ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 82

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৮২
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

ইমার্জেন্সি ইউনিটের লবিতে কালো কামিজ পরিহিতা অর্ধসিক্তা এক কিশোরী মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে । কিশোরী নাকি তরুণী সেটা ভাববার বিষয়, মেয়েটিকে দেখে বয়স আন্দাজ করতে পারছে না আগন্তুকেরা। কালোতে ফরসা মুখটা ঝকমক করছে, যেতে যেতে মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষে একটিবার পলক ফেলতে কসুর করছে না আদুরে বিদেশীনির রূপসী আননে,ওষ্ঠজোড়া কাঁপছে ঠান্ডার প্রকোপে। অল্পবিস্তর ভিজেছে যে!

ইমার্জেন্সি ইউনিটে একজন ডাক্তার এবং নার্স মিস জেনির ট্রিটমেন্ট করছে। বাইরে ওরা দু'জন। ইনায়া এখনও এসে পৌঁছায়নি। ইরফান কাকভেজা হয় ইমার্জেন্সি ইউনিটের বাইরে একটা বেঞ্চিতে বসে আছে। চুপচুপ করে ভেজা চুল বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরছে পানি, গা হিম হয়ে আছে, ফরমাল শার্টটা শক্তপোক্ত শরীরে আঁটসাঁট হয়ে লেপ্টে আছে।

ইরফান গলা থেকে টাইয়ের নট খুলে পেছনে হেলান দেয়। শরীরটা জমে যাচ্ছে ঠান্ডায়, এখন একটা সিগারেট অতি জরুরি হয়ে পরেছে। দু'হাতে প্যান্টের পকেট হাতরে দু'টো ভেজা সিগারেট পেলো যদিও, সেগুলোর দিকে বিরক্তি নিয়ে কয়েকপল তাকিয়ে থেকে দৃষ্টি দিলো প্রণমির দিকে, পরমুহূর্তেই চোখে মুখে সংকোচ নামিয়ে সিগারেট দু'টো ফেললো ওয়েস্টবিনে।
আবারও গাঢ় বাদামী চোখজোড়ার প্রকট দৃষ্টি আছড়ে আছড়ে পরে প্রণমির মুখবিবরে।

সেই কথাগুলো ইরফানের মুখের ওপর বলে দিয়ে সেই যে মেয়েটা চুপ হয়েছে,আর একটা কথাও বলেনি। ইরফানও না। দু'জনের দূরত্ব কয়েক গজের মাত্র, দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা, চোখেমুখে উৎকণ্ঠা নিয়ে।
এখানকার অল্পবয়সী ইনটার্ন ডক্টরগুলো যেতে যেতে হা করে প্রণমিকে দেখছে, দেখছে তো দেখছেই, দূরে গিয়েও ঘুরে তাকিয়ে দেখছে। সে খবর তো প্রণমি রাখে না, সে নিজেকে ওড়নায় জরিয়ে রেখে দাঁড়িয়ে আছে।

ইরফান উঠে দাঁড়ালো, একবার খোজ নিলো নার্সদের কাছে, জানতে পারলো কপালে দু'টো সেলাই লেগেছে, এবং জ্ঞান হয়তো অল্পসময়ের মাঝেই ফিরবে। প্রণমিও শুনলো সেসব। ইরফান ইনুকে কল করলো,ওদিকে তখন একটা ক্যাব পাচ্ছিলো না ইনু এই বৃষ্টিতে, শুধু কাঁদো কাঁদো হয়ে বলছে,“একটু তুমি দেখো দাদান, আমি এক্ষুনি আসছি।”

ফোন কেটে ইরফান চুপচাপ প্রণমির কাছে গিয়ে শান্ত স্বরে বললো,“এখানে চুপ করে পাঁচ মিনিট বসে থাকবে। এক পা সামনে পেছনে,ডানে বায়ে দেবে না। কেউ কথা বলতে এলে বলবে না। আমি আসছি একটু।”

প্রণমি জবাব দিলো না তবে চূড়ান্ত বিরক্তিতে কপাল এমন করে কুঁচকে নিলো, ইরফানের চোখে খুব লাগলো সেটা, আর লাগলো অ-মানুষ ইরফানের মনেও। ইরফান ভাবলেশহীন মুখে চলে গেলো হসপিটালের ক্যান্টিনে। কাঁটায় কাঁটায় ঠিক পাঁচ মিনিট পরে দু কাপ চা নিয়ে ইরফান এলো। চা টা ইরফান সরাসরি প্রণমিকে না দিয়ে একজন আয়ার কাছে রিকোয়েস্ট করে তাকে পাঠালো। আয়া প্রণমিকে বললেন,“নাও তোমার হাজবেন্ড দিয়েছেন চা। খাও।”

কথাটা শুনে ইরফান বেঞ্চিতে বসতে গিয়েও বসে না, চোখ বড় বড় করে আয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে,আর প্রণমি চেঁচিয়ে ওঠে,“উনি আমার হাসবেন্ড না।”

আয়া ভড়কালো, চায়ের কাপটা প্রণমির পাশের বেঞ্চিতে রেখে বললো,“আচ্ছা,আচ্ছা। তোমার বাড়ির লোক দিয়েছে। খাও।”

প্রণমি রাগে ফেটে পরছে ইরফান বুঝতে পারে, আয়া চলে যেতে এবার ইরফান এগিয়ে আসে ধীরে ধীরে, কন্ঠে নম্রতা ঢেলে বললো,“আমি কিন্তু ওনাকে কিছু বলিনি, উনি নিজেই আন্দাজ করেছেন আমি তোমার হাসবেন্ড।”

_আপনি দূরে যান আমার থেকে! আমি এসব শুনতে চাইনা। একটু দূরে থাকুন অনুগ্রহ পূর্বক। ভাবীকে ফোন করুন।
মেজাজী হয়ে উঠছে প্রণমি।

ইরফান এবার একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,“যাচ্ছি! তবে তুমি চা টা খাও। ঠান্ডায় কাপছো! ”

_আর সেদিন বৃষ্টির মধ্যে টেনে হিচরে কিডন্যাপ করে আট ঘণ্টা ভেজা কাপড়ে রেখে মানসিক টর্চার করার সময় এতো আত্মীয় জ্ঞান কোথায় ছিল?

ইরফান মাথা নিচু করে নেয়, খানিক বাদে আবারো প্রণমির চোখে চোখ রাখে, মুখটা আবারও লাল হচ্ছে মেয়েটার, মনে হচ্ছে কাঁদবে আবারও। ইরফান গেলো না, দু'চোখ বন্ধ করে তিন সেকেন্ড কিছু একটা ভেবে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে ওঠে,“দেখো! ভুল মানুষ মাত্রই হয়....”

কথা শেষ করতে দিলো না প্রণমি ওর,বলে ওঠে,“জি জি সব মানুষ এমন ভুল করেই থাকে, একজনকে তুলে নিয়ে জোর জবরদস্তি বিয়ে করে তার সাথে কুত্তার মতো আচরণ করা। এটা ভুল। সব মানুষ এমন ভুল করে। এটা স্বাভাবিক।”

ইরফান ঢোক গিলে নিলো, কুত্তা! সে কুত্তা? এই মেয়ের মুখ চলে খুব, যেমনটা ইরফান এই মেয়েকে ভেবেছে, এই মেয়ে তেমনটা নয়।

প্রণমি বলতে থাকে,“দয়া করে আপনি দূরে যান, আপনি কথা বাড়াচ্ছেন, আমারও রাগ উঠছে। এসব ভাবী এসে দেখলে খুব কান্নাকাটি করবে, তার প্রাণপ্রিয় মেজো দাদানকে আমি কথা শোনাচ্ছি, এসব দেখলে খুব কষ্ট পাবে আপনার বোন। যান।”

ইরফান কিছু সময় চুপ করে থেকে বলল,
_আর যাই বলো কুত্তা বলো না!
ঠান্ডা গলায় ওয়ার্নিং দেয় ইরফান।

প্রণমি শোনে না, জমে থাকা ক্ষোভ বাঁধ ভেঙে বেড়িয়ে এলো, চেঁচিয়ে উঠলো।

_বলবো, কুত্তা,কিডন্যাপার,বদমাশ, অমানুষ, রেপিস্ট......

_চোপ!

খুব কড়া একটা বজ্র ধমকে বিস্ফোরিত চোখ, আ'ত'ঙ্কি'ত মুখ নিয়ে ছিটকে পিছিয়ে যায় প্রণমি। ইরফানের মাথায় হঠাৎ খুব রাগ চাপলো,তার প্রভাবে ডান হাতে রাখা গরম চা ভর্তি ওয়ানটাইম কাপটাকে কুচলে দিলো, শক্ত হাত গরম চায়ে পুড়লো তবে তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ হয়নি ইরফানের। তার রাগী প্রকট দৃষ্টি প্রণমির চোখে, যে মেয়েটা হুট করে, আচানক দু'চোখের পানি ছেড়ে দিয়েছে। কোনো শব্দ নেই, শুধু নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে।

ওটা দেখে ইরফান কেমন নিমিষেই থিতু হয়ে গেলো, হতবিহ্বল হলো, দীর্ঘসময় চুপচাপ তাকিয়ে থেকে আস্তেধীরে, কন্ঠে অতিরিক্ত কোমলতা এনে বলে ওঠে,“প্রণমি। আমি রেপিস্ট নই!”

প্রণমি জবাব দিচ্ছে না, কাঁদছে। ইরফান নিজের চুল টানছে অস্থির হয়ে হঠাৎ, নিজেকে মনে মনে নিজেই বিভৎস কিছু গালি দিয়ে আবারও প্রণমিকে বলে,“লিসেন। যা হয়েছে, সবকিছুর জন্য সরি। সরি প্রণমি। কেঁদো না, আমি ধমক দিয়েছি একটা অন্যকারনে। আচ্ছা এই ধমকটার জন্যও সরি! সরি ফর এভরিথিং! ”

প্রণমি ইরফানের কথা যেন শুনতেই পাচ্ছে না, আবারও তরতর করে রাগ উঠছে ইরফানের, বহুকষ্টে নিজেকে সংযত করে বলে নম্র হয়ে বলে,“অ্যাই মেয়ে!”

থামে না প্রণমি, ইরফান বলতে শুরু করে,“একটা কথা বলবো? একটা সত্যি কথা বলবো? যেটা একেবারেই সত্যি তুমি বিশ্বাস করলেও,আর না করলেও, তুমি বুঝতে চাইলেও আর না চাইলেও।

সত্যি কথাটা হচ্ছে, তোমার ছোটো বেলায় যেটা হয়েছিল প্রণমি, আমি ইরফান কখনোই ওটা রিপিট করতাম না, হ্যা তোমার হাত ধরে টেনেছি তবে ছোটোবেলায় যে ক্ষত তুমি পেয়েছো,ওটা রিপিট
করতাম না । আমি ওভাবে তোমাকে ছুঁই-ই নি ট্রাস্ট মি! আমার শুধু অমানুষগিরি ছিলো, প্রতিশোধ পরায়ণতা ছিলো,জেদ,হিংস্রতা ছিলো তবে......”

_উদ্ধার করেছেন আমাকে! সেদিন অমন ইনটেনশন আপনার ছিলো না,এটা এখন জানিয়ে উদ্ধার করেছেন।

ইরফানের নম্রতা পায়ে পিষ্ট করে চেঁচিয়ে মুখের ওপর বলে দিলো প্রণমি। ইরফান ওখানেই চুপ হয়ে গেলো। প্রণমি চোখ মুছলো। ইরফান বেঞ্চি থেকে চায়ের কাপটা তুলে প্রণমির হাতে ধরিয়ে বলল,“আচ্ছা আমার সরি এক্সেপ্ট করতে হবে না, কিচ্ছু করতে হবে না, শুধু এটা খাও। কাপছো তুমি।”

প্রণমি কাপটা নিলো, মুখে হাসলো তাচ্ছিল্যের হাসি, পরপর নিজের স্বভাব থেকে বেরিয়ে নম্রভদ্র প্রণমি একটা কান্ড করে বসলো। চায়ের কাপের মোটামুটি গরম চা টুকু ছুড়ে মারে ইরফানের দিকে, প্রণমির আন্দাজ বরাবর ঠিক হয়,আজও তাই। চা টুকু আছড়ে পরলো ইরফানের বা গালে,গলায়।

জ্বলে উঠলো ইরফানের গাল, হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে প্রণমির দিকে। ঠিক অমন সময় ইনু এসে এই দৃশ্য দেখে আঁতকে উঠলো, ছুটে যায় ইরফানের কাছে। ওড়না দিয়ে ইরফানের গাল,গলা মুছে নিতে নিতে প্রণমিকে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে,“কি হয়েছে প্রণো?”

ইরফান প্রণমির থেকে দৃষ্টি ফেরায় না,তার দৃষ্টি এখন যারপরনাই শান্ত, সে ক্ষান্ত হয়ে তাকিয়ে আছে ফরসা মুখটাতে,গালের লাল তিলটাতে, একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছে ইরফান।

ইনায়া আবারও প্রণমিকে বললো,“বলো কি হয়েছে প্রণো?”

প্রণমি ভাবীর কথায় জবাব না দিয়ে ইরফানকে বলে,“সরি ইরফান মির্জা। আমিও ভুল করে ফেলেছি। যদিও জেনে শুনে ঠান্ডা মাথায় প্রতিশোধ নিতে করেছি, তবুও এটা ভুল। আর ভুল তো মানুষ মাত্রই হয়! তাইনা?”

ইরফানের ঘোর কাটে না, সে শুধু দেখছে তো দেখছেই মেয়েটাকে। প্রণমি এতক্ষণে সামান্য হাসে,তবে সে হাসি তাচ্ছিল্যের। ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। ইনু কথা না বাড়িয়ে ভাইকে টানছে,“চলো দাদান মুখে পানি দেবে তুমি।”

নিজের যায়গা থেকে একচুলও নড়ে না ইরফান। প্রণমি এবার ভাবীকে কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বলে ওঠে,“তুমি এসেছো ভাবী। ভাইয়াকে কল করো।”

ইনু মলিন মুখে লাল হয়ে যাওয়া গাল দেখছে দাদানের, আবার দেখছে প্রণমিকে। অন্যকেউ হলে থাপড়ে মেরেই ফেলতো ইনু, কিন্তু কাজটা যে প্রণমি করেছে, ওকে কিছু বলতে পারবে না ইনু, আর কখনও বলবেও না, এটুকু বোধ তার আছে।

ইরফান নড়াচড়াও করছে না যেন,শুধু নির্নিমেষ দেখছে কালো সালোয়ার স্যুটে একটা ছোটোখাটো অগ্নিশিখা। যে এভাবে ধুপধাপ জ্বলে ওঠে। ইনু আসার পর থেকে সব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলো, ইশির মতো অতো চালু নয় তবুও সবটা সামলে নিচ্ছে।
প্রণমির হাত ধরে রেখেছে আসার পর থেকে। মিস জেনির জ্ঞান ফিরেছে যদিও,তবে অতটা স্টেবল নয়। ইনায়া এসে ইরফানকে বলে,“দাদান এবার তুমি যাও।”

_পারবি তুই?

_বড় দাদানকে কল করে নিচ্ছি।

_ওওও শীট! দেখেছিস আমিই কল করতে পারতাম দাদানকে, মাথায় আসেনি রে! দাঁড়া কল করছি।

ইরফানকে থামিয়ে দিয়ে ইনু বলে,“না দাদান। তুমি বড় দাদানকে কল করো না!”

_কেন?
অবাক হয়ে জানতে চায় ইরফান। ইনু বলে,“আমি কল করে ডেকে নেবো। তুমি দাদান আসার আগেই এখান থেকে যাও, নয়তো বড় দাদান খুব বকবে তোমাকে।”

ইরফান বোনের দিকে তাকিয়ে আছে। ইনু দূরে বেঞ্চিতে বসে থাকা প্রণমির মুখের দিকে একপলক তাকিয়ে ইরফানকে আবারও বলে ওঠে,“গালে একটু অয়েনমেন্ট লাগিয়ে নিও দাদান।”

হেসে ফেললো ইরফান, ইনু চোখ বড় বড় করে বললো,“হাসছো কেনো?”

_এতে আমার কিছু হয়না। তুই যা তোর ননদের কাছে‌ । আমি যাচ্ছি চুপচাপ।

________

সন্ধ্যা থেকে ভারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে শহরে। ইনশিরাহ ঘরের মধ্যে পায়চারি করছে এখন, এতক্ষণ ঘরটা গুছিয়েছে সে,মানে ঘরের কাটছাঁট বদলেছে, জিনিসপত্র এদিক সেদিক করে। মিঠি মায়ের পিছু পিছু ঘরময় পায়চারী করছে।

ঝুমঝুমির মা কিচেনে, রাতের রান্না করে দিতে এসেছে, বারান্দায় দোলনার ওপরের কুশন গুলোকে ঠিকঠাক করে দিতে দিতে ইনশিরাহ ঝুমঝুমির মাকে বললো,“আজ খিচুড়ি করো। আর শোনো বিফ দিয়ে খিচুড়ি নয়, বিফ আলাদা ভুনা করবে, খিচুড়িটা রাঁধবে আলাদা। তোমার স্যার এভাবে খেতে পছন্দ করেন।”

মিটি মিটি হাসছে ঝুমঝুমির মা। সবটা গুছিয়ে ইনশিরাহর কাছে গিয়ে হাসতে লাগলো নিশ্চুপ। ইনশিরাহ অবাক হয়ে বললো,“হাসছো কেনো এভাবে?”

_স্যারের লাইগা আপনের মোহাব্বত দেইখা হাসতেছি। আমার কি যে খুশি লাগে আপনাদের দেখলে এখন ম্যাডাম।

ইনশিরাহ সামান্য হেসে নিজের কাজ করতে থাকে। ঝুমঝুমির মা বলতে থাকে,“যতদূর শুনছি স্যার বড় হয়েছে ঐ এতিমখানায়, বিয়ার পর আপনার ভোলামন দেইখা আফসোস লাগতো স্যারের জন্য,এতো ভালো মানুষটা বৌয়ের সেবা যত্ন পাইবো না? অক্ষন ভীষণ শান্তি লাগতেছে। এইবার মনে হইতেছে স্যার পরিবার পাইছে। এরপর আর দুই তিনমাস পরে পরিবারে নতুন সদস্য আনার কথা ভাবেন ম্যাডাম।”

_নতুন সদস্য মানে? নতুন সদস্য কে?

_বাচ্চা।

ইনশিরাহ চুপ করে থাকে, ঝুমঝুমির মা বিজ্ঞের ন্যায় বলে,“এখনই আপনার উপযুক্ত বয়স। আর স্যারেরও।”

ইনশিরাহ সরল বোকাসোকা ঝুমঝুমির মাকে বলে,“বাচ্চা নিতে উপযুক্ত বয়স হলেই হয়না ঝুমঝুমির মা। বাচ্চা একটা আবেগ নয় শুধু, একটা রেসপনসিবিলিটি। উপযুক্ত মানসিক পরিস্থিতি দরকার হয়। আমার মনে হচ্ছে আমি এখনই প্রস্তুত নই। একটা বাচ্চা নিলাম দুম করে, তারপর তার টেইক কেয়ার করতে পারলাম না ঠিক করে,এটা তো অন্যায় কাজ আমার মতে। নিজের ক্যারিয়ার টা একটু নেড়েচেড়ে দেখি। তারপর ভাববো বাচ্চার কথা, তখনই ভাববো যখন আমি সম্পুর্ন ভাবে আমার সন্তানের হয়ে থাকতে পারবো, তার প্রতি দায়িত্ব পালনে একটুও যেন গাফিলতি না হয়। এখন আমাকে দেখছো? আমি এখনও ভীষণ অগোছালো।”

ঝুমঝুমির মা ম্যাডামের এতো জটিল কথা বুঝতে পারে না, বাচ্চা নিতে এতো হিসাব নিকাশ করতে হয়? ঝুমঝুমিকে জন্ম দিতে গিয়ে তো সে করেনি! পেটে এসেছে,জন্ম দিয়েছে, দুধ খাইয়েছে,লালন পালন করেছে। কি জানি বাপু শিক্ষিত মানুষের ব্যাপার স্যাপার। এসব ঝুমঝুমির মায়ের মাথায় ঢুকবে না। সে চলে যায় রান্নাঘরে।

রাতের রান্না সেরে ঝুমঝুমির মা যখন চলে যায় তখন সন্ধ্যা সাতটা। ইনশিরাহ বারবার ঘড়ি দেখছে। ইদানিং এসপি খুব রাত করে বাড়ি ফেরে। লাঞ্চ টাইমে একঘন্টা আর রাতে নয় ঘন্টা। এতটুকু সময়ই পাওয়া যায় লোকটাকে।
বাইরে ঝমঝমে বৃষ্টি, বৃষ্টি হলে মুঈনের অসভ্যতামি বেড়ে যায়, ঠেলে ঠুলেও দূরে সরানো যায়না, বাবুই পাখি নিজের বাড়িতে যেভাবে ঘাপটি মেরে থাকে। গোটা রাত ঠিক তেমন কাটে ইনশিরাহর মুঈনের বুকে, ইনশিরাহ ভাবতে ভাবতে হাসলো।

ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে কল দিলো মুঈনের পার্সোনাল নাম্বারে, কলটা কেটে দিলো মুঈন। ইনশিরাহ মজা করে আবারও দিলো, বারবার দিলো। বারবার কলটা কেটেও নয় বারের বার মুঈন কলটা রিসিভ করে। তার দৃষ্টি হাতে একটা কাগজে নিবদ্ধ। ইশি কিছু বলার আগেই মুঈন বলে উঠলো,“কি ব্যাপার! কল কেটে দিচ্ছি তো!”

ইশি একটু থমকায়, পর পর বলে,“কি ব্যাপার এসপি! আজকাল বৌকে ধমকাতেও শিখেছো যে!”

মুঈন চুপ করে গেলো, কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে গলার স্বর খাদে নামিয়ে বললো,“আজ তাড়াতাড়ি ফিরছি। আর আধাঘণ্টা লাগবে।”

ইশি খুশি হয়ে কল কেটে টেবিল সেট করে। একটা সুন্দর বৃষ্টিস্নাত রাতের পরিকল্পনা করে নেয় বসে বসে, বেশ ক'দিন দু'জনে নিবিষ্ট হয়ে সময় কাটানো হয়নি। ইশি আজ নিজে থেকে আমন্ত্রণ জানাবে মুঈনকে, মুঈন এটা ভীষণ পছন্দ করে। ওয়্যারড্রোব খুলে মুঈনের পছন্দের একটা শাড়ি বের করে বড় গলার ব্যাকলেস, স্লিভলেস ব্লাউজের সাথে পরে নিজেকে আয়নায় দেখে হাসতে হাসতে লুটোপুটি খায় সে। কি ইশি আজ কত হ্যাংলা হয়েছে, স্বামীকে খুশি করতে তার কত চেষ্টা।

শাড়ি পরে, গাঁয়ে পারফিউম মেখে পুরো পটের বিবি হয়ে অপেক্ষা করছিলো একা অ্যাপার্টমেন্টে। মুঈন ঠিক আধাঘণ্টা পরেই এলো, অল্পস্বল্প ভিজেছে সে।
দরজা খুলেই দেখতে পেলো তার জন্য অপেক্ষা করছিলো একটুকরো হৃদয় প্রশান্ত করা চাঁদ।
ইশি দাঁড়িয়ে আছে লাজুক হয়ে, মুঈন শুকনো মুখে ইশির পা থেকে মাথা দেখে। ইশি ভ্রু উঁচিয়ে খুনসুটি করে বলে,“কোলে নাও।”

ভেতরে ঢোকে মুঈন। ইশি দরজা বন্ধ করে আশ্চর্য হয়ে বলে,“কি ব্যাপার! কোলে নাও!”

কেমন বাচ্চাসুলভ বায়না, ইশির সরল মুখের দিকে কিছু মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে আস্তেধীরে মুঈন বলে,“আমার ট্রান্সফার অর্ডার এসেছে ইশি!......আচ্ছা একটু পানি দাও, পানি খাবো।”

________

ভীষণ রেগে গিয়েছে ইহান তাজওয়ার মির্জা। হসপিটালে এসেই ইনুকে বকেছে,কেন তাকে আগে জানানো হয়নি। ইনু চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ওদিকে প্রিতম প্রেরণাকে নিশ্চিন্ত করা হয়েছে এখানে ইহান তাজওয়ার মির্জা এসেছে। প্রিতম ইহানের কথা শুনে একেবারেই নিশ্চিন্ত হয়েছে।

মিস জেনিকে আগামীকালই রিলিজ করে দেয়া হবে,তবে আজ রাতটা থাকতে হবে এখানে, তিনটা স্যালাইন চলবে সারারাত।
প্রণমি মিস জেনির কেবিনে তার মাথার কাছে বসে আছে মিস জেনির হাত ধরে। ইনু একটা সোফাতে। ডক্টরের সাথে কথা বলে ইহান কেবিনে ঢুকে বোনের দিকে তাকিয়ে বললো,“এখানে কে এনেছে ওদের? প্রণমি আর মিস জেনিকে হসপিটালে কে এনেছে?”

ঘামছে ইনু, ঢোক গিলছে বারবার, আড়চোখে প্রণমিকে এক পলক দেখে বড় দাদানকে বললো,“এক পথচারী এনেছে দাদান‌।”

প্রণমি চুপচাপ ভাবীর মিথ্যা কথাগুলো শুনছে,তার মুখ ভাবলেশহীন, অবশ্য এসবে তার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। ইহান বললো,“হু। রাত বাড়ছে, এখানে কাউকে থাকতে দেয়া হয়না,নার্স রা আছে। তোরা দুজন অ্যাপার্টমেন্টে একা আজ রাতটা থাকবি কি করে!”

ইনু এবারও ঢোক গিলছে। ইহান কোনোকিছু না ভেবেই বললো,“আমাদের বাড়িতে যাবি?”

ইনু আরেকটা ফাঁকা ঢোক গিলে বললো,“প্রণোকে নিয়ে ওখানে যাবো কি করে দাদান! ওখানে মেজো দাদান আছে তো! প্রিতম আমাকে খুনই করে ফেলবে।”

_ওহহহ শীট! আমার মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।
বলেই দুমিনিট কিছু একটা ভাবলো ইহান। পর পর বললো,“আচ্ছা চল, ইশির ফ্ল্যাটে পৌছে দিই তোদের। আজ রাতটা ওখানে থাক। আমি কাল খুব ভোরে এসে তোদের পিক করে নেবো।”

চলমান......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 82 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন