতে শুরু করে। ইনশিরাহ এবার আর পারছে না, গায়ের শাড়িটা ভীষণ এলোমেলো হয়েছে, চেঁচিয়ে বলে,“আসুক না বৃষ্টি। আমি এভাবে ছুটতে পারছি না।”
_ভেজা যাবে না । জ্বর বাধাবে সেদিনের মতো।
মুঈনও বলে।
শেষ রক্ষে হয়নি,মেইন রোডেও একটা রাইডার পেলো না। ভিজে একাকার দু'জন। প্রিতম আর ইনায়া অনবরত কল করেই যাচ্ছে ওদের।
মুঈন কলটা রিসিভ করে ওদের দুজনকে ডিনার সেরে নিতে বলে দেয়।
কাকভেজা হয়ে ওরা দু'জন রিসোর্টে ফিরলো তখন রাত সাড়ে নয়টা! ঠান্ডায় জমে গিয়েছে দুজন। কাঁপছে ঠকঠক করে দু'জনেই, মুঈনের কাপাকাপি দেখে ইনশিরাহ হেসে ফেললো, মুঈন বললো,“হেসো না। ইট ওয়াজ ঠু মাচ ডেঞ্জারাস! এতো ঠান্ডা পানি!”
_প্রিতম ভাইয়ার থেকে একটা সিগারেট এনে সেটা ফুঁকতে পারেন। গা গরম হবে।
খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে ইনশিরাহ কথাটা বলতে গিয়ে, মুঈন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে, এতোটা প্রানোচ্ছল ইনশিরাহকে কখনও দেখেনি,আজ এমন ভাবে কথা বলছে যেন তারা খুবই ফ্রি হয়েছে! মুঈন ভাবলো,ট্রিপের প্ল্যানটা মন্দ ছিল না।
কিছুক্ষণ হেসে হাসি থামিয়ে ইনশিরাহ বলে,“একটা মজার কথা শুনবেন মুঈন?”
_বলো!
_আমার ব্যাপারে একটা রিউমার আছে! আমি নাকি চেইন স্মোকার!
হাসিতে ফেটে পরলো ইনশিরাহ। মুঈন খানিকটা অবাক হয়ে বলে,“এমনটা কেনো?”
_আমার ছেলেদের মতো ড্রেসাপ তাই নাকি আমি সিগারেট খাই।
হাসছে ইনশিরাহ। মুঈনও হেসে ফেলে। কাঁপতে কাঁপতে কটেজের তালা খোলে মুঈন। দু'জনে ভেতরে ঢুকতেই মুঈন লাইট জ্বেলে দেয়। ইনশিরাহ ছোটাছুটি করে তোয়ালে খুঁজে বের করে নিজের মাথা মুছতে থাকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে,মুঈন কটেজের দরজা লাগাতেই তার ফোনটা আবারও বেজে ওঠে,ব্যস্ত আঙুল চালিয়ে কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে প্রিতম আর ইনু বলে,“ভাইয়া!”
_হ্যা হ্যা এসে গিয়েছি কটেজে। ডিনার করলে তোমরা ঘুমাও। চিন্তা নেই। আমি আর তোমাদের আপু ঠিক আছি।
কল কেটে মুঈন ইনশিরাহর দিকে ঘুরতেই দাঁড়িয়ে পরে। ইনশিরাহর শাড়িটা ছিলো শিফনের। ভিজে কাকভেজা হয়ে যাওয়া অঙ্গে শিফনের পাতলা শাড়িটা লেপ্টে আছে সবখানে। মুঈনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক অপার্থিব সৌন্দর্যের অধিকারিণী তার সর্বোচ্চ আবেদনময়ী সৌন্দর্য নিয়ে। চুপ চুপ করে পানি ঝরছে ভেজা শাড়ির আঁচল থেকে। মুঈনকে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে ফেলার পায়তারা চালাচ্ছে এই পরিস্থিতি। ইনশিরাহ তখনও দেখলো না মুঈনকে, নিজের মাথা মুছে নিতে নিতে মুঈনের দিকে না তাকিয়েই বলতে লাগলো,“মুঈন আপনি মাথা মুছে নিন। আমার তো হাঁচি আসছে! আল্লাহ জানেন কি আছে কপালে! এটা বৃষ্টি ছিলো নাকি অন্যকিছু! মাই গড! বরফ গলা পানি একেবারে!”
বলে হাঁচিও দিলো ইনশিরাহ। মুঈনের থেকে জবাব না পেয়ে সে ঘুরে দাঁড়ায়। মুঈনের অমন মদ্যক চাহনি দেখে সেও কিছু মুহূর্তের জন্য তাকিয়ে থাকে মুঈনের চোখে। মুঈনের চোখের ভাষা দ্রুতই পরে ফেলে চুপ করে রয়, দাঁড়িয়ে থাকে নিজের স্থানে।
বৃষ্টির ঝমঝমে আওয়াজ সাথে সাগরের গর্জন, ওদের দু'জনকে এই পৃথিবীতে একা করে দিলো। মুঈন এগিয়ে গেলো ইনশিরাহর কাছে। ইনশিরাহ অস্ফুটে বলতে লাগলো,“ঠান্ডা লাগবে মুঈন মাথাটা মুছে নিন...”
হাতে টান খেলো ইনশিরাহ, কেমন শিউরে উঠে দু'চোখ বন্ধ করতেই টের পায় মুঈন তাকে ঘুরিয়ে দাড় করিয়ে দিল। সে জমে গেলো উৎকণ্ঠায়। তিরতির করে কাঁপছে ঠোঁট, ধীরে ধীরে চোখ খুলে দেখলো সে আয়নার সামনে, কি বলবে, কি করবে কিছু বুঝতে না পেরে সে বারবার একই কথা আওড়ায়,“মুঈন ঠান্ডা লাগবে মাথাটা মুছে নিন।”
ওকে পেছন থেকে আগলে ধরে, ঘাড়ে থুতনি ঠেকালো মুঈন,আয়নার ওর চোখে চোখ রেখে জড়ানো গলায় বলে,“ তোমাকে ভয়ংকর সুন্দর লাগছে সহজ সরল বাপের জটিল কন্যা। মনে এক বিধ্বংসী আত্মা এসে ভর করতে চাইছে, আমার একদম ইচ্ছে করছে না এই সৌন্দর্য নষ্ট করে দিতে। কি করি বলো তো! একটা বুদ্ধি দাও!”
এসব কি বলছে মুঈন নিজেও জানে না,কেমন অস্থির লাগছে নিজেকে। ইনশিরাহ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল,বললো না কিছু! মুঈন আবারও ঘুরিয়ে নেয় ইনশিরাহকে,ওর চোখে চোখ রাখে। ইনশিরাহ কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে মুঈনের চোখ দেখে, সত্যিই অন্য কেউ এসে ভর করেছে মুঈনের মাঝে,এই দৃষ্টি এক বিধ্বংসী পুরুষের।
ইনশিরাহ ভাবছে,নিজেকে বোঝাচ্ছে,“ইশি এসব স্বাভাবিক,যাস্ট কুল ডাউন হ্যা? লোকটা তোর স্বামী! এসব স্বাভাবিক ইশি! শান্ত হ!”
মুঈন কেমন পাগলামি শুরু করে দিয়েছে,ওকে আবারও ঘুরিয়ে ওর কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে,“আমি কাপুরুষ নই ইশি, তুমি বলো আমি কি করবো! আমি স্বামী হতে চাইলে কি খুব বড় অন্যায় করে ফেলবো আজ? আমি বুঝতে পারছি না। সিদ্ধান্ত হীনতায় ভুগছি! ”
ইনশিরাহ দু'চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলছে,“কুল ডাউন ইশি। হাজবেন্ড,লোকটা তোর হাজবেন্ড! মাম্মার যেমন পাপা হাজবেন্ড, মেজো মায়ের যেমন মেজো বাবা হাজবেন্ড, ছোটো মায়ের যেমন ছোটো বাবা হাজবেন্ড। অমন হাজবেন্ড। কুল ডাউন। মন শান্ত কর।”
দু'জনে দু'জনের অনুভূতির সাথে যুদ্ধ করতে ব্যস্ত যখন, হঠাৎ লাইট চলে যায়। মুঈন একটু থামলো, বাইরে বজ্রপাত হচ্ছে। ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার, মুঈন ইশিকে ছেড়ে দিয়ে কিছুক্ষণ লম্বা লম্বা শ্বাস নিয়ে কটেজ থেকে বেরিয়ে যায় লাইট কেন গিয়েছে বিষয়টা দেখতে। বারান্দায় গিয়ে অথরিটিকে কল করে সে।
ইনশিরাহ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রয়। মেঘের গর্জন, সাগরের গর্জন ছাপিয়ে হঠাৎ তার ফোনটা বেজে উঠতেই সে খানিকটা চ'ম'কে ওঠে, গিয়ে হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলে স্ক্রিণে তাকাতেই সে ধাক্কার মতো খায়। একটা বজ্রপাত যেন তার মাথাতেও পরলো। স্ক্রিনের নাম্বারটা তার অতি চেনা,একটা লাঞ্ছনা ইশির, ছ'বছরের লাঞ্ছনা। আবার কি চাইছে সে! ইনশিরাহ কেমন ভেঙেচুরে যায়। কাঁপা হাতে সে ফোনটাকে মেঝেতে ছুঁড়ে মারে প্রথমে, তারপর উঠিয়ে কাপা হাতেই সিমকার্ড খুলে ফোনটাকে দূরে ছুড়ে ফেলে রেখে দেয়।
বিছানায় ধপপ করে বসে সে হাঁপাতে থাকে, বাইরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাঁপাতে থাকে মুঈন। জেনারেটর সিস্টেম চালু হতেই লাইটস এসে আলোকিত হয় রিসোর্টের বাংলো আর কটেজ গুলো। কিছুক্ষণ বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থেকে মুঈন কক্ষে ঢোকে। ঢুকে দেখে ইনশিরাহ বিছানায় চুপচাপ বসে আছে,ভেজা শাড়িতেই।
মুঈন দরজা বন্ধ করলো। ধীরপায়ে এগিয়ে গেল ইনশিরাহর কাছে। ইনশিরাহ কোন নড়চড় করলো না, সে যে মলিন, মুঈন বুঝতে ব্যর্থ হয়। তার এই নির্লিপ্ততাকে মুঈন লজ্জা ধরে নেয়, যে লজ্জা একজন স্বামীর কাঙ্ক্ষিত! তার হাতে একটা হাত রাখে মুঈন। ইনশিরাহ হাত সরিয়েও নেয়না। মুঈন নিজের ডানহাতে ইনশিরাহর থুতনি উঁচু করে তুলে ধরে নম্রস্বরে আবারও বলতে শুরু করে,“ইশি,আক্ষরিক অর্থে একটা আয়োজিত বিয়ে এটা, তবে জানো সবকিছু আয়োজন করা ছিলো, পরিকল্পনা করা ছিলো ফরাজী ভীষণ ভালোবাসবে তার বৌকে, এই অনুভূতি, আমার এই সমর্পণের সদিচ্ছা, সবকিছু এই বিয়ের মতো আয়োজিত। আমি একটু একটু করে,একফোঁটা একফোঁটা করে আমার বৌয়ের প্রতি ভালোবাসা, আহ্লাদ সবকিছু আয়োজন করে রেখেছি,এই অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের মতো তুমি তোমার স্বামীর গুছিয়ে রাখা ভালোবাসা পেতে যাচ্ছো। তোমাকে একটুও কষ্ট করতে হবে না যা পেতে!”
ইনশিরাহ মাথা নিচু করে আছে। মুঈন অনুভূতি সামলাতে পারছে না, হ্যাচকা টানে ইনশিরাহকে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। বাইরে মেঘ ডাকছে, আর কক্ষের ভেতরে তোলপাড় চলছে মুঈনের অন্তঃপুরে।
মুঈন সিক্ত ইনশিরাহকে নিজের বুকের মাঝে মিশিয়ে নিয়ে তার ঘাড়ে নাক ঠেকায়, ইনশিরাহ চোখ বন্ধ করে নেয়। কেমন বেচারা হয়ে মুঈন বলে,“ইশি! বৌকে ভালোবাসার আগে ভালোবাসি কথাটা বলে নিতে হয়? আমি না এটা জানি না!”
একটু থামলো, ইনশিরাহর নরম তুলতুলে হাতটা তার গালে ছুঁইয়ে রেখে এ ভালোবাসার প্রথম চুমুটা খেলো মুঈন বধূর কন্ঠনালীতে। ইনশিরাহ বুঝলো তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, কিন্তু সে কোন কথা বলতে পারছে না। মুঈন পরম আদরের সহিত ইনশিরাহর দুকাধ ধরে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ওর দিকে ঝুকলো, ভেজা চুল গুলো ইনশিরাহর মুখের ওপর থেকে আঙ্গুল চালিয়ে সরিয়ে কেমন জড়ানো গলায় বললো,“চলো বলছি! ........ভালোবাসি বৌ।”
কতটা আবেগ ছিল কথাটাতে,যার গভীরতা ঠাওর করতে পারছেনা ইনশিরাহ,তার চোখ দু'টো ঝাঁপসা,সে অন্য অনুভূতি সামলাতে ব্যস্ত।
মুঈন এখন পাগলামি করছে না, তার ভেজা শার্ট টা অনেক ধৈর্য্য নিয়ে খুললো। এক হাতে ইনশিরাহর গাল আগলে ধরে মুঈন তার আদুরে পানপাতার মতো স্নিগ্ধ মুখটা সিক্ত করলো পাগলের মতো চুমু খেয়ে,দুগালে,কপালে, সিঁথিতে, কানের লতিতে,নাকের ডগায়,বন্ধ দু'চোখের পাতায়।
এই আদর গুলোও ফরাজী তার বৌয়ের জন্য আয়োজন করে রেখেছিলো,একটু একটু করে, একফোঁটা একফোঁটা করে।
থেমে গিয়ে মুঈন মাথা তুলে তাকায় হঠাৎ, ইনশিরাহ চোখ বন্ধ করে রেখেছে। মুঈন খুব কোমল স্বরে বলে,“তোমার প্রতি একটুও আধিপত্য বিস্তার করতে যাচ্ছি না বৌ, আমি নিজেই নিজেকে সমর্পণ করছি তোমার কাছে, ফরাজী ইজ ইয়র! Always, in this life, Faraji will always be at your service ম্যাডাম!”
নরম তুলতুলে হাতের আঙ্গুলের ভাঁজে শক্ত রুক্ষ হাতের আঙ্গুল রাখা হলো, বৌয়ের জন্য জমিয়ে রাখা আদর গুলো গলায় ,ঘাড়ে মাখিয়ে দিয়ে মুঈন এবার হাত বাড়ালো ইনশিরাহর ভুষনে, আঁচল ধরে একটানে যখন শাড়ির অংশটা সরিয়ে ফেললো,ঠিক তখনই হুহু করে কেঁদে ফেলে ইনশিরাহ। দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছে যেন তার,ঠিক এমন শোনাচ্ছিলো তার কান্নার শব্দ। মুঈন থেমে যায়, অনুভূতি দমিয়ে রেখে বিমূঢ় হয়ে চেয়ে থাকে ইনশিরাহর মুখের দিকে। ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরছে কান্না, ইনশিরাহ দু'চোখ বন্ধ রেখেই কাঁদতে কাঁদতে বললো,“আমি আর কটাদিন সময় চাইছি মুঈন। প্লিজ! আই বেগ ইউ!”
চলমান......