#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৬৯
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
ইহান বেরিয়ে যাওয়ার পরেও সবাই ঘুরে ঘুরে প্রেরণাকে কিছুক্ষণ দেখলো। একটা সাধারণ ব্যাপারকে এতোটা রাঙিয়েও দেখা যায়,প্রেরণা সব লোকের দৃষ্টি দেখে বুঝলো কথাটা। বাকিটা সময় নিজের মেজাজটাকে শান্ত রেখে প্রেরণা কাজ করলো, তারপর পেমেন্ট নিয়ে বিক্ষিপ্ত মেজাজে বাড়ির দিকে চললো। এসব ঝেড়ে ফেলে তাকে ছেলের জন্য একটা গিফট নিতে হবে।
_______
সামিন আলোকে শক্ত করে ধরে রাখলো, আলো হাপাচ্ছে। হাঁপাতে হাঁপাতেই বললো,“আমি না আপনারও যোগ্য ছিলাম না, কিন্তু আপনি আমাকে বেঁধেছেন, এতো লাই দিয়েছেন। আমাকে দু দুটো সন্তান দিয়েছেন, তাদের একজনকে তো আমি ধরেই রাখতে পারিনি, আরেকজন, তাকে তো আমি ধরতে চেয়েও পারিনা কখনো, বরাবর অধরা থেকে গিয়েছে মেয়েটা। আর আজ! আমি বড্ড ক্লান্ত! আপনি না আমাকে বলেছিলেন একবার,জীবনে অসংখ্যবার কিছু না কিছু ভুলভাল ঘটবেই, আমাদের চেষ্টা করতে হবে সেসব থেকে পজিটিভ কিছু খুঁজে বের করা,সামনে এগিয়ে চলা! কই আমি পাচ্ছি না কেন? বলুন না!”
কাঁদছে আলো, কাঁপছে আলো, সামিন শুধু চেয়ে চেয়ে ওকে দেখছে।
জোর করে ওকে সিটে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিয়ে সিট বেল্ট ঠিক করে সামিন,শান্তিনীড়ের গেটে এসে পৌঁছাতেই আলোর শরীরটা খারাপ লাগতে শুরু করে আরো বেশি, ইহানের গাড়িও তখন শান্তিনীড়ের গেটে। সেও ফিরেছে ইভেন্ট থেকে বিক্ষিপ্ত মেজাজ নিয়ে।
বড় মাকে এভাবে দেখে এগিয়ে যায়, হতভম্ব হয়ে বলে,“কি হয়েছে? তোমরা কোথায় গিয়েছিলে?”
সামিন কোনো জবাব না দিয়ে বলে,“ওকে ঘরে নিয়ে শুইয়ে দে।”
বড়মাকে দুহাতে পাঁজাকোলা করে তুললো ইহান,ঠিক যেমন ছোটোবেলায় বড় মা তাকে তুলতো।
_______
সামিনরা বেড়িয়ে যাওয়ার পরে ইনশিরাহ ঝাপসা চোখে মুঈনের দিকে তাকায়, মুঈনের দৃষ্টি স্বাভাবিক।
ইনশিরাহ কন্ঠে নিদারুণ কোমলতা ঢেলে বললো,“মাম্মা পাপা ভুল বুঝেছে আমাকে, তারা হয়তো বিষয়টা বোঝেনি, আপনি অন্তত ভুল বুঝবেন না আমাকে! আমি ভ্রষ্টাচারিনী নই!”
একটু থেমে দম নিয়ে ইনশিরাহ আবারও কাঁপা গলায় বলে,“ভ্রষ্টাচারিনী নই আমি!”
আবারও বললো,“মাম্মা পাপা ভুল বুঝছে। কেমন ওভাররিয়াক্ট করলো মাম্মা দেখেছেন? আমাকে একটুও বিশ্বাস করলো না।”
মুঈন শান্ত চোখে ওকে দেখছিলো, হঠাৎ রাশভারী আওয়াজে বললো,“বাবা মা তোমাকে ভুল বোঝেনি! ভ্রষ্টাচারিনী বোঝেনি তোমাকে, তারা তোমাকে ভুল বুঝেছে এটা বোঝা তোমার বোঝার ভুল! তুমি হয়তো বুঝতেই পারবে না বাবা এতোটা রিয়াক্ট কেন করেছেন আর মা এভাবে কেন কাঁদলেন। তাই বাদ দাও! রেস্ট করো।”
মুঈন ভীষণ শীতল জবাব খানা নিক্ষেপ করে ঘুরে দাড়াতেই ইনশিরাহ বলে,“তো বুঝতে চাই আমি! বলুন! বুঝিয়ে বলুন! আমি এক্সপ্লানেশন দেওয়ার পরেও পাপা এমন কেন করলো? মাম্মা এত কাঁদল! কেন? বলুন!”
মুঈন এবারও ওকে বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলে,“পারবে না তুমি বুঝতে! ট্রাস্ট মি ইশি!”
লোকটার এই একরোখা,তেজী, শীতল আচরণ ক্ষণে ক্ষণে পীড়া দিচ্ছে ইনশিরাহকে। মুঈন ঘরে ঢুকলো, ইউনিফর্ম ছেড়ে ফ্রেশ হলো। ইনশিরাহ চুপচাপ ওকে দেখছিলো। অস্থির লাগছে,অসহ্য লাগছে, এক ছুটে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করছে।
মুঈন ফ্রেশ হয়ে এসে টেবিলে খাবার সেট করে শান্ত স্বরে ওকে ডাকলো, ইনশিরাহ গেলো না, তার খেতে ইচ্ছে করছে না। তার অস্থির মনটাকে শান্ত করতে চাইছে শুধু,কি করবে সে? কি করবে?
ঘরের এককোণে, মেঝেতে বসে হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে ছিলো সে।
মুঈন ওকে হাত ধরে টেনে নিয়ে বসালো টেবিলে, লোকটাকে দেখে ক্রমে ক্রমে ঘাবড়ে যাচ্ছে ইনশিরাহ। পুরুষের এই শীতলতা ভয়ংকর, ভয় লাগে।
চুপচাপ খেলো দুজন, মুঈন একবার সামিনকে কল করলো,এটা জানতে, সামিন আলো পৌঁছেছে কি না। কলটা তখন রিসিভ হয়নি।
রাতের নিস্তব্ধতায় ঢাকা পরেছে দুজন। গোটা কটেজ অন্ধকার। শুধু মুঈন ইশির রুমের টেবিল ল্যাম্প টা জ্বলছিলো। খাওয়ার পরেও ঘরে ঢুকে ইনশিরাহ হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে বসেছিল কিছুক্ষণ। মুঈন বিছানায় বসে একটা বই নাড়াচাড়া করছিলো। শান্ত, গম্ভীর মুখভঙ্গি তার।
ইনশিরাহ ঘরের মেঝেতে এক কোণে বসে বেশ কয়েকবার মাথা তুলে দেখলো ওকে, ঘনঘন নিশ্বাস ফেললো কিছুক্ষণ, তারপর উঠে দাঁড়ায় ধীরে ধীরে। সবকিছু শেষ করবে সে আজ, এই অস্থিরতা, এই অন্তর্দহন, এই এলোমেলো দিন, এই অগোছালো সম্পর্ক, সবকিছু শেষ করবে সে।
অনেকটা সাহস সঞ্চয় করে ইনশিরাহ। মুঈন ওকে দেখেওনি, তার দৃষ্টি হাতের বইতে নিবদ্ধ।
ইনশিরাহ ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় তার কাবার্ডের কাছে। কাবার্ডের দরজা খুলে একটা লাল রঙের নতুন নাইটি সে বের করে আনে। এটা তিথি তাকে উপহার দিয়েছিলো বিয়ের পরে।
একটা শ্বাস ফেলে ইনশিরাহ ওয়াশ রুমে গিয়ে গাঁয়ের সুতি শাড়িটা পালটে ঐ নাইটিটা পরে নেয়। অতঃপর আয়নায় নিজেকে দেখে, এই ইশিকে সে আজ নতুন দেখছে, একজন খোলামেলা, সর্বোচ্চ আবেদনময়ী রূপে। নিজেকে নিজে কিছুক্ষণ দেখে। চুল গুলো খুলে দেয়, হালকা পারফিউম মেখে চুপচাপ বেরিয়ে আসে ওয়াশ রুম থেকে।
মুঈন তখনও বেশ মনোযোগ দিয়ে বই দেখছিলো। ইনশিরাহ ধীরপায়ে এগিয়ে যায় ওর কাছে। গিয়ে ওর মুখোমুখি বসে। ইনশিরাহ টের পাচ্ছে,তার গা কাঁপছিল। এই সাহস, এমন নির্লজ্জ সাহস তার নেই, তবুও সে সাহস করলো।
মুঈন বই থেকে চোখ তুলে তাকাতেই থমকাল, রিডিং চশমার আড়ালে দুটি সুন্দর চোখে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে সে ইনশিরাহকে অবলোকন করতে থাকলো শুধু।
ইনশিরাহর হাত থরথরিয়ে কাঁপছে,তবুও সে তার কাঁপা হাতে মুঈনের হাত থেকে বইটা টেনে নিয়ে পাশে রেখে দেয়।
আরেকটু ঘনিষ্ট হয় মুঈনের সামনে। ঘামছে সে খুব। মুঈন অনিমেষ দেখছিলো তাকে।
এরপর মুঈনের চোখ থেকে রিডিং চশমাটা টেনে খুললো ইনশিরাহ। ওটাও পাশে রেখে,আরেকটু ঘনিষ্ট হলো মুঈনের। কাঁপা হাতে মুঈনের শক্ত হাত দু'টো টেনে নিজের লতানো কোমরে রাখলো। মুঈন চেয়ে চেয়ে দেখলো, একপ্রকার ঠকঠক করে কাঁপছে ইনশিরাহ।
ইনশিরাহ আরেকটু এগিয়ে যায়, দু'জনের মাঝে তখন ইঞ্চিখানেক দূরত্ব। ওর কাঁপতে থাকা হাতেই মুঈনের গাল আগলে ধরলো ইনশিরাহ,ঠিক তখনই মুঈন ওর হাত দুটো আগলে ধরে অস্ফুটে বললো,“কি করছো টা কি!”
ইনশিরাহ ঘামছিলো,একটা ঢোক গিললো, বললো,“হয়তোবা এজন্য, হয়তোবা এজন্য আমাদের কমিউনিকেশনটা প্রপারলি এগোচ্ছে না। হয়তোবা এসব হলে সম্পর্কটা এভাবে আটকে থাকবে না। হয়তোবা আসলেই এটা সবকিছুর সমাধান হতে পারে!”
বলতে বলতে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেলো ইনশিরাহর ভেতর থেকে।
মুহুর্তেই ভীষণ রাগ ধরে গেলো মুঈনের, ধৈর্যচ্যুতি হয়ে আজ ভদ্রলোক মুঈন একটা কাণ্ড করে বসলো,উঠে দাঁড়িয়ে হাতের কাছে একটা কাঁচের বক্স পেয়ে এক ঝটকায় সেটা ফেলে দিল মেঝেতে, চূড়মার হয়ে ভেঙে গেলো তা। ইনশিরাহ চমকায়,ভীত চোখে তাকিয়ে থাকে মুঈনের দিকে।
মুঈন দেয়ালে একটা সজোরে ঘুষি মেরে চেঁচিয়ে উঠলো,“তুমি! এই সম্পর্কটাকে বারবার একটা পয়েন্টে এনে ব্যাখ্যা কেন করছো স্টুপিড গার্ল? হোয়াই? ইউ থিংক,ফর মেন,ম্যারেজ ইজ অল আবাউট শারীরিক সম্পর্ক এবং তোমার মাথা ভর্তি ঠাশা বিয়েতে ফালতু অ্যাডজাস্টমেন্টের যে ব্যাপারগুলো, সেগুলো? আন্সার মি!”
ইনশিরাহ তাকিয়ে আছে শুধু। মুঈন বড্ড অশান্ত হলো, বড্ড বেশি অশান্ত হলো। ইনশিরাহর হাত ধরে টেনে বিছানা থেকে নামিয়ে একেবারে দেয়ালের সাথে মিশিয়ে দাড় করালো, ওর হাতটা শক্ত করে ধরে চেঁচিয়ে উঠলো,“কেন টানছো কাছে? সময় নেওয়া হয়ে গিয়েছে? সহজ হয়ে গিয়েছো আমার সাথে তুমি?”
ইনশিরাহর বুকের হাপর ওঠানামা করছে,কিছু বলতে পারছে না সে,মুঈন তাকে কিছু বলার সুযোগও দিচ্ছে না। মুঈন আশেপাশে তাকিয়ে একটা ফুলদানিতে সজোরে লাথি মেরে বলে,“হ্যা! আমার বৌ তো আমার সাথে বেশ সহজ হয়েছে! এতোটাই সহজ হয়েছে যে তাকে একটা লোক গত কিছুদিন ধরে কন্টিনিউয়াসলি বিরক্ত করছে,সেটা সে আমাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি। এবং আজ ধেই ধেই করে তার সাথে বোঝাপড়া করতে গেলো উইদাউট এনি প্রটেকশন, আরে আমাকে জানিয়েছে তো! জানিয়েছে! জানিয়ে আমাকে ধন্য করেছে! তার এই সম্পর্কে এক বালতি অবদান রাখা শেষ আমাকে মেসেজে জানিয়ে। একটা কথা তো সত্যি, আপনি সাচ্চা মানুষ, কোনো ভেজাল নেই। তবে আসুন,আপনাকে মাথায় তুলে নাচি! ”
ইনশিরাহ আর কিছু বলে না, মুঈন বলতে থাকে,“বাবা মা ওভার রিয়াক্ট করছে! হ্যা করছেই তো! মাকে এসিড ছুড়েছে তার ভাইপোর সাথে ছ'বছরের রিলেশনে প্রতারিত হবার পরে, স্বেচ্ছায় বিয়ের পিঁড়িতে বসার পরে, যখন দুজন বৃদ্ধা বৃদ্ধ একটু স্বস্তি পেয়েছিল, তারপর একজন বাবা বাইরের লোক থেকে দেখে আবার তার মেয়ের নামে অপবাদ,এসব ছবি, মাথায় হয়তো কত কত ভাবনাও এসেছিল তার,তার মেয়ে হয়তো আবারও ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছে।তবে তো বাবা মা ওভার রিয়াক্ট করবে না! নাকে সরষের তেল মেখে ঘুমাবে বাবা! আর মা, সে তো কাঁদবে না, সে নাচবে। বিয়ের দিনের পরে থেকে ঘটনাগুলো মনে করে দেখো,মা কতটা আত্মগ্লানিতে ভোগেন আমাদের বিয়ের সিচুয়েশানটা নিয়ে এখনও, তবুও মনের জোর খাটিয়ে তোমাকে,আমাকে কম সময় দিচ্ছে না! আজ যখন সাময়িক সময়ের জন্য মনে হলো সে ব্যর্থ হয়েছে,তখন তার আত্মগ্লানি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে না! কাঁদবে না মা! মা কখনো তোমাকে বোঝেনি। তুমি বুঝতে দিয়েছো? মা যেটুকু বুঝেছে,তোমাকে ভুলই বুঝেছে, তুমি কখনো তার সাথে সহজ হয়েছো? বলো, বলো তো আমাকে!”
একটু থেমে মুঈন দম নিয়ে বলে,“তোমার সমস্যা আছে বলো, তোমার সাহায্য দরকার বলো। ইনশিরাহ অথচ আমি দেখছি তুমি হাতটা গুটিয়েই রেখেছো!”
আবারও দম নেয় মুঈন, এবার কন্ঠস্বর নরম করে বলে,“আর এই বিয়ে, ইনশিরাহ তুমি বলো তুমি সময় চাও, তোমার একজনের সাহায্য দরকার এই বিয়ের ব্যাপারে, সাইক্রিয়াটিস্ট দেখাবে, অথচ ইনশিরাহ এই সম্পর্কটা এমনই কিছু যেটা অন্য কেউ কখনোই ফিল করিয়ে দিতে পারবে না তোমাকে, এটাকে শুধু তোমাকে, নিজের মতো করেই অনুভব করতে হবে! যেমন টা আমি করি!”
শেষের কথাটায় কিছু একটা মেশানো ছিলো মুঈনের, ইনশিরাহ মাথা তুলে তাকায় ওর দিকে। মুঈন একটা লম্বা শ্বাস ফেললো, বললো,“সাইক্রিয়াটিস্ট অবশ্যই দেখাবে তুমি। তবে বাবা মাকে বুঝতে,তাদের কাছে নিজেকে বোঝাতে। আমাদের সম্পর্কের মাঝে কোনো সাইক্রিয়াটিস্ট ঢুকবে না! যখন বিনা সংকোচে,বিনা দ্বিধায়, কোনো রকম লুকোছাপা,কোনো রকম বাধ্যতা, কোনো রকম পিছুটান, কোনো রকম ঠকঠক করে কাঁপতে থাকা হাত ছাড়া তোমার ইচ্ছে হবে আমাকে কাছে টানতে, আমি আগ্রহ নিয়ে সাড়া দেবো। তার আগে না স্বামী হিসেবে আমি আমার আত্মসম্মানে আঘাত লাগাতে চাইছি, না তো তোমাকে অপরাধবোধে ভোগাতে চাইছি। যেখানে আমাদের দুজনের কোনো দোষ নেই, শুধু কিছু পরিস্থিতি দায়ী,কিছু বাজে, বিদঘুটে পরিস্থিতি।”
মুঈন এবার কাছে টানলো ইনশিরাহকে, ইনশিরাহ বিমূঢ় চেয়ে আছে লোকটার দিকে। ওকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুললো মুঈন, ধীরপায়ে হেটে বিছানার কাছে এগিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিলো ইনশিরাহকে। কন্ঠে ভীষণ কোমলতা ঢেলে মুঈন বললো,“এবার আমি একটা অভিযোগ করি এই আরেঞ্জ ম্যারেজের তুমি বৌটাকে নিয়ে?”
নিষ্পলক দেখছে ওকে ইনশিরাহ,মুঈন বলে,“তুমিও সবাইকে যেটুকু বোঝো,তার চেয়েও বেশি ভুল বোঝো! অথচ বাবা,মা বা আমি, তোমার অনুভূতি খুব সহজ ভাবে সামলাতে চাই।”
কপালে প্রগাঢ় একটা চুমু খেলো মুঈন,নিজে শান্ত হলো, ভীষণ শান্ত হয়ে এবার বললো,“এই আরেঞ্জ ম্যারেজে! সবকিছুর সমঝোতা হোক, তবে কখনো যেন আমার ফোনে আর মেসেজ না আসে,“আমি অমুকের সাথে অমুক রেস্টুরেন্টে দেখা করতে যাচ্ছি, আমার একটু বোঝাপড়া দরকার, আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না ব্লা ব্লা ব্লা!.....
বাচ্চা মানুষ আপনি! বাচ্চামো বলে মাফ করে দিয়েছি এইবার, আর একটি বারের জন্যও এই ঘটনা,বা একই ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে আর মাফ হবে না। শাস্তি হবে। আর মোস্ট ইম্পরট্যান্টলি, যত ইচ্ছে সময় নাও, শুধু এখানে, মুঈনের আওতায় থেকেই নিজের সাথে ল'ড়ো, আমাকে বুঝিয়ো তুমি লড়ছো। তাতেই হবে। কখনো সখনো সাহায্যও করবো ট্রাস্ট মি!
ইনশিরাহ যে মুখে তালা লাগিয়েছে,সেই তালা খুলছেই না। মুঈন ওর অবস্থা দেখে হাসলো সামান্য। কেমন ছোটো বাচ্চাদের মতো সিটিয়ে গিয়েছে ভয়ে, মুঈন উঠে দাঁড়ায়,বলে,“ধমকা ধমকি বেশি করে ফেলেছি? এটাও একটা সমস্যা,আরেঞ্জ ম্যারেজে হাজবেন্ড ভীষণ ধমকায়,লাভ ম্যারেজ হলে স্টুপিড বৌটাকে মাথায় নিয়ে নাচানাচি করতাম আজ।”
ফোনটা এগিয়ে দেয় ইনশিরাহর কাছে মুঈন। বলে,“ধরো,বাবা মায়ের সাথে কথা বলো! এমন ভাবে বলো, অধিকার খাটিয়ে বলো,কন্ঠে দৃঢ়তা নিয়ে বলো যেন বাবার রাগটা পরে যায়। একটু একটু ছড়াতে হয় নিজেকে একটা সম্পর্কে ইনশিরাহ, তুমি কচ্ছপের একটা খোলস পরে আছো। এই খোলসটা তোমাকে একজন সাইক্রিয়াটিস্টের কাছেও পুরোপুরি নিজেকে মেলতে দেবে না।”
ইনশিরাহ হাত বাড়িয়ে চুপচাপ ফোনটা নিলো, তখন রাত এগারোটা প্রায়, সামিন কলটা রিসিভ করতেই ইনশিরাহ প্রথমে কোমল স্বরে ডাকলো,“পাপা!”
পরপর মুঈনের দিকে তাকিয়ে কন্ঠে দৃঢ়তা এনে বললো,“বাড়িতে পৌছেছো পাপা?”
সামিন কানে ফোন চেপে বিছানায় বসে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলে,“হ্যা। খেয়েছো তোমরা?”
দু'চোখ বন্ধ করে ইনশিরাহ শ্বাস নেয়, বলে, “হ্যা। মাম্মা কোথায়?”
_ঘুমাচ্ছে।
_কথা বলবো।
_শরীরটা যে ভালো নেই। কাল সকালে কথা বলিয়ে দিই?
কিছুক্ষণ দু'জনেই চুপচাপ, তারপর ধীরে ধীরে ইনশিরাহ বলে ওঠে,“আ'ম ট্রাইং পাপা, ট্রুলি, ফাইটিং উইদ মাই ওডস! কোনো দায় তোমার নেই,নিতে হবে না।”
সামিন দু'চোখ বন্ধ করে,চোখ ভিজে উঠছে তার, বেশ নম্রস্বরে বললো,“কাল ডক্টর নির্ঝর নাসিরের কাছে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে রাখবো? যাবে তুমি আমার সাথে?”
চুপচাপ, একবাক্যে, ইনশিরাহ বলে,“হু! প্লিজ!”
সে রাতটাতে ইনশিরাহ ঘুমিয়ে পরেছে দ্রুত। মুঈনও ঘুমিয়ে গিয়েছে খানিক পরেই।
সকাল সকাল আজ ইনশিরাহ উঠেছে মুঈনের ঘুম ভাঙারও আগে। উঠে সে-ই কটেজের লক খুলে ঝুমঝুমির মাকে ঘরে ঢুকিয়েছে। মুঈন আজ অনেকটা দিন পরে উঠে জগিংয়ে গিয়েছে। ইনশিরাহ যায়নি। সে ঝুমঝুমির মায়ের সাথে হাতে হাতে গুছিয়েছে অগোছালো ঘরটা।
সবকিছু গুছিয়ে, ঝুমঝুমির মা চলে যাওয়ার আগে ইনশিরাহ বললো,“ঝুমঝুমির মা, আমাকে সুন্দর করে একটা শাড়ি পরিয়ে দিয়ে যাবে? আমি নিজে থেকে সুন্দর করে পরতে পারিনা।”
ভীষণ অবাক হয়ে ঝুমঝুমির মা একটা টকটকে লাল ইক্কত শাড়ি ইনশিরাহকে পরিয়ে দিয়ে যায়।
আয়নায় নিজেকে দেখে ইনশিরাহ, তারপর বিড়বিড় করে মুঈনকে উদ্দেশ্য করে বলে,“আমার ঠেকা পরেনি আর আপনাকে কাছে টানতে। আপনি নিজেই টানবেন! আমি না! আমার ঠেকা পরেনি! পরেনি ! পরেনি! ঠেকা আপনারই পরবে ফরাজীর বাচ্চা!”
শাড়িটা অগোছালো করে, পেট টা সামান্য উন্মুক্ত করে ইনশিরাহ। অপেক্ষা করতে থাকে মুঈনের।
জগিং শেষে মুঈন কটেজে ফিরলো, ইনশিরাহকে দেখলো স্বাভাবিক দৃষ্টিতে। খেতে খেতে মিঠির ব্যাপারে কিছু কথাও বললো মুঈন, অথচ ইনশিরাহ উশখুশ করছে,মুঈন যেন তাকে নোটিস করে ঠিকঠাক ভাবে। মুঈন তো নোটিস করেছে, তবে বৌকে কাছে না টানার মতো ধৈর্য্য সে রেখেছে। খেয়ে দেয়ে ঘরের জন্য কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করে মুঈন রেডি হয়ে বেরিয়ে যায়।
এদিকে ইনশিরাহ ফুঁসছে। একা একা বলছে,“কত্তো বড় ধুরন্ধর লোক! আমাকে ইগনোর করে! কি সাহস! ইনশিরাহকে ইগনোর করে! ওনার এক জনমের ভাগ্য এতো সুন্দর বৌ পেয়েছে! সিডিউসড হবে না? ওনার ঘাড় হবে সিডিউসড! হবেই!”
বুক থেকে আঁচল কিছুটা নামিয়ে নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে ইনশিরাহ, বোঝার চেষ্টা করে তাকে কিভাবে নিগূঢ় আবেদনময়ী লাগবে।
নিজের পাগলামি দেখে নিজেই কিছুক্ষণ হাসে। তারপর ফোনটা তুলে মাকে কল করে। আলো শারীরিক ভাবে কিছুটা দুর্বল ছিলো,তবে মানসিক ভাবে স্বাভাবিক। মেয়ের কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ইনশিরাহ মুঈনের কথা অনুযায়ী কন্ঠে দৃঢ়তা নিয়ে বলে,“এই মাম্মা! তুমি তো ঘোড়ার ডিম! পাপা তোমার কি দেখে প্রেমে পরেছিলো?”
আলো ভীষণ অবাক। হতভম্ব ভাব কাটিয়ে আস্তে ধীরে বললো,“রূপ সৌন্দর্যের দিকে গেলে,উনি আমার চুল দেখে প্রেমে পরেছিলো শুনেছি। আর স্বভাব! ওটা আমি আজও বুঝিনি কেনো উনি আমার জন্য পাগল হয়েছিল। কেন?”
_কারণ আমিও ঘোড়ার ডিম,আমিও চাচ্ছি ওকে আকৃষ্ট করতে, একেবারে পাপা যেমন তুমি বলতে অজ্ঞান। বুঝেছো তুমি? একটা হেলদি ফ্যামিলি চাচ্ছি আমি!
আলো চুপ করে মেয়ের কথা শোনে, ইনশিরাহ বলে,“এই তুমি মেজো মাকে ফোনটা দাও তো!”
রিতু এলো, ইনশিরাহ বলতে লাগলো,“মেজো মা! মিউ মিউ বৌ কি করে হয় গো? কিছুদিন মিউমিউ বৌ হয়ে দেখবো, এমনিতে নিজের স্বভাব থেকে তো আমি বেরোবো না, কিছুদিন ভং ধরে থেকে দেখবো কেমন স্বভাব থাকলে একটা সম্পর্ক সতেজ বেশি থাকে। একটা গবেষণা করতে চাচ্ছি আমি। তার আগে বলো খাসির রেজালা কি করে তৈরি করে, তোমার পার্সোনাল রেসিপি টা দাও।”
রিতু তার পার্সোনাল রেসিপিটা দিলো। ঝুমঝুমির মা দুপুরে ছুটি নিয়েছে, ইনশিরাহ ঝুমঝুমির মা আসার অপেক্ষা করলো না, নিজেই রাঁধতে চলে গেলো, ভয়ে ভয়ে চুলা অন করলো। পাশে মিঠি মিউ মিউ করছিলো, ওর জন্য দুধ জ্বাল দিতে বসিয়ে দিলো।
এদিকে রেসিপি অনুযায়ী কিছুই পারছিলো না সে, পরিমাণে ভুল ভাল দিয়ে মেজাজ খারাপ করে হাতা খুন্তি ছোড়াছুড়ি করে ঘরে গিয়ে বসলো। বসে চুল টানতে লাগলো নিজের। ক্লান্ত লাগছে খুব, বিছানায় শুয়ে পরলো ওভাবেই, খানিক বাদে তন্দ্রার মতো এসে গেলো তার।
_______
ইহান তখন পার্টি অফিসে তালা লাগিয়ে বেরোচ্ছিল,তার ভীষণ তাড়া ছিল, সামিন হঠাৎ অফিসে যেতে বলেছে একটা কাজে।
দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে যখন নামছিল ইহান, নাহিদ এলো ছুটতে ছুটতে, হাঁপাতে হাঁপাতে, কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,“ভাই! ভাই ইশি!”
ইহান তাকিয়ে আছে জিজ্ঞাসা সূচক দৃষ্টিতে,অন্তর মুখে না বলে লাইভটা দেখালো, ততক্ষণে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয়েছে পুলিশ সুপারের কটেজ। সেটার লাইভ চলছে লোকাল নিউজ পোর্টাল গুলোতে।
মুঈন ফরাজী অফিসে ছিলেন, নতুন অফিসারদের সাথে মিটিং ছিল তার। খবরটা বড্ড দেরীতে পায় মুঈন। কনস্টেবল এলো, এই ভয়ংকর কথাটা আহাজারি করে বললো,“স্যার আপনার কটেজ পুড়ছে!”
চলমান.......