ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 71

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৭১
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

একটা একটা করে,একটু একটু করে,একটা পরিবারের জন্য গোছানো,কেনা,সাজানো আসবাবপত্র গুলি, মুঈন ফরাজীর সংসার,একটা আদুরে সংসার,একটা স্বপ্নমাখা সংসার পুড়ে কয়লা হয়ে গিয়েছে।
শেষ বিকেলের আলোয় সেই বিধ্বস্ত কটেজটাকে একটা ভুতুড়ে বাংলোর মতোই লাগছে, আগুনের উত্তাপ এখনও কমেনি। বাতাসে ভ্যাপসা গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে এখনও।
ফায়ার ডিফেন্স অফিসাররা তাদের লটবহর গুছিয়ে নিয়ে চলে যায় আসর বাদ। আজান হলো, ধীরে ধীরে লোকসমাগম কমলো, এবং ধীরে ধীরে ঐ নিড়িবিলি এরিয়াটা তার আগের নিস্তব্ধতা ধারণ করলো।

শান্তিনীড়,মির্জাদের নিবাসে,ছেয়ে আছে মলিনতা, বিধ্বস্ত মানুষ গুলো চুপচাপ বসে আছে।

ইনশিরাহ কাঁপছে,খুব কাঁপছে, এখনও যারপরনাই আ'ত'ঙ্কি'ত লাগছে তাকে। আজ সে কিভাবে বাঁচল? কোন কপালের জোরে?
তার তো পুরে ছারখার হয়ে যাওয়ার কথাই ছিলো!

কটেজে আগুন লাগার প্রাথমিক কারণ সিলিন্ডার ব্লাস্ট,পরে ইলেকট্রনিক ডিভাইস অ্যাফেক্টেড হয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। প্রাথমিক তদন্তে এগুলো জানা গিয়েছে। আইজিপি স্যার নিজে এসেছেন শান্তিনীড়ে, এসেছেন ডিসি এবং জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। তারা এসে মুঈন ইনশিরাহকে সমবেদনা জানিয়ে গিয়েছে কিছুক্ষণ আগেই।

ইনশিরাহ সোফাতে বসা,তার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে এক হাতে ধরে আছে মুঈন। ইনশিরাহর পাশে তার পাপা বসে আছে। মেয়েটার কিছুক্ষণ আগে প্যানিক অ্যাটাকের মতো হয়েছিল। রিতু মেয়ের ঘর্মাক্ত মুখটা আঁচলে মুছিয়ে দেয়।

বিপরীত পাশের সোফায় গা এলিয়ে ছিলো আলো,হাত পায়ে যেটুকু চোট পেয়েছে,পরী ড্রেসিং করিয়ে দিলো সবার।
বাড়ির পুরুষ গুলো সবাই-ই চোট পেয়েছে কোনো না কোনো ভাবে।

আছর পেরিয়ে মাগরিব হয়ে এলো যখন,ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে আলো নড়েচড়ে বসল,মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললো,“এটা কিভাবে হলো? তুমি জানো? ধারণা আছে কিভাবে হতে পারে এটা?”

ইনশিরাহ এলোমেলো দৃষ্টি দিয়ে মায়ের দিকে তাকায়,পাপার দিকে তাকায়,মুঈনের দিকে তাকায়। একটা ঢোক গিলে বলে,“জানিনা মাম্মা! আমি জানিনা! আমি তো........”

একটু থামে ইনশিরাহ, পরপর কন্ঠস্বর পাল্টে অস্থির হয়ে বলে,“মাম্মা,চুলা অন করা ছিলো! আমি নেভাতে ভুলে গিয়েছিলাম! কিন্তু,কিন্তু....”

আমতা আমতা করছে ইনশিরাহ। বাড়ির সবাই ওর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। আলো একটা লম্বা শ্বাস ফেলে মেয়ের মুখের দিকে তাকায়, কিছুক্ষণ তাকিয়েই থাকে,পরপর ঘুরে বাড়ির সবার দিকে তাকিয়ে রুগ্ন কন্ঠে বলে,“এই মেয়েকে যদি আমি এখন একটা চটকনা মারি এখন,আপনারা বলবেন আলো বাড়াবাড়ি করছে?”

ঢুলতে ঢুলতে উঠে দাঁড়ায় আলো, ইনশিরাহ তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বাবা আর স্বামীর পেছনে লুকায়। ক্লান্ত শরীরে সামিন ম্লান হাসে, মুঈনও হাসে । কারো হাসিতে জোর নেই তবুও। সামিন বললো,“আর বাড়াবাড়ি করো না আছিয়া!”

আলো তার বাড়াবাড়ি অব্যাহত রাখে,মেয়েকে টেনে এনে জরিয়ে ধরে কাঁদতে থাকে হাহাকার করে। আরেকদফা শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় সবাইকে। ঝাপসা চোখে ইনশিরাহ মাকে দেখে,দেখে মায়ের পুড়ে যাওয়া হাত পা, দেখে মায়ের পুড়ে যাওয়া অর্ধেক খানি চুল,যে চুল পাপার প্রিয়। মায়ের নরম গালে ইনশিরাহ হাত রেখে কেঁদে বলে,“এবারও বাড়াবাড়ি করে দিলে মাম্মা।”

কপালে কপাল ঠেকায় মায়ের। বাড়ির পরিস্থিতি গুমোট, ইহান ইনশিরাহকে তাড়া দিয়ে বলে,“মুঈনকে নিয়ে ঘরে যা,এসব বন্ধ কর। সবার বিশ্রামের প্রয়োজন আছে তো!”

প্রেরণা এসেছিল,এ বাড়ির সবার যা অবস্থা,সে কিছুক্ষণ থেকে এটা ওটা সাহায্য করেছে রিতুকে। রিতুর মেয়েটিকে পছন্দ,এই মেয়ের দু একটা আচরণ বাদে মেয়েটি একেবারে খাটি মেয়ে রিতুর মনে হয়। এমন মেয়ে এই যুগে অন্তত বিরল।

ইনায়া ফেরেনি সন্ধ্যায় প্রিতম প্রেরণার সাথে, কটা দিন থাকবে এখানে। শেহা আর শান্ত আসছে। বাড়িতে লোকসমাগম,কাছের দূরের স্বজন আসছে এতোবড় বিপদের কথা শোনা মাত্র।

অস্ট্রেলিয়া থেকে সামিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফুয়াদ কল করেছে,সামিন ওর সাথে কথা বলে ক্লান্ত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে এসে লিভিং রুমের সোফাতে ধপ করে বসে আলোকে ডাকে। আলো,রিতু,পরী তিনজন আসে।

কেমন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ছেড়ে সামিন বলে,“এই মেয়েটার নতুন সংসারটা এভাবে জ্বলে গেলো! তোমরা একটু ছেলে মেয়ে দুটোকে দেখেশুনে রাখো! দু'জনের সংসারটা জোড়াতালি দিয়ে গড়ে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব এখন!”

দোতলা থেকে ত্রস্ত পায়ে নামছিল ইহান, বাড়ির বড়রা সবাই নিচতলায় ছিলো। ওকে দেখে ইশমাম জানতে চাইলো,“কোথায় যাচ্ছিস?”

বড্ড তাড়াহুড়ো ছিলো ইহানের,বললো,“হৌপে। একটু ঝামেলা করছে ইরফান।”

_______

ফোনের স্ক্রিণে দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিলো সাঈমের। লোকাল ব্লগারদের ধারণ করা দৃশ্যটুকু বারবার প'জ করে করে দেখছে সে। সাথে শুনছিলো ব্যাকগ্রাউন্ডের ঐ কথাগুলো,“ভেবেছিলেন স্ত্রী হয়তো জীবিত নেই, শোকের মাতম চলছিলো গোটা মির্জা পরিবারে, কিন্তু পরে স্ত্রীকে চোখের সামনে জীবিত দেখতে পেয়ে পুলিশ সুপারের পাগলামি। এ যেন সিনেমার কাহিনীকেও হার মানায়। একঘন্টায় ভিডিওটি কাঁদিয়ে ছেড়েছে ইন্টারনেট দুনিয়ার একাংশকে!”

সাঈম দেখছিলো নির্নিমেষ। মুঈন ইনশিরাহকে কাঁদতে কাঁদতে, উন্মাদের মতো চুমু খাচ্ছিল দু গালে। আর ইনশিরাহ চেঁচিয়ে কিছু একটা বলছিলো, লোকটার গলা জরিয়ে ধরে।

আরোও কিছুক্ষণ ভিডিওটা দেখলো সাঈম। হুট করে কি হলো,এক আছাড়ে ফোনটাকে ছুড়ে মারলো সুইমিং পুলে। সাগর ভুঁইয়া অদূরে বসে দেখতে লাগলো ছেলের কাণ্ড।

_______

মাগরিবের ওয়াক্ত শেষ হয়েছে, মুঈন শান্তিনীড়ে, ইশির রুমে টান টান হয়ে শুয়ে আছে। গাঁয়ের ইউনিফর্ম এখনও খোলেনি লোকটা, না খেয়েছে একগ্লাস পানি। এতোটা ক্লান্ত,এতোটা উত্তেজিত নিজেকে কখনও লাগেনি মুঈনের।

ইনশিরাহ একগ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে এসে ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। মুঈন মাথাটা সামান্য তুলে দেখলো ওকে, দু'জনের বিধ্বস্ত,ক্লান্ত দৃষ্টি দু'জনকে দেখলো।

ডান হাত তুলে মুঈন কেমন জড়ানো গলায় ডাকে,“এসো।”

ইনশিরাহ এগিয়ে যায়। ঐ মুহুর্ত টুকু মনের মধ্যে এখনো উত্তেজনা বজায় রেখেছে, বুকটা এখনও সেই ঐ সময়ের মতন কাঁপছে লোকটাকে দেখে। মুঈন হাত দিয়ে ইশারা করে গ্লাসটাকে সাইড টেবিলে রাখতে।

গ্লাসটা রেখে ইনশিরাহ মলিন মুখে এগিয়ে গিয়ে বসলো বিছানার একপাশে। মুঈন ওকে দেখলো চেয়ে চেয়ে, চোখের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে যেন দেখে।

একটা ছোটোখাটো মুখ,একটা পানপাতার মতো মিষ্টি মুখ। ফরাজী ইনশিরাহর থুতনি এক হাতে,একটু উঁচু করে ধরে কোমল স্বরে বললো,“কি? শরীর খারাপ লাগছে?”

দু'পাশে মাথা ঝাঁকায় ইনশিরাহ, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,“যা হলো, সব আমার জন্যই হলো?”

মুঈন দু'চোখ বন্ধ করে,একটা ফাঁকা ঢোক গিলে আবারও বৌয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,“যা হলো,সব হওয়ার ছিলো বলেই হলো ইশি।”

একটু থামলো মুঈন,ইশির নরম হাতটা শক্ত হাতে আগলে নিয়ে বলে,“আর যা হতে হতে হয়নি, তার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো!”

ইনশিরাহ উঠে দাঁড়ায়, কি সান্ত্বনা দেবে লোকটাকে! লোকটার কতদিনে গড়ে তোলা একটা সংসার। কত পরিশ্রম! সব এক দুপুরে পুড়ে ছারখার। আর লোকটার দেয়া সব উপহার! ইনশিরাহ তৎক্ষণাৎ নিজের গলার দিকে চায়! আজ সকালে এটা কি মনে করে পরেছিলো সে জানেনা। বড্ড আবেগী হয়ে লকেটটা ধরে আবারও বসে পরে সে। মুঈন ওকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে লক্ষ্য করে। এরপর একটানে ইশিকে বুকে টেনে নেয়। ইনশিরাহ চুপচাপ পরে আছে। দু'চোখ বন্ধ করে মুঈন বলে,“এটা গলায় রাখার জন্য আপনাকেও শুকরিয়া।”

পাশাপাশি শুয়ে দু'জন, দু'জনের দিকে তাকিয়ে আছে। ইশি বলে,“ফরাজী! আপনার এতো দিনের পরিশ্রম। একটু একটু করে জমানো, ওগুলো আপনার পরিশ্রম।”

মুঈন বললো,“বুড়ো হয়ে যাইনি! যথেষ্ট পরিশ্রম করার মুরোদ আছে এখনও!”

_আমারো আছে।
দু'চোখের পাতা বুজে বলে ইনশিরাহ।

_তাহলে তো হয়েই যায়।
এতক্ষণ পরে সামান্য হেসে, হাঁপাতে হাঁপাতে বলে মুঈন, ইনশিরাহও হেসে ফেলে।
দু'জনে হাসতে থাকে দু'চোখ বন্ধ করে।

কল আসে একটা, কলটা রিসিভ করে মুঈন কিছুক্ষণ ওপাশের ব্যক্তির কথা শুনলো, তারপর কলটা কেটে সোস্যাল সাইটে ঢুকলো, আজকের ভিডিও ক্লিপটুকু আলোড়ন তুলেছে বিভিন্ন পেজে। ক্যাপশনে লেখা,“এমন একটা জামাই চাই।”“এমন অফিসারের বৌ হতে চাই!”“এভাবে কেউ আমাকেও ভালোবাসুক।”

ইনশিরাহ-মুঈন দু'জনে হা করে ভিডিওটার দিকে তাকিয়ে থাকে। পরপর একজন আরেকজনের দিকে তাকায়। এতক্ষণের লজ্জা ঠেলে বেরিয়ে আসে ইনশিরাহর, পরপর মুখ ছেয়ে যায় অপ্রস্তুত ভাব। অস্ফুটে বলে,“এসব কি!”

মুঈন উঠে বসলো,দম নিয়ে বললো,“পুরো ভাইরাল করে দিলো ননসেন্স গুলো!”

ইনশিরাহ উঠে বসলো,বললো,“সেন্স হারিয়ে আপনার এসব না করলেই হতো! ছিঃ ছিঃ, এগুলো অনবরত বাড়ির সবাই দেখবে! এই লোকগুলো শান্তি হারাম করে দেবে আমার! মাম্মা পাপা ভীষণ বিব্রত হবে! হায় আল্লাহ! এ আবার নতুন কোন বিপদ!”

মুঈন ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে সাইবার সিকিউরিটি ব্যুরোর অফিসে কল করে বলে,“আমি মুঈন ফরাজী বলছি। হ্যা ঐ ভিডিওটা......”

ওকে বলতে না দিয়ে অফিসার তাড়াহুড়ো লাগিয়ে বললো,“জী জী, আপনার শশুর সামিন ইয়াসার মির্জা কিছুক্ষণ আগে কল করে এটা সরাতে বলেছেন, জী আমরা কাজ চালাচ্ছি। আর কিছুক্ষণ ধৈর্য্য রাখুন।”

কল কেটে আবারও শুয়ে পরে মুঈন, ওর পাশে শুয়ে পরে ইনশিরাহ। আবারও কিছুক্ষণ হেসে মুঈন বলে,“বৌরে বৌ! আপনার অ্যারেঞ্জম্যারেজোফোবিয়া কাটাতে গিয়ে একেবারে ভাইরাল হয়ে গেলাম।”

______

ইরফান মির্জা। শ্যামলা গম্ভীর চেহারার টগবগে ছাব্বিশের ছেলেটা, রাগী এবং ক্ষ্যাপাটে ছেলেটার শান্ত ভাব দেখে তবেই ইহান লম্বা শ্বাস ফেললো। ভাইয়ের প্রতি স্নেহ জাগছে, তবে রাগও হচ্ছে। ধমকে বলে,“এসব কোন ধরণের ফাজলামি? তুই কি শোধরাবিই না?”

আর শান্ত থাকতে পারলো না ইরফান,দেয়ালে সজোরে একটা ঘুষি মেরে বলে,“তোমরা শোধরাতে দিলে তো? এই আমাকে মানুষ মনে হয়না? সুদির ভাই মনে হয়? নাকি বোন তোমার একার? আমি কেন খবর পাইনি সাথে সাথে? হোয়াই! জবাব দাও!”

অম্বর কাঁপিয়ে চেঁচায় ইরফান, ওর কপালের নিলচে শিরা দৃশ্যমান।ওর দিকে শান্ত চোখে চেয়ে থেকে ইহান বললো,“কি করতিস তুই? এখান থেকে উড়ে যেতি?”

ইরফান হাপাচ্ছে। হাপাতেই থাকলো কিছুক্ষণ। ইহান ওকে ধাক্কা মেরে চেয়ারে বসিয়ে দিলো, চেয়ারের এক হাতলে ভর রেখে নিচু হয়ে ভাইয়ের চোখে চোখ রেখে বলল,“এই অস্থির স্বভাবটা যতক্ষনে চেঞ্জ না করতে পারবি ততক্ষণে কিচ্ছু হবার নেই!”

_তা তুমি অস্থির হওনি বোনের জন্য? হাত পুড়িয়েছো কেনো?
চেঁচিয়ে জানতে চায় ইরফান।

ইহান ওর দিকে ঘুরে তাকালো,বললো,“যা হয়েছে সব নিজের দোষে হয়েছে তোর।”

ইরফান চুপ হয়ে গেল হুট করে। ইহান ভাইয়ের দিকে ঝুঁকে বসলো। গলার কাছে শার্টের বোতামটা লাগিয়ে দিতে দিতে বললো,“আর মাত্র কটা দিন আছে, ও বাড়ি, অফিস, বোনদের সামলানোর জন্য সারাজীবন পরে আছে। ইরফান! আমাদের ডিসাপইন্ট করিস না আর প্লিজ ভাই! ”

দাদানের কথা শুনলো ইরফান চুপচাপ। ইহান পকেট থেকে ফোনটা বের করে সামিনকে কল লাগায়। ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলল,“ধর ইশি! কথা বল!”

বোনের সরল মুখটা দেখে বুকটা কেমন করে উঠলো ইরফানের। ওদিকে ইনশিরাহ চুপটি করে তাকিয়ে আছে। ইরফান স্মিত হেসে মাথা চুলকালো। ইনশিরাহ রাগী গলায় বলল,“কি? ম্যানেজমেন্টের লোকের সাথে ঝামেলা করেছিস? এই তুই শোধরাবি না?”

_বিয়ের পর স্বামীর জন্য রান্না করতে গিয়ে পুরো ঘরটাই পুড়িয়ে দিলি! এই তুই কখনো শোধরাবি না?

ইনশিরাহ হাসলো,চোখের কোণে জমে থাকা জল মুছে নিয়ে বললো,“হয়তো না!”

ইরফানও হাসলো, অমায়িক হাসি, বললো,“আমিও হয়তো না!”

ভাই-বোন অযথাই হাসে,যেমন ঝগড়ুটে,ওরা ঠিক তেমনই প্রানোচ্ছল।

______

হৌপ থেকে ইহান ফিরলো রাত দুটোর সময়ে, রিতুকে লিভিং রুমে জেগে থাকতে দেখে সে মায়ের দিকে এগিয়ে যায়, রিতু জানতে চায় ইরফানের কথা, ইহান বলে,“চিন্তা করো না, ঠিক আছে! তর্কাতর্কি করেছে শুধু, মারামারি না।”

রিতু সোফাতে গা এলিয়ে দিয়ে হাঁফ ছেড়ে বলে,“আর চিন্তা! তোমাদের দুটি ভাইকে জন্ম দিয়ে আমি চিন্তার সাথে সখ্যতা করে নিয়েছি। বুঝিনা তোমাদের, আমাদের ব্যর্থতা। ভাইয়া ভাবী,আমি তোমার পাপা,পরী ছোটো ভাইয়া, সবাই অভিভাবক হিসেবে ব্যর্থ। আমাদের ব্যর্থতা।”

ইহান চুপচাপ দোতলায় ওঠে। মায়ের ব্যাপারটা সে ধরতে পেরেছে, ইদানিং একটা পুত্রবধূর জন্য হাপিত্যেশ করছে ভীষণ। অথচ ইহান মনটাকে স্থির করতে পারছে না, একজনকে ঘিরে যে নাদান অস্থিরতা তার হচ্ছে তার সমাধান করতে পারছে না সে ‌। কি ভাবে কি হবে? ইহান জানে না।

কটেজ পুড়েছে,পুড়েছে মুঈনের অর্জিত সবকিছু,পুড়েছে সব ডকুমেন্টস। যদিও জেরক্স আছে সব ডকুমেন্টসের, তবুও সেই মেডেল গুলো! মুঈনের সম্মান,মুঈনের অর্জন।

রাতের নিস্তব্ধতার মাঝে দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে, দু'জন দু'জনের হাতে হাত রেখে বসে আছে।

ইনশিরাহ বললো,“এরপর ফরাজী?”

_পনেরো তারিখে নতুন কটেজ পাবো। আগামীকাল একটা ছোটোখাটো ফ্ল্যাট দেখে উঠে যাবো,সেভিংস যা আছে তাতে দু'জনে সুন্দর করে গুছিয়ে নিতে পারবো বোধ হয়।

_আগামীকালই এ বাড়ি থেকে যাবো আমরা?

মুঈন হাসলো,বললো,“জি। কেন তুমি যেতে চাও না?”

_চাই। আমি যেতে চাই।

আগ্রহ ছিলো ভীষণ ইনশিরাহর। মুঈন এক হাতে ওকে টানলো কাছে। ইনশিরাহ চুপ করে আছে বাধ্য মেয়ের মতো, মুঈন বললো,“তারপর বলো! ফোবিয়া কেটেছে তোমার?”

ইনশিরাহ ওর দিকে তাকায়,বলে,“ঠিক বুঝতে পারছি না এসপি। আমার কেমন পাগল পাগল লাগছে জানেন। কেমন হালকা লাগে তবে পরিপূর্ণ লাগে , এই অনুভূতি কি?”

_আমি তো জানি না, তুমি নিজেই খুঁজে বের করো, এর জন্যেও সময় নেবে?

_আপনি দেবেন সময়? আছে আপনার ধৈর্য্য?

হেসে ফেললো মুঈন,বললো,“দেবো‌। আছে ধৈর্য্য।”

রাত দু'টো পেরিয়েছে। এবাড়িতে ইনশিরাহর কাবার্ডে মুঈনের কিছু পোশাক ছিলো। ইউনিফর্ম পাল্টে সে সেগুলোই পরেছে। একে একে হেড অফিসে মিটিং, আইজিপি স্যার, কলিগ বন্ধু বান্ধবের সাথে সৌজন্য আলাপ শেষ করে যখন বিছানায় গা এলিয়ে দিলো তখন রাত প্রায় তিনটা বেজেছে। শুয়ে পরার সাথে সাথেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলো মুঈন।

আর ইনশিরাহ চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলো তামাটে পুরুষটির ক্লান্ত, ঘুমন্ত মুখটা।
যার সাথে তার আরেঞ্জ ম্যারেজ হয়েছিল।

_______

বাইরে দোতলার লিভিং রুমে আলো জ্বলতে দেখে ইনশিরাহ মুঈনকে রেখে ঘর থেকে বেরোয়। তার ঘুম আসছিল না, লিভিং রুম পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে দেখলো মাম্মা পাপার ঘরেও আলো জ্বলছে ।

অতরাতে মাম্মা পাপাকে এভাবে জেগে বসে থাকতে ইনশিরাহ এগিয়ে যায়, চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে উৎকণ্ঠা নিয়ে বলে,“কি হয়েছে মাম্মা পাপা? এখনও কেনো জেগে আছো?”

দু'জনের মধ্যে কিছু নিয়ে আলোচনা চলছিল বিশদ,মেয়ের দিকে তাকিয়ে সামিন স্ত্রীর দিকে তাকায়,বলে,“তুমি বলো।”

_না আপনি বলুন।

_আরে না তুমি বলো।

_না আপনি বলুন না।

_না তুমি বলো।

আমতা আমতা করতে থাকে দু'জনেই। ইনশিরাহ দু'জনের কাছে এগিয়ে গিয়ে বসলো,বললো,“কি হয়েছে? দু'জনেই বলো।”

সামিন বলতে পারলো না, বাধ্য হয়ে শেষটায় আলো বলে,“মা! মুঈনের কাছে বলার সাহস পাচ্ছি না,তোকে একটা কথা বলি? তোর পাপা তোদের কিছু টাকা দিতে চাচ্ছে। এটা উপহার, শুধুমাত্র উপহার। মুঈনের সাথে ঠান্ডা মাথায় আলোচনা করে দেখবি একবার?”

বাবা মায়ের মুখটা দেখে নেয় ইনশিরাহ দীর্ঘসময় ধরে,ওরা দুজনেই ইনশিরাহর জবাবের অপেক্ষা করছে আগ্রহ নিয়ে।

ইনশিরাহ মলিন হাসলো, পাপার হাতটা আগলে নিয়ে বললো,“এসবের কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা ম্যানেজ করে নেবো পাপা।”

“আমরা ম্যানেজ করে নেবো।” “আমরা!” বাক্যটাতে কি ছিলো আলো সামিন জানে না, দু'জনেই একটা লম্বা শ্বাস ফেলে দিলো স্বস্তিতে। একহাতে মেয়েকে টেনে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে মাথায় চুমু খেয়ে সামিন বললো,“সুখী হও। খুব খুব খুব সুখী হও আম্মা।”

চলমান......

কোনো জুটিকেই তাড়াতাড়ি শেষ করার পরিকল্পনা নেই, ওদের সবার কাহিনী ঘুরেফিরে আসবে,গল্পটা সেভাবেই সাজানো। আমার অদক্ষ হাতের ভরসায় এ পর্যন্ত এসে ডিসাপইন্ট হলে আন্তরিক দুঃখিত। আমি আমার পক্ষ থেকে যেটুকু বলতে পারি তা হলো,“ধৈর্য্য রাখুন, নয়তো স্কিপ করুন।”
আর কিছু বলার আছে? আর কিছুই বলার নেই ইসরাত ইতির।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 71 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন