ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 84

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৮৪
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

উত্তপ্ত মেজাজ নিয়ে নিজের স্থানে দৃঢ় ভাবে দাঁড়িয়ে আছে প্রণমি। ভাইয়া ভাবী কখন আসবে জানা নেই , দেড়টার আগে আসবে না সম্ভবত। তবে সে চাচ্ছে দ্রুত প্রোগ্রাম শেষ করে আসুক, ভাবী স্বচক্ষে যেন তার প্রাণপ্রিয় দাদানকে এখানে দেখে।

ইরফান সোফায় বসে পা থেকে মাথা মেয়েটিকে চোরা চোখে একপলক দেখে নেয়, গোছালো পরিপাটি মেয়েটার চুল গুলো উসকোখুসকো, চেহারায় ক্লান্তির ছাপ, কন্ঠস্বর শুনে মনে হচ্ছে ঠান্ডা লাগিয়েই ছেড়েছে।

ইরফান তাকায় মিস জেনির দিকে,বলে,“ফলগুলো আপনার জন্য। খাবেন প্লিজ।”

মিস জেনি নির্বিকার। কোনো জবাব দিলো না, প্রণমি একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,“মিস জেনি। ওনাকে এক কাপ চা এনে দিন।”

ইরফান মুখটাকে হাসিহাসি করে আশেপাশে তাকায়,ড্রয়িং রুমে শেল্ফ ভর্তি শুধু বই আর বই। এতো বই কে পড়ে ভীষণ কৌতুহলী হয়ে জানতে চায় ইরফান,“এতো বই কে পড়ে?”

_জেনে আপনার লাভ?

_না বললেও তো তোমার কোন লাভ হবে না।

_হবে, আপনার সাথে এতো কথা খরচ করার ইচ্ছে নেই।

ইরফান সামান্য হেসে বিজ্ঞের ন্যায় মাথা নাড়ায়। মুখে বলে,“হু! আই সি!”

প্রণমি কোচকানো কপাল নিয়ে চলে যায় কিচেনে, কিচেনে গিয়ে মিস জেনিকে ফিসফিসিয়ে বলে,“চা হয়েছে মিস জেনি?”

_হু। এইতো।

_এক কাজ করুন মিস জেনি, দু চামচ লবণ দিয়ে দিন।
দাঁতে দাঁত চেপে প্রণমি বলে।

মিস জেনি সামান্য অবাক হলেও পর পর নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,“এভাবে খাবার জিনিস নষ্ট করা ঠিক নয় প্রণমি, তুমি বরং মুখে কিছু কথা শুনিয়ে দাও।”

_কি শোনাবো আর? কি শোনাবো? আর কত গালি দেবো? আমার আর কিছু বলার বাকি নেই, বেহায়া কোথাকার! ইচ্ছে করছে চায়ে কয়েক ফোঁটা হারপিক মিশিয়ে দিতে।

মিস জেনি বললো,“আমি প্রিতমকে ফোন করি?”

_না,ভাইয়া ভাবী প্রোগ্রাম ফেলে দৌড়ে আসবে। ভাবীর এই দিনটা নষ্ট হোক আমি চাইনা। ওনাকে গিয়ে চা দিন। বলুন মুখ টা না নেড়ে চুপচাপ এটা গিলতে।

মিস জেনি ইরফানকে গিয়ে চা দেয়, ইরফান হেসে ধন্যবাদ জানিয়ে চা টা নেয়।
প্রণমি কিচেন থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে যেতে নিলে ইরফান চায়ে চুমুক না বসিয়ে বললো,“আচ্ছা শোনো, ইনুর শরীর ঠিক আছে তো?”

প্রণমির পা থমকালো। দাঁড়িয়ে পরে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,“আছে।”

আবারও প্রণমি যেতে নিলে ইরফান বললো,“আচ্ছা শোনো,ও ঠিকভাবে খাওয়া দাওয়া করে তো!”

আবারও দাঁড়িয়ে পরলো প্রণমি, বললো,“করে”

আবারও ইরফান বলে ওঠে,“আমার বোনকে দিয়ে বেশি কাজ করাও না তো তোমরা?”

এবার দাঁড়িয়েই রয় প্রণমি, কোনোরকম মেজাজ সে দেখায় না, তবে মনে মনে কল্পনা করছে এই লোকটাকে দুমদাম করে খুব মারছে সে, দু গালে ঠাস ঠাস করে চ'ড়,নাক বরাবর ঘুষি আর মাথার চুল ধরে দেয়ালের সাথে বারি দিচ্ছে।
এটা প্রণমির অভ্যাস, কারো ওপর রাগ উঠলে নিজেকে এভাবেই তৃপ্ত করে সে। এই লোককে কল্পনাতে কত সহস্র বার যে প্রণমি থাপড়েছে,খামচেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এই লোক দেখতে কেমন প্রণমি জানে না। প্রণমির কল্পনায় ইরফান মির্জা নামের উগ্র বদ লোকটা খুব কুৎসিত দেখতে। প্রণমির সুন্দর মন কখনো মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য বিচার করেনি, যেখানে সে নিজেই নিখুঁত না,তবে তার কাছে মনে হয় এই লোক হয়তো দেখতে অতি ভয়ংকর।

ইরফান ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে,“এভাবে ক্যাট ক্যাট করে জবাব দিচ্ছো কেন? তোমার ভাবী সংক্রান্ত প্রশ্ন করছি তো! শুনতে ভালো লাগছে না?”

_না, কারণ আপনার কন্ঠস্বর খুবই নির্মম, ক'র্কশ, আপনার মতো।

_ও আচ্ছা তাই নাকি!

_জি, আপনি যেমন বদ লোক,আপনি দেখতেও কুৎসিত আর আপনার কন্ঠস্বরও খুবই বাজে।

বলতে বলতে প্রণমির অদ্ভুত লাগছে। এই লোককে কথা শোনানোর একটা সুযোগও সে ছাড়ছে না।

ইরফান হা করে প্রণমির মুখের দিকে কিছু মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে অস্ফুটে বলে,“কুৎসিত দেখতে? তুমি আমাকে দেখেছো?”
বলে চায়ে চুমুক বসায় ইরফান।

প্রণমি কাঠ কাঠ গলায় বলে,
_না। তবে ঐ হবেন হয়তো ছোটোবেলায় আমার পড়া কমিকসের সব থেকে ভয়ংকর রাক্ষসের মতো দেখতে, আর স্বভাবও সেরকম,সবসময় অন্যকে আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত থাকেন।

বিষম খায় ইরফান, হাতের চায়ের কাপ থেকে ছলকে পরে চা,পর পর চোখ বড় বড় করে প্রণমির দিকে তাকিয়ে কাশতে শুরু করে। প্রণমি চোখে মুখে কাঠিন্য বজায় রেখে দাঁড়িয়ে থাকে।

খানিক বাদে কাশি থামিয়ে ইরফান সময় দেখলো। চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়িয়ে প্রণমিকে বললো,“আসছি আমি।”

তাড়াহুড়ো ভাব ইরফানের। কিঞ্চিত অবাক প্রণমি। লোকটা তো এসেছিলো বোনকে দেখতে নিজের!
তবে প্রণমি নিজে থেকে কিছু বললো না,এই লোক এখান থেকে চলে গেলেই তার আত্মা শান্তি পাবে।

ইরফান চলে যাওয়ার পরে প্রণমি নিজের ঘরে ঢুকে বিছানায় বসে থাকে চুপচাপ, আজ আসুক ভাইয়া আর ভাবী, বলে দেবে প্রণমি ভাইয়াকে সবকিছু।

ঘড়িতে সময় তখন বেলা সাড়ে এগারোটা,মির্জা এন্টারপ্রাইজের হেড অফিসের সামনে বাইক পার্ক করে হেলমেট সরিয়ে ইরফান ত্রস্ত পায়ে হেঁটে অফিসে ঢুকতেই ইরফান মির্জা মুখোমুখি হলো সামিনের। ইরফানের জয়েনিংয়ের পর থেকে সামিন একটু দেরি করেই অফিসে আসে,বলা চলে একটু ফ্রি করেছে নিজেকে এতো ব্যস্ততা থেকে, ইলহাম মির্জাও তাই। এমনিতে ইরফান অফিস খুব সুন্দর করে সামলায়,যতই ছন্নছাড়া স্বভাবের হোক না কেন।

বড় বাবাকে দেখে গম্ভীর মুখটা একটা অবুঝ শিশুর মতো করে ফেললো ইরফান। যেন তার মতো নম্র ভদ্র সভ্য ছেলে ব্রহ্মাণ্ডে আর দ্বিতীয়টি নেই। একেবারে নতজানু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বড় বাবার সামনে। সামিন তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে ওকে দেখে বলে,“কোথায় গিয়েছিলে অফিস রেখে?”

_আটা মিলে, পাপা গতকাল রাতে দেখে আসতে বলেছিলো।

একেবারে ভদ্রজবাব ইরফানের,সামিন বললো,“হু,যাও,কাজ করো গিয়ে এবার।”

ইরফান মাথা নিচু করে ধীরপায়ে হেটে একাউন্ট সেকশনে ঢুকতেই সামিন ইয়াসার এদিক ওদিক তাকিয়ে ফোনটা বের করে প্রথমে ইলহামকে, তারপর আটা মিলের ম্যানেজার নুরুলকে কল করে জানতে চায়,“ইরফান গিয়েছিলো ওখানে?”

_জি স্যার।

_কতক্ষন ছিলো?

_ঘন্টাখানেক স্যার।

আশ্বস্ত হয়ে কল কেটে সামিন ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে নেয়, ওদিকে ইরফান তখন একাউন্ট সেকশনের এক্সিটে দাঁড়িয়ে উঁকি মেরে বড় বাবার কাজ কারবার দেখছিলো, সে জানতো এটাই হবে, তার জন্য প্ল্যান বি আগে থেকেই রেডি করে রেখে গিয়েছিলো।
লুকিয়ে লুকিয়ে বড় বাবাকে দেখতে দেখতে পৈশাচিক হাসি হাসে ইরফান, আটা মিলে সে অবশ্যই গিয়েছিল, তবে এক ঘন্টা থাকেনি। থেকেছে পাঁচ মিনিট, ম্যানেজার নুরুলের সাথে একটা সাইকোলজিক্যাল গেম খেলেছে সে, গিয়েই শুরুতে ম্যানেজার নুরুলকে বলেছে,“সে এখানে ঘন্টাখানেক হয় এসেছে।” কথাটা নুরুলের মস্তিস্কে ভালো করে ঢুকিয়ে দিয়ে তবেই আটামিল থেকে বেরিয়েছে। নুরুলের মস্তিস্ক ধরে নিয়েছে মেজো স্যারের ছেলে একঘন্টা থেকেছে,সে তেমনটাই বড় স্যার মানে সামিনকে জানিয়েছে।

নিশ্চুপ হাসতে হাসতে নিজের ডেস্কে গিয়ে বসলো ইরফান,চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে দু'চোখ বন্ধ করে ফেলে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ওভাবেই বসে থাকে।

দুপুরে ভাইয়া ভাবীর অপেক্ষা করতে করতে ঘন্টাখানেকের জন্য ঘুমিয়ে পরেছিল প্রণমি। যখন উঠলো তখন কেবলমাত্র দেড়টা বেজেছে। মিস জেনিকে জিজ্ঞেস করে প্রণমি জানতে পারে ভাইয়া ভাবী এসেছে কিছুক্ষণ আগে। ব্যস আর দেরি করে না সে, চোখ মুখ কঠিন করে ছড়ি নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। মিস জেনি ঠোঁট দিয়ে জিভ ভিজিয়ে বললেন,“এখন বলবে?”

“হু”
জবাব দিয়ে এগিয়ে যায় প্রণমি,পা দু'টো গিয়ে স্থির হয় ভাইয়া ভাবীর ঘরের সামনে। এবং ওখানেই দাঁড়িয়ে পরে সে, ভেতর থেকে ইনায়ার খিলখিল হাসি কর্ণগোচর হয় মেয়েটার, স্বামীর সাথে হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে, আজ প্রোগ্রামে দারুণ মজা করেছে দুজন। প্রোগ্রাম থেকে বাড়িতে ফিরে প্রিতম খোঁচা খোঁচা দাড়ি ছাঁটতে নিলে ইনু ওর হাত থেকে রেজার নিয়ে নিজেই প্রিতমের শেভ করে দিচ্ছে,প্রিতম হাসতে হাসতে বলছে,“আরে আরে এতো হাসছো কেন! গাল কেটে যাবে আমার।”

ইনু হাসি থামায় না। তার খিলখিল হাসিতে মুখরিত গোটা কামরা।

বাইরে দাঁড়িয়ে সবটা শোনে প্রণমি। অকস্মাৎ তাকে জেঁকে ধরে তীব্র অস্বস্তি আর মন খারাপ। ভাইয়া ভাবী কত সুন্দর সময় কাটাচ্ছে! এতো সুন্দর মুহূর্ত! প্রণমি নষ্ট করে দিতে পারবে না! কখনোই না।

পিছিয়ে যায় প্রণমি। ইরফান মির্জার কথা বললে আজ এখানে কি হবে সে জানে,ভাবীর ঐ হাসি থেমে যাবে। ভাবী অবচেতন মনে প্রণমিকে দায়ী করবে,দুষবে তাদের মাঝে ঝামেলা বাঁধানোর জন্য। প্রণমি আর এগোয় না, পাংশুবর্ণের মুখটা নিয়ে ফিরে যায় নিজের ঘরে। মিস জেনি অবাক হয়ে বললেন,“জানাবে না মামনি প্রিতমকে?”

প্রণমি গিয়ে চুপচাপ শুয়ে পরলো বিছানায়,বললো,“তার দরকার নেই। ভাইয়া ভাবীকে এসব থেকে দূরে রাখাই বেটার। আসুক আরেকবার, তখন দেখবো।”

________

আজ বাদে কাল ইশি-মুঈন চলে যাবে বান্দরবান,থানচিতে মুঈন কটেজ পেয়েছে, ওদের গোছগাছ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে, আজ অফিস থেকে চারটা নাগাদ ফিরে ইরফান গোসল সেরে নিতেই নিচে শোনে ইলহাম মির্জার হাকডাক। ইরফান নিচে নেমে জানতে চাইলো,“কি হয়েছে?”

চেঁচিয়ে ওঠে ইলহাম মির্জা,“কি হয়েছে? ওরা কাল সকালে চলে যাবে। জামাই অফিশিয়াল কাগজপত্র গোছাতে ছোটাছুটি করছে। ইশি ওদিকে একা গোছগাছ করছে। ভাই হিসেবে কোনো দায়িত্ব আছে কি নেই তোমাদের? একজন সভা সেমিনার করতে করতে জান দিয়ে দিলো আর তুমি তো তুমি। খুঁচিয়ে না দিলে একটা কাজ করতে চাও না।”

সামিন নিউজ পেপার হাতে চুপচাপ হাসছে। ইরফান ঠান্ডা গলায় ইলহামকে বলে,“বড় বাবার সাথে আগেই বলেছি আমি, এই এখন বেড়োবো। এতো চেঁচামেচি করো না। বোন আমার, আমার যথেষ্ট চিন্তা আছে। দাদানও ওখানেই আছে।”

ঘরে গিয়ে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছে ফটাফট পোশাক পাল্টে নেয় ইরফান, আগের মতো বখাটে বেশে থাকা হয়না, শার্টের সবগুলো বোতাম লাগিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল গুলো সেট করতে করতে বিড়বিড় করে বললো,“তুই যতই চেষ্টা করিস না কেন ইরফান মির্জা,তোকে কখনো ভদ্রলোক লাগবে না দেখতে, আরে ভদ্রলোকদের চেহারাই থাকে আলাদা। তোর চেহারায় একটা “শাআলা ইতর ইতর” ভাব রয়ে গিয়েছে, তা সে তুই যতই ভালো হোস না কেন। ঐ যে ইহান তাজওয়ার আর মুঈন ফরাজী, ওনাদের চেহারায় যেমন লেপ্টে আছে সাক্ষাৎ ফেরেস্তা! তেমন তোর চেহারায় লেপ্টে আছে শাআলা ভণ্ড!”

আপনমনে বিড়বিড় করতে করতে হঠাৎ হাত থামে তার,হাত থেকে হেয়ার ব্রাশ টা নামিয়ে রেখে চোখ বড় বড় করে নিজের কৃষ্ণবর্ণের মুখটাকে দেখে, কানের কাছে প্রতিধ্বনিত হয় সেই কথাগুলো,

“কুৎসিত দেখতে? তুমি আমাকে দেখেছো?”

_না। তবে ঐ হবেন হয়তো ছোটোবেলায় আমার পড়া কমিকসের সব থেকে ভয়ংকর রাক্ষসের মতো দেখতে, আর স্বভাবও সেরকম,সবসময় অন্যকে আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত থাকেন।”

কথাগুলো মনে করে হাসলো ইরফান । পরপর গম্ভীর কন্ঠে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বকে দেখে বললো,“আর তুই কুৎসিত দেখতে, তুই জ্ঞানী আপার আদরের ছোট বোনের ছোটো বেলায় পড়া কমিকসের সব থেকে ভয়ংকর রাক্ষসের মতো দেখতে, তোর স্বভাবও সেরকম,সবসময় অন্যকে আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত থাকিস।”

বলতে বলতে হাসে ইরফান। একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে সরাসরি ইনুকে কল করে সে। আজকে একটা ব্যাপার পরিক্ষা করার ছিলো তার,সেই টেস্টের ফলাফল জানতে ইনুকে কল করলো। ইনু কলটা রিসিভ করতেই ইরফান বললো,“কি করছিস?”

_পড়ছিলাম দাদান।

_তোর স্বামী কই?

_কম্পিউটারে কাজ করছে।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইরফান বললো,“মিস জেনি কেমন আছেন?”

_ভালো।

_আসলেই সব ঠিকঠাক?

_হ্যা কেনো? কি হবে?
ইনু অবাক হয়ে জানতে চায়। ইরফান সামান্য হেসে কিছুনা বলে কল কেটে ফোনের স্ক্রিণের দিকে তাকিয়ে থাকে দীর্ঘক্ষণ। জ্ঞানী আপার আদরের বোন নালিশ করেনি তার ভাইয়ের কাছে! হাসলো ইরফান মনে মনে,পর পর বললো,“বোকামির টেস্টে পাশ করেছো তুমি বিরক্তিবতী! তোমাকে দশ মার্ক দেওয়া হলো।”

একটু থেমে ইরফান আবারও বললো,“বড্ড বেশি ভালো মানুষ তুমি। আর ভালো মানুষীর সুযোগ নিতে হয়। ইরফান মির্জা নেয়।”

_______

অফিশিয়াল কাগজপত্র গুছিয়ে সন্ধ্যা নাগাদ মুঈন ফ্ল্যাটে ফিরে দেখলো ইহান আর ইরফান এসেছে। ঝুমঝুমির মা কাঁদছে ইনশিরাহ মুঈনের জন্য, ইনশিরাহ তাকে অনেককিছু উপহার দিয়েছে।

ফ্ল্যাটের যাবতীয় মালামাল প্যাক করে ইতিমধ্যে বান্দরবান পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইহান আর ইরফান এসে সবটা দেখেছে। এখন বোন আর বোন জামাইকে নিয়ে চলে যাবে শান্তিনীড়ে । আজ রাতটা সেখানে থেকে কাল সকালে ইহান-ইরফানই নিয়ে যাবে মুঈন ইশিকে।

মুঈনের মুখে লেপ্টে আছে অমায়িক হাসি,তবে চেহারা দেখে যে কেউ বলে দিতে পারবে মন মেজাজ ঠিক নেই। অফিসে আজ লিয়াকত চৌধুরী ফুলের তোড়া পাঠিয়েছিলো,তোড়াটা কুচলে দিয়ে চুপচাপ চলে এসেছে।

রাতে শান্তিনীড়ে ইনুও এলো,আপু দুলাভাইকে সকাল সকাল সি-অফ করবে বলে। খাবার টেবিলে মেয়ে জামাইকে বসিয়ে বাড়ির বড়রা আড্ডা দিলেন দীর্ঘক্ষণ। যাতে কেউ মন খারাপ না করে থাকে।
মুঈনের মন টা শুধুমাত্র ট্রান্সফার নিয়ে বিক্ষিপ্ত ছিলো না, তার লোভী মন এতো সুন্দর একটা পরিবার থেকে এতোটা দূরে চলে যাওয়ার বিষয়টি মানতে নারাজ, বাইরে কাউকে বুঝতে না দিলেও ভেতরে ভেতরে খানিকটা ভঙ্গুর সে, এই ব্যাপারটা নিজের স্ত্রীকেও বুঝতে দেয়নি মুঈন। তাহলেই ইশি শুরু করে দেবে ইয়াসার মির্জার থেকে টাকা নিয়ে ট্রান্সফার আটকিয়ে দেওয়ার কথা, হয়তো আবেগে বলবে তবে মুঈনের জন্য বিব্রতকর হবে খুব।

যাওয়ার আগে শশুর শাশুড়িদের সাথে রাতে চায়ের আড্ডায় ব্যস্ত মুঈন। ইহানও সেখানে ছিলো, ইনুর সাথে কিছুটা দূরে বসে ল্যাপটপে শুদ্ধর জন্মদিনের ছবিগুলো দেখছিলো সে, ইনু হঠাৎ ফোনটা হাতে নিয়ে বলে ওঠে,“এই রে! আপু বাড়িতে এলো কি না সেটা খোজ নিতেই ভুলে গিয়েছি।”

ইহান ওর দিকে তাকায়,প্রেরণা দুদিন রেস্তোরাঁতে বসেনি সে জানে,জানতে চাইলো,“কোথায় গিয়েছেন উনি?”

_আপুর শশুর বাড়িতে।

ইহান চুপচাপ নিজের দৃষ্টি নামিয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিণে রাখলো,স্ক্রিণে প্রেরণা আর শুদ্ধর একটা হাস্যজ্জ্বল ছবি। মায়ের গলা জরিয়ে ধরে রেখেছে শুদ্ধ।

ইরফান তখন পুলসাইডে সিগারেট খেতে গিয়েছিলো,দূর থেকে ইশিকে আসতে দেখে সে সিগারেটটা ফেলে দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। ইশি এসে ভাইয়ের পাশে বসতে বসতে বলে,“কি সুন্দর চাঁদ দেখ! জানি না বান্দরবান গিয়ে চাঁদ দেখলে এমন লাগবে কিনা!”

_তোর বর কোথায়?

_শশুরদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে।

দুই ভাই বোন চুপচাপ বসে থাকে, ইরফান হঠাৎ নীরবতা ভেঙে নম্রকন্ঠে বোনকে বলে,“ওখানে গিয়ে উল্টো পাল্টা কিছু করিস না,করার আগে আর কাউকে না জানালেও আমাকে জানাস!”

হাসছে ইনশিরাহ,হাসতে হাসতে বলছে,“কি কথা রে তোর ভাই! খুব ভাইগিরি দেখাচ্ছিস দেখছি!”

শার্টের কলার ঠিক করতে করতে ইরফান ফাজলামি করে বলে,“ও তো ম্যা হু!”

ইনশিরাহ চুপ করে ভাইকে কিছু সময় দেখে বলে,“আর এখানে তুইও উল্টোপাল্টা কিছু করিস না,ঐ ইনুর ননদ....”

ইশিকে পুরোটা বলতে না দিয়ে ইরফান মুখ চ বর্গীয় শব্দ করে বলে ওঠে,“কি লাগিয়ে রেখেছিস তুই ভাই! বললাম না আই হ্যাভ নো ইন্টরেস্ট ইন হার! আরে যার নামটাও ঠিকঠাক মনে নেই আমার, প্রণতি, প্রমিলা,পুবালী......কি যেন নাম ছিলো!”

_প্রণমি।
অস্ফুটে জবাব দেয় ইনশিরাহ। ইরফান তৎক্ষণাৎ বলে ওঠে,“ও হ্যা,প্রণামী, প্রণামী! আচ্ছা এমন নাম হয়?”

ভাইয়ের দিকে শীতল চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ইনশিরাহ বলে,“প্রণামী না,ওর নাম প্রণমি! যাক গে! তোর না জানলেও চলবে। মেয়েটার ধারেকাছেও ঘেষবি না,এটাই ফাইনাল কথা!”

চলমান......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 84 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন