ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 80

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৮০
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই

থানা চত্বরে কালো ল্যান্ড ক্রুজারটা বেশ কিছুক্ষণ হয় থেমেছে। এই আসনের সাংসদ লিয়াকত চৌধুরীর গাড়ি ওটা। যিনি এখন অবস্থান করছে থানা প্রাঙ্গণে । গোটা এরিয়ার পরিবেশ থমথমে। আজ নিয়ে দু'দিন ধরে লাবিব চৌধুরীর জামিন আটকে ছিলো, অবশেষে আজ সাময়িক জামিন পেয়েছে, কপাল জোরে। তদন্ত সুষ্ঠু হলে আবারও ঢুকতে হবে তাকে পুলিশ কাস্টডিতে। তার শহর ছাড়ার ওপরে নিষেধাজ্ঞা বসিয়েছে কোর্ট।

ছেলেকে নিয়ে লিয়াকত চৌধুরী আর তাদের লইয়ার পুরনো ভবন থেকে হাসতে হাসতে বেড়িয়েছে , কনস্টেবলরা মাথা নিচু করে দু'পাশে দাঁড়িয়ে। যেখানে ক্ষমতা কথা বলে সেখানে তারা কারা? এতো বড় মার্ডার কেসের প্রমাণ হালকা করে ঠিক সাময়িক জামিন করিয়ে নিয়েছে এরা।

মুঈন কঠিন মুখে নিজের কার্যালয়ের বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে টানটান হয়ে। তিনদিন সময় লেগেছে এদের জলজ্যান্ত প্রমাণ গুলোকে উকিলের চৌকস চালে ঝাপসা বানিয়ে ফেলতে। নিজের পেশার সাথে মস্করা দেখছে মুঈন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।

ল্যান্ড ক্রুজারটা সাই সাই করে উড়ে চলে যেতেই বিক্ষিপ্ত মেজাজ নিয়ে কেবিনে ফিরতেই দেখলো আইজিপি স্যারের ফোনকল, কলটা রিসিভ হতেই আইজিপি সানাউল হক বললেন,“এফসিপিবি পোর্টাল চেক করো। ফাস্ট।”

মুঈন ফোনটা কেটে দিয়ে নিউজের হেডলাইন টা দেখলো শুধু,“তরুন নেতা লাবিব চৌধুরীর জামিন মঞ্জুর করলেন কোর্ট, সুষ্ঠু তদন্তে গাফিলতি প্রশাসনের।”

মুঈন শান্ত চোখে দেখলো হেডলাইন টা, পরপর ফোনটাকে দূরে ছুড়ে রাখলো। মন মেজাজ ইদানিং কাল অত্যন্ত খারাপ যাচ্ছে। ভয়ংকর খারাপ।

ইশি আজ অফিস থেকে লিভ নিয়েছে, পিরিয়ডের তীব্র যন্ত্রণায় সে বিছানায় মরে পরে আছে একপ্রকার। তার ওপর অসহ্যকর পেটে ব্যথা। সকাল থেকে একটা পাউরুটি, একগ্লাস উষ্ণ গরম পানি, আর ব্যাথা কমানোর ওষুধ খেয়ে বিছানায় গুটিসুটি মেরেই শুয়েছিলো, কখনো জেগে ছিল, কখনো ঘুমিয়েছিল। তার ফোনটা ছিলো অফ।

একা ফ্ল্যাটে তীব্র যন্ত্রণায় কাতরানো ব্যতীত আর কোন কাজ নেই যে, একটু উঠতে পারছে না, হাঁটাচলা তো দূরে থাক।
মুঈন কলিং বেল টিপলো না আজ, সকালে দেখে গিয়েছে ইশির শরীর খারাপ, সে পাসওয়ার্ড দিয়ে ঘরে ঢুকলো।

মুঈনের আগমন টের পেয়ে ইশি যন্ত্রণাকাতর মুখেও সামান্য হাসার চেষ্টা করলো, লজ্জিত হয়ে বললো,“আজ রান্না হয়নি এসপি!”

মুঈন সারাদিনের উত্তপ্ত মেজাজটাকে পাশে সরিয়ে রেখে বৌকে অমায়িক একটা হাসি উপহার দিয়ে খাবার অর্ডার করেছে। ইউনিফর্ম খুলে মুখে সামান্য পানি ছিটিয়ে দিয়ে ঘরদোর পরিষ্কার করে, মিঠিকে খাবার দিয়ে এসে ইশির মাথার কাছে বসে। ইনশিরাহ বললো,“মাম্মার কথা মনে পরছে, একটু ডাকবে আমার এখানে? দুদিন এসে যেন থেকে যায়!”

ভীষণ আকুতি আর মনখারাপ মেশানো বাক্যটা শুনে মুঈন কিছুক্ষণ তাকিয়ে রয় ওর দিকে, পর পর কপালে প্রগাঢ় এক চুমু খেয়ে মুঈন বললো,“ডাকবো।”
চোখ বন্ধ করে ইনশিরাহ মুঈনের হাত আঁকড়ে ধরে। খানিক বাদে হুট করে চোখ মেলে লাফিয়ে উঠে বস। মুঈন জানতে চাইলো,“কি হয়েছে?”

ফোন খুঁজছে ইনশিরাহ, তাড়াহুড়ো লাগিয়ে বললো,“কেউ শহরে নেই। ইরফান কোথায়। ওর খোজ নেয়া হয়নি যে আজ সারাদিনে,হায় আল্লাহ!”

_______

এক্সাম হল থেকে বেড়িয়েই ইনায়ার আবদার আজ তাকে নিয়ে এই ঘুরতে হবে। কারণ তার এক্সাম খুব ভালো হয়েছে আজকে।
প্রিতম বৌয়ের আবদার ফেরায় না, গতদিনের মনোমালিন্যের পরে দু'জনে এই দুপুরটা দারুণ কাটালো। যত ধরণের স্ট্রিটফুড আছে, ভরদুপুরে ইনায়া সব খেলো, প্রিতমের কোনো কথা শুনলো না, নিজের ডায়েটের ধারও ধারলো না।
এগারোটা থেকে সাড়ে বারোটা পর্যন্ত শহর চষে শেষে শুদ্ধকে স্কুল থেকে তুলে নিলো দু'জন।

_______

ইরফানের ফোন বেজে ওঠে হঠাৎ। প্রণমির থেকে চোখ সরিয়ে ইরফান ফোনটা দেখে, ইনশিরাহ কল করছে লাগাতার। ইরফান চুপচাপ ফোনটাকে সাইলেন্ট মোডে রেখে আবারও ঠোঁটে বক্র হাসির রেখা ফুটিয়ে প্রণমিকে বললো,“এতো বুদ্ধি তোমার! তুমি তো দারুণ ইন্টেলিজেন্ট মেয়ে।”

প্রণমি একটুও নড়চড় করে না। তীব্র ক্রোধে গলা কাঁপছে, সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,“কি চাই?”

মিস জেনি কিছু বলতে যাবে তার আগে ইরফান হুট করে কন্ঠস্বর গম্ভীর করে জবাব দিলো,“হাত থেকে ওটা নামাও।”

প্রণমি নামায় না, সে দৃঢ়তার সাথে ফুলদানি হাতে দাঁড়িয়ে, কাছে এগোলে আজ সব রাগ এক বারিতে ঝেড়ে ফেলবে লোকটার ওপর। একটুও কসুর করবে না আঘাত করতে।
ইরফান বরফ শীতল কন্ঠে বলে,“আই সেইড! হাত থেকে ওটা নামাও। আমি আমার বোনের কাছে এসেছি।”

তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে প্রণমি,বলে,“কেন নামাবো এটা? নামাবো না। ফালতু লোক,উগ্র লোক, বেহায়া লোক।”

ইরফান তাকিয়ে আছে প্রণমির রক্তিম ঠোঁটের দিকে,যে ঠোঁট নেড়ে এই মাত্র তিনটে গালি ইরফানকে দিলো।

ইরফান বললো,“তোমাকে সেদিন দেখে বোঝা যায়নি। তুমি খুব সাহসী।”

_কেন? কি আশা করছিলেন? আপনাকে দেখে ভয়ে কাপবো আমি? আপনার মতো একটা উন্মাদকে ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নেই। আপনি একটা খুব বাজে লোক, আপনাকে শুধু ঘৃণা করা যায়, ভয় নয়।

ইরফান কয়েক মুহূর্ত প্রণমিকে দেখে বললো,“এক্সাক্টলি! আমাকে ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নেই। এখন দরজা থেকে সরে দাঁড়াও, আমার বোনকে দেখবো আমি। তোমার ভাই আমার বোনকে বিয়ে করেছে। কিনে নাওনি তোমরা আমার বোনটাকে!”

ইরফান শান্ত ভঙ্গিতে ভেতরে ঢুকলো। প্রণমির এখন কিছুটা নার্ভাস লাগছে, যতই সাহসিকতা দেখাক না কেন, দিনশেষে সে তো অন্ধ। এভাবে দরজা খোলা টা বোকামিই হয়েছে। তবে আজ দম থাকতে এই লোকটা উল্টোপাল্টা করে পার পাবে না, কখনোই না।

ইরফান ঢুকে জোরে জোরে ইনুকে ডাকতে লাগলো, বেপরোয়া হয়ে। ইনু সারা দেয়না। প্রণমি বিরক্তি মিশিয়ে বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলে,“ভাবী বাড়িতে নেই।”

ইরফান দাঁড়ায়,ওর দিকে ঘুরে তাকায়, তারপর বলে,“তোমার গুড বয় ভাইকে ফোন করো, তোমার গুড বয় ভাই আমার ফোন ধরছে না। আই নিড মাই সিস্টারস আপডেট নিউজ রাইট নাউ!”

প্রণমি কপাল কুঁচকে মিস জেনিকে বলে প্রিতমকে কল দিতে। অনেকক্ষণ চেষ্টা করলেও, প্রিতম ওদের কলটাও রিসিভ করে না।

ইরফান এবার প্রণমিকে ভালো করে খেয়াল করে, চূড়ান্ত বিরক্তি নিয়ে হাবভাব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। এরা তিন ভাইবোন একই গোছের। আচরণে মিলে যায়।
ইরফান আবারও বাঁকা হেসে এবার গুছিয়ে বসলো সোফাতে। মিস জেনি ঘামছে, সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে সে। দু'দিন আগে ইনু বৌমা আর প্রিতমের মাঝে এই লোককে নিয়ে ঝামেলা বেঁধেছিল,সে কিভাবে এই লোককে ট্রিট করবে বুঝতে পারছে না, তার শুধু রাগ বাড়ছে ছেলেটার ওপর।

ইরফান শুধু বসলোই না,হাত বাড়িয়ে এসির রিমোট নিয়ে পাওয়ার বাড়িয়ে দিলো।

প্রণমি দরজার কাছে থেকে সরে না,আর না হাত থেকে ফুলদানি নামায়। ইরফান এবার বলে ওঠে,“একটা কথা বলো! তোমরা তিন ভাইবোন তো একেবারে ফকফকে মানুষ। তোমরা রিলেটিভকে এভাবে আপ্যায়ণ করো? কিছু খাওয়ার জন্য সাধছোও না।”

একটা লম্বা শ্বাস ফেলে প্রণমি আবারও তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে,বলে,“আমরা রিলেটিভের সাথে কেমন বিহেভ করি সেটা আপনি একটু কষ্ট করে, এক এক করে, আপনার বাড়ির প্রত্যেকটা সদস্যের কাছে থেকে জেনে নিবেন। আর রইলো আপনার কথা, আমি একজন কিডন্যাপারের সাথে এর চেয়ে ভালো ব্যবহার,ভদ্রতা কোনো ভিকটিম দেখিয়েছে বলে শুনিনি।”

ইরফান অনিমেষ তাকিয়ে আছে প্রণমির দিকে,ওর কথার জবাবে বললো,“কিন্তু আমি তো এখানে কিডন্যাপার হয়ে আসিনি, তোমার কাছেই আসিনি আমি, আমি তোমার বেয়াই, তোমার শ্রদ্ধেয়া ভাবীর শ্রদ্ধেয় বড় ভাই, সম্পর্কে তোমার গুরুজন। যাও গিয়ে চা নিয়ে এসো বাচ্চা।”

প্রণমি লোকটার বেহায়াপনা দেখে আশ্চর্য হচ্ছে শুধু, ইরফান বলতে থাকে,“চা নিয়ে এসো! বোনের বাড়িতে প্রথম এলাম।”

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে প্রণমি ঠান্ডা গলায় মিস জেনিকে বলে,“এক কাপ চা নিয়ে আসুন মিস জেনি।”

দরজা থেকে সরে না প্রণমি, মিস জেনি এক কাপ চা এনে ইরফানের হাতে দেয়। ইরফান প্রণমির দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ হেসে চায়ের কাপটা নিয়ে চুমুক বসায় আস্তেধীরে। চা খেতে খেতে বোনের শ্বশুরবাড়ি টা দেখতে থাকে সে, দৃষ্টি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে।

প্রণমি মিস জেনিকে আবারও বলে,“ভাইয়াকে কল করুন আবারও,বলুন তার আত্মীয় এসেছে বাড়িতে।”

কাউকে কল করতে হয়না আর, প্রিতম ইনায়া আর শুদ্ধ ফিরেছে। সদর দরজা খোলা পেয়ে হুরমুর করে ওরা ঢুকে থ'ম'কে দাঁড়ায়। ইরফান চুপচাপ চা খাচ্ছে।

প্রিতম হতভম্ব হয়ে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলে তৎক্ষণাৎ, চিন্তিত, আ'ত'ঙ্কি'ত হয়ে বোনের মুখের দিকে চায়। প্রণমির মুখভঙ্গি কঠিন,নাক চোখ কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রিতম ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ইনুর দিকে,যে কিনা এতক্ষণ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকলেও হুট করে ছুটে চলে যায় ইরফানের কাছে। পাশে বসে উত্তেজিত হয়ে পরে,“দাদান তুমি? দাদান কখন এলে?”

ইরফান বোনকে পা-মাথা সুস্থ দেখে একটু স্বস্তি পায়, বোনের জন্য কন্ঠে দরদ মিশিয়ে বলে,“নুযাইফা কল করেছিলো,তুই নাকি মাথা ঘুরে পরে গিয়েছিস হলে!”

_ওহ ঐ খবরটা দাদান,আজ সবাই মিস্টেক করছে, মাথা ঘুরে পরেছে ইনায়া মাহমুদ, আমি নই। ওর হিস্টিরিয়া আছে।

ইরফান উঠে দাঁড়ালো। তাকালো প্রিতমের দিকে, প্রিতম শুধু প্রণমিকে দেখছে।

এর মাঝে হুট করে প্রেরণা চলে আসে, বাড়িতে ঢুকে শুরুতেই ইরফান মির্জাকে দেখে সে দাঁড়িয়ে পরে থমকে, মুহুর্তেই আ'ত'ঙ্কি'ত মুখটা ঘুরিয়ে দেখে নিজের বোনকে। একটা ঝালরওয়ালা ফ্রক পরেছে, গায়ে ওড়না নেই প্রণমির। প্রেরণা দুমিনিটের জন্য নিশ্চুপ হয়ে এক এক করে সবার মুখের দিকে তাকায়।

ইনু প্রেরণার দিকে দৃষ্টিতে আকুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে,তার দৃষ্টি যেন প্রেরণাকে আকুতি করছে প্রেরণা যেন এখানে সিনক্রিয়েট না করে।

ইরফান দেখছে প্রেরণা-প্রিতম দুই ভাইবোন কে, দুই ভাইবোনের আত্মা উড়ে গিয়েছে তাকে দেখে বুঝে নিলো, তাদের অভিব্যক্তি বুঝে ঠোঁটে বক্র হাসি ফুটিয়ে তুলে অত্যন্ত শীতল কন্ঠে প্রেরণাকে বললো,“আসসালামু আলাইকুম আপু।”

একপ্রকার চ'ম'কে ওঠে প্রেরণা, চোখ বড় বড় করে ইরফানকে দেখে। ইরফানের মুখ হাসিহাসি, বড় বাবা খুব করে বলে দিয়েছে,এক কথায় আদেশ করেছে প্রেরণা দ্য জ্ঞানী আপাকে দেখলেই লম্বা সালাম দিতে। ইরফান খুব বাধ্য ছেলে,তাই সালাম দিয়েছে। এমনিতেও তার দাদানের কল্যাণে ভবিষ্যতে ভাবীমনি ভাবীমনি বলে প্রেরণার আঁচল ধরে ছুটতে হতে পারে, তাই আগে থেকে সালামের প্র্যাকটিস।

প্রেরণা যে অনেকটাই চমকেছে তা দেখে একদফা মনে মনে হেসে নেয় ইরফান। প্রেরণা একপলক ইনুকে দেখে, ইরফানের দিকে দৃষ্টি না দিয়েই অস্ফুটে বলে,“ওয়ালাইকুমুস সালাম।”

_ভালো আছেন আপু?

নাটুকে স্বর। রাগে গা চিড়বিড়িয়ে ওঠে প্রেরণার ছেলেটার নাটক দেখে, বারবার ইনুর দিকে তাকায়,মেয়েটার মুখটা মলিন। প্রেরণা নিজেকে শান্ত রেখে মুখটাকে অকস্মাৎ হাসি হাসি করে বলে,“আল্লাহ খুউউউব ভালো রেখেছেন। তোমার সব ভালো?”

দুপক্ষ কি সুন্দর নাটক চালিয়ে যাচ্ছে,ইনু তা বোঝে। সে তবুও মনে মনে চায় এভাবে নাটক করে হলেও যেন সবকিছু একটু স্বাভাবিক থাকে।

ইরফান বললো,“সব ভালো আপু। আসলে ইনুকে দেখতে এসেছি। মাইন্ড করেননি তো আবার আপু?”

ইরফান মনে মনে পৈশাচিক হাসি হাসে, দেখতে চাইছে প্রেরণার সহ্যশক্তি। এই দুই ভাইবোনকে জ্বালাতে তার খুব ভালো লাগবে ভবিষ্যতে।
প্রেরণা চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,“মাইন্ড করবো কেন ? তুমি তোমার বোনকে দেখতে এসেছো।”

কেউ কারও থেকে কম নয় নাটকে। প্রেরণা প্রণমির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নম্রস্বরে বলে,“ঘরে যাও প্রণমি। তুমি অসুস্থ।”

প্রণমি কঠিন মুখটাকে হঠাৎ সহজ করে চুপচাপ চলে যায় ঘরে। ইরফান ওর দিকে তাকালোই না। তখন এক ডেলিভারি ম্যান আসে নানা পদের মিষ্টি নিয়ে। এগুলো ইরফান কিছুক্ষণ আগে অর্ডার করেছে। রাজ্যের মিষ্টি দেখে ইনু বললো ,“এসব কি!”

_তোর বাড়িতে প্রথম এলাম। টেনশনে তখন কিছু কিনে উঠতে পারিনি, আবার তোর স্বামী এটা না ভেবে বসে তার শ্রদ্ধেয় সম্বন্ধি অসামাজিক একজন লোক। তাই সামান্য করলাম। আমি খারাপ হলেও মানুষ ভালো!

কথাটা বলে ইরফান প্রিতমের দিকে তাকায়। প্রিতম নির্বিকার।

ঘুরে ইরফান এবার ইনুকে বলে,“আসছি আমি।”

দুপুর দু'টো বেজেছে তখন। এই দুপুরে দাদানকে না খাইয়ে পাঠিয়ে দিতে মন চাইছে না ইনুর। খুব সাহস করে বললো,“দাদান খেয়ে যাবে না?”

ইরফান দাঁড়ায়। ইনু তখন প্রেরণার দিকে তাকায়, প্রেরণা নির্লিপ্ত হয়ে ছিলো, ইনুর দৃষ্টি দেখে রোবটিক কন্ঠে ইরফানকে বলে,“খেয়ে যাও। কুটুম বাড়ি তোমার।”

ইরফানের বেশ মজা লাগছে এই নাটক, সে আরেকটু দেখবে বলে একবাক্যে রাজি হয়। মিষ্টি করে হেসে প্রেরণাকে বলে,“জি আচ্ছা আপু।”

দাঁতে দাঁত চেপে, দু'চোখ বন্ধ করে প্রেরণা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের দিকে যায়।

________

ইনশিরাহ একহাতে তলপেট চেপে ধরে উঠে দাঁড়িয়েছে, ইরফান কল রিসিভ করছে না, টেনশন হচ্ছে খুব হঠাৎ। মুঈনও চেষ্টা করছে নিজের নাম্বার থেকে, কারোও ফোন ধরছে না ইরফান।

ইরফান ফোনটা সাইলেন্ট করে তখন একেবারে আরাম করে বসেছে প্রিতমের ড্রয়িং রুমে।

প্রণমি নিজের ঘরের দোর লাগিয়েছে, তারপর থেকে টু টা সাউন্ড নেই।

প্রিতম ইরফানের মুখোমুখি একটা সোফায় বসে আছে। পরিস্থিতি খুবই শান্ত।

ইনু রান্নাঘরে, ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে সব গরম করছে। প্রেরণা হাতমুখ ধুয়ে এসে রান্নাঘরে ঢোকে। পদের কমতি নেই, গরুর মাংস, ভেটকি মাছ, সজনে দিয়ে পুটি মাছ, আম দিয়ে ডাল, তবুও আরও দু'টো পদ বাড়িয়ে নেয় প্রেরণা, ইলিশ মাছ লাউপাতায় মুড়ে ভাজে, চিংড়ি মাছের দোপেঁয়াজা করে ত্রিশ মিনিটে।
ইনু ঘনঘন দৃষ্টি দিয়ে নিজের ননদকে দেখছে, আপু স্বভাবে রাগী রাগী, আপুর থেকে এমন স্বাভাবিক আচরণ সে আশাই করেনি।
সেদিন রাতের পর থেকে আপুর আচরণ তার সাথে খুবই ঠাণ্ডা। কেমন অস্বাভাবিক ঠান্ডা।

প্রেরণা চুপচাপ টেবিল সাজিয়ে প্রিতমকে ডেকে বলে,“ওকে নিয়ে খেতে আয়।”

ইনুকেও খেতে বসতে বলে সবার সাথে। নির্বিকার ভঙ্গিতে প্রেরণাই ইরফানের প্লেটে খাবার তুলে দেয়।

ইরফান খেলো সামান্য। আড়চোখে বারকয়েক প্রেরণা আর প্রিতমকে দেখে। ইনু খেতে খেতে বাড়ির সবার কথা জানতে চায়, ইরফান চুপচাপ জবাব দিতে থাকে।

খেয়ে আর ইরফান বসেনি এক মুহুর্তের জন্যও। ও উঠে দাঁড়িয়ে বোনের থেকে বিদায় নেওয়ার সময় প্রিতম ইনুকে বললো,“আমি নিচ থেকে আসছি একটু।”

ইরফান,প্রিতম দু'জনেই একসাথে অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেড়োয়।

দরজা লাগিয়ে ইনু দেখছে প্রেরণা মাথায় শাড়ির আঁচল তুলে চুপচাপ ভাত খাচ্ছে। ইনু গিয়ে ভাইয়ের কিনে দেওয়া মিষ্টি গুলো ফ্রিজে ভরে রাখে। তারপর ঘুরে প্রণমির ঘরের দিকে তাকায়,মিস জেনিকে দিয়ে কিছুক্ষণ আগে খাবার পাঠিয়েছে ইনু সেখানে।
প্রণমি লোকটা বেড়িয়ে যাওয়ার পরেও ঘর থেকে বেড়োচ্ছে না, বিছানার চাদর খামচে ধরে বসে আছে চুপচাপ।

লিফটে তারা দুজন, ইরফান এবং প্রিতম। ইরফান চুপচাপ হাতঘড়িতে সময় দেখছে, আর প্রিতম দেখছে ইরফানকে, তার চোখের দৃষ্টি শান্ত। হুট করে ঠিক তখনই লিফট টা একটু থামলো, এই অ্যাপার্টমেন্টের দু'টো লিফটের মধ্যে এটাতে সিস্টেমে গোলযোগ দেখা যায় মাঝে মাঝে।

ইরফান নিশ্চুপ, হঠাৎ প্রিতম বলে ওঠে,“মেজো দাদান,মেজো দাদান,আপনি নাকি ভালো হয়ে গেছেন?”

ইরফান তাকায় ওর দিকে। প্রিতম ওর দিকে খানিকটা তেড়ে এসে বলে,“কেন এসেছিস হুট করে!”

ইরফান শান্ত ভঙ্গিতে বললো,“আমার বোনকে দেখতে! তুই আমার বোনকে বিয়ে করেছিস। কিনে নিসনি।”

প্রিতম একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,“শা'লা, এটাই সমস্যা। তোকে কিছু করতে পারছি না। কি বলতো! আমি আমার বৌ,আমার ইনু জানকে বড্ড ভালোবাসিরে। কত রিস্ক নিয়ে বিয়ে করলাম ওকে! ও ওর দাদানকে ভীষণ ভালোবাসে। কষ্ট পাবে বেচারী। ”

_কি করতে চাস তুই?
শান্ত স্বরে ইরফান জানতে চায়। প্রিতম হুট করে ওর কলার চেপে ধরে বলে,“তোর মতো গুণ্ডামি না করতে পারলেও বোনের জন্য একটা মার্ডার করতে পারবো ট্রাস্ট মি।”

ইরফান হাসলো, চুপচাপ কলার থেকে প্রিতমের হাতটা সরিয়ে দিয়ে নিজের মাথায় বুলিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো,“শাআলা। সরি, ভাই শোন, প্লিজ শোন ভাই! আমাকে খোচাস না,তোর দোহাই লাগে। আমি চেতে গেলে তোদের তিন ভাইবোনের কপালে খুব দুঃখ আছে‌ রে। প্লিজ খোচাস না! আমি ভালো হয়ে গিয়েছিরে,ট্রাস্ট মি।”

প্রিতম আবারও ইরফানের কলার ধরে বললো,“কিচ্ছু যায় আসে না তাতে আমার। শুধু আমার বোনের থেকে দূরে থাকবি! ও বাচ্চা একটা মেয়ে ইরফান, তোর বোনের থেকেও ছোটো। এখন একটু লজ্জা হওয়া উচিত তোর!”

চেঁচিয়ে উঠলো প্রিতম, পর পর বললো,“শা'লা আমি সবথেকে অপদার্থ একটা ভাই যাকে বোনের অন্যায়কারীর সাথে মেপে মেপে রাগ দেখাতে হচ্ছে! যাস্ট বিকজ সে বৌয়ের দাদান।”

ইরফান এবার প্রিতমের কলার ধরলো,“আর আমি? শত্রু এসে হঠাৎ বোনটাকে ফুঁসলিয়ে ফাসলিয়ে বিয়ে করে নিয়েছে! আর সেটা চুপচাপ দেখেছি কারণ ফাকিং আইনি মতে বিয়ে করেছে যে তারা!”

_তো আমি তোর বোনকে ভালোবেসেছি!

_বিশ্বাস করার মতো ছিল? তুই করতি?

_না,তবে আমি কখনো বদলা নিতে একটা প্রতিবন্ধী মেয়েকে তুলে নিয়ে বিয়ে করতাম না।

হঠাৎ চুপ হয়ে গেল ইরফান, প্রিতমের কলার থেকে হাত সরিয়ে নেয়। প্রিতম কলার ঠিক করে বলতে থাকে,“নেপালে, যখন তোর বোনটা আমার কাছে ছিল, একটি বারের জন্য আমার মাথাতেও আসেনি ওকে ফেলে নিজের জীবন বাঁচানোর কথা। আর তুই....”

লিফট চলতে শুরু করে আবারও। ইরফান তখনও নিশ্চুপ। প্রিতম দূরে সরে দাঁড়ায়। একেবারে শান্ত স্বরে বলতে থাকে,“তোকে আমি হাড়ে মজ্জায় চিনি, যেমন তুই আমাকে চিনিস! যা হয়েছে হয়েছে, বাট প্লিজ শেষবারের মতো রিকোয়েস্ট, প্রণমিকে নিয়ে উল্টোপাল্টা ভাববি না তুই। একটুও না। তোরা বড়লোকের বাচ্চা, তুড়ি মারলে মেয়ের অভাব হবে না। আমার প্রতিবন্ধী বোনের আগেপিছে যেন না দেখি তোকে!”

ইরফান চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রিতম চশমাটা ঠিকঠাক করতে করতে বলে,“আমাদের ঝামেলা কখনো শেষ হবার নয় এটা তুই আর আমি দুজনেই জানি। যা করেছি তার জন্য ক্ষমা চাইছি। এবার একটু আমাকে ছেড়ে দে!”

চলমান......

[ আজকে পেরেছি দিয়েছি, কাল সত্যিই পারবো না গল্প দিতে 🫠 ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 80 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন