ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 92

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৯২
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

ডক্টর রুকাইয়া পরী মেয়ের হাত ধরে রেখেছে, তাকে দেখাচ্ছে খুবই শান্ত তবে আদতে তা নয়। ভেতরটা তার ছিঁড়েখুঁড়ে যাচ্ছে এক ভয়াবহ আশংকায়।

ইনু পেটে হাত চেপে চেচিয়েই যাচ্ছে,“মাম্মা আমি মরে যাচ্ছি মাম্মা। আমি মরে যাচ্ছি!”

রেডিওলজি বিভাগের ওয়েটিং রুমে উপস্থিত প্রিতম, ইশমাম, ইহান, ইরফান, প্রেরণা, প্রণমি, শুদ্ধ এবং মিস জেনি। ওরা সবাই শুনছে ইনুর সেই আর্তনাদ।

রেডিওলজি বিভাগের প্রধান ডক্টর নাফিসা তার কাজটা করতে পারছিলেন না ঠিকঠাক ভাবে, তিনি পরীকে বললেন মেয়েকে ধরতে, পরী ধরতেও পারছিলো না, নির্বাক হয়ে দেখছে মেয়ের তড়পানি,যেন ধরলে মেয়েটা আরও কষ্ট পাবে,তাই ধরছেন না। দু'জন নার্স এসে ধরলে সে বলল,“একটু আস্তে ধরো।”

মনিটরের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ পরীর। ইনুর পেট থেকে ট্রান্সডিউসার সরিয়ে নিতে নিতে নাফিসা পরীর দিকে তাকিয়ে বললো,“ওর ইমার্জেন্সি ডিএনসি প্রয়োজন, পরী আপা আপনি করবেন এটা নাকি মারুফা আপাকে বলবো?”

পরী যেন শুনছে না কিছু, ঝাপসা চোখে মেয়েকে দেখছে। ইনু ব্যাথার তোড়ে চেঁচিয়ে বলছে,“মাম্মা কি হয়েছে আমার? ডিএনসি মানে? কি বলছে নাফিসা আন্টি!”

কথাটা ঠিক ভাবে বলতেও পারেনি,এর মাঝে জ্ঞান হারায় ইনু। পরী খুব শান্ত, নার্স দুটোকে বলল,“ওকে কেবিনে নিয়ে কোমরে ইনজেকশন দুটো দিয়ে দাও। আমি আসছি।”

ট্রলিতে করে অচেতন ইনুকে আনা হচ্ছে দেখে সবাই তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায়। ছুটে যায় ইশমাম মির্জা, প্রিতম।
গিয়ে প্রথমে প্রিতমই ধরলো ইনুর হাত। ওকে যেতে দেখে ইরফান,ইহান কেউই এগোলো না ওদের কাছে।

প্রিতমের গলা কাঁপছিল,জানতে চাইলো,“কি হয়েছে?”

_স্যার রুকাইয়া ম্যাম আসছে, আমাদের যেতে দিন,পেশেন্টকে দু'টো ইনজেকশন দিতে হবে। প্লিজ কেবিনে ঢুকবেন না কেউ কিছুক্ষণ।

ইনুকে নিয়ে চলে গেলো ওরা। এদিকে উৎকণ্ঠায় মলিন সকলের মুখ। ইশমাম ছটফট করছে পরীকে দেখে। পরী হাতে গ্লাভস পরে নিতে নিতে ক্লান্ত ভঙ্গিতে হেঁটে আসছিল, ইশমাম চেঁচিয়ে উঠলো,“হয়েছেটা কি আমার মেয়ের?”

একপলক স্বামীর দিকে, একপলক জামাইয়ের দিকে তাকিয়ে পরী নিস্তেজ কন্ঠে বলে,“ইনকম্প্লিট অ্যাবর্শন! ফেটাসের বয়স পাঁচ সপ্তাহ!”

ওখানে উপস্থিত প্রত্যেকে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলো পরীকে, পরী খুবই শান্ত। প্রিতম শাশুড়ির মুখের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে ছুটে যায় ইনুর কেবিনে।

ইশমাম সহ বাকিরা ধপ করে বসে পরে বেঞ্চিতে। শুদ্ধ শুধু করুণ কন্ঠে মায়ের কাছে জানতে চাইছে,“মাম্মা, মামী মনির কি হয়েছে মাম্মা?”

বান্দরবানে খবরটা পৌছেছে বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ। আলো আর রিতু হিমশিম খাচ্ছে, কি করবে না করবে বুঝে উঠতে পারছিলো না, দু'টো মেয়েই এতটা অসুস্থ! ইশির ট্রিটমেন্ট চলছে হসপিটালেই, পুরোপুরি সুস্থ না হলে ডক্টররা ছাড়বেন না। মুঈন এসে শশুর আর চাচাশ্বশুরকে বললো,“আপনারা দু'জন থাকুন এখানে, দুজন ওখানে যান।”

মুঈনের কথা মেনে ইলহাম আর রিতু রওনা দিয়ে দিয়েছে তখনই।

ইনুকে ওটিতে নিয়ে যাওয়া হবে সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ। আপাতত ব্যাথানাশক ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে, হাতে কেনুলা পরিয়ে দুটো স্যালাইন সংযুক্ত করা হয়েছে।

প্রিতম চুপচাপ এগোচ্ছে, তাকে দেখাচ্ছে উদ্ভ্রান্তের ন্যায়। এগোতে এগোতে চশমা খুললো, চোখটা কেমন করছে তার, ঠিক ইনায়ার বেডের পাশে যখন দাঁড়ালো,দেখতে পেলো আধো অচেতন মেয়েটা চুপচাপ, পিটপিট করে তাকাচ্ছে।

প্রিতমের বুক কাঁপছে। মলিন মুখে দেখছে ইনুকে, ইনুও দেখছিলো, হঠাৎ অস্ফুটে বিড়বিড় করলো,“খুব কষ্ট হচ্ছে প্রিতম।”

বলতে বলতে চোখ থেকে পানি ঝরালো, প্রিতম তৎক্ষণাৎ ওর দিকে ঝুকে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নরম গলায় বললো,“সেরে যাবে। একটু সহ্য করো!”

_মনে কষ্ট হচ্ছে প্রিতম।

_তুমি জানতে? আমাকে জানাওনি কেন?
ব্যাকুল হয়ে জানতে চায় প্রিতম।

ইনু কেঁদে বললো,“আমি এটাও জানতাম না প্রিতম বিশ্বাস করো, যখন থেকে জেনেছি তখন থেকে কষ্ট হচ্ছে, আমার বাচ্চা.....”

কান্নার দমকে কথা বেড়োচ্ছে না, শ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে এমন। প্রিতম ওর মাথার কাছে বসে মাথাটা নিজের কোলের ওপর রেখে বলতে লাগলো,“এটাই হয়তো পরিকল্পনা ছিলো আল্লাহর ইনু, এমন করো না।”

প্রিতমের হাতটা আগলে ধরে কাঁদছে ইনু, ব্যাথা একেবারে কমে গিয়েছে ইনজেকশন দুটো দেওয়ার পর, এরপর সন্ধ্যা সাতটায় ওটি।

কাঁপা কাঁপা ডান হাতটা ইনু নিজের পেটে রেখে অঝোর ধারায় চোখের পানি ফেলতে থাকে, প্রিতম ওকে সান্ত্বনা দিতে পারছে না, সে নিজেই সান্ত্বনা পাচ্ছে না খুঁজে,এমন একটি যন্ত্রণাদায়ক মুহুর্ত,তার পুরুষ মনটাও ক্ষান্ত হতে পারছে না। কিভাবে হলো,হলোই যখন এমন করে কেন হলো! কেনই বা সে চলে গেলো! কেন দিয়ে গেলো মা'কে এতো যন্ত্রণা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সে খুজে পাচ্ছে না।

প্রিতম ইনুকে আগলে নিয়ে চুমু খেয়ে বললো,“কাদে না এমন করে! আমরা জানলে জান দিয়ে ওকে আগলাতাম না বলো? ও তো জানালো না আমাদের, জানিয়ে আসেনি আমাদের, তোমার কোনো দোষ নেই,তুমি এভাবে কেঁদো না!”

_সেটাই প্রিতম, আসলে আমি খুব অযোগ্য যে, একটা অযোগ্য মেয়ে মাম্মা পাপার, অযোগ্য বৌ তোমার, সেজন্য আল্লাহ ভেবেছেন আমি অযোগ্য মা হবো হয়তো,তাই ওনার উপহার উনি ফিরিয়ে নিয়েছেন।

হু হু করে কাঁদছে ইনু,প্রিতম ওকে ধরে রেখেছে চুপ করে, এতক্ষণ পরী কেবিনের দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে ছিল, মেয়ের কথাগুলো শুনে চুপচাপ চলে যায় কেবিনের দরজা থেকে।

কেবিনের বাইরে বসে আছে বাকিরা। একপার্শ্বে মির্জা পরিবার থেকে ইশমাম,ইহান, ইরফান। বিপরীত পার্শ্বে আহসান পরিবারের লোকগুলো। প্রণমি চুপ করে আপুর পাশে বসে আছে মাথা হেঁট করে। ইহান প্রণমিকে দেখে একপলক নিজের ভাইয়ের দিকেও তাকায়, তার হুট করে মাথায় প্রশ্ন এলো ইরফান ইনুকে নিয়ে প্রেরণাদের বাড়িতে কি করছিলো, কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনায় চুপ করে আছে। ইরফান মাথা নিচু করেই বসে আছে, দৃষ্টি তার মেঝেতে নিবদ্ধ।

শুদ্ধ এতোকিছু বোঝে না, সে ইহানকে দেখেই ইহানের সাথে হাই-হ্যালো করতে ব্যস্ত। ইহান মলিন হাসে বাচ্চাটাকে দেখে। একটা সময় সে প্রেরণাকে ছেড়ে এসে ইহানের কোলে চড়ে বসলো তার অভ্যাস মতো।
প্রেরণার মুখে ছেয়ে যায় অপ্রস্তুত ভাব। শুদ্ধ তখন ইহানের সাথে তার নতুন সুপার ম্যানের ঠ্যাং ভেঙে যাওয়ার আলাপ পাড়তে ব্যস্ত।

প্রেরণা ধমকে ওঠে,“শুদ্ধ! এদিকে এসো, বিরক্ত করো না ওনাকে।”

ইহান কপাল কুঁ'চ'কে প্রেরণার দিকে তাকায়,বলে,“ওকে এভাবে ধমকাচ্ছেন কেন।”

_এটা হাসাহাসি করার সময় না,ওকে পরিস্থিতি বুঝতে হবে।

বিরক্ত হয়ে ইহান বললো,“সিরিয়াসলি! ও একটা বাচ্চা! যেখানে আমরা বড়রাই পরিস্থিতি বুঝি না। সেখানে ও বুঝবে?”

প্রেরণা চুপ হয়ে যায়,সে আসলে পছন্দ করছে না ছেলেটা ইহান তাজওয়ারের এতো গা ঘেঁষা হোক। ইহান প্রেরণার অভিব্যক্তি বুঝলো, কিন্তু এই সময়ে এমন আচরণ করলো শুদ্ধর সাথে তাও তার কোলে চেপে বসার জন্য এজন্য ভীষণ ইগো হার্ট হলো ইহান তাজওয়ারের, সে জেদ করে শুদ্ধকে আরেকটু মিশিয়ে নিলো নিজের সাথে, এবং প্রেরণাকে দেখিয়ে শুদ্ধকে তিন চারটা চুমু খেয়ে বুঝিয়ে বললো,“আজ একটু কম কথা বলি বাচ্চা? মামী মনি অসুস্থ, চলো আমরা ওর জন্য প্রে করি আল্লাহর কাছে।”

শুদ্ধ ইহান আঙ্কেলের কথায় মাথা নেড়ে চোখ বন্ধ করে প্রে করতে লাগলো। ইহান তাকায় প্রেরণার দিকে, প্রেরণা মাথা নিচু করে নেয়। ইরফান তখন শান্ত চোখে দেখতে থাকে ইহান-প্রেরণাকে। ওদের দু'জনকে দেখে একপলক প্রণমির দিকে তাকায় ইরফান, এককোণে কেমন গুটিসুটি মেরে বসে আছে মেয়েটা।

ইরফান হঠাৎ বলে উঠল,“আ'ম স্যরি বাট,এখানে এতো জনের থাকার দরকার নেই সম্ভবত.....”

ইহান বললো,“কেন তুই বাড়ি যেতে চাস?”

_না, বাচ্চা বা অসুস্থ লোক,যেমন শুদ্ধ,মিস জেনি। তাদের দু'জনের কথা বলছিলাম।

প্রণমির নামটা ইরফান মুখে নিল না, ইহান মাথা তুলে দেখলো মিস জেনিকে, ভাইয়ের ওপর কিঞ্চিত খুশি হলো ওর ভদ্রতা জ্ঞান দেখে। তারপর প্রেরণাকে বললো,“মিস জেনি,প্রণমি, শুদ্ধ। এদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিন। বুঝলেন?”

প্রণমি যেতে চাইলো না,ভাবীর খবরটা না নিয়ে সে কোথাও যাবে না। প্রেরণা বুঝলো কথাটা ফেলে দেওয়ার মতো নয়। তাই আদেশ করলো প্রণমিকে যেতে।

কিন্তু প্রণমি গেলোই না, অতঃপর একপ্রকার জোর করে শুধুমাত্র শুদ্ধ আর মিস জেনিকে পাঠিয়ে দিলো প্রেরণা,মির্জা বাড়ির গাড়ি এসে নিয়ে গেলো ওদের।

খানিক বাদে প্রিতম এলো কাহিল ভঙ্গিতে, পুরোপুরি বিধ্বস্ত অবস্থা তার। এসে ওয়েটিং রুমের এক কোণে চুপচাপ মাথা নিচু করে বসলো, ইশমাম ছিলো প্রিতমের মুখোমুখি, হাপাচ্ছে লোকটা, খুব বড় একটা ধাক্কা পেয়েছে মেয়েকে নিয়ে আবারও।
প্রিতমকে দেখে খুব রাগ চাপলো মাথায়, পরী সার্জিক্যাল পোশাক পরে ইশমামের পাশে এসে দাড়াতেই হাঁপাতে হাঁপাতে ইশমাম বললো,“খুব বিয়ে করবে, সংসার করবে, পড়াশোনা করবে, এই করবে, সেই করবে আরো কতকিছু করবে তোমার মেয়ে। করছে না? দেখছো করছে না?”

প্রিতম চুপ করে আছে। প্রেরণা,ইহান, ইরফান ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো ইশমাম কে।
ইশমাম বলতে লাগলো,“কি হাল করে ছেড়েছে নিজের। এসব নিয়ে কিছু তো বলতেও পারবো না কারণ আমার বলার দিন ফুরিয়ে গিয়েছে, কারণ আমি তাকে বুঝি না, তাকে বোঝে তার স্বামীই।”

পরী চুপ করিয়ে দিলো ইশমামকে,“থামবেন আপনি? যা হয়েছে একটা দূর্ঘটনা, আল্লাহকে ডাকেন আমার মেয়েটা যেন শক্ত থাকে।”

_আমি তো থেমেছি বহু আগেই পরী। মেয়ে যখন থেকে নিজের জীবন থেকে আমার মতামতের গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে তখনই থেমেছি।

কথাগুলো বলতে বলতে ইশমাম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, প্রিতম আর একটা কথাও বলেনি শ্বশুরের কথার বিপরীতে, সেই যে নীরব হয়েছে, নীরবতা ভেঙেছে ইনুকে ওটি থেকে বের করার পরে, এবারও সবার আগে ছুটে গেলো প্রিতম,ইনুর শরীরটা অবশ ছিলো তখন অ্যানেসথেসিয়ার প্রভাবে। স্যালাইন চলছিল।

প্রিতমকে হুরমুর করে ঢুকতে দেখে বাকিরা কেউ পা বাড়ায়নি ওদিকে। ইশমামও না,সে শুধু চোখমুখ কঠিন করে বসে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়।

প্রিতমকে দেখেই ইনু নড়েচড়ে উঠতে চায়,প্রিতম ওকে থামিয়ে দিলো,“চুপ করে থাকো।”

_আমি কি বেঁচে আছি?
ক্লান্ত আর ক্ষীণ স্বরে বললো ইনু। এখনো একটা ঘোরের মধ্যে আছে সে, ওটিতে কি হয়েছে তার স্পষ্ট মনে নেই কিছুই। একটা টাইম লুপে আটকে ছিলো যেন।

_আছো।
শান্ত জবাব প্রিতমের।

ইনু বড় বড় শ্বাস নিয়ে প্রিতমের দিকে তাকিয়ে বলে,“প্রিতম।”

_হু।

_আমি স্যরি। আর ঝগড়া করবো না।

_এটা কতবার বলবে?

_যতবার তোমার সাথে ঝগড়া করবো তার পরে, ততবার।

ইনু কাঁদছে হুঁ হুঁ করে। প্রিতম ওর বেডের পাশে বসে চুপচাপ ওকে দেখছে, কালো মোটা ফ্রেমের চশমার নিচে ছলো ছলো দু'টো চোখ, ইনু বললো,“তুমিও ওর জন্য কষ্ট পাচ্ছো তাইনা?”

মাথা নাড়লো প্রিতম, বললো,“আমার শুধু মাথায় একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে, আমি বাবা হতে যাচ্ছিলাম ইনু।”

দু'চোখ বন্ধ করে নেয় ইনু, কিছুক্ষণ ফোঁপানির মতো আওয়াজ বের হয়, তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,“এখান থেকে আমাকে বাড়িতে নিয়ে চলো, থাকতে চাইনা এখানে আমি।”

_সুস্থ হও আগে।

_আপু কোথায়? প্রণো কোথায়?

_আছে।

আবারও লম্বা একটা শ্বাস ফেললো ইনায়া,বলতে লাগলো,“প্রিতম আমি আলাদা হতে চাইনা। আমি তোমার বোনদের থেকেও তোমাকে আলাদা করতে চাইনা,অমন ইনটেনশন নিয়ে আমি তোমার লাইফে আসিনি....”

_ইনু তুমি ঠিক নেই। এসব তুমি সুস্থ হলেও বলতে পারবে। আমরা তখন আলোচনা করবো।

মনটা সবকিছু মিলিয়ে বিতৃষ্ণ হয়ে আছে। খানিকবাদে আবারও বললো,“ও যদি থাকতো তুমি খুব খুশি হতে তাইনা? ও আমাদের বেবি হতো প্রিতম!”

একটার পর একটা প্রসঙ্গ টেনে হাহাকার করছিলো, প্রিতম ওকে সান্ত্বনা দিতে পারছিলো না, কি সান্ত্বনা দেবে? ঝুঁকে ইনুর দিকে তাকিয়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,“তোমার বেবি চাই? ছ'মাস পরে আমরা চেষ্টা করবো। তুমি পড়াশোনা করবে,বেবিটা আমি পালবো। মনকে শান্ত করো ইনু।”

দু'চোখ বন্ধ করে নেয় ইনু, তড়পাচ্ছে সে। প্রিতম আর অপেক্ষা না করে বেড়িয়ে এসে পরীকে বলে,“মা ওকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে দিন।”

ইহান ইরফান উঠে দাঁড়ায়, বোনকে একটিবার দেখে আসবে বলে।
এদিকে ইশমাম ফোনকল রিসিভ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছে সবার। সবার খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো।

পরী মেয়েকে সামলে মনকে শক্ত করে চলে যায় দু'টো পেশেন্টকে নরমাল ডেলিভারি করাতে, সে যে ডাক্তার, তার ফুরসৎ কই একটু অসুস্থ মেয়েটার মাথার কাছে বসার।

রাত বারোটা তখন, আবারও ওয়েটিং রুমে ঝিমুচ্ছিলো সবাই, কারো নেই বাড়ি যাওয়ার তাড়া। ইশমাম দু'চোখ বন্ধ করে হেলান দিয়ে বসে আছে। ইনুকে তখন খাবার দেয়া হয়েছে, রং চা এবং বিস্কিট। প্রেরণা উঠে গেলো ভাইয়ের বৌকে খাওয়াতে। পেছন পেছন প্রিতমও গেলো।

প্রণমি ইশমামের পাশে বসেছিল, কিছুক্ষণ বসে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে অহেতুক পায়চারি করছিল একটা নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে ছড়ি নিয়ে, দূরে কোথাও যাচ্ছিলো না । ইরফান তাকিয়ে দেখছে ওর কর্মকাণ্ড, হুট করে একটা চেয়ারের সাথে ধাক্কা খেয়ে ছড়িটা ছিটকে দূরে পরে যায়। আশেপাশে ইহানও ছিলো না,আলো সামিনের সাথে কথা বলতে একটু দূরে চলে গিয়েছিল।
প্রণমি বোকা বনে গিয়েছে পুরো, ভয়ার্ত কন্ঠে ইশমামকে ডাকলো,“আঙ্কেল! আঙ্কেল!”

ইশমাম শুনতে পায়নি,সে কপালে হাত ঠেকিয়ে ঝিমুচ্ছে, একটা লম্বা শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায় ইরফান। ওর কাছে এসে ছড়িটা তুলে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,“ধরো।”

প্রণমি চ'ম'কে ওঠে। ইরফান শান্ত স্বরে বলে,“ভাবীর জন্য একটা যায়গায় চুপ করে বসে থেকেও প্রে করা যায়, আমরা যেমন করছি। এভাবে ছোটাছুটি করার মানে নেই।”

প্রণমি ছড়ি নিয়ে ঘুরলো, ইরফান গম্ভীর হয়ে বললো,“চার কদম এগিয়ে,ডানে যাও, বেঞ্চিতে বসো।”

প্রণমি চুপচাপ তাই করলো, আবারও গিয়ে চুপ করে বসে রইল।

________

ইশমাম মির্জা ইনুকে হসপিটাল থেকে ডিসচার্জ করিয়েছে পরেরদিন বিকেলেই। গোটা রাত হসপিটালে ছিলো পরী আর প্রিতম। প্রেরণা প্রণমিকে নিয়ে বাড়িতে ফিরেছিলো রাত দু'টো নাগাদ,ইহান আর ইরফানও তখনই শান্তিনীড়ে ফিরেছিলো।

ইনু সুস্থ মোটামুটি, কোনো ধরণের জটিলতা নেই আপাতত, ডিএনসির ধাক্কায় শারীরিক দুর্বলতা যা একটু আছে সারতে খানিকটা সময় নেবে। মির্জা বাড়িতে ফিরেছে রিতু-ইলহাম।

ইনু উদগ্রীব হয়ে ছিলো বাড়িতে যাওয়ার জন্য, হসপিটালের এই আকাশী সাদা ডেকোরেশন আর মেডিসিনের ঘ্রাণ তাকে একটুও স্বস্তি দিচ্ছিলো না। সে চাচ্ছিল বাড়িতে ফিরে নিজের ঘরে ঢুকে বিশ্রাম নিতে, একটু প্রিতমের সাথে সময় কাটাতে।

কিন্তু হতবাক হলো ইনু যখন শুনলো সে প্রিতমের সাথে যাচ্ছে না, তাকে শান্তি নীড়ে নিয়ে যাওয়া হবে।

সকালে ইশমাম মির্জা এসে এই খবরটা দেওয়ার পরে ইনু হতভম্ব হয়ে বললো,“কেন পাপা! আমি ও বাড়িতে কেন যাবো? আমি আমার বাড়িতে যাবো!”

_যাবে কারণ তোমার এখন যে কেয়ারটুকু প্রয়োজন সেটা তোমার মাম্মা,মেজো মা ছাড়া কেউ দিতে পারবে না। বুঝেছো?

_কিন্তু পাপা ও বাড়িতে প্রিতম,আপু আর মিস জেনি.....

_চুপ করো! বাড়তি একটা কথাও আমি শুনতে চাই না!

কেবিন ছেড়ে ইশমাম বেরিয়ে গেলে ইনু প্রিতমের দিকে চায়,প্রিতম চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল,সে সেই রাত থেকে না শশুরের মুখোমুখি হয়েছে না কথা বলেছে।

ইনু প্রিতমকে বললো,“প্রিতম তুমি পাপাকে কিছু বলছো না কেন? প্রিতম আমি বাড়িতে যাবো!”

প্রিতম নিশ্চুপ,ইনু কেঁদে দিয়ে বললো,“প্রিতম তুমি রেগে আছো না ঐ ব্যাপারটা নিয়ে ? আমি যাবো না শান্তিনীড়ে, তখন তো আমি রেগে চলে গিয়েছিলাম, থাকতাম না বিশ্বাস করো,চলে আসতাম আমি দাদান না নিয়ে গেলেও।”

প্রিতম তখনও নিশ্চুপ,ইনু বলতে লাগলো,“তুমি কেনো কোনো কথা বলছো না? আচ্ছা শোনো আমি দাদানকে বলে দেবো দাদান যেন আমাদের বাড়িতে না আসে,আর এটা নিয়ে ঝামেলা হবে না। প্লিজ রাগ কমাও এবার, এবং যাও,পাপার সাথে কথা বলো!”

প্রিতম ইনুর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জবাব দিলো,“মা বাবা একটা ডিসিশন নিয়েছেন ইনু, ওনাদের মুখের ওপর আমি কিছুই বলতে পারছি না। কিছুদিন ও বাড়িতে থেকে বিশ্রাম নাও।”

_এই তোমাকে পাপা কিছু বলেছে আমার অসুস্থতার জন্য? বলো আমাকে? সেজন্য তুমি এমন করছো?

_এমন কিছুই হয়নি ইনু।
ক্লান্ত স্বর জবাব দিলো।

প্রেরণাকে ইনু ধরেছিলো পাপাকে বোঝাতে,প্রেরণা বলেওছিল ইশমামকে,“আঙ্কেল বিষয়টা ওরা দুজন মিলে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিক।”

ইশমাম কারো কথা শোনেনি, মেয়েকে রেগে ধমকে সবার সামনে থেকে নিয়ে গিয়েছে শান্তি নীড়ে, যাওয়ার সময় প্রিতমকে বলেছে,“বাড়িতে এসো মন চাইলে, কটা দিন ইনু আমার কাছেই থাকবে।”

বাড়িতে এনে খুব চেঁচামেচি করেছে ইশমাম,“একটু নিজের শরীরের খেয়ালটাও রাখোনি । আমি তোমার রেজাল্টও দেখবো। আজ সন্ধ্যায়ই তো রেজাল্ট দেবে। দেখবো নিজের জীবনে তুমি কতটা সুখী হয়েছো।”

ইনু শুধু কাঁদছে,সে কোনো জবাব দেয় না। প্রিতম একটু জোর দিয়ে পাপার সামনে কেন তাকে আটকালো না এইবার, একটা ভুল সে করেছে, কিন্তু তাই বলে এই সময়টিতে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে ইনুর হাত ছেড়ে দেবে!

ইশমামকে কেউ থামাতে যায়নি। সবাই বুঝিয়ে ক্লান্ত। এমনকি ইরফানও বুঝিয়েছে,“ছোটো বাবা এখন ইনুর বোধহয় তোমার কিংবা আমাদের থেকেও ওর বরের প্রয়োজন বেশি।”

ইশমামের চাপা ক্ষোভ উপচে পরেছিল প্রিতমের ওপর, সে মেয়ের অসুস্থতার জন্য দায়ী করলো প্রিতমকে।

ইনু বিরোধীতা করে বললো,“কি বলছো কি তুমি পাপা? আমি মা হতে যাচ্ছিলাম,এটা কোনো অপরাধ নয়, আর যদি অপরাধ হয়েও থাকে তবে প্রিতম তো একা দোষী নয়, আমিও দোষী। বকাবকি করতে হলে আমাদের দু'জনকে করো!”

_এটা কোনো অপরাধ নয়, আমি জানি, আমি শুধু বলতে চেয়েছি তোমার জীবন মরণ সমস্যা হয়ে যেতে পারতো অথচ তোমার জ্ঞানী বর বা তুমি এতটা অজ্ঞান! কি সংসার করেছো? আজ সন্ধ্যায় রেজাল্টটাও দিক, আমি দেখবো। বিশ্রাম নাও।

শান্ত গলায় বলে ইশমাম চলে যায়, জানালার দিকে দৃষ্টি দিয়ে বসে থাকে ইনায়া। একবার ফোনের দিকেও তাকায় ইনু ভেজা চোখে, আসার পর থেকে প্রিতম একটিবার ফোনকলও করেনি তাকে।

হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে কাঁদতে থাকে ইনু। আর ওকে দূরে দাঁড়িয়ে চুপচাপ দেখতে থাকে ইরফান।

চলমান.......

[ আবার কবে লিখতে পারবো জানি না। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 92 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন