ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 87

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৮৭
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

সকাল সকাল ইহান তাজওয়ারের মেসেজ পেয়ে খুব বেশিই অবাক হয় প্রেরণা। তার অবশ্য কারণ আছে, কারণ ইহান তাজওয়ার মির্জার সাথে তার মেসেজে কখনও কথা হয়নি,প্রেরণাকে কখনোই নক করেনি সে।
কিন্তু কারণটা কি হতে পারে? ইনু-প্রিতম? ইরফান মির্জা? কিন্তু বেশ কদিন ধরে তো সবটাই ঠিকঠাক, কোনো ঝুট ঝামেলা নেই কোথাও। তবে?
ভাবতে ভাবতে শাড়িটা পাল্টে নেয় প্রেরণা, সে এমনিতেও অফিস যাচ্ছিল, যাওয়ার আগে না হয় লোকটার সাথে দেখা করে যাবে।
চুলে চিরুনি চালাতে গিয়ে হঠাৎ করে হাত থামে প্রেরণার।‌ হুট করে মনে পরে যায় রেস্তোরাঁর কথা। তবে কি রেস্তোরাঁর ভাড়া নিয়ে ডিসকাশনে যেতে চাচ্ছে লোকটা? কিন্তু তার জন্য কফিশপে কেন দেখা করতে বলবেন? এটা তো অফিশিয়াল কথা!

এমন নানা কথাই প্রেরণার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। পরক্ষনেই চুলে বিনুনি করতে করতে একটা শ্বাস ফেলে ভাবে হবে হয়তো পারিবারিক বিষয়ে কিংবা প্রিতমের চাকরি বাকরি নিয়ে জরুরি আলোচনা, গিয়েই না হয় দেখবে।

বড় মায়ের দেয়া অফ হোয়াইট রঙের পাঞ্জাবিটা আঁটসাঁট হয়ে চওড়া কাঁধ, বলিষ্ঠ শরীর সুসজ্জিত করেছে। পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নিতে নিতে লম্বা কদমে যখন সিঁড়ি বেয়ে নামছিল তখন ইরফানের মুখোমুখি হয় সে। দাদানকে আজ অন্য বেশে দেখে দৃষ্টি তীক্ষ্ম হয় ইরফানের, সে অফিস যাচ্ছিল, বললো,“কোথায় যাচ্ছো? পার্টি অফিসে তো যাচ্ছো না।”

_কাজ আছে।

_মেয়ে দেখতে যাচ্ছো? বড় মাকে নিয়ে যাও।

ইহান থামলো, ইরফান তার স্বভাব মতো ফাজলামি করে বললো,“অ্যান্ড লিসেন, তোমার এই লুকটা অতি ডিসেন্ট। নতুন বর, নতুন বর লাগছে, মেয়ে পটবে না।”

ইহান ঘুরে তাকায় ভাইয়ের দিকে,ওর কাঁধে একটা হাত রেখে জ্ঞান দেওয়ার মতো করে বললো,“অ্যান্ড ইউ লিসেন, অমন কাউকে পটানোর ইচ্ছেও নেই যারা পুরুষের লুক দেখে পটে।”

_তবুও ম্যাটার করে!

_নট অ্যাট অল! একটা ভদ্র বিচক্ষণ মেয়ে একটা পুরুষের চোখে ভরসা, সম্মান খুঁজে বেড়ায়, না তো লুক খোঁজে। অসভ্য ব্যাড বয় লুক।

দাদানের কথায় ইরফান বলে,“ইনসাল্ট করছো?”

_না,তোকে ভদ্র হওয়ার অনুপ্রেরণা দিচ্ছি। বড় বাবা কি বলেন সবসময় মনে নেই?

_আজকাল খুব প্রেরণা-অনুপ্রেরণার কথাই ভাবো দেখছি দাদান।

ইহান শান্ত চোখে দেখছে ইরফানকে। ইরফান হাসি চেপে রেখেছে বহু কষ্টে।

বাইরে বেড়িয়ে ইরফান দুষ্টুমি করে আবারও বললো,“ওকে, আজ আমাকে লিফট দাও তুমি।”

_সময় নেই আমার।
বলেই গাড়িতে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলো । ইরফান বসলো নিজের বাইকে। খুব ইচ্ছে করলো দাদানের পিছু নিতে, তবে আজ ঘাটালো না, ভদ্র হয়ে গিয়েছে ইরফান মির্জা।

ইহান গিয়ে বসলো বুক করে রাখা টেবিলে। রেডিও কলোনি রোডের বাগানবাড়ি ক্যাফেটা এই শহরের সবথেকে নিরিবিলি ক্যাফে, ইহান বেছে বেছে এমন একটা ক্যাফেতেই টেবিল বুক করেছে। সবচে বড় কথা তাকে আর প্রেরণাকে মানুষ একসাথে দেখে অহেতুক কথা বানিয়ে ছাড়বে,তাই এই মানসম্মত নিড়িবিলি ক্যাফেটা বেছেছিলো ইহান।
গিয়ে বসতেই দুজন ওয়েটার এসে সালাম দিলো,তাদেরকে অপেক্ষা করতে বলে ইহান পথ চেয়ে রইল প্রেরণার।
কাকতালীয় ভাবে আজ প্রেরণার গায়ের শাড়ির রংটাও অফ হোয়াইট। পাড়টা বেগুনী। ক্যাফের দরজা ঠেলে যখন ভেতরে ঢুকলো,ইহান অকস্মাৎ মাথা তুলে তাকাতেই থমকাল।
লম্বা একটা বেনী ডান কাঁধে রেখেছে,চলনে দৃঢ়তা,তবে দৃষ্টি নত। উচ্চতায় ছোটোখাটো, ছিমছাম গোছের,গাঢ় নীল চোখের ভদ্রমহিলা কিছুক্ষণের জন্য সফল হয়েছে ইহানের দৃষ্টি আটকাতে।
কিছুটা কাছে এগোতেই ইহান যখন টের পেলো,খুকখক করে কেশে উঠলো। এতক্ষণ দৃঢ়তা নিয়ে বসে থাকলেও হুট করে নার্ভাসনেসে জমে গেলো লোকটা,পিঠ বেয়ে নামলো শীতল স্রোত।

প্রেরণা নির্ধারিত টেবিলে ইহানকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখেই এগিয়ে এলো সামান্য হেসে। তার ভাব ভঙ্গিতে বড্ড তাড়াহুড়ো ভাব, একটা চেয়ার টেনে বসে সরাসরি তাকায় ইহানের চোখে, ইহান নামিয়ে নিলো চোখ অস্থিরতায়। তারপর ওয়েটারকে ডেকে দু'টো কোল্ড কফি অর্ডার করে প্রেরণার দিকে তাকাতেই প্রেরণা বললো,“কিছু হয়েছে? প্রিতম ইনুর ব্যাপারে কিছু হয়েছে? আই মিন ইশমাম আঙ্কেল তো ধীরে ধীরে মেনে নিচ্ছেন, তবে?”

ইহান চুপচাপ দু'পাশে মাথা নাড়ে। প্রেরণা অস্ফুটে বলে,“তবে?”

_বলছি!

_রেস্তোরার ব্যাপারে? ভাড়া বাড়িয়ে দিতে হবে?

অহেতুক কথাবার্তা শুনে ইহান জবাব কি দেবে বুঝে উঠতে পারছে না, ওদিকে কথাগুলো কিভাবে শুরু করবে তাও বুঝতে পারছে না।

প্রেরণা ব্যাপারটা লক্ষ্য করে। নার্ভাসনেস এই লোকটার সাথে যায়না, তবে কি সিরিয়াস কোনো পারিবারিক ইস্যু? প্রেরণাই কন্ঠে কোমলতা এনে ইহানকে আশ্বস্ত করে বলে,“বলুন কি হয়েছে? কোনো ব্যাড নিউজ! স্যরি বাট আপনার মুখ দেখে তেমনটাই মনে হচ্ছে!”

নড়েচড়ে বসলো ইহান। নিজের মুখটাকে খুব আয়নায় দেখতে ইচ্ছে হলো তার। তার মুখ দেখে আসলেই মনে হচ্ছে ইহানের প্রেরণাকে কোনো ব্যাড নিউজ দেওয়ার আছে?

প্রেরণা উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে। ইহান এবার গলা খাঁকারি দেয়,বললো,“অ্যাকচ্যুলি.......”

_অ্যাকচ্যুলি?

_অ্যাকচ্যুলি,এটা পার্সোনাল হয়ে যায়,বাট,প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড আপনার বিয়ে ঠিক হতে চলেছে?

স্তব্ধ প্রেরণা,চোখ মুখ কঠিন হয়ে যায় মুহুর্তেই। ইনুর ওপর আচানক রাগ ওঠে, নিশ্চয়ই কথাটা ও প্রচার করেছে। ইহান প্রেরণার অস্বস্তি দেখে নড়েচড়ে উঠে বলে,“মাইন্ড পরে করবেন। আই নিড আনসার, সিম্পল অ্যান্ড স্ট্রেট!”

_না। প্রিতম পাগলামি করছে। বিয়ে ঠিক হয়নি।
খুবই শান্ত স্বরে জবাব প্রেরণার। পরপর বলে,“এখন বলুন এখানে আমরা কিসের মিটিংয়ে এসেছি যেটার সাথে আপনার এই প্রশ্নটা রিলেটেড! আই নিড এক্সপ্লানেশন।”

ভদ্রমহিলা কিঞ্চিত চটেছেন,ইহান যা বুঝলো। চটে যাওয়াটাই স্বাভাবিক, তবে ইহান আজকে পিছু হটবে না। সে নিশ্চুপ দম নিয়ে সরাসরি প্রেরণার মুখের দিকে তাকায়, কোনোরকম সংকোচ কিংবা জড়তা ছাড়াই বলে,“এখন আমি আপনাকে একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চলেছি। আশা রাখছি আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না কিংবা আমাকে......”

_বলুন,আমি হুটহাট কাউকে ভুল বুঝি না। ভেবে চিন্তে ভুল বুঝি।
শান্ত স্বরে আওড়ায় প্রেরণা।

একত্রিশের সুপুরুষ বারবার হোঁচট খাচ্ছে মহিলার সামনে, কিন্তু তাকে আজ একটা বিহিত করতেই হবে। সে চিত্ত কঠোর করে দু মিনিট চুপ করে বলে ওঠে,“আমার কথাগুলো যেভাবেই গ্রহণ করুন না কেন,আমি এটাও চাই আপনি একটা সুন্দর জবাব দেবেন।”

_সুন্দর কথার সুন্দর জবাব দিই আমি।
আবারও শান্ত জবাব প্রেরণার।

ইহান আরও একবার গলা খাঁকারি দেয়, এবার আর কালক্ষেপণ না করে চিত্ত দৃঢ় করে রাশভারী গলায় বলে ওঠে,“আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাচ্ছি প্রেরণা।”

প্রেরণা এই ধরণের কথার জন্য আদতেই প্রস্তুত ছিলো না, সে শুরুতে বুঝতে না পেরে ভাবলেশহীন মুখে তাকিয়ে থাকে। ইহান এবার গভীর করে তাকায় প্রেরণার চোখে, কথাটা রিপিট করে আলাদা আলাদা, স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করে,“আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাচ্ছি!”

প্রেরণা শুনলো,কয়েক মুহূর্ত অবিশ্বাস্য নজরে তাকিয়ে দেখলো ইহানকে, পরপর অস্বস্তি আর বিস্ময়ে মিলেমিশে তাকে হতচকিত লাগলো।

ইহান শান্ত চোখে দেখছে, প্রেরণা শাড়ির আঁচল গুছিয়ে নিয়ে,হাতের ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে অকস্মাৎ উঠে দাঁড়ায়, অস্বাভাবিক ক্ষিপ্রতা তার উঠে দাঁড়ানোতে।
ইহান সামান্য ভড়কায়,তবুও দৃষ্টি নামায় না। প্রেরণা বড় বড় দুটো শ্বাস ফেললো আবার, অস্ফুটে বললো,“আবার বলুন!”

_আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাচ্ছি প্রেরণা।

প্রেরণা এক পা পিছিয়ে গেলো,চোখ বড় বড় করে ইহানের মুখের দিকে কয়েক মুহূর্ত দৃষ্টি দিয়ে অবিশ্বাস্য সুরে বলে উঠলো,“আপনি পাগল?”

না ইহানকে কিছু বলতে দিলো,না নিজে কিছু বললো। কেমন চুরি করে ধরা পরলে চোর যেভাবে পালিয়ে যায়, প্রেরণা ঠিক সেভাবে ছুটতে ছুটতে বেড়োলো রেস্তোরাঁ থেকে।

তাজ্জব বনে গিয়ে ইহান প্রেরণার প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে থাকে, নির্নিমেষ। সে কিছু বলার সুযোগই পেলোনা, কি অদ্ভুত আচরণ! মুহূর্তেই অস্থিরতা ঘিরে ধরে তাকে,ডাকতে গিয়েও ডাকেনা,ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে প্রেরণাকে মেসেজ করতে গিয়েও করে না। চুপচাপ গম্ভীর হয়ে বসে থাকে।
ওয়েটার আসে কোল্ড কফি নিয়ে,ইহান চুপচাপ বিল মিটিয়ে উঠতে যেতেই ফোনটা বেজে উঠলো, ফোনের ওপাশে ইনশিরাহ, হরবরিয়ে বললো,“দাদান প্রস্তাব দিয়েছো মেয়েটাকে?”

_হু।

_কি বলেছে? হ্যা বলেছে?

_না।

শুকনো গলায় ইনশিরাহ বললো,“হ্যা বলেনি? না বলেছে?”

_না।

_তবে সময় চেয়েছে?

_না ইশি।

_তবে কি বলেছে? কিছু তো বলেছে!

ইহান একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,“বলেছে, আপনি পাগল!?”

_______

এক প্রকার ছুটে বেড়িয়েছে প্রেরণা। তাকে দেখে আশেপাশের মানুষ জন অবাক,প্রেরণা সবার দৃষ্টি দেখে নিজেকে সামলে নেয়, শাড়ির আঁচলে কপালের ঘাম মুছে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে একটা ক্যাবে চেপে বসে।
ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে ঢকঢক করে গলাটা ভিজিয়ে নেয়। সংকোচ, বিস্ময় আর অবিশ্বাসের ঘোরে চলে গিয়েছে পুরো । ঘোর কাটলো অ্যাপার্টমেন্টের সামনে নেমে। অফিসে আজ যাবে না সে, দ্রুত ফ্ল্যাটে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দরজায় ঠেশ দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অনেক্ষণ। কানে বাজছে,“আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাচ্ছি প্রেরণা।”

আত্মীয়...লোকটা আত্মীয় বলেই কি প্রেরণা রিয়াক্ট করতে পারলো না? নাকি ভদ্র সভ্য লোকটাকে দু'টো কথা শুনিয়ে দিতে মন চাইলো না প্রেরণার। কোনটা? কেন লোকটার ওপর চড়াও হতে পারলো না!

তবে প্রেরণা নিজেকে সংযত করতে পেরে স্বস্তি পাচ্ছে। এমনিতেই নানা ঝুট ঝামেলা, তার ওপর স্বয়ং ইহান তাজওয়ারের সাথে ঝামেলা বাঁধিয়ে সব কিছু বিতৃষ্ণ করে দিতে চায়না প্রেরণা। নিজের ভাইয়ের সংসারের জন্য একটু সংযত তো হওয়াই যায়! প্রেরণার সর্বোচ্চ যেটা করা উচিত হবে সেটা হলো এড়িয়ে যাওয়া। হ্যা এটাই, এটাই। যেটা সে বরাবর করে এসেছে।

_________

মেজাজটাকে ভীষণ সতর্কতার সাথে নিজের ভেতরে আটকে রেখেছে প্রণমি, বিগত আটত্রিশ মিনিট ধরে। তার মুখ হাসি হাসি, এই অ্যাকাডেমির লোকজন সব অমায়িক,তাদের সামনে কোনো অশোভন আচরণ প্রণমি করতে ইচ্ছুক নয় তাই হাত মুঠি করে চেয়ার ঠেশে নিজেকে সংযত করে বসে আছে। নয়তো কখন গিয়ে ঐ লোককে দু'টো কথা শুনিয়ে দিয়ে আসতো এখানে অতিরিক্ত ভালোমানুষীর নাটক দেখানোর জন্য।

ইশশ! ওস্তাদ জির সাথে বিনয়ে একেবারে লুটোপুটি খাচ্ছে! নাটকবাজ লোক! অথচ সেদিন? প্রণমির মনে পরলো তার থুতনি চেপে ধরে কিভাবে ডলে ডলে লিপস্টিক লাগিয়ে দিয়েছিল ঐ অর্ধ উন্মাদ টা।

প্রণমির রাগের বহু কারণ আছে,তার রাগ চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে তো বাড়ছেই।
ইরফান সবার সাথে হেসে হেসে কথা বলছে,আর ক্লাস সিক্সের বাচ্চাদের তো গাল টিপে টিপে মজা করছে,সবাই তার সাথে দারুণ সময় কাটাচ্ছে বিরতির সময়টিতে। এসব বুঝতে পেরে প্রণমির মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে,সে ঐ লোকের জন্য তার ব্যাচমেটদের সাথে আড্ডা দিতে পারছে না, সব কটাকে কব্জা করেছে ঐ উগ্র লোকটা, কিভাবে করেছে কে জানে!
প্রণমিও যাবে না ওদের কাছে,যা ইচ্ছা করুক সবাই। একাডেমীর সর্বকনিষ্ঠ স্টুডেন্ট রিনি ক্লাস থ্রিতে পরে,সে ইরফানকে ডাকে লম্বা ভাইয়া বলে, গান শুনে বেশ পছন্দ করে ফেলেছে ইরফানকে, আদুরে স্বরে বিরতির সময়টিতে ইরফানকে বললো,“লম্বা ভাইয়া তুমি তোমার মতো করে একটা গান গাও না।”

ইরফান হেসে বললো,“আমার মতো মানে?”

_মানে কাল গিটার নিয়ে যে গাইলে। ওভাবে। আরেকটা গাও।

একে একে সিনিয়রেরাও ধরলো ইরফানকে, ইরফানকে নিয়ে এমনিতেও সবার কৌতূহলের শেষ নেই, ভীষণ বড়লোক বাড়ির ছেলে, তার ওপর দারুন গান গায়।

চোখমুখ শক্ত করে বসে রয় প্রণমি,এরা আগে বিরতি সময়ে তার কাছে গান শুনতো, অথচ দু'দিন ধরে ঐ লোককে নিয়ে নাচানাচি করে, কেন? কারণ লোকটার একটা অনেক দামী গিটার আছে,সেটা নিয়ে ভ্যা ভ্যা করে সবাইকে চমকে দেয়। রবীন্দ্র সঙ্গীত এভাবে গায়? গিটার বাজিয়ে, স্বরলিপি পাল্টে,যাচ্ছেতাই গাইলেই হলো? আর এরাও মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শোনে, ওস্তাদজিও কিছুই বলে না।
এই ওস্তাদ জি নিজেই তো লোকটাকে নিয়ে নাচানাচি করে কুল পায়না, কেনো? লোকটা কি ওস্তাদ জি কে বেশি টাকা দেয়? নিশ্চয়ই তাই দেয়, এনাদের তো আবার টাকা পয়সা উঠোনে গড়াগড়ি খায়।

কতকত কথা ভাবতে ভাবতে তলিয়ে যায় প্রণমি বিরক্তিতে। সবার হাসাহাসিতে প্রণমির ঘোর কাটে। ইরফানকে রাজি করিয়েছে সবাই গানে। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ুয়া বাবাই গিয়ে গিটার এনে ইরফানের হাতে ধরিয়ে দেয়, প্রত্যেকে উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে,প্রণমি উল্টো,সে এই লোকের এমন বেহুদা সুরের গান শুনবে না। না মানে না,তা তার স্বর যতই ভালো হোক না কেন।
দু'হাতে কান চেপে ধরে প্রণমি। মিস জেনি পেছন থেকে ফিসফিসিয়ে বলে,“মামনি হাত নামাও সবাই দেখছে যে।”

বাধ্য হয়ে হাত নামিয়ে নেয় প্রণমি। গিটারের টুংটাং আওয়াজ হজম করতে থাকে চুপচাপ। অতঃপর প্রণমির অপছন্দের তবু বিস্ময়কর স্বর গেয়ে ওঠে,

“দূর হতে আমি তারে সাধিব
গোপনে বিরহডোরে বাঁধিব।
দূর হতে আমি তারে সাধিব
গোপনে বিরহডোরে বাঁধিব ।
বাঁধন-বিহীন সেই, যে বাঁধন অকারণ।

মায়াবন বিহারিনী...

চমকিবে ফাগুনেরও পবনে,
পশিবে আকাশ বাণী শ্রবণে
চমকিবে ফাগুনেরও পবনে
চিত্ত আকুল হবে অনুখন অকারণ।

মায়াবন বিহারিনী হরিণী।”

প্রণমির কুঁচকে যাওয়া কপালের রেখা বিলীন হয় ধীরে ধীরে। না চাইতেও হয়ে যায় তার বিরক্তিকর কর্কশ কন্ঠের শ্রোতা। বসে থাকে চুপচাপ।

গান শেষ হতে সবাই ইরফান মির্জার প্রশংসায় ব্যস্ত,আর প্রণমি তখন নিজের চেতনা ফিরে পেয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে চুপচাপ। কিছু বলছে না, কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। শুধু ভেতরে চাপা রাগে ফেটে পরছে সে, এই লোকটা এতো ভালো গান কেন গাইবে? কেন? এই লোকটা কি এই একাডেমীতে প্রণমির জায়গা কাড়তে এসেছে?
ইরফান আড়চোখে প্রণমিকে এক পলক দেখে,এমনিতে এখানে ভর্তি হবার পর থেকে প্রণমির কাছে এসে বিরক্ত করা তো দূরে থাক,একটা কথাও সে বলে না। শুধু চুপচাপ দেখে,শান্ত গোছের মেয়েটি অকারণে নাক চোখ কুঁচকে থাকে, কপাল কুঁচকে গান করে।আড়চোখে দেখে ইরফান, দু'চোখে মুগ্ধতা এসে ভর করে রাজ্যের।

_______

হন্তদন্ত হয়ে বাড়িতে ঢুকেছে ইহান তাজওয়ার মির্জা। তাকে দেখে বাড়ির সকলেই আন্দাজ করেছে কিছু তো ঠিক নেই, নেই মানে নেই। এমন অস্বাভাবিক ইহানকে লাগে না সচরাচর,ওর প্রতিটা পদক্ষেপ শান্ত,সভ্য।

আলো ইহানের বেশি ক্লোজ, সে দু পা বাড়িয়েছিল যদিও প্রশ্ন করতে,পরে পিছিয়ে গেলো, ইদানিং সবাই ইহানের ধ'ম'ক খাচ্ছে,হয়তো কাজ নিয়ে স্ট্রেসড,বেশি একটা না ঘাটানোই ভালো হবে।
ইহান সরাসরি ঘরে গিয়ে দোর আঁটে। পরনের পাঞ্জাবিটা একটানে খুলে একটা চেয়ারের ওপর ছুঁড়ে ফেলে রেখে গিয়ে বিছানায় বসে চুপচাপ। ক্যাফে থেকে বেরিয়ে পার্টি অফিসে কাটিয়েছে আজ সারাটা দিন।

এর মাঝে প্রেরণার সাথে যোগাযোগ করার ইচ্ছা জেগেছিল খুব, এভাবে কথোপকথন অর্ধসমাপ্ত করে, কিংবা পালিয়ে গেলে তো হবে না। এই অদ্ভুত আচরণটা প্রেরণার থেকে ইহান আশা করেনি। প্রেরণা দৃঢ় চিত্তের মহিলা, যেকোনো একটা উত্তর ইহানকে দিতে পারতেন। এতদিনে ইহানকে দেখে দেখে এতো টুকু সভ্য কি ভাবেননি? মুখের ওপর পাগল বলে চলে গেলেন। কাউকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়া পাগলামি? পাগলের কান্ড?
ফোনটা হাতের মুঠিতে নিয়ে চোখ মুখ কঠিন করে বসে থাকে ইহান।

মুঈন একফাকে আজ কার্যালয় থেকে বাড়িতে এসেছিলো হুট করে, তাও বিশ মিনিটের জন্য। এসে থেকে টিকতে পারেনি ইনশিরাহর মেজাজে। আজ সারাটাদিন কেটেছে ইনশিরাহর রাগ ঝারতে ঝারতে। মুঈনকে হঠাৎ পেয়ে শেষে গিয়ে চড়াও হয়েছে মুঈনের ওপর, তিরিক্ষি মেজাজে বলছে,“কত্ত বড় সাহস! কত্ত বড় সাহস ঐ মেয়েটার আমার দাদানকে পাগল বলে যায় মুখের ওপর! আরে ওর সৌভাগ্য যে আমার দাদানের নজরে পরেছিলো ওর ওপর, হুহ! কি মনে করে কি নিজেকে! বিশ্বসুন্দরী নাকি! এই তুমি ঐ মেয়ের খোজ লাগাও। আমি দেখতে চাই মেয়েকে। আহাম্মক মেয়ে, এই শতাব্দীর সবথেকে বড় আহাম্মক মেয়ে, বুঝলোও না কি হারালো, এই মির্জা বাড়ির বৌ হওয়া সবার কপালে থাকে না। আমার বাপ চাচাদের মতো শশুর, আমার মা চাচীদের মতো শাশুড়ি, আমার আর ইনু শেহুর মতো ননদ। সব হারালো ঐ আহাম্মক মেয়ে, সব।”

মুঈন বুঝতে পারলো তার ভুল সময়ে আসা হয়েছে, সে বৌয়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চুপচাপ কেটে পরতে চাইলো, ইনশিরাহ ওকে আটকে ফেলে বললো,“দাদান আমাকে মেয়ের ছবি দেখাচ্ছে না। তোমার সাথে তো দাদান অনেক কিছু শেয়ার করে। তুমি ছবিটা আনো, ডিটেইলস আনো ঐ মেয়ের,আমিও দেখতে চাই কোন বিশ্বসুন্দরী সে।”

ইনশিরাহর মেসেজ পায় আবারও ইহান, আবারও সেই একই কথা। দাদান মেয়ের ছবি দাও প্লিজ। ইহান অফলাইন হয়ে যায়, গম্ভীর হয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকে। তারপর হঠাৎ করে আবারও ফোনটা হাতে তুলে নেয়, না, সে আজকে ভুল কিছু বলেনি,করেনি, তাই সে এই উদ্ধত আচরণ মানতে নারাজ প্রেরণার, প্রেরণাকে সাফ সাফ বলতে হবে ইহানের সাথে কথা, ইহান কোনো ইভটিজার নয়। ইহানের জানতে হবে উত্তর টা, প্রেরণার মুখে, সেটা হ্যা হলেও আর না হলেও। জানতে হবে।

দ্রুত আঙ্গুল চালায় ইহান, অতঃপর খুব দৃঢ় হয়ে প্রেরণাকে নক করে,“প্রেরণা! আই ওয়ানা টক টু ইউ! স্পিক আপ!”

চলমান.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 87 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন