#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৯১
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
ভাইয়ার হাকডাক শুনেই প্রণমি চিন্তিত হয়ে পরে ভীষণ। এমন করে ডাকছে কেন ভাইয়া? তাকে বকবে নাকি! ঠিক কোন ব্যাপারে বকবে?
ইনু তখন প্রচন্ড পেটে ব্যথা নিয়ে ওয়াশ রুমে ছিলো, গতকাল রাত থেকে চিনচিনে ব্যাথা হচ্ছে তার পেটে। ওয়াশ রুমে থাকায় প্রিতমের হাক ডাক তখনও শোনেনি সে।
প্রিতম গিয়ে প্রণমির সামনে দাঁড়ায়। প্রণমি ঘাবড়ে গিয়ে বলল,“কি হয়েছে ভাইয়া?”
_ও প্রায়ই আসে এখানে?
নিরেট গম্ভীর স্বর প্রিতমের।
_কে?
_ইরফান।
প্রণমি ঘামছে, ঘামছে মিস জেনিও। পর পর নিজেকে সামলে নিয়ে প্রণমি ধীরে সুস্থে বলে,“না।”
_তুই দরজা খুললি কেন? মিস জেনি? ফোন দিলেন না কেন আমাকে?
ধমকে ওঠে প্রিতম।
মিস জেনি আর প্রণমি দু'জনেই আঁতকে ওঠে ধমকে,প্রিতমের মেজাজ বিগড়েছে খুব। আবারও বললো,“ভুলে গিয়েছিস নাকি তোর সাথে কি করেছে ও? ভুলে গিয়েছিস?”
_ভুলিনি ভাইয়া।
গলার স্বর খাদে নামিয়ে বললো প্রণমি।
_তাহলে কোন সাহসে আমি বাড়িতে না থাকা অবস্থায় দরজা খুলবি! বোকা কোথাকার!
প্রণমি মাথা নিচু করে আছে। মিস জেনিও ভয়ে সিটিয়ে আছে, এখন যদি প্রিতম জানে ইরফান ছায়ানটেই পৌঁছে গিয়েছে তাহলে ধুন্ধুমার লেগে যাবে বাড়িতে।
প্রিতম রাগে গজগজ করছে, পায়চারি করছে ঘরময়, পাগল পাগল লাগছে নিজেকে তার, অনবরত বলছে,“স্কাউন্ড্রেল একটা! নতুন ফন্দি আটছে আমাকে জ্বালানোর, ওর আমার সমান সমান থাকতে হবে সবসময়! এখন অন্য উপায় বের করেছে স্কাউন্ড্রেল টা! বাস্টার্ড!”
প্রণমি মলিন মুখে দাঁড়িয়ে আছে,শুধু অস্ফুটে বললো,“গালি দিও না ভাইয়া,ভাবী শুনলে কষ্ট পাবে!”
কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ, ইনু এসে সেই কখন ওদের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে দেখলেন মিস জেনি, ঘাবড়ে গিয়ে প্রিতমকে বললো,“বৌমা এসেছে প্রিতম।”
প্রিতম চকিতে ঘুরে তাকায়,দেখতে পায় ইনু ভেজা চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। অতঃপর কেঁদে দেওয়ার মতো করে বলে,“তুমি বাস্টার্ড বললে দাদানকে? আমার দাদান বাস্টার্ড?”
কথাটা বলেই ইনু ছুটে গিয়ে রুমে ঢুকে কাঁদতে লাগলো বিছানায় বসে। প্রিতম একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বললো,“লেগে গেছে আগুন! শা'লা!”
ঘরে ঢুকে ইনুকে কাঁদতে দেখে প্রথমেই দরজা লাগায় প্রিতম, তারপর ঘুরে ইনুকে ঠান্ডা গলায় বলে,“রাগের মাথায় বলেছি। এটাকে ইস্যু করো না প্লিজ।”
_ইস্যু করবো না? আমার দাদান বাস্টার্ড? তার জন্ম পরিচয় নেই?
_গালি দেওয়ার সময় এতো মিনিং দেখার টাইম থাকে না। স্টপ ক্রাইং ইনু!
_তাই বলে গালি দেবে?
কেঁদে ওঠে ইনু।
_কেন? বিয়ে আগে তোমার মেজো দাদান কথায় কথায় আমাকে বাস্টার্ড বলতো না? আমার কি জন্ম পরিচয় ছিলো না?
এবার খুব রেগে যায় প্রিতম। ইনু বললো,“সেই-ই তোমার সবকিছু আমার দাদানের সাথে প্রতিযোগিতা করে, তার থেকে শোধ নিতে, ওভাবে বিয়েটা করারও তো বড় কারণ ছিলো ওটাই। দাদান খারাপ হলে তুমিও খারাপ, তোমার টা বোঝা যায়না শুধু।”
_ইনু কি বলছো? মাথা ঠিক আছে? আই লাভ ইউ! আমার তোমাকে পেতেই হতো অ্যাট এনি কস্ট!
চেঁচিয়ে উঠলো প্রিতম।
_ওকে এবারও মানলাম, তোমার আত্মপক্ষ সমর্থনের সব যুক্তি মেনে নিলাম। তবে তুমি কেন এটা মানতে চাও না দাদান ভালো হয়ে গিয়েছে? কেন? দাদান কোনো বাজে আচরণ করেছে এসে থেকে? বলতে পারবে? তবে কেন আজ বাস্টার্ড শব্দটা ব্যবহার করেছো তাকে গালি দিতে। কি অন্যায় করেছে দাদান? বোনের বাড়িতে এসেছে তাই তো? তাই বাস্টার্ড?
_ইনু ওর ইনটেনশন ভালো না, ও প্রণমিকে....
এটুকু বলে থেমে গেল প্রিতম।
ইনু বললো,“থামলে কেনো? বলো! ও প্রণোকে ব্রেইন ওয়াশ করবে বাড়িতে এসে? আর তোমার বোনও গলে যাবে? এই তোমার বোন দরজা খোলে কেন? দরজা না খুললে তো আমার দাদান ঢুকতে পারে না! ন্যাকামি হচ্ছে ভাইবোন মিলে?
_ইনু স্টপ,লিমিট ক্রস করছো!
_নো আ'ম নট! তোমাকে আমাকে স্বীকার করতে হলে আমার দাদানকেও স্বীকার করতে হবে।
_ইনু থার্ড পারসন ঢোকাবে না আমাদের মাঝে খবরদার।
_চৌদ্দ গোস্টিকে আমি ঢোকাবো, বিয়েটা শুধু দু'জনের না, জরিয়ে আছে দু'টো পরিবার। আমি চেয়েছিলাম সবাইকে হাতে পায়ে ধরে মানিয়ে তোমাকে বিয়ে করতে, কিন্তু তুমি একটা গেম খেলে বিয়ে করলে আমায়, অবশ্য পাপা ঠিকই বলতো, পরিবারের মানে তুমি বোঝো না।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে রয় প্রিতম ইনুর দিকে, তারপর বলে,
_আর তুমি বোঝো? বুঝলে আমার বোনদের নিজের বোন মনে করতে তুমি। ওদের তুমি তোমার স্বার্থ অনুযায়ী আদর, সম্মান দাও। এসব আমার চোখে পরে না? সারাদিন দাদান দাদান বলে নাচো, কই প্রণমিকে গিয়ে কখনো তো বোঝাও না একবার যে প্রণো আর ভয় নেই!
ইনু খুব আহত হয়। বললো,“আমি স্বার্থ অনুযায়ী ওদের ভালোবাসি?”
_মাঝেমাঝে তাই মনে হয়।
চুপ হয়ে যায় পুরোপুরি ইনু,প্রিতম বলতে থাকে,“এনাফ হয়েছে ইনু। হ্যা আমি যোচ্চর,তোমায় ঠকিয়ে বিয়ে করেছি, পাপ আমি করেছি। আর আমি আমার অপরাধে আমার বোনদের ভুগতে দেবো না। আমি তোমাকে নিয়ে আলাদা হবো। তোমার কষ্ট তোমার দাদান এ বাড়িতে আসতে পারে না তাইতো? আমাদের আলাদা সংসারে তার অবাধ বিচরণ থাকবে। আজ আপু আসুক,বিকেলে আমি ফ্ল্যাট দেখবো !”
ইনু হতভম্ব হয়ে কাঁদো কাঁদো বলে,“আলাদা হবো মানে! এই অ্যাপার্টমেন্ট থেকে চলে যাবো মানে?”
_ওমা তুমি জানো না? তোমার যোচ্চর ব্যাগাবন্ড হাজবেন্ড তার আপুর আশ্রয়ে থাকে,এই ফ্ল্যাট আপুর। তো এখানে কতদিন থাকবো? আমরা আলাদা হবো, এতে তোমার মেজো দাদান রোজ তোমার কাছে আসতে পারবে আর আমার বোনটাকে নিয়েও আমার টেনশন হবে না।
বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলে প্রিতম। কিন্তু ইনুর কষ্টের মাত্রা বাড়ছে। সে বসে পরে কাঁদল কিছুক্ষণ। প্রিতম কঠিন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আজ।
দুপুর তখন সাড়ে বারোটা, প্রেরণা এখনও ফেরেনি,সে শুদ্ধর স্কুলে প্যারেন্টস মিটিংয়ে আছে।
এদিকে ইনু নিজের ব্যাগ গোছাচ্ছে। সে থাকবে না এখানে, অভিমান হয়েছে খুব। ব্যাগ গুছিয়েছে শান্তিনীড় চলে যাবে বলে।
প্রিতম ওকে আটকায়,“এসব কোন ধরণের পাগলামি?”
_মাম্মা পাপার কাছে চলে যাবো আমি। তুমি এখানে থাকো, আমার কিংবা আমার দাদানের জন্য বোনদের থেকে আলাদা হতে হবে না তোমার।
_ইনু দিস ইজ ঠু মাচ। কোত্থাও যাবে না তুমি!
_আমি যাবোই! ছাড়ো তুমি আমার হাত।
প্রণমি আর মিস জেনি এসে ওকে আটকায়, প্রণমি তো কেঁদেই ফেললো,“ভাবী! আপু আসুক না, ঠান্ডা মাথায় কথা বলো তোমরা! এভাবে যেও না। আংকেল আন্টি কি ভাববে?”
_ভাববে তাদের মেয়ে অযোগ্য,তাই সংসার করতে পারছে না।
_ভাবী! ভাবী আমার কোনো অভিযোগ নেই তোমার কিংবা তোমার দাদানের প্রতি! ভাইয়া একটু রেগেছে। মানিয়ে নাও,আমি তো ঝামেলা করছি না তাইনা? আপুও তো করছেনা। প্লিজ যেও না।
ইনু চুপচাপ ওর হাতটা সরিয়ে দিলো, যা দেখে প্রিতমের মেজাজ আরও বিগড়ালো, চেঁচিয়ে বললো,“অতটুকু মেয়ে তোমাকে বুঝের কথা বলছে আর তুমি অবুঝের মতো করছো! বেশি বাড়াবাড়ি করছো, এক পাও তুমি বাইরে দেবে না।”
ইনু ঘুরে দাঁড়ায়, সে যাবেই। প্রিতম ওর হাতটা টেনে ধরলো শক্ত করে, ধমকে বললো,“ইনু !”
এক ঝটকায় ইনু ছাড়িয়ে নিলো নিজের হাত, কান্না আর রাগ মিশ্রিত কন্ঠে বলে,“তুমি আমাকে টর্চার করছো প্রিতম!”
তৎক্ষণাৎ হাত ছেড়ে দেয় প্রিতম, মুহুর্তেই মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে যায়, আহত গলায় বলে,“স্বামী হিসেবে শাসন করছি,সেটা টর্চার হয়ে গিয়েছে?”
ইনু যেন একটা কথাও শুনতে চাইছে না,ব্যাগ রেখেই হনহন করে অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে যায়।
মিস জেনি পেছন থেকে অনবরত ডাকতে থাকে,“ও বৌমা! দাড়াও।”
প্রণমি কাঁদছে নিশ্চুপ। প্রিতম মলিন মুখে দাঁড়িয়ে আছে ঠাঁয়, পর পর মুখে ফুটে ওঠে চাপা রাগ। সে যায়না ফেরাতে ইনুকে। গেলে যাক, অনেক অবুঝপনা সহ্য করেছে, মানিয়ে নিয়েছে প্রিতম নির্লজ্জের মতো দিনকে দিন, এবার সবকিছু মাত্রা ছাড়িয়েছে। এবার বড়দের নিয়ে বসবে প্রিতম, তার শশুর,চাচা শ্বশুরদের নিয়ে বসবে, বোঝাতে হবে এই মেয়েকে, এর আচরণ ঠিক করতে হবে!
প্রণমি বললো,“ভাইয়া তুমি যাচ্ছো না কেন?”
_গেলে যাক, আমাকে মানে একটুও? একটা পাপ করেছি আমি যেন, তাই এতো ভুগছি। আমি আর পারছি না, ও বাড়ির বড়রা দেখবেন এখন বিষয়টা, আমার তাদের ওপর ভরসা আছে। আর তুই, ঐ ইরফান এলে যদি দরজা খুলিস তো থাপ্পড় খাবি! দূরে থাকবি ওর থেকে!
________
বাড়িতে তখন শুধুমাত্র ইরফানই ছিলো, ইশমাম ইউনিভার্সিটিতে,পরী ক্লিনিকে,ইহান পার্টি অফিসে।
ইনু গেটে পা রাখা মাত্র আবারও পেট চেপে ধরল কয়েক মুহূর্তের জন্য, এই ব্যাথাটা কিসের ব্যাথা সে সেটাই বুঝতে পারছে না। পিরিয়ডের ব্যাথা এটা নয়। তার তলপেটের অনেকটা নিচে,দুই পাশে ব্যাথাটা হচ্ছে। আজ এই প্রথম হচ্ছে ব্যাথা টা,আগে কখনও হয়নি, মাম্মাকে জানাতে হবে এটা।
ইনু কাঁদছিল,ওকে দেখে বাড়ির হেল্পিং হ্যান্ড রাহেলা বললো,“ছোডো মামনি? কাদতেছো কেন? ইশি মামনির জ্বর কমছে তো কিছুটা, নিউমোনিয়া ধরা পরছে, ডাক্তার দেখতাচে তো। কাইন্দো না।”
ইনু জবাব না দিয়ে চুপচাপ দোতলায় উঠলো, ইরফান ফোন কানে চেপে ধরে কথা বলতে বলতে ঘর থেকে বেরোচ্ছিল। ইশির খবরটা নিলো, হসপিটালে ফ্যামিলির কাউকে রাতে থাকতে দেওয়া হচ্ছে না। জ্বরও কমছে না। ইরফান ভাবছে সে একবার যাবে। ঠিক তখনই ইনুকে দেখে থমকায় ইরফান। ইনু কাঁদছে।
________
প্রেরণা বাড়িতে ঢুকেই ইনুকে না পেয়ে চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে প্রিতমের ওপর,“তাই বলে যেতে দিবি? এই ভর দুপুরে মেয়েটা বাড়ি ছাড়লো? একটু কি বোঝানো যেত না?”
_বুঝিয়েছি আপু, ইভেন প্রণো অনুরোধ করেছে, সে কি কারো কথা শোনে? আমাকে বললো,আমি টর্চার করছি!
প্রেরণা ঘামছে, এখন ইশমাম মির্জা এটা নিয়ে আরেকটা ইস্যু তৈরি করলে প্রেরণার বলার কিছুই থাকবে না আর। ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে প্রেরণা বলে,“একজন অবুঝ হলে আরেকজনকে একটু বেশিই ধৈর্য্যশীল হতে হয়! বিয়েটা কোনো ব্যবসায়িক চুক্তি না,যৌথ মালিকানার ব্যবসা না যে বনিবনা হলো না ফটাফট চুক্তি ক্যানসেল। অনেক অপশন আছে প্রিতম,খুব এফোর্ড দিতে হয় এই সম্পর্কে!”
_আমি তো ওকে ছাড়বো না আপু! ওকে একটু স্পেস দিলাম, যদি একটু নিজে থেকে বোঝে। তাছাড়া এইবার আমার ও বাড়ির লোকের হেল্প লাগবেই। ইরফানের ব্যাপারে!
_ইরফানের ব্যাপারে?
_হু, ইরফান তালাক দেবে প্রণোকে।
প্রেরণা আশ্চর্য হয় ভাইয়ের কথায়, বলে, “ধর্মীয়,আইনী, সামাজিক, পারিবারিক কোনো অস্তিত্ব নেই, ইভেন প্রণমিই স্বীকার করে না বিয়েটা,তালাক কি হবে? কি আবার বকছিস তুই?
_বকছি না, আমার মনে খচখচানি আছে, সেটা দূর করবো। ইশি আপু অসুস্থ, সামিন আঙ্কেল আর ইলহাম আঙ্কেল ঢাকা ফিরুক। তুমি কথা বলবে। আমি প্রণোর তালাক চাই।
প্রেরণা চুপ হয়ে যায়। প্রিতম ঘরে ঢোকে শ্বশুরকে কল করতে,তার শশুরের সাথে কথা বলতে হবে,ইনু পৌঁছেছে কি না সেটা জানতে হবে।
______
“আমাকে গালি দিয়েছে?”
শান্ত হয়ে বসে বোনকে জিজ্ঞেস করে ইরফান। ইনু কাঁদতে কাঁদতে বলে,“রাগের মাথায় দিয়েছে। কিন্তু আমি মানতে পারছি না।”
ইরফান চুপচাপ বোনকে কিছুক্ষণ দেখে। বাড়িতে তখনও কেউ ফেরেনি। ওরা দু'জনই ছিলো।
“ও কি তোর গায়ে হাত তুলেছে?”
ঠান্ডা গলায় জানতে চাইলো ইরফান।
_না।
_তবে কেনো বললি টর্চার করেছে?
_ওটা টর্চারই। একটু বুঝতে চাইলো না আমাকে,বলে দিলো আমি ওর বোনদের ভালোবাসি না। অথচ আমি ইশি আপুর থেকে কম কিছু ভাবি না ওদের।
একটা লম্বা শ্বাস ফেললো ইরফান,বললো,“তুই এখানে এসেছিস কেন? তোর ডিভোর্স চাই ওর থেকে?”
ইনু কেঁদে ফেললো,“কিসব বলছো দাদান? ডিভোর্স কেন চাইবো? আমি তো কষ্ট পেয়ে এসেছি, চলে যাবো কখনো।”
ইনু কাঁদতে থাকে, তার ইচ্ছে করছে দেয়ালে মাথা ঠুকতে, শরীরে এক ব্যাথা শুরু হয়েছে আর সে করছে পাগলের মতো আচরণ। তার কি হচ্ছে কে জানে!
ইরফান ক্রন্দনরত বোনকে দেখে ম্লান হেসে বলে,“ওকে খুব ভালোবাসিস?”
_হু।
_থাকতে চাস ওর সাথে?
_হু।
_তুই মানছিস আজকের তর্কাতর্কিতে তোরও ভুল ছিল?
_হু।
_তবে এখানে বসে থাকলেও কোনো সমাধান হবে না। উল্টো ছোটো মা অসুস্থ হবে এসব জানলে আর ছোটোবাবা তোর পেয়ারের প্রিতমের ওপর চড়াও হবে।
ইনু কেঁদে ফেললো। বললো,“আমি জানিনা দাদান আমি কি করবো!
ইরফান উঠে দাঁড়ায়, ঘরে গিয়ে গাঁয়ে একটা শার্ট চাপিয়ে এসে বোনের হাত ধরে বলে,“আয় আমার সাথে।”
বাড়িতে কেউ ফেরার আগেই ইরফান ইনুকে নিয়ে বেড়োলো। ইনু বারবার জানতে চাইছে কোথায় যাচ্ছে তারা। ইরফান গাড়ি চালাচ্ছে ফুল স্পীডে। গাড়ি গিয়ে থামায় রোজ গার্ডেন অ্যাপার্টমেন্টের সামনে।
পেটে ব্যাথাটা বাড়ছে ইনুর। ইরফান ওকে নিয়ে ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল টিপলো। ইনু পেট চেপে ধরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। দরজা খুললো প্রিতমই। তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে প্রেরণা।
এপাশে ইরফান দাঁড়িয়ে,শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে প্রিতমের চোখে, তারপর বলে,“ওর আচরণ বরাবর এমনই ছিলো, একটু অবুঝ, কিন্তু বোঝালে ঠিক বুঝে যায়, ও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, কোনো কিছু গভীর করে ভাবতেও পারে না, একটু খামখেয়ালি, এসব তুই জেনেই এগিয়েছিলি, বিয়ে করেছিলি, তোকে তো এসব আমৃত্যু সহ্য করতে হবে যদি ও পুরোপুরি বুঝদার হয়ে যায় তবুও। কারণ ওর ধাতটাই এমন, যেমন আমার ধাত বদমায়েশি করা। বাট স্টিল! শি ইজ স্যরি ফর টুডে! ”
প্রিতম ফ্যালফ্যাল করে ইনুকে দেখছে, ইনুর মুখটা অস্বাভাবিক মলিন। প্রিতমের পেছনে দাঁড়িয়ে প্রেরণাও দেখছিলো ওদের।
ইরফান থেমে আবারও বলতে শুরু করে,“শি ইজ রিয়ালি ভেরি স্যরি!”
আবারও একটু থেমে ইরফান চেঁচিয়ে উঠলো,“অ্যান্ড উই আর স্যরি! স্যরি ফর এভরিথিং!”
প্রেরণা ভাবলেশহীন মুখে শুধু দেখছে। প্রণমি ইরফান মির্জার কন্ঠস্বর পেয়ে ধীরপায়ে হেটে ড্রয়িং রুমে এলো।
ইরফান ইনুর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,“নিজের ঘরে যা ইনু।”
ইনুর ব্যাথাটা আচানক বেড়েছে। ধীরে ধীরে মাথা তুলে সে প্রিতমকে দেখে। প্রিতম ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।
দাদানের দিকে একপলক তাকিয়ে ইনু পা বাড়ায় সামনে, হঠাৎ করে পেটে এমন ভাবে মোচড় দিয়ে উঠলো তার,ইনু আর সইতে পারলো না। ঘাম ছেড়ে দিয়েছে শরীর থেকে, তীব্র যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে ইনু জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পরলো মেঝেতে। ওর দিকে বোকার মতো কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল প্রিতম, ইরফান। তারপর দু'জনেই “ইনু” বলে চেঁচিয়ে উঠে ত্বরিত এসে ধরলো ইনুকে।
ইনু অচেতন ছিলো মাত্র দেড় মিনিট। প্রেরণার কোলের ওপর ইনুর মাথাটা রাখা, ইরফান অ্যাম্বুলেন্স ডেকে নিলো। প্রিতম ইনুকে আগলাতে ব্যস্ত। তখন ইনু শুধু চেঁচিয়ে যাচ্ছে,“আপু আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে আমি মরে যাবো। প্রিতম আমার এমন লাগছে কেনো!”
যন্ত্রণার তোড়ে ঠিকমতো কিছু বলতেও পারছে না সে, ব্যাথাটা সবসময় এতো জোড়ালো থাকছে না, হঠাৎ এসে ধাক্কা দিচ্ছে,তখন মিনিটের জন্য জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে সে। আবার চেতনা ফিরলে সেই চিৎকার।
প্রণমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে কাঁদছে, এমন ভাবে চেঁচাচ্ছে ইনু কেউ আর স্থির হয়ে থাকতে পারছে না।
চলমান.....