#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৮৬ [ ১ম অংশ ]
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
[ ১ম অংশ ]
সময় ঠিক বিকেল পাঁচটা পঞ্চান্ন মিনিট। নিতিন মজুমদারের এই সময়ের নিয়মিত খদ্দেরের বাইকটা এসে থামলো তার স্টলের ছাউনীর নিচে। স্টলে আপাতত খদ্দের বলতে দুজন আছে। তাদের উপেক্ষা করে নিতিন সদ্য আসা আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে নির্মল হেসে বললো,“কি অবস্থা বাবা?”
ইরফান হেলমেট সরিয়ে বাইকের মিররে নিজের মুখটা দেখে,চুল ঠিক করে ত্রস্ত পায়ে হেঁটে এসে বসলো,একটা চওড়া হাসি হেসে বললো,“এইতোহ মামা।”
ইরফানের হাতে চা ধরিয়ে দিয়ে নিতিন অন্যান্য কাস্টমার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরে। ইরফান একটা সিগারেট ধরিয়ে চায়ে চুমুক বসিয়ে দৃষ্টি রাখে ছায়ানটের গেটে, রোজকার মতো।
আজ প্রণমির মনটা খুবই প্রফুল্ল। সব্বাইকে টপকে স্যারের প্রশংসা কুড়িয়েছে বলে, এই একটা ব্যাপারে প্রণমি খুব বাচ্চামো করে, তার কাছে একটা সুখকর জগত হলো তার গান।
হাসতে হাসতে তার ব্যাচমেটদের সাথে বেড়োয় প্রণমি। মিস জেনি এক হাত ধরে রেখেছে। প্রণমির গানের ক্লাসের ব্যাচমেটরা বিভিন্ন বয়সী, আট থেকে আটচল্লিশ,অনেক স্টুডেন্ট ছায়ানটে।
ওরা আজ সবাই ফুচকা খাবে বলে এতো আনন্দ করছে। ছায়ানটের গেটের সামনে একটা ফুসকা-ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে।
হাসাহাসির বন্যা বয়ে যাচ্ছে যেন। প্রণমি তার থেকে সিনিয়র ব্যাচমেট মিনতি আন্টির গাঁয়ে আছড়ে পরছে হাসতে হাসতে। চায়ে চুমুক না দিয়ে একদৃষ্টে প্রণমিকে দেখছে ইরফান, এতোটা দূর থেকে প্রণমির মিহি কন্ঠের খিলখিল হাসি তার কানে এসে বাজছে। ইরফান গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছে। না সিগারেট ফুকছে না খাচ্ছে চা। সিগারেটটা পুড়তে পুড়তে তার হাতে ছ্যাঁকা লেগে যেতেই তার হুঁশ ফেরে,হাত থেকে ওটা দ্রুত ফেলে সিগারেটটাকেও একটা গালি দেয় সে।
নিতিন মজুমদার কাস্টমার সামলে ইরফানকে দেখে। তিনি এ কদিনে অনেকটাই বুঝেছে, ছেলেটির সাথে তার বড় ভাব। যথেষ্ট মার্জিত আর সভ্য একটা ছেলে। হঠাৎ করে নিতিন আজ বললেন,“বড় ভালো মেয়েটি। ভারি লক্ষি। ভারি গুণী।”
ইরফান প্রণমির থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতিনের দিকে তাকায়। নিতিন নতুন এক কাপ চা বানাতে বানাতে বলতে থাকে,“আমি তো জানতাম না, ও আমার মেয়ে দূর্গার সাথেই গান শেখে ঐ একাডেমীতে। দূর্গার থেকে জেনেছি মেয়েটি খুব ভালো গান করে,ওকে নিয়ে ছায়ানট একাডেমীর টিচারদের আলাদা ভাবনা। তবে জানো, মেয়েটির কত কষ্ট, একে তো অন্ধ, তারপর কিছুমাস আগে নাকি একটা পাজি, জানোয়ার, বড়লোকের বেহাংরা বেয়াদপ ছেলে ওকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, একরাত মেয়েটিকে আটকে রেখে নির্যাতন করে ছেড়ে দিয়েছে।”
ইরফানের মুখটা অকস্মাৎ পাংশুবর্ণের হয়ে যায়। গম্ভীর শ্যামবর্ণের মুখে ঘামের ফোঁটা জড়ো হচ্ছে। নিতিন বলতে থাকে,“আর ওর পরিবারকে কেস তুলতেও বাধ্য করেছে ছেলের পরিবার। মেয়েটা একমাস কথাই বলতে পারেনি ঠিক মতো, তারপর এই একাডেমীর সব টিচার আর ওর ব্যাচমেটরা মিলে ধীরে ধীরে ওকে স্বাভাবিক করেছে,হাসিয়েছে। এই সব কিছুই দূর্গার থেকে শুনলাম সেদিন।”
ইরফান নিতিনের কথা চুপচাপ শুনে তাকায় প্রণমির দিকে, সাদা রঙের কুর্তি পাজামা পরনে আজ, একটার পর একটা ফুচকা মুখে পুরছে,খাচ্ছে,আর চেঁচিয়ে বলছে,“মামা আরো ঝাল দিন। আরো ঝাল।”
ইরফান দেখতে থাকে তরুণীর চঞ্চলতা। মিস জেনির ধমক শুনছে না, বাচ্চাদের মতো বায়না করে বলছে,“আরো খাবো আমি।”
ঐ আদুরে মুখ, আদুরে আচরণ, প্রণমি আজ ভিন্নরূপে ইরফানের চোখে। ইরফান খেই হারিয়ে ফেললো নিজের, হঠাৎ কল্পনায় দেখলো প্রণমিকে সে বারণ করছে,প্রণমি তার কাছে আহ্লাদ করছে,“আরো খাবো আমি।”
আচমকা অস্থির হয়ে ওঠে ইরফানের মন, নিজের কল্পনা দেখে নিজেই অবাক। এসব কি ছাতা ভাবছে সে ! তার মাথাটা পুরোপুরি । দৃষ্টি তীক্ষ্ম করে ইরফান মন দেয় প্রণমির কর্মকাণ্ডে। গপাগপ গিলেই যাচ্ছে ফুচকা।
আচমকা নিতিনের কন্ঠস্বরে তার দিকে তাকায় আবারও,নিতিন কন্ঠে ভীষণ আফসোস মেখে বলতে থাকে,“এতো বড় সর্বনাশের কোনো মানে হয় বলো? অমানুষে ভরে গিয়েছে দেশটা বাবা বুঝলে। এখন কি হবে মেয়েটার? একে তো অন্ধ,তার ওপর এতো বড় কেলেঙ্কারি। কেউ গ্রহণ করবে এই মেয়েকে? কেউ না। এইসব অমানুষদের ফাঁসিতে ঝোলানো উচিত।”
ইরফান এখনও নিরুত্তর। নিতিন আরো কিছুক্ষণ আপনমনে বকবক করে চুপ হয়ে যায়। প্রণমিরা চলে যায় ছায়ানটের সামনে থেকে। চায়ের বিল মিটিয়ে দিয়ে ইরফানও উঠে দাঁড়ায় ধীরে ধীরে।
________
সময় বিকাল পাঁচটা আটত্রিশ মিনিট। ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা ওরফে প্রধান ওস্তাদ নিখিলেশ বড়ুয়া নিজের রিক্লাইনার চেয়ারে হেলান দিয়ে ঝিমুচ্ছিলেন। রোজ সকাল বিকাল দু'টো ব্যাচ তিনি তালিম দেন। বাকি ব্যাচ গুলো তার মেয়ে সামলায়। এই একাডেমীতে মোট পাচটা ব্যাচ গান শিখে যায়।
দিনের শেষ ব্যাচ হচ্ছে প্রণমিদের ব্যাচ, এখন নিখিলেশ বড়ুয়ার একটু বিশ্রামের সময়, তারপর একাডেমীতে তালা লাগিয়ে সে বাড়ি যাবে। ভারি স্বাস্থ্যের আটষট্টি বছর বয়সী নিখিলেশ বড়ুয়া ইদানিং বেশ ক্লান্ত থাকেন।
দরজায় নক করে ক্লাসে ঢোকে তার বড় মেয়ে সন্দিপ্তা। নিখিলেশ বড়ুয়া চোখ বুজেই বলে,“একটু চা দিয়ে যা তো মা,খেয়ে বেড়োই।”
_একজন তোমার সাথে দেখা করতে এসেছে বাবা।
মেয়ের কথায় নিখিলেশ বড়ুয়া চোখ মেলে তাকায়। দৃষ্টি দেয় দরজার দিকে, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে ইরফান মির্জা। নিখিলেশ বড়ুয়াকে সবিনয়ে সালাম দিয়ে ক্লাসরুমে ঢুকলো।
নিখিলেশ বড়ুয়া সালামের জবাব দিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে রয় ইরফানের দিকে। ইরফানের ঠোঁট ছেয়ে আছে আন্তরিক হাসিতে, ভদ্র মতন দাঁড়িয়ে নিচুস্বরে বললো,“কেমন আছেন ওস্তাদ জি!”
বিস্ময় কাটে না নিখিলেশের, অস্ফুটে বলে,“বসো।”
ইরফান নিখিলেশের সামনের একটি চেয়ার টেনে বসে আবারও বলে,“চিনতে পারেননি আমাকে?”
নিখিলেশ চিনতে পেরেছে বৈকি! খুব ভালো করেই চিনতে পেরেছে। চেহারার ছাটকাট যতই সুপুরুষের হোক না কেন, গোটা মুখে রয়ে গিয়েছে সেই ষষ্ঠ শ্রেণীর বালকের ছাট। নিখিলেশ বড়ুয়া কিছুসময় দেখে ফিরে যায় অতীতে। মনে পরে যায় যেদিন সাবেক সাংসদ ইয়াসার মির্জার স্ত্রী ছয় বছরের একটা শিশু ছেলের হাত ধরে তার বাড়িতে গিয়েছিলো, তখন নিখিলেশের এই ছায়ানট একাডেমী ছিলো না,সে তার টিনশেড ঘরের সামনে একটা ছোটো রুম বানিয়ে বাচ্চাদের গান শেখাতেন। সেই শিশুটি ছিলো ইরফান মির্জা। তার কাছে একটানা ক্লাস সিক্স পর্যন্ত গানের তালিম নিয়েছে, গাইতো ছেলেটা বড্ড ভালো, তবে আচরণ ছিলো অতি চঞ্চল, দুষ্টু ছিলো ভীষণ, আর ছিলো রগচটা। তার একাডেমীর এক স্টুডেন্ট একদিন ইরফানের এক বোনের ভারি স্বাস্থ্য নিয়ে মজা করেছিলো,সেই ঘটনার সূত্র ধরে একাডেমীর দু'টো ছেলেকে মেরে বাড়িতে গিয়েছিল, অনেক ঝামেলা করে গান শেখা বাদ দিয়ে দিয়েছিল। নিখিলেশ বড়ুয়া শত চেষ্টা করেও আর গান শেখাতে আনতে পারেনি, দিন দিন প্রচন্ড জেদী হয়ে গিয়েছিল ছেলেটা।
আজ এতো গুলো বছর পরে এই ছেলেকে চিনতে নিখিলেশের মোটেও অসুবিধা হয়নি। ইরফান আবারও হেসে বললো,“চিনতে পারেননি আমাকে?”
মাথা ঝাঁকায় নিখিলেশ, মুখে বললো,“চিনতে পেরেছি। তোমাকে না চেনা কোনো ব্যাপার না। তোমার বড় ভাই আর তুমি হুবহু তোমাদের দাদা ইমতিয়াজ মির্জার ইয়াং বয়সের চেহারার আদল পেয়েছো। কেমন আছো তুমি? বাড়ির সবাই কেমন আছে?”
_ভালো আছে।
_কি অবস্থা বলো। হঠাৎ এখানে? বেশ অবাক হলাম।
ইরফান সামান্য হেসে বলল,“আমি গান শিখতে চাচ্ছি আবারও।”
_গান আর তুমি?
নিখিলেশ আরো অবাক হয় ভীষণ। ইরফান মাথা ঝাঁকায়। নিখিলেশ বললেন,“এতো বছর পর হঠাৎ করে এই ইচ্ছা।”
_শখ হলো হঠাৎ। অবসরে শিখবো।
নিচুগলায় জবাব ইরফানের।
_শখ?
ইরফান নিশ্চুপ। নিখিলেশ ওকে কিছুক্ষণ দেখে বলে,“বেশ শান্ত লাগছে দেখে, কি করা হয় এখন? পড়াশোনা?”
_মাস্টার্স এক্সাম দেবো সামনে, আপাতত বাড়ির ব্যাবসা দেখছি। ওখানে জব করি।
_অহহহ, দারুণ। তো গান শিখতে চাও?
_জি।
_চর্চা আছে?
_ওভাবে নেই।
_বেশ, হারমোনিয়াম ভুলে গিয়েছো?
_নাহ, সবকিছুতে মাঝেসাঝে হাত লাগাতাম ইচ্ছে হলে।
নিখিলেশ বড়ুয়া কিছুক্ষণ ভাবলেন। ইরফান বললো,“আপনার বিকেলের ব্যাচে ভর্তি হতে চাচ্ছি। প্রসিডিওর কি?”
_তুমি আগামীকাল সকালে এসো। আমার মেয়ে সন্দিপ্তা তোমার ভর্তি নেবে।
________
আগস্টের শুরু, গরম তুলনামূলক ভাবে বেড়েছে। শহুরে জীবন দুর্বিষহ । এই গরমে বড্ড হাঁসফাঁস লাগে প্রেরণার, ইদানিং মন মেজাজ দীর্ঘসময় ঠিক থাকে না,এই গরমে মাথার ঘিলুও টগবগ করে ফুটতে থাকে সর্বদা।
আজ ভীষণ শরীর খারাপ প্রেরণার, এতোটাই খারাপ যে কেটরিং সার্ভিসের অফিস থেকে একা ফিরতে পারেনি, ম্যানেজার সাব্বির পৌঁছে দিয়ে গিয়েছে।
প্রিতম একটা ইন্টারভিউ দিয়ে তখন সবেমাত্র ফিরেছে। একটা গেমিং সফটওয়্যার কোম্পানি, বেতন প্রায় দেড় লাখ টাকা। যদিও ফ্রিল্যান্সিং করে যথেষ্ট উপার্জন করে প্রিতম, তবুও শ্বশুরের কাছে চাকুরী বিহীন সে তো বেকার। নিজের বেকারত্বের ট্যাগ টা মুছতেই চাকুরীর জেদ ঢুকেছিল মনে। আজকের ইন্টারভিউ ভালো হয়েছে,প্রিতম আশাবাদী।
আপুর এই হাল দেখে আঁতকে ওঠে প্রিতম। ডক্টরের কাছে নিয়ে গেলে ডক্টর কিছু টেস্ট দিয়েছে। হিমোগ্লোবিন কম।
বাড়িতে এনে ভীষণ রাগারাগী করেছে বোনকে প্রিতম, খাওয়া দাওয়া নিয়ে বড্ড উদাসীন প্রেরণা তাই। বিকেলে দেশের বাড়ি থেকে মুবিনা এসেও একই কাজ করলেন। ভীষণ বকলেন প্রেরণাকে। তার চেঁচামেচি গিয়ে ঠেকলো প্রেরণার বিয়েতে। কেন বিয়ে করছে না প্রেরণা, কেন জেদ ধরে আছে, এই যুবতী বয়সে আর কত একা থাকবে। দিন দিন নিজেকে নিয়ে ভাবছেই না প্রেরণা।
প্রেরণা রুগ্ন কন্ঠে বিরক্তি মিশিয়ে ফুপিকে বললো,“থামবে তুমি? এসব কি শুরু করেছো?”
রুবিনা ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়,তবে থামলেন না। ওপাশে গিয়ে চিল্লিয়ে বলতে লাগলেন,“ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখ প্রেরণা। এতো জেদ নিয়ে থাকিস না। যাদের জন্য নিজের এমন ত্যাগ দিচ্ছিস, দিনশেষে কেউ তোর থাকবে না মা। এই যে প্রিতম,প্রণমি,শুদ্ধ। এরা সবসময় তোর থাকবে? থাকবে না। তখন আফসোস করবি।”
প্রিতম প্রণমি ইনায়া প্রিতমের ঘরে,তারা মুবিনার কথা চুপচাপ শুনছিলো,মুবিনা গিয়ে ওদের তিনজনের সামনে বসে জ্ঞান দেওয়ার মতো করে বলতে লাগলেন,“তোরা কি করিস? কেন ওকে বোঝাস না? ধীরে সুস্থে ঠান্ডা মাথায় বোঝাস। সাদাদ, আমার ভাসুরের ছেলের কথা তো জানিসই, বৌটা মরেছে আছ কতবছর হয়েছে, ওর একটাই মেয়ে, মেয়ে ডাক্তারিতে চান্স পেয়েছে এবছর। এখন সাদাদ নিরিবিলি মানুষ, বয়স মাত্র একচল্লিশ, তোরা তো জানিস কত ভালো লোক সাদাদ, মনে মনে প্রেরণাকে খুবই সম্মান করে, পছন্দ করে। শুদ্ধ ঐ সাদাদের কাছে ভালো থাকবে। টাকা পয়সার কমতি আছে সাদাদের? তার ওপর উপজেলা চেয়ারম্যান। কোনো দিক থেকে ফেলনা নয়।
আর প্রেরণা, এখনও মুখটা কত সুন্দর,ও কি বুড়ি হয়ে গিয়েছে? ওকে দেখে মনে হয় বাচ্চাও আছে? জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বয়সটাই এখন, একজন সঙ্গী দরকার হবে রে। তোরা কি বুঝিস এসব?
ইনায়া আমতা আমতা বললো,“কিন্তু ফুপি,এটা তো আপুর লাইফ,আমরা ছোটো হয়ে কি করে বোঝাবো?”
প্রণমি ভাবীর সাথে তাল মিলিয়ে বলে,“ঠিক তাই,আপু তো শুনলেই আমাকে চড় মারবে।”
প্রিতম চোখমুখ কঠিন করে, ঠান্ডা মাথায় এতক্ষণ ফুপির কথাই শুনছিলো, অকস্মাৎ বলে ওঠে,“তোমাদের কারো কিছু বলতে হবে না আপুকে। বিষয়টা নিয়ে এবার আমি এগোবো। এবার একটা বিহিত করতেই হবে!”
ভাইয়ের ওপর আর ক্ষেপলো না প্রেরণা,শুধু শুনে যাচ্ছে ভাইয়ের কথা। প্রিতম অসহায়ের মতো মুখ করে বোনকে বোঝাতে থাকে,“ফুপি তো কিছু ভুল বলেনি আপু। আমরা পারি তোমার খেয়াল রাখতে? ঘরের দরজা বন্ধ করে তুমি যখন নিশ্চুপ কাঁদো,আমরা বা শুদ্ধ,আমাদের এলাউ করো তুমি তোমার কাছে? কিছু বুঝি না আমি? আমি ঘাসে মুখ দিয়ে চলি?”
প্রেরণা চুপচাপ ভাইকে দেখে খানিকটা সময়,প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,“আমি বুঝি বোঝা হয়ে যাবো তোদের?”
বলেই হাসলো ম্লান। প্রিতম রেগেমেগে বললো,“একদম কথা ঘোরাবে না, তুমি আমার কথা শোনো। আচ্ছা সাদাদ ভাইয়ের সাথে একবার কথা বলে তো দেখতে পারো!”
ইনায়া প্রণমি মুখ শুকনো করে প্রেরণার ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে ভাইবোনের কথাবার্তা শুনছে,এখন একটা বড় সর সুনামি বয়ে যাবে এখানে সেটা নিশ্চিত।
কিন্তু তাদের ধারণা মিথ্যে করে দিয়ে প্রেরণা চুপ থাকে,আসলে তার মাথা ব্যথা করছিলো,তর্ক করতে ইচ্ছে করছিল না। প্রিতম আরো কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করে, শেষটায় বলে,“শুদ্ধকে আমরা সবাই মিলে দেখবো। তোমাকে দেখা আদৌও আমাদের পক্ষে সম্ভব? একটা নিজের মানুষ তো লাগে আপু!”
নিশ্চুপ প্রেরণা, ওর নির্লিপ্ততা দেখে চূড়ান্ত বিরক্ত হয়ে প্রিতম হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে যায় ঘরে থেকে, নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় বসে থাকে চোখ মুখ কঠিন করে। ইনু যায় স্বামীর কাছে, প্রিতমের গলার টাই খুলতে খুলতে বললো,“আচ্ছা এখন বাদ দাও। ধীরে সুস্থে বুঝিয়ো আপুকে। এতো জোর করছো কেন?”
_কারণ আমি আপুকে সুখী দেখতে চাই,এই লাইফটা আপু ডিজার্ভ করে না, করেনা ইনু। একদমই করে না।
কথাগুলো চেঁচিয়ে বলছে প্রিতম, নিজের ঘরে বসে প্রেরণা সেসব কথা শুনতে থাকে মাথা নিচু করে।
________
বিকাল পাঁচটা দশ মিনিট। আজ নিখিলেশ বড়ুয়া এখন অবধি চুপচাপ বসে আছেন। ঝিরঝিরে বৃষ্টি দেখে আজ স্টুডেন্টও খুব কম। প্রণমি, এবং আরো তিনজন মেয়ে,একজন মহিলা এবং দুজন ছেলে রয়েছে।
নিখিলেশ বড়ুয়াকে দেরী করতে দেখে প্রণমি বললো,“আজ তালিম দিবেন না স্যার?”
ঘড়ি দেখলেন নিখিলেশ,বললেন,“আজ তোমাদের সাথে আরেকজন স্টুডেন্ট যুক্ত হবে এখানে।”
অবাক হয়ে সবাই অপেক্ষা করতে থাকলো নতুন স্টুডেন্টের।
আজ ইরফানের প্রথম দিন ছায়া নটে, চারটায় অফিস শেষ করে দশ মিনিটে পৌঁছেছে সে, বাইকের গতি বাড়িয়ে।
ছন্নছাড়া, উগ্র, চঞ্চল প্রকৃতির ছেলেটা তার স্বভাব মতো একটা বেপরোয়া কাজ করে ফেলেছে যার পরিণতি বহু রকমের হতে পারে, সে জানে,তবে তার মনের মাঝে যে কৌতুহল,যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, সে ছিল নিরুপায়। শুরু করেছে তার খামখেয়ালি জীবনের আরেকটা খামখেয়ালি অধ্যায়। ফলাফল যা-ই হোক, পিছু হটার পাত্র নয় সে।
ইরফানকে দেখতে পেয়েই নিখিলেশ বড়ুয়া সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলেন ইরফানকে, ইরফানের শান্ত চোখ দুটো তখন খুঁজছিল প্রণমিকে,প্রণমি তখনও টের পায়নি ইরফান মির্জার কথা। ক্লাস রুমের একেবারে পেছনের সাড়িতে বসেছিল সে। তবে মিস জেনি তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
পা জোড়ায় কাপন ধরেছে মিস জেনির, নিখিলেশ বড়ুয়া সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন,“এ আমার বহু পুরনো স্টুডেন্ট। ইরফান। এখন থেকে তোমাদের সাথে শিখবে। তোমরা তাকে স্বাগত জানাও।”
প্রণমি শুরুতে খেয়াল করেনি,যখন নামটা ভালো করে শুনলো তৎক্ষণাৎ চ'ম'কে উঠলো মেয়েটা, মুখটা শুকিয়ে একটুখানি হয়ে গেলো, কম্পিত স্বরে আওড়ায়,“কে?”
মিস জেনি নির্বাক, হুঁশ ফিরলে কিছু বলতে যাবেন ঠিক তখনই শান্ত গম্ভীর স্বরে ইরফান সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে,“আমি ইরফান মির্জা। হেলোও এভ্রিওয়ান!”
হাত দু'টো মুষ্টিবদ্ধ করে বার কয়েক ঢোক গিলে নেয়,লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলে প্রণমি। পেছন থেকে মিস জেনি ফিসফিসিয়ে বললেন,“মামনি আসলেই ইরফান মির্জা।”
ইরফানের দৃষ্টি শীতল, প্রণমির মুখভঙ্গি আচানক কোমল থেকে কঠিন রূপ ধারণ করে ফেললো। বিরক্তিতে মুখটা তেতো হয় মেয়েটার, কপালটা দপদপ করে ওঠে।
লোকটার নির্লজ্জতা আকাশছোঁয়া তা প্রণমি টের পেয়েছে সেদিন যখন মুখে গরম চা ছুড়ে মারার পরেও প্রণমিদের বাড়িতে গিয়েছে তখন। তবে এই লোকটার মাঝে কি একটু ভয় ডরও নেই? প্রণমি আশ্চর্য হয়, নেই বোধ হয়, রাগে বাকরুদ্ধ প্রণমি। এতো বড় সাহস! একটুও ভয় নেই লোকটার। এতোটা বেপরোয়া আর উদ্ধত! ওদিকে ইরফান মির্জা সবাইকে তার পরিচয় দিয়ে, সবার সাথে কুশলাদি বিনিময় করার পরে ধীরে ধীরে প্রণমির সামনে আসে।
সেই স্বল্পপরিচিত পারফিউমের ঘ্রাণ নাকে যায় প্রণমির। প্রণমির নাক আর মস্তিষ্ক খুব সাংঘাতিক, সে একবার একটা ঘ্রাণ পেলে সেটা বহুকাল মনে রাখতে পারে, এই ঘ্রাণটা প্রথম পেয়েছিল সে কিডন্যাপ হবার সময়ে। তারপর অনেকবার পেয়েছে,যখন যখন ইরফান মির্জা তার সামনে এসেছে।
মিস জেনি হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছে পুরো, প্রণমি ততটাই কঠিন। ইরফান এসে ঠিক ওর সামনে রাখা হারমোনিয়ামের সামনে দাঁড়াতেই কর্কশ স্বরে প্রণমি বলে ওঠে,“কে?”
_আমি তোমার বেয়াই ইরফান মির্জা।
অত্যন্ত শান্ত স্বরে শুধুমাত্র প্রণমিই যাতে শুনতে পায় তেমন করে জবাব দিলো ইরফান। প্রণমি দাঁতে দাঁত চেপে বসে রয়। নিখিলেশ দূর থেকে প্রণমিকে বলে,“প্রণমি মা, তোমার একজন ব্যাচমেট সিনিয়র ভাইয়া উনি। সালাম দাও।”
চোখমুখ খিচিয়ে বসে আছে মেয়েটা। নিখিলেশ ইরফানকে বসতে বলায় ইরফান বসলো। ঠিক প্রণমির থেকে কিছুটা দূরেই, প্রণমিকে দেখতে দেখতে।
অন্যান্য স্টুডেন্টরা তখন নিখিলেশের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত। প্রণমি একপ্রকার চেঁ'চি'য়ে ওঠে চাপা স্বরে ইরফানের ওপর,“আপনি এখানে কোন সাহসে এসেছেন?”
_ওয়েট। আমি এখানে গান শিখতে এসেছি।
_ফাজলামি তাইনা? গান আর আপনি? ফাজলামি?
_বেয়াদবি করেনা প্রণমি, আমি আসলেই গান শিখতে এসেছি।
ঠান্ডা স্বর জবাব টা দিলো।
_হাস্যকর, অত্যন্ত হাস্যকর। উদ্দেশ্য কি বলুন। আবার কি পাকাচ্ছেন আপনি? ভাইয়া ভাবীকে নালিশ করে দেবো নাকি?
_দাও। কে বারণ করেছে।
আবারও শান্ত স্বরের জবাব।
থমথমে মুখে বসে আছে প্রণমি। নিখিলেশ বড়ুয়া ইরফানের দিকে মনোযোগ দিলেন এবার, বললেন, আজ তোমার গান শুনবো, দেখি কতটা কি চর্চায় রেখেছিলে,শোনাও তো দেখি।
প্রণমি বিস্মিত, বিরক্ত। হাত মুঠি করে বসে আছে। গান আর এই লোক! কি আশ্চর্যের বিষয়।
দাঁতে দাঁত চেপে ইরফানকে বললো,“এতো নাটক কি করে জানেন!”
ইরফান জবাব না দিয়ে হাসে নিশ্চুপ। পর পর কন্ঠে কোমলতা এনে বললো,“কেন ? গান গাইতে পারি না?”
প্রণমি জ্বলছে, দাঁতে দাঁত চেপে বলে,“সবকিছু সবার জন্য না। গান কোনো মনস্টারের জন্য না।”
চলমান.....
[ ২য় অংশের লিংক কমেন্টে ]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৮৬ [ ২য় অংশ ]
[ ২য় অংশ ]
বাড়ি ফাঁকা, প্রিতম ইনুকে নিয়ে বিকেলে বেরিয়েছে, প্রেরণা শুদ্ধকে নিয়ে বেড়িয়েছে পার্কে। মিস জেনি প্রণমিকে নিয়ে বাড়িতে ঢুকে দরজা লাগাতেই দ্রুতপায়ে হেটে প্রণমি নিজের ঘরে ঢুকলো,আজ তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে কপালে বারিও খেলো আচমকা।
মস্তিষ্কে স্ফুটন চলছে। মিস জেনি আ'ত'ঙ্কি'ত হয়ে ছুটে এলেন, “মামনি শান্ত হও।”
প্রণমি শান্ত হয় না, রেগেমেগে বলে,“কি করে মিস জেনি? ঐ লোক এতো ভালো গান করে কি করে?”
_সেটা তো আমি জানি না মামনি।
প্রণমি রাগে কাঁপতে থাকে, একটা ক'র্কশ লোকের কন্ঠ এতো সুন্দর হবে কেন? কেনো ঐ অসভ্য লোক এতো ভালো গান গাইবে ! বিরক্ত লাগছে প্রণমির, সবকিছু বিরক্ত লাগছে।
আজ একাডেমীতে ইরফান মির্জা গান গেয়েছে, প্রণমি শুনবে না শুনবে না করেও নিজেকে আটকাতে পারেনি শেষটায়, শুনেছে খুব মনোযোগ দিয়ে। যেনো ঐ লোক প্রফেশনাল গায়ক।
মিস জেনি প্রণমির পাশে বসে বললেন,“আচরণ খুব নম্র ছেলেটার, তবুও প্রেরণাকে অন্তত জানাই মামনি?”
_না! কাউকে জানাবেন না মিস জেনি। ঐ লোকের সাথে সব ঝামেলা আমার,আমি বুঝে নেবো। না আপু ঢুকবে,না ভাইয়া,না ভাবী ঢুকবে। কত্ত বড় সাহস আমাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। আমাকে!
হাপাচ্ছে প্রণমি,জেদ ঢুকেছে মাথায়। দিনকে দিন নিজেকে চূড়ান্ত সাহসী লাগছে, চূড়ান্ত!
_______
একটা নির্দিষ্ট গতিতে বাইক ছুটছে ইরফানের। হেলমেটের নিচে একজোড়া বাদামী চোখে অদ্ভুত শান্তভাব। চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা দৃশ্যপট,
ছুটির সময় আবারও যখন মুখোমুখি হয়েছিল প্রণমির তখন প্রণমি আবারও বলেছিলো,“আমি কিন্তু ভাইয়া ভাবীকে নালিশ করে দিবো!”
_কি বলে করবে? আমি তোমাকে বিরক্ত করেছি? বলো বিরক্ত করেছি?
বিরক্ত করেনি ইরফান প্রণমিকে। আসলেই তো,কি নালিশ করবে সে? একাডেমী প্রণমির নয়, না ঐ লোকের প্রণমির সাথে লেনা দেনা আছে।
ইরফান সামান্য হেসে বলে,“তুমি তো আমাকে ভয় পাও না। তবে আমি তোমার আশেপাশে থাকলেই কি আর না থাকলেই কি? একটা কথা বলো, তুমি কি ভাবো আমি তোমার পিছু পরেছি? ও কাম অন! আচ্ছা যদি তাই হয়, তবে তুমি কি এটা ভাবছো আমি তোমাকে ইমপ্রেস করে ফেলবো? সেজন্য এতো অস্বস্তি হচ্ছে?”
রাগে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল প্রণমি, বলেছে,“কখনোই না। আপনি আমার আশেপাশে থাকলে আমার কিচ্ছু না। কিচ্ছু না। আমার কিচ্ছু এসে যায়না। আপনি একটা ক্রিমিনাল, যাকে আমি ভয় পাইনা। আপনি এখানে এসে প্রতিদিন নৃত্য করুন গিয়ে, এতে প্রণমির কিচ্ছু যায় আসে না।”
একটু থেমে আবারও বলেছিলো,“ওওও বুঝতে পেরেছি, আপনার উদ্দেশ্য।”
ইরফান অবাক হয়ে বলেছে,“বুঝতে পেরেছো? কি উদ্দেশ্য?”
_আপনি আসলে আমার পেছনেই পরেছেন। তবে আমার শান্তি হারাম করতে তাইনা ইরফান মির্জা? আপনি আসলে আমার কাছ থেকে এখন এই গানের জগতটা কাড়তে চাচ্ছেন, ভাবছেন আমাকে বিরক্ত করে এখান থেকে ভাগাবেন আপনি? ভেবেছেন আপনাকে দেখে আমি বিরক্ত হয়ে একসময় একাডেমী ছাড়বো? লেজ গুটিয়ে পালাবো আমি? ওসব কিছু হবে না। কখনো হবে না। আপনার উদ্দেশ্য কখনো সফল হবে না ইরফান মির্জা। আমি এই একাডেমীতেই থাকবো।”
তীব্র জেদে শরীর কাঁপিয়ে চেঁচিয়ে ছিলো প্রণমি। ইরফানের কল্পনায় বারবার সেই দৃশ্য ভাসছে, ঠোঁটে তার একপেশে হাসি,কানের কাছে বাজছে,“আপনি আসলে আমার কাছ থেকে এখন এই গানের জগতটা কাড়তে চাচ্ছেন, ভাবছেন আমাকে বিরক্ত করে এখান থেকে ভাগাবেন আপনি?”
ভীষণ জেদি এই প্রিতমের আদরের বোনটা, কিন্তু বড্ড সরল। একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ইরফান বাইকের স্পিড বাড়িয়ে দেয়, নিশ্চুপ হেসে অস্ফুটে আওড়ায়,“বোকা বিরক্তবতী।”
_________
শান্তিনীড়ের বাইরের বাতি জ্বলছেনা, ইহান গাড়ি থেকে নেমে ক্লান্ত পায়ে হেঁটে গিয়ে কলিং বেল টিপে দাঁড়িয়ে থাকে। দরজা খোলে পরী। আজ এতো তাড়াতাড়ি ইহানকে দেখতে পেয়ে পরী অবাক,খুশি দুটোই হয়।
বাড়িতে ঢুকেই ইহান জানতে চাইলো ইরফান ফিরেছে কিনা। প্রফুল্ল চিত্তে পরী জানালো সন্ধ্যার আগেই ফিরে ল্যাপটপ নিয়ে বসে অফিসের কাজ করেছে একটানা, তারপর খেয়ে ইতিমধ্যে শুয়েও পরেছে।
রাত তখন সবে নয়টা, সামিনেরা তিনভাই দোতলায় ছিলো। গিন্নিরা নিচতলায়। ইহানের জন্য সবাই অপেক্ষা করছে।
ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে ইহান মা-চাচীদের সাথে খেতে বসলো রাতের খাবারটা। চুপচাপ খাচ্ছিল ইহান। পরী হঠাৎ করে নিজের জা-দের বলে ওঠে,“আজ ইনু আর জামাই এসেছিল আমার চেম্বারে,বিকেলে। প্রেরণার প্রসঙ্গ উঠতেই জানতে পারলাম জামাই প্রেরণার বিয়ে দেবে এবার। জামাইয়ের ফুপু মুবিনা বেয়ান,তিনিই তোরজোর করছেন,বিয়েটা বোধহয় হয়েই যাবে।”
সাবলীল আলাপ। ইহান খাওয়া থামিয়ে কয়েকসেকেন্ডের জন্য চুপ হয়ে যায়।
আলো পরীর কথার পিঠে বলে,“যা-ই হোক, মেয়েটা সুখী হোক।”
রিতু বলে ওঠে,“পাত্র কে?”
_বেয়ানের ভাসুরের ছেলে,বিপত্নীক.....
“আচ্ছা তোমাদের এসব অহেতুক আলাপ না পাড়লে হয়না ছোটোমা? টিপিক্যাল আন্টিদের মতো,এগুলো কি?”
ইহানের আচমকা ধ'মকে পরী চোখ বড় বড় করে তাকায়।
ইহান বলে,“ইনু তোমাকে বললো,আর তুমিও তোমার জা'দের সাথে আলোচনা শুরু করলে! আশ্চর্য!”
আলো কড়া গলায় বলে,“এটা তো পরনিন্দা পরচর্চা ছিলো না ইহান,আমরা নরমালি আলাপ করছিলাম,এতো রিয়াক্ট করছিস কেন!”
ইহান হুট করে দমে যায়, ছোটো মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,“আ'ম সরি ছোটো মা ,অ্যাকচ্যুলি মাথা ঠিক নেই আমার,স্ট্রেসড!”
হন্তদন্ত হয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে ইহান। পরী তখনও বোকার মতো বসে আছে,রিতু বললো,“তুই কষ্ট পাস না, জানিসই তো ও কোন বংশের রক্ত, হুটহাট জ্বলে ওঠে, মেজাজ, খালি মেজাজ এদের।”
পরী শান্ত ভঙ্গিতে বলে,“আসলে একেও এখন ধরে বেঁধে বিয়ে করিয়ে দিতে হবে। ওর বৌ এসে ওর এই মেজাজ সামলাবে। আমরা তো বুড়ি,ওর এমন হুট হাট ধমকে হার্টে প্রবলেম হয় আমাদের।”
ওরা তিন জা হাসতে হাসতে লুটোপুটি খায়।
ইহান ঘরে ঢুকে দরজা লাগায়, তার কি হচ্ছে কি এসব! আজ ছোটো মাকে এভাবে ধমকে উঠলো! আজকের পথসভায় ভীষণ ধকল গিয়েছে,হয়তো সেজন্য স্ট্রেসড। তবে ঐ কথাগুলো!
আচানক মস্তিষ্কে স্ফুটন শুরু হয়, দ্রুত পায়ে হেঁটে ড্রয়ার খুলে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে সেখান থেকে দুইটা মার্লবোরো শলাকা আর লাইটার তুলে নিতেই থমকায়, কিছুক্ষণ রিভলবারটার দিকে তাকিয়ে থেকে ড্রয়ার লাগিয়ে চলে যায় বারান্দায়।
একসাথে দু'টো সিগারেট শেষ করে দাড়িয়ে দাড়িয়ে,রেলিংয়ে বলিষ্ঠ হাত ঠেকিয়ে রেখে।
পর পর কিছুক্ষণ ভাবে, অতঃপর গিয়ে হাতে ফোনটা তুলে কল লাগায় ইনুর ফোনে।
ইনু রিসিভ করতেই ইহান বললো,“কি করছিস?”
_স্কিনকেয়ার দাদান। কি হয়েছে?
_ছোটোমার চেম্বারে এসেছিলি বিকেলে?
_হু।
_কার বিয়ে?
খুবই শান্ত স্বরে জানতে চাইলো ইহান।
ইনু থমকায় হঠাৎ এই প্রশ্নে, তারপর বললো,“মাম্মা বলে দিয়েছে? এই মাম্মাটাও না, কিচ্ছু পেটে থাকে না আমার মতো! আরে দাদান বিয়ে নয়, বিয়ে দিতে চাচ্ছি আমরা আপুর। প্রিতম কোমর বেঁধে নেমেছে, পাত্র মুবিনা ফুপির ভাসুরের ছেলে,উনিও পলিটিশিয়ান, বিজনেস আছে। একটু বুড়ো যদিও,তবে দেখতে বেশ। ”
ইহান চুপচাপ শুনলো, তারপর বললো,“তোর ননদ রাজী?”
_ঠিক জানি না দাদান,আমার তো মনে হচ্ছে আপু রাজি। কারণ আপু হ্যা বলেনি,তবে নাও বলেনি,আর মৌনতা সম্মতির লক্ষণ। প্রিতম যেভাবে ধরছে রাজী হয়ে যেতেই পারে।
_আচ্ছা রাখছি।
হুট করে কলটা কাটলো ইহান। রেলিং ধরে অন্ধকারের দিকে দৃষ্টি দিয়ে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকলো অযথা, অতঃপর দ্রুত পায়ে ঘরে ঢুকে বিছানায় বসে আরো একটা সিগারেট শেষ করলো।
তারপর আবারও ফোনটা তুলে মুঈনকে কল করে হুট করে,সময় না দেখেই, মুঈন তখন সারাদিনের ক্লান্ত শরীর নিয়ে বৌয়ের সেবা নিতে ব্যস্ত,ইশি চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো,পরম আবেশে চোখ দুটো বুঝেছিল মুঈন, আচানক ইহানের কল পেয়ে কিছুটা মজার ছলে ইশিকে বলে,“আমার শশুর শাশুড়িদের সমস্যা কি? এই লোককে কেনো বিয়ে করিয়ে দিচ্ছে না? ভাই সারাদিন পরে একটু বৌটাকে কাছে পাই। কুছ তো রহম কর ইহান তাজওয়ার মির্জা!”
ইশি বিছানায় শুয়ে শুয়ে মুখে হাত চেপে হাসছে। মুঈন ফোন নিয়ে চলে যায় বারান্দায়, রিসিভ করে বলে,“বলো।”
কোনো বাড়তি কথা খরচ না করে ইহান বললো,“আমি যাকে পছন্দ করি, তাকে আমি আসলেই পছন্দ করি মুঈন। এবং এটা ইনফ্যাচুয়েশন নয়, এটা খুব সাংঘাতিক কিছু।”
মুঈন তবদা মেরে দাঁড়িয়ে আছে, রাত বিরেতে বোন আর বোনজামাইয়ের রোমান্সে ব্যাঘাত ঘটিয়ে তার সাংঘাতিক অনুভূতির আলাপ করতে এসেছে!
গলা খাঁকারি দিয়ে মুঈন বললো,“তারপর?”
_আমি বিয়ে করতে চাই তাকে।
_হ্যা তো প্রস্তাব দাও। আমাকে ডিটেইলস বলো, শশুর শাশুড়িদের রাজি করানোর দায়িত্ব আমার।
_কিন্তু ওনার বিয়ে ঠিক হচ্ছে সম্ভবত, এমতাবস্থায় ঠিক কোন পদক্ষেপ নিলে ঠিক হবে আমি বুঝতে পারছি না, আমার কোনো আচরণে যেন উনি আমাকে অভদ্র না মনে করেন। আমি কিভাবে ওনাকে এপ্রোচ করবো!
হতাশ মুঈন, চূড়ান্ত হতাশা নিয়ে বললো,“সাজেশন চাইছো? তুমি তো তাও একটা প্রেম করেছিলে, আমি তো একেবারে জিরো। কথা ছিলো যাকে পাবো তাকে ভালোবাসবো,বেসেছি।”
ইহান নিশ্চুপ। মুঈন বলে,“রিল্যাক্স। তোমার নার্ভাসনেস দেখে বুঝতে পারছি তুমি কতটা সিরিয়াস, মেয়েটি আসলেই লাকি। এখন শোনো, বিয়ে ঠিক হচ্ছে বললে,হয়নি। যাও গিয়ে মনের কথা বলো। তারপর দিলওয়ালে তুমহারে দুলহানিয়া লে আও। এটাও বলে দিতে হয়? যাও!”
এবার হাসলো মুঈন,ফোন কাটার আগে বললো,“মেয়েটির সাথে কথা বলে আমাদের জানিয়ো,আমরাও দেখতে চাই তাকে।”
ফোন কেটে ইহান চুপচাপ বসে থাকে আরো কিছুক্ষণ। সিগারেটটা সম্পুর্ন শেষ করে এইবার বিছানায় গা এলিয়ে দেয়,কপালে তার ডান হাত। এবার তার নিজের সাথে নিজের কিছু বোঝাপড়া দরকার। সমীকরণ জটিল,তাকে ঠান্ডা মাথায় মেলাতে হবে।
একজন বিধবা মহিলা, একটা বাচ্চা আছে, যে একটু একটু করে বড় হচ্ছে, একজন মানুষ হিসেবে একটা সুস্থ পরিবেশ তার জন্মগত অধিকার। আর এই দুজন,ইহানের জীবনে দু'টো মানুষ হবে না কেবল, হবে ইহানের আমৃত্যু রেসপনসিবিলিটি। সোস্যাইটির মানুষের বাঁকা কথা, মানুষের বাকা হাসি থেকে সে বাঁচাতে পারবে এই মানুষ দুটোকে? সবসময়,সব মুহুর্তে!
এই হিসেব গুলো খুব ঠান্ডা মাথায় মেলাতে হবে,সময় আজ রাতটা শুধু, তারপর একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নেবে ইহান।
এমনটা যদি হয়,তবে খুব কম সম্ভাবনাই আছে বর্তমানে এই সোস্যাইটি প্রেরণাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে না,প্রতি পদে পদে তারা বোঝাতে আসবে এটা খুবই বেমানান জুটি হয়েছে,প্রেরণাকে নিচু দেখাতে আসবে, হাসি মজা করে প্রেরণাকে ইহানের পাশে অযোগ্য প্রমাণ করতে আসবে। এমন অনেক তিক্ত জিনিস ঘটতে থাকবে, এগুলো থেকে ইহান সবসময় বাঁচাতে পারবে প্রেরণাকে ?
খুব সাবধানে তাকে ভাবতে হবে।
ইহান সে রাতে ঘুমায়নি। বলতে গেলে সারারাত কেটেছে তার সিগারেটের ধোঁয়া ওড়াতে ওড়াতে আর সমীকরণ মেলাতে মেলাতে। খুব সকালে ইহান ফোনটা হাতে নিলো, তখন ইহান শান্ত, একেবারে দৃঢ় নিজের সিদ্ধান্তে। দ্রুত আঙ্গুল চালিয়ে প্রেরণাকে মেসেজ করলো,“আসসালুআলাইকুম।”
ইহানের একটুও নার্ভাস লাগছে না এখন,তবে কেমন পাগল পাগল আর বেপরোয়া লাগছিল। ওপাশ থেকে খানিক সময় পরে প্রেরণা সালামের জবাব দিলে ইহান লিখে পাঠায়,“প্রেরণা আপনার সাথে দেখা করতে চাই। কাইন্ডলি দেখা করুন। কিছু বলার আছে আমার।”
চলমান........