ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 78

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৭৮
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই

মাছটা ড্রাইভারকে দিয়ে কাটিয়ে এনেছে ত্রিশ মিনিটের মতো সময় লাগিয়ে, অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকতেই ইশি আবারও মাথায় হাত দিয়ে বসে রইল, আট কেজি মাছ কিভাবে ধুবে বুঝতে পারছে না সে,দেখেই গা গুলোচ্ছে তার, মাছের আঁশটে গন্ধে বমি পাচ্ছে, সদ্য গোসল করে এসেছে সে। ইরফান বোনের দিকে অপরাধীর মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,“আমি তোকে চ'ম'কে দিতে এনেছিলাম মাছটা, তুই যে কোমায় চলে যাবি বুঝিনি।”

_স্টুপিড আমি এগুলো এখন কি ভাবে ধোবো!

ইরফান মুখে চ বর্গীয় শব্দ করে বলে,“এই তোকে মেয়ে হতে কে বলেছিলো রে নারী জাতির কলঙ্ক! সর সামনে থেকে।”

মাছভর্তি ব্যাগটা নিয়ে ইরফান সিঙ্কের কাছে এগিয়ে যায়। ইশি অবাক হয়ে বললো,“তুই কি করছিস।”

ইরফান জবাব না দিয়ে নিজের শার্টের হাতা ফোল্ড করে নিজেই ধুতে শুরু করে দেয় মাথ, ইশি হতভম্ব হয়ে ওকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে বলে,“আহাম্মক সর,আমিই করছি।”

ইরফান আবারও এগিয়ে এলো, দুই ভাইবোন মিলে বহু কষ্টে আট কেজি মাছ ধুলো তো ধুলো, মুঈন-ইশির গোটা কিচেনটাই নোংরা করে দিলো । এরপর ইশি সেগুলো পরিষ্কার করলো আরো এক দফা। অন্যদিকে ইরফান মাছ গুলো বক্স ভর্তি করে ফ্রিজে রাখতে রাখতে বললো,“শাআলা তোর মতো একটা বোন থাকলে সেই ভাই বুঝে যায় শান্তি কাহাকে বলে। ভালোবেসে একটা মাছ এনেছিলাম, তুই ইতিহাস করে ছারলি। এই তোর স্বামীকে আজ আমি একটা স্যালুট করে যাবোই যাবো। কি নিয়ে ঘর করছে ভদ্রলোক ! এদিক থেকে আমার ইনু বেস্ট, মেয়েটা সবদিক থেকে ভালো ছিলো শুধু পি ফর প্রিতমের পাল্লায় পরে গোল্লায় গিয়েছে!”

ইশি কপাল কুঁচকে ফেলে, ঠিক তখনই কলিং বেল বেজে ওঠে। দ্রুতপায়ে হেঁটে যায় ইশি সেদিকে।

বাইরে দাঁড়ান ব্যক্তিটার মুড ঠিক নেই, ভীষণ রাগী লাগছে , আজ থানায় মন মেজাজের ফালুদা হয়েছে বলাই বাহুল্য। কপালের শিরা দৃশ্যমান। রাগে ঘিলু টগবগ করে ফুটছে ফরাজীর, ক্লান্ত লাগছে শরীরটা, ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।

ইশি দরজা খুলে দিতেই কি হলো, মানুষটার সমস্ত ক্লান্তি,মেজাজ খারাপ নাই হয়ে গেলো নিমিষেই। ধীরে ধীরে কপালের রেখা গুলো বিলীন হলো সামনে হাসিমুখে আবেগময় আমন্ত্রণ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রমনীকে দেখে।
একজন ক্যাটকেটে,দৃঢ় মেজাজী অফিসার ঠিক এখানেই শান্ত হয়, বৌয়ের মুখ দেখে, যদি সে পুরুষ হয়।
পুরুষ মানুষ এখানেই শান্ত হয়,এখানেই,যদি সে আসলেই পুরুষ হয়। পুরুষ তান্ত্রিক সমাজে এমন আহ্লাদিত,না মানতে চাওয়া সত্যি কথা আর দ্বিতীয়টি নেই।

ইশি হেসে বললো,“ইরফান এসেছে।”

_নিচে গাড়ি দেখেছি।

_মাছ নিয়ে এসেছে , ওকে দিয়ে মাছ ধুইয়েছি।

মুঈন আশেপাশে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,“শেম অন ইউ!”

_মি ঠু। ইয়েট আই যাস্ট লাভ মাইসেল্ফ!
ইশি হাসতে হাসতে দরজা লাগায়। ইরফান ততক্ষণে কিচেন থেকে হাত ধুয়ে বেড়িয়ে মুঈনকে সালাম দেয়,মুঈন ওর সালামের জবাব দিয়ে বললো,“করেছো টা কি! এসব কেন এনেছো!”

_তার আগে বলুন এই গাধীকে কেন টলারেট করছেন, ওকে আমার সাথে দিয়ে দিন। আপনি শান্তিতে থাকুন ভাইয়া।

মুঈন সামান্য হাসলো, ইরফান টিস্যু পেপার দিয়ে হাত মুছে বললো,“আমি এখন আসছি।”

_সে কি! খেয়ে যাবে এখন।

মুঈন-ইশি দুজনে ওকে আটকে রাখতে চাইলেও পারলো না, বাড়ির সবাই ইরফানের জন্য খাবার টেবিলে অপেক্ষা করছে বলে চলে যায় ইরফান তাড়া দেখিয়ে।

ও চলে যেতেই মুঈন রুমে ঢুকলো, ইনশিরাহ ঢুকলো তার পিছু পিছু। তখন থেকে খেয়াল করেছে মুঈনের মেজাজ ঠিক নেই, মুড ঠিক নেই, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ইউনিফর্মের বোতামে আঙ্গুল রাখতেই হুট করে পেছন থেকে ইশি হাত বাড়িয়ে মুঈনের হাত দু'টো ধরলো, মুঈন ওর দিকে তাকায়। ইনশিরাহ ঘুরে ধীরে ধীরে মুঈনের সামনে এসে দাঁড়ায়, অতঃপর খুব যতনে একটা একটা করে মুঈনের ইউনিফর্মের বোতাম গুলো খুলে দেয়। মুঈন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো শুধু, এমন নরম দু'টো হাত খুব যতনে তার ইউনিফর্মের বোতাম খুলে দেবে,এটা মুঈনের স্বপ্ন ছিলো, বহুদিন পরে যা পূর্ণতা পেল।
ইনশিরাহ মুঈনের ইউনিফর্ম খুলে নিয়ে রেখে দিয়ে বলতে থাকে,“আজ খুব প্রেশার গিয়েছে?”

_হু।
ছোটো করে জবাব দেয় মুঈন। ইনশিরাহ ঘরের মধ্যে পায়চারি করে স্বামীর জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখতে রাখতে বললো,“ভাত এখুনি খাবে?”

_না প্লিজ খানিক বাদে, খিদে নেই।

ইনশিরাহ গিয়ে টেবিলে খাবারের বাটি গুলো ঢাকা দিয়ে আসে। এসে দেখে মুঈন বিছানায় চুপচাপ শুয়ে আছে। লোকটা ঘরের বাইরে মেজাজী হলেও ইশির সাথে ছিলো সবসময় সর্বোচ্চ নরম, সহনশীল এবং খোশ মেজাজী, এভাবে উদাসীন লাগেনি মুঈনকে কখনো। ইশি রুমের দরজা ধরে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরে হুট করে বলে ওঠে,“আপনার লাইফে কি অনেক ঝামেলা? বাইরে আপনার কর্মক্ষেত্রে কি খুব কাজের চাপ যাচ্ছে? বাড়িতেও আপনার নিস্কর্মা বৌ কি আপনাকে খুব চাপে রাখছে? ঘরে বাইরে কোথাও আপনি একটুও স্বস্তি পাচ্ছেন না? জীবনের চূড়ান্ত হতাশা এসে আপনাকে গ্রাস করেছে? তাহলে এই ভর দুপুরে এক কাফ কফির সাথে হতাশাটুকু গিলে ফেলার আমন্ত্রণ রইল আপনার, চিনি দু চামচ তো?”

মুঈন মাথা তুলে দেখলো ইশিকে,ইশির মুখভঙ্গি গম্ভীর অথচ চোখেমুখে খেলা করছে দুষ্টুমি। মুঈন হেসে ফেললো,বললো,“হু দুচামচ।”

ইশি দুজনের জন্য দুকাপ কফি বানিয়ে নিয়ে বসলো মুঈনের কাছে। ক্লান্ত মুঈন ওর নরম হাতটা ধরে কাছে টেনে বললো,“খুব নাটুকে হচ্ছো!”

ইনশিরাহ হাসতে হাসতে কফির কাপ নিয়ে মুঈনের গায়ে মিশে যায়,হাসতে হাসতে বলে,“It's worth it!”

________

প্রেরণা সোস্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট গুলোতে খুব কম বিচরণ করে, দুদিন আগে একবার দেখেছে ইনু তাকে একটি ফ্যামিলি গ্রুপে সংযুক্ত করেছে সেখানে ইরফান মির্জা আছে দেখে প্রেরণা বেড়িয়ে যেতে চেয়েছিল, পরে ইনুর খারাপ লাগবে বলে লিভ নেয়নি। দু'দিন ধরে ওদের দুই বোনের কথোপকথন দেখছে প্রেরণা, প্রথমে বিরক্ত লাগলেও এখন প্রেরণার ভালো লাগে গ্রুপটা, সে কোন কথা বলে না যদিও, যা বলার ইনশিরাহ আর ইনুই বলে, প্রিতম,মুঈনও মাঝে মাঝে দুয়েকটা কথা বলে,তবে প্রেরণা, ইহান, ইরফান,শেহা একেবারেই নিরব। অবসরে গ্রুপটাতে ঢুকে ওদের কথোপকথন দেখতে খারাপ লাগে না, প্রেরণার জীবনে কখনও এতটা ফুরসৎ মেলেনি এভাবে আড্ডা দেওয়ার। ইনশিরাহ আর ইনায়াকে দেখলে মাঝে মাঝে অবচেতন মনে প্রেরণা হিংসা করে বসে।
আজ ছুটির দিন,সকাল সকাল দশ মিনিটের মতো মোবাইল ঘাঁটাঘাঁটি করেছে সে,এর মাঝে দেখেছে ইহান তাজওয়ার মির্জা তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে,খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রেরণা গ্রহণ করেছে। ফোনটা রেখে উঠে প্রেরণা আয়নার সামনে গিয়ে নিজের হাল দেখে, শুকিয়ে পাটকাঠি হয়েছে একেবারেই। কদিন ধরে আগের মাপের ব্লাউজ গুলোও ফিট হচ্ছে না। এই হাল শাওকাত দেখলে প্রেরণাকে আস্ত রাখতো না বকে, বিবাহিত জীবনে শাওকাতকে সে ছুটিছাটা মিলিয়ে প্রতি বছর চার মাসের মতো কাছে পেত। যতদিন শাওকাত তার কাছে থাকতো তাকে জোর করে রেগে ধ'ম'কে খাইয়ে ওজন বাড়িয়েই রাখতো।

আর এখন, প্রেরণা কখনও কখনও ভুলেই যায় সে আজ সারাদিনে খায়নি, প্রিতম জিজ্ঞেস করলে আন্দাজে বলে দেয়,“খেয়েছি ভাই।”

একটা বড় শ্বাস ফেললো প্রেরণা। শুদ্ধ এলো রঙ পেন্সিল আর ক্যানভাস নিয়ে, সে ছবি আঁকবে। প্রণমি এলো আপুর কাছে বসে থাকবে, ইনুও পড়তে পড়তে হাঁপিয়ে উঠেছে বলে প্রেরণার কাছে এলো,তার চুলে তেল দিয়ে দিতে হবে।

এতোজনকে সামলিয়ে প্রেরণা হাসতে হাসতে বললো,“ছুটি নেই। আমার একটুও ছুটি নেই তোদের জ্বালাতে।”

বহুদিন পরে ইনশিরাহ ইনুর বাড়িতে এসেছে,প্রায় মাসখানেক পরে তো হবেই। বিয়ে হয়ে গেলে এই এক জ্বালা,যাদের সাথে বেড়ে ওঠা তাদের সাথেও মুখোমুখি যোগাযোগ কত হালকা হয়ে যায়। ইনশিরাহর পরনে একটা সাদা কালো তাঁতের শাড়ি, এটা আড়ং থেকে মুঈন কিনে দিয়েছে গত পরশু। আজই প্রথম পরেছে, কারণ আজ ইনশিরাহর লাইফের বিশেষ দিন।

হাতে মিষ্টির প্যাকেটটা সামলে নিয়ে লিফটে উঠতেই দেখলো রাদিফকে। রাদিফ ইনশিরাহকে দেখে চওড়া হাসলো, নিজের কপাল দেখে সে মনে মনে পৈশাচিক হাসি হাসে। সে যখনই লিফটে একা ওঠানামা করে,তাকে সঙ্গ দিতে এমন হুরপরী গুলো আকাশ থেকে নেমে আসে। ইনশিরাহকে রাদিফ মুখ চেনে, মেয়েটা যে প্রিতম ভাইয়ের বড় শালী জানে সে। রাদিফের সিনিয়র সম্ভবত। এই মেয়েটাও মারাত্মক সুন্দরী, ফিগারটা শাড়ির ওপর থেকে আন্দাজ করা যায়, হলিউডের নায়িকাদের মতন স্লিম সুগঠিত, আর মুখটা বাঙালি মেয়েদের মতো শ্যামলা মিষ্টি।

ইনশিরাহ টের পেয়েছে ছেলেটার হাবভাব। কিছু মুহূর্ত রাদিফের দৃষ্টি দেখে সে সরাসরি চোখ রাখে রাদিফের চোখে, ইনশিরাহর দৃঢ় চাউনী দেখে রাদিফ দৃষ্টি নামাতে বাধ্য হয়। ইনশিরাহ আর পাঁচটা মেয়েদের মতো না, ঠান্ডা গলায় সোজাসাপ্টা জানতে চাইলো,“ভাই কিছু বলবেন আমাকে?”

_নাতো।
মিনমিন করছে রাদিফ।

_তাহলে হুতুমের মতো তাকিয়ে আছেন যে! কিছু লেগে আছে আমার মুখে? কালি লেগে আছে?

রাদিফ থতমত খায়, এমন ভাবে কেউ তাকে আক্রমণ করবে ভাবেনি। ইনশিরাহ আর কিছু বললো না, নিজের মুখটাকে সংযত করে হন্তদন্ত হয়ে লিফট থেকে বেরিয়ে আটতলায় নামে।

দরজা খুলে প্রেরণা অবাক ইশিকে দেখে, অবাক হয়েই বললো,“শাড়িও পরতে শুরু করলে?”

ইনশিরাহ হাসলো,ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললো,“মাঝে মাঝে,তাও সর্বোচ্চ ত্রিশ মিনিটের জন্য, মেজাজ খারাপ হলে একটানে খুলে ফেলি।”

আপুর গলা পেয়ে ইনু এলো ছুটতে ছুটতে, ইনশিরাহ প্রেরণার হাতে মিষ্টির প্যাকেট তুলে দিয়ে বোনকে আগলায়। পর পর প্রণমির মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দেয়। মিষ্টির প্যাকেট দেখে প্রেরণা বললো,“মিষ্টি কিসের?”

_আমার চাকরি হয়েছে!

_আলহামদুলিল্লাহ, কোথায়?

_মির্জা এন্টারপ্রাইজে। অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টে। বেতন আটত্রিশ হাজার। খুব কম তাইনা? পাপা এর বেশি দেবে না বলছে, হাহাহা।

প্রেরণা অবাক হয়ে বলে,“চাকরি করবে তাও নিজেদের অফিসে?”

_হ্যা, ইন্টারভিউ দিয়ে ঢুকতে হয়েছে।

_ইন্টারভিউ! তুমি তো মালিকের মেয়ে। তুমি অ্যাকাউন্টসের চাকরি করবে?

_পাপা আমাদের বড় কোনো দায়িত্ব দিতে চাচ্ছে না আপাতত, আগে চাচ্ছে আমরা উপযুক্ত হই যাতে। ইরফানও ইন্টারভিউ দিয়েই ঢুকেছিল, ওর বেতন আমার থেকে একটু বেশি।

ইরফানের কথাগুলো স্বাভাবিক ভাবেই বলেছিল ইনশিরাহ, কিন্তু দেখলো প্রণমি আর প্রেরণা কপাল কুঁ'চ'কে ফেলেছে।
একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ইনশিরাহ, এখন ভাইকে নিয়ে স্বাভাবিক দু'টো কথাও বলা যাবেনা এদের সামনে? কি আজব!

তিন দিন আগে ইনশিরাহর রেজাল্ট বেড়িয়েছে। ফাইন্যান্স এন্ড ম্যানেজমেন্ট নিয়ে ফার্স্ট ক্লাসের ঠ্যাং টা কোনোমতে ধরতে পেরেছে,উতরে গিয়েছে সে।
এর পর সামিন একটুও সময় দেয়নি মেয়েটা কে। মুঈনকে কল করে করে পাগল বানিয়ে ফেলেছে । খুব চাপ দিয়েছে যেন খুব দ্রুত ইনশিরাহ মির্জা এন্টারপ্রাইজের হেড অফিসে সিভি জমা দেয়।

মুঈনই ইনশিরাহর সিভি জমা দিয়েছে শ্বশুরদের অফিসে।
তারপর সকালে গিয়ে ইন্টারভিউ দিয়েছে, ইন্টারভিউ নিয়েছে ইলহাম মির্জা।
ইনশিরাহর আগ্রহ আছে, সারাদিন একা একা অ্যাপার্টমেন্টে সময় কাটে না তার, পাপা আর মেজো বাবা কিছু টাকা দিয়েছে একটা ক্যামেরার জন্য, ইনশিরাহ কেনেনি। মুঈন বলেছে নেক্সট স্যালারি পেয়ে ইনশিরাহকে ক্যামেরা কিনে দেবে। যেভাবেই হোক,লোকটা খুব আশা করেছে তো, এখন বাবার টাকাতে ক্যামেরা কিনে মুঈনের ইগো হার্ট হোক সে কোনমতেই চায়নি, ক্যামেরা ছাড়া দিনগুলো নিরামিষ কাটছিলো। তাই চিন্তা করলো অফিসে ঢোকা যাক,আর তাছাড়াও ইনশিরাহর বোরিং দিনগুলো আরেকটা দায়িত্ব পালন করতে করতে বেশ কেটে যায়, সেটা হলো ইরফানের চব্বিশ ঘণ্টার খোজ খবর রাখা, কোথায় যাচ্ছে,কার সাথে মিশছে এসব।

ইনুদের মিষ্টি দিয়ে ওদের সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে ইনশিরাহ বেড়িয়েই ইরফানকে কল দেয়, কলটা রিসিভ হতেই ইনশিরাহ বলে,“এখন কই তুই?”

বিরক্ত হলো ইরফান,হাই তুলে বললো,“শশুর বাড়িতে। এটাও দেখাতে হবে?”

_হু,ভিডিও কল দে।

ইরফান তখন শান্তিনীড়ের ছাদে দাঁড়িয়ে হাওয়া খাচ্ছে, ফোনের স্ক্রিনের দিকেই দৃষ্টি রেখে ইশিকে বললো,“দেখেছিস? মাম্মার শশুর বাড়ীতে আমি। আচ্ছা একটা কথা বল, তোকে মির্জা ফ্যামিলি থেকে কত টাকা দেয়রে আমার আপডেট নিউজ পেতে?”

দুম করে কলটা কেটে দেয় ইনশিরাহ। ইরফান তখনও ঠায় দাঁড়িয়ে হাওয়া খেতে থাকে ছাদে। পরপর বুকে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলে,“শাআলা এই দুনিয়ার মানুষের একটাই সমস্যা, এদের ভালো মানুষ লাগবে,অথচ ভালো হলে কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না, এজন্যই আমি ভালো হইনা।”

________

বিকেলে গোটা বাড়ি ফাঁকা দেখে ইরফান গায়ে শার্ট চাপিয়ে নিচতলায় নামে, রিতু নিচতলায় বসে অলস সময়ে একটা নকশি কাঁথা সেলাই করছিলো। ইরফান সিঁড়ি ভেঙে নামতে নামতে বললো,“তোমার জা'রা কোথায়? মেয়ে দেখতে বেরিয়েছে? আজকাল তিন জা তিনবেলা ওষুধের সাথে নিয়ম করে মেয়ে দেখে বেরাচ্ছো।”

রিতু উঠে দাঁড়ায়, ইরফান শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে বলতে থাকে,“এতো খাটা খাটনি সব বেকার বেকার করছো, দাদান আমার মতো মেয়ে তুলে এনে সারপ্রাইজ করে দেবে তোমাদের তিন জা কে।”

রিতু চ'ম'কে তাকায়, ইরফান হাসছে, রিতু কপাল কুঁ'চ'কে ফেলে তাকিয়ে থাকে ছেলের দিকে, এই মস্করাটা তার পছন্দ হয়নি, ইরফান হাসতে হাসতে সদর দরজার দিকে পা বাড়ায়, রিতু গম্ভীর হয়ে বললো,“কোথায় যাচ্ছো?”

_অধরা অসুস্থ,সবাই মিলে ওকে দেখতে যাচ্ছি। বিশ্বাস না হলে ইশিকে কল করে আপডেট নিয়ে নিও।

দ্রুতপায়ে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে বাইক স্টার্ট করে ইরফান সোজা চলে যায় নিউ টাউন রোডে অধরার অ্যাপার্টমেন্টে। স্নিগ্ধা,মমো,স্নেহা,রাফি,নিক্সন ওরা সবাই আগেই পৌঁছে গিয়েছে। অধরার সাথে রিহ্যাব থেকে ফিরে ইরফানের এই প্রথম দেখা, মেয়েটা অসুস্থ। বিয়ের একমাসের মাথায় প্রেগন্যান্ট হয়েছে, ওর স্বামী একজন নেভি অফিসার, আপাতত শহরের বাইরে আছে। মন টিকছিলো না দেখে বন্ধুদের বাড়িতে ডেকে নিয়েছে।

বন্ধুরা মিলে আবারও পুরনো দিনের মতো হৈচৈ করলো, ইরফান গান গাইলো সবার অনুরোধে।

বারবার ঘড়িতে সময় দেখছিলো ইরফান, গান শেষে ইরফান উঠলো,তাকে বেরোতে হবে, ওর তাড়া দেখে অধরা সরু চোখে তাকিয়ে বললো,“কোথায় যাবি?”

_তোর ভাবীকে দেখতে। এসেছি পাঁচদিন হয়েছে অথচ নাদান বৌটাকে এখনও দেখা হলো না।

ফাজলামি করে বলেছে ইরফান, মেয়েগুলো অগ্নিদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে, ইরফান হেসে বলে,“এমন করছিস কেন?”

বেশ নেতিয়ে পরেছে অধরা অসুস্থতার জন্য, তবুও কন্ঠে ধ'ম'ক নিয়ে নিক্সনকে বলে,“এই তুই এই পাজিকে একেবারে বাড়িতে দিয়ে আয়। এটাকে একা ছাড়িস না।”

অধরার অ্যাপার্টমেন্ট,মানে নিউটাউন রোড থেকে ধরণী রেসিডেনসিয়াল এরিয়ায় যেতে সর্বোচ্চ আধাঘণ্টা লাগে। ইরফান বাইক চালাচ্ছে খুব স্লো, পেছনে বসে নিক্সন সেই তখন থেকে ওকে বিবরণ দিয়ে যাচ্ছে তাদের কোন বন্ধুরা এখন কোথায় আছে। হুট করে ইহান ভিন্ন রাস্তা ধরলে নিক্সন চ'ম'কে ওঠে,চাপা স্বরে চেঁ'চি'য়ে বলে,“একি তুই কোথায় যাচ্ছিস।”

ইরফান তার স্বভাব মতো অদ্ভুত ভঙ্গিতে হেসে বলে,“আমি আসলেই তোর ভাবীকে দেখতে যাচ্ছি।”

নিক্সন চেঁচিয়ে ওঠে,“মানে! এই মানে কি? তুই প্রিতমের অ্যাপার্টমেন্টে যাবি? ভাই ভাই,তুই এবার আস্ত থাকবি না।”

ইরফান হেসে ফেলে,হাসতে হাসতে বলে,“চাপ নিসনা। আমি আমার বৌকে দেখে যাবো এটা প্রিতম দূরে থাক,আমার বৌ-ই টের পাবে না।”

বাইকের স্পিড বাড়িয়ে দেয় ইরফান, পেছনে বসে নিক্সন অনবরত চেঁচাতে থাকে,“এই ভাই! ভাই দোহাই তোর, আমাকে নামিয়ে দে! ভাই আমাকে ফাঁসিয়ে দিস না আর।”

ইরফান বাইক না থামিয়ে হাসতে থাকে, নিক্সন কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলে,“মাম্মা পাপা এমনিতেই তোর সাথে মিশতে দিতে চায় না, সবাই লুকিয়ে তোর সাথে যোগাযোগ করি আমরা, তুই এভাবে সর্বনাশ করিসনা ভাই আর আমাদের ।”

ইরফান ওর কথা গায়ে না মেখে এক টানে,বাইক উড়িয়ে চলে যায় ছায়ানট একাডেমীর সামনে, রাস্তার অপজিটে হুট করে বাইকের ব্রেক কষে বসে লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলে ইরফান। নিক্সন এতক্ষণ চেঁচিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছে, হাঁপাতে হাঁপাতে বলছে,“একটা কথা বল। তোর এই মেয়ের সাথে কি? তুই ওকে ভালোবাসিস?”

_না তো। তোর মাথা খারাপ?
হেসে জবাব দেয় ইরফান।

_তবে কি? কে এই মেয়ে তোর?

_বৌ।
সোজা উত্তর ইরফানের। নিক্সনের গা জ্বলছে, চেঁচিয়ে বলছে,“শাআলা তুই এমন কেন করছিস?”

ইরফান হাসতে হাসতে বলে,“আহাম্মক আমি মজা করেছি, এখানে চা খেতে এসেছি আমি।”

_চা?

_হু।

_ছায়ানটের সামনে?

_হু।

_কেন শহরে আর চায়ের দোকান নেই?

_ওগুলো আমার জন্য নয়।

বাইক থেকে নামলো ইরফান, চায়ের দোকানীকে দু কাপ চায়ের কথা বলে ঘাড় ঘুরিয়ে অদূরে ছায়ানটের প্রধান ফটকে দৃষ্টি দিলো। হাত ঘড়িতে সময় দেখে শেষ বারের মতো, বিকেল যেই পাঁচটা ছুঁই ছুঁই ইরফান চটকরে হেলমেটটা তুলে মুখটা ঢেকে নেয়।

ঘড়িতে যখন সময় পাঁচটা তিন মিনিট ঠিক তখন ধীরে ধীরে ছায়ানটের প্রধান ফটক থেকে বের হয় প্রনমি,মিস জেনির হাত ধরে।

ইরফান চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ, হেলমেটের কাঁচ গলিয়ে একজোড়া ঈগল চোখের চাহনি নিবন্ধ হয়ে আছে অদূরে, ছায়ানটের গেটের কাছে।
মিস জেনি প্রনমিকে যাত্রী ছাউনীতে দাড় করিয়ে ক্যাব খুঁজতে লাগলেন। একটা সাদা রঙের ধোতি পাজামা,একটা আকাশী শর্ট কামিজ এবং সাদা শিফনের ওড়না জড়ানো প্রনমির অঙ্গে। চুলে দু'পাশে দু'টো বেনী। হাতে একটা পার্স ব্যাগ।

নিতান্তই বাচ্চা একটা মেয়ে মনে হয়,আর সাজ পোশাক যেন মেয়েটার বয়স বাড়তেই দেয়না। ইরফান দেখছে অনিমেষ, পা থেকে মাথা, একটা ফর্সা মুখ, তবে গালের ঐ তিলটা দেখা যাচ্ছে না।

চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে,ওর কানের কাছে তখন প্রেরণার চেঁচিয়ে বলা সেই কথাগুলো বেজে উঠলো,“তুমি যাকে ব্যবহার করেছো না প্রিতমের থেকে শোধ তুলতে? সে-ই মেয়েটির ওপর তার ছয় বছর বয়সে রেপের অ্যাটেম্পট হয়েছিলো। যার কারণে আজ মেয়েটির চোখের দৃষ্টি টুকুও নেই, আছে শুধু মানসিক ট্রমা, যন্ত্রণা,আর গোটা জীবনের জন্য প্রতিবন্ধী তকমা।
তুমি জিতেছো। কে বলে তোমাকে লুজার? প্রিতম চ্যাম্পিয়ন, এসব কে বলে? এবার তুমি জিতলে,একেবারে যায়গা মতো আঘাত করেছো ভাই! প্রিতমকে শিক্ষা দিতে এর থেকে বেস্ট কিছু আর হয়-ই না।”

ইরফান আবারও পা থেকে মাথা তাকালো। সে টের পেলো তার আশেপাশের সবকিছু কেমন অন্যরকম! নিক্সন ভয়ে ভয়ে শুধু ঢোক গিলে যাচ্ছে। ইরফান কোনো নড়চড় করছে না। রাস্তা দিয়ে এতো এতো গাড়ি যাচ্ছে অথচ ইরফান পলক ফেলছে না মেয়েটির মুখ থেকে।
মিস জেনি ক্যাব খুজে পাচ্ছে না। এদিকে প্রনমি হঠাৎ পার্স থেকে একটা টিস্যু পেপার বের করে নাকের সর্দি মুছে নিতে থাকে, তার সর্দি কমেনি।

হেলমেটের ভেতরে লুক্কায়িত মুখটা তৎক্ষণাৎ কুঁচকে ফেলে ইরফান সেই দৃশ্য দেখে। বিড়বিড় করে বলে,“ইশশিরেহ! একে এর জ্ঞানী বোন সর্দি মুছতেও শেখায়নি! ইউক!”

নিক্সন এগিয়ে আসে,বলে,“কি বলছিস বিড়বিড় করে?”

ইরফান জবাব দেয় না। প্রণমিকে দেখতে ব্যস্ত সে, যে মিস জেনির হাত ধরে ক্যাবের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

নিক্সন বললো,“মেয়েটার নামটা যেন কি? ভুলে গিয়েছি,প দিয়ে।”

_প্রনমি।
অস্ফুটে উত্তর দেয় ইরফান।

ক্যাবটা দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে যেতেই নিক্সন এসে বললো,“দেখা হয়েছে তোর একদিনের বৌকে? এখন চল সোনাভাই।”

ইরফান ঘুরে মাথা থেকে হেলমেট টা খুলে হাতটা চুলে বুলিয়ে বললো,“কে বৌ দেখতে এসেছে?”

_তুই।

_আমি এখানে চা খেতে এসেছি, এই মামা চা দেন তো আরেক কাপ, এটা তো ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে বাতাসে।

ইরফান ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিকেলে তিনকাপ চা খেয়ে বাইক স্টার্ট করলো, গন্তব্য সোজা বাড়ির দিকে, গম্ভীর মুখটা অথচ মুচকি মুচকি হাসছিলো। হঠাৎ ইশি কল করে রাগী রাগী গলায় বলে,“এই তুই কোথায় রে?”

_তোর ভাবীকে দেখতে এসেছিলাম রে।
শান্ত স্বরে জবাব দিলো ইরফান।

_ফাজলামি কথা বলিস না, এতো বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিস না, বাড়িতে যা।

কল কেটে দেয় ইনশিরাহ, ইরফান হাসলো, অস্ফুটে নিজ মনে বললো,“শাআলা সত্যি কথা বললেও কেউ বিশ্বাস করে না, আমি ভালো হয়ে করবো টা কি!”

চলমান.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 78 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন