ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 89

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৮৯
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

“ভেতরে আসতে পারি? আমি চাই আপনি জবাব টা ধীরে সুস্থে দেবেন।”

আমতা আমতা করতে থাকা প্রেরণাকে কাঠ কাঠ গলায় বললো ইহান। প্রেরণা সংকোচের সাথে চুপচাপ সরে দাঁড়ায় দরজা থেকে। ইহান স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ঘরে ঢোকে। তখন প্রেরণা থমথমে মুখে বলে,“ইনু-প্রিতম শান্তিনীড়ে।”

_আই নো,আমি তো আপনার কাছে এসেছি।

সহজ স্বাভাবিক উত্তর দিয়ে সোফাতে বসলো ইহান,শুদ্ধ এলো ইহান আংকেলকে দেখতে পাওয়া মাত্রই। ইহানের সাথে কথা বলে মাম্মার কথায় আবারও চলে গেলো হোমওয়ার্ক করতে।

ইহান হালকা গলায় বললো,“বসুন।”

প্রেরণা ইহানের মুখোমুখি একটা সোফাতে বসলো জড়োসড়ো হয়ে।

_এবার জবাব টা দিন।

_আপনার প্রস্তাবে রাজি হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না ইহান।

ইহান চুপচাপ শুনলো,জবাবে বললো,“তো ওইভাবে পালিয়ে আসার মানে কি? আমি কি জোর করতাম? আমরা তো আলোচনা করতে পারতাম।”

_ঠিক তা না, বিষয়টা হচ্ছে....বিষয়টা হচ্ছে আমি আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম আপনার কথা শুনে, আমি আপনার থেকে এমন কিছু আশা করিনি।

ইহান শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে,বললো,“আমি বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে কোনো অন্যায় করেছি বলে মনে হচ্ছে না। বিয়ের প্রস্তাব দেয়া কোনো ধরণের হ্যারাসমেন্টের অন্তর্ভুক্ত নয় যতক্ষন না ভিক্টিমকে জোর জবরদস্তি করা হয়। আর আজ এখানে আপনাকে জোর জবরদস্তি করতেও আসিনি,এসেছি আলোচনা করতে,যেটা সেদিন অর্ধসমাপ্ত রেখে চলে এসেছেন।”

_আমি বিবাহিতা ইহান।
স্পষ্ট উত্তরটা দিলো প্রেরণা।

_আপনি বিবাহিতা নন ,আপনি বিধবা, ধর্ম-সমাজ-আইন সবকিছু আপনাকে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দিয়েছে।

ইহানের ভদ্রভাবে বলা স্পষ্ট কথাগুলো শুনে প্রেরণা কিছু মুহূর্তের জন্য দুচোখ বন্ধ করে নিলো,একটা লম্বা শ্বাস ফেললো।
ইহান বিচলিত না হয়ে বলতে লাগলো,“আজ অথবা কাল, ধরুন একটা সময় কাউকে আপনি জীবনের সাথে জরিয়ে নিলেন, নিতেই পারেন, অবশ্যই নিতে পারেন, তবে সেই লোকটা আমি কেন নয়? আমি ঐ লোকটা হতে চাই। আমার আপনাকে ভালো লাগে, এবং নিজেকে আমি আপনার এবং শুদ্ধর উপযুক্ত মনে করি। এবং আপনাকেও, আপনি মাই কাইন্ড অব লেইডি প্রেরণা! বিয়ে করবেন আমায়?”

এ পর্যন্ত ইহান কন্ঠস্বর নমনীয় করে ফেললো। প্রেরণা তীব্র সংকোচে জমে গেলো,বার কয়েক ঢোক গিলে আবারও একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,“আমি বিবাহিতা,আমি আমার স্বামীকে ভালোবাসি।”

_“মরহুম স্বামীকে” হবে কথাটা প্রেরণা, বাসতেই পারেন.....
ইহান শান্ত স্বরে জবাব টা দিলো।

_বিয়ে একবার হয়।

_আপনি বিবাহিতা নন, মন চাইলে আরো একবার হালাল সম্পর্কে জড়াতে পারবেন। এবং এটা কখনোই অন্যায় না।

_অহেতুক কথা। আর এটারনাল লাভ?

_আপনিটা জীবিত প্রেরণা।

_আপনি প্লিজ যান,আমি আমার জবাব টা দিয়ে দিয়েছি ইহান।
এবার কন্ঠে বিরক্তি মিশিয়ে প্রেরণা জবাব দেয়। ইহানের স্থির দৃষ্টি থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে।

দু'জনের মাঝে মিনিট দুয়েকের নীরবতা,ইহান দৃষ্টি নামায় না। প্রেরণার ইচ্ছে করছে না এই লোকটার সাথে বাজে ব্যবহার করতে মোটেই, সে ধীরে সুস্থে ব্যাপারটাকে অন্য ধারায় নিতে বললো,“আপনি একজন অবিবাহিত পুরুষ।”

_তো আমি বিবাহিত হলে আপনাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতাম?

প্রেরণা চুপ হয়ে যায়, ইহান বললো,“আপনি ব্যাপারটা দিয়ে কি বোঝাতে চাইলেন? ওকে ফাইন,আপনি আপনার মৃত স্বামীকে ভালোবাসেন,আপনি আমাকে বিয়ে করতে পারবেন না। মেনে নিলাম। তবে....”

প্রেরণা দৃষ্টি মেলায়, ইহান উঠে দাঁড়ায়,বলে,“কারণ টা এমন হলে দ্যাটস টোটালি ফাইন। আই রেসপেক্ট ইয়র ফিলিংস অ্যান্ড মাইন ঠু, বিরক্ত করবো না, প্রশ্নই ওঠে না বাট......”

_বাট?

_যদি হয় বস্তাপচা সোস্যাইটির ফালতু ট্যাবুতে জর্জরিত মানুষের চোখে নিজের আত্মমর্যাদা বাঁচাবার প্রয়াশ! ট্রাস্ট মি প্রেরণা,এমনটা যদি হয় না? তবে..

_তবে?

_হয়তো আরও একবার প্রস্তাব দিতে পারি‌।
অমায়িক হেসে কন্ঠে নিদারুণ কোমলতা ঢেলে ইহান বললো।

চোখমুখ কঠিন করে ফেলে প্রেরণা,নিদারুণ অস্বস্তি, অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রেরণা,
ইহান ও বিব্রত চেহারায় দৃষ্টি দিয়ে বললো,“এতোটা উদ্বিগ্ন কেনো? আপনি তো আপনার মরহুম হাজবেন্ডকে ভালোবাসেন, এবং তার জন্য বিয়ে করবেন না, আপনার নিজের ওপর বিশ্বাস আছে আপনার মন কখনো সুইং করবে না,তবে?”

_কারণ আপনার সাথে এ ধরণের ব্যাবহার যায়না। আপনি বাচ্চা অবুঝ ছেলে নন।

_আমি তো এটা বলেছি,যদি কারণটা অন্য কিছু হয়, নয়তো আই রেসপেক্ট ইয়র ফিলিংস। কখনোই আমার দ্বারা আপনার অসম্মান হবে না কসম। আই উইল লিভ ইউ অ্যালোন।

কথা শেষ করলো ইহান,প্রেরণা চুপচাপ বসে আছে। ইহান আবারও বললো,“আমার এক কথা প্রেরণা,হয়তো অতিরঞ্জিত লেগেছে, তবে এটাই, আমার দ্বারা আপনি অসম্মানিত হবেন না, নিশ্চিন্ত থাকুন।”

_এক অহেতুক বিড়ম্বনায় ফেলছেন ইহান আপনি নিজেকে, সাথে আমাকেও, আপনি বিয়ে করে নিয়েন, বিষয়টা দুই বাড়িতে জানাজানি হলে আমরা দু'জন হয়তো আর স্বাভাবিক হতে পারবো না, আপনার সেই বয়স নেই ইহান পাগলামি করার। আমাদের দু'জনেরই বয়স নেই এসব কন্ট্রোভার্সিতে জড়ানোর। বিয়ে করে নিয়েন। এমন কিছুই কখনো হবে না,আমি আমার সিদ্ধান্ত বদলাবো না।

ইহান চুপচাপ প্রেরণাকে দেখে,তার যা বলার বলা শেষ,আর একটা কথাও বাড়াতে চাচ্ছে না সে। শুধু বললো,“আমি বিয়ে করবো কিনা সেটা সময় সাপেক্ষ, তবে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন কোনোরকম কন্ট্রোভার্সি হবে না আপনাকে নিয়ে।”

এরপর ইহান হালকা গলায় ডাকলো শুদ্ধকে। শুদ্ধ ছুটে আসতেই ইহান ওকে কোলে নিয়ে বললো,“তোমার স্পাইডারম্যানের হাত ঠিক হয়েছে?”

শুদ্ধ মাথা নেড়ে জবাব দিলো। প্রেরণার হঠাৎ শুদ্ধকে লোকটার কোলে দেখে অস্বস্তি বোধ হচ্ছে,যেমনটা আগে হতো না। ইহান পাঞ্জাবির পকেট থেকে তিনটা চকোলেট বের করে শুদ্ধর হাতে দিয়েই বললো,“একটা শুদ্ধর,একটা তার খালামনির,একটা তার মামীমনির। ওকে?”

শুদ্ধ তার ফোকলা দাঁতে হেসে বললো,“ওকে।”

শুদ্ধকে নিয়ে ইহান আরো কিছুক্ষণ আড্ডা দিলো,ইহানের গিফট করা কালার পেন্সিল দিয়ে শুদ্ধ কি কি এঁকেছে সব দেখলো। পুরোটা সময় প্রেরণা ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছটফট করেছে শুদ্ধকে ইহানের থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু গলা দিয়ে কোনো কথা বলতে পারলো না। শুদ্ধকে রেখে ইহান উঠলো, গম্ভীর মুখশ্রীতে অমায়িক হাসি লেপ্টে আছে লোকটার, দু চোখে নেই কোনো সংকোচ কিংবা জটিলতা , ভদ্রভাবে প্রেরণার দিকে তাকিয়ে বললো,“আসছি। ভালো থাকবেন।”

আকাশে খুব মেঘ করেছে, সিঁদুর রঙা মেঘ। ইহান প্রেরণার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে অন্য কোথাও গেলো না,সোজা শান্তিনীড়ে চলে গেলো। যতক্ষণে শান্তিনীড়ে পৌঁছাল তখন আকাশ ছাপিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। গাড়ি থেকে নেমে লম্বা কদমে ঘরে ঢুকেই থমকালো।
আলো,রিতু,পরী শুকনো মুখে ওকেই দেখছে। ওরা সবাই নিচতলায় ছিলো তখন। সিনিয়র মির্জারা কেউই বাড়িতে নেই। ইহান জানতে পারলো ইনু-প্রিতম কিছুক্ষণ আগেই চলে গিয়েছে, ইহান সিঁড়ির দিকে যেতে নিলে আলো বলে ওঠে,“ইহান।”

_হু বড় মা?
কাহিল স্বরের জবাব।

_তোকে মেয়েটা রিজেক্ট করেছে?

ইহান হতচকিত হয়ে ঘুরে মা চাচীদের দেখে। তিনজন উদ্বিগ্ন হয়ে তাকিয়ে আছে ইহানের মুখের দিকে। এই ব্যাপারটা নিশ্চয়ই ইশি-ইনু ছড়িয়েছে, ইহানের বুঝতে সময় লাগলো না। দীর্ঘশ্বাস ফেলল ইহান, বিরক্ত হলো ইশির প্রতি, ওদেরকে খুব করে ধমকাতে হবে।

ইহান কথা সাজিয়ে বললো,“কিসব আজেবাজে কথা!

_ইহান মেয়েটার যদি বয়ফ্রেন্ড না থাকে তবে আমি আর তোর মা গিয়ে তার সাথে আলাপ করবো, চিন্তা করিস না মেয়েদের মন তো,গলে যাবে বাবা। তুই অ্যাড্রেস দে মেয়ের!

_তোমরা থামবে বড় মা? কি সব শুরু করেছো!

সে সময়ে ইরফান পৌঁছাল বাড়িতে অল্প স্বল্প ভিজে। ইহান রাগী চোখে ভাইয়ের দিকেও তাকায়। তারপর মা চাচীদের বলে,“এই বিষয়টা এখানে ভুলবে তোমরা! আমার বাবা-চাচাদের কানে তুলে আমাকে বিব্রত করার দরকার নেই। আমি এমনিতেই অনেক স্ট্রেসড!”

সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে ইহান। রিতু গিয়ে ইরফানকে ধরে,“এই তুই তো ওর পেটের খবর জানিস ‌। মেয়েটাকে চিনিস? কেমন দেখতে? বয়স কত? কোন ক্লাসে পড়ে?”

আলো বললো,“ছেলেটা দ্বিতীয় বারের মতো কষ্ট পেলো, মেয়েটার অ্যাড্রেস পেলে পারিবারিক ভাবে বসতাম যদি মেয়েটার বয়ফ্রেন্ড না থাকে তো। আজকাল মেয়েরা পলিটিশিয়ানদের খুব অপছন্দ করে,নয়তো ইহানকে রিজেক্ট করার একটা কারণ আমি দেখছি না। ইরফান অ্যাড্রেস টা এনে দিতে পারবি একটু বুদ্ধি খাটিয়ে দাদানের কাছ থেকে।”

ইরফান শুকনো মুখ করে মা চাচীকে দেখছে, পর পর মাথাটা নিচু করে নিয়ে গম্ভীর হয়ে বলে,“পারবো না। দাদানের বিষয়টা দাদানকে বুঝতে দাও। এত্তো ঘেটো না তো! লীভ হিম অ্যালোন!”

________

গুণে গুণে চৌদ্দটা দিন কাটলো, দু সপ্তাহে প্রণমি নিজেকে বদ্ধপরিকর করেছে সামনের প্রতিযোগিতা জিতবে বলে। নিয়মিত চর্চায় রেখেছে নির্বাচিত গানটি। ঐ লোকের সামনে নার্ভাস কিংবা বিরক্ত হয়ে প্রণমি নিজের লক্ষ্য পূরণে ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে না, মনে মনে এতটুকু দৃঢ়তা সে এনেছে।
তার একমাত্র মনোযোগ থাকবে তার গান,শুধু তার গান।

প্রণমির চোখে মুখে চাপা উত্তেজনা দেখে ইরফান দূরে বসে হাসে চুপচাপ। এই মেয়েটা ভীষণ বাচ্চা, ইনুর চেয়েও বেশি বাচ্চা বাচ্চা টাইপ। হিংসা করার ধরণটা একেবারেই বাচ্চামো ধরণের। মনে হচ্ছে পরিণত শরীরে বাচ্চার আত্মা, যেমন ইরফানের শরীরে মনস্টারের আত্মা।
আজকে ইরফান একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে বসলো, প্রণমির সেদিনের সেই বিষন্নতা তাকে বিচলিত করেছে, এখানে সে আসে,তার সময় কাটায়,মেয়েটাকে দেখে, সেই মেয়েটাকে যার লাইফে ইরফান খুব বাজে একটা অ্যাক্সিডেন্ট ঘটিয়ে দিয়েছিল। ইরফান মির্জা এখন আর কখনোই চায়না মেয়েটির বিষন্নতার কারণ হতে, সে ঠিক করেছে আর কখনো সে কোন প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না।

ওস্তাদজিকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতেই প্রণমির মুখটা ফ্যাকাসে হলো। এই লোক অংশ নেবে না মানে? আজ তো একে হারাবে বলে প্রণমি প্রস্তুত। এই লোক অংশগ্রহণ না করলে কিভাবে হবে?

ওস্তাদ জি বললেন,“কেন ইরফান? তোমার কি ঠান্ডা লেগেছে?”

_না,তবে ইচ্ছে করছে না।

প্রণমি উশখুশ করছে,নিজেকে সামলাতে না পেরে বলে ফেলে,“ঠান্ডা লাগেনি। তো? তবে ফাঁকি দিচ্ছেন কেন? প্রতিযোগিতায় আপনাকে অংশগ্রহণ করতে হবে সবার মতো।”

কন্ঠে বাচ্চামি ধরণের জেদ প্রণমির। অ্যাকাডেমির সবাই-ই দিনকে দিন ভদ্র নম্র প্রণমির হঠাৎ হঠাৎ এমন অদ্ভুত আচরণে আশ্চর্য হয়। এতোটা খামখেয়ালি,জেদী আচরণ তাও সিনিয়র ব্যাচমেটদের সাথে,এসব প্রণমি কখনও করেনি।

ওস্তাদ জি প্রণমিকে চুপ করতে বলার আগেই প্রণমি ইরফানকে খুঁচিয়ে বললো,“হার জিত তো প্রতিযোগিতায় থাকবেই, ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়াটা লুজারদের বৈশিষ্ট্য।”

ইরফানের ঠোঁটে অস্পষ্ট হাসির রেখা,সে নির্নিমেষ দেখছে প্রণমি কতটা ডেসপারেট তাকে হারিয়ে দিতে,যতটা না ডেসপারেট এই প্রতিযোগীতা জিততে। যেন এই আজন্ম দুঃখী মেয়েটা এক জনমের শান্তি পাবে ইরফানকে গানে হারিয়ে দিতে পারলে। ওকে কিছুক্ষণ দেখে ইরফান একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ওস্তাদ জিকে শান্ত স্বরে বললো,“আমি অংশগ্রহণ করবো ওস্তাদ জি।”

প্রণমির ঠোঁট প্রশ্বস্ত হয় হাসিতে,তার মনে চাপা উত্তেজনা,সুপ্ত আত্মগড়িমা,আজ এই লোকটাকে গো হারা হারাবে সে।

প্রতিযোগিতা হলো, প্রণমি গাইলো,“আমারো পরান যাহা চায়।” যথারীতি প্রশংসা কুড়িয়ে নিলো সবার।

যখন ইরফানের পালা এলো,প্রণমি উৎসুক হয়ে বসেছিল। ইরফান প্রণমির বাচ্চামো দেখে সামান্য হাসলো, তারপর গাইলো “তুমি রবে নিরবে।”

আজ একটা কান্ড করে বসলো ইরফান প্রত্যেকের অগোচরে। না সুর ঠিকমতো হলো,না রাগ, স্বরলিপিও মনে হলো যেনো কয়েক যায়গায় হোঁচট খেলো,তবে সেটা অতি সাবধানে,যেন ওস্তাদ জির কাছে ভুলটা ধরা পরলেও এটা যে ইরফানের ইচ্ছাকৃত সেটা যেন কেউ না বোঝে।
কিন্তু প্রণমি ঠিকই বুঝলো, ছড়িয়ে যাওয়া হাসি মলিন হলো মেয়েটার। কপালে পরলো ভাজ, চেহারা জুরে অপ্রস্তুত ভাব। কেমন অস্থির হয়ে নড়াচড়া করছে বসে বসে। এই লোকটা কি ইচ্ছে করে এমন করেছে? হ্যা তাইতো! কারণ এই গান টা সেদিন যখন মিনতি আন্টিদের শুনিয়েছিল তখন তো একেবারে পার্ফেক্ট ছিল। এখন এমন গাইলো কেন?
প্রতিযোগিতা জিতেও মনে খচখচানি শুরু হয়েছে প্রণমির। পর পর নিজের ওপর বিরক্তি ধরে গেল নিজেরই, সে পাগল হয়ে যাবে ধীরে ধীরে নিশ্চিত। এই লোকের পাল্লায় পরে সে পাগল হয়ে যাবে। মাথা থেকে ঝারতে হবে প্রণমির এই লোকটাকে।
প্রণমি মাথা ঝাঁকায় ইরফানকে মাথা থেকে বেড় করার জন্য। এই লোক ইচ্ছা করে হারুক নয়তো যা ইচ্ছা করুক। প্রণমি জিতেছে প্রণমির যোগ্যতায়। এটা নিয়ে মনে খচখচানি প্রণমি রাখবে না, এই লোককে মস্তিস্কে স্থান প্রণমি দেবে না। না মানে না। বারংবার মাথা দোলাতে থাকে প্রণমি।

আজ অ্যাকাডেমি ছুটি হয়েছে পনেরো মিনিট দেরী করে। ইরফান রোজ সবার প্রথমে বেড়িয়ে নিতিনের চায়ের দোকানে বসে থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রণমি আর মিস জেনি ক্যাবে উঠে চলে যায় ততক্ষণ পর্যন্ত বসে থাকে।
আজ প্রণমিরাও বেড়োতে দেরী করছিলো, ওদিক থেকে ইশি কল করছে,ইহান কল করছে অনবরত। কলগুলো রিসিভ করছে না ইরফান, তার ধ্যান ছিলো একাডেমীর গেটে। খানিক বাদে মিস জেনিকে নিয়ে প্রণমি যখন বেড়োলো, ওদের দিকে দৃষ্টি দিতেই ইরফান তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ালো উদ্বিগ্ন হয়ে। তার কপালে ভাঁজ পরলো, দ্রুত পা ফেলে রাস্তা পার হয়ে ছুটে গেলো প্রণমির কাছে, বাম হাত দিয়ে ডান হাত চেপে রেখে অঝোর ধারায় চোখের জল ফেলছিলো মেয়েটা,আর কাঁপছিল একটু একটু করে ।

ইরফান অস্থির হয়ে বললো,“কি হয়েছে?”

মিস জেনির মুখটা থমথমে, এই ছেলেকে আগে ঘৃণা করলেও ইদানিং একাডেমীতে ছেলেটার কার্যকলাপ দেখে মিস জেনির আচরণে নমনীয়তা এসেছে, সে ধীরে সুস্থে বললো,“ওয়াশরুমে গিয়েছিলো,লকের সাথে হাত আটকে গিয়েছে ভুল করে।”

গলগল করে রক্ত ঝরছে হাত থেকে,প্রণমি কাঁদতে কাঁদতে নাক বেয়ে সর্দি বের করার অবস্থায়। ইরফান তাড়াহুড়ো লাগিয়ে বললো,“ওকে একাডেমীর ভেতরে নিয়ে যান,আমি ডিসপেনসারি থেকে টেম্পোরিরি এইড বক্স নিয়ে আসছি।”

_একাডেমী লক করে এসেছি আমি,ওস্তাদ জি রা তো কি কার্ড নিয়ে চলে গিয়েছেন।
হতাশ গলায় জবাব দিলেন মিস জেনি। পর পর বললেন,“ওকে নিয়েই যাচ্ছি আমি,একটা ক্যাব পেলেই হয়।”

_ওকে দেন এখানে বসান,আমি নিয়ে আসছি , ক্যাবের অপেক্ষা করবেন কতক্ষন! এভাবে রক্ত ঝরতে থাকা তো ভালো নয়।

প্রণমির হঠাৎ খুব রাগ চাপলো আবারও,কন্ঠে এতো দরদ দেখে লোকটার, খেকিয়ে উঠলো একপ্রকার ,“আপনার কি? আপনি এখান থেকে যান।”

এতক্ষণ যন্ত্রণায় ফোপাচ্ছিল,এখন অহেতুক চেঁচামেচি দেখে ইরফানের রাগ ধরে গেলো,তবে হুট করে নিজেকে সামলেও নিলো ইরফান, শান্ত ভঙ্গিতে বললো,“তোমাদের এখানে একা ফেলে আমি যেতে পারবো না।”

_কেন?

_কারণ এখন আমি এখান থেকে চলে গেলে,মিস জেনি তোমাকে নিয়ে বিপদে পরবে, ডিসপেনসারি অপজিটে,তোমাকে নিয়ে রাস্তা পার হবার রিস্ক সে নেবে না, ওভারব্রিজ দূরে, তোমাকে যদি এখানে একা মিস জেনি দাঁড় করিয়ে রেখে যায় তখন যদি কেউ তোমাকে ছো মেরে তুলে নিয়ে যায়, তবে দোষ পরবে আমার ঘাড়ে। পুলিশ আমাকে খুঁজবে,কারন তোমার পরিবারের সন্দেহের তালিকায় একমাত্র এই ইরফান মির্জা, কারণ এই শহরে আমিই একমাত্র কিডন্যাপার আছি,বাকি সব দুধে ধোওয়া তুলসী পাতা। আর আমি অহেতুক বদনাম মাথায় নিতে রাজি নই,সো প্লিজ স্টপ ক্রাইং অ্যান্ড আমি সামনে এলেই শালিকের মতো কিচিরমিচির করা বন্ধ করো। সহ্য করতে না পারলে গিয়ে থানায় কম্প্লেইন করে দাও যেটা তোমরা উঠিয়েছিলে বুঝলে?

শেষের কথাগুলো ধমকে বলে ইরফান,ধৈর্য্যহারা হয়ে। প্রণমি দমে যায়,কান্না থামিয়ে চোখ বড় বড় করে রাখে। মিস জেনি কিছু বলতে যাবে ইরফান জেদী গলায় বলে,“ওকে নিয়ে দাঁড়ান,আমি ওষুধ এনে দিচ্ছি।”

প্রণমি একেবারে চুপ হয়ে গেলো। ইরফান সর্বোচ্চ চার মিনিট ব্যায় করে এইড বক্স এনে মিস জেনির হাতে দিল। মিস জেনি প্রণমির হাতে ওষুধ লাগাতে ব্যস্ত। প্রণমি কপাল কুঁচকে অস্ফুটে বিড়বিড় করছে, যন্ত্রণা কমছে না।

ইরফান শান্ত চোখে ওকে দেখে বললো,“তোমাদের দু'জনের জন্য আরো চারজন বডিগার্ড রাখা প্রয়োজন তোমার ভাইয়া, আপুর।”

_সেটা আমার আপু ভাইয়া বুঝবে।

_হ্যা,সেটাই,যখন আমার বোঝার সময় আসবে তখন আমি বুঝবো।
একেবারে ক্ষীণ আওয়াজে বিড়বিড় করে ইরফান।

প্রণমি কান খাড়া করেও শুনতে না পেয়ে বললো,“কি বললেন আপনি কি বললেন?”

চলমান......

[ প্রেমের গল্প তাই সবাই প্রেম দেওয়ানা থাকবে স্বাভাবিক। এখন আপনি একজনকে পছন্দ করেন,তাকে যদি নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে চান তাহলে তো হাত পা গুটিয়ে বসে থাকলে হবে না, আপনাকে এগোতে হবে। নয়তো কোনো অদৃশ্য শক্তি তো তাকে আপনার প্রেমে ফেলবে না। এমন এপ্রোচ যদি ছ্যাবলামি হয় তাহলে কিছু বলার নেই আমার আর। নেক্সটে কালাজাদুর গল্প লিখবো, নায়ক নায়িকাকে কালো জাদু করে এক রাতের মধ্যে প্রেমে ফেলবে।

আমার কাছে,ছ্যাবলামি হলো বিয়ের আগে দেয়ালের সাথে চেপে ধরা,চুমু দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা। ইত্যাদি ইত্যাদি। বাকি সব অস্থিরতা প্রেমে জায়েজ । 😵‍💫 ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 89 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন