#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৬৮
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
সবার সাথে,বেশ মনোযোগী শ্রোতা হয়ে তাদের কথা শুনলেও ইহানের দৃষ্টি ছিলো প্রেরণার দিকে, ভদ্রমহিলা কখনো সামনে আসছেন, কখনো আড়ালে চলে যাচ্ছেন। কাজ করতে,ছুটতে সে বেশ পটু ইহান জানে। ভাইয়ের জন্য থানায় ছোটাছুটি, সুদূর নেপাল যাওয়া,বোনের জন্য, ছেলের জন্য ছোটাছুটি। এই নীলচোখা সাদামাটা ভদ্রমহিলা মিলখা সিংয়ের লেডি ভার্সন। এই মহিলার জীবন বৃত্তান্ত নিয়ে যদি কখনো সিনেমা তৈরি হয় তাহলে সেই সিনেমার নাম হবে,“ভাগ প্রেরণা ভাগ।”
আচ্ছা এই মহিলা একজন স্ত্রী হিসেবে কেমন ছিলো? ওর মৃত স্বামীর ব্যাপারে একবার আলো ইনায়ার কাছে জানতে চেয়েছিলো,ইনায়া বলেছে,“আপু তার পার্সোনাল বিষয় নিয়ে গসিপ একদম পছন্দ করে না,প্রিতম নিষেধ করেছে এসব ব্যাপারে বলতে।”
ইহান ধরে নেয়,কারো বৌ হিসেবে প্রেরণা ছিলেন অমায়িক। ভাবতে ভাবতে মুচকি হাসে ইহান। তার দৃষ্টি দূরে কর্মচারীর সাথে হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলতে থাকা ধূসর রঙের একটা সুতি শাড়ি পরিহিতা প্রেরণার দিকে স্থির। ইহানকে দেখে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ওয়াজেদ বলে ওঠে,“এভাবে মুচকি হাসছো কেন তাজওয়ার?”
ইহান দ্রুত নিজের মুখভঙ্গি গম্ভীর করে দাঁড়িয়ে থাকে,হাতের জুসের গ্লাসে চুমুক দিয়ে আবারও তাকায় সে, প্রেরণা আবারও চোখের সামনে আসে। ভদ্রমহিলা ঘামছেন, চোখ মুখ মলিন। ইহান সেই মলিনতা দেখে, মুগ্ধ হয়ে, লুকিয়ে লুকিয়ে।
অন্যমনস্ক ভাব কাটে ইহানের কারো সাথে ধাক্কা লেগে। গ্লাসে সব জুস তার ধবধবে সাদা পাঞ্জাবিতে,পেটের কাছে লেপ্টে আছে। ইহান নিজেকে দেখে, বাকিরা ব্যস্ত হয়ে বলে,“ইশশ কি অবস্থা। যান তাজওয়ার,ওয়াশ রুম দোতলার যেকোনো ঘরে পাবেন।”
আজকের এই ইভেন্ট শেষ হবে সন্ধ্যা নাগাদ। তারপর প্রেরণার ব্যস্ততা প্রচুর। ছেলের সাথে দুই মিনিট কথা বলেছে ফাঁকে, ছেলেটার মন খারাপ। আজ সারাদিন মা'কে পায়নি। প্রেরণা আজ পেমেন্টের টাকা থেকে ছেলের জন্য খুব দামী একটা গিফট কিনে নিয়ে যাবে ঠিক করলো,মাঝে মাঝে একটু খরুচে তো হওয়াই যায় !
এই কমিউনিটি সেন্টারটা একেবারেই রাজ প্রাসাদের মতন বড়, এবং ভুল ভুলাইয়া মনে হয় প্রেরণার কাছে। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে গেলে হারিয়ে যেতে হয়। ফুড লাউঞ্জ থেকে বেরিয়ে প্রেরণা কমিউনিটি সেন্টারের ম্যানেজারকে খুঁজতে লাগলো, মুত্তালিব নয়,তাকে হায়ার করেছে এখানকার ম্যানেজার রিপা আনাম। পেমেন্ট টা তার কাছ থেকেই নিতে হবে।
খুঁজতে খুঁজতে রিপা আনামকে কোথাও না পেয়ে প্রেরণা তার অ্যাসিস্ট্যান্টদের কাছেই যেতে নিচ্ছিলো ঠিক তখনই এক লোক এসে, প্রেরণার কাছে রিপা আনামের অ্যাসিস্ট্যান্ট পরিচয় দিয়ে বললো,“ম্যানেজার আপা দোতলার রুম নাম্বার তেরো তে আছেন। আপনার পেমেন্ট নিয়েই কথা বলতে চাচ্ছেন। আপনাকেই খুজছে সে।”
প্রেরণা আন্তরিক হেসে,মাথা নেড়ে ধীরপায়ে দোতলায় উঠলো। দোতলা পুরোটা ফাঁকা। সব গেস্ট নিচে,ইয়ার্ডে। রুম নাম্বার তেরোতে প্রেরণা নক করে মাথা বাড়িয়ে উঁকি দিলো ভেতরে। এটাও সম্ভবত একটা অফিসকক্ষ। এই কক্ষের সাথে সংযুক্ত ওয়াশ রুম থেকে পানি পরার শব্দ ভেসে আসছে। কাউকে দেখতে না পেয়ে প্রেরণা ভেতরে ঢুকলো, তারপর গিয়ে ডেস্কের সামনে রাখা চেয়ারটাতে বসে পরলো।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে দরজা লাগানোর শব্দ হয়, খট করে শব্দ হতেই প্রেরণা লাফিয়ে উঠে দরজার দিকে তাকায়। গোল গোল চোখে চেয়ে থাকে দরজার দিকে।
পরমুহূর্তেই পেছন থেকে খট করে দরজা খোলার আওয়াজ হয়। প্রেরণা তড়িৎ ঘুরে তাকায়। ওয়াশ রুম থেকে বেড়িয়েছে স্বয়ং ইহান তাজওয়ার।
প্রেরণা হতভম্ব হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ইহান পাঞ্জাবির ভেজা অংশটাতে একটা টিস্যু চেপে চেপে নিচ্ছিলো,মাথা তুলে কক্ষে উপস্থিত প্রেরণার দিকে তাকাতে সেও কিছুটা অবাক। প্রেরণা ইহানের দিকে চায়, একবার চায় দরজার দিকে। ওর এলোমেলো দৃষ্টি অনুসরণ করে ইহান রাশভারী গলায় বলল,“আপনি!”
প্রেরণা অস্থির হয়ে দরজার কাছে যায়, দরজায় চাপর মেরে চেঁচিয়ে বলে,“বাইরে কে আছেন,দরজাটা খুলুন! আমরা ভেতরে আছি তো!”
ভীষণ অস্থিরতা ঘিরে রেখেছে প্রেরণাকে। ইহান স্থির দাঁড়িয়ে তাকেই দেখছে, কেমন ছটফট করছে সমুদ্রনীলা।
______
অনেকটা সময় নিয়ে ইনশিরাহ নিজেকে শান্ত করে, চোখ মুখ শক্ত করে আবারও সাঈমের দিকে তাকিয়ে বলে,“অনেক ধৈর্য্য নিয়ে তিনটে সিমকার্ড চেঞ্জ করেছি, এটা লাস্ট ওয়ার্নিং!”
সাঈম চেয়ারে নিজের পিঠ হেলিয়ে দিয়ে শুকনো হাসি হাসলো, বললো,“তোমার বলা হয়েছে?”
ইনশিরাহ নিশ্চুপ। সাঈম হাসলো, বললো,“মাই গড! এতোটা ভেবে নিলে!”
_নাটক বন্ধ করো!
তেজ নিয়ে বলে ইনশিরাহ।
_তোমার কাছে আমার অ্যাপোলোজাইজ করার ছিলো, আর কিছুই না ইশি।
ঠান্ডা গলায় বলে সাঈম।
ইনশিরাহ তাকায়,সাঈমের মুখভঙ্গি গম্ভীর। খানিক বাদে বললো,“অন্যের বৌকে ফুসলানোর ইচ্ছে নেই, শুধু ক্ষমা চাওয়ার ছিলো তোমার থেকে, ইউ নো, আমি কোনো কিছুতে স্বস্তি পাচ্ছিলাম না কারণ....”
থামলো সাঈম তাকালো ইনশিরাহর দিকে,পর পর একটা লম্বা শ্বাস ফেলে প্রসঙ্গ পাল্টে বললো,“শাড়ি পরেছো! এতোটা এলোমেলো ভাবে শাড়ি কে পরিয়ে দিয়েছে, হাজবেন্ড?”
_ইউ আর গোয়িং ঠু ফার!
ধ'ম'কে ওঠে ইনশিরাহ।
_নো আ'ম নট! রিল্যাক্স! এতো রাগার কিছুই হয়নি! যাও, ফেস টু ফেস হয়ে ভালো লাগছে। আমি কখনোই তোমার আমার ছবি একসাথে মিলিয়ে আমাদের ঘনিষ্ট মুহুর্তের ভুয়া ছবি বানিয়ে তোমার স্বামীকে দেখিয়ে তার কাছে তোমাকে ছোটো করবো না! রিল্যাক্স!
ইনশিরাহর চোখ মুখ কঠিন, সে কপাল কুঁ'চ'কে রেখে তার ফোন আর পার্স টা হাতে তুলে নেয়।
________
ইয়াসার মির্জার হাত কাঁপছিল,তার হাতের ফোনের স্ক্রিণে তার দৃষ্টি ছিলো নিবদ্ধ।
ইনশিরাহ আর সাঈমের ছবিটিও তুলে পাঠানো হয়েছিলো তাকে। পিতৃত্ব তাকে সুখ দিয়েছে, জীবনে পরিপূর্ণতা দিয়েছে, কখনো হতাশ করেছে, কখনো প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, কখনো ব্যর্থ প্রমাণ করেছে। ইয়াসার মির্জা জীবনে কখনো থেমে থাকেনি তবুও, কখনোই না। আজ তার পিতৃত্ব তাকে কোন অপমানের মঞ্চে দাড় করাতে চাইছে?
একজীবনে ইয়াসার মির্জা কি একই সাথে ভালো স্বামী হওয়ার পাশাপাশি ভালো বাবা হয়ইনি? আসলেই কি তাই?
শরীর কাঁপছে লোকটার, বয়স ষাটের কাছাকাছি, ছোটো খাটো শারীরিক সমস্যা আছে, বুকে ব্যাথা হয় প্রায়শই। সবকিছু সামলে চলতে হয় সেজন্য।
আলো স্বামীর জন্য চিনি ছাড়া বাদামের ওকমা বানিয়ে সন্ধ্যা সন্ধ্যা ঘরে ঢুকেছিল, ভেবেছে স্বামীর কাছে আবদার করবে মেয়েটার কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য, বাড়িতে আজ সব ইনশিরাহর পছন্দের খাবার রান্না হয়েছে, মনটা আঁকুপাঁকু করছিলো মেয়েটাকে সেসব খাওয়ানোর জন্য।
স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা,না না, কাঁপতে থাকা সুদর্শন, প্রায় বৃদ্ধ লোকটাকে আলো দেখে চিন্তিত ভঙ্গিতে এগিয়ে গেলো, ছো মেরে তার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে আলো ছবিটা দেখলো। কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে সে।
_______
ট্রেনিং শেষ করে মুঈন আজ দ্রুত বাড়িতে ফিরবে বলে ঠিক করেছিলো। কেবিনে ঢুকেছে সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ, ইউনিফর্মের বোতাম দু'টো আলগা করে সে চেয়ারে বসে একটুখানি হাঁফ ছেড়েছিল। হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিয়ে, ফোনটা সুইচ অন করে লিস্ট দেখলো একটা,
১.মিঠির ক্যাটফুড।
২.ওটস।
৩.বিফ।
৪.ইনশিরাহর ডায়েট ফুড।
৫.হেলথ ড্রিংকস।
বাড়িতে ঢোকার আগে সুপার মার্কেট ঘুরতে হবে।
ফোনের নোটিফিকেশন বারে চোখ পরেছিল হঠাৎ, দেখলো মোট দুটো মেসেজ এসে ভীড় করেছে সেখানে। একটা ইনশিরাহর নাম্বার থেকে, একটা ছিলো অচেনা একটা নাম্বার থেকে।
______
প্রেরণাকে ভীষণ আ'ত'ঙ্কি'ত লাগছে ইহানের কাছে। ইহান পরিস্থিতি বুঝতে পেরে দরজার কাছে গিয়ে সজোরে দরজায় চাপড় মেরে বলে,“এক্সকিউজ মি! ইজ দেয়ার এনিওয়ান হেয়ার? আমরা আটকা পরেছি!”
চোখে মুখে সংকোচ প্রেরণার। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোঁটা। ইহান ওকে দেখে, তারপর দু'হাতে পাঞ্জাবির পকেট হাতাহাতি করে, মনে পরে তার ফোনটা আপনের কাছে রেখে এসেছে। ঘুরে ইহান প্রেরণার দিকে তাকায়,বলে,“আপনার ফোন?”
প্রেরণা নিজের হাত দেখে, তার হাতে ছিলো লিস্ট টা শুধু। তার পার্স নিচে আফ্রার কাছে।
মলিন মুখে প্রেরণা তাকিয়ে থাকে ইহানের দিকে। ইহান একটা লম্বা শ্বাস ফেলে আবারও দরজায় ধাক্কা দেয়।
বাইরে দাঁড়িয়ে হাসছিল ভুঁইয়ার লোক দু'টো। হাসতে হাসতে ওরা একে অপরের গায়ে গড়াগড়ি খায়। একজন আরেকজনকে বলে,“এখন খুলবি না, জনে জনে লোক উঠলে খুলে দিবি। ব্যাপক মজা হবে।”
প্রেরণা চুপচাপ এক কোণে সরে দাঁড়ায়, তার ঘাবড়ে যাওয়া মুখটা ইহান আড়চোখে দেখতে থাকে। বলে ওঠে,“আপনি এখানে এলেন কেন?”
_রিপা আনামের সাথে কথা বলতে।
আবারও নিস্তব্ধতা। ইহান আবারও দরজায় ধাক্কা দেয়। কাউকে ডাকে। কেউ আসে না।
ইহান ঘুরে প্রেরণার দিকে তাকায়, তার প্রেরণার ওপর রীতিমতো মেজাজ টা খারাপ হয়ে গিয়েছে প্রেরণার এতো অস্বস্তি দেখে। গম্ভীর হয়ে ইহান বলে,“হেই প্রেরণা! কি হয়েছে? এভাবে ঘাবড়ানোর কি আছে? আপনাকে এভাবে মানায় না! একদমই না।”
প্রেরণা শ্বাস ফেললো, শাড়ির আঁচলে কপালের ঘাম মুছে নিয়ে বললো,“আসলে তেমন কিছুই না,ব্যাপার টা কেমন যেন লাগবে। আপনি বুঝতে পারছেন?”
_একটুও কেমন যেন লাগবে না। দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ প্রেরণা,আমরা ভেতর থেকে বন্ধ করিনি!
_লোকে একটু হলেও বাঁকা চোখে দেখবে।
ইহান অদ্ভুত দৃষ্টিতে দেখছে প্রেরণাকে। পরপর হেসে বললো,“এটা কেমন ধরনের কথাবার্তা? এখানের মানুষের মেন্টালিটি অত লো নয়,আর কেউ কিছু ভাবলেও বা! আপনার সাথে এ ধরণের কথা যায় না।”
প্রেরণা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,“লোকের কথা? ভাবলেও বা? আসলে আমি না এতো বেপরোয়া নই ইহান। আমি লোকের পাঁচ কথা বড্ড ভয় পাই, নিজের বেলায় অন্তত, কারণ এই ধরণের লোকই কিন্তু আমার রুজি রোজগারের মাধ্যম। আমাকে তো এদেরকে পরোয়া করেই চলতে হয়। হেই কেই আমি করিনা ইহান এই ব্যাপারে,আমাকে বড্ড সাহসী দেখালেও আমি আমার সম্মান নিয়ে বড্ড আ'ত'ঙ্কি'ত থাকি।”
ইহান শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে প্রেরণাকে। কথাগুলো শেষ করে প্রেরণা চুপ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরে আবারও বলে,“আমি ওভার রিয়াক্ট করছি হয়তো, তবে আমার বদনামে বড্ড ভয়!”
ইহান আরও কিছুক্ষণ ওকে দেখে তারপর প্রেরণাকে পাশে সরতে বলে, পাঞ্জাবির হাত গুটিয়ে নিয়ে দরজায় সজোরে ধাক্কা দেয় বাহু দিয়ে, পরপর তার বলিষ্ঠ পা দিয়ে লাথি বসায় দরজায়।
ক্যাপ্টেন ইহান তাজওয়ারের চারটা লাথি যথেষ্ট ছিলো ঐ দরজার সিটকিনি ভাঙতে।
বাইরে ততক্ষণে লোকজন ভিড় করেছে শব্দ পেয়ে। সাগরের লোক দু'টো দাঁত বের করে হাসছিল ইহান তাজওয়ারের অপ্রস্তুত মুখটা দেখবে বলে।
প্রেরণা গোল গোল চোখে চেয়ে আছে ইহানের দিকে। লোকটা দরজাটা ভাঙবেই যদি, আরেকটু আগে ভাঙতে পারতো না? কেন এতক্ষণ অপেক্ষা করলো!
হঠাৎ বিরক্তি ধরলো ইহানের ওপর তার। পরপর নিজেকে শাসায়,“এসব কি? লোকটাও তো ভিক্টিম তোর মতো!”
মুত্তালিব চিন্তিত হয়ে ইহানের দিকে এগিয়ে আসে। বাকিরা একবার ইহানকে দেখছে একবার প্রেরণাকে। ইহানের মুখভঙ্গি গম্ভীর, দৃঢ়তা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তবে প্রেরণা অপ্রস্তুতের মতন রিপা আনামকে বলে,“আমি আপনাকে খুঁজতে এসেছিলাম, দরজাটা কেউ বাইরে থেকে লক করে দিয়ে চলে যায়!”
ইহান সবার দৃষ্টি এড়িয়ে নিচে নামে, গাম্ভীর্য নিয়ে, সবটা স্বাভাবিক যেন, এখানে দাঁড়িয়ে এদের কৌতুহলকে প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো মানে হয় না।
______
মুঈন তার কার্যালয় থেকে সোজা চলে যায় রেস্তোরাঁর সামনে,যখন ইনশিরাহ দ্রুতপায়ে মেইন গেট থেকে বেরোয়, তার পেছনে পেছনে নামে সাঈম। মুঈনকে ইনশিরাহ যখন দেখলো,থেমে গেল তার পা। দু'জনে দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। সাঈমের পায়ের গতিও থামলো।
ইনশিরাহ এগিয়ে এলো মুঈনের কাছে, অবাক হয়নি খুব একটা, মেসেজে সে জানিয়ে দিয়েছে সব, তবে এভাবে ডিউটি ফেলে চলে আসবে ভাবেনি ইনশিরাহ। দুকদম মুঈনের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো,“মুঈন আপনি !”
মুঈন একবার ইনশিরাহর দিকে তাকায়, তাকায় সাঈমের দিকে। সাঈম নেমে আসে, স্বাভাবিক ভঙ্গিতে।
সে সন্ধ্যায় মুঈন শুরুতেই সাঈমকে একটা ঘুষি মেরে দেয়। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব ইনশিরাহ পেছন থেকে মুঈনের হাত টা টেনে ধরে বলে,“মুঈন! স্টপ! চলুন বাড়িতে যাই।”
ঘুষিতে একটুও ভ্রুক্ষেপ হয়নি সাঈমের, সাঈম তাকিয়ে আছে ইশি মুঈনের হাতের দিকে, মুঈন ইশির হাত থেকে হাতটা ছাড়িয়ে নেয় নিজের। সাঈমের দিকে এগিয়ে গিয়ে টান টান হয়ে দাঁড়ায়, ইনশিরাহ শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে মুঈনকে দেখে।
সাঈমের ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে মুঈন ডান হাতের তর্জনী তুলে, সাঈমের চোখে চোখ রেখে, ভীষণ ক্ষ্যাপাটে হয়ে বলে ওঠে,“নট উইদ মাই ওয়াইফ!”
কন্ঠস্বর ভীষণ অচেনা মুঈনের, ইনশিরাহ নির্নিমেষ দেখছিলো শুধু, সাঈমও দৃষ্টি নামায়নি। মুঈন কথাটা বলে দাঁড়ায় না, ইনশিরাহর কব্জি চেপে ধরে ডান হাতের। ইনশিরাহ চমকায়। ভীষণ জোরালো ছিলো মুঈনের ছোঁয়া। ভীষণ ব্যাথা পাচ্ছিল হাতে,তবে বলেনি কিছু। ইনশিরাহর মনে হলো ইনশিরাহ এই হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইলে মুঈন এখানে তুলকালাম করে দেবে। ওকে তেমনই লাগছিল। আতঙ্ক এসে বাসা বাঁধে তার মনে।
পুরোটা রাস্তা মুঈন, ইনশিরাহ দু'জনেই চুপচাপ ছিলো। মুঈন ছাড়েনি ইনশিরাহর কব্জি। কটেজের বাইরে নেমে ই-ক্যাবের বিল মিটিয়ে দেওয়ার সময়ও মুঈন ইনশিরাহর হাতটা ছাড়েনি। কিন্তু যখনই কটেজে ঢুকলো,তখন ছেড়ে দিলো হাত।
সামিন মুঈন-ইশির ড্রয়িং রুমে দাড়িয়ে আছে। আলো একটা সোফাতে গা এলিয়ে দিয়ে বসে আছে, দু'চোখ ভেজা তার। দরদর করে পানি ঝরছিল দু'চোখ থেকে।
ইনশিরাহ মাম্মা পাপা, দু'জনকেই দেখলো। দুকদম এগিয়ে গিয়ে বললো,“পাপা তুমি!”
সামিন স্থির দাঁড়িয়ে,মেয়ের দিকে বিমূঢ় চেয়ে। ইনশিরাহ বুঝে নিলো সবটা, বললো,“পাপা! পাপা আমি মুঈনকে মেসেজ করে গিয়েছিলাম, আমার ইনটেনশন খারাপ ছিলো না পাপা,ওটা পাবলিক প্লেস ছিলো!”
আলো শাড়ির আঁচল দিয়ে দু'চোখ ঢাকে। ইনশিরাহ এগিয়ে গিয়ে বলে,“মাম্মা! ওভার রিয়াক্ট করছো! আমি সত্যি বলছি! মুঈনকে জিজ্ঞেস করো!”
মুঈন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ইনশিরাহ হাতে টান খেলো হঠাৎ। সামিন মেয়ের কব্জি ধরে টেনে মুখোমুখি দাঁড় করালো নিজের। ইনশিরাহ চোখ বড় বড় করে পাপাকেই দেখলো। একটা ঢোক গিললো সে। সামিন মেয়ের দুকাধ ধরে শান্ত স্বরে বলতে থাকে,“একটা ধ্রুব সত্যি কথা শুনবেন আম্মা? আমি,এই ইয়াসার মির্জা,আপনার মা এবং আপনার প্রতি ভীষণ রকমের দুর্বল, এবং এটাই সত্যি! আজ যদি এমনটা না হতো তবে আমি হয়তো আপনাকে একটা থাপ্পর মারতে পারতাম! বিশ্বাস করুন।”
ইনশিরাহ কোমল স্বরে ডাকে,“পাপা।”
সামিন কঠোর হলো ভীষণ, ক্ষেপে উঠলো মেয়ের ওপর, দুকাধ ধরে ঝাকুনি দিয়ে বলে,“কেন যাবে? বলো কেনো যাবে? ও কে? তোমার বন্ধু? তোমার আত্মীয়? তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী? না! ও একটা পরপুরুষ! এবং তুমি বিবাহিতা! কি কাজ তোমার ওর সাথে? কিসের লেনা দেনা তোমার! বলো! জবাব দাও!”
চেঁচায় সামিন।
_পাপা আ'ম টেলিং ইয়ু, আমার ইনটেনশন খারাপ ছিল না! ও আমার সাথে যোগাযোগের চেষ্টায় ছিল, এবং ফেস টু ফেস হওয়া দরকার ছিলো আমার!
সামিন ভীষণ ক্ষেপেছে, চেঁচিয়ে উঠলো,“জোক করছো তুমি? কি সাপোর্ট করেছি তোমার? বলো! তোমার ধৃষ্টতা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে! এই স্বাধীনচেতা স্বভাবকে আমি ইয়াসার মির্জা সাপোর্ট দিয়েছি তোমার? যাতে তুমি নিজের সাথে সাথে আমাদের তিনজনকে এভাবে অপদস্থ করো? আগে তুমি ভুল করতে! এটা ছিলো অন্যায়!”
মুঈন চুপচাপ ওদের তিনজনকে দেখছে। সামিন মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,“জবাব কেনো দিচ্ছো না? এই দায় কি আমি মাথা পেতে নেব ইনশিরাহ? আমি কি মেয়েকে এভাবে শিক্ষা দিয়েছি যাতে তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে বাইরের কিছু লোক,সে সেই সুযোগ নিজেই তাদের দিয়ে দেয়? নিয়ে নেই আম্মা আমি এই দায়?”
ইনশিরাহ চুপ করে থাকলো, আলো কাঁদছে, আজ কিছু বলতেও পারছে না সে। বাবা মেয়ের কথোপকথনের মাঝে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,“ওরা এসে গিয়েছে! এখন বাড়িতে চলুন। আমি বিশ্রাম নিতে চাচ্ছি।”
ইয়াসার মির্জা মেয়ের নির্লিপ্ততা দেখে ভয়ংকর রেগে গিয়ে ইনশিরাহর কনুই ধরে নাড়া দিয়ে গর্জে ওঠে,“তুমি জবাব কেনো দিচ্ছো না।”
মুঈন গিয়ে শশুরের কাছ থেকে ইনশিরাহকে ছাড়িয়ে এনে সামিনের দিকে তাকায়, ভীষণ শান্ত লাগছে তাকে, শশুরকে বললো,“বাবা, আই থিংক আমাদের দুজনের আলোচনা করা দরকার এ ব্যাপারে। আপনি আর মা শান্ত হয়ে বসুন, রাতে খেয়ে যাবেন আপনারা!”
সামিনকে ভীষণ অসহায় লাগছিল সে সময়, সে মুঈনের দিকে তাকিয়ে একটা কথাই বললো,“আমি বলেছিলাম আমার মেয়ের চোখ দিয়ে যেন পানি না ঝরে, এটা বলিনি ওর সমস্ত অন্যায় চুপচাপ মেনে নাও। তোমার যতটুকু লেগেছে,এর কৈফিয়ত তুমি ওর কাছে চাইবে! এটা আমার আদেশ!”
গিয়ে আলোকে টেনে তুললো সামিন, মেয়ের দিকে করুণ দৃষ্টিতে একপলক তাকিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে বেড়িয়ে যায় তখন।
গাড়ি নিয়ে এসেছিল ওরা, কিছুটা দূর যেতেই আলো শরীর ছেড়ে দেয় গাড়ির ড্যাশবোর্ডের ওপর। এক হাতে স্ত্রীকে আগলে ধরে সামিন, আরেকটা হাতে গাড়িটাকে পার্ক করে রাস্তার এক পাশে, স্ত্রীকে আগলে নিয়ে সামিন হতভম্ব হয়ে বলে,“কি হয়েছে?”
লালাভ আভায় ছেয়ে গিয়েছে আলোর মুখ, কাঁদতে কাঁদতে বলছে,“আজ কেনো আমার বিষ খেতে ইচ্ছে করছে?”
ভীষণ রকমের হতবাক হয়ে সামিন ওকে বুকে টানলো,আলো ফোপাচ্ছে,বলছে,“এতদিন মা হিসেবে ব্যর্থ লাগতো নিজেকে, আজ মনে হচ্ছে মা হওয়ার যোগ্যতাই আমার নেই, সেটা অনেক বছর আগে একবার বুঝেছিলাম, আজ আবারও। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে মেয়র সাহেব। আমি মনে হচ্ছে মরে যাচ্ছি।”
চলমান......