ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 88

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৮৮
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

রাতে মুঈন বাড়িতে ফিরে ফ্রেশেনআপ হয়েই ইহান তাজওয়ারকে কল করলো। জানতে চাইলে আজ ঠিক কি কি হয়েছে। ইহান ধীরে ধীরে জবাব দেয়।
মুঈনের বিভ্রান্ত স্বর,“আপনি পাগল?...এটা বলেছে? দ্যাটস মিন,উনি বোঝাতে চেয়েছে প্রস্তাব টা উনি নিতে পারছে না।”

_কিন্তু সেটা তো আমায় বলতে হবে মুঈন,ওনার থেকে এমন অদ্ভুত আচরণ আশা করিনি! আমি কি হালকা ধরণের বিহেভিয়ার করেছি? একটা সিরিয়াস কথা বলেছি।

_আচ্ছা ঠিকাছে,তুমি একটু মেয়েটার ছবিটা দাও তো, ইশি দেখার জন্য জেদ ধরেছে!

_না,এখন না! এখনই না।

কলটা কেটে ইহান চুপ করে বসে থাকে,প্রেরণা মেসেজ দেখেনি,এমনকি অনলাইনেই আসেনি আজকে সারাদিন। বিরক্ত লাগছে ইহানের খুব, অস্বস্তি বোধ হচ্ছে, কেমন অস্থির লাগছে। সে কি হঠকারী হচ্ছে? কঠিন মন এমন নাদান হয়েছে কেন? কনভারসেশন চেক করে দেখলো কতটা বেহুদা আচরণ সে করে বসেছে ঝোঁকের মাথায়, প্রেরণা মেসেজ দেখেনি তারপর চারবার অযথা সে নক করেছে প্রেরণাকে। এখন মেসেজ গুলো সরিয়ে ফেললেও কি লাভ? নোটিফিকেশন তো ঠিকই পৌঁছে যাবে প্রেরণা আহসানের কাছে।

ইশি রাতে একটা কান্ড করে বসলো, তার সুপুরুষ দাদানের এই প্রত্যাখ্যান হওয়ার বিষয়টি সে মানতে পারলো না কোনোমতেই,রাত ন'টা নাগাদ ইনু আর ইরফানকে কনফারেন্স কলে রেখে কি কি হয়েছে সব বললো। ইরফান তখন পুলসাইডে ছিল,ইনু ছিলো কিচেনে। সরল ইনু বড় দাদানের প্রত্যাখ্যাত হবার বিষয়টি শুনেই চেঁচিয়ে উঠলো, তার পেছনে হঠাৎ গিয়ে প্রেরণা ফ্রিজ খুলেছে সে টের পায়নি। উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে বললো,“কি! আমার বড় দাদানকে রিজেক্ট করেছে!”

আচমকা লাফিয়ে ওঠে প্রেরণা বুকে হাত চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে,তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে আছে। সারাদিন তীব্র মাথাব্যথা নিয়ে রুমেই ছিলো সে,এই মাত্র বেরিয়ে কিচেনে এসেছে।

ইনু প্রেরণাকে দেখতে পায়নি,সে বলেই যাচ্ছে,“ঐ মেয়ের কত বড় সাহস আমার বড় দাদানকে রিজেক্ট করে। বড় দাদানকে! আপু,অ্যাই আপু, ঐ মেয়ের ছবি দেখবো আমি। ঐ মেয়েকে দেখবো।”

রাগে কাঁপছে ইনু। ওর পেছনে দাড়িয়ে অনুভুতি শূন্য দৃষ্টিতে প্রেরণা দেখছে ওকে। ইনায়া তার চেঁচামেচি অব্যাহত রাখে,“আমি সত্যিই দেখতে চাই ঐ মেয়ে কোন রানী এলিজাবেথ যার কাছে আমার মিস্টার পারফেকশনিস্ট বড় দাদান রিজেক্ট হয়। আহাম্মক মেয়ে। দুর্ভাগা মেয়ে।”

প্রেরণার চুপচাপ দেখতেই থাকে ইনুকে,ইনু হাতের খুন্তি দিয়ে কিচেনের লোয়ার কেবিনেটে বারংবার আঘাত করে কথাগুলো বলছে।

ইশি ওপাশ থেকে বলে,“দাদান মেয়েটার ছবি দেখাচ্ছে না মুঈনকে। এই ইরু! তুই একটু কাইন্ডলি মেয়েটার ডিটেইলস বের করবি?”

ইরফান এতক্ষণ চুপচাপ দুই বোনের কথোপকথন শুনছিলো,তবে তার চোখের সামনে ভাসছিলো দাদান জ্ঞানী আপার থেকে রিজেক্ট হয়েছে সেই দৃশ্য। কিভাবে রিজেক্ট করেছে জ্ঞানী আপা দাদানকে? চ'ড় মেরেছে? বাজে কথা বলে গালি দিয়েছে? নাহলে দাদান অসময়ে এভাবে ঘরের দোর এঁটে বসে থাকবে কেন!

ইরফান অন্যমনস্ক, ইনশিরাহ চেঁচিয়ে ওঠে,“ইরু শুনলি তুই!”

_হ-হু-হ্যা। আচ্ছা রাখ।

কল কাঁটে ইরফান,রাগে কাঁপতে কাঁপতে ইনুও কল কেটে আপনমনে বলে,“গর্দভ মেয়ে,ইহান তাজওয়ারকে রিজেক্ট করে। শাকচুন্নী একটা!”

ঘুরে দাড়াতেই ইনুর ধাক্কা লাগে প্রেরণার সাথে, প্রেরণা থমথমে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। ইনু নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,“আপু আপনি!”

প্রেরণা কয়েক পল ইনুকে দেখে বলে,“টেবিল সেট করছি, প্রিতমকে নিয়ে খেতে এসো।”

পুলসাইড থেকে এসে সরাসরি বড় দাদানের দরজার কড়া নাড়ে ইরফান। ইহান দরজা খুলে দেয় খানিক পরে, দাদানের মুখের অভিব্যক্তি পড়তে ব্যস্ত ইরফানকে দেখে ইহান রাশভারী আওয়াজে বলল,“কিছু বলবি?”

_কে মেরেছে,কে ধরেছে? কে দিয়েছে গাল? তাইতো খোকা রাগ করেছে ভাত খায়নি কাল!

হতাশ ইহান ইরফানের ওপরে, ইরফানের ঠোঁটে বক্র হাসির রেখা। ইহান কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে ভাইকে ওয়ার্নিং দিয়ে বললো,“তোর ভাগ্য ভালো আমার খুব ধৈর্য্য ইরফান। এখন যা! ডিস্টার্ব করিস না।”

_ইশি বললো মেয়েটা তোমাকে রিজেক্ট করেছে!

ইহান জবাব দেয়না, ইরফান ঠান্ডা স্বরে বললো,“প্রেরণা আপা রিজেক্ট করেছে?”

ইহান আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ইরফানের মুখের ওপর দরজা লাগিয়ে দেয়। ইরফান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসে,পর পর মুখটা গম্ভীর হয়ে যায়, তারও ইশি ইনুর মতো রাগ উঠছে হঠাৎ, কতবড় সাহস বড় দাদানের মতো সুপুরুষ কে রিজেক্ট করে,তাও পাগল উপাধি দিয়ে। আসলেই ভদ্রমহিলার খুব সাহস।

ইহান সে রাতে একটা সিগারেট খেয়েছে মাত্র। গতকাল রাত কাটিয়েছে নির্ঘুম। তবে আজ রাতটা সে ঘুমাতে চাচ্ছে। সকাল সকাল সে পার্টি অফিসে যাবে, প্রেরণার সাথে সামনাসামনি দেখা করে কথা বলবে সে।

গতকাল দুপুর থেকে প্রেরণা তার মোবাইলটা ছুঁয়েও দেখেনি। শুদ্ধকে ঘুম পাড়িয়ে সে রাতে ফোনটা চার্জে লাগিয়ে শুয়েছিলো, কখন যে তলিয়ে গিয়েছিল ঘুমের রাজ্যে টের পায়নি। সকাল সকাল উঠে শুদ্ধকে খাইয়ে স্কুল বাসে তুলে দিয়ে যখন রেস্তোরাঁর উদ্দেশ্যে তৈরি হচ্ছিল ঠিক সেসময় গতকালের ঘটনা মনে পরে,মনে পরে ইহান তাজওয়ারের কথা। একজন লোক যার চোখে কখনো প্রেরণা অশোভন কিছু দেখেনি মনের ভুলেও,না টের পেয়েছে, সে হুট করে এসে বলে দিয়েছে বিয়ে করতে চায়। প্রচন্ড ধাক্কা খাওয়ার মতো একটি বিষয়। প্রেরণা ছটফট করেছে কাল গোটা দিন। লোকটাকে সে খুব সম্মান করে, তাই গুছিয়ে প্রতিক্রিয়া দিতে ব্যর্থ হয়েছে, প্রেরণা এখনও ঘোরের মধ্যে। অবিশ্বাস্য ছিলো, অস্বস্তিদায়ক, এবং বিব্রতকর ছিলো সবকিছু, সবকিছু।

রেস্তোরাঁ গ্রাউন্ড ফ্লোরে। ইহান প্রেরণার জন্য গ্রাউন্ড ফ্লোরের এক্সিটের কাছেই অপেক্ষা করছিলো সকালবেলা। তাকে লাগছে উদ্ভ্রান্তের মতন। আজ প্রেরণা এসেছে চলনে তাড়াহুড়ো ভাব নিয়ে, এদিক ওদিক তাকানোরও ফুরসৎ নেই যেন। ইহান ওকে দেখেই টানটান হয়ে দাঁড়ায়,এখানে দাঁড়িয়েই কথা শেষ করবে সে।
কিন্তু না, প্রেরণা একটিবার তার দিকে তাকালোও না, বিপরীত পার্শ্বের এক্সিট পেরিয়ে ঢুকেছে, রেস্তোরাঁয় ঢুকে পরে চোখের পলকেই। ইহান আশেপাশে লোকজন থাকায় ডাকতেও পারলো না প্রেরণাকে, তার কিছুই করার নেই আসলে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ব্যাতীত। বুঝলো প্রেরণা ইচ্ছে করে তাকে এড়িয়ে গিয়েছে। রাগ জমছে বিন্দু বিন্দু করে, নিজের ওপর জমছে, সে কি অভদ্রতা করেছে? সে কি এই ব্যাবহার ডিজার্ভ করে? আশেপাশে এসে দাঁড়ায় ওর দলের ছেলেগুলো। ভাইকে বিষন্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেও কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেলো না ওরা।

______

ছায়ানটে দু সপ্তাহ অন্তর অন্তর একটা প্রতিযোগিতা হয়। প্রত্যেক ব্যাচেই এই নিয়ম। সবগুলো ব্যাচ সেদিন একত্রে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। ঐদিন চারটা-ছয়টা টানা দুঘন্টা ক্লাস হয়। এই প্রতিযোগিতায় ওস্তাদ জি বিজয়ীকে একটা করে মেডেল উপহার দেয়,নয়তো পেন। প্রত্যেক বারের বিজয়ী,প্রণমি আহসান ওরফে প্রণোর বাড়িতে এক দুই করে করে মোট আটটি মেডেল। কারণ প্রত্যেকবার প্রণমীই অঘোষিত বিজয়ী। আজকের প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রণমির উত্তেজনা ছিল ভিন্ন ধরণের। কারণ ঐ যে ঐ লোকটা, যে হাতে গিটার নিয়ে স্বরলিপি পাল্টে ভ্যা ভ্যা করে রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়ে সবাইকে চমকে দেয়,তার মুখে ঝামা ঘষবে প্রণমি মেডেল নিয়ে।

কিঞ্চিত অহংকারী প্রণমির মন, কারণ তার খুশি এই গান, এ জগত থেকে সে হাসি পায়, সেখানে অন্য কেউ এসে তার সাথে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তাকে টেক্কা দেবে, তাও ঐ লোক যার অন্তরে নেই দরদ,নেই মায়া এটা প্রণমি মানতে নারাজ।

কিন্তু হঠাৎ, এই যে প্রণমির অন্তরে লুক্কায়িত সুপ্ত অহংকার ভেঙে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যায় যখন ওস্তাদ জি বিজয়ী হিসেবে আজকে প্রণমির স্থলে ইরফান মির্জার নাম উচ্চারণ করে।
আত্মাসহ কাঁপছে প্রণমি অহংকার বিচূর্ণ হবার দুঃখে,তার চোখ হঠাৎ ঝাপসা হয়। ওদিকে ইরফান পেয়েছে ওস্তাদ জির তরফ থেকে একটা পেন। পেয়েছে সবার মুখ থেকে জয়ধ্বনি।

প্রণমি যেন জমে গিয়েছে অপমানে, মিস জেনি প্রণমির কাঁধে হাত রেখে পেছন থেকে বললেন,“ইটস ওকে মামনি, ও ভালো গান গেয়েছে। জাজমেন্ট ঠিক হয়েছে।”

জাজমেন্ট! জাজমেন্ট তো ঠিক হয়েছেই, ভুলটা হয়েছে প্রণমির, রাগ ঠিক করে হয়নি আজ, গেয়েছিলো “তুমি কোন ভাঙনের পথে এলে।”
আর ঐ লোকটা গেয়েছে “আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে।”
না কোনো ভুল,না কোনো ত্রুটি,গেয়েছে নির্মল, প্রাঞ্জল সুর, ঝর্ণার মতো কলকল করে যে সুর কর্ণে বয়ে চলতে পারে।

প্রণমির রাগটা তো এখানেই, উড়ে এসে জুড়ে বসে লোকটা এভাবে প্রণমিকে অপমান করবে! আজ সবার সামনে প্রণমি একটা লুজার হয়ে গিয়েছে।
এমন কত কত অবুঝ চিন্তা চাপা হিংসার প্রভাবে মস্তিষ্কে ভিড়ছে প্রণমির। তার ইচ্ছে করছে ঐ লোককে গিয়ে চেঁচিয়ে বলতে,“আপনি এই অ্যাকাডেমি ছেড়ে চলে যান। আমি সহ্য করতে পারছি না আমি আপনার কাছে হেরেছি। যে শিল্প কি বোঝেনা, গিটার নিয়ে ভ্যা ভ্যা করে সময় পেলেই। সেই লোক কেন আমার থেকে ভালো গাইবে? তার কুৎসিত কর্কশ কন্ঠস্বর কেন গাইতে গেলেই অন্যরকম হয়ে যায়!”

প্রণমি মুখে এসব বলতে পারবে না, অ্যাকাডেমির লোকজন হাসবে, হাসি ওড়াবে তার, বলবে লক্ষি মেয়ে প্রণমি হিংসা করে, হার মেনে নিতে পারে না।

আর প্রণমি কে লোকটাকে অ্যাকাডেমি ছাড়তে বলার? লোকটা এসে থেকে প্রণমির থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলে, অতিরিক্ত ভালোমানুষী দেখায় যদিও,তবে ভালোমানুষীই তো। লোকটার নামে অভিযোগ তুলবে কিভাবে? না প্রণমিকে বিরক্ত করে,না কথা বলতে আসে। কিছুই করে না লোকটা, অথচ প্রণমি জ্বলছে। অন্তরটা ভীষণ জ্বলছে প্রণমির আজকের হার না মানতে পারায়।

পেন টা সযত্নে ইরফান তার সামনের হারমোনিয়ামে রেখে ঘাড় ঘুরিয়ে প্রণমির দিকে এক পলক দৃষ্টি দেয়, বিষন্ন চেহারার মেয়েটিকে দেখে ইরফানের বুঝতে বাকি নেই কি ঘটেছে, এতোটুকু ওমেন সাইকোলজি ইরফানের নখদর্পণে। হুট করে নিজেকে খুব অপরাধী লাগলো খুব, এই মেয়ের মুখে আরো একবার বিষন্নতা এনেছে ইরফান তাই।

ওস্তাদ জি গিয়েছেন অ্যাকাডেমির বাইরে, এখন পনেরো মিনিট বিরতি সময়। বাচ্চারা ইরফানকে ধরলো,“লম্বা ভাইয়া গিটার নাও,লম্বা ভাইয়া গান শোনাও।”

এই সব কটা বাচ্চা ইরফানের চ্যালা হয়েছে,আগে যারা প্রণমির ভক্ত ছিলো। ইরফান ওদের চূড়ান্ত বিরক্ত করে, আবার চূড়ান্ত মাতিয়ে রাখে আনন্দে।
আজও ওদের আবদার পূরণ করতে গিটার হাতে তুলে নেয়। দূরে তাকিয়ে দেখতে পায় প্রণমি কপাল কুঁচকে বসে আছে। ইরফান সামান্য হেসে সুর তুলে গাইতে শুরু করে,

“তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে
হৃদয়ের কোঠরে রাখবো
আর হৃদয়ের চোখ মেলে তাকিয়ে
সারাটি জীবন ভরে দেখবো
আমি নেই নেই নেই রে
আমি নেই নেই নেই রে
যেন তোরই মাঝে হারিয়ে গেছি ”

প্রণমির নেত্রযুগল বিস্ফোরিত, মাথাটা দপ করে জ্বলে যায় হঠাৎ, এতক্ষণে চাপা রাগ, বিতৃষ্ণ ভাব বাধ ভেঙে গলগল করে বেরিয়ে যেতে চায়। আর একটা শব্দও ইরফানকে গাইতে না দিয়ে দুকান চেপে ধরে চেঁচিয়ে ওঠে,“ছিঃ”

কক্ষের প্রত্যেকে হতচকিত হয়ে দৃষ্টি দেয় প্রণমির দিকে, ইরফান গান থামিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকায়।
প্রণমি এবার সুযোগ পেলো লোকটার ভ্যা ভ্যা নিয়ে খোটা দেওয়ার। কন্ঠে ভারি বিরক্তির সুর নিয়ে দ্বিতীয় দফায় চেঁচিয়ে ওঠে,“ছিঃ এসব কি!”

_গান।
অস্ফুট জবাব দেয় তাজ্জব বনে যাওয়া ইরফান। প্রণমি তাচ্ছিল্যের সাথে বলে,“ছিঃ কি রুচিবোধ! এটা গান? জঘন্য!”

ইরফান বোকার মত কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলে,“এটাও গান। আর এটা জঘন্য না।”

_জঘন্য না বলছেন?

_হ্যা জঘন্য না, এখানে প্রেয়সীকে অতি যত্নে আগলে রাখার কথা বলা হয়েছে। খারাপ মিনিং তো নেই! ভাষা বিকৃত করে তো গাওয়া হয়নি!

_এ ধরণের ভুংভাং গান এখানে চলবে না, আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখতে আসি। কাউকে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে বলে ভ্যা ভ্যা করতে নয়।

ইরফান তাজ্জব হয়ে শুধু প্রণমির মুখ চালানোই দেখছে। বাইরে থেকে ওস্তাদ জি ফিরে এসে ধমকের সুরে প্রণমিকে বলে,“প্রণমি সিনিয়রদের সাথে উঁচু গলায় কথা বলা আমি শিক্ষা দিইনা । আর তোমার বাচনভঙ্গি খুবই দৃষ্টিকটু। ভাষা ঠিক করো। ভ্যা ভ্যা শব্দটা বলবে না।”

দমে যায় প্রণমি, পর পর বলে,“কিন্তু ওস্তাদ জি উনি কিসব আজগুবি গান গাইছে।”

_এটা বিরতি টাইম প্রণমি। ইরফান নিশ্চয়ই ক্লাস টাইমে এসব গান করে না। বিরতি সময়ে সবাই তো যে যার ইচ্ছে মতো থাকো।

এবার সম্পূর্ণ রুপে দমে যায় প্রণমি। ইরফান নির্নিমেষ দেখতে থাকে মেয়েটিকে। দেখে মনে হচ্ছে ওস্তাদ জির কথায় দমে গিয়েছে মেয়েটা,তবে আদতে তা নয়, ইরফান জানে,এই মেয়েটার রাগ আরেকটু বেড়ে গিয়েছে তার ওপর। রাগের ওপর আরেক স্তর রাগ জমেছে, ইরফানের পরিশ্রম বাড়ছে, বাড়বে।

বাকিটা সময় প্রণমি চুপ থাকলো। মিস জেনি একটু ওয়াশ রুমে যেতেই ইরফান হুট করে এসে ওর কিছুটা দূরে বসতেই প্রণমি কপাল কুঁচকে ফেললো পরিচিত পারফিউমের ঘ্রাণ নাকে যেতেই। নীরবতা ভেঙে,কন্ঠে নিদারুণ বিরক্তি আর ক্ষোভ ঢেলে প্রণমি বলে,“ইচ্ছে করে এসব করেন তাইনা।”

_আমি কিছুই করি না প্রণমি। তোমার ভুল ধারণা হচ্ছে। তুমি অহেতুক অস্থির হচ্ছো।

দূরে বসেই জবাব টা দিলো ইরফান। প্রণমিও ভাবলো তাই, সে অহেতুক অস্থির হচ্ছে। এই লোককে নিয়ে,এই খবিশ আর বেহুদা লোককে সে যত মাথায় রাখবে তত তারই মাথা নষ্ট হবে। এই লোক জাহান্নামে যাক, পুতুলের মতো করে সাজিয়ে গাক, নয়তো অ্যানাবেলের মতো করে সাজিয়ে গাক। প্রণমি মাথা ঘামাবে না। প্রণমি নিজের আত্মমর্যাদা ধীরে ধীরে কমিয়ে ফেলছে এই অ্যাকাডেমিতে চেঁচিয়ে, লাফিয়ে উঠে। আর না। এখন থেকে স্থির হয়ে থাকবে প্রণমি। এই লোক গিটার নিয়ে ভ্যা ভ্যা করুক,অথবা বাঁদর নাচ নাচুক ব্যাচমেটদের নিয়ে প্রণমি নাক গলাবে না।

ইরফান প্রণমির নির্লিপ্ততা চুপচাপ দেখে, আজ হঠাৎ করে বহুদিন পরে ইরফান ফরসা, মায়াবী মুখটাকে দেখলো এতো কাছ থেকে, দেখলো ঐ গালের লাল তিলটা, থেমে গেলো আশেপাশের দুনিয়া, ওস্তাদ জির কথা শুনতে পাচ্ছে না সে, বাড়ি থেকে মা ফোন করছে কানে যাচ্ছে না তার, সে ডুবে গেলো জ্ঞানী আপার অভিমানী বোনটির লাল তিলে, যা তিলের মালকিন টেরও পাবে না কখনো। টের পেলে ভাইয়া আর আপুকে গিয়ে কেঁদে কেঁদে বলবে,“ঐ অমানুষ টা আমার তিলে ডুব দিয়েছে ভাইয়া,আপু।”

________

শুদ্ধকে হোমওয়ার্ক করতে দিয়ে টানা চব্বিশ ঘন্টা পরে প্রেরণা ফোনটা হাতে নিলো, মেসেজ চেক করতে গিয়ে ইহানের মেসেজ গুলো দেখতে পেয়ে তার হাত থামে।
তড়িঘড়ি করে উঠে বসে সে। আজকের দুপুরের কথা মনে পরে যায়, রেস্তোরাঁয় গিয়েছে আর এসেছে, এর মাঝে ইহানের সাথে তার দেখা হয়নি। প্রেরণা চায়ওনা দেখা হোক, অফিশিয়াল কথা আজ থেকে সাব্বিরকে দিয়ে বলাবে। চুপ করে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া ছাড়া তার করণীয় কিছুই নেই। তার ভাইয়ের বৌয়ের স্বভাব গোলমেলে, কিনা এটা নিয়েও প্রিতমের সাথে কান্নাকাটি করে ঝামেলা,“আপু কিভাবে পারলো আমার বড় দাদানের প্রস্তাব নাকচ করে দিতে? তোমরা তিন ভাইবোন এতো অসামাজিক কেন? আমার দাদানদের এতো অপমান করো কেন?”

ইহানের মেসেজ দেখে প্রেরণা একটা বিশাল বড় ভদ্র মেসেজ লিখে ফেলে ইহানকে পাঠাবে বলে, তখনই কলিং বেল বেজে ওঠে, ইনুকে নিয়ে প্রিতম শান্তিনীড়ে গিয়েছে, মিস জেনি আর প্রণমি ছ'টার আগে আসবে না, তবে কে হতে পারে?

প্রেরণা দ্রুতপায়ে হেঁটে গিয়ে ডোর ভিউয়ারে চোখ রাখতেই থমকায়। সমস্ত মুখমণ্ডল নিমিষেই ছেয়ে যায় অস্থিরতায়, অস্বস্তিতে। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে ইহান তাজওয়ার মির্জা,টান টান হয়ে,চোখ মুখ কঠিন করে।

দুমিনিট প্রেরণা ভাবলো সে কি করবে, ফাঁকা বাড়ি, এই অবস্থায় দরজা খুলবে? নাকি খুলবে না, না খুললে অভদ্রতা হবে? ইনুর চোখে অসামাজিক হয়ে যাবে প্রেরণা? আর এই লোকটা, এতদিনের জানা শোনা ইহান তাজওয়ারের সাথে মেলাতে কষ্ট হচ্ছে প্রেরণার। কেমন ডেসপারেট আচরণ! নাকি প্রেরণার ভুল?

কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে প্রেরণা দরজাটা খুললো, ইহান শান্ত চোখেই ওকে দেখলো, প্রেরণা একটা লম্বা শ্বাস ফেলে কয়েক সেকেন্ডে নিজের মধ্যে দৃঢ়তা আনে, সামনাসামনি ভদ্রভাবে রিজেক্ট করবে। কোনো উচ্চবাচ্য নয়।
ইহান ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে,“হেই প্রেরণা! আপনি পালাচ্ছেন কেন?”

প্রেরণা এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে লোকটার দিকে তাকায়, অস্বস্তি নিয়ে বলে,“কোথায় পালাচ্ছি।”

_করছেন না তেমন? হেই আন্সার মি! ডু আই লুক লাইক আ ব্লাডি ইভটিজার,ব্লাডি স্টকার! যাকে দেখলে ছোটাছুটি করতে হয়! আমার এমন কোন আচরণে আপনি বুঝলেন আমি একটা বখাটে যে বিরক্ত করবো আপনাকে! আন্সার মি!

কন্ঠে ধ'ম'ক ইহানের,জানতে চাইছে জবাব, প্রেরণা জবাব গোছাচ্ছে। দু'জনে দাঁড়িয়ে আছে মুখোমুখি,ইহান দরজার বাইরে, প্রেরণা অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে।

চলমান.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 88 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন