#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৮৩
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
“ট্রান্সফার অর্ডার এসেছে মানে!”
স্তম্ভিত হয়ে বিস্ফোরিত নেত্রযুগল মেলে মুঈনের গম্ভীর, উদাসীন মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। মুঈনও সরাসরি বৌয়ের চোখের দিকে তাকিয়েছিল।
ইশি আবারও বলে উঠলো,“বলো মানে কি? অর্ডার এসেছে? কেন?”
_ওটা আমারও প্রশ্ন, কজ দেখিয়েছে আমার গাফিলতি, হেডকোয়ার্টার থেকে জবাব পাইনি ইশি।
গাফিলতি? ইশি লোকটাকে দেখছে, তার হঠাৎ এতো খারাপ লাগছে মানুষটার জন্য, এটা একটা অত্যন্ত বড় দুঃসংবাদ মুঈনের জন্য। মুঈন চোখ নামায় না, ইশি ছুটে গিয়ে পানি এনে মুঈনের হাতে পানি দেয় একগ্লাস। পানি খেয়ে গ্লাসটা ইশির হাতে দিতেই ইশি বললো,“কোথায় ট্রান্সফার করেছে?”
_বান্দরবান।
অস্ফুট স্বর জবাব দিতেই দ্বিতীয় দফায় চমকে ওঠে ইনশিরাহ। বান্দরবান? সরাসরি বান্দরবান? এটা কেমন জুলুম। এর যৌক্তিকতা কোথায়?
একটার পর একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে ইশি আহত গলায়। মুঈন ভাবলেশহীন মুখে কিছু মুহূর্ত ইশিকে দেখে, কোনো জবাব না দিয়ে সোফাতে বসে এক হাতে টেনে নেয় ইশিকে, কোলে বসিয়ে গম্ভীর উদাস মুখে ইশিকে ভালো করে খেয়াল করে বলে,“এভাবে আমার জন্য সেজেছিলে তুমি?”
ইশি মলিন মুখ করে উপর নিচে মাথা ঝাঁকিয়ে জবাব দেয়। মুঈন একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে ইশির নরম দু'টো হাত ধরে অপরাধীর ন্যায় বললো,“আ'ম সরি! তোমার এই সময়টা নষ্ট করে দিলাম, বাট ট্রাস্ট মি আই ওয়াজ ডেসপারেট টু শেয়ার উইদ ইয়ু।”
ইশি তৎক্ষণাৎ হাত সরিয়ে স্বামীর দুগালে রেখে বলে,“এবং আমি সরি, ভীষণ সরি আমি , তোমার এই মুহুর্তে মন খারাপ দূর করার উপায় আমার জানা নেই ফরাজী! আমি কি করতে পারি?”
ফোন বেজে উঠলো ইশির,কলটা রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে ইহান অনেক কিছু বললো ইনশিরাহকে। কল কেটে মুঈনের দিকে তাকিয়ে বললো,“ইনু আর প্রণো আসছে। মিস জেনি হসপিটালে। আজ রাতটা আমার এখানে থাকবে।”
_হ্যা তো আসতে বলো।
_বলেছি!
ইশি মুঈনের দিকে এগিয়ে যায়, জরিয়ে ধরে শক্ত করে, ভীষণ নম্রস্বরে বলে,“মুঈন আমি কি করবো বলো! তোমার জন্য আমার ভীষণ খারাপ লাগছে। এখন কি হবে মুঈন?”
বিক্ষিপ্ত মনটা এমন নরম স্বরে প্রশান্ত হয় খানিকটা, ইশিকে আগলে নিয়ে মুঈন জবাব দিলো,“আমি প্রেয়ার দেবো একটা, তাতেও যদি কাজ না হয় যা হবে দেখা যাবে। তার আগে এই শাড়ি, ব্লাউজ পাল্টে এসো, এই সাজ টুকু শুধু আর শুধুমাত্র আমিই না হয় দেখবো, ইনুকে দেখিয়ে কি লাভ?”
চূড়ান্ত মন খারাপেও লজ্জা পায় ইনশিরাহ । উঠে গিয়ে শাড়ি পাল্টে পালাজো-টিশার্ট পরে আসে। মুঈন ইউনিফর্ম পাল্টে নেয়। ইশি মুঈনের ট্রান্সফার অর্ডারটা দেখলো ভালো করে, আচানক বুকটা কেমন খা খা করে ওঠে, বান্দরবান? যদি মুঈন কিছু করতেই না পারে ,এভাবে এতোটা দূরে, সবার থেকে আলাদা হয়ে যাবে ওরা দু'জন!
মুঈন এসে ওর কাঁধে একটা হাত রেখে বললো,“মেহমান আসছে বাসায়, এখন এই টপিক টা অফ করো।”
রাত এগারোটা নাগাদ ইহান ইনু আর প্রণমিকে ইশির অ্যাপার্টমেন্টে রেখে যায়। ইনু ফোন করে প্রিতমের থেকে পারমিশন নিয়ে নিয়েছিল এ ব্যাপারে।
মুঈন-ইশি নিজেদের দুঃসংবাদ চেপে রেখে আপাতত অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত। অ্যাপার্টমেন্টে একটাই বেড। ইনশিরাহ নিজেদের বেডরুম টাতে নতুন চাদর বিছিয়ে ছেড়ে দেয় ইনু আর প্রণমিকে। প্রণমি রাজি হয়নি এভাবে স্বামী স্ত্রীর ব্যক্তিগত বেডরুমে থাকতে। ইনশিরাহ অনেকবার বলার পরেও রাজি হয়নি, ওদের তাই গেস্ট রুমে ম্যাট্রেস বিছিয়ে দিয়ে ইনশিরাহ রুমে এসে থমকে দাঁড়ায়।
মুঈন ল্যাপটপের সামনে বসে একটা প্রেয়ার লিখছিলো। তার ট্রান্সফার অর্ডারটা আটকে দিতে।
________
রাতে প্রিতম প্রেরণাদের পৌঁছে দিয়ে ঘন্টা চারেকের মতো বিশ্রাম নিয়ে ভোরের ট্রেনেই ঢাকা ফেরে।
ইহানও খুব ভোরে ইনু আর প্রণমিকে ইশির অ্যাপার্টমেন্ট থেকে তুলে নেয়, ইনশিরাহও গিয়েছে তাদের সাথে মিস জেনিকে দেখতে।
হসপিটালে ঢুকে নিড়িবিলিতে প্রিতম যখন শুধুমাত্র বৌ আর বোনকে পেলো,শুরুতেই প্রিতম ইনুকে বললো,“কিভাবে কি করলে! বলো। কি হয়েছিলো,এবার বলো! কে এনেছে ওদের এখানে?”
বারবার ঢোক গিলছে ইনু। সে টের পাচ্ছে প্রিতমকে সে মিথ্যা বলতে পারবে না, তবে দাদানের নাম শুনলে এখানে কি হবে সেটা ভেবে ইনুর ফরসা মুখটা শুকিয়ে একটুখানি হলো।
ইনুর নির্লিপ্ততা টের পেয়ে প্রণমি চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর নিজেই বলে ওঠে,“ভাইয়া।”
প্রিতম ঘাড় ঘুরিয়ে বোনের দিকে তাকাতেই প্রণমি বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলে,“একজন পথচারী এনেছে আমাদের এখানে। সে চলে গিয়েছে।”
ইনুও তাকায় প্রণমির মুখের দিকে। তীব্র গ্লানি জেঁকে ধরে মুহুর্তেই তাকে। এই মেয়েটাও মিথ্যা বললো? কেন? কিসের জন্য?
________
বরাবর প্রিতমই শুদ্ধকে নিয়ে যায় ওয়াসীতের কবর জিয়ারত করাতে। এবার তা হলো না। আজ সারাদিনে প্রেরণা শুদ্ধর জন্মনিবন্ধন সনদ নিয়ে ইউপি অফিসে ছোটাছুটি করেছে, ইউপি চেয়ারম্যানকে পায়নি যদিও। শুদ্ধ ছিলো প্রেরণার ফুপির কাছে। বিকেলে শুদ্ধ,ফুপি আর আঠারো বছর বয়সী ফুফাতো ভাইকে নিয়ে প্রেরণা ওয়াসীতের পারিবারিক কবরস্থানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
ওয়াসীত শরিফ এবং প্রেরণার ফুপি মুবিনা একই এলাকার, পাশাপাশি দু'টো ওয়ার্ডের মানুষ। এখানে ওয়াসীতের একটা বাংলো ছিল,যেটা প্রেরণা বিক্রি করে এলাকা ছেড়েছিলো, আছে শুধু ওয়াসীতের পৈতৃক সূত্রে পাওয়া অনেক জমি, সেগুলো সেভাবেই পরে আছে।
ওয়াসীত ছিলো এতিম,তার কোনো ভাই বোন ছিলো না, তার চাচারা ভীষণ লোভী এবং চতুর লোক, যারা বর্তমানে ওয়াসীতের জমিজমা দখল করে নেওয়ার বহু প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আড়ালে আবডালে, শুধুমাত্র প্রেরণার জন্য পারছে না।
এই এলাকার নামকরা বাড়ির নাম শরীফ বাড়ি, পাশাপাশি আঠারোটা বাংলো। প্রেরণা এই বংশের বৌ ছিলো,তবে কখনো সমাদর পায়নি এই মানুষগুলোর থেকে। ওয়াসীতের মৃত্যুর পরে যেন মানসিক ভাবে প্রেরণা আরও আঘাত পাচ্ছিলো এই লোকগুলোর থেকে,তাইতো সব ছেড়ে ছুড়ে চলে গিয়েছিল।
কবরস্থান বাংলো গুলোর থেকে খানিকটা দূরেই ছিলো, প্রেরণা সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারো সাথে দেখা করবে না,তাদের হুল ফোটানো কথা প্রেরণার আর সহ্য হয় না।
প্রেরণা আর এগোলো না,দূর থেকেই সাদা মার্বেল পাথরে বাঁধানো পারিবারিক কবরস্থানের গেট চোখে পরতেই পা থমকালো ভদ্রমহিলার, আর সামনে এগোনোর সাহস, মানসিক শক্তি নেই তার, প্রতিবারের মতো সে ধপ করে বসে পরে লাল পাথরের বেঞ্চটাতে, আর যেতে পারবে না সে, ফুফাতো ভাই রবিনকে বললো,“শুদ্ধকে নিয়ে যাও,ওর পাপার কবরের কাছে।”
প্রেরণার কন্ঠস্বর স্বাভাবিক। মুবিনা আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন। শুদ্ধ রবিন মামার হাত ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, প্রেরণা ছেলেকে টেনে কাছে নিয়ে চুমু খেয়ে বললো ,“মনে আছে কি বলতে হবে?”
মাথা নাড়ায় শুদ্ধ। তার মনে আছে। প্রেরণা জিজ্ঞেস করে,“কি?”
_রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানী ছাগীরা।
দু'চোখ বন্ধ করে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে প্রেরণা, সে বহু আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ছেলের সামনে ওর পাপার জন্য কাঁদবে না,আজও তাই হলো,সে তার কথা রাখলো।
রবিন এগিয়ে যায় শুদ্ধকে নিয়ে তার পাপার কবরের কাছে। এদিকে ঠিক তখন প্রেরণার সাথে দেখা হয়ে যায় ওয়াসীতের চাচা মুত্তালিবের। প্রেরণাকে এভাবে দেখতে পেয়ে বিস্মিত হয়ে বলে,“ওমা বৌমা যে। ভালো আছো?”
_জি ভালো,আপনি ভালো আছেন?
কথায় কথায় মুত্তালিব তুললেন নানা অভিযোগ,প্রেরণাকে দোষী করলেন, তাদের বংশের নাতীকে প্রেরণা কেন এতো তাদের থেকে আড়াল করে সেই নিয়ে নানা অভিযোগ তাদের। প্রেরণা জবাব দেয়না।
মুত্তালিব সব আলোচনা নিয়ে শেষে ফিরলেন ওয়াসীতের জমিতে,প্রেরণাকে বোঝাতে চাইছে জমিগুলো প্রেরণা যাতে অল্প দামে বিক্রি করে দেয়।
তখন প্রেরণা ক্ষিপ্ত হলে জানিয়ে দেয়,“ওসব কিছু শুদ্ধর বাবার ছিলো, এখন সব কিছু শুদ্ধর। শুদ্ধ বড় হোক, তারপর ও বুঝবে কি করতে হবে, আর বাংলোটা বিক্রি করে ঐ টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট আমি শুদ্ধর নামেই কিনেছি। ও বড় হোক, মানুষ হোক, তখন বাবার পৈতৃক জমিতে আরেকটা বাংলো আমার ছেলে তুলবে। আপনারা এতো দুশ্চিন্তা করবেন না চাচা।”
মুখটা অন্ধকার করে মুত্তালিব প্রেরণাকে অনেক সাধলো বাড়িতে ঢোকার জন্য, প্রেরণা গেলো না। শুদ্ধকে নিয়ে ওখান থেকে তাড়াতাড়ি চলে যেতে পারলেই যেন বেঁচে যায়।
_______
বিকেলে মিস জেনিকে নিয়ে অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছানোর পরে প্রিতম গেলো বাজার করতে, প্রণমি তখন মিস জেনির পাশে বসে ছিলো। ইনু এক বাটি স্যুপ এনে মিস জেনিকে দেয়।
মিস জেনি তার কেউ না সত্যি বলতে, তবে এই মহিলা প্রতিদিন কি ভীষণ আদরে রাখে ইনুকে, তাই ইনু খুব সেবা করছে মিস জেনির। ইনু ভাবে তার শাশুড়ি থাকলে হয়তো এমন আদর সে পেতো।
তাদের দুই বোনের কপালে শশুর শাশুড়ি নেই, ইনুর যা ননদ আছে দু'টো, ইশি আপুর তাও নেই।
মির্জা বাড়ি থেকে খবর এসেছে মাম্মা আর বড়মা,মেজো মা আসছে মিস জেনিকে দেখতে, ওনারা সবাই টাঙ্গাইল থেকে আজ সকালেই ফিরেছে, খুব গন্ডগোল লেগেছিল নাকি বিয়ে বাড়িতে, বিস্তারিত শোনেনি ইনু।
বাড়ির মেইডকে কি কি রাঁধতে হবে বলে ইনু চলে যায় প্রণমির জন্য চা আনতে, গতকাল ভিজে গলা বসিয়েছে আবারও,সেটা সারতে হবে চা খেয়ে।
কল বাজছে,ইনু এসে নিজের ফোনটা তুলে দেখলো ইরফানের নাম্বার। খানিকটা আড়ালে গিয়ে কলটা রিসিভ করে ইনু বললো,“হ্যা দাদান বলো।”
_মিস জেনি কেমন আছেন?
_ভালো, স্বাভাবিক কথাবার্তা বলছেন, ডায়াবেটিকসের পেশেন্ট, ঘা শুকাতে সময় লাগবে বোঝোই তো।
ইরফান কিছু মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললো,“তুই কেমন আছিস। তোর বর কিছু বলেছে আমাকে নিয়ে? আমি ওদের হসপিটালে এনেছি তাই?”
_না, ও না জানে না দাদান। আমি বলিনি।
_আর তোর ননদ? সেও বলেনি? নালিশ করেনি ভাইয়ের কাছে?
_না,প্রণমিও লুকিয়ে গিয়েছে কথাটা।
কলিং বেল বেজে ওঠায় ইনু তাড়াহুড়ো লাগিয়ে কল কাটার আগে বললো,“আচ্ছা রাখছি দাদান, প্রিতম এসেছে বোধ হয়।”
কল কাটার পরেও ইরফান বোকার মতো ফোনের স্ক্রিণের দিকে তাকিয়ে থাকে। পর পর কন্ঠে বিস্ময় এবং অবিশ্বাসের সুর মিশিয়ে বলে ওঠে,“কথাটা লুকিয়ে গিয়েছে জ্ঞানী আপার আদরের বোন!”
_________
দূর্ঘটনা ঘটেছে, সামিন ইয়াসার শহরে ফেরার পরে মেয়ের থেকে জানতে পেরেছে। জামাইয়ের ওপর খানিকটা মনক্ষুণ্ণ হয়েছে সামিন, এতো গুলো ঘন্টার মাঝে তাকে একটিবার ফোন করে জানাতে পারলো না মুঈন?
ওরা সবাই,ইহান তাজওয়ার মির্জা সহ মির্জা বাড়ির সবাই চলে এসেছে ইশির কাছে। কিন্তু যখন মুঈনের মুখটা দেখলো, সামিনের সব অভিমান জল হয়ে গেলো, ছেলেটার মন খারাপ চেহারায় নামিয়েছে, অথচ কত প্রানোচ্ছল ছেলেটা শশুর শাশুড়ির সাথে।
ইশির ড্রয়িং রুমে শশুর শাশুড়িদের সামনে মুঈন বাসার পোশাক, ট্রাউজার এবং টি-শার্টে বসে আছে ভদ্র মতন। এতক্ষণ চলেছে বিশদ আলোচনা, মুঈনের প্রেয়ার ধোপে টেকেনি তাই। ট্রান্সফার বহাল থাকবে।
ইনশিরাহর মন ভালো নেই, তবুও সে বাপের বাড়ির লোকজনের জন্য কিছু স্ন্যাক্স রেডি করছে।
জামাইয়ের শান্ত মুখবিবরের দিকে চেয়ে সামিন একটাই কথা বললো,“দেখো, আমি কিন্তু তোমার এই ট্রান্সফার টা খুব সহজেই আটকে দিতে পারি বাবা! তুমি ভেবে দেখো।”
মুঈন প্রথম থেকেই রাজি না ব্যাপারটিতে, কাড়ি কাড়ি টাকার ব্যাপার। তার কাছে আপাতত সে সামর্থ্য নেই। গতকাল রাতে এ নিয়ে ইশির সাথে সামান্য কথা কাটাকাটি হয়েছে, ইশি তারপর ঠান্ডা মাথায় প্রস্তাব দিয়েছিলো তার মোহরানার টাকা টা ব্যাবহার করতে, সেবার ঘরের ফার্নিচার কিনতে ব্যাবহার করার কথা বললে তখনও মুঈন না খোশ হয়েছিল, এবারও তাই, এবার ইশির ওপর কিছুটা বিরক্তও হয়েছিল মুঈন, রেগে গিয়েছিলো হঠাৎ, শেষটায় ইশি আর জেদ করেনি বিষয়টা নিয়ে, টাকা পয়সার বিষয় নিয়ে অন্তত সে মুঈনের ইগো হার্ট করতে চায়না।
আলো খুব ভয়ে ভয়ে জামাইকে বলছে,“দেখো তোমার শশুর খুব একটা ভুল বলছেন না, তুমি রাজি হও।”
ইলহাম মির্জা আর ইশমাম মির্জারও একই বক্তব্য। মুঈন খুব সুন্দর ভাবে সবার পরামর্শ পাশ কাটিয়ে গেলো, ইহান বড়দের থেকে আড়ালে নিয়ে ধৈর্য্য ধরে মুঈনকে বোঝালো। কোনো কাজ হয়নি, আপাতত মুঈন শ্বশুরের অর্থের জোরে কিছুই করবে না, ইহান শেষটায় বললো,“অহেতুক জেদ করছো তুমি! এর পেছনে বড়দের ভালোবাসাটা দেখলে না?”
মুঈন সামান্য হেসে বললো,“গিয়ে ছমাস থাকি, তারপর আবার ট্রান্সফার নিয়ে আশেপাশের কোনো জেলায় চলে আসবো। আপাতত সবাইকে তুমি একটু বোঝাও। আমার দ্বারা হবে না এটা ইহান।”
একসপ্তাহ পরে মুঈন চলে যাবে বান্দরবান। এদিকে বড়রা সবাই চিন্তিত। জামাইয়ের ওপর এইবার আলো সামিন খানিকটা বিরক্ত হলেও মানিয়ে নেয়, সারাজীবন পরিশ্রম করা ছেলেটা হুট করে শ্বশুরের অর্থনির্ভর হবে এটা ভাবাও মূর্খামি।
মেয়ে জামাইকে নিয়ে আবারও জরুরি আলোচনায় বসলো বাড়ির বড়রা। প্রসঙ্গ হচ্ছে ইশি। মুঈন বান্দরবান চলে গেলে ইশি কি করবে সেটা জানতে চাইছে সামিন।
মুঈন স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ইশমাম মির্জা ইশিকে বললো,“বলো বড় আম্মা, কি করবে?”
ইশি একটিবার ভাবলোও না, সাথে সাথে জবাব দিলো,“আমি ওর সাথে যাবো ছোটো বাবা, আর কি করবো?”
_কিন্তু তুই একটা চাকরি করিস ইশি।
ইহানের কথায় ইনশিরাহ চুপ হয়ে যায়, পর পর বলে,“ আপাতত আমি যেতে চাচ্ছি। আমার রেজিগনেশন দিয়ে দেবো। আমি ওখানে কিছু একটা ট্রাই করবো না হয়।”
সবাই হা করে বাড়ির বড় মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। মুঈন একটি শব্দও বলেনি, সে চুপচাপ ইশির কথা শুনছে।
সামিন মেয়ের কথা শুনে খুশি হয় ভীষণ, তবুও তার পিতৃসত্তা আবেগী হয়ে বলে ওঠে,“সবকিছু এতো ইজি হবে না আম্মা, তুমি চাইলে এখানে থেকে কাজটা শিখতে পারো,আর তাছাড়া ছমাস গিয়ে মুঈন ওখানের পরিবেশ বুঝুক, তুমি না হয় পরে যেও।”
আলো,রিতু,পরী কেউই কথা বলছে না আর। একেকজনের একেক মত থাকবেই, শুধু জামাই আর মেয়ের ব্যক্তিগত ব্যাপারে পরামর্শ দিতে ইচ্ছে করছে না তাদের।
ইশি মুঈনের চোখের দিকে তাকায়, মুঈন তখনও নিশ্চুপ, শ্যামলা রঙের সুন্দর মুখটা, নিকষ কালো চোখের দৃষ্টি দেখে ইশি আজও বুঝে নিলো মুঈন চাচ্ছে ইশির যেটা ভালো লাগবে সেটা করতে, কাউকে খুশি করে একটা কাজ করার প্রয়োজন নেই যদি না সেটা মন থেকে আসে, একটা মহানগরীর মেয়ে হুট করে স্বামীর হাত ধরে বান্দরবান গিয়ে থাকবে? তাও ইশির মতো খুঁতখুঁতে, স্বাধীনচেতা মেয়ে, মুঈন এটা নিয়ে সন্দিহান ছিলো কিঞ্চিৎ।
কিন্তু ইশি প্রফুল্ল চিত্তে বাবা,মা,চাচা,চাচী, বড় ভাইয়ের সামনেই মুঈনের দিকে ফিরে স্পষ্ট স্বরে বললো,“আমি তোমার সাথে যেতে চাচ্ছি অ্যান্ড দ্যাটস ফাইনাল!”
আলো এখন আর একটা কথাও বলেনা, শুধু পরী কন্ঠে আদর মেখে বলে ওঠে,“মা তুই পরে যা না হয়, এভাবে হঠাৎ,তোর অ্যাডজাস্টমেন্টে অসুবিধা হয়.....”
_কিন্তু আমি বরাবর বলেছি আমি সংসারটা করতে চাই, এবং সেটা মুঈনের থেকে এতো মাইলের দূরত্বে থেকে নয় নিশ্চয়।
সামিন সহ বাড়ির বড়রা সবাই তখনই চুপ হয়ে যায়, ইনশিরাহ এইবার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,“মাম্মা, আমার জায়গায় তুমি থাকলে কি করতে?”
_আমি তোমার পাপার সাথে যেতাম।
অস্ফুটে আলো বলে দেয় মেয়েকে।
ইনশিরাহ উঠে দাঁড়ায়, পাপার দিকে তাকিয়ে বলে,“রেজিগনেশন পাঠিয়ে দেবো পাপা।”
সামিন হাসে, দীর্ঘসময় মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,“তুমি কাজ টা ওখানে থেকেই করবে। রেজিগনেশন দিতে হবে না আম্মা।”
রাতে খেয়ে দেয়ে শশুর বাড়ির লোক চলে গেলে মুঈন বেডরুমে ঢুকে তার বৌকে কাছে টানলো, নিভৃতে ইশির কোলে মাথা রেখে নম্রস্বরে বলে,“আরেকটি বার কি ভাবতে চাচ্ছো? দেখো সবদিক বিবেচনা করে নেবে, আমি সব মিলিয়ে নয়-দশ ঘন্টা বাড়িতে থাকবো, ওটা বান্দরবান,হুট করে ছুটে মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পরতে পারবে না,চাইলেও সময় কাটাতে বান্ধবী কিংবা বোনদের বাড়িতে ডেকে নিতে পারবে না, বাবাকে দেখতে আসতে পারবে না যখন ইচ্ছে হবে তখন।”
_কিন্তু সত্যি তো এটাই আমাকে ওখানেই থাকতে হবে, আমার ওখানেই থাকা উচিৎ।
স্পষ্ট করে বলে দেয় ইশি।
শুকনো হাসলো মুঈন, বৌয়ের গালে হাত রেখে বললো,“তুমি শিখে গিয়েছো উচিৎ অনুচিত কি?”
_হ্যা।
_কেন?
_কারণ It's worth it!
বলেই ইনশিরাহ মুইনের পাশে শুয়ে পরলো,মুঈনকে জরিয়ে ধরে সে রাতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলো বড়লোক বাপের বখে যাওয়া, উচ্ছন্নে যাওয়া মেয়েটা।
মুঈন ঘুমন্ত মুখবিবর থেকে নিজের দৃষ্টি সরায় না, যে মেয়েটিকে একদিন বুঝিয়েছিলো এটা বিয়ে,শোধ বোধ খেলা নয়,আজ মেয়েটা কেমন লাগামহীন হয়ে শুধু দিয়েই যাচ্ছে মুঈনকে। মিষ্টি আন্টির এক টুকরো বরফ খন্ড এভাবেই গলে মুঈনের সবটুকুতে আছড়ে পরুক, রাজ করুক।
আজকাল মুঈনের খুব ইচ্ছে করে দু'জন থেকে তিনজন হতে, কিন্তু এই মেয়ে সব মানলেও এটা মানবে না এতো তাড়াতাড়ি, ইশি জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে সবসময় সচেতন থাকে, সাংঘাতিক সচেতন। ওর হাবভাব দেখে মুঈন বুঝেছে এখনই বেবি নেয়াতে তার ঘোর আপত্তি। সত্যি বলতে এতো তাড়াতাড়ি কেউ তো চায়না বেবি! মুঈনের মতো অত লোভী নয় কেউ।
একা একাই হাসে মুঈন,আরেকটু বৌয়ের সাথে মিশে গিয়ে বলে,“ভাই মুঈন! আস্তেধীরে। সব এভাবে একসাথে পেলে আনন্দের চোটে তুমি হার্ট অ্যাটাক করবে! সবকিছু আস্তেধীরে হোক। পঁচিশের বুড়ি বাচ্চা বৌ, বড় হোক আরেকটু! তারপর।”
________
প্রেরণা আটকে পরেছে ফুপির বাড়িতে,শুদ্ধর জন্মনিবন্ধন সনদ শুধরে আজকেও ফিরতে পারবে না। ফোন করে মিস জেনি আর সবার খোঁজ নিয়েছে।
সকালের রান্নাটা মেইড করে রেখে গিয়েছে। ইনুর আজকে একটা প্রোগ্রাম আছে ইউনিভার্সিটিতে, সেখানে যেতেই হতো। প্রিতমও গিয়েছে সাথে। ইনুর গার্ডিয়ান হিসেবে। যদিও ইনু শুরুতেই পাপাকে কল করে বলেছিল, ইশমাম মির্জা শীতল কন্ঠে জানিয়ে দিয়েছেন,“স্বামীকে নিয়ে যাও। এখন পাপার সাথে এতো ফর্মালিটি দেখাতে হবে না।”
বাড়িতে প্রণমি আর মিস জেনি, কোনো কাজ নেই দু'জনের। মিস জেনি দুর্বলতা কাটিয়ে সুস্থ হলেও কপালের ঘা শুকায়নি। এমনিতে হাঁটাচলা করতে পারছেন স্বাভাবিক ভাবেই।
প্রণমি গান শুনছে, মিস জেনির কোলে মাথা রেখে, ওর চুলে আদুরে আঙ্গুল চালিয়ে বিলি কেটে দিচ্ছিলেন মিস জেনি।
খানিক বাদে কলিং বেল বেজে ওঠে, মিস জেনি ধীরে ধীরে উঠে দরজার কাছে যায়,তার পেছন পেছন চলে যায় প্রণমিও। ডোর ভিউয়ারে ইরফান মির্জার কৃষ্ণবর্ণের গম্ভীর অথচ শান্ত মুখটা দেখতেই মিস জেনি প্রণমির দিকে তাকায়। অস্ফুটে বলে,“ইরফান মির্জা!”
চূড়ান্ত বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ফেলে প্রণমি, দাঁতে দাঁত চেপে বলে,“কি নির্লজ্জ লোক রে বাবা!”
_দরজা খুলবো নাকি প্রিতমকে কল করবো?
একটু ভাবে প্রণমি, তারপর আস্তেধীরে বলে,“ভাইয়াকে যা বলার আমি বলবো, আপাতত দরজা খুলুন। দেখুন বোনের জন্য এসেছে কি না! দরজা না খুললে তো আমরা অসামাজিক হয়ে যাবো,আমরা ওনাদের বোনকে ওনাদের থেকে নাকি কেড়ে নিয়েছি, এমন হুল ফোটানো কথা শুনতে হবে!”
ইরফান মির্জা দাঁড়িয়েছিল হাতে ফলের প্যাকেট নিয়ে। মিস জেনি দরজা খুলতেই ইরফান মুখটা হাসি হাসি করে বললো,“কেমন আছেন মিস জেনি!”
মিস জেনি হাসতে চাইলেও পারে না, গম্ভীর হয় বলে,“ভালো,তুমি?”
ইরফান বলে,“ভেতরে আসতে পারি? আসলে আপনাকে আর ইনুকে দেখতে এলাম। আত্মীয় আমরা, সামাজিকতার একটা ব্যাপার আছে না বলুন! আপনাকে সুস্থ দেখে ভালো লাগছে।”
প্রণমি কোচকানো কপাল আরও কুঁচকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ইরফান গম্ভীর হয়ে বললো,“মেহমান আসলে দরজা আটকে এভাবে দাড়িয়ে থাকতে নেই, আমার বোনটা কষ্ট পাবে।”
বড় বড় শ্বাস ফেলে একপাশে সরে দাঁড়ায় প্রণমি, ইরফান ভেতরে ঢুকে ভান করে ডাকছে,“ইনু কোথায় তুই!” যেন সে জানেই না ইনু বাড়িতে নেই।
_ভাবী বাড়িতে নেই।
রাগী রাগী গলায় জবাব দেয় প্রণমি।
_ও তাই নাকি! ইশশ ভুল সময়ে এলাম, আচ্ছা অপেক্ষা করছি!
ফলের প্যাকেট টা সেন্টার টেবিলে রাখতে রাখতে ইরফান বসলো সোফাতে। প্রণমি দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে আছে। ইরফান বললো,“এভাবে আমার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে আমাকে কোম্পানি দিতে হবে না, আমি জানি তোমরা আত্মীয় হিসেবে যথেষ্ট সামাজিক। যাও ভেতরে যাও। আমি একা একা অপেক্ষা করছি!”
মেজাজের বারোটা বেজে গেলো প্রণমির। বিড়বিড় করে দু'টো গালি দিলো, ইরফান শুনলো না। সে বললো,“কি বললে? কফি খাবো না চা খাবো জানতে চাইলে! ওয়েল! এক কাপ চা হলে খাওয়াই যায়। বোনের বাড়িতে এসে কিছু মুখে না দিলে বোন কষ্ট পাবে! তোমার ভাবী কষ্ট পাবে।”
চলমান.......