#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৭৭
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
ইনায়া মির্জা সদ্য “উই” নাম দিয়ে একটা সোস্যাল মিডিয়া সাইটে একটি মেসেজিং গ্রুপ খুলেছে। এটা গতকালই অতি উৎসাহী হয়ে খুলে ফেলেছে সে।
এই গ্রুপে সংযুক্ত করা আছে এই প্রজন্মের মানুষদের। বড়রা বাদ, ইনায়ার কাছের মানুষ গুলোকে ইনায়া সংযুক্ত করেছে ইতিমধ্যে, প্রিতম আহসান,ইহান তাজওয়ার মির্জা,প্রেরণা আহসান, ইনশিরাহ বিনতে সামিন, মুঈন ফরাজী, শেহা, ইরফান মির্জা। আপাতত এই কজনকে।
প্রেরণা আর ইরফান মির্জাকে সংযুক্ত করার আগে ইনায়া ইনশিরাহকে ফোন করে বলেছিল,“আপু? ঝামেলা হবে না তো?”
ইনশিরাহ সাফ সাফ বলেছিলো,“ঝামেলা মানে? প্রেরণা তোর ননদ, ইরফান তোর ভাই। তোর কাছের দু'জন, তুই দু'জনকে গুরুত্ব দিস তাই অ্যাড করেছিস, যার ভালো না লাগবে সে বেড়িয়ে যাবে। এতো মিন মিন করছিস কেন? তুই অ্যাড কর দু'জনকে। প্রেরণা আপু অযথা কথা শোনালে আমাকে ধরিয়ে দিবি।”
ইনায়া খুব সাহস করে প্রেরণার অ্যাকাউন্টটা ঐ গ্রুপে অ্যাড করে দিয়েছে। যদিও প্রেরণা সবকিছু দেখেও এখনও কিছুই বলেনি। গ্রুপটাতে শুধু ইনায়া আর ইনশিরাহ কথা বলেছে কিছু,বাকিরা এখনও অংশ নেয়নি।
ইহান কাজের ফাঁকে একবার চোখ বুলিয়ে দেখেছিলো গ্রুপটা, হঠাৎ প্রেরণা আহসানের অ্যাকাউন্টটাকে দেখে ইহান চেয়ে রয় বৃত্তাকার প্রোফাইলটার দিকে, ছবিটা শুদ্ধর। ইহান খুব কৌতুহলী হয়ে আইডিটা স্টক করেছে এই প্রথমবারের মতো, এর আগে একবার ভেবেও দেখেনি এসবের কথা। কিছুই নেই প্রোফাইলে। মোটামুটি মানের বিজনেস ওম্যানের ব্যক্তিগত আইডিটা তার পরনের মলিন শাড়ির মতোই সাদামাটা। অবশ্য ইহানের বোনগুলোও এমন,ওরা কখনও ফেসবুক,ইনস্টাগ্রাম বা অন্যান্য সাইটে নিজেদের ছবি দেয়না।
ইহান শুদ্ধর ছবি গুলো জুম করে দেখে দীর্ঘসময়, তারপর প্রেরণার প্রোফাইল থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার আগে তার হাত থামে, আচমকা কি মনে করে ইহান একটা কাণ্ড করে বসে, প্রেরণাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দেয় ইহান।
পরমুহূর্তেই চোখ বড় বড় করে নিজেকে উপলব্ধি করে। এটা কি ছ্যাবলামি ধরণের কিছু করে ফেললো সে? উনি কি ইহানকে ছ্যাবলা ধরণের পুরুষ লোক মনে করবে?
ভীষণ অস্বস্তিতে পরে ইহান ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট ক্যান্সেল করতে গিয়ে দেখলো বড় বাবা,পাপা,ছোটো বাবা,বড় মা,ছোটো মা সবাই প্রেরণার বন্ধু তালিকায় আছে। রিতুর অ্যাকাউন্ট থাকলে হয়তো রিতুও থাকতো।
ইহান থামলো,একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলে ভাবলো,ছ্যাবলা কেনো ভাববে? সে তো রিলেটিভ, শেষ বারের মতো ভেবে ইহান বন্ধু রিকোয়েস্ট ক্যানসেল করলো না আর।
আজ বেশ গরম পরেছে সকাল থেকে, এছাড়াও বিভিন্ন কারণে ইহানের মেজাজ টা ঠিক নেই, কিছুক্ষণ এমনি এমনিই কাটিয়ে দেয় পার্টি অফিসে, তারপর মুঈনের পার্সোনাল নাম্বারটাতে কল লাগায়।
মুঈন কলটা রিসিভ করতেই ইহান বললো,“আমি ভাবিনি তোমার ফোনটা খোলা থাকবে।”
_হ্যা ঐ ইশির খোজ নেওয়ার জন্য খুলেছি মাত্র, কিছু বলবে?
_হয়েছে কি মুঈন? আর ইউ শিয়র তুমি ব্রিফিং করবে?
_কেন নয় ইহান?
_মুঈন লিয়াকত চৌধুরী এমনিতেই তোমাকে খোঁচায়....
_কাম অন ইহান,তুমি এটা বলছো? কারণ এটা রিস্কি? কারণ আমি তোমার বোন জামাই? নয়তো ঠিক তুমিই বলতে আমাকে এটা করার জন্য।
ইহান চুপ করে থাকে। মুঈন হেসে বলে,“আমি বুঝে নেবো। এমনিতেও আমি সবগুলো জেলাতে ঘুরে ঘুরে চাকুরী করার মনস্থির করেছি। রাখছি।”
সোজাসাপ্টা কথাটা বলে মুঈন কল কাটলে ইহান কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকে, মুঈনের কথা শুনে আজ হঠাৎ খুব করে একজনের কথা মনে পরে গেলো ইহানের, তার স্যার। যে ঠিক মুঈনের মতো ছিলো নিজের পেশায় বেপরোয়া, বড় বাবার পরে ইহান যার কথা,যার জীবনবোধ নির্দ্বিধায় গ্রহণ করতো। যাকে ইহান তিন বছরে ভীষণ মান্য করতো।
হুট করে তীব্র অস্থিরতায় হাশফাশ করে উঠলো মনটা। ইহান মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে অন্য কোথাও মন দিতে চাইলো, তাকালো সিসিটিভি মনিটরের দিকে। হুট করে ইহান থমকায়, গেটের বাইরের ফুটেজটা দেখে।
আজ কি বার,ইহান ফোনে দেখলো আজ সোমবার, হিসেব মিলিয়ে বুঝলো আজ প্রেরণার এখানে থাকার কথা। তবে এই সময়ে কোথায় যাচ্ছে!
পা-মাথা দেখলো প্রেরণাকে ইহান। জুম করে দেখলো ফুটেজ, শাড়ির আঁচল দিয়ে বারবার কপালের ঘাম মুছে নিচ্ছে, আর কেমন হাশফাশ করছে দেখে মনে হলো! ভদ্রমহিলার শরীর খারাপ ইহান জানে, ওকে কিছুক্ষণ দেখে অন্তরকে বললো,“ওনাকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর কোনো অসুবিধা হয়েছে কি না!”
অন্তর উঠে দাঁড়ানোর আগে ইহান বললো,“তুই থাক। আমার নিচে কাজ আছে,আমি যাচ্ছি। ওরা সাংগঠনিক কাগজ গুলো নিয়ে এলে অফিস তালা মেরে যাবি।”
ইহান গাড়ির চাবি নিয়ে চলে গেলে অফিসের ছেলে গুলো ছুটে এসে সিসিটিভি মনিটরের সামনে বসে পরে গোল হয়ে, একজন আরেকজনকে খুঁচিয়ে বলে,“এই ভাই আর বাবুর্চি আপা? কেস কি?”
_আমার না আগে থেকে সন্দেহ হয়েছে কিছু চলে। ভাই আই যাস্ট কান্ট বিলিভ ভাইয়ের এই মহিলাকে পছন্দ!
_অসুবিধা কি? সুন্দর তো মহিলা।
_সুন্দর তবে ভয়ংকর! ভাইয়ের রুচি ভয়ংকর! অতি ভয়ংকর!
ওরা কেউ কেউ হাসছে, কেউ কৌতুহলী হয়ে মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছে। দেখছে ভাইয়ের কান্ড।
ইহান গিয়ে গেটের বাইরে পা রাখতেই প্রেরণা ক্লান্ত মুখটা ঘুরিয়ে ওকে দেখলো, পর পর সালাম দিলো।
ইহান গম্ভীর কন্ঠে সালামের জবাব দিয়ে বললো,“আপনার স্কুটি কোথায়?”
_আনিনি আজ।
ইহান দেখলো কন্ঠস্বরও ভীষণ দুর্বল প্রেরণার। আশেপাশে তাকিয়ে ইহান বললো,“আজ ক্যাব পাবেন না হয়তো, আজ শহরে মোটামুটি ঝামেলা চলছে জানেন না?”
প্রেরণা কেমন রুগ্ন কন্ঠে বলে,“ওহ, তাই নাকি, আসলে খেয়াল নেই। প্রিতমকে কল করছি।”
ইহান ওর হাতের মোবাইল থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বরফ শীতল কন্ঠে বললো,“ওকে কল করতে হবে না, আমি ওদিকে যাচ্ছি। আপনি আসুন, আপনাকে ড্রপ করে দেবো।”
খুব বেশি ভাবলো না প্রেরণা,তার মনে হচ্ছিল সে ভিড়মি খেয়ে পরে যাবে এক্ষুনি। ইহান গাড়ির দরজা খুলে দিতেই প্রেরণা শাড়ির আঁচল সামলে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে পেছনের সিটে মাঝ বরাবর বসলো। ইহান গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগে ফ্রন্ট মিররে একপলক দেখলো মহিলাকে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে বাইরে উদাস চোখে, যে চোখ দুটোতে ডুবে যাওয়া যায়,ঐ চোখে উদাস দৃষ্টি।
খানিক বাদে আশেপাশে তাকিয়ে প্রেরণা বললো,“আজ কি হয়েছে শহরে?”
_লাবিব চৌধুরী অ্যারেস্ট হয়েছে। দ্য আওয়ার্সে একটা মেয়ের ডেডবডি পাওয়া গিয়েছে গতরাতে, প্রাথমিক তদন্তে ওর নাম উঠে এসেছে। ওর দলীয় ছেলেরা ঝামেলা করছে শহরে।
প্রেরণা সিটে গা এলিয়ে দিয়ে আঁচল দিয়ে মুখটা ঢেকে রাখে। ইহান দেখলো,অনেকটা সংকোচ কাটিয়ে বললো,“সুগার ফল করেছে?”
_না আপনি প্লিজ শুদ্ধর স্কুল হয়ে যান,ওকে পিক করতে হবে।
গাড়ি একটানে শুদ্ধর স্কুলের অপজিটে দাঁড় করিয়ে ইহান প্রেরণার দিকে ঘুরে দেখলো প্রেরণা নামছে,সে বললো,“আপনি বসুন,আমি নিয়ে আসছি।”
শুদ্ধর স্কুলে ছুটির ঘন্টা বাজছে। গেটের কাছে গুটি গুটি পায়ে শুদ্ধ এগিয়ে আসতেই ভিড়ের মধ্যে থেকে ছো মেরে ইহান ছোট্ট মানুষটাকে কোলে তুলে নেয়।
শুধু চমকায়,চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে ইহানের দিকে, ইহান হেসে বলে,“হ্যাললো! ভয় পেয়েছো?”
শুদ্ধ মাথা নাড়ে,সে ভয় পায়নি। ইহান ওর কপালে কপাল ঠেকিয়ে আদর দিয়ে বললো,“চলো,মাম্মা আছে গাড়িতে।”
শুদ্ধ বিস্ময় ভাব কাটিয়ে মুখটা হাসি হাসি করলো, ইহান আংকেল তার সবথেকে পছন্দের আংকেল, সে দেখলেই খুশি হয়ে যায়।
শুদ্ধকে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে ইহান পাশের একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে আইসক্রিম এনে ওকে দিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসলো।
গাড়ি চলছে , শুদ্ধ আইসক্রিম খাচ্ছে, প্রেরণা শরীর খারাপ নিয়েও শুদ্ধর ব্যাগ হাতিয়ে ওর হোমওয়ার্ক ডায়েরী দেখছে, আর ইহান ফ্রন্ট মিররে দেখছে মা ছেলেকে বারবার। হঠাৎ প্রেরণা কি মনে করে মাথা তুলে তাকাতেই দু'জনের চোখাচোখি হলো। ইহানের মুখটা থমথমে হলো অস্বস্তিতে, সে এতো ছ্যাবলা হয়েছে এটা ভেবে ফরসা মুখটা মলিন হলো মুহুর্তেই। চোখ নামিয়ে সামনের দিকে তাকায় ইহান। মনে মনে ডিসেন্ট মির্জা নিজেকে কিছু ডিসেন্ট গালিও দেয় এমন অকাজের জন্য।
খানিক বাদে প্রেরণা আচমকা বললো,“আপনার ভাই শুদ্ধ হয়েছে?”
প্রশ্নটি শুনে ইহান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,“ও আগাগোড়া অশুদ্ধ ছিলো না তো, ব্যাপারটা ছিলো ওর রাগ নিয়ে, ওটা কন্ট্রোল করতে পারতো না ও, আপাতত দেখছি তো বেশ পরিবর্তন। আই হোপ সো সব ঠিক হবে!”
প্রেরণা আর কথা বাড়ায় না, গাড়ি প্রেরণাদের অ্যাপর্টমেন্টের সামনে থামলে,ইহান নেমে দরজা খুলে দেয়, তারপর কোলে তুলে নেয় শুদ্ধকে। ধীরে ধীরে প্রেরণাও নামে, তার কেমন গা গুলোচ্ছে। নেমে গাড়ির দরজায় হাত দিয়ে ভর দিয়ে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে সামনে পা ফেলতেই মাথাটা চক্কর দিলো হঠাৎ, ইহান দ্রুত তার বলিষ্ঠ হাতে খপ করে প্রেরণার ডান হাতটা ধরে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিলো।
ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব প্রেরণা এক ঝটকায় ইহানের হাত সরিয়ে পিছিয়ে গিয়ে গাড়িতে ঠেশ দিয়ে দাঁড়ায়।
হাশফাশ করছে প্রেরণা, ইহান চমকে গিয়ে বিমূঢ় চেয়ে রয় ভদ্রমহিলার মুখের দিকে, আবার তাকায় নিজের হাতের দিকে। ঘটনাটা ব্রেইনে প্রসেস করতে না করতেই তার মাথায় হুট করে এলো মুঈনকে বলা সেই কথাটা,“এক অসম্ভবের প্রেমে হয়তো পরেছি,হয়তো না। আমি না আসলে কনফিউজড। এটা ইনফ্যাচুয়েশন হতেও পারে। আমি সঠিক ব্যাখ্যা খুঁজে না পাওয়া অবধি এগোতে চাই না। হয়তো এগোনো হবেও না কখনো।”
আসলেই, এগোনো হবে না ইহানের, এগোনো যে ঠিক হবে না এটা ভদ্রলোক ইহান তাজওয়ার বুঝতে পারে,এই ভদ্রমহিলা বুঝিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ প্রেরণাকে দেখে ইহান পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোনটা বের করে ইনুকে কল করে,বলে,“মিস জেনিকে নিয়ে একটু নিচে আয়।”
প্রিতম গিয়েছিলো একটা সফটওয়্যার কোম্পানিতে জব ইন্টারভিউ দিতে, ইনু আর মিস জেনি নিচে আসতেই ইহান বললো,“ওনাকে ধরে ধরে নিয়ে যা।”
ইনু চিন্তিত হয়ে ছুটে আসে প্রেরণার কাছে। এসে ওকে ধরে ইহানকে বললো,“তুমি আসবে না?”
প্রেরণা রুগ্ন দৃষ্টিতে ইহানকে একপলক দেখে অস্ফুটে বললো,“প্লিজ চা খেয়ে যান।”
গম্ভীর চেহারায় আরেকবার আন্তরিক হেসে ইহান বললো,“আরেকদিন।”
_______
একগাদা কাগজপত্র হাতে সকাল থেকে বসে আছে ইরফান। এগুলো মির্জা এন্টারপ্রাইজের সিমেন্টের ব্যাবসার হিসেব পত্র।
বহুকাল আগে মির্জা এন্টারপ্রাইজের ব্যাবসা ছিলো দু'টো, আটা মিল এবং স্পাইস, বর্তমানে রড, সিমেন্ট এবং ফেব্রিক্স। ভিন্ন ভিন্ন স্থানে চারটি কারখানা মোট। হেড অফিস একটি। যেখানে ইয়াসার মির্জা এবং ইলহাম মির্জা বসেন।
পলিটিক্স থেকে বেড়িয়ে ইয়াসার মির্জা বহু পরিশ্রম দিয়ে এতদূর এনেছেন ব্যাবসাকে।
কাগজগুলোর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ইরফান। অর্ধেক হিসেব দেখেছে,বাকিটা দেখতে ইচ্ছে করছে না, বন্ধুরা গ্রুপে অবিরত মেসেজ করছে দেখা করার জন্য, সবাইকে থামিয়ে রেখে নিজেও থেমে আছে ঘরে, বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে এগারোটা নাগাদ।
আলো ঘরে ঢুকে ছেলের হাতে কাগজগুলো দেখে বিরক্ত হয়ে বলল,“এগুলো এখন রাখ। আবার বিকেলে দেখিস।”
ইরফান নড়েচড়ে বসলো, আলোকে বললো,“কই গিয়েছিলে মাম্মা আর তুমি সকাল সকাল?”
_ঐ তো তোদের তালুকদার আংকেলের বাসায়,ওনার ছোটো ভাগ্নি হোস্টেল থেকে ফিরেছে, ওকে এক ঝলক দেখে এলাম, তোর তালুকদার আংকেলই সকালে এসে ধরে নিয়ে গেলো।
_মেয়ে দেখছো? দাদানের জন্য? দাদান জানে?
_জানে,শুধু ঢং করে, মুঈন কথা বলেছিলো,মুঈনকেও থামিয়ে রেখেছে। ব্যাপারটা এখন সহ্য সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে না বল?
ইরফান হাতের কাগজগুলো রেখে সামান্য হাসলো,বললো,“দাদানের কোনো পছন্দ আছে কি না জানতে চেয়েছো কখনও?”
_তা তো সবসময়ই চাই। বলে না কিছু। জানিস একদিন আমাকে বলেওছিল একটা মেয়েকে অল্পস্বল্প ভালো লেগেছে,মেয়েটার চোখ সুন্দর,নীল সমুদ্রের মতন। আবার বলে ও ঠিক বুঝতে পারে না এটা ভালো লাগা নাকি অন্য কিছু।
সুন্দর নীল চোখের কথা শুনেই প্রেরণা দ্য বিশিষ্ট জ্ঞানী আপার রাগী রাগী জুতো হাতে নেওয়া মূর্তি টা ভেসে ওঠে ইরফানের, ইরফান চোখ বড়বড় করে উচ্চশব্দে হেঁসে ফেললো হঠাৎ। আলো অবাক হয়ে বললো,“হাসছিস কেনো? তুই জানিস কিছু।”
নকল হাই তোলার ভান করে ইরফান আড়মোড়া ভেঙে বললো,“আমি কি করে জানবো,যেখানে দাদানই বুঝতে পারছে না। আগে দাদান জানুক, তারপর থেকে আমিও জানবো, তারপর তোমাদের জানাবো।”
ইরফানের রহস্য করে কথায় বিরক্ত হয় আলো, সে চুপ করে আছে, ইরফান বললো,“এতো প্যারা খেও না, এতো মেয়ে বাছাবাছি করার কিছু নেই, এমনিতেও তোমার গুড বয়ের বৈবাহিক কপাল খুব খারাপ দেখতে পাচ্ছি।”
_মানে? এমন কথা কেন বলছিস?
আলো অবাক হয়ে জানতে চাইলো। ইরফান তার স্বভাব সুলভ কিছুক্ষণ হেসে ফাজলামির সুরে গান ধরলো,“কারন
ভালো ছেলেদের কপালে ভালো মেয়ে জোটে না।”
আলো হেঁসে ফেললো হঠাৎ,হাসতে হাসতে চোখের কোণে পানি এসে যায়, হাসি থামিয়ে বলে,“একটা গান শোনা বাবা।”
অবাক হলো ইরফান,বললো,“গান শুনবে তুমি আমার?”
_হ্যা তো, তোর মায়ের সাথে ঝগড়া করে ছোটোবেলায় তোকে গান শিখিয়েছি কি শুধু শুধু?
বলে উঠে দাঁড়ায় আলো,পরীকে ডেকে আনে, পরী আজ চেম্বারে যায়নি শরীরটা খারাপ বিধায়।
দুই জা মিলে গুছিয়ে বসলো ছেলের গান শুনতে, বাইরে ঝমঝমে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, রিতু নিচে ব্যস্ত ইলিশ পোলাও করতে।
ইরফান গিটার নিয়ে এসে ভদ্র মতন বড় মা,ছোটো মায়ের সামনে বসে পরলো, কিছু মুহূর্ত পরে এক অন্যরকম ইরফান হয়ে ইরফান দু'চোখ বন্ধ করে নিয়ে গান ধরলো,
“মন মোর মেঘের সঙ্গী,
উড়ে চলে দিগ্দিগন্তের পানে
নিঃসীম শূন্যে শ্রাবণবর্ষণসঙ্গীতে
রিমিঝিম রিমিঝিম রিমিঝিম॥
মন মোর হংসবলাকার পাখায় যায় উড়ে
ক্বচিৎ ক্বচিৎ চকিত তড়িত-আলোকে।
ঝঞ্জনমঞ্জীর বাজায় ঝঞ্ঝা রুদ্র আনন্দে।
কলো-কলো কলমন্দ্রে নির্ঝরিণী
ডাক দেয় প্রলয়-আহ্বানে॥
বায়ু বহে পূর্বসমুদ্র হতে
উচ্ছল ছলো-ছলো তটিনীতরঙ্গে।
মন মোর ধায় তারি মত্ত প্রবাহে
তাল-তমাল-অরণ্যে
ক্ষুব্ধ শাখার আন্দোলনে॥”
আলো আর পরী দেখছিলো চোখ বন্ধ করে গান গাইতে থাকা উগ্র ছেলেটাকে,কন্ঠে যার এতো সুর, গান শেষ হবার সাথে সাথে আলো বলে উঠলো,“তুই রবীন্দ্র সঙ্গীত কবে থেকে ট্রাই করছিস! তোর তো গাইতে ভালোলাগতো না!”
হাসলো ইরফান সামান্য,বললো,“মাঝে মাঝে করা হয়, ভালোই লাগে এখন!”
পরী বললো,“তুই এটার আরেকটু তালিম নিতে পারিস। দারুণ হবে বাবা।”
রিতু রান্না সেরে উঠে দোতলায় এসে ইরফানের ঘরে ঢুকে বললো,“ফ্রি আছিস? একটু ইশির অ্যাপার্টমেন্টে যাবি? ওদের জন্য ইলিশ পোলাও বক্স ভরে দিতাম।”
ইরফান মাথা নেড়ে ভদ্র ছেলের মত উঠে দাঁড়ায়, টি শার্ট খুলে একটা শার্ট চাপিয়ে বোতাম গুলো সুন্দর করে লাগিয়ে নিয়ে চুলটা ঠিক করে নেয়, পুরোদস্তুর গুড বয়ের ভং ধরে লম্বা কদমে নিচে নামতেই দেখে মোট দু'টো বড় বড় বক্স। ইরফান একটা তুলে নিয়ে আরেকটার দিকে তাকিয়ে মাকে বললো,“এটা কার?”
_ওটা ইনুদের জন্য, তোর ওটা দিয়ে কোনো কাজ নেই, তুই ইশির টা দিয়ে আয়। ওটা ইহান দিয়ে আসবে। ও আসছে।
মায়ের মুখের দিকে কিছু মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে ইরফান চুপচাপ চলে যায়,পেছন থেকে রিতু গম্ভীর গলায় বলে,“বাড়ির গাড়ি নিয়ে যা। বাইক নিবি না।”
_________
থানা দালানের সামনে এক ইঞ্চি যায়গা ফাঁকা নেই আজ। লাবিব চৌধুরীকে এ্যারেস্ট করায় তার ছেলেরা ক্ষেপেছে। উপরমহল এদের প্রতিহত করতে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। মুঈন নিজের ক্ষমতা জাহির করে যতটুকু পেরেছেন বাঁধ দিয়ে রেখেছে। পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে কড়া নিরাপত্তার ব্যাবস্থা করা হয়েছে, অন্যপাশে থানাও সুরক্ষিত।
লাবিব চৌধুরীকে রাখা হয়েছে থানার পুরোনো দালানের চার নাম্বার সেলে বসিয়ে। মুঈন নিজের কার্যালয়ে বসে এই মাত্র ওসির সাথে কথা বলে ফোন কাটতেই একজন কনস্টেবল ঠান্ডা পানি এনে দিলো। মুখে কিছু বললো না স্যারকে, আজ স্যারের মেজাজ একদম ঠিক নেই, একদম না। অযথা ধ'ম'ক খাওয়ার ইচ্ছা নেই তার।
মুঈন পানিটা খেলো, বাইরে তখনও শোরগোলের আওয়াজ, ছেলেগুলোর উগ্রতা দেখে মুঈনের শরীরে উষ্ণ রক্ত টগবগ করে ফুটছে। লাইসেন্স প্রাপ্ত আগ্নেয়াস্ত্রটাকে আজ খুব কাজে লাগাতে ইচ্ছে করছে।
থম মেরে কিছুক্ষণ বসে থাকার পরে হুট করে তার অফিশিয়াল ফোনটা বেজে ওঠে, রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে লিয়াকত চৌধুরী সালাম না দিয়ে খেকিয়ে ওঠে একপ্রকার,“এই শোনো অফিসার, বারবার আমার ফোন কেটে কিন্তু শনি ডাকছো তুমি নিজের। তুমি ওসিকে বলো এক্ষুনি আমার ছেলেকে ছাড়তে, এক্ষুনি, টু টা সাউন্ড যেন না হয় নয়তো তোমাদের দুজনকে আমি এক হাত দেখে নেবো।”
মুঈন কল কাটলো না, লিয়াকত চৌধুরী বলতে থাকে,“তোমাকে বলা হয়েছে তো যে অ্যামাউন্ট চাও ওইটাই দেবো,শুধু সাংবাদিকের সামনে গিয়ে বলে দিবা উপযুক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি লাবিবের বিরুদ্ধে। এই এতো সততা দেখাইয়ো না, তোমার লোভ আছে কি নেই তা জানি, ইয়াসার মির্জাকে তেল দিয়ে তার মেয়েকে বিয়ে করছো, কেন করছো জানি না? বলদ আমরা? লাভ লোকসান তো ভালোই বুঝো, বলো বলো, অ্যামাউন্ট বলো।”
দুম করে এবার কলটা কাটলো মুঈন। কনস্টেবল এসে বললো,“স্যার প্রেস থেকে সাংবাদিক এসেছে।”
অন্যদিকে তার পার্সোনাল নাম্বারটিতে আইজিপি স্যার ফোন করছে। মুঈন কলটা রিসিভ করলো না,উঠে দাঁড়িয়ে সোজা হেঁটে চলে গেলো কার্যালয়ের প্রেস কনফারেন্স রুমে।
একটুও ভাবলো না মুঈন,একটুও ভড়কালো না, গলায় স্বাভাবিকতা বজায় রেখে সাংবাদিকের সাথে কথা বলে, তাদের নিশ্চিত করেছে লাবিব চৌধুরীর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
কেবিনে ফিরেই দেখলো আইজিপি স্যার লাগাতার ফোন করছে, এইবার মুঈন কলটা রিসিভ করতেই আইজিপি স্যার চেঁচিয়ে উঠলো,“এই বোকার হদ্দ! তুমি ব্রিফিং কেন করেছো? আর ইউ আউট অফ ইয়র মাইন্ড?”
_স্যার বিহেভ ইয়র সেল্ফ, আমরা অফিশিয়াল কথা বলছি।
ঠান্ডা গলায় জবাব টা দিলো মুঈন।
আইজিপি সানাউল হক মেজাজ টা খানিকটা কমিয়ে বললো,“মুঈন আ'ম সরি! বাট নেক্সটে আমি তোমাকে কোন হেল্প করতে পারবো না।”
_______
ড্রাইভারকে সুপার শপের সামনে গাড়িটা দাঁড় করাতে বলে ইরফান নামলো, গাড়িতে ইলিশ পোলাওয়ের বক্স। নেমেই একটা সিগারেট ধরিয়ে ইরফান ঢুকলো শপে, দেদারসে ধোওয়া ছড়িয়ে উসকোখুসকো চুল গুলো হাত দিয়ে ঠিক করে সামনে এগোয় ডানে বায়ে না তাকিয়ে, ইশির বাসায় যাবে বলে কিছু কিনতে এসেছে এখানে, ফল মিষ্টি টাইপের কিছু।
ইরফান যখন হাঁটে তখন ডানে বায়ে দেখার সময় থাকে না ওর, চকিতে একটা মেয়ের সাথে ধাক্কা লাগলো, ইরফান না তাকিয়েই সরি বলে এগিয়ে যায় সামনে, তার দৃষ্টি আশেপাশে খুঁজছে ইশির জন্য কি নেওয়া যায়, কিছু সময় খোঁজাখুঁজি করে কিছু মিষ্টি আর সফটড্রিংকস নিতেই পেছন থেকে একটা মেয়ে বললো,“এক্সকিউজ মি!”
ইরফান ঘুরে তাকায়। মেয়েটাকে সে চেনেনা, তাকিয়ে আছে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে, মেয়েটা কেমন লজ্জা লজ্জা ভাব করে বললো,“ক্যান আই হ্যাভ ইয়র নাম্বার?”
ইরফান সিগারেটটা ঠোঁট থেকে সরিয়ে বললো,“কেন? কোন আনন্দে?”
মেয়েটার সাথে কিছুক্ষণ আগে ইরফানের ধাক্কা লেগেছিলো। মেয়েটা বললো,“আনন্দ নয়, আপনার প্রোফাইল টা জানতে শুধু।”
আগে হলে ইরফান দু চারটে গালি অবশ্যই দিতো মেয়েটিকে, ইদানিং গালি খরচ করে না ইরফান, এই ধরণের মেয়ে গালাগালির উর্ধ্বে। ইরফান শান্ত ভঙ্গিতে বললো,“আমার বৌ আছে।”
একটা মুহুর্তও না দাঁড়িয়ে সোজা হেঁটে ওখান থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসে ইরফান, সিগারেটটা আবারও দুই ঠোঁটের মাঝখানে চেপে ধরে বলে,“শালা আমার মতো কালামানিকের কাছে নাম্বার চায়,এর রুচিও জঘন্য!”
ফিশ মার্কেট এরিয়ায় ঢুকে ইরফান কি মনে করে একটা বড় আইর মাছ কিনলো, আট কেজির মাছটা বড় দেখেই ইরফান কিনলো, তার মনে পরে ছোটো বেলায় বড় বাবা আর সে একসাথে মাছ বাজারে ঢুকে এমন বিশাল সাইজের মাছ কিনে ফুপির বাড়িতে যেতো। ফুপি বড় মাছ ভীষণ পছন্দ করতো। তার অবচেতন মন ভাবলো ভাইয়েরা হয়তো বোনের বাড়িতে এমন বড় মাছ নিয়ে যায়, এটাই হয়তো ভাইদের কর্তব্য। তাই মাছটা নিয়ে নিলো। এই মাছ দেখে ইনশিরাহ কেমন রিয়াক্ট করবে সেটা ভেবে পৈশাচিক হাসি হাসলো ইরফান। নিশ্চয়ই অকর্মার ঢেকিটা নিজের চুল ছিড়বে,ভাই-বোন গুলোকে জ্বালিয়ে এতো আনন্দ কেনো পায় সে নিজেও জানে না। তবে হঠাৎ মনটা উদাস লাগলো ইরফানের, ইনুর জন্য এত বড় একটা মাছ নিতে পারলো না সেটা ভেবে।
হলোও তাই, ইনশিরাহ মাছ দেখে ভীষণ রাগারাগী করলো দুপুর বেলা, চেঁচিয়ে বললো,“আহাম্মক তুই এনেছিস এনেছিস এটা কাটিয়ে আনলি না কেনো? প্রসেসিং করে।”
_কাটিয়ে আনবো কেন? কাটিয়ে আনলে কিভাবে বুঝতি এটা কত বড় মাছ ছিল?
সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে ইরফান বললো।
ইনশিরাহ কপাল চাপড়াচ্ছে। ইরফান বোকার মতো ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,“ঠিকাছে ঠিকাছে, মাথা ঠান্ডা কর। আমি এই গেলাম আর এই এলাম এটাকে কাটিয়ে। মাথা ঠান্ডা কর ছোটো ভাই।”
চলমান.........