#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৭৯ [ ১ম অংশ ]
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই
[ ১ম অংশ ]
একটা অফ হোয়াইট রঙের শার্ট, ব্ল্যাক ফরমাল প্যান্ট এবং টাইয়ে মির্জা বাড়ির রগচটা, ফাজিল, মেজাজী ছেলেটাকে একেবারেই লাট সাহেবের মতো লাগছে।
শ্যামবর্ণের মুখটা সময়ের সাথে কৃষ্ণবর্ণের হয়েছে যদিও। চেহারা, বেশভূষায় অমায়িক, ভদ্রলোকের ছাট। কে বলবে এই ছাব্বিশের তরুণ একটা গোটা পরিবারকে চিন্তায় রাখে চব্বিশটা ঘন্টা।
হাত ঘড়ি ঠিক করতে করতে গুনগুন করে যখন সিঁড়ি বেয়ে নামছিল ও, মার্জিত বেশভূষায় ওকে দেখে নিচতলায় দাঁড়ান সিনিয়র তিন মির্জা হা করে তাকিয়ে থাকে। আলো সামিনদের তিন ভাইয়ের জন্য তিন কাপ কফি নিয়ে আসে,ইরফানের দিকে তাকাতেই মুখ থেকে আপনা আপনি অস্ফুটে বেড়িয়ে যায়,“মাশাআল্লাহ।”
ইরফান সবার দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে বড় মাকে,“অফিস যাচ্ছি” বলে বেড়িয়ে যেতে নিলে সামিন হঠাৎ বলে ওঠে,“কমপ্লেইন যেন না আসে!”
ইরফান ঘুরে তাকায়,বলে,“আসবে না,মন দিয়ে হিসেব দেখবো।”
_তোমার ব্যবহার নিয়ে কোনো কম্প্লেইন যেন না আসে। সেটা বলছিলাম।
কফির কাপে চুমুক দিয়ে বরফ ঠাণ্ডা গলায় সামিন বলে। ইরফান বড়বাবার মুখের দিকে কিছু মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে টিফিন বক্স নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।
সামিন, ইলহাম, ইশমাম আজ একটু দেরি করে কাজে বেড়োবে। গ্রামের বাড়ি থেকে লোক আসবে বংশীয় জমিজমা সংক্রান্ত আলাপ আলোচনা করতে। আলোরা আজ রান্নাঘরে খুব ব্যস্ত,কম সে কম পঞ্চাশ জন মানুষ খাবে দুপুরে।
ইরফান অফিসে গিয়ে পৌঁছানোর পাঁচ মিনিট পরে ইশি এলো হাঁপাতে হাঁপাতে, লিফট প্রয়োজনে বন্ধ করে রাখা হয়েছে তাই ছয়তলা অবধি সিঁড়ি বেয়ে এসেছে।
ইরফান ওকে দেখে বললো,“তুই লেট!”
_আর তুই ফাস্ট!
_এটা ভালো গুণ।
_হ্যা,তুই তো খুব ভালো ছেলে, খুব ফাস্ট! যেমন তোর জন্মানোর ডেটের দুই মাস আগে জন্মেছিলি, মেজো মাকে কষ্ট দিয়ে, প্রিম্যাচিওর বেবি ইরফান!
ভাইকে ভেংচি কেটে ইনশিরাহ জবাব দিলো। ইরফান তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো,“আর তুই খুব ম্যাচিওর! ভিডিও দেখেছি আমি হ্যা?! কে যেন সেদিন বরের কোলে বসে তার গলা জরিয়ে ধরে চিল্লিয়ে কেঁদেছে আর বলেছে,“মাম্মা,পাপা দেখো লোকটা আমার জন্য কাঁদছে, মাম্মা পাপা দেখো আমি ফাইনালি একটা ন্যাড়া পেয়েছি মাথায় কাঁঠাল ভাঙার জন্য সারাজীবন। ন্যাককা!”
মেয়েদের মতো কন্ঠস্বর করে ইরফান কথাগুলো বলে উচ্চশব্দে হাসতে থাকলো। ইনশিরাহ কপাল কুঁচকে রাগী রাগী চোখে ভাইকে কিছুক্ষণ দেখে হিসেবের খাতায় মনযোগ দিলো, পরপর কম্পিউটারে সেটা তুলে নিলো।
ইরফান বোনের দিকে টিফিন বক্সটা এগিয়ে দিয়ে বললো,“বড়মা পাঠিয়েছে। এখন থেকে টিফিন আমি নিয়ে আসবো ও বাড়ি থেকে। তোর কষ্ট করে কিছু বানিয়ে আনতে হবে না।”
ইনশিরাহ লুফে নিলো টিফিন বক্স, মায়ের হাতের রান্না যে। কাজ রেখে গোগ্রাসে গিলতে থাকলো আলোর হাতের মোগলাই পরোটা।এর মাঝে মুঈন এক ফাঁকে কল করলে ইনশিরাহ ভিডিও কলে দেখালো ইরফান আর সে অফিসে কি কি করছে। মুঈন দুই মিনিট সময় দিতে পারলো ওকে, তারপর ব্যস্ত হয়ে পরায় কল কাটে।
কাজ করতে গিয়ে ইনশিরাহ দু দু বার আটকাল হিসেবে, ইরফান ওকে দেখিয়ে দিলো কোনোরকম মেজাজ না দেখিয়ে। ভাইয়ের পরিবর্তন আড়চোখে দেখে ইশি। ফোনটা হাতের কাছে অথচ গেমস খেলছে না। সিগারেট খাওয়ার জন্য নির্লজ্জতা করছে না। সুন্দর মতন কাজ করে যাচ্ছে একটানা। এক ফাঁকে ফোনটা হাতে নিয়ে ইহানকে এসব মেসেজ করে দেয় সে। ইহান দায়িত্ব দিয়েছে ওকে অফিসে কি হয় না হয় সবকিছুর খবর দিতে।
এর মাঝে অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টের হেড এসে আরো দু'টো হিসেব দেখতে দিলো ইরফানকে। আনিসুল হক এই অফিসের হেড অব অ্যাকাউন্টস সেকশন । বেতন ভুক কর্মচারী হলেও মালিকের ছেলেমেয়ের ওপর কর্তৃত্ব দেখাতে পেরে পৈশাচিক হাসি হাসে সে মনে মনে।
ইরফান ভদ্রছেলের মতো সেই হিসেব দু'টোও দেখে উঠে দাঁড়ায়,এখন একটা সিগারেট না ধরালে বড্ড বেশি ভণ্ডামি হয়ে যাবে। ইরফান এতোটা ভণ্ড না।
কিন্তু আনিসুল হক আরো দু'টো হিসেব এনে তার হলুদ দাঁতের পাটি বের করে বলে,“আরো দু'টো হিসেব দেখে দাও। লাঞ্চ টাইম যে হয়নি! মালিকের ছেলে বলে কাজে ফাঁকি দেয়া যাবে না।”
ইরফান আগের ইরফান হলে আনিসুল হক, আনিসুল হক থাকতো না। ইরফানের ঠোঁটের আগায় খুব মার্জিত একটা গালি এসেছিলো যদিও,সে বহু কষ্টে আটকে দিলো সেটাকে।
এর মাঝে সামিন ইয়াসার ঢুকেছে অফিসে,সে ঘন্টাখানেকের মতো থাকবে এখানে। ইলহাম বাড়িতে রয়ে গিয়েছে।
ইরফান গালি আটকে মুখটাকে খিচিয়ে রেখেছে,দু গালের পেশি সংকুচিত, প্রসারিত করছে বারবার,গালিটা কোনো অবস্থাতেই বেরোতে দেওয়া যাবে না,যাবেই না।
আনিসুল হক পৈশাচিক হাসি হাসতে হাসতে চলে যায়। সামিন এসে গম্ভীর মুখে ইরফানের সামনে দাঁড়িয়ে বলে,“কি হয়েছে? মুখটাকে এমন করছো কেনো?”
একটা লম্বা শ্বাস ফেললো ইরফান,বললো,“বড় বাবা। এটা মুখের এক্সারসাইজ। প্রফেসর শিখিয়েছে। তিনবেলা করতে হয়।”
_হু। কাজ করো।
বলে কেবিনে ঢোকে সামিন।
ইরফান আরও একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলে,“সুদির ভাই আনিসুল।”
ইশি মোগলাই পরোটা খেতে খেতে বললো,“কিছু বললি রে?”
_নারে। তুই খা!
সিগারেটের প্যাকেট ড্রয়ারে পুরে রেখে আবারও কম্পিউটারের সামনে বসে পরলো ইরফান মির্জা।
_______
আজ প্রেরণার সবথেকে ব্যস্ততম দিন শুদ্ধকে নিয়ে। আগামী পরশু শুদ্ধ ইবনে ওয়াসীতের জন্মদিন। প্রতিবারের থেকে শুদ্ধ এইবার বেশি এক্সাইটেড তার জন্মদিন নিয়ে, কারণ তার বন্ধুরা। এ বছর ঘুরে ঘুরে শুদ্ধ সব বন্ধুদের বার্থডে পার্টি দেখেছে, সে চাচ্ছে ঠিক ওভাবেই উদযাপন করতে তার জন্মদিন। যাকে যাকে শুদ্ধ ইনভাইট করবে,তাকে শুদ্ধর পছন্দের কস্টিউমে সেজে আসতে হবে,এটা শুদ্ধর এবছরের জন্মদিনের থিম। মাম্মাকে নিয়ে ইতিমধ্যে শুদ্ধ কিছু চরিত্র বেছে নিয়েছে । প্রেরণা ছেলের এমন বাচ্চামি প্রথমে লাই দিতেই চায়নি,পরে যখন তীব্র আগ্রহ আর উত্তেজনায় ভরা ছোটো মুখের দিকে তাকালো,বুকটা মোচর দিয়ে উঠলো প্রেরণার, শাওকাত ওয়াসীত বেঁচে থাকলে তিনি কি কখনো ছেলের এমন আবদার ফেরাতেন? অবশ্যই না। দুনিয়া উল্টে গেলেও ছেলেকে বেজার করতেন না তিনি।
জন্মদিন অনুষ্ঠানের অর্ধেক খরচ প্রিতম দেবে বলেছে সাফসাফ,প্রেরণা নিষেধ করতে পারেনি ভাইকে, শুধু বলেছে,“যা করবি ইনুর সাথে কথা বলে করবি।”
সবকিছুই ইনুর সাথে কথা বলে করেছে প্রিতম,শুধু শশুর বাড়ি থেকে নিমন্ত্রিত অতিথিদের লিস্ট বাদে।
মুঈন-ইশি দু'জনকে আলাদা করে কল করে প্রেরণা ইনভাইট করেছে, আর ও বাড়ি থেকে ইরফান মির্জা ব্যতীত সবাইকে কল করে নিমন্ত্রণ করেছে।
একটা সমস্যার সূত্রপাত এখান থেকেই হয়েছে। যখন বোকাসোকা,অবুঝ ইনু জানলো প্রিতম তার মেজো দাদানকে ইনভাইট তো দূরে থাক, যখন সামিনকে সপরিবারে নিমন্ত্রণ করেছে তখন ইরফানের নামটা পর্যন্ত মুখে উচ্চারণ করেনি।
সন্ধ্যা থেকে এ নিয়ে ভীষণ অস্থির হয়ে উঠেছিল ইনু, নরম মনের মেয়েটা তো সবসময় দেখে ইনশিরাহ আপুর বাড়িতে সবসময় যায় মেজো দাদান, কত মজা করে ওরা, মেজো দাদান কত কি নিয়ে যায় আপুর জন্য, কিন্তু কখনও তার বাড়িতে আসতে পারে না। আচ্ছা সে না হয় মেনে নিলো,মেজো দাদান দোষী,আসার দরকার নেই, তাই বলে প্রিতম এতটা অসামাজিক কি করে হতে পারে?
ভীষণ মন খারাপ লাগলেও প্রিতমকে শুরুতে কিছু বলতে ইচ্ছে হয়নি তার। কিন্তু পরে যখন দেখলো আশেপাশের কিছু মানুষ,যারা অতটা কাছেরও নয়,তাদেরও প্রিতম কত আন্তরিক হয়ে ইনভাইট করেছে তখন থেকে সমস্যাটা শুরু করেছে ইনু।
রাতে প্রেরণা আর প্রিতম যখন খাচ্ছিল, খাওয়া প্রায় শেষ। ইনু হন্তদন্ত হয়ে গিয়ে দুই ভাইবোনের সামনে দাঁড়ায়। কারণ বোঝাপড়াটা এই দুই ভাইবোনের সাথেই তার। সরাসরি বললো,“মেজো দাদানকে ইনভাইট করেছো?”
প্রিতম বেসিনে হাত ধুয়ে আবারও চেয়ারে বসে ঠান্ডা গলায় বলল,“না!”
_কেন?
_বড় বাবাকে বলেছি সপরিবারে আসতে, তোমার মেজো দাদান তো পরিবারের বাইরে নয়।
_কিন্তু ঢং করে তো প্রত্যেকের নাম আলাদা করে উচ্চারণ করেছো, মেজো দাদানের কথা তোলোনি কেন?
প্রিতম প্রেরণা দুই ভাইবোন দু'জনের দিকে তাকায়। প্রেরণা উঠে যেতে চায় এই ঝামেলা থেকে,সে জানতো এমন কিছু এখন থেকে ঘটতেই থাকবে রোজ।
ইনু বললো,“দাড়ান আপু। কথা আপনার সাথেও আছে।”
দাঁড়ায় প্রেরণা, প্রিতম খানিকটা ধমকে বলে,“আপুকে টানছো কেন এর মধ্যে? শশুর বাড়ী তো আমার, আপুর নয়!”
_কিন্তু তুমি তো আপুর কথামত চলো।
ইনু দুম করে বলে দেয় কথাটা।
কথাটা খুব কটু লাগলো প্রেরণার কাছে, কিন্তু কোনো জবাব দিলো না,সে জানে ইনু এমন করে ভাবার মেয়ে নয়,মাথা ঠিক নেই দেখে বলে ফেলেছে। কিন্তু প্রিতম ধ'ম'কে ওঠে ইনুকে,বলে,“এই তুমি কি মিন করতে চাচ্ছো? আমাদের দুজনের মাঝে আপুকে টানছো কেন?”
ইনু প্রিতমের ধমকটা নিতে পারেনি, হঠাৎ ফ্যাচফ্যাচ করে কেঁদে ওঠে। সারাদিনের মন খারাপ, বিতৃষ্ণা সব জল হয়ে গড়িয়ে নামে চোখ থেকে।
প্রণমি ঘরে বসে ভাবীর কান্না শুনছিলো চুপচাপ। ইনু কাঁদতে কাঁদতে চেঁচিয়ে প্রিতমকে বললো,“অসামাজিক লোক একটা! কি হতো আমার মেজো দাদানকে ইনভাইট করলে? সে চলে আসতো ? এই আমার মেজো দাদান কখনও আসতো? বললে কি হতো একটু? মেজো দাদান যখন আমাকে ইনভাইট করে তখন তো বলে,“তোর স্বামী আর তুই আসিস।” তুমি কেন বললে না তার কথা। আর আসলেও কি হতো আমার বাড়িতে? তোমার বোনকে এতো গুলো লোকের সামনে থেকে আমার মেজো দাদান খেয়ে ফেলতো? না তো!”
প্রণমি চুপচাপ ভাবীর কথাগুলো শুনছে, প্রিতম হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে ইনুর দিকে, প্রেরণার মেজাজ বিগড়ায়,ধমকে বলে,“মাইন্ড ইয়র ল্যাঙ্গুয়েজ ইনু। যাও ঘরে, ঘুমাও। কাল সকালে তোমার সাথে আমি এ নিয়ে ঠান্ডা মাথায় কথা বলবো।”
ইনু শান্ত হয়না, প্রেরণার ধমকটা তার গায়ে আরও রাগ ধরিয়ে দিলো, বললো,“হ্যা এটাই তো পারেন আপনারা ভাই বোন দুজন। আমাকে ধমকাতে , ডমিনেট করে রাখতে, খুব সহজ যে!”
প্রিতম তৎক্ষণাৎ টেবিলে একটা চাপড় মেরে চেঁচিয়ে বলে,“একদম আপুর সাথে বেয়াদবি নয়। যাও ঘরে! এক্ষুনি যাও।”
ইনু জেদ করে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রেরণা ভাইয়ের ওপর চেঁচায়,“আস্তে কথা বল। দু'জনে যা ঘরে। এক্ষুনি যা!”
বলে প্রেরণা নিজেই চলে যায় নিজের ঘরে, গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। ইনুর হাত ধরে টানছে প্রিতম,ইনু নড়ছে না। ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গিয়ে প্রিতম চেঁচিয়ে বলে,“এতো যখন মেজো দাদানের জন্য বুক পোড়ে তখন আমার কাছে এসেছিলে কেনো প্রেমের প্রস্তাব নিয়ে? জানতে না এমনই হবে? ও আমার শত্রু! ”
কথাটায় খুব আহত হয় ইনু, কান্না আটকে রেখে বললো,“এসেছি বলে দোষ করেছি আমি?”
প্রিতম নিজেকে সামলে নিয়ে এবার নরম হয়, বলে,“এমনটা মিন করতে চাইনি ইনু!”
ইনু আর দাঁড়ালো না, এক ঝটকায় প্রিতমের হাত সরিয়ে দিয়ে, রুমে গিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে রইলো চুপচাপ, কাঁদতে লাগলো।
প্রেরণার ঘরের বাতি অফ হলো, প্রনমি গিয়ে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে পরলো গুটিসুটি মেরে। প্রিতম অসহায়ের মতো ডাইনিংয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে চলে যায় বারান্দায়। সিগারেট টা বিশ মিনিটে শেষ করে ধীরে ধীরে রুমের দিকে এগোয়।
রুমে পা রাখতেই সে হতবাক। দরজা আটকে দেখলো ইনু তখনও কাঁদছে, তার শরীরটা কাঁপছে রীতিমতো। ইনুর একটা সমস্যা আছে, বেশি কাঁদলে খুব অসুস্থ হয়ে পরে।
প্রিতম ছুটে এগিয়ে যায় বৌয়ের কাছে। বিছানায় উঠে ইনুকে টেনে কাছে নিয়ে বলে,“এই ইনু! কি হয়েছে?”
ইনুর রাগ একটুও কমেনি, একটুও না, তার বিরক্ত লাগছে প্রিতমকে। প্রিতমের হাত সরিয়ে দিতে চায়, তবে পারলো না। হঠাৎ ইনু চাঁপা স্বরে চেঁ'চি'য়ে, হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,“কি লাগবে? আদর করতে দিতে হবে এখন?”
এটুকু বলে ইনু গলা থেকে ওড়না সরিয়ে দিয়ে বলে,“নাও। তারপর আমার চোখের সামনে থেকে বিদায় হও।”
প্রিতমের ফরসা, সুদর্শন মুখটাতে অন্ধকার নেমে আসে মুহুর্তে, সে চূড়ান্ত আহত আর হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে ইনুর দিকে, ইনু উঠে নিজের কামিজ খুলতে গেলে প্রিতম ওর হাত দুটোকে শক্ত করে ধরে থামিয়ে দেয়, তীব্র অপমানে একটা চড় বসানোর অভিপ্রায় হয়েছিল ইনুর গালে, কিন্তু মেয়েটার ক্রন্দনরত মুখটা দেখে আর পারলো না।
বুকে প্রচণ্ড যন্ত্রণা শুরু হয়েছে প্রিতমের, শুধু কাঁপা গলায় বলল,“আমি কি এটা ছাড়া তোমার কাছে আসি না ইনু?”
_তোমার জন্য মেজো দাদানকে,পাপাকে কত কথা শুনিয়েছি বিয়ের আগে, এখন মেজো দাদানের জন্য তোমাকে কথা শোনাচ্ছি। তোমরা কেনো বোঝো না,আমি তোমাদের সবাইকে চাই। আমার ভালোলাগে না এসব। আর ভালোলাগে না।
প্রিতমের কথার জবাব না দিয়ে নিজের মনে বলে কাঁদতে থাকে,হাঁপাতে থাকে ইনু। প্রিতম ওকে ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় তৎক্ষণাৎ, প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হয়ে প্রিতম ঘরের জিনিসপত্র তুলে মেঝেতে ছুড়ে মারে কিছুক্ষণ। চশমা খুলে নিজের চোখ চেপে ধরে ঘরের এককোণে বসে থাকে চুপচাপ, নিজের চুল টানে।
আর ইনু আবারও বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পরে।
বাইরে ড্রয়িং রুমে প্রেরণা,প্রণমি এসে দাঁড়ায়। ওরা ভাঙচুরের শব্দ শুনে এসেছে। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে আবারও দুইবোন যে যার ঘরে চলে যায়।
________
রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি ইনু, ভোররাতে ঘুমিয়ে ঠিক সকাল দশটায় উঠেছে, ঘুম থেকে উঠে প্রিতমকে কোথাও দেখতে পায়না। ঘর থেকে বেরিয়ে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যায় প্রেরণার ঘরে। গিয়ে দেখে প্রেরণা ঘর গোছাচ্ছে। মুখটা মলিন হয়ে যায় ইনুর। মনে পরে গতকাল রাতে প্রেরণাকে কত কথা শুনিয়েছে। চট করে নিজের ওপর ভীষণ রাগ হয় তার। যে মহিলা রোজ একবার হলেও ভাত মেখে খাইয়ে দেয় ইনুকে সে মহিলাকে এতো তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলে ইনুর নিজেকে এখন নিজের চড় মারতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু কাল রাতে কি যে হয়েছিলো,খুব বেশিই উত্তেজিত হয়ে পরেছিল মেজো দাদানের বিষয়টি নিয়ে।
দু'বার ভাবলো না ইনু,ছুটে গিয়ে পেছন থেকে প্রেরণাকে জরিয়ে ধরে নরম গলায় ডাকলো,“আপু সরি। খুব সরি।”
প্রেরণা চমকালো,পর পর শুকনো হাসি হেসে ইনুর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ইনুকে দেখে বলে,“ওখানে বসো।”
ইনু প্রেরণার বিছানায় বসলো, প্রেরণা এসে ওর মুখোমুখি বসে খুবই ঠাণ্ডা স্বরে বলতে লাগলো,“এখানে এখন আমি বা প্রণমি,কারো সাবজেক্ট টানবো না। ওসব বাদ, তুমি বলো প্রিতম কি কখনও তার আচরণে বুঝিয়ে দিয়েছে সে তোমার বাড়ি মানে প্রিতমের শশুর বাড়ির প্রতি কর্তব্য পালনে অযোগ্য?”
দু'পাশে মাথা নাড়ে ইনু। প্রেরণা বলে,“ওর সমস্যাটা ইরফান মির্জাকে নিয়ে, তোমার গোটা পরিবার নিয়ে নয়। কদিন হয়েছে তোমার ভাই রিহ্যাব থেকে ফিরেছে ইনু? কদিন হয়েছে আমার বোনটা একটু স্বাভাবিক হয়েছে? প্রিতমের একটু সময় দরকার এতটুকু কি তুমি বুঝতে পারো না? আমি আবারও বলছি,প্রণমি আর আমার বিষয় না কিন্তু, আলোচনা করছি শুধু প্রিতমকে নিয়ে, সেদিন রাতে একজন ভাই হিসেবে কেমন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছে সেটা স্ত্রী হিসেবে তুমি দেখেছো, বোঝো। সময় লাগবে ইনু। আমার ভাইকে আমি অসামাজিক বানাইনি, বিয়ে যখন করেছে তোমাকে, তোমার ভাইদের সাথে সে অবশ্যই সামাজিকতা করবে, করতে বাধ্য, আমি বা প্রণমি কখনো আমার ভাইকে আটকাতে যাবো না। শুধু একটু সময় দাও। যাও এখন, গিয়ে পড়তে বসো, জামিরা আসছে,ওরা ঘর গোছগাছ করবে পার্টির জন্য। তুমি পড়ো।”
শুদ্ধর জন্মদিনের পার্টিতে শান্তিনীড় থেকে এসেছিলো আলোরা তিন জা, ইশমাম মির্জা এবং ইহান। সামিন এবং ইলহাম আসতে পারেনি। শুদ্ধর জন্য একটা দারুণ স্কুল ব্যাগ এবং ঘড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে সামিন আর ইলহাম। অপরদিকে ইনশিরাহ এসেছে শুধু, মুঈনের ডিউটি থাকায় পারেনি আসতে, তবে একটা লেটেস্ট রোবোকার খেলনা র্যাপিং পেপারে মুড়িয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে ইনশিরাহর কাছে।
শান্তিনীড়ের মানুষগুলো থেকে শুদ্ধর পাওয়া উপহার গুলো হলো, আলো একসেট কমিক বুক দিয়েছে, বড় বড় মনিষীদের শিশুকালের সাহসীকতার গল্পের বই দিয়েছে, রিতু দিয়েছে একটা কোরান শরীফ,সাথে শুদ্ধকে বুঝিয়ে বলে দিয়েছে জন্মদিনে কেক কাটলে আল্লাহ নারাজ হন, তাদের বাড়িতে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে কেউ তার আপত্তি শোনে না, তাই এখানে এসে শুদ্ধকে একটু বোঝালো, আর যেন শুদ্ধ এসব না করে, পরী দিয়েছে কিছু ফ্লাওয়ার প্ল্যান্ট, ইশমাম মির্জা শুদ্ধকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছে, এবং ইহান তাজওয়ার মির্জা শুদ্ধর জন্য বাজারের সমস্ত রঙ পেন্সিল,কালার টিউব,ক্যানভাস নিয়ে এসেছে। ইনুর থেকে ইহান জেনেছিলো শুদ্ধ এসব কত পছন্দ করে। ইনশিরাহ মুঈনের তরফ থেকে শুদ্ধর জন্য একটা রোবোকার থাকলেও ইনশিরাহর তরফ থেকে আলাদা একটা গিফট ছিলো শুদ্ধর জন্য। আর সেটা হলো, ইনশিরাহ শুদ্ধকে প্রমিজ করেছে মিঠির বেবি হলে সেগুলো শুদ্ধকে দেয়া হবে।
অনুষ্ঠান শেষে রাতে সবাই চলে যাওয়ার পরে প্রেরণা দেখলো শুদ্ধ সবার গিফট গুলো তীব্র উত্তেজনা এবং আনন্দ নিয়ে খুলে খুলে দেখছে, আলোর দেয়া কমিকস বুক থেকে একটা বের করে ইতোমধ্যে পড়তেও শুরু করে দিয়েছে শুদ্ধ।
সবগুলো গিফট, বিশেষ করে শান্তিনীড়ের মানুষগুলোর গিফট প্রেরণা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে। খুব বেশি দামী নয় অথচ কতটা ভালোবাসা মিশে আছে গিফট গুলো দেখলেই বোঝা যায়।
প্রেরণা বসে বসে শুধু ছেলের মুখের হাসি দেখে, আর শুদ্ধ মাকে কমিকস পড়ে শোনায়।
চলমান....
[ ২য় অংশের লিংক কমেন্টে ]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৭৯ [ ২য় অংশ ]
[ ২য় অংশ ]
রাত গভীর হলেও ইনুর দুচোখে ঘুম নামে না। প্রিতম পাশে এসে শুয়েছে দীর্ঘসময় হয়েছে, আজ সারাটা দিন মনটা আঁকুপাঁকু করেছে প্রিতমের থেকে ক্ষমা চাইবার জন্য। একটু নিড়িবিলি সময় হয়ে ওঠেনি। সারাদিনে প্রিতম খুব স্বাভাবিক আচরণ করলেও একটিবার ছুঁয়ে দেখেনি ইনুকে, যেখানে অকারণে কতবার লোকটা ইনুকে নরম আদর নিয়ে ছোঁয়। কাল ইনু এমন একটা আচরণ করলো ঝোঁকের মাথায়, এখন এই প্রিতম কখনো এটা ভুলতে পারবে না সে জানে। ভীষণ অস্থির লাগছে ইনুর, আবারও কান্না পাচ্ছে। কি করবে কিছু বুঝতে পারছে না।
সময় গড়ায়, ইনু কিছুটা এগিয়ে গিয়ে প্রিতমের গায়ে একটা হাত রেখে বলে,“প্রিতম।”
প্রিতম হাতটা সরিয়েও দেয়না, কিছুই করেনা। সিলিংয়ের দিকে দৃষ্টি দিয়ে চুপ করে শুয়ে আছে শুধু। তবে ইনু দেখলো লোকটা দৃঢ়,শক্ত নিজের স্থানে। তার ইগোতে বড্ড আঘাত করেছে ইনু। পুরুষের ইগোতে আঘাত করলে এতো সহজে ক্ষত সারানো যায়?
ইনুর শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, তার এতো মুড সুইং হচ্ছে কেন সে বুঝতে পারছে না ইদানিং।
একলাফে উঠে সে ফোনটা নিয়ে বারান্দায় চলে যায়, তারপর ইনশিরাহকে কল করে ঝরঝর করে কেঁদে দিয়ে বলে,“আপুউউ।”
ইনশিরাহ মুঈন পাশাপাশি শুয়ে আছে, ইনুকে এভাবে কাঁদতে দেখে দু'জনেই চিন্তিত হয়ে পরে ভীষণ। ইনু কাঁদতে কাঁদতে আপু-দুলাভাইয়ের কাছে সবকিছু খুলে বলে, শুধু সে প্রিতমকে অপমান করে একটা নোংরা কথা বলেছে সেটা বলতে পারলো না, তবে বললো,“আমি খুব জঘন্য ভাবে ওকে আঘাত করেছি ভাইয়া,আমি কি করবো? আমার মাথা ঠিক ছিলো না। পুরুষ মানুষের ইগো,আমাকে এতো সহজে ক্ষমা করবেই না।”
মুঈন জানতে চাইলো না ইনু কি বলেছে, শুধু জানতে চাইলো,“সমস্যাটা তোমাদের দু'জনের বিষয় নিয়ে শুরু হয়নি তাইতো? ইরফানের প্রসঙ্গ ধরে শুরু হয়েছে। এবং তুমি নিজেই টেনেছো?”
_হু।
মুঈন কিছুক্ষণ ওকে দেখে বলে,“হাজবেন্ড ওয়াইফের সম্পর্কের মধ্যে কখনও থার্ড পারসন ঢোকাবে না ইনু, ঝামেলা তৈরি করতেও না, ঝামেলা শেষ করতেও না। ঝামেলা যে ব্যাপারটা নিয়ে শুরু হয়েছে,বা তুমি যে ব্যাপারটি নিয়ে কথা শুনিয়েছো, সরাসরি সেটা টেনে, সরাসরি ওর কাছে ক্ষমা চাইবে। একটুও দ্বিধা করবে না, এটা মানুষের মুখ, ভুল কথা বেড়িয়ে যেতেই পারে, ভুলটা বুঝে ক্ষমা চাওয়াটাই আসল, তারপরও যদি ওর রাগ না ভাঙে তাহলে সেক্ষেত্রে তখন প্রিতমকে দোষী সাব্যস্ত করা হবে, পুরুষ মানুষের ইগো আবার কি? সুন্দর করে ক্ষমা চাইলে দানব মানুষ, পাথর মানব, লৌহমানবেরও ইগো রাখা উচিত নয়। যাও, আগে সুন্দর করে ক্ষমা চাও।”
দুলাভাইয়ের কথা শুনে ইনু ফোন কেটে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে চলে যায় রুমে। গিয়ে দৃঢ়তার সাথে পাশে বসলো প্রিতমের। তারপর আবারো লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলে বলে,“এই প্রিতম।”
ইনুর কন্ঠে কিছু একটা ছিলো, প্রিতম ওর দিকে তাকায়। ইনু চেঁচিয়ে বলে,“আ'ম সরি প্রিতম, এটা মানুষের মুখ। ভুল কথা বেড়িয়ে যেতেই পারে। তুমি শুধু ওটার জন্য আমার কাছে আসো না, কখনোই না। আ'ম সরি জান।”
জান ডাকলো ইনু প্রিতমকে। প্রিতম তাকিয়ে আছে চুপচাপ, নির্বিকার ভঙ্গিতে। তার হঠাৎ ওয়াশ রুমে যাওয়ার প্রয়োজন হলো, তাই সে কিছু না বলে ওয়াশ রুমে চলে গেল।
এদিকে বোকা ইনু এটাও প্রিতমের ইগো,রাগ ভেবে মুখে ওড়না চেপে ডুকরে কেঁদে ওঠে। পাঁচ মিনিট পরে প্রিতম ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে এসে ইনুকে ওভাবে কাঁদতে দেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয় কিছুক্ষণ।
তারপর গিয়ে বিছানায় বসলো চুপচাপ, এই মেয়েকে ঠিক কিভাবে বোঝাবে, কিভাবে শাসন করবে, কিভাবে আদর করবে, কিভাবে ভালোবাসবে প্রিতম বুঝতে পারছে না, এতোটা অবুঝ কি করে একটা প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে হয়!
প্রিতম বসতেই ইনু ছুটে এসে ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো, দম বন্ধ করা কান্নার মাঝে হঠাৎ কোনো মতে বলে উঠলো,“কাছে এসো প্লিজ। আমি মরে যাবো নয়তো।”
ছাড়েনা প্রিতমকে ইনু, প্রিতম ঘুরে বৌকে কিছুক্ষণ দেখে ওকে টেনে কাছে নিলো। হাঁপাতে হাঁপাতে ইনু বললো,“তুমি শুধু ওটার জন্যই আমাকে কাছে টানো না, আরো অনেক কিছুর জন্য আমার কাছে আসো। আমি চাই তুমি এভাবেই আমার কাছে আসো। প্রিতম আর কখনও হবে না এমন।”
ওকে হুট করে আগলে নেয় প্রিতম, আস্তেধীরে বললো,“চুপ করো, শরীর খারাপ করবে।”
ইনু চুপ করে না, বারবার ক্ষমা চাইতে থাকে। প্রিতম ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,“আমিও সরি ইনু। তোমাকে ওভাবে কথা শোনানোর জন্য। তুমি বেশ করেছো আমার কাছে প্রেমের প্রস্তাব নিয়ে এসে, বেশ করেছো। আমার মতো নিরিবিলি একটা পুরুষের জীবনে ব্যান্ড বাজানোর জন্য তোমার মতো একটা দাদানদের দুলালী মেয়ের প্রয়োজন ছিলো, আসলেই ছিলো।”
হুট করে হেসে ফেলে প্রিতম। কাঁদতে কাঁদতে ইনুও হেঁসে ফেলে ফিক করে। পরমুহূর্তে দুজন হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খায়। আবার কিছুক্ষণ পরে ইনু বলে,“কিন্তু তুমি মেজো দাদানকে একবার বললে কি খুব বেশি ক্ষতি হতো?”
ওকে আগলে নিয়ে প্রিতম বলে,“না হতো না, তবে সাফ সাফ বললে আমার সময় দরকার ইনু। তোমাকে আমার স্ত্রী হিসেবে এতটুকু বোঝার অনুরোধ করছি।”
ইনু আর কথা বাড়ায় না, সে আর এই প্রসঙ্গ টানতেই চাচ্ছে না। দীর্ঘসময় পরে প্রিতমের বুকের সাথে মিশে আছে, তার অন্যকিছু নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করছে না আর।
খানিক বাদে প্রিতম ওকে শোয়াল, ইনু সহাস্যে সায় দিল ভালোবাসাবাসির আমন্ত্রণে। প্রিতম ওর আঙ্গুলের ভাঁজে আঙ্গুল রাখতেই ইনু বললো,“নির্লজ্জ পুরুষ! আপনার ইগো শেষ?”
গলার ওড়নাটা সযতনে সরিয়ে প্রিতম ওর কপালে কপাল ঠেকিয়ে বললো,“কিসের ইগো? এই চোখের পানির সামনে সেসব নস্যি।”
________
আজ ইরফান একাই অফিসে। ইনশিরাহ আসেনি খানিকটা অসুস্থ বলে, ছুটি নিয়েছে। শান্তিনীড়ের বাকি সবাই আজ কেউ বাড়িতে নেই। বাড়ির সিনিয়ররা টাঙ্গাইল গিয়েছে এনআরএইচ গ্রুপের মালিকের মেয়ের বিয়েতে যোগ দিতে, এনআরএইচ গ্রুপের মালিক মাহফুজ আহমেদ মির্জাদের ঘনিষ্ট, তিনি গতকাল রাতে সস্ত্রীক এসে বাড়ির তিন সিনিয়র মির্জা এবং তাদের ওয়াইফদের ধরে নিয়ে গিয়েছেন একপ্রকার।
বাড়িতে ইহান, ইরফান,দুই ভাই-ই ছিলো। আজ সকালে ইহান শহরের বাইরে গিয়েছে সম্মেলনে। ইরফান এসেছে অফিসে।
একা একা কিছুক্ষণ কাজ করার পরে একটু রিল্যাক্স হয়ে সিগারেটটা কেবল ধরিয়েছে ঠিক তখনই তার ফোনে একটা আননোন নাম্বার থেকে কল আসে। ইরফান কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে এক নারী কন্ঠ বলে,“হ্যালো ইরফান ভাইয়া বলছেন?”
_জি,আপনি কে?
_আমি নুযাইফা ভাইয়া,ইনায়ার ব্যাচমেট। আপনি চেনেন।
_হ্যা,কি অবস্থা বলো?
_আসলে ভাইয়া আজ তো ইনায়ার এক্সাম ছিলো, আমারও ছিলো। হলে বসে শুনলাম ইনায়া নাকি মাথা ঘুরে পরে গিয়ে মারাত্মক আহত হয়েছে। আমি বেড়িয়ে কাউকে পেলাম না জানেন, রিন্তু রুশফিদেরও না। ইনায়ার ফোন অফ, ল্যাবে ইনায়ার অ্যাটেন্ডেন্স শিটে আপনাদের নাম্বার ছিলো, বাড়ির বড়রা কেউ ফোন ধরলেন না,ইহান ভাইয়ার ফোন অফ, শেষে আপনাকে পেলাম। ও কি হসপিটালে?
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে শেষ করলো মেয়েটা, ইরফান কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থেকে বললো,“রাখছি আমি,তোমাকে থ্যাংক ইয়ু।”
মেজাজ বিগড়েছে ইরফানের। দ্রুত কল করতে থাকলো বাড়ির বড়দের সবকটা নাম্বারে। লাগাতার ফোন করতেই থাকলো পাগলের মতো, অবশেষে আলো রিসিভ করে ইরফান কিছু বলার আগেই চিল্লিয়ে বলে,“ইরু। শোন আমাদের ফিরতে দেরী হবে, এখানে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটেছে, তোর মাহফুজ আঙ্কেলের মেয়ে মিরা আপু সুইসাইডের ট্রাই করেছে,ওর বিয়েতে মত ছিলো না। খুব ঝামেলায় আছি। সব ফ্রিজে আছে,মেইড কে বলে খাবার গরম করে দুই ভাই চালিয়ে নে। রাখছি হ্যা?”
ফোনের ওপাশে আহাজারি আর হট্টোগোলের শব্দ, আলো ফোন কাটে। ইরফান আর বড়দের কাউকে ফোন করে না, ইহান সম্মেলনে,দাদানের নাম্বার বন্ধ থাকবে ইরফান জানে, ইরফান কল করলো ইশিকে। ইশির নাম্বারটাও বন্ধ। এতো রাগ উঠছে ইরফানের ইশির ওপর,এমনিতে চব্বিশ ঘন্টা ফোন দিয়ে দিয়ে পাগল করে দেয় এখন আসল সময়ে ফোনটা বন্ধ। মুঈনের নাম্বার অফিস টাইমে বন্ধ থাকে তাই ওকেও কল করলো না ইরফান।
দু'হাতে মাথার চুল টেনে কিছুক্ষণ একটা লম্বা শ্বাস ফেলে, তারপর হুট করে মুখভঙ্গি গম্ভীর করে দৃঢ়তার সাথে ফোনটা তুলে প্রিতমের নাম্বারে কল করে সমস্ত কিছু পাশে সরিয়ে রেখে।
একবার, দু'বার, তিনবার, ছয়বার ফোন করলেও প্রিতম কলটা ধরলো না। রাগ চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে ইরফানের। আর অপেক্ষা না করে উঠে দাঁড়ায়, চেয়ারটাতে একটা লাথি মেরে গলার টাইয়ের নটটা কিছুটা আলগা করে ম্যানেজারকে বলে সোজা বেড়োয় অফিস থেকে।
সকাল থেকে প্রণমি হাঁচি দিচ্ছে আবারও, গতকাল থেকে সর্দিজ্বর। মিস জেনি প্রণমির জন্য কিচেনে জাদুর টোটকা বানাচ্ছে। এটা একটা রাশিয়ান কুইজিন। সর্দি জ্বরে খেলে আরাম লাগে। বাড়িতে এখন কেউ নেই। প্রিতম বেড়িয়েছে ইনুকে নিয়ে, শুদ্ধ স্কুলে, প্রেরণা অফিসে।
অলস দুপুরে বসে বসে একটা গান শুনছে আর হাঁচি দিচ্ছে মেয়েটা। হঠাৎ করে কলিং বেল বেজে উঠতেই প্রণমি মিউজিক অফ করে ছড়ি নিয়ে হেটে বসার ঘরে যায়। মিস জেনি যায় দরজা খুলতে। ডোর ভিউয়ারে দৃষ্টি রাখতে মিস জেনির ধবধবে সরল মুখটা হুট করে পাংশুবর্ণের হয়ে যায়।
প্রণমি এগিয়ে গিয়ে বললো,“কি হয়েছে মিস জেনি? দরজা খুলছেন না কেন? কে এসেছে?”
ঢোক গিলছেন মিস জেনি। প্রণমি বললো,“আরে কে এসেছে বলুন তো!”
_ইরফান মির্জা।
ভয়ার্ত, কাঁপা কাঁপা গলায় মিস জেনি অস্ফুটে বললো। প্রণমি নামটা শুনলো, মুহূর্তেই শরীরটা কাঁপুনি দিয়ে উঠলো। ত্বরিত কানের কাছে প্রতিধ্বনিত হলো সেই রাতের সেই হাকডাক,“এই কাজী! সেদিন আমার বোনের বিয়ে নিয়ে কত যুক্তি দেখিয়েছিলেন না? আজকেও একটা যুক্তি শুনুন, ও খুব অসহায় দেখতে পাচ্ছেন তো? অন্ধ মেয়েটা। তাছাড়া বাবা মা নেই ওর, খুবই অসহায়। আমি বিয়ে করে ওর আর ওর গুষ্টির দায়িত্ব নিতে চাই। এটা একটা মানবিক বিয়ে কাজীর বাচ্চা। বিয়ে পড়ান।”
তীব্র বিরক্তি আর আতঙ্কে দীর্ঘক্ষণ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রয় মেয়েটা। বাইরে থেকে ইরফান কলিং বেল টিপেই চলেছে। মিস জেনি খুব আ'ত'ঙ্কি'ত, কাঁদো কাঁদো কন্ঠে প্রণমিকে বলে,“প্রণমি বেটা? প্রেরণা প্রিতমকে কল করি আমি?”
এক এক করে সেদিন রাতের সবকিছু মনে পরে যায় প্রণমির ,একটা ক'র্কশ,বিশ্রী পুরুষ কন্ঠ তার কানে বারবার প্রতিধ্বনিত হয়,“কেন সাজবে না তুমি? অযত্ন করেছে তোমার স্বামী তোমার? এতো বেচারী সাজার কিচ্ছু হয়নি। সাজবে, অবশ্যই সাজবে। তোমার ভাই আমার বোনকে কত যত্ন করে সবার থেকে প্রশংসা কুড়োচ্ছে দেখো। ট্রাস্ট মি তোমার ভাইয়ের থেকেও অনেক ভালো বর হবো, এতো ভালো বর হবো যে তোমার ভাইয়া আর আপু খুশিতে পাগল হয়ে যাবে। কখনো ভালো হবে না, পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে।”
ঝাপসা হয় প্রণমির চোখ, পরপর ভীষণ কঠিন হয় মুখটা। মিস জেনি বলতে থাকেন,“আমি প্রেরণা প্রিতমকে কল করি।”
_নাহ।
অস্ফুটে কিন্তু দৃঢ়তা নিয়ে বললো প্রণমি। মিস জেনি অবাক হলেন,“মানে?”
মুখটা কঠিন করে প্রণমি বলে,“একটা ফুলদানি নিন মিস জেনি।”
আরো অবাক হয়ে মিস জেনি বললো,“কেন?”
_নিন আগে।
মিস জেনি হাতে একটা ফুলদানি নিলো। প্রণমি বললো,“আমার হাতেও একটা দিন।”
মিস জেনি ওর হাতেও একটা ফুলদানি দিলো। প্রণমি এবার লম্বা একটা শ্বাস ফেলে বললো,“এবার দরজাটা খুলে দিন। ভাবীর প্রিয় মেজো দাদান বলে কথা,একটু খাতির যত্ন করা উচিত না? প্রথমে জানতে চাইবেন কেন এসেছে। উল্টোপাল্টা কিছু করার চেষ্টা করলে এই ফুলদানি দিয়ে ঘাড় বরাবর একটা বারি মারবেন। দুলাভাই ছোটোবেলায় আমাকে শিখিয়েছেন ওখানটায় আঘাত করে আত্মরক্ষা করতে। সেদিন পারিনি, তবে আজ পারবো। নিন দরজা খুলুন।”
মিস জেনি ফুলদানি হাতে ভয়ে ভয়ে দরজা খুলে দিতেই ইরফান ভেতরে উঁকি মারে, অকস্মাৎ মুখোমুখি হয় অপ্রত্যাশিত ব্যক্তির। একটা ফ্রক পরেছে, দু'পাশে দু'টো বেনী, শুভ্র স্নিগ্ধ রূপ,আর গালের লাল তিল।
বোনের চিন্তায় বিগড়ানো মেজাজ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইরফান মির্জার কপালের রেখা গুলো বিলীন হলো মুহুর্তেই। তার দৃষ্টি ঐ লাল তিলেই আটকেছে। মিস জেনি কোনো কথা বলে না,প্রনমিও না। ইরফান দেখতে পেলো ফুলদানি হাতে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা টানটান হয়ে।
চোখের দৃষ্টি শীতল হলো ইরফানের, টের পেলো আশপাশটা আবারও কেমন কেমন হয়ে গিয়েছে তার। একবার প্রণমির চোখ দেখছে, একবার দেখছে হাতের ফুলদানি। বুঝতে কিছু বাকি নেই বুদ্ধিমান ছেলেটার, কিছুক্ষণ দেখে ইরফান বাঁকা হাসলো, হাসলো অদ্ভুত ভঙ্গিতে। গলার টাইয়ের নট টা ঠিক করে,প্যান্টের দু পকেটে হাত গুজে টান টান হয়ে দাঁড়ায়, পর পর বলে উঠলো,“কে বলে তুমি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী? তুমি হচ্ছো ভীষণ সেয়ানা একটা মেয়ে!”
চলমান.........
[ কয়েকদিন গল্প দিতে পারবো না ব্যক্তিগত কারণে। উতলা হবেন না। দুঃখিত। ]