ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 76

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৭৬
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

দুই বোনের কাড়াকাড়ি লেগেছে ভাইয়ের হাতটা নিয়ে। ওদের আনন্দ দেখে কে। ইরফান বোনদের পাগলামি দেখে সামান্য হাসলো, গাড়ি থেকে ততক্ষণে দাড়োয়ান ওর ব্যাগেজ নামিয়ে আনে।

বাড়ির মহিলারা একছুটে এসে পোর্চের ধারে দাঁড়িয়েছে। খাবার টেবিল থেকে পুরুষ চারজন উঠলো না।

রিতু ছেলেকে দেখেও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, কোনোরকম অভিব্যক্তিহীন হয়ে, এগিয়ে যায় আলো আর পরী।
কেমন চেহারার কি হাল হয়েছে, শ্যামলা থেকে আরও কৃষ্ণবর্ণের হয়েছে ছেলেটা। স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে,ফলে লম্বা লাগছে আরও কিছুটা।

মা চাচীদের সালাম দিয়ে,মাকে চুমু দিয়ে ইরফান সদর দরজার দিকে পা বাড়ায়, পেছন থেকে ইলহাম বলে,“বোন জামাইয়েরা আছে ভেতরে, খাচ্ছে, সালাম দেওয়ার দরকার নেই,কথা বলে ওপরে যেও।”

ইরফান ভেতরে ঢুকতেই সরাসরি চোখ পরলো ডাইনিংয়ে। সামিন,ইহান,মুঈন খাওয়া রেখে উঠতেও পারছিলো না, শুধু ইরফানের দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলো সামান্য। প্রিতম একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ইরফানের দিকে, থমথমে মুখে। ইরফান ওর দিকে একপলক তাকিয়ে বাকিদের বললো,“ফ্রেশ হয়ে আসছি।”

সহজ স্বাভাবিক আচরণ, কোনো জড়তা নেই, কিচ্ছু নেই। মুঈন শুধু বলে উঠলো,“তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই,আমরা আছি।”

ইরফান চওড়া হেসে সিঁড়িতে পা রাখলো। প্রিতম তখনও চুপচাপ বসে আছে, সামিন ওকে খেয়াল করে নম্রস্বরে বললো,“খাও বাবা।”

এই ঘরটাতে টানা আড়াইমাস পরে ঢুকলো ইরফান, সবকিছু গোছালো, যেন ইরফান এখানেই ছিলো। চারদিকে চোখ বুলিয়ে বিছানায় গিয়ে চুপচাপ বসতেই ইনশিরাহ আর ইনায়া হুরমুর করে ঢুকলো ওর পেছনে পেছনে। ভাইয়ের ব্যাগ থেকে টয়লেট্রিজ বের করে ইনশিরাহ বললো,“তাড়াতাড়ি কর। খেয়ে রেস্ট নিবি না হয়।”

স্বল্পসময়ে ইরফান মুখ হাতটা ধুয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিচতলায় যায়। কেউ বুঝতে না দিলেও সবার কৌতুহলী দৃষ্টি বারবার ইরফানকেই ঘুরে দেখছে।
মির্জা বাড়ির রগচটা উগ্র উন্মাদ ছেলেটার আচরণ স্বাভাবিক, আলো চেয়ার টানার আগে ইরফান গিয়ে বড় মায়ের হাত ধরে বললো,“আমি করছি বড় মা!”

যে চেয়ারটা টেনে ইরফান বসলো, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সেটা প্রিতমের মুখোমুখি। ইরফান বসতে গিয়ে আবারও দেখলো ওকে, দ্রুত চোখ সরিয়ে পাশের চেয়ারে বসা মুঈনকে বললো,“কেমন আছেন ভাইয়া?”

_এইতো আলহামদুলিল্লাহ। কই দেখি প্লেট নাও। খাওয়া শুরু করো। পরে আড্ডা দেবো।

বলে মুঈন নিজেই ইরফানের প্লেটে পোলাও তুলে দেয়। ইলহাম মির্জা এবং ইশমাম মির্জাও ফ্রেশ হয়ে এসে দু'টো চেয়ার দখল করে বসে পরলো। খেতে খেতে বাড়ির পুরুষ লোক গুলোর মধ্যে খুব স্বাভাবিক আলোচনা হয়, অনেকটাই মুঈনের আগ্রহে, ইরফানের সাথে স্বাভাবিক আলাপ। বিয়ের পর থেকে ওভাবে আত্মীয় হিসেবে মুঈনের সাথে আলাপ হয়নি তাই, মুঈন ভেবেছে রিহ্যাভ থেকে ফিরে ছেলেটার জড়তা কিংবা গ্লানি থাকতে পারে তার সাথে তাই নিজে থেকেই সেটা কাটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা খেতে খেতে।

বাড়ির দুই জামাইকে রিতু ব্যক্তিগত ভাবে ভীষণ পছন্দ করে,মিশুক স্বভাবের, গম্ভীরতা কম, এমন পুরুষ বৌকে শান্তি দেয়, বৌয়ের দরদ বোঝে। ইরফানের সাথে মুঈনের আলাপচারিতা খুব ভালো লাগছে বড়দের, এতো আলাপের মাঝে মুঈন পুরনো কাসুন্দি ঘাটেনি দেখে আরেকটু ভালো লাগছে, মনে হচ্ছে ইরফান এতদিন এখানেই ছিলো। এখানেই।

দুপুরের খাওয়া শেষে সামিন উঠে দুই জামাইকে উদ্দেশ্য করে বলেছে আজ কোথাও যাওয়া চলবে না। মুঈন দ্বিমত দেখাতে পারেনি তবে প্রিতম উশখুশ করছিল,ঠিক তখন ইশমাম জামাইকে বললো,“একটা রাত থাকো, এ বাড়ির সবার ভালো লাগবে।”

কথাটিতে ছিলো নম্রতা,ছিলো না ক'র্কশ ভাব। প্রিতম কিছু মুহূর্তের জন্য অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে শ্বশুরের মুখের দিকে, তারপর ভদ্রছেলের মত নিচুগলায় বলে,“জি বাবা।”

খাওয়া শেষে ইরফান গোসল সেরে নেবে বলে ঘরে যায়। ওর প্রস্থানে আলো,পরী আর রিতুর মাঝে ফিসফিসিয়ে কথা শুরু হয়। তবে ইনু আর ইনশিরাহ চলে যায় ভাইয়ের ঘরে।

সবকিছু গুছিয়ে ইনশিরাহ ট্রিমার আর শেভিং স্প্রে বের করে ইরফানের হাতে দিয়ে বলে,“ওখানে নাকি ডিসিপ্লিনড থাকতে হয়? তোর গালে কাঁটার মতো এসব কি? উদ্ভট লাগছে তোকে!”

_হ্যা আর হ্যান্ডসাম লাগছে শুধুমাত্র এসপিকে।
তৎক্ষণাৎ জবাব দেয় ইরফান।

ভাইয়ের মস্করা গায়ে না মাখিয়ে ইনশিরাহ বললো,“যা,এই খোচা খোচা দাড়ি ছাটবি।”

ভাইয়ের ব্যাগ হাতাহাতি করছে ইনায়া,দাদানের দিকে তাকিয়ে বলে,“দাদান কোনটা পরবে? কোনটা বের করবো?”

দুই বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে ইরফান বলে,“তোরা আমাকে নিয়ে পরলি কেন? তোদের হাসবেন্ডদের কাছে যা!”

ওরা গেলো না, ইরফান গোসল সেরে বেরিয়েও দেখলো ওরা দুজন দাঁড়িয়ে আছে, ইরফান বললো,“কি হলো? তোদের হাসবেন্ডরা কান্নাকাটি করছে ওদিকে, যা!”

_থাকি না কিছুক্ষণ।
ইনশিরাহ অস্ফুটে বলে। ইরফান ওদের দু'জনকে হাত দিয়ে ইশারা করে বলে ,“বস।”

দুইবোন বসলো। ইরফান ইনুর দিকে তাকিয়ে বলে,“পড়াশোনা হয়?”

মাথা ঝাঁকায় ইনু। কিছু মুহুর্ত চুপ করে থেকে বলে,“তুমি বদলে গিয়েছো দাদান সত্যিই?”

ইরফান হেসে ফেললো, খুব হাসলো কিছুক্ষণ, তারপর বলল,“হ্যা! সত্যি রে! কেন খুশি হোসনি?”

_তুমি বদলাও,তবে আমার আর আপুর সাথে বদলে যাওয়ার দরকার নেই। আমাদের সাথে আগের মতো কথা বলো, ধমকে ধমকে। প্লিজ দাদান।

বোনের সরল আবদার দেখে ইরফান আবারও কিছুক্ষণ হাসলো, তারপর বললো,“যা আমি একটু রেস্ট নেবো। বের হ!”

দুই বোন বেরিয়ে যাওয়ার পরে দরজাটা বন্ধ করে ইরফান আয়নায় নিজেকে কিছুক্ষণ দেখলো। একটা কালো রঙের ফুল স্লিভ টিশার্ট চাপিয়েছে তার পোড়া মাটি রঙের শরীরে।

তারপর ধীরে ধীরে ব্যাগ থেকে সিগারেটের প্যাকেট টা বের করে একটা সিগারেট ধরিয়ে আরাম করে বসে ধোওয়া ওড়াতে লাগলো ।

খানিক বাদে ইনশিরাহ আর ইনু আবারও এলো,কাল সকালে দুই বোন চলে যাবে, এতটুকুই তো সময় পাবে ভাইয়ের সাথে কাটানোর জন্য। এমনিতেও পুলসাইডে ইহান,মুঈন আর প্রিতম আড্ডা জমিয়েছে, ওদের দুবোনের ওখানে মন টিকছিলো না। ওরা আবারও এসে ইরফানের দরজায় নক করল। ইরফান সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে রেখে রুম ফ্রেশনার স্প্রে করে দিয়ে দরজা খুলে দেয়।

রুম ফ্রেশনারে কাজ হয়নি,নাক উঁচু ইশি তার উঁচু নাক কুঁচকে ফেলে চেচালো,“তুই সিগারেট খেয়েছিস? অমনি শুরু হয়ে গেলো?”

_ক্যান সিগারেট খেলে কি হবে?

_কিছুই না,তুই যে শুধরাবি না এটা জানতাম।

ইরফান ওর মাথায় একটা গাট্টা মেরে বললো,“ঐ ঐ, সিগারেট খেলে জাত যাবে? কেমন আপ্যাচাল এগুলো!”

_না খা, তোর সাথে তো এটা যায়।
ইনশিরাহ ইরফানের জামাকাপড় গুছিয়ে দিতে দিতে বললো,

ইরফান শান্ত স্বরে বলে ওঠে,“বড় দাদানও তো খায়। তোর মুঈন খায়না দ্যাটস গ্রেট! যা এবার তাকে কোলে নিয়ে নাচানাচি কর! ইয়েএএএএ আমার স্বামী সিগারেট খায়না!”

শেষের কথাটা মেয়েদের মতো ঢং করে ইরফান বললো। ইনু চোখ দু'টো বড় বড় করে বললো,“আমার বড় দাদান সিগারেট খায়?”

ইরফান বাঁকা হাসলো, সামান্য হাসলো ইনশিরাহও,ওরা দুজন জানে। কিন্তু ইনু এই কথাটা জানতো না। বড় দাদান কখনো বুঝতেই দেয়না!

ইরফান বললো,“এটাই ভদ্রলোক ইহান তাজওয়ারের কামাল! তার আরও অসংখ্য গুণ রয়েছে যা আপনারা জানেন না,আপনাদের শুধু আমার দোষ গুলো নজরে পরে!”

ইনশিরাহ হেসে ওঠে, বহুদিন পরে একটু হাসলো ভাইবোনদের সাথে। ইনু তখনও বিশ্বাস করতে পারছে না তার বড় দাদান সিগারেট খায়, ইরফানের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়াতীত কন্ঠে বললো,“বড় দাদান আসলেই সিগারেট খায়?”

_তোর পেয়ারের পি ফর প্রিতমের থেকেও বেশি খায়,আয় দেখে যা!

ইরফানের ঘর থেকে বেরিয়ে ওরা তিনজন ইহানের ঘরে ঢুকলো, ইহানের স্টাডি টেবিলের ড্রয়ার খুলে ইরফান দেখায় ইনায়াকে। ইনায়া ভীষণ অবাক, অথচ সে একটি বারের জন্যও দেখেনি এসব। বড় দাদান বরাবর চাপা স্বভাবের,এই ব্যাপারটাও কি সুন্দর লুকিয়ে গেলো।

হঠাৎ ইনশিরাহ ইহানের ড্রয়ারের ভেতরে সিক্রেট প্লেসে নজর বুলিয়ে হাত বাড়িয়ে একটা রিভলবার উঠিয়ে ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলে,“এসব কি! দাদান এই দু'টো এখনও কেনো রাখে!”

_শখ করে রাখে। চল বেড়োই, মার পরবে আমাদের পিঠে দাদান এসে দেখলে।

ইনু তখন হেসে কুটিকুটি হয়ে বলে,“আজ একেবারে শৈশব থেকে ঘুরে এলাম তাইনা দাদান,মনে আছে আমি ,তুমি,আপু আর শেহু এভাবে বড় দাদানের রুমে ঢুকে লুকিয়ে লুকিয়ে সব অগোছালো করতাম।”

_হ্যা,বড় মা একদিন আমাদের পেদিয়েছিল তাই।

হাসতে হাসতে আবারও ইরফানের রুমে ঢুকলো ওরা। ইনশিরাহ দাবার বোর্ড নিয়ে বসলো,তারা এখন দাবা খেলবে।

বাড়ির পরিস্থিতি সরল,নির্মল। দোতলায় পশ্চিমে ইরফানের ঘরে ওরা তিনজন হাসাহাসি করছে, পুল সাইডে ইহান,মুঈন এবং প্রিতম বসে আড্ডা দিচ্ছে। সামিনেরা তিনভাই খোশমেজাজে দোতলার লিভিং রুমে বসে আড্ডা দিচ্ছে, আজ মনটা বড্ড ফুরফুরে তিন ভাইয়ের। যত যাই হোক ছেলে তো তাদের,ছেলে কাছে এসেছে,ছেলের মধ্যে নম্রতা দেখতে পেয়ে খুশি।

বাড়ির গিন্নিরা ব্যস্ত রান্নাঘরে। এই গরমেও নানা পদের পিঠা বানাচ্ছে তাল,আখ আর খেজুরের গুড় দিয়ে। এর মাঝে নিচতলা থেকে ডাকাডাকি করে আলো সামিনকে বলে,“শুনছেন! পান্তুয়া গুলো প্যাক করা হয়েছে, একটু কুরিয়ার অফিসে পাঠান না দ্রুত!”

শেহার জন্য সবকিছু প্যাক করে পাঠিয়েছে, মেয়েটাকে ছাড়া ওর মামীরা কখনও পিঠে করে না, মেয়েটা পিঠে ভালোবাসে তাই।

বর্তমানে শান্তিনীড়কে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সুখী পরিবার মনে হচ্ছে,যেখানে কখনো অশান্তি সৃষ্টি হয়না। বাড়ির ছেলে-মেয়ে,মেয়ে জামাইদের নিয়ে যেন হাসছিল বাড়িটা। আজ অনেকটা দিন পরে সামিন, ইলহাম, ইশমাম, তিন ভাইয়ের হাকডাক, হাসাহাসি তে মুখরিত এই বাড়ির দোতলা।

________

রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে যে যার রুমের রাস্তা মাপলো। খাবার টেবিলে আজ হাসাহাসির বন্যা বয়ে গিয়েছে। শুধু নির্লিপ্ত ছিল প্রিতম, ইরফান।

মুঈন কিছুক্ষণ আগে রুমে ঢুকে মিঠিকে নিয়ে শুয়ে আছে, ইদানিং এমন হয়েছে মিঠি ইনশিরাহর থেকে মুঈনের কোলঘেঁষা বেশি হয়েছে, যেমন এ বাড়ির প্রত্যেকটা লোককে মুঈন ফরাজী ওরফে দ্য গ্রেট চালু লোক এমনভাবে পটিয়েছে যে এখন মুঈনই এ বাড়ির ছেলে,আর ইনশিরাহ এই বাড়ির পুত্রবধূ।

রাত বেশি হয়নি যদিও, সারাদিন আড্ডা দিয়ে যে যার রুমে বিশ্রাম নিচ্ছে। ইনশিরাহ ঘরে ঢুকে তার ড্রেসিং টেবিল হাতাহাতি করে একটা বোতল নিয়ে দরজার দিকে যাওয়া ধরলে মুঈন উঠে বসে বললো,“কোথায় যাচ্ছো?”

_মাম্মার কাছে,এটা ঠান্ডা তেল। মাসাজ করে দেবে। মাথা ধরেছে আমার।

মুঈন হাত দিয়ে ইশারা করে ওকে কাছে ডাকলো, ইনশিরাহ এগিয়ে যেতেই ওর হাত থেকে বোতলটা নিয়ে বললো,“মা সারাদিন খাটা খাটনি করে বিশ্রাম নিচ্ছেন। এসো আমি লাগিয়ে দিচ্ছি।”

ইনশিরাহ চুপচাপ মেঝেতে বসলো হাঁটু মুড়ে,মুঈন বিছানায় বসে ধীরে ধীরে ওর মাথায় ঠান্ডা তেল দিয়ে মাসাজ করে দিতে থাকে। আরামে,প্রশান্তিতে ইনশিরাহর ঘুম এসে যাচ্ছে। সে দুই বার হাই তুলে বললো,“ফরাজী।”

_হু।

_তুমি কি কখনও সেলনেও কাজ করেছো? আরামে আমার ঘুম এসে যাচ্ছে।

হাসলো মুঈন, বললো,“এতিমখানার ওস্তাদের মাথা মাসাজ করতে করতে এক্সপার্ট হয়ে গিয়েছি। তখন ভাবিনি এটা এখন এভাবে কাজে লাগবে!”

_অথচ তোমার বৌ গুড ফর নাথিং!

_অ্যান্ড আ'ম ওকে উইদ দ্যাট!

ইনশিরাহ একটা লম্বা শ্বাস ফেলে মুঈনের হাত ধরলো, তারপর ওর হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে ওভাবেই বসে রইলো চুপচাপ। ইদানিং এভাবে এই লোকের গায়ে মিশে থাকতে ইনশিরাহর দারুণ লাগে।
ঠিক তখনই ইরফান এসে ওদের দরজায় দাঁড়িয়ে পরলো,দরজা খোলাই ছিলো, থ'ম'কে দাঁড়িয়ে পরে আবার ঘুরে দাঁড়ায় ইরফান,এখন এদের বিরক্ত করতে চায়না। কিন্তু মুঈন ওকে দেখে ফেলে,বলে,“আরে এসো ভেতরে।”

ইনশিরাহ উঠে দাঁড়ায়। মুঈন ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলে,“কি আশ্চর্য এসো! কি লাগবে বলো!”

ঘরে ঢুকলো ইরফান, ইনশিরাহর দিকে তাকিয়ে বলে,“তোর ব্লুটুথ টা দে।”

মুঈন দুই ভাইবোনকে রেখে ঘর থেকে বেরোয়, রাত তত গভীর নয়। সে গিয়ে দোতলার লিভিং রুমে ইহানের কাছে বসলো, রাতের খবরটা দেখতে।

মুঈন বেরিয়ে যেতেই ইরফান ইশিকে বললো,“তুই এতো জ্বালাস লোকটাকে?”

_ও জ্বালাতন পছন্দ করে বলে।

ইরফান হেসে বলল,“তোর স্বামী কি দিয়ে গড়া? তোদের এসব লুতুপুতু দেখে হাসিও পায় আবার অবাকও লাগে।”

_অবাক কেনো লাগে?
অবাক হয়ে জানতে চাইলো ইনশিরাহ।

ইরফান ওর মাথায় জোরে একটা গাট্টা মেরে বলে,“কারন তুই এতো লাভিং আর কেয়ারিং হাসবেন্ড ডিজার্ভই করিস না।”

ব্লুটুথ টা নিয়ে একছুটে বেড়িয়ে যায় ইরফান, ইনশিরাহ মাথায় হাত দিয়ে গাট্টা মারার যায়গাটিতে ডলতে থাকে। এই বদমাশ ছেলে জীবনেও শোধরাবে না,জীবনেও একটু ভারদার হবে না। এমন উদ্ভটই থেকে যাবে!

________

ইনু ঘুরতে ঘুরতে ইনশিরাহর কাছে এসে বললো,“এই আপু? ওকে দেখেছো? ওকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না!”

বিছানার বালিশ ঠিক করতে করতে ইনশিরাহ হেসে জবাব দেয়,“কাকে? তোর পেয়ারের পি ফর প্রিতমকে? না রে দেখিনি!”

ইনায়া কপাল কোচাকালো আপুর কথা শুনে, বিরক্তি নিয়ে বললো,“এমন ভাবে মেজো দাদানের মতো লেগফুল করছো কেন আপু?”

_সরি!
হাসতে হাসতে জবাব দেয় ইনশিরাহ। ইনু মহাবিরক্ত হয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে যেতে নিলে ইনশিরাহ বললো,“আচ্ছা শোন,ওকে দেখলে ঘরে পাঠিয়ে দে, বল আপু ডাকছে।”

ইনু থামলো,বললো,“কাকে? তোমার এম ফর মুঈনকে? পারবো না! নিজে গিয়ে ডাকো।”

হনহনিয়ে চলে যায় ইনায়া, ইনশিরাহ হাসে একা একা, তারা সবকটা ভাইবোন কি অদ্ভুত!

প্রিতম পুল সাইডে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিলো অন্ধকারে, আকাশে মস্ত বড় একটা চাঁদ। সিগারেটে শেষ টান দিয়ে রুমের দিকে যাবে বলে ঠিক করেছে। অকস্মাৎ কারো পায়ের শব্দে,কারো অস্তিত্ব টের পেয়ে ঘুরে দাড়াতেই থমকালো প্রিতম।

ইরফান তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে,প্রিতমের মুখটাও থমথমে হয়ে গিয়েছে মুহুর্তেই। দু'জনে দুজনের মুখ থেকে দৃষ্টি নামিয়ে তাকায় দু'জনের হাতের দিকে, দু'জনের হাতেই জ্বলন্ত সিগারেট।

ইরফান দাঁড়িয়ে আছে ঠাঁয়, প্রিতম নিজের সিগারেটটা ফেলে পা দিয়ে পিষে ফেলে, তারপর চলে যেতে নিয়েও আবারও দাঁড়িয়ে পরে। ঘুরে দেখে ইরফানকে, ইরফান রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে চুপচাপ সিগারেট টানছে।

প্রিতম একটা বড় শ্বাস ফেলে আবারও চলে যেতে নিলে ইরফান বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলল,“কিছু বলবি?”

প্রিতম আবারও দাঁড়াল,ঘুরে তাকালো ইরফানের দিকে,পর পর তাচ্ছিল্য মাখা কন্ঠে বলে উঠলো,“ভালো হয়ে গিয়েছিস নারে?”

ইরফান সিগারেটটা দুই ঠোঁটের মাঝখান থেকে সরিয়ে ধোওয়া উড়িয়ে বাঁকা হাসলো।

প্রিতমও হাসলো,পর পর বললো,“তুই অ্যাকটিংয়ে খুব কাঁচা!”

_এক্সাক্টলি মেরে ভাই! আমি কাঁচা, এবং তুই অ্যাক্টিংয়ে পাকা। ঠিক আছে? হ্যাপি?

একটা লম্বা শ্বাস ফেললো প্রিতম,বললো,“এই তো আসল রুপ। এই শোন আমার সামনে ভং ধরে থাকিস না। এতো কষ্ট করতে হবে না আমার সামনে। বি ইরফান! বি দ্য অ্যাক্চুয়াল ইরফান মির্জা!”

ইরফান আবারও হাসলো, কিছুক্ষণ পরে এলোমেলো দৃষ্টি দিয়ে বললো,“শালা... আই কান্ট বিলিভ আমি তোর বাচ্চাদের মামু হবো!”

কথাটা হাসতে হাসতে বলে ইরফান গম্ভীর হয়ে যায়,প্রিতম তখন একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে,“অ্যান্ড আই কান্ট বিলিভ মেজো বাবার চার লাখ আটচল্লিশ হাজার টাকা জলে গেলো।”

ইরফান তাকিয়ে আছে চুপ করে। প্রিতম বললো,“বাট মাঝখান থেকে আমি হ্যাপি! কারণ, তুই ভালো হোস না না হোস সেটা নিয়ে আই হ্যাভ নো ইন্টরেস্ট! তোর গোটা ফ্যামিলির সাপোর্ট আল্টিমেটলি এই প্রিতমের ঝুঁলিতে থাকবে। মাইন্ড ইট!”

_কি হচ্ছে এখানে!
মুঈন অবাক হয়ে ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। সে এখানে এসেছে ইশিকে খুঁজতে।

মুঈন অবাক হয়েই প্রিতম ইরফানের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,“হেই! ঝগড়া করছিলে তোমরা?”

ওরা দুজন মুখটা হাঁসি হাঁসি করে ফেলে তৎক্ষণাৎ। ইরফান চওড়া হেসে এক হাতে প্রিতমের গলা পেঁচিয়ে ধরে মুঈনকে বললো,“ভাইয়া ঝগড়া কেনো করবো? কি আশ্চর্য! আমরা কথা বলছিলাম।”

প্রিতমও হেসে মুঈনকে বলে,“কথা বলছিলাম ভাইয়া। আপনি আসুন না,একসাথে আড্ডা দিই।”

মুঈন বিশ্বাস করলো না ওদের, কপাল কুঁ'চ'কে বললো,“না আমি যাচ্ছি, ঘুমাবো।”

মুঈন চলে যেতেই প্রিতম এক ঝটকায় নিজের গলা থেকে ইরফানের হাতটা সরিয়ে দেয়, ইরফান হাসতে থাকে, প্রিতমের ওর হাসি সহ্য হচ্ছিল না। হনহনিয়ে সেও চলে যায়।

ইরফান আবারও একটা সিগারেট ধরিয়ে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকে দীর্ঘক্ষণ, তারপর হাসতে হাসতে বলে,“শাআলা!”

মুঈন ভেতরে গিয়ে ইনশিরাহকে দোতলার লবিতে পেলো। বললো,“হেই তুমি আমার সাথে লুকোচুরি খেলছো?”

_এক্সাক্টলি,আ'ম গনা আস্ক ইয়ু সেইম কোয়েশ্চন! লুকোচুরি খেলছো?

_না তো!

_আমিও না তো!

_তবে কেউ কাউকে খুজে পাচ্ছি না কেনো!

মুঈন আশেপাশে তাকিয়ে ওকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে রুমের দিকে এগিয়ে যায়, গিয়ে ওকে বিছানায় ফেললো। দরজা লাগিয়ে দিয়ে এসে বালিশ গুলো বিছানা থেকে ফেলে ইশির কোলে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে নিলো।

ইনশিরাহ খিলখিলিয়ে হেসে বলল,“এখন এটা কি হচ্ছে?”

_তখন চুলে তেল লাগিয়ে দিয়েছি এখন শোধ করে দাও, যতক্ষণ না পর্যন্ত আমি ঘুমাবো ততক্ষন পর্যন্ত এভাবে বসে থাকবে,চুপ করে।

_কেন?

_কারন It's worth it!

________

প্রিতম ঘরে ঢুকে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পরলো। ইনু সিল্কের নাইট স্যুট টা গাঁয়ে চাপিয়ে,হাতে পায়ে লোশন মেখে গিয়ে প্রিতমের পাশে শুয়ে পরে বললো,“কোথায় ছিলে? কত খুঁজলাম।”

ওকে কাছে টানলো প্রিতম,বললো,“পুল সাইডে।”

কালো রঙের নাইট স্যুটটাতে এই ইনুটাকে ভীষণ আবেদনময়ী সৌন্দর্যের মালকিন লাগছিলো, বৌয়ের শান্ত স্নিগ্ধ সরল মুখটা কিছুক্ষণ দেখতেই মেজাজটা ঠান্ডা হলো প্রিতমের,মাথা থেকে ইরফানকে ঝেড়ে ফেলে ইনুকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরলো, ইনু আজ এসবে পাত্তা না দিয়ে সারাদিনে কি কি করলো, মেজো দাদান আর আপুর সাথে কত মজা করলো সেসব বলতে লাগলো। প্রিতম বৌকে ভালোবাসতে বাসতে যখন ওর ঘাড়ের কাছে পৌছায় তখন ইনু বলে,“জানো মেজো দাদান না একেবারেই বদলে গিয়েছে, তুমি খেয়াল করেছো?”

থেমে গেল প্রিতম, মেজাজটা আবারও বিগড়ালো, ইনুকে কিছু বুঝতে না দিয়ে শান্ত হয়ে শুয়ে রইলো।

ইনায়া ওকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে বলে,“এই কি হলো, বলো, মেজো দাদান বদলে গিয়েছে তাইনা?”

দু'চোখ বন্ধ করে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে প্রিতম বলে,“হ্যা জান, একেবারে বদলে গিয়েছে তোমার মেজো দাদান, এখন একটু ঘুমাও? এতো কথা বললে শরীর খারাপ করবে।”

________

ঘুমানোর আগে ইহান শেষবারের মতো লাইটস গুলো চেক করে দেখলো বাড়ির, লিভিং রুমের বাতিটা নিভিয়ে ঘরে যেতেই দেখলো ইরফানের ঘরের দরজা খোলা,ভেতরে ইরফান নেই।

তৎক্ষণাৎ পুলসাইডে গিয়ে দেখে ইরফান সেখানে। দাদানকে দেখে ইরফান হাতের সিগারেট টা ফেলে পা দিয়ে পিষে দেয়।

ইহানের মুখভঙ্গি গম্ভীর। ইরফান হেসে বলল,“দাদান দিনে সর্বোচ্চ দু'টো!”

কিছুক্ষণ ওকে দেখে ইহান বললো,“ঘরে যা।”

ইরফান বাধ্য ছেলের মত চুপচাপ ঘরে ঢুকে দরজা আটকালো, রাতের নিস্তব্ধতায় ঢাকা পরেছে গোটা বাড়ি। ইরফান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে গিয়ে গিটার টা হাতে নিয়ে সোজা চলে গেলো বারান্দায়,মেঘ ডাকছে হঠাৎ,তবে বৃষ্টি নামবে বলে মনে হচ্ছে না। এই মেঘ ইরফান মির্জার মতো পাগলাটে,উন্মাদ। অকারণে চেঁচামেচি করছে, পাগলামি করছে।

পাগলাটে মেঘের সাথে তাল মিলিয়ে ইরফান গম্ভীর হয়ে গিটারে সুর তোলে, এতো রাতে সবার ঘুম ভেঙে যেতে পারে ভাবলো না, গাইতে ইচ্ছে করলো খুব, এটা গত চার মাসে একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মেঘের দল তাদের পাগলামি বজায় রাখে, ইরফান গাইতে শুরু করে,

“হা হাম বাদালনে লাগে,
গিড়নে সামহালনে লাগে,
যাব ছে হে জানা তুঝে,
তেরি ওর চালনে লাগে,
হা হাসি বান গায়ে,
হা নামি বান গায়ে,
তুম মেরে আসমা,মেরে জামি বানগায়ে......

চলমান......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 76 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন