ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 81

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৮১
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই

প্রিতম ঘরে ফিরে চুপচাপ চলে গেলো গেস্টরুমে,গিয়ে বসলো কম্পিউটারের সামনে, প্রোগ্রামিংয়ের কিছু কাজ বাকি আছে,সেটুকু সম্পূর্ণ করতে। ইনায়া তখনও ফ্রিজের কাছে দাঁড়িয়ে আছে ঠাঁয়। প্রেরণা ভাত খেয়ে উঠে শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে এঁটো প্লেট-বাসন নিয়ে সিঙ্কের ধারে এগিয়ে যায়।

কিছু মুহুর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে ইনু বললো,“আপু মিষ্টি?”

প্রেরণা স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই তাকালো ইনুর দিকে,বললো,“মিষ্টি? দেখো তোমরা কতটা খেতে পারবে, সেটুকু রেখে প্রতিবেশীদের মাঝে বিলি করে দাও। নষ্ট বা অপচয় করে তো লাভ নেই। মিস জেনিকে ডাকো।”

ইনায়া নড়াচড়া করে না,প্রেরণা থালা বাসন ধুয়ে ওর সামনে থেকে হেঁটে যেতে নিলে ইনু খপ করে প্রেরণার ডান হাতটা ধরলো, প্রেরণা বিমূঢ় দৃষ্টিতে চেয়ে রয় ওর দিকে। ইনু জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে একটা ফাঁকা ঢোক গিলে সরাসরি প্রেরণার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,“আপু। দাদানকে কি করে আমি না খাইয়ে পাঠাতাম? আমার স্বামীর ঘর যে এটা! আর ঐ দাদানটা কখনও আমাকে না খেয়ে থাকতেই দিতো না, আজ বোনের বাড়ি থেকে ভর দুপুরে না খেয়ে যেতো আপু?”

কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে থেকে প্রেরণা নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে বললো,“আশ্চর্য তুমি এসব কথা কেনো তুলছো? আমি বা আমরা তোমাকে কিছু বলেছি?”

প্রণমির ঘরটা কিচেনের পাশেই। আপু ভাবীর কথোপকথন কানে যেতেই ধীরে ধীরে উঠে এসে সে রুমের দরজার রঙিন পর্দা ধরে দাঁড়ায়।

ইনু আবারও একটা ফাঁকা ঢোক গিলে বললো,“আপু প্রণমিকে আমি ভীষণ স্নেহ করি,ভালোবাসি, ওর খারাপ দিনগুলোতে আমি আমার কর্তব্য পালনে কসুর করেছি বলতে পারবেন? কিন্তু এখন, আপু দাদানকেও যে আমি বড্ড ভালোবাসি!”

প্রেরণা আশেপাশে তাকালো,তার মাথা ধরেছে ভীষণ, তবু মুখে শুকনো হাসি ফুটিয়ে ইনুর গালে হাত রেখে বললো,“আমরা তিন ভাইবোন চারিত্রিক দিক দিয়ে ভীষণ নির্লজ্জ ইনু। তুমি অবাক হবে সে ইতিহাস জানলে! এসব কথা বলো না! আর কোনো কথা বলো না তুমি। আমি তোমাকে খুব স্নেহ করি,প্রণমিও সম্মান করে। আমরা দুজনে তোমাকে ভালোবাসি। এটা বজায় থাকবে আমৃত্যু। শুধু প্লিজ এখন এসব বাদ দাও। প্লিজ।”

হন্তদন্ত হয়ে প্রেরণা নিজের রুমে চলে যায়, ইনুর চোখ দুটো হঠাৎ ঝাপসা হয়ে ওঠে,ঘুরতেই দৃষ্টি পরে প্রণমির মুখটাতে। ওকে কিছু না বলে ছুটে চলে যায় পশ্চিমের বারান্দায়। গিয়ে রেলিং ধরে হাঁপাতে থাকলো ইনু, প্রেরণার শীতল ভাব তাকে পীড়া দিচ্ছে খুব। এতোকিছু তার মস্তিস্ক আর নিতেই পারছে না। সব কিছু এতো অসহ্য কেন! রাগ উঠলো খুব করে হঠাৎ, চোখমুছে ফোনটা হাতে তুলে নিলো, সে ঠিক করেছে মেজো দাদানকে বলবে,“আর যেন কখনও সে এ বাড়িতে না আসে, কখনোই না!”

কিন্তু কলটা কেটে দিলো ইনু,যখন তার মেজো দাদানের মুখটা ভেসে উঠলো, চোখের সামনে ভেসে উঠলো পুরনো সেই দিনের কথা।
বাড়িতে কিছু খাবার আনলে মেজো দাদানের চিল্লিয়ে বলা,“এই ইনু খাবে আগে। ইনু নেবে আগে।”

আবারও চোখ ঝাপসা হয় ইনুর। বারান্দায় দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ।

_________

কলটা রিসিভ করার আগে ইরফান লম্বা লম্বা দু'টো শ্বাস ফেলল , তারপর রিসিভ করলো কলটা। সাবলীল গতিতে চলছে তার বাইক, বেলা তখন সাড়ে তিনটা। ফোনের ওপাশ থেকে চেঁচিয়ে উঠলো ইনশিরাহ,“এই তুই কোথায়?”

_রাস্তায়। আসছি আমি তোর কাছে।

শুকনো গলায় জবাব দিয়ে বাইকের স্পিড বাড়িয়ে একটানে চলে যায় ইশির অ্যাপার্টমেন্টে। ভাইকে দেখে রাগে গজগজ করছে ইনশিরাহ, কোমর ব্যথা নিয়েও টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে একটার পর একটা প্রশ্ন ছুঁড়ছে। কিন্তু যখন সত্যিটা জানলো, পুরোপুরি থ হয়ে গেলো সে, আবারও কিছুক্ষণ পরে চেঁচিয়ে বললো,“তোর সাহস হয় কি করে ওখানে যাওয়ার? আচ্ছা তোর বোধ বুদ্ধি হবে না কখনো? তুই কেন যাবি!”

ইরফান শুধু তাকিয়ে আছে। ইশি নিজের চুল টানছে, বলছে,“একটু শান্ত হয়ে থাকলে কি হয় তোর? ইনু মাথা ঘুরে পরে গিয়েছে তো এমন তর আগেপিছে না ভেবে ছুটতে হবে? ওর হাজব্যান্ড আছে তো ওর সাথে। আমাকে ফোনে পেলিনা,এখানে আসতি। হায় আল্লাহ! বাড়ির সবাই ওদের ফ্যামিলিকে কথা দিয়েছিলো তোকে শহরের বাইরে পাঠাবে,সেটা করেনি কেউ, আর তুই এখন নাচতে নাচতে ঐ মেয়েটার সামনে চলে যাস। একটু সময় তো দিবি ওদের!”

একনাগাড়ে কথা গুলো বলে ইশি হাপাচ্ছে, ইরফান নিশ্চুপ,বোনকে দেখছে শান্ত ভঙ্গিতে। ইশির মুখটা কেমন কাঁদো কাঁদো,বলে,“অস্থির লাগে। আমাদের কারো সুশিক্ষা নেই শুনতে শুনতে অস্থির লাগে ভীষণ। পাপা মাম্মারা সবাই বুড়ো হচ্ছে, কার কখন কি হয়ে যায়। তাদের কথা একটু ভাব! এতো টা তো অবুঝ নোস তুই।”

_আচ্ছা শান্ত হ, এরপর থেকে আর তোকে না বলে কিছু করবো না।

_জানি আমি আপনার দৌড়! যা এখন,আমি ঘুমাবো!

_ভাইয়া ডিউটিতে?

_হু,লাঞ্চ সেরে গেলো।

ইরফান ওঠে না, সোজা চলে যায় ইশির ফ্রিজের কাছে। ইশি বলে,“আজ রান্না হয়নি রে। বাইরে থেকে অর্ডার করে খেয়েছি। ওতে কিছু নেই। কিছু করে দেবো?”

_ইটস অলরাইট। আমি খেয়ে এসেছি ইনুর বাসা থেকে। এখন আইসক্রিম খাবো।

_খেয়ে এলি?
চোখ দুটো গোল্লা গোল্লা হয়ে যায় ইনশিরাহর, ইরফান হাসলো সামান্য, বিগত একঘন্টায় যা যা হলো সবকিছু আবারও ভাবতে ভাবতে ফিচেল হাসলো। আইসক্রিম খেয়ে বোনের বাড়ি থেকে বিদায় নেওয়ার সময় বললো,“আজকের জন্য চিন্তা করিস না। আমি সোজা বাড়িতেই যাচ্ছি। তুই ঘুমা!”

_আর কাল? কাল থেকে দুশ্চিন্তা কনটিনিউ করবো? তাইতো?

ওর দিকে ঘুরে ইরফান আবারও হাসলো,তবে বললো না কিছু।

________

ভাইকে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে ইহান, বাড়ির বড়রা এখন অবধি বাড়িতে ফেরেনি। ইহান সম্মেলন থেকে গতকাল রাত নয়টায় ফিরেছে। ফিরে ইরফানের ঘরে একবার উকি দিয়েই ঘুমিয়ে পরেছিল । আজ সকাল সকাল উঠে কফি নিয়ে পুল সাইডে যেতেই পা থমকালো তার।

পুলের ধারে ম্যাট বিছিয়ে ইরফান পুশ আপ দিচ্ছে, সেটা কোনো আশ্চর্য ব্যাপার না। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে ইরফানের সামনে,ম্যাটের ওপর একটা বই। বই পড়তে পড়তে পুশ আপ দিচ্ছে ইরফান।

কিছু মুহুর্ত তাকিয়ে থেকে ইহান হাসলো সামান্য, এই ছেলেটার সবকিছু অদ্ভুত। ও জেনে শুনে এমন অদ্ভুত, না জেনে শুনেও। একটা কাজ স্বাভাবিক ভাবে করতে নারাজ ছেলেটা।

আচানক বইটা ইরফানের সামনে থেকে সরিয়ে নেয় ইহান, পুশ আপ দিতে দিতে হাঁপিয়ে ওঠা ইরফান থামলো, ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পরলো ম্যাটের ওপর। ইহান বললো,“যেকোনো একটা কর। এভাবে বই পড়া যায়? আর বই পড়ছিস তুই? মানতে কষ্ট হচ্ছে!”

উঠে তোয়ালে দিয়ে কপালের ঘাম মুছে ইরফান বললো,“কেন? পৃথিবীতে ভদ্রলোক শুধু ইহান তাজওয়ার মির্জা? ইরফান হতে পারে না?”

ইহান কফির মগ নিয়ে সামনের টুলে বসতে বসতে বলে,“পারে! তবে ইরফান হতে চায় না!”

দাদানকে দেখছে ইরফান। কিছুক্ষণ দেখে একহাত বাড়িয়ে ফাজলামি করে বলে,“এই দাদান তোমার কানের কাছে ওটা সাদা চুল নাকি! আয় হায়! একি সর্বনাশ!”

ইহান বিরক্ত হয়ে ওর হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,“সরতো!”

ইরফান হাসছে, খানিক বাদে হাসি থামিয়ে হুট করে বলে,“বাড়িতে কেনো বলছো না তোমার পছন্দের কথা! মেয়েদের মতো ঢং কেন করছো?”

_কাকে পছন্দ করি আমি?

অবাক হবার ভান করলো ইহান। কথাটা শুনে উচ্চশব্দে হেসে ওঠে ইরফান। ইহান থতমত খেয়ে আছে। ইরফান হাঁসি থামিয়ে উঠে দাঁড়ায়,বলে,“অহহ জানো না, আচ্ছা জানলে আমাকে জানিও। তুলে এনে দেবো!”

_সবসময় ফাজলামি ভালো লাগে না ইরফান।

রাগী চোখে ভাইয়ের দিকে দৃষ্টি দিয়ে আছে ইহান। ইরফান সামান্য ঘাবড়ে যাওয়ার ভঙ্গি করে বললো,“সরি দাদান! যাস্ট কিডিং! এমনিতে আমার ভাবী মনি আনবো ধুমধাম করে, পালকি চাপিয়ে ইউ নো। বিয়ের থিমটা হবে সাবেকি আমলের মতো। ভাবী মনি পালকি থেকে নামলে আমি,ইনু,ইশি,শেহু তাকে জুতা পরিয়ে দেবো। কারণ সে দাদানের সিন্ড্রেলাও হবে। সিরিয়াসলি! আমি,ইশি,ইনু প্ল্যান করেছি বহু বছর আগে এটা,যখন আমরা টিনেজার ছিলাম। গোটা শহর দেখবে আমার ভালো মানুষ দাদানের বধূ বরণ। যে-ই আসুক আমাদের থেকে পাবে সর্বোচ্চ সম্মান। শুধু একটা কন্ডিশন পূরণ করতে হবে তাকে, আমার দাদানকে সর্বোচ্চ সুখী করতে হবে।”

ইহান অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে চুপ করে আছে, ইরফান আড়চোখে ভাইকে দেখে, নিশ্চয়ই এখন জ্ঞানী আপার মুখটা কল্পনায় একে আহ্লাদে গদগদ হচ্ছে দাদান। এটা ভেবেও ইরফান বাঁকা হাসে। অতঃপর গান গাইতে গাইতে চুপচাপ চলে যায়,তাকে অফিস যেতে হবে।

ইহানের কল্পনাতে অকস্মাৎ প্রেরণাই এসেছিল তখন, একটা ফরসা স্নিগ্ধ মুখ, একজোড়া সমুদ্র নীল চোখ,আর একটা লাল বেনারসী।
মুহুর্তেই কঠিন, গাম্ভীর্যে ঠাশা একত্রিশের সুদর্শন মুখটায় ছেয়ে যায় অপ্রস্তুত ভাব, কিন্তু ঠোঁটের কোণে ফুটলো অস্পষ্ট হাসি। পর পর গলা খাঁকারি দিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে কফির মগে চুমুক বসায় চুপ করে।

_______

ঘড়ির কাঁটা তখন বেলা সাড়ে তিনটায় গিয়ে ঠেকেছে। তাড়াহুড়ো লাগিয়ে প্রেরণা নিজের একটা শাড়ি এবং শুদ্ধর দু সেট জামাকাপড় ব্যাগে পুরলো।

প্রিতম এসে দরজায় দাঁড়িয়ে তাকে আরও তাড়া দেয়,“আপু ট্রেন মিস হবে তাড়াতাড়ি।”

_এইতো হয়ে এলো।

ব্যাগ গুছিয়ে প্রেরণা শুদ্ধকে রেডি করিয়ে দেয়। আজ সে ওয়াসীতের দেশের বাড়ি যাবে। শুদ্ধর জন্মনিবন্ধন সনদে সামান্য ভুল হয়েছে,সেটা শোধরাতে হবে। প্রেরণা এ শহরে এলেও শুদ্ধর জন্মনিবন্ধন করিয়েছিলো মেজর ওয়াসীতের ঠিকানায়। তাছাড়া প্রতিবছর শুদ্ধকে তার পাপার কবর জিয়ারত করাতে নিয়ে যাওয়া হয়। ওখানে গিয়ে প্রেরণা ফুপির বাড়িতে থাকবে দু রাত,অফিসে এবং রেস্তোরাঁয় সাব্বিরকে সব বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রিতম প্রেরণাকে পৌঁছে দিয়ে চলে আসবে।

প্রেরণা অনেক করে বলেছে প্রিতমের যেতে হবে না, সে তো একা একা নেপাল অবধি ঘুরে এসেছে। কিন্তু প্রিতম শোনেনি,বলেছে,“নেপালের মানুষগুলো তো সভ্য, তোমার শশুর বাড়ীর এলাকার মানুষ তো অসভ্য। আমি যাবো।”

ইনায়া,প্রণমি,মিস জেনি লিভিং রুমে এসে দাঁড়িয়েছে। শুদ্ধর হাত ধরে ঘর থেকে বেড়োয় প্রেরণা, ইনুর দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে প্রেরণা বললো,“দুদিনেই ফিরবো। থাকতে পারবে না?”

ইনু মাথা নাড়ে। বলে,“পারবো।”

_চুলার ধারে কাছে যাবে না তুমি বা প্রণমি। মেইড অথবা মিস জেনিকে সব বলবে ঠিক আছে?

ইনু এবারও মাথা নাড়ায়। প্রেরণা ঘুরে প্রণমির গালে হাত রেখে নরম গলায় বলে,“আজ আর কাল গানের ক্লাসে যাসনা সোনা,কেমন?”

_কেন আপু?

_এমনিই, বাড়িতেই থাক ভাবীর সাথে। এত চিন্তা নিয়ে কি করে থাকবো আমি?

প্রণমি সামান্য হাসলো এবার,কন্ঠে তাচ্ছিল্য নিয়ে বললো,“আমি তো যাবো আপু। যাবোই।”

_জেদ করছিস কেন?

_জেদ না আপু। আমার এভাবে অসহায় অসহায় হয়ে থাকতে ভালো লাগে না আর। মোটেও না। তোমরাও আমাকে ভেবো না। তোমরা যাও, কোনো রকম চিন্তা করতেই হবে না, আমি যাবো গানের ক্লাসে।

প্রেরণা বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে কাতর স্বরে বলে,“সরি রে! তোকে আমি একটু সময় দিতে পারিনা সোনা।”

_সরি কেনো বলছো আপু? একটুও সরি বলবে না। আমার তোমাদের ওপর কোনো রাগ নেই, কারো ওপর নেই, আমার শুধু ড্যাডের ওপর রাগ, কেমন ভীতু লোক, তোমাকে আর ভাইয়াকে কতটা মুসিবতে ফেলে দিয়ে গেলো,পালিয়ে গেলো। আমার খুব রাগ আপু লোকটার ওপর।

প্রিতম বোনকে আগলে ধরে, ইনু মাথা নিচু করে নেয়। প্রণমি বলতে থাকে,“আজ থেকে আমি একটু সাহসী হতে চাই আপু। পৃথিবীটা খারাপ মানুষে ঠাশা, তেমনি আমাকে সহানুভূতি দেখানোর মানুষও তো আছে তাই না? আমি নিজেকে অভ্যস্ত করতে চাই সবকিছুর মাঝে। আমি আজ যাবোই যাবো গানের ক্লাসে। তোমরা প্লিজ যাও।”

_______

চারটা থেকে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে শহরে। ছায়ানটের বারান্দায় চিন্তিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মিস জেনি। আজ সকাল থেকে যে রোদ সে পেয়েছে তাতে ভাবতেও পারেনি এমন বৃষ্টি হবে,ওয়েদার ট্র্যাকার বলেনি কিছু। প্রণমি মামনিকে নিয়ে ঝামেলায় পরতে হবে খুব বুঝতে পেরে তার চিন্তা বাড়ছে। প্রেরণা আর প্রিতম ট্রেনে বসে দুবার কল করেছে,যদিও তাদের নিশ্চিন্ত করে দিয়েছে মিস জেনি। ক্লাস শেষে প্রণমিকে তার এক ব্যাচমেট এগিয়ে আনে মিস জেনির কাছে। প্রণমি তাড়া লাগিয়ে বলে,“চলুন মিস জেনি,আজ ভাবী একা বাড়িতে। আমাদের তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।”

ছায়ানটের সামনে, বিপরীতে নিতিন কাকার চায়ের দোকানে আজ লোক নেই, এখনও বেলা গড়ায়নি দেখে অথবা বৃষ্টি। এই দু'টো কারণ হতে পারে। রাস্তা ফাঁকা,কিছু ক্যাব যাচ্ছে মাঝেসাঝে। নিতিন কাকা টি মেকারে জল ফুটতে দিয়েছে অযথা,এখন তার মাছি মারা ছাড়া অন্য কোন কাজ নেই যেন। বৃষ্টি কমে এলে খদ্দের আসবে। চেয়ারে বসে যখন ঢুলছিলো নিতিন ঠিক তখন আরওয়ানভফাইভের লেটেস্ট মডেলটা এসে হুট করে থামলো তার স্টলের সামনে,রোজকার মতো।

গত একসপ্তাহ ধরে নিতিন খেয়াল করেছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় মিলিয়েও দেখলো কাঁটায় কাঁটায় চারটা পঞ্চান্ন বেজেছে। রোজ ঠিক এই সময়েই আসে ছেলেটা।
গম্ভীর মুখ, কৃষ্ণবর্ণের, লম্বা দেখতে, মার্জিত আচরণ, কোনো বড়লোক বাড়ির ছেলেই হবে সম্ভবত, পায়ের জুতোর ব্র্যান্ড দেখে বুঝেছে নিতিন। তবে ছেলেটার নাম জানে না, জিজ্ঞেস করা হয়নি কখনো পরিচয়। ভদ্রলোক,বড়লোক খদ্দের রোজ পাঁচ মিনিটের মতো বসে,তিনকাপ চা খেয়ে চলে যায়, তার নাম জানতে চেয়ে কি লাভ! তবে নিতিন খেয়াল করেছে ছায়ানট একাডেমীর দিকেই তাকিয়ে থাকে ছেলেটা পুরোটা সময়।

বাইকটাকে ছাউনীর নিচে রেখে রেইনকোট সামলে ইরফান নেমে হেলমেট সরিয়ে চওড়া হাসলো নিতিনের দিকে চেয়ে, নিতিনও হেসে বলল,“সেই বৃষ্টি মাথায় নিয়েও এলে।”

ইরফান হেসে বললো,“আপনার চা অসাধারণ মামা। বিকেলটা দারুণ হয়ে যায়।”

হেলমেট একটা টুলের ওপর রেখে পাশের টুলে বসলো ইরফান,তার দৃষ্টি ছায়ানটের গেটের দিকে, ঠিক পাঁচটায় ছুটি হবে।

নিতিন তা বানিয়ে ইরফানের হাতে দিতেই ছায়ানট একাডেমী ছুটি হলো।

মিস জেনি আর প্রণমি একটা ছাতা নিয়ে গেট পেড়িয়ে কোনমতে যাত্রীছাউনীতে এসে দাঁড়ায়, ছাতাটা প্রণমির টিচার নিখিলেশ বড়ুয়া দিয়েছেন।
একটার পর একটা ক্যাব আসছে,যাচ্ছে, অথচ কোনো ক্যাব ফাঁকা নেই। মিস জেনি কোনো রাইডার বুক করতে পারলেন না বৃষ্টিতে।
প্রণমিকে ছাতা হাতে দাড় করিয়ে রেখে সামনে এগিয়ে আশেপাশে দেখছে তাই।

আজ প্রণমির গায়ে একটা কালো কামিজ,পাজামা,ওড়না। সারা অঙ্গে কালো জরিয়ে দূর থেকে মেয়েটা সাদা মুক্তা পাথরের মতো ফুটে আছে। পথচারীদের নজর ক্ষনিকের জন্য থমকাচ্ছে মেয়েটা।

ইরফান চুপচাপ চায়ের কাপে চুমুক বসিয়ে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে ওকে দেখছে। আর নিতিন দেখছে ইরফানকে,বলছে,“তোমার বেশভূষায় মনে হয় অফিস থেকে আসো, তুমি কোথাও চাকরি করো বাবা?”

_হু।
এক হাতে একটা জ্বলন্ত সিগারেট, চায়ের কাপে চুমুক বসিয়ে প্রণমির দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে ইরফান জবাব দেয়।

ওদিকে মিস জেনি যাত্রীছাউনির একপাশে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে একটা ক্যাব থামানোর চেষ্টায়। ঠিক তখনই মডেল স্কুল রোড থেকে আগত এক বাইকার হুঁশ করে তার সামনে থেকে চলে যাওয়ার সময় তার হাতের পার্সটা ধরে হেঁচকা টান লাগায়।

ঘটনাটা ঘটেছে ইরফান এবং চা দোকানির চোখের সামনেই,এতো দ্রুত ঘটেছে যে কেউ বুঝতেও পারেনি। মিস জেনির চিৎকারে ইরফান তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ায়। উঠে দাঁড়ায় চায়ের দোকানী।

ঝুম বৃষ্টিতে দেখতে পেলো কপালে হাত চেপে নিচে পরে আছে মিস জেনি। প্রণমি মুখ দু'হাতে চেপে কিছুটা দূরে আ'ত'ঙ্কি'ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে না কিছু, শুধু চেঁচিয়ে বললো,“কি হয়েছে মিস জেনি?”

ছিনতাইকারী পার্সটা নিতে পারেনি যদিও,তবে টান লেগে ধুপ করে পরে গিয়ে কপাল ফেটেছে নানা রোগে জর্জরিত ভদ্রমহিলার। খুব আহত হয়েছে।

প্রণমি খুজে পাচ্ছে না তাকে, দু'হাতে হাতরে চেঁচিয়ে উঠছে বারবার,“কি হয়েছে মিস জেনি কোথায় আপনি? কি হয়েছে বলুন।”

গলগল করে রক্ত ঝরছে,মিস জেনি কাতরাতে কাতরাতে কোনোমতে ডাকলো,“প্রণমি মামনি।”

_হ্যা,এই তো আমি। আপনি বলুন কি হয়েছে!

কেঁদে ফেলে প্রণমি। আশেপাশে একটা লোক নেই, প্রণমি বুঝতেও পারছে না আসলে। মিস জেনি এখন কোনো জবাব দিচ্ছেন না।

ইরফান নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর চায়ের কাপটা রেখে হাতের সিগারেটটা ফেলে পা দিয়ে পিষে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে নামে। চা দোকানি নিতিনও বিপদ দেখে একটা ছাতা মাথায় নিয়ে নামে। লোকটা পঙ্গু,ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটছে।

প্রণমি কাঁদছে, তার হাতে ছাতা, পার্সটা মিস জেনির কাছে, হাতে থাকলে ওয়াচটা বের করা যেতো। এখন সেটাও পারছে না, শুধু চেঁচিয়ে বলছে,“এখানে কেউ আছেন? হেল্প মি।”

আবারও কাঁদল প্রণমি। সে নিজের ব্যর্থতা দেখে কাঁদছে। প্রকৃতি আবারও বুঝিয়ে দিয়েছে প্রণমি তুমি সত্যিই অসহায়।

ইরফান এগোচ্ছে ওর দিকে, দু'টো ঈগল চোখের দৃষ্টি প্রণমির ফরসা,ক্রন্দনরত মুখটাতেই নিবদ্ধ, যেতে যেতে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ইরফান বললো,“শাআলা এরা নিজেরাই চায়না আমি ভালো হই।”

আশপাশটা সিগারেটের কড়া গন্ধে ভরে যেতেই প্রণমি নাক কোচকালো, ভয়ার্ত কন্ঠে ডাকলো,“কে?”

চায়ের দোকানী এগিয়ে এলো, ইরফান প্রণমির সামনে দাঁড়িয়ে, ঠান্ডা স্বরে জবাব দিলো,“আমি তোমার বেয়াই ইরফান মির্জা।”

আ'ত'ঙ্কি'ত প্রণমির চোখ দুটোতে কেমন বিস্ফোরণ হয়। একপা পিছিয়ে যায়, পর পর আবারো ডাকে,“মিস জেনি।”

ইরফান শান্ত স্বরে জবাব দিলো,“অচেতন হয়ে গিয়েছে।”

মুখটা চেপে ধরে প্রণমি চোখ ঝাপসা করলো। তারপর আবার মুখটা কঠিন করে ইরফানকে উদ্দেশ্য করে বললো,“কি চাই? চাই কি!”

ধমক প্রণমির কন্ঠে। ইরফান বললো,“কেউ নেই কোথাও,হেল্প লাগবে?”

বিষিয়ে উঠলো প্রণমির মনটা। চেঁচিয়ে বললো,“এখানে কি আপনার? কেন এসেছেন?”

_এটা পাবলিক প্লেস তাই। দ্রুত বলো, ওনার কপাল ফেটেছে, হেল্প লাগবে?

_না।

এমন জোরে চেচালো প্রণমি, ইরফান দুকান চেপে ধরল নিজের। প্রণমি চেঁচিয়ে বলতে লাগলো,“কখনোই না, কখনোই না।”

তারপর প্রণমি আশেপাশের লোকজনকে উদ্দেশ্য করে চেঁচায়,“কেউ আছেন। আছেন এখানে?”

নিতিন নরম গলায় বললো,“মা আছি, তোমার মাকে হসপিটালে নিতে হবে ইমার্জেন্সি।”

প্রণমি ভরসা পেলো, কেঁদে বললো,“আংকেল আপনি আমায় একটু সাহায্য করুন না।”

নিতিনের মুখটা অন্ধকার হয়ে গেল হুট করে। ইরফান প্রণমির দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে বলে,“উনি তোমাকে হেল্প করতে পারবেন না ‌। উনি নিজেই পঙ্গু।”

ঘনঘন শ্বাস ফেলছে প্রণমি। ইরফান চুপচাপ নিজের ফোনটা বের করে ইনুকে কল করে লাউড স্পিকার অন করে বললো,“তোর হাজবেন্ড কই?”

_আপুকে নিয়ে দেশের বাড়ি গিয়েছে কেন?

_শোন চেঁচামেচি করবি না, মিস জেনির সামান্য এক্সিডেন্ট হয়েছে, আমি হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি, তোর ননদ আমার কাছে আছে, দুশ্চিন্তার কিছু নেই।

ইনায়ার মনে হলো গোটা আকাশটাই তার মাথায় ভেঙে পরলো, ভয়ে আতঙ্কে তার হাত পা কাঁপতে লাগলো ঠকঠক করে।

চেচালো ইনু,“তুমি ওখানে কি করছিলে!”

_চা খাচ্ছিলাম। আত্মীয় দেখে হেল্প করতে এসেছি, এখন কলটা রাখ, সিটি কেয়ার হসপিটালে আয়,ফাস্ট। এসে তোর ননদকে সামলা!

প্রণমি কাঁদছে, চুপচাপ দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে কাঁদছে।

ইরফান একটা অ্যাম্বুলেন্স ডেকে নিলো। সিটিকেয়ার হসপিটাল এখান থেকে পাঁচ মিনিটের মতো দূরে। মিস জেনিকে একজন নার্স তুলে নেয়।

ইরফান দেখলো ততক্ষণে প্রণমি কান্না থামিয়ে চোখ মুখ কঠিন করে দাঁড়িয়ে আছে। এবং ইরফান বেশ অবাক হলো যখন দেখলো প্রণমি নির্বিকার, ইরফানের কথা মেনে অ্যাম্বুলেন্সে গিয়ে বসেছে চুপচাপ। আর টু টা সাউন্ড করেনি মেয়েটা, অথচ এতো সহজে মানার কথা না মেয়েটির ইরফানের প্রস্তাব।”

ইরফান হতভম্ব ভাব কাটিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে বসে ইনুকে কল করে কথা বলে নিলো আবারও, ইনু ওপাশ থেকে শুধু বলে যাচ্ছে,“ও দাদান! দোহাই তোমার মেয়েটাকে ভয় দেখিও না কোনো! একটু নরম হয়ে কথা বলো ওর সাথে, আমি মুখ দেখাতে পারবো না নয়তো শশুর বাড়িতে। আর ওকে ধমকিও না, আর ওকে....”

ইনুর কথা শেষ হতে না দিয়ে কলটা কাটলো ইরফান, ঘুরে প্রণমির দিকে তাকায়, গালে লেপ্টে আছে চোখের পানি, ইরফান দেখলো কিছুক্ষণ, পরপর অতিরিক্ত নম্র কন্ঠে আহাম্মকের মতো বলে উঠলো,“এতক্ষণ তো ভয় পাচ্ছিলে। এখন ভয় করছে না আমাকে?”

প্রণমি দাঁত দিয়ে দাঁত চেপে বসে আছে। ইরফান বললো,“তুমি আসলেই সাহসী। ভেরী গুড গার্ল!”

প্রণমি হাসলো তাচ্ছিল্যের হাসি, অতঃপর বললো,“কি জানেন তো! এই পৃথিবীটা আপনার মতো অ-মানুষে ঠাশা। আমি কাকে বিশ্বাস করবো? ভাবলাম আপনার কথাই মেনে নিই, কারণ আপনার আর যাই হোক একটু ভয় ডর ঢুকেছে থানা থেকে ঘুরে আসার পরে। তবে কি জানি! আপনি নির্লজ্জ হলে ভিন্ন কথা! তবে আপনাকে ভয় পাচ্ছিলাম না আমি,আমার বিরক্ত লাগছিলো আপনাকে!”

অ-মানুষ। শব্দটা শুনে ইরফানের মনে হলো কেউ একটা জুতোর বারি মেরেছে তার মুখে। গালটা পুড়ছে বেশ। সে শুধু তাকিয়ে আছে মেয়েটার রক্তিম মুখের দিকে, তীব্র ক্ষোভে ফরসা মুখটা লাল হয়েছে প্রণমির।

চলমান.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 81 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন