#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৭০
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
ইনশিরাহর পছন্দের কিছু প্ল্যান্টস ছিলো। সেগুলো ওর সাথে দিয়ে দেওয়া হয়নি। ইশির ঘরেই পরে আছে সেসব, অযত্নে কিছুটা। রিতু সকালের ফাঁকা সময়টিতে এসে সেগুলোর পরিচর্যা করলো আজ। পরী চেম্বারে, আলো নিজের ঘরে শুয়ে আছে। তাঁরও সময় কাটছে না, এই ফাঁকা বাড়িতে ভীষণ ভাবে একজন পুত্রবধূর অভাববোধ করছে সে।
ফোন বেজে উঠল হঠাৎ, শাড়ির আঁচলে হাত মুছে কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ইহানের কন্ঠস্বর শোনা গেল, ঠিকভাবে কথা বলতে পারছিলো না ছেলেটা, পারছিলোই না। যতটুকু বলতে পারলো,“মাম্মা! প্লিজ বড়মাকে কিছুক্ষণ সামলে রেখো!”
______
কটেজের কেয়ারটেকার ছিলো না ঐ সময়টিতে, পুরো এরিয়াটা অফিসারদের আবাসিক এরিয়া। ডিউটিটাইমে বিস্তৃত এই এরিয়া জুড়ে বিরাজ করছিলো পিনপতন নীরবতা। কোথাও একটা পাতা পরার শব্দ হচ্ছিল না। আশেপাশে কোথাও একজন পথচারী ছিলোনা,যেহেতু সংরক্ষিত এরিয়া।
অদূরে অফিসার্স মেসের তিনতলা থেকে একজন অফ ডিউটি কনস্টেবলের চোখে পরেছে আগুনের ঝলকানি। কটেজের ফাঁকফোকর থেকে ঠিকরে বেরিয়েছিলো কালো ধোঁয়া, পোড়া গন্ধে গুমোট হয়ে উঠেছিলো কাঠফাঁটা দুপুর।
অফ ডিউটি অফিসারদের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত,ফায়ার স্টেশন থেকে ফায়ার ডিফেন্স অফিসার আসার মধ্যবর্তী সময়টিতে আরেকটি দূর্ঘটনা ঘটে যায় সেখানে। কটেজের বৈদ্যুতিক তার থেকে আগুন ছড়িয়ে পরে আশেপাশেও।
ইয়ার্ডে ফায়ার ডিফেন্স অফিসারদের গাড়ি, তাদের লটবহর, অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম স্তুপ হয়ে আছে। সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছিল এ বিধ্বংসী আগুনকে নিয়ন্ত্রণে আনার। আশেপাশে চলে এসেছে কিছু লোকাল ব্লগার,যারা ব্যস্ত লাইভ করা নিয়ে।
বাতাসে পোড়া পোড়া গন্ধ,পানি ছিটিয়ে যা ছাপিয়ে রাখা যায়নি।
কার্যালয় থেকে কটেজের দূরত্ব টুকু মুঈন ফরাজী অনুভূতি শূন্য হয়ে ভেদ করেছে। সে কি ছুটেছে? সে কি আদৌও ছিলো? সে কি? মুঈন বুঝতে পারছে না।
একটা মুখ,একটা পানপাতার মতো মুখ,তার প্রতি বিতৃষ্ণা,তার প্রতি জড়ো হওয়া টান, এই অনুভূতি মুঈনকে শেষ করে দিলো অতটুকু রাস্তা।
মেয়েটা কেউ ছিলো,মেয়েটা সব ছিলো,মুঈনের জীবনের প্রথম কেউ। মুঈনের জীবনের একমাত্র কেউ।
ইয়ার্ডে পা রাখলো মুঈন,শরীরটা ছেড়ে দিচ্ছে তার,শরীরের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখলো মুঈন,ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে ছুটলো সে, ওকে আটকে দিলো হতভম্ব ফায়ার ডিফেন্স অফিসাররা। ধরে ফেললো জাঁদরেল অফিসারকে, মুঈন কি করলো! বাচ্চা হয়ে গেলো মুঈন একটা। অনেক শখের একটা খেলনা হারিয়ে বাচ্চারা যেমন করে, ঠিক তেমন করলো বুঝদার,সংযমী লোকটা। নখ বসালো এক অফিসারের হাতে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টায়, ধস্তাধস্তির দৃশ্যটি ছিলো করুণ। মুঈন চেঁচিয়ে উঠলো, নিজের প্রাণ টুকু হাতে নিয়ে মুঈন চেঁচিয়ে উঠলো,“আমার বৌ, আমার বৌ!”
ওর অনুভূতিকে বিধ্বস্ত করতে আগুনের ঝলকানি গুলো সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিল। মুঈন পারছে না লোকগুলোর সাথে, কাকে কাকে দেখছিলো যেন,কারা যেন বলছিল,“স্যার,স্যার ম্যাম ঠিক আছে। আপনি সরে যান।”
মুঈন শুনছিলো না, চোখের সামনে ভাসছিল, এক রত্তি মেয়ে, খুব অদ্ভুত ভাবে মুঈনকে ঘায়েল করেছে, আজ সকালে, দেখেছিলো মেয়েটিকে, শ্যামবর্ণের মুখটাকে, কটেজ থেকে বেরিয়ে আসার সময় বলেছিলো,“আজ একটু বাড়ি তাড়াতাড়ি ফিরবেন মুঈন,মাম্মাকে একটু দেখে আসবো।”
নিস্তেজ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে সে দেখতে পারছিলো না, উন্মাদের ন্যায় ধস্তাধস্তি চলমান।
এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি,এই নৃশংস পরিস্থিতি টেনে হিচড়ে নিয়ে আসলো সেই মেয়েটির জন্মদাতাকে। এসে মুখ থুবড়ে পরলো যেন ষাট ছুঁই ছুঁই লোকটা, কিছুই হয়নি, এই মেয়ের কিছুই হয়নি। কেউ যেন বলেছিলো তাকে, সে শুধু সেই অদৃশ্য কন্ঠস্বরের জবাবে বললো,“আমার আম্মা কোথায়! আমার আম্মাকে তোমরা বের করতে না পারলে,আমাকে ছাড়ো,আমি গিয়ে নিয়ে আসি আমার আম্মাকে।”
মুর্ছা যেতে চাইলে বলিষ্ঠ হাতে আগলে রেখেছিল ইহান, কিন্তু তারও দুর্বল শরীরটা যে এসব সামলানোর মতো পরিস্থিতিতে ছিলো না। বোনের মুখ,বোনের কথা,দাদান ডাকটা, সবকিছু তার গলা চেপে ধরেছে। ছুটে ছুটে নিজের সবটুকু ধৈর্য্য ফেলে রেখে ঝাঁপিয়ে পরতে চেয়েছিলো বোনের জন্য। সামর্থ্য ছিলো ইহান তাজওয়ারের,তবে ছয়জন ফায়ার ডিফেন্স অফিসারের কাছে তার শক্তি ছিলো নস্যি।
ইলহাম মির্জা, ইশমাম মির্জা, ইনশিরাহর আদরের মেজো বাবা, ছোটো বাবা। ঐ ফায়ার ডিফেন্স অফিসাররা হিমশিম খাচ্ছে এই উন্মাদ লোকগুলোকে সামলাতে। এতজন পুরুষ লোক, বাচ্চাদের মতো করছে। একেবারে বাচ্চাদের মতো করছে।
ওরা নিজের কাজ করছিল,একটা টিম এই পুরুষদের ব্যারিকেড দিয়ে ধরে রাখলো। আশেপাশে লোকের ভিড়। লোকাল দুজন সাংবাদিক,যারা এসপি অফিসে ছিলো। ওদের উপস্থিতি ছিলো।
আগুন নিভবে কি! মেইন দরজা ভেঙে পরে যেতেই সামিন বিকট চিৎকার দিয়ে ছুটলো সেদিকে,ভেতর থেকে আগুনের লেলিহান শিখা দৃশ্যমান। লোকটা ঝাপ দিলো বোকার মত, ইহান ধরলো, ইলহাম, ইশমাম ধরলো, কে কাকে ধরবে? সবাই পারলে লাফ দিলো, ঐ ইনশিরাহ, ঐ বাড়ির বড় মেয়েটা,সবার আদরের,শখের, তিন ভাইয়ের প্রথম কন্যাসন্তান,যারা ছোটো ছোটো লাল চুড়ি,ক্লিপ,লাল ফ্রক কিনে ভরিয়ে ফেলতো ঘরটা, অপচয় করতো! ভীষণ অপচয় করতো নিজেদের প্রথম কন্যার জন্য। সামিনের বৃদ্ধ শরীরের শক্তির কাছে পারছিলো না যেন ওরা, মুখ থেকে কিছু বলছিলো না লোকটা,শুধু পাগলামি করছিল।
ওকে নিয়ে ঐ তিনজন ব্যস্ত থাকায় এদিকে দেখেনি খেয়াল করে, ইহান বড়বাবাকে পিছিয়ে এনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখলো মুঈনের পাগলামি,ইহান কি করবে? শেষটায় ধাক্কা মারলো ওকে।
ফায়ার ডিফেন্সাররা এসে ঠেলতে ঠেলতে ওদের বের করলো,ইহান টানছিল মুঈনকে,মুঈন বিড়বিড় করে বলছিলো,“ইহান ও আমার সাথে সংসার করতে চেয়েছে! ওর চোখে আমি আমার জন্য টান দেখেছি!”
গোটা এরিয়ার বৈদ্যুতিক লাইন বিচ্ছিন্ন করে রাখা,সাথে এলার্ট জারি। অনুসন্ধানী টিম নিজেদের সেফটি ড্রেস পরে আগুনের থিতু হওয়ার অপেক্ষায়।
আর মাঠের মধ্যভাগে কিছু নিস্তেজ প্রাণ,একটা নারকীয় দুপুর, একটা একটা আর্তনাদ।
কম পরে গিয়েছিলো এসবও,ঠিক তখনই আলো এলো। ছুটতে ছুটতে এলো, ওর ডান কাঁধে আঁচল টা ছিলো না, চুলগুলো খোপাতেও ছিলো না, কোথায় এতো জোর পেলো কে জানে! ওকে থামাতে পারলো না রিতু,পরী, যারা নিজেরাও থামতে পারেনি।
ভদ্রমহিলা এসে না কাউকে দেখলোও না, না ওকে দেখার সময় পেয়েছে কেউ, ঢুকে গেলো আগুনের মধ্যে, পুরলো শাড়ির আঁচল,গায়ে লাগলো ছ্যাকা, ভদ্রমহিলার চুল পুড়লো,ভাগ্যিস সেখানে দুজন অফিসার ছিলো। মা সম্বোধনে ওকে জাপটে ধরে ফিরিয়ে আনলো।
আলো শুধু চেঁচিয়ে বলতে পেরেছিল,“আল্লাহ আমার মৃত্যু অন্যভাবে দিন,এভাবে নয়। এভাবে নয়।”
_______
বাচ্চাটার বয়স বারোর কাছাকাছি। তার বেড়ালটার নাম পপাশ। ইনশিরাহ শুনেই হেসে ফেললো, বিড়ালের এমন পপাশ নাম সে শোনেনি। যাক গে! ভালোবাসার জিনিসকে ভালোবেসে যা ডেকে পারা যায়। এই পপাশের মালিকের নাম ইনশিরাহ আন্দাজ করে নিলো, ভীষণ মোটাতাজা বাচ্চাটা, পপাশের মালিকের নাম সম্ভবত ঢপাশ।
পপাশ স্বভাবে সম্ভবত একটু লুচু প্রকৃতির। প্রথম প্রথম বেড়ালটাকে ভালোই লেগেছিলো ইনশিরাহর,এবার বিরক্তি ধরে গেল। মিঠির গা ঘেঁষে, মিঠিকে বিরক্ত করছিলো সে। এমন অদ্ভুত বিড়াল ইনশিরাহ দেখেনি এর আগে।
মিঠি এখনও হিটে আসেনি,তাই যার তার সাথে মেটিংয়ে দেওয়ার ব্যাপারে ইনশিরাহ সবসময় সতর্ক থাকে।
এই বিড়ালের মতিগতি ভালো নয়,মিঠিকে সিডিউস করার চেষ্টা চালাচ্ছে। ইনশিরাহর ভীষণ বিরক্ত হয়ে পপাশের মালিক ঢপাশকে বললো,“এইযে ,তোমার পপাশকে একটু সামলাবে? আমার মিঠি না এসব পছন্দ করে না।”
পপাশের মালিক ঢপাশ মুখ কালো করে তার লুচু বেড়ালকে সামলে নিলো। রিসিপশনিস্ট তখন বেল টিপে বললো,“পেশেন্টের নাম মিঠি, মা ইনশিরাহ বিনতে সামিন। আপনাদের স্যার ডাকছেন।”
আজ মিঠির একটা ভ্যাকসিন নেওয়ার ছিলো, যার কথা ইনশিরাহ ভুলেই গিয়েছিলো,তখন ঘুমিয়ে পরার পরে হঠাৎ তার ফোন বেজে ওঠে, হসপিটাল থেকে ফোন যায় তার কাছে। ভ্যাকসিনটা স্টক আউট হতে চলেছে,এরপর সাতদিন লেট হবে। তাড়াহুড়ো করে ইনশিরাহ মিঠিকে নিয়ে বেরিয়ে পরেছিলো।
অথচ এখানে এসে কত দেরি করে ফেললো,এখনও ইনজেকশনটা দিতে পারলো না। হাতে ফোনটা নেই,সেটা ভুল করে ফেলে রেখে এসেছে বাড়িতে।
ইনশিরাহ ডক্টরের মাথার দিকে তাকিয়ে থাকবে নাকি তার কথা শুনবে বুঝতে পারছিলো না, ডক্টরের টাক মাথা চকচক করছিল। মিঠিকে ইনজেকশনটা দিয়ে ওকে ডক্টর চেক করে বললো,“মিঠি হিটে এসেছে,ওকে মেটিংয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন।”
ইনশিরাহ চিন্তিত হয়ে বললো,“কিন্তু যার তার সাথে এভাবে মিঠি!”
ডক্টর যেন খিকখিক করে হেসে উঠলো, বললো,“মনে হচ্ছে আপনার মেয়ের রিলেশন আছে, আর আমরা অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ করাতে চাইছি ওর, আর ও যার তার সাথে বিয়ে করতে চাইছে না।”
ইনশিরাহ লজ্জা পেলো ডক্টরের কথায়। হাসলো সামান্য। ডক্টর বললো,“ওকে আগামী সানডে নিয়ে আসবেন। আমরাই ব্যবস্থা করে দেবো। চিন্তা নেই, আপনার মেয়ের উপযুক্ত জামাই দেওয়ার চেষ্টা করবো।”
মিঠিকে নিয়ে হসপিটাল থেকে বেরোয় ইনশিরাহ। বেশ দেরি হয়ে গিয়েছে ওর, বাড়ি ফিরতে হবে। মুঈনকে একটু ইনফর্মও করেনি, একবার ভাবলো কলিং বুথ থেকে একটা কল করে নেবে,পরে আর থামলো না। ই ক্যাব বুক করে তাড়াহুড়ো করে বসলো সে।
অফিসার্স রেসিডেন্সিয়াল এরিয়ায় যখন ওর ক্যাব ঢুকলো তখন এই নিরব নিস্তব্ধ এরিয়ায় লোকের উপচে পরা ভিড় দেখে ভীষণ আশ্চর্যান্বিত হয়ে পরলো ইনশিরাহ। কি হয়েছে এখানে? শহরের সবথেকে নিড়িবিলি এরিয়ায় এতো ভিড় কেনো?
বাতাসে ভ্যাপসা গন্ধ,দূর থেকে ভেসে আসছে আহাজারির শব্দ। কটেজ এরিয়ার গেটের সামনে ক্যাব থামিয়ে,নেমে দাঁড়িয়ে পরলো ইনশিরাহ, স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে পুরো মেয়েটা।
ভিড় গলিয়ে সামনেটা কিছু দেখা যাচ্ছিল না, শুধু দেখতে পেলো ধোঁয়া উড়ছে। দেখতে পেলো মানুষের আ'ত'ঙ্কি'ত মুখ।
কি হয়েছে এখানে? সে না থাকাতে কি হয়েছে? কিছু পুড়েছে? কটেজ পুড়েছে? আর মুঈন! মুঈন কোথায়! মুঈন এসেছিল নাকি! উনি কি ভেতরে!
অস্থির হলো মন, ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে মনে। ছুটতে ছুটতে গেলো ইনশিরাহ, পাগলের মতো, লোকজন ঠেলে, ধাক্কা দিয়ে সবাইকে অবাক করে, হতবাক করে ছুটতে ছুটতে কটেজের মাঠে গিয়ে স্থির হলো পা।
আগুন ততক্ষণে নিয়ন্ত্রণে, অনুসন্ধানী টিম ভেতরে পায়নি কোনো মানবশরীর, একটু আশা, একটু আতঙ্কে পাগলপ্রায় ইনশিরাহ নামের অগোছালো একটি মেয়ের মানুষগুলো।
ইনশিরাহ বিধ্বস্ত হলো দৃশ্যটা দেখে। পুরো ঘটনাটা তার ব্রেইনে প্রসেস হতে বেশি সময় নিলো না। শরীরটা কাঁপুনি দিয়ে উঠলো নারকীয় দৃশ্যটা দেখে।
আলো মৃত মানুষের মতন পরে আছে মাঠে। যারা আছে,সবাই মৃতই। ইনশিরাহ পাগলের মতো ছুটে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,“কি হচ্ছে? এখানে কি হচ্ছে?”
এইযে কন্ঠস্বর, এই কন্ঠস্বর টা ঐ মানুষগুলোর নিভু নিভু প্রাণটাকে সজাগ করলো।
ইনায়া ছিলো প্রিতমের বুকে, আপুর অতি নিকটে ছিলো সে। মরা মাছের মত দৃষ্টি দিয়ে আপুকে দেখলো,কেন জানি এখন বলতে পারছে না কিছু।
ইনশিরাহ এগোলো, উপস্থিত মানুষগুলোর মনযোগ কেড়ে, চূড়ান্ত হতবাক করে, সামনে এগিয়ে আবারও চেঁচালো,“হচ্ছে টা কি! বলো হচ্ছে টা কি!”
মুঈনকে যে দু'জন ধরে রেখেছিল তারা ওকে ছাড়লো,মুঈন ফরাজী, ঘুরে তাকালো, ওর দৃষ্টিতে কিছুই ছিলো না, সব অনুভূতি নিংড়ে নিয়েছে এই উত্তাপ। ও তাকিয়ে থাকলো,ওর জীবনের একমাত্র অস্বস্তির দিকে।
একে অপরকে জড়িয়ে ধরে রাখা সামিন আর আলো, ধীরে ধীরে মাথা তুলে মেয়েকে দেখলো, দেখতেই থাকলো। এখন কোন নড়চড় নেই তাদের, মৃত্যু যন্ত্রণা শেষ হলো, বুঝতে পারছে,তবে বেরোতেই পারছে না।
মিঠিকে কোল থেকে নামিয়ে,ইনশিরাহ উন্মাদ হয়ে উঠলো, ছুটে গিয়ে শুরুতে মাকে জড়িয়ে ধরলো,দুগালে পাগলের মতো চুমু খেয়ে মায়ের হাত দু'টো ইনশিরাহ নিজের গালে ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে আকুল হয়ে বললো,“ও মাম্মা দেখো,এইযে তোমার মেয়ে! তুমি কেঁদো না।”
গিয়ে পাপাকে ধরে পাপার দুগালে পাগলের মত চুমু খেয়ে পাপার হাত নিজের দুগালে ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে বলছে,“ও পাপা দেখো! এইযে তোমার আম্মা! দেখো! কিছু হয়নি আমার।”
ওরা কিছু বলছেই না। ইনশিরাহর অনেক তাড়া,উঠে ইহানকে ধরলো, ভাইয়ের হাত গালে ছুইয়ে বললো,“দেখো দাদান আমার কিছু হয়নি।”
ছোটো বাবা,মেজো বাবার হাত গালে ছোঁয়ায়,ওদের চুমু খেয়ে বলে,“দেখোনা আমি বড় আম্মা তোমাদের।”
রিতু আর পরীকে জাপটে ধরে হাহাকার করে উঠলো মেয়েটা,“আরে তোমরা দেখো,আমার কিছুই হয়নি।”
ওকে তখন ছো মেরে লুফে নিলো ইনায়া,আপুকে চুমু দিতে দিতে বাধ ভাঙ্গা কান্নায় ভেঙে পরেছে ইনু।
ইনশিরাহ ধমকাতে চায়,কিন্তু কেঁদে ফেলে। মাম্মা পাপা, দাদান, মেজো বাবা, ছোটো বাবা,মেজো মা, ছোটো মা। সবাই নিস্প্রাণ পুতুলের মতো ওকে দেখছে।
ইনশিরাহ চোখ মুছে ইনুকে সরিয়ে দিয়ে অসহায়য়ের মতো আশেপাশে তাকায়, তৎক্ষণাৎ, ঠিক কিছুটা দূরেই, বিধ্বস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইউনিফর্ম পরিহিত ফরাজীর চোখে চোখ পরে তার। ইনশিরাহ ভাঙলো, ইনশিরাহ ভেঙে গেলো পুরোটা। যখন দূর থেকেও দেখলো লোকটার চোখে পানি। ঐ পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চির পুরুষের চোখ থেকে দরদর করে পানি ঝরছে। অথচ কি গাম্ভীর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আচ্ছা উনি চোখের পানি আটকাতে পারলো না কেন?
আর কাউকে খেয়াল করলো না,কারো দিকে মনোযোগ দেয়নি ইনশিরাহ। ধীরপায়ে এগিয়ে যায় সে। মুঈন তাকিয়ে আছে,দেখছে তার বধূকে।
ইনশিরাহ গিয়ে ওর সামনে দাঁড়ায়, ডাগর ডাগর দুটি চোখে রাজ্যের বিস্ময়। মুঈন তখন একটা লম্বা শ্বাস ফেলে, ধীরে ধীরে ইনশিরাহর এক হাত ধরে টেনে আরো কিছুটা সামনে আনে, এবং, ফরাজী বৌকে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয়। ইনশিরাহ নির্নিমেষ দেখছে ফরাজীকে। মুঈন ওকে আড়াআড়ি কোলে তুলে নিজে হাঁটু ভেঙ্গে বসে পরে মাঠে। বৌকে কোলে নিয়ে বসে পরে। ইনশিরাহ তার বা হাতের তর্জনী দিয়ে মুঈনের চোখের পানি ছোঁয়। পর পর আকুল হয়ে বলে,“এই আপনি কাঁদছিলেন?”
মুঈন হ্যা বোধক মাথা নাড়ায়।
_আপনি আমার জন্য কাঁদছিলেন?
মুঈন হ্যা বোধক মাথা নাড়ে।
_আপনি ইনশিরাহর জন্য কাঁদছিলেন?
মুঈন হ্যা বোধক মাথা নাড়ে।
ইনশিরাহ এলোমেলো দৃষ্টিতে তাকিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলে,“ইয়া আল্লাহ,কি বললো! আপনি একটা বাজে বৌয়ের জন্য কাঁদছিলেন?”
মুঈন হ্যা বোধক মাথা নাড়ে।
ইনশিরাহ দুচোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলে,“কেনো কাঁদছিলেন?”
_ভয়ে।
অস্ফুটে জবাব দিলো মুঈন।
_হারিয়ে যাবো বলে? কেন ভয় পেয়েছেন?
_বৌকে ভালোবাসি বলে।
ইনশিরাহ দু'চোখ বন্ধ করে আবারও শ্বাস নিলো, পরপর চোখ খুলে বললো,“ভালোবাসেন? কেনো ভালোবাসেন?”
_তোমার স্বামী বলে।
_স্বামী হলেই মানুষ ভালোবাসে?
_হ্যা বাসে।
_কেন বাসে?
_আমাদের পুরুষদের তো তা-ই করতে বলা হয়েছে!
আরো একটা লম্বা শ্বাস ফেলে, হাঁপাতে হাঁপাতে বললো মুঈন।
_কি বলা হয়েছে?
_তিন কবুল বলে বিয়ে করা মেয়েটাকে ভালোবাসতে হবে। আর কোন অপশন নেই।
_বৌ উল্টোপাল্টা হলেও ভালোবাসতে হবে?
মুঈন মাথা নেড়ে বলে,“উল্টোপাল্টা বৌকেও ভালোবাসতে হবে!”
ইনশিরাহ ছটফট করছে, দু'হাতে মুঈনের গলা জড়িয়ে ধরে বলে,“আমি না স্থির হয়ে থাকতে পারছি না,আপনি আমাকে ঠিকভাবে কোলে বসিয়ে রাখুন,এই আপনার হাত কাঁপছে কেন!”
মুঈন ওকে আরো শক্ত করে ধরলো, ইনশিরাহ হাপাচ্ছে, আবারও মুঈনের চোখের পানি ছুয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলছে,“এই সত্যি সত্যি বলুন না, আপনি এভাবে আমার জন্যই কাঁদছিলেন?”
মুঈন মাথা নেড়ে বলে,“তিন সত্যি!”
ইনশিরাহ কি করলো হঠাৎ,জোরসে কেঁদে উঠলো,অম্বর কাঁপিয়ে, মুঈনের গলা জরিয়ে রেখে বলছে,“ইয়া আল্লাহ! কি বলে লোকটা,লোকটা নাকি আমার জন্য কাঁদছিলো।”
তখন ফরাজী আর নিজেকে সামলাতে পারেনি,বৌয়ের দু গালে চুমু খেতে লাগলো ভেজা দুটি চোখ বুজে। যারা ক্যামেরা হাতে লাইভ করছিলো,তারা ওদের ভিডিও ধারণ করতে লাগলো।
ইনশিরাহ কাঁদছে। মুঈন চুমু খাচ্ছে পাগলের মতো ওর দুগালে, শশুর, শাশুড়ি, লোকজন কারো কথা ফরাজীর মাথায় নেই। ইনশিরাহ ফোপাচ্ছে। ফোঁপানি বন্ধ করে আবার জোরে কাঁদছে, কাঁদতে কাঁদতে ইনশিরাহ আলোর দিকে তাকায়, চেঁচিয়ে বলে,“ও মাম্মা শুনেছো! এই লোকটা নাকি আমার জন্যই কাঁদছিল।”
আলো বুকে হাত রেখে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ইনশিরাহ হাউমাউ করে কেঁদে দিয়ে এবার সামিনের দিকে তাকায়, চেঁচিয়ে বলে,“ও পাপা দেখলে ইরফানের কথা ফলে গেলো, আমি তোমার জামাইকে কাঁদিয়ে ছাড়লাম পাপা।”
মুঈন শুধু চুমু খাচ্ছিল, ইনশিরাহ কেঁদে বলে,“থামুন! থামুন! আর কত দেবেন?”
_যতক্ষণ পর্যন্ত তোমার অ্যারেঞ্জম্যারেজোফোবিয়া না কাটে ততক্ষণ পর্যন্ত।
আকুল হয়ে বলে মুঈন।
ইনশিরাহ কাঁদছে,শক্ত করে জরিয়ে ধরে মুঈনের গলা, আবারও চেঁচিয়ে বলে,“মাম্মা পাপা দেখো,এই লোকটা আমার জন্য কাদছে, আমার জন্যই কাঁদছে, এই লোকটাকে আমি কাঁদিয়ে ছেড়েছি পাপা। এই লোকটাকে কাঁদিয়ে আমার ভীষণ আনন্দ হচ্ছে মাম্মা। ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। আমার এতো কেনো আনন্দ হচ্ছে এই লোকের চোখে পানি দেখে মাম্মা পাপা?”
চলমান.......