ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 90

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৯০
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

তুখোড় জ্বরে পরেছে ইশি। পাহাড়ী এলাকার বৃষ্টিতে ভিজে এই হাল করে ছেড়েছে নিজের। সেদিন বিকেলে মুঈনকে না নিয়ে একা একা চলে গিয়েছিল হিংড়ি টিলার কাছে, সাথে ছিল তার ক্যামেরা, অফিসের ব্যস্ততায় মুঈন খুব কমই সময় দিতে পারে ইশিকে এসবে আজকাল, দু'জনের ঘোরাঘুরি তেমন একটা হয়ে উঠছে না বললেই চলে। সারাদিনের কাজ সামলে ইশিই এখানে ওখানে ছুটে যায় ক্যামেরা নিয়ে, অবশ্য ক্ষণে ক্ষণে এসপিকে ইনফর্ম করে রাখবার কড়া আদেশ রয়েছে,যেটা সে পালন করে।
বান্দরবানে টোনা টুনির সংসারে হাসি, আনন্দ,একে অপরের সাথে খুনসুটিময় রাত, দুপুরে একসাথে লাঞ্চ, দু'জনের দু'জনকে দেয়া অগাধ স্বাধীনতা,প্রাণ সবই ছিলো ভরপুর, হুট করে চলে এলো এই অসুখ, বহুদিন পরে এলো।
বান্দরবান পুলিশ হসপিটালের ফোর্থ ফ্লোরে,কেবিন নাম্বার চারশো চারে ইশি ভর্তি ছিল, জ্বর কমছে না মেয়েটার।
শ্যামলা পানপাতার মতো শীর্ণকায় ঘুমন্ত মুখটা দেখতে দেখতে মুঈন ফোনটা হাতে তুলে নেয়, ডিউটির ফাঁকে এসেছে সে,পরনে হালকা নেভি ব্লু রঙের ইউনিফর্মটা। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় লাগছে তাকে।

ওপাশ থেকে কলটা রিসিভ করতেই কেঁদে ওঠে আলো, মুঈন অপ্রস্তুত হয়ে পরলো ভীষণ। কিছুক্ষণ ফুঁপিয়ে আলো বলে,“আসছি আমরা,পথে, ওর জ্ঞান এসেছে?”

_মা শান্ত হোন, জ্ঞান এর মাঝে ফিরেছিলো,আমি ছিলাম না পাশে। তাপমাত্রা কিছুটা কমেছে,আপনারা ধীরে সুস্থে আসুন।

ইনশিরাহর জ্বর শুনেই বুকে অসহনীয় যন্ত্রণা শুরু হয়েছিল আলোর,যখন শুনলো হসপিটালে রাখা হয়েছে কালক্ষেপণ না করে আলো সামিন আর রিতু ইলহাম রওনা দিয়েছে। বারবার ফোন করছে মুঈনকে। আলো কাঁদছে,জ্বর হলে মির্জা বাড়ির ছেলে-মেয়ে গুলো কেমন অতি নাজুক হয়ে যায়, একেবারে বাচ্চা হয়ে যায়, মুঈন পারছে না সময় দিতে, পরিবারে আর কেউ নেই, মেয়েটা পরে আছে একা হসপিটালে।
সামিন এবার পথেই বলে ফেললো,“মেয়েটার কাছে মাসখানেক থেকে এসো তুমি এইবার। লোকে যা বলে বলুক।”

কল কেটে মুঈন ইশির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে, বলে,“আমার কাছে,আমাকে সঙ্গ দিতে এসে তুমিই কেমন একা হয়ে পরলে। আ'ম স্যরি! তোমাকে মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেবো এইবার।”

অচেতন ইনশিরাহ। কোনো জবাব দেয়না। নার্স এসে মুঈনকে বলল,“স্যার ম্যামের গা মুছবো, এরপর ডক্টর ম্যাম এসে দেখবেন।”

মুঈন উঠে দাঁড়ায়, অফিসে যেতে হবে, নিজেকে বড্ড অপরাধী ঠেকলো হঠাৎ, এজন্য আইজিপি স্যার একদিন বলেছিলেন,“একটা পরিবার হোক,তখন এই ডিউটিও তেতো লাগবে দেখো।”

কার্যালয় থেকে জরুরি কল ছিলো, দ্রুত পৌঁছেছে মুঈন। থানার সামনে একটি লাশবাহী গাড়ি। রিমজু জঙ্গল থেকে একবস্তা টুকরো টুকরো করে রাখা দেহাবশেষ উদ্ধার করেছে বান্দরবান পুলিশ গতকাল রাতে, তদন্তের ভার ওসি দিপংকরের ওপর। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে একটা লোকাল গ্যাংয়ের নাম, চন্দন কাঠ চোরাচালান ব্যাবসায় ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে ঝামেলা হওয়ায় এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। মৃত নিরফী মারমার দেহের টুকরো অংশগুলো বান্দরবান সদর হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে নিয়ে যাওয়ার পরে সাংবাদিক এসেছে সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ,মুঈন ফরাজীর কার্যালয়ে। ইশির জন্য দুশ্চিন্তায় মাথাটা দপদপ করছিল তখন, কোনোমতে ব্রিফিং সেরে সাংবাদিকদের ওসি দীপঙ্করের কাছে পাঠিয়ে মুঈন কার্যালয় ছাড়লো। বাইরে তখন বৃষ্টি, এই বৃষ্টির কোনো তাল ঠিক নেই। নিজেকে বাঁচিয়ে মুঈন চলে গেল ইশির কাছে। দুপুরে কিছু খাওয়া হয়নি সে খেয়াল তার নেই।
গিয়ে দেখলো ইশির জ্ঞান ফিরেছে,পিট পিট করে তাকাচ্ছে, তাপমাত্রা অনেকটাই কমেছে, রুগ্ন কাহিল চেহারা নিয়ে সামান্য হেসে ক্ষীণ স্বরে বললো,“আ'ম স্যরি এসপি। তোমাকে সবসময় দৌড়ের ওপর রাখি।”

মুঈন বসে পরলো। নার্স এসেছে ইশির গা মুছিয়ে দিতে আবারও, মুঈন ওর হাত থেকে স্পঞ্জার নিয়ে আদেশের সুরে নার্সকে বললো,“বাইরে যান।”

নার্স চুপচাপ চলে গেলো মাথা নিচু করে, এদিকে লজ্জায় লাল লাল হয়ে ইশি রাগতে চাইলো, রুগ্ন কন্ঠে বললো,“এটা worth it ছিলো না।”

মুঈন সামান্য হেসে ওর এপ্রোন খুলে গা মুছিয়ে দিলো ওর,এক হাতে আগলে ধরে আরেক হাতে কাজটা করছিলো। ইশি কাহিল চোখে দেখতেই থাকলো শুধু লোকটাকে, হঠাৎ বললো,“শেষ কখন খেয়েছো?”

_কাল রাতে।

ইশি কি বলবে বুঝতে পারছে না, একটা ঢোক গিলে ক্ষীণ আওয়াজে বলল,“এসবও কি worth it?”

_কি করবো বলো? আমার একটাই তুমি। হেলায় পেয়েছি তবে হেলার নও।
উত্তপ্ত শরীরটাকে বুকের মধ্যে আগলে নিয়ে বললো মুঈন। ইশি চোখ বুজলো।

_ডিউটি ফেলে এসেছো?

_না, ফাঁকি দিয়ে এসেছি।

_মাম্মা পাপা আসছে?

_আরো অনেকেই আসছে,পথে।

দরজায় নক করল নার্স হঠাৎ,“স্যার ডক্টর ম্যাম এসেছে ম্যাডামকে দেখবে,দরজাটা খুলুন।”

বাড়িতে থেকে গিয়েছে চারজন,পরী ইশমাম আর ইহান ইরফান। একান্নবর্তী পরিবার হওয়ার এই একটা সুবিধে,দলে দলে বিভক্ত হয়ে যেকোনো বিপদ সামলে নেয়া যায়।
অফিস দেখবে ইরফান, সেটা নিয়ে চিন্তার কিছুই নেই। ইশির ওখানে এখন বড়দের থাকা প্রয়োজন, রিতু ইলহামকেও পাঠিয়েছে ইহান এটা বলে,ইশি সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া অবধি যেন কেউ না আসে।

দুদিন পরে আজ বিকেলে ইরফান ছায়ানটে এসে তাজ্জব বনে যায়। গত দু'দিন অফিসের ঝামেলায় আসতে পারেনি সে,ইশিকে নিয়েও ছিলো ভীষণ চিন্তিত,তাই এদিকটায় মন টানেনি তার। আজ এসে জানতে পারলো প্রণমিও তিনদিন ধরে আসছে না, হাত কেটেছে বলে জ্বর এসে এক শেষ করেছে। হাতের ঘা শুকোয়নি। ইরফান জানে না এসব, অথচ ইনুর সাথে আজ দুপুরেও কথা হলো, বিকেলে বাড়িতে ফিরে ইশির খবরটা নিয়ে কিছুক্ষণ উশখুশ করে ইরফান অবশেষে কল করেই বসে ইনুকে। ইনু ফোনটা রিসিভ করতেই ইরফান হরবরিয়ে বলে,“কি অবস্থা। কেমন আছিস। বাড়ির সবাই কেমন আছে?”

দুপুরেও একই কথা জানতে চেয়েছে, আবারও চাইছে । ইনু অবাক হয়ে বলে,“সবাই-ই ভালো, কেনো?”

_কারো কোনো অসুবিধা নেই তো?

অসুবিধা আছে,প্রণমি অসুস্থ,এটা মেজো দাদানকে জানানোর মতো কথা না বিধায় জানায়নি দুপুরে,তবে এখন জানায়,আমতা আমতা করে বলল,“হ্যা ঐ আমার ছোটো ননদ একটু অসুস্থ।”

_কি হয়েছে?

_হাত কেটেছে,জ্বর এসেছে। এসব কথা বাদ দাও, তুমি বলো,তুমি অফিস থেকে বেরিয়েছো?

_হু।
ছোটো জবাব দিয়ে ইরফান কিছুক্ষণ ভাবলো,পর পর জানতে চাইলো,“কাল ভার্সিটিতে যাবি তুই?”

_হ্যা।

_তোর বর কি করে সারাদিন? তোকে ভার্সিটিতে নিয়ে যায় কে?

_ও-ই তো নিয়ে যায়,কালও যাবে। শুদ্ধ আর আমার বডিগার্ড ও।

হাসতে হাসতে বললো ইনু। ইরফান শান্ত হয়ে,চুপ করে শুনলো সবকিছু, ইনুর অগোচরে তথ্য নিলো সে,বুঝলো না ইনু।

পরেরদিন সময় মিলিয়ে ঠিক সাড়ে এগারোটা নাগাদ ইরফান ইনুর শশুর বাড়ীতে উপস্থিত। বাড়িতে তখন মিস জেনি এবং প্রণমি ব্যতীত কেউই ছিল না। মিস জেনি এইবার সাবলীল ভঙ্গিতে দরজা খুললেন, এতদিনে একটু একটু করে ছেলেটাকে তার কাছে আগের মতো খতরনাক লাগে না। আচরণে স্বাভাবিকতা। প্রণমির কাছে এসে বললেন,“মামনি ইরফান মির্জা এসেছেন, তুমি কি যাবে? নাকি আমি চা খাইয়ে বসিয়ে রাখবো!”

গাঁয়ে জ্বর নিয়েও প্রণমি উঠে বসলো,সে কেন উঠে বসলো সে বুঝতে পারছে না, তার তো মেজাজ খারাপ করার কথা ছিল। পর পর নিজেকে শান্ত করে বললো,“যাওয়া উচিৎ, লোকটা অধম তাই বলিয়া সে উত্তম হইবে না কেন?”

হ্যা প্রণমি সামাজিক,প্রণমি অধম না,উত্তম। তাই প্রণমি গেলো ধীরপায়ে হেটে। ইরফান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ড্রয়িং রুমের শেলফ থেকে একটা একটা বই বের করে নেড়েচেড়ে দেখছিলো। তিনটা শেলফের একটা শেলফ ভর্তি করা ইংরেজি নভেল। ড্রয়িং রুমে প্রণমির অস্তিত্ব টের পেয়ে ইরফান ঘাড় ঘুরিয়ে ওকে দেখে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,“আজ এসেছি ব্যাচমেট হিসেবে। ছায়ানট থেকে সবাই এসে তোমাকে দেখে গিয়েছে শুনলাম। কেমন আছো প্রণমি?”

শেষের কথাটায় প্রণমির এই লোকটাকে কেমন অন্য মানুষ মনে হলো, যেন প্রণমির জন্য দরদ উথলে পরছে। যেন লোকটা ইরফান মির্জা নয়,লোকটা প্রণমির কিডন্যাপার নয়,এমন কিছুই হয়নি কখনও। লোকটা যেন প্রণমির কাছের লোক।

এমন দরদ মাখা প্রশ্নটার বিপরীতে প্রণমি উত্তরটাও বেশ ভদ্রভাবে দিলো।
“আগের থেকে বেটার।”

মিস জেনি শুকনো হেসে কিচেনে গেলেন চা বানাতে। দ্রুত চা খেয়ে ছেলেটা চলে যাক,প্রিতম আসার পূর্বে,নয়তো আবারও তর্কাতর্কি হতে পারে।

ইরফান প্রণমির হাত দেখলো,বললো,“বসো।”

প্রণমি ধীরে ধীরে বসে বললো,“ভাবী বাড়িতে নেই।”

_বলেছি তো ব্যাচমেট কে দেখতে এসেছি।

_এমন আন্তরিকতার প্রত্যাশা আপনার থেকে রাখার আগ্রহ নেই বিন্দু পরিমাণ।

কাঠকাঠ জবাব দিলো প্রণমি, বুঝিয়ে দিলো প্রণমি ভদ্র তবে সে আশা করে না ইরফানের থেকে কোনো কিছুরই।

ইরফান মেয়েটাকে খানিকটা সময় ধরে দেখে মুচকি হাসলো। পরে একটা বই নাড়াচাড়া করতে করতে বললো,“একাডেমীতে জানে আমি তোমার রিলেটিভ?”

_না, জানে না। তারা এটাও জানে না আপনি আমার কিডন্যাপার। তবে তো তুলোধুনো করে ছাড়বে আপনার।

ইরফান হাসলো,বললো,“বলে কেনো দিচ্ছো না ওদের?”

_বলে আমার লাভ? রাগ আমার,আমি কেন অন্যদের হায়ার করবো আমার হয়ে রাগ দেখানোর জন্য। তারা আপনাকে মাথায় করে নাচে,নাচুক।

ইরফান আবারও চুপ করে দেখলো ওকে। এবার শুকনো গলায় বলল,“তুমি খুব সরল মেয়ে। সবকিছুর ব্যখ্যা নিজের মতো করে সাজিয়ে সুখী থাকতে পারো। যদি আমি তোমার মতো হতে পারতাম!”

প্রণমি এই জটিল কথাটার মানে বুঝতে পারলো না। সে নীরব। ইরফান বইয়ের শেলফ গুলো ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখতে দেখতে গুনগুন করে গান গাইছে। প্রণমি না চাইতেও কান খাড়া করে শুনছে। কিছুক্ষণ পর জড়তা,ক্ষোভ,রাগ একসাইডে ঠেলে রেখে তার কৌতুহলী মন জানতে চাইলো,“গান কার কাছ থেকে শিখেছেন আপনি?”

_ওস্তাদজির কাছ থেকেই। ছোটোবেলায়।

_প্রাকটিস করতেন নিয়মিত?

_হু বলতে পারো।

_তাহলে গুণ্ডামি করতেন কখন?

ইরফান দু'চোখ বন্ধ করে ফেলে, হাতের বই ভাজ করে নেয়। এতক্ষণ নরম গলায় কথা বলে অকস্মাৎ ইরফানের মুখটায় সুকৌশলে ঝামা ঘষে দিয়েছে এই এক রত্তি মেয়ে। অবশ্য ইরফান ভুলেই বসেছিল এই মেয়েটা প্রেরণা-প্রিতমের বোন।

লম্বা শ্বাস ফেলে ইরফান নিজের হুট রাগটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল,“ওটার জন্য আমার সময় থাকতো আলাদা। ধরো ঘুম থেকে উঠে। মন চাইলে।”

প্রণমি হাসছিল অপমান করে, কিন্তু তার অপমান এই লোক গাঁয়ে মাখেনি দেখে প্রণমি বেজার হলো।

ইরফান তখন আশেপাশে তাকিয়ে বলতে লাগলো,“এইসব বই তোমার?”

_জি।

_এতো বই তুমি পড়েছো?

_জি।

_বাহ,বেশ। কে পড়ে শোনায়,মিস জেনি?

_জি।
প্রণমির খারাপ লাগছে না নিজেকে জাহির করতে,লোকটা জানুক প্রণমির যোগ্যতা, প্রণমি তার মতো বাউন্ডুলে নয়। তখন ইরফান বললো,“নিক স্মিথের দ্য সেঞ্চুরির সেকেন্ড সিরিজ পড়েছো?”

প্রণমি অবাক হয়ে বলে,“জি। আপনিও পড়েছেন?”

_হ্যা।

_আপনি বই পড়েন?

_আগে পড়তাম না, রিহ্যাব গিয়ে অভ্যাস হয়েছে, এখন বদ অভ্যাস হয়েছে বই পড়ার। এটার থার্ড সিরিজটাও পড়েছি।

প্রণমি অবাকের ওপর অবাক হয়ে যায়, নেত্রযুগল বিস্ফোরিত। বললো,“থার্ড সিরিজও, কিন্তু ওটা তো বিডিতে পাইনি।”

কন্ঠে নিদারুণ কৌতুহল প্রণমির, ইরফান চুপচাপ দাঁড়িয়ে প্রণমির স্বাভাবিক আচরণ গুলো লক্ষ্য করতে থাকে,মেয়েটার আগ্রহ,মেয়েটার সরলতা,মেয়েটার জীবনের সাথে জড়িত খুঁটিনাটি সবকিছু ধীরে ধীরে তার নখদর্পণে আসছে।

ইরফান বললো,“আই নো,রিহ্যাবে মারামারি করে প্রফেসর জনের কাছ থেকে গিফট পেয়েছি,উনি অ্যামরিকা থেকে নিয়ে এসেছিলেন। একপিসই আছে ওটা এদেশে,সেটা আমার কাছে।”

বিস্ময়াভিভূত হয়ে প্রণমি বলে,“ওয়াও।”

ইরফান মুচকি হাসলো,এই মেয়ে তার সাব কন্সাস মাইন্ডে চলে গিয়েছে,ভুলে গিয়েছে সে তার কিডন্যাপারের সাথে কথা বলছে। তার কৌতুহল আটকে আছে নিক স্মিথের বইয়ে। ইরফান এবার নম্র কন্ঠে বলল,“তুমি পড়তে চাও বইটা?”

_চাই। তবে ওটা তো দুবছরের আগে পাবোই না।

_আমি আমারটা দিতে পারি ধার,নেবে?
নিচু গলায় প্রণমির দিকে ঝুঁকে ইরফান জানতে চাইলো। প্রণমি আচমকা পিছিয়ে গেলো। সে রাগ করতে পারছে না,তার লোকটার প্রতি কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়াই আসছে না, প্রণমি মাথা নিচু করে সাফ সাফ বললো,“আপনার থেকে ধার নিয়ে বই পড়ার মতো সখ্যতা আমার আছে বলে মনে হয়না। নেবো না।”

_তবে কিনে নাও।
সাথে সাথে ইরফান বললো।

প্রণমির মনে খুব লোভ জেগেছে বইটার কথা শুনেই,কত কত চেষ্টা করেও বইটা পেলো না, কিন্তু এই লোকের সাথে বাড়তি কোনো সম্পর্ক প্রণমি গড়বে না। সে যত প্রিয় বই নিয়েই সাধুক না কেন। প্রণমি বললো,“নো থ্যাংকস।”

_ওকে।
আর সাধলো না ইরফান,শুধু আড়চোখে প্রণমিকে দেখছে,আর মিটিমিটি হাসছে, এই মেয়েকে এখন বইটা দিলে সে ঝাঁপিয়ে পরবে নির্ঘাত।
ইরফান বলে,“ওটা এমনিতেও বিক্রি করে দিতাম, আমি মনস্টার মানুষ, ওসব বই টই যত্ন করতে পারিনা শেলফে সাজিয়ে, ওটা কোনো প্রকৃত বই পড়ুয়া লোককে বিক্রি করে দেবো।”

উশখুশ করছে প্রণমি,লোভ জাগছে, আবার সেটা সে দমিয়ে ফেলছে। এই টপিকে কথা ঘোরাতে প্রণমি বললো,“মারামারি করে বইও উপহার পান আপনি? আপনার প্রফেসর কি পাগল ছিলেন?”

_মারামারি বলতে বক্সিং।

_আপনি বক্সিং জানেন?

_অবাক হচ্ছো কেনো? তোমার ভাইয়ের নাকে কত প্র্যাকটিস করেছি!

বলতে বলতে শব্দ করে হেসে উঠলো ইরফান। প্রণমি এবার মেজাজ গরম করে ফেললো, এতক্ষণ লোকটা ভং ধরে ছিল, এই তো ফিরলো আসল রূপে। তাদের তিন ভাইবোনের পেছনে লাগতে মজা পায় এই লোকটা খুব।

ইরফান প্রণমির বেজার মুখ দেখে হাসি থামিয়ে নিজেকে নিজে মনে মনে গালি দিলো, পর পর বললো,“আমি বক্সিং জানি না, আন্দাজে ঘুষি মারি, রিহ্যাবে কিভাবে ম্যাচ জিতেছি জানি না।”

_আপনি এবার যান। আপু ভাইয়া আসলে দেখলে ভাবীর সাথে আবার ঝামেলা করবে। আমি আমার ফ্যামিলিতে ঝামেলা চাইনা, ভাইয়া ভাবীর সাথে দুর্ব্যবহার করুক আমি চাইনা।

ইরফান ওকে দেখতেই থাকলো নির্নিমেষ চেয়ে থেকে,কন্ঠে কোমলতা ঢেলে বললো,“সো নাইস অফ ইউ। তবে চা টা খেয়ে যাই? মিস জেনি কষ্ট করে বানালেন। আরেকটু নাইস হও?”

_হু,প্লিজ।

প্রণমি চোখমুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে রয়। ইরফান হেসে মিস জেনির হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়ে এক চুমুক বসাতেই কলিং বেল বেজে উঠল হঠাৎ।

ইরফান শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে আঁতকে উঠলো প্রণমি। মিস জেনি একটা ঢোক গিলে এগিয়ে গিয়ে পাসওয়ার্ড দিয়ে দরজা খুলতেই দেখলো ইনু প্রিতম দাঁড়িয়ে।
আজ ইনুর শেষের ক্লাস দুটো হয়নি,প্রিতমও নিজের কাজ সেরে তাড়াতাড়ি এসে পরলো। দু'জনের মুখ ছিলো হাসিহাসি পরক্ষনেই ফ্যাকাশে হলো দু'জনের মুখ।

______

তিনদিন হয়ে গিয়েছে ইহানের সাথে প্রেরণার দেখা হয়নি। ইহান নিজেই খুব ব্যস্ত ছিলো। আজ হঠাৎ এভাবে,তাও নিজের সামনে, দৃঢ়তা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখে কিছুটা অবাক হল ইহান। পর পর মনে মনে হিসেব মেলালো, ভদ্রমহিলা বুঝিয়ে দিতে চাইছে ইহানকে নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই, কোনো জড়তা নেই, নিজের আত্মবিশ্বাস এবং আত্মমর্যাদাবোধ তার দৃঢ়। দু'জনের মার্জিত আলোচনা সেদিন শেষ হয়ছে, প্রেরণা শাড়ির আঁচলের ধূলো ময়লার মতো ওসব ঝেড়ে ফেলেছে। ইহান সামান্য হেসে বললো,“বসুন।”

প্রেরণা চেয়ার টেনে বসলো। ইহান স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জানতে চাইলো,“কি হয়েছে? কোনো অসুবিধা? কি সাহায্য করতে পারি?”

তীব্র জড়তাবোধ প্রেরণার ভেতরে,বুঝতে না দিয়ে স্পষ্ট করে বলল,“ভাড়াটা ক্যাশে দিতে চাচ্ছি এই মাসে।”

_ঠিকাছে, দিন। অন্তর নেই।

_আপনাকে দেবো?

_জি।

প্রেরণা ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে টাকাগুলো বের করে রাখলো টেবিলে ভদ্রমতো। ইহান সেদিকে তাকিয়ে আন্তরিক হেসে বললো,“কোনো অসুবিধা হলে জানাবেন। ইদানিং সরকার দলীয় পার্টির স্বৈরাচারীতা বেড়েছে। রেস্তোরাঁয় কেউ বিরক্ত করলে আপনকে জানাবেন।”

প্রেরণা মাথা নিচু করে মাথা নাড়ায়। মনের মধ্যে একটা খচখচানি ছিলো বিয়ের প্রস্তাব নাকচ করার জন্য সাগর ভুঁইয়ার মতো প্রেরণার সাথে চুক্তি না ক্যানসেল করে। করলে প্রেরণার বলার কিছুই থাকতো না আর। তবে এই লোকের স্বাভাবিক আচরণে প্রেরণা একটু হাফ ছাড়ল। নিজে থেকেই বললো,“নেক্সট মান্থে ভাড়া বৃদ্ধি সংক্রান্ত আলোচনায় বসবো।”

_জি আচ্ছা। কম্পিউটারে একটা বিল টাইপ করতে করতে জবাব দিলো। বিলের কাগজটা প্রেরণার হাতে দিলো চুপচাপ।

লোকটার সহজ স্বাভাবিক আচরণ প্রেরণার জড়তা অনেকটাই কাটিয়ে দেয়। প্রেরণা আসছি বলে চলে যায় কক্ষ থেকে। ইহান চুপ করে টেবিলের ওপর রাখা ক্যাশ টাকা গুলো তুলে নিয়ে ড্রয়ারে ফেলে রাখে। বিড়বিড় করে বলে,“চুক্তি বাতিলের ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। আপনাকে আমিই ছাড়বো না প্রেরণা, কখনো না।”

_______

ইরফান শান্ত ভঙ্গিতে চা খেতে খেতে ইনুকে বললো,“তোর ল্যাবের কার্ডটা রিনিউ করেছি। ওটা দিতে এলাম। ভালো আছিস?”

পকেট থেকে কার্ডটা বের করে ইরফান ইনুকে দেয়। ইনু নিজেকে সামলিয়ে ভীষণ খুশি হয় দাদানকে দেখে, এতো হীনমন্যতায় ভুগবে না সে। দাদানের কোন বাজে ইনটেনশন নেই, এতো অপরাধী অপরাধী ভাব করার কিছু নেই।

সে বললো,“ভালো করেছো এসেছো। বসো।”

ইরফান আড়চোখে তাকায় প্রিতমের দিকে। প্রিতম একপলক ইরফানকে দেখছে, একপলক দেখছে প্রণমিকে যে একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, চোখে মুখে নেই কোনো জড়তা।

ইরফান বললো,“কেমন আছিস প্রিতম?”

_ভালো,তুই?

_ভালো।

স্বাভাবিক কুশল বিনিময়। ইনু ব্যস্ত হয়ে পরলো দাদানকে নিয়ে। এক ফাঁকে ভাবী হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করতে প্রণমিকে বললো,“ঘরে যাও প্রণো,এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না।”

প্রণমি ঘরে চলে যায়, ইনু কিছু ফল কেটে, মিষ্টি বের করে ইরফানকে আপ্যায়ন করে। আর প্রিতম শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে ইরফানকে।

ইরফান বেরিয়ে যাওয়ার সময় প্রিতমও নিচে যাওয়ার বাহানায় বেড়োলো আজও। এবং লিফটেই ইরফানের কলার চেপে ধরলো প্রিতম, ভীষণ ক্রোধান্বিত লাগছে তাকে। ইরফান কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখাতে সে আরো ক্ষেপে গিয়ে চেচালো,“আমার বোনের সাথে কি তোর?”

_কিছুই না।

_কেন এসেছিস? এই বল কেন এসেছিস! ইনুর কার্ড দিতে তো আসিসনি। তোকে আমার থেকে ভালো কেউ পড়তে জানেনা। বল তোর প্ল্যান কি? বাড়িতে এসে আমার ছোটো বোনটার ব্রেইন ওয়াশ করা?

ইরফান শান্ত থেকেই প্রিতমের হাত সরিয়ে দিয়ে বলে,“ভুল ভাবছিস। আমি কারো ব্রেইন ওয়াশ করা করিতে নেই।”

_তাহলে এভাবে আসিস কেন? কেন পরে আছিস আমার বোনের পেছনে। ও বোকাসোকা মেয়ে ইরফান, লিভ হার অ্যালোন! কেন পেছনে পরেছিস?

_তোর বুঝতে ভুল হচ্ছে, আমি প্রণোর পেছনে পড়িনি।

_ডোন্ট কল হার প্রণো।

প্রিতম গর্জে ওঠে, ইরফান ততটাই শান্ত। কিছুক্ষণ পর বলে,“আমি প্রণমির পেছনে পরিনি এটুকু জেনে রাখ, তোর বোনটা খুব সরল। ওর পেছনে কেন পড়বো শুধু? আমার অওকাত থাকলে ওকে ভালোবাসতাম।”

প্রিতম চমকালো, চোখ বড় বড় করে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে ইরফানের দিকে। লিফট এসে গ্রাউন্ড ফ্লোরে থামতেই ইরফান চুপচাপ বেরিয়ে যায়। বলে যায়,“রিল্যাক্স! ইরফান মির্জা তোর বোনকে চুরি করবে না আর। রিল্যাক্স!”

লিফটে দাঁড়িয়েই রয় প্রিতম। নিমিষেই চোখমুখ শক্ত হয়ে যায়। আজ প্রণমিকে আচ্ছামতো বকবে সে, বোকামির একটা সীমা থাকে। কত সহজ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো ইরফানের সামনে, প্রিতমের বুকটা ধক করে উঠেছিলো এটা দেখামাত্রই। ধীরে ধীরে তার শংকা না বাস্তব হয়ে যায়, নিজের বোনের পাশে ঐ বদটাকে কখনও মানবে না প্রিতম, কোনো দিনও না। তার শশুর বাড়ীর লোকের সাথে আলোচনায় বসবে সে উপায়ও নেই, একটা না একটা ঝামেলা লেগে যায়,যার প্রভাব পরে ইনুর সাথে তার সম্পর্কে। বোকাটা বুঝতেও চায়না।

তবে নিজের বোনকে তো সতর্ক করাই যায়! রেগেমেগে আগুন হয়ে প্রিতম ঘরে ঢুকে প্রণমিকে ডাকতে লাগলো,“প্রণো,এই প্রণো! এদিকে আয়! কথা আছে তোর সাথে।”

চলমান......

[ গল্প একদিন পর পর পাবেন। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 90 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন